Home শ্রদ্ধাঞ্জলি অগ্রজের জন্মদিনে > খালিকুজ্জামান ইলিয়াস >> আখতারুজ্জামান ইলিয়াস > আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে অভিভাষণ

অগ্রজের জন্মদিনে > খালিকুজ্জামান ইলিয়াস >> আখতারুজ্জামান ইলিয়াস > আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে অভিভাষণ

প্রকাশঃ February 12, 2018

অগ্রজের জন্মদিনে > খালিকুজ্জামান ইলিয়াস >> আখতারুজ্জামান ইলিয়াস > আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে অভিভাষণ
0
0

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ৭৬তম জন্মদিনে 

 

[আজ আমাদের কালের সবচেয়ে প্রতিভাবান ও উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ৭৬তম জন্মদিন। বাংলা সাহিত্যের এই বরপুত্রের জন্মদিনে প্রকাশিত হলো তাঁরই অনুজ প্রখ্যাত অনুবাদক লেখক খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের একটি নতুন লেখা। সেইসঙ্গে প্রকাশিত হলো আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কর্তৃক পঠিত শংসাবাচন আর তারই প্রত্যুত্তরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অভিভাষণ]

[এক]

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস >> অগ্রজের জন্মদিনে

 

বেঁচে থাকলে আজ তিনি হতেন পঁচাত্তর বছরের যুবক। যুবক বলছি কারণ, তাঁর যে আগ্রহ, সব বিষয়েই তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি, হাসিঠাট্টা, রসবোধ, তার কোনো বয়স নেই, চিরকালই তা তরুণ। আসলে একজন কথাশিল্পীকে এরকমই হতে হয়। জীবন্ত মানুষকে গল্পে, উপন্যাসে পুনর্নির্মাণ করতে গেলে লেখককে জীবন্ত থাকতে হয়। ডি. এইচ. লরেন্স যেমন বলেছেন ঔপন্যাসিক সৃষ্টি করেন জ্যান্ত মানুষ, জ্যান্ত মেয়েমানুষ। আবার অস্টেনও যেমন বলেছেন ঔপন্যাসিককে নিচুর কাছে নিচু, সাধুর কাছে সাধু হতে হয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও সেরকমই একজন লেখক। চরিত্রের যে ইলাস্টিসিটি অর্থাৎ সবরকম পরিবেশে মানিয়ে চলেও সচেতনভাবে মিশে না যাওয়ার, গড্ডালিকায় ভেসে না চলার ক্ষমতা – সেটা ইলিয়াসের ছিল পুরোমাত্রায়। এজন্যই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল গ্রামে গঞ্জের, বস্তির মহল্লার একেবারে তৃণমূল মানুষের কথা এতটা বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে উপন্যাসে বলতে পারা।
পড়াশোনা করতেন বিচিত্ররকম। কোনো লেখাই তাঁর কাছে ফেলনা নয়। সাধু লেখা, কাঁচা লেখা, পাকা লেখা, সবই তাঁর মনোযোগের বিষয়। তবে বিশ্বসাহিত্যের ভালো লেখা তিনি পড়তেন খুব মনোযোগ দিয়ে এবং অনেকদিন ধরে। তাঁর বালিশের কাছে দেখেছি দিনের পর দিন সার্ভেন্তেসের ডন কিহোতে, দেখেছি হোমারের অডেসি, মার্কেসের বা কাজান জাকিসের ঢাউস উপন্যাসগুলো। আমাদের বগুড়ার বাসার দুটো আলমারি ভরা বইগুলোর প্রত্যেকটির স্পাইনে সাংকেতিক নাম্বারে তাঁর হাতের লেখা টুকরো কাগজ নির্দেশ করতো কোন ধাঁচের বই সেটা। ‘ইলিয়াস হোমলাইব্রেরী ১৯৫৪’ নামে ইংরেজিতে একটা সীলও বানিয়ে বইগুলোতে ছাপ দিয়ে রাখতেন। আবার একসময় দেখি দাদাবাড়ি থেকে কয়েক সংখ্যা পুরনো ইসলামিক রিভিউ এনে বাঁধিয়ে রেখেছেন। এছাড়া পাকিস্তানের প্রথমদিকের পার্লামেন্ট গেজেটও কিছু এলোমেলো পড়ে ছিল, পোকায় খাচ্ছিল। সেগুলোও বাঁধাই করে এনেছেন। পরবর্তীকালে, সম্ভবত দেশ স্বাধীন হবার পর সমকাল পত্রিকার অনেকগুলো সংখ্যা বছরওয়ারি সাজিয়ে বাঁধাই করে যথারীতি সীল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন। এইসব উৎসাহ, এই পত্রপত্রিকা নিয়ে নাড়াচাড়ার অভ্যাস তাঁর ছেলেবেলা থেকেই। বইপড়া, বইপ্রীতি, বইয়ের প্রতি নেশা – এইসব বুঝি একজন উঁচুমাপের লেখক হওয়ার পূর্বশর্ত।
আজ থেকে পঁচাত্তর বছর আগে সারা বাংলা জুড়ে চলছিল দুর্ভিক্ষ। বহুলোক তাদের স্থান শূন্য করে চলে গিয়েছে। ইলিয়াস মজা করে লিখছেন সেসব শূন্যস্থানেরই একটিতে মওকা বুঝে সে সুড়ুৎ করে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। নিজেকে নিয়ে, নিজের মরণব্যাধি, কর্তিত পা ইত্যাদি নিয়ে ঠাট্টা করার সুযোগ ছাড়তেন না। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিও কিন্তু একজন বড় লেখকের লক্ষণ। ঠাট্টার সুরে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। আমাদের পোশাকি বুদ্ধিজীবীদের খুব গুরুত্বের সঙ্গে একটা ভাব তৈরি করে ফালতু কথা বলার প্রয়াসকে তিনি বহুবারই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। তো এরকম একজন জীবন্ত মানুষ মাত্র ৫৪ বছর না হতেই মৃত্যুপথে চলে গেলেন; তাও এমন একটা সময়ে যখন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীলতার তুঙ্গে। প্রকৃতিতে অহরহই দেখি অপচয় হতে। নানাধরনের অপচয়, একটা তরতাজা সবুজ গাছ পোকা লেগে মরে গেল, একটা বাচ্চা ছেলে দুর্ঘটনায় মরে গেল, একটা সম্ভাবনাময় দেশ অরাজকতায়, রাজনীতির অদূরদর্শিতায় ধ্বংস হয়ে গেল – এরকম তো দেখা যায়ই। তেমনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরও সৃজনশীলতায় ভরা জোয়ারের কালে চলে যাওয়াটা একটা অপচয়ই, আমাদের সাহিত্যের জন্য একটা বিরাট অপচয়।

[দুই]
আনন্দ পুরস্কার >> শংসাবাচন পাঠ : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় >> প্রত্যুত্তরে অভিভাষণ দেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
[১৪০৩ বঙ্গাব্দে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করে। সেই পুরস্কার অনুষ্ঠানে শংসাবাচন পাঠ করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জবাবে অভিভাষণ দেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এখানে এই দুজনের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। পাঠক, ইলিয়াস তার অভিভাষণে উপন্যাস সম্পর্কে যে কথাগুলি বলেছেন, তা তার উপন্যাস ভাবনারই প্রতিফলন ছিল বলা যায়।]
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় >>
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
শ্রদ্ধাস্পদেষু,

রাষ্ট্রনৈতিক বা রাজনৈতিক বিভাজনে কোনও জাতির ভাষা ও সাহিত্য বিভক্ত হয় না। বাঙালি জাতি এখন দুটি পৃথক রাষ্ট্রের অধিবাসী, কিন্তু বাংলা সাহিত্য আজও অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবহমান। বাংলা ভাষায় যে-কোনও লেখক বা লেখিকা এই অবিচ্ছিন্ন সাহিত্য-ঐতিহ্যের অন্তর্গত। আপনি এই ভাষার একজন প্রধান লেখক, নিবাস বাংলাদেশ। আপনার সাহিত্য সাধনা দীর্ঘ দিনের, কিন্তু লিখেছেন খুব কম। বিষয়বস্তুর নির্বাচন ও ভাষা ব্যবহারে গভীর অভিনিবেশ আপনার বৈশিষ্ট্য। কিছু ছোটগল্প ও দুটি মাত্র উপন্যাস এ যাবৎ প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে আপনার প্রথম উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বিদগ্ধ পাঠকমহলে বিশেষ সমাদৃত। আপনার ‘খোয়াবনামা’ নামে দ্বিতীয় উপন্যাসটির পটভূমিকা দেশবিভাগ। প্রায় অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও দেশবিভাগের বেদনা, বিপর্যয় ও প্রভাব এখনও উভয়খণ্ডে তীব্রভাবে অনুভব করা যায়। এর ফলে বহু পরিবার সর্বনাশে তলিয়ে গেছে এবং নতুন নতুন সম্ভাবনারও সৃষ্টি হয়েছে, অনেক সামাজিক রদবদলও ঘটে গেছে। ধর্মের পবিত্র ভাব মুছে গিয়ে হিংস্র, স্বার্থপর রূপ প্রকটিত হয়েছে দিকে দিকে। বাংলার মাটিতে ঝরেছে প্রচুর অশ্রু ও রক্ত। পাশাপাশি কয়েকটি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার রূপান্তর ও মূল্যবোধের অবক্ষয় অত্যন্ত নিখুঁত ও নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে। মৌলিক সাহিত্য ছাড়াও এই রচনা একটি উল্লেখযোগ্য দলিল। এই উপন্যাসের জন্য আপনাকে এ বৎসরের প্রফুল্লকুমার সরকার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার প্রদত্ত হল।

 

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস >> অভিভাষণ
মাননীয় সভাপতি, মাননীয় প্রধান অতিথি, এবং সুধীবৃন্দ,
এবছর সৃজনশীল রচনার ক্ষেত্রে আমার লেখা ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসটিকে আনন্দ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করায় পুরস্কার প্রদান কমিটিকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। অসুস্থ বলে আমি এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। এজন্য আমি দুঃখিত।
সাহিত্য পুরস্কার দেয়ার সময় লেখককে একটি অলিখিত শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, তা হলো এই যে তোমার লেখা অব্যাহত রাখতে হবে, এবং লেখার মান বাড়ুক কি নাই বাড়ুক অর্জিত মান যেন পড়ে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখবে। এই শর্ত যে কোনো লেখককে সব সময় তটস্থ রাখার জন্য যথেষ্ট। একথা, আমার মনে হয় উপন্যাস লেখকের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।
উপন্যাসের সৃষ্টি ঔপনিবেশিক যুগে; অথচ এর অবস্থান ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিপক্ষেই। উপন্যাসে সব স্তরের মানুষের যে বিপুল সমাবেশ ঘটে, শ্রেণী-গোষ্ঠী-সম্প্রদায় নির্বিশেষে যে বিচিত্র, জীবন্ত মানুষ সৃষ্টি হয়, মানুষের সৃজনশীল কল্পনার যে বাঁধভাঙা প্রকাশ ঘটে তা ঔপনিবেশিক আর্থসামাজিক ও মনস্তাত্বিক ব্যবস্থার প্রতি তো রীতিমতো হুমকি। এজন্যই কি ডন ক্যিহুটির মতো শিল্পকর্মকে দুশো বছর লাতিন আমেরিকার স্প্যানিশ উপনিবেশগুলোয় নিষিদ্ধ করা হয়? কিন্তু উপন্যাসের খোলা মাঠে বিপুল লোকসমাগম ও মানুষের স্ফূর্ত কল্পনার উড়াল ঠেকায় কে? স্পেনের ক্ষয়িষ্ণু অভিজাতের কাহিনী তাই মদের পিপেয় চালান হয়ে দিব্যি ঢুকে পড়ে বলিভিয়ায়, পেরুতে, লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে। প্রায় চারশো বছর আগে সার্ভেন্তেস সাহেব তাঁর নাইটের রুগ্ন ঘোড়ার দাপটে সত্যিই অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।
উপন্যাস বড় হয়েছে ব্যক্তির বিকাশ ঘটতে ঘটতে। আবার ব্যক্তির বিকাশ ঘটাতেও উপন্যাসের ভূমিকা কম নয়। ওদিকে পাশ্চাত্যে ব্যক্তিস্বাধীনতার উন্মেষ না ঘটতেই তা রূপান্তরিত হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে। এখন দেখি এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য পর্যবসিত হয়েছে ব্যক্তিসর্বস্বতায়। উপন্যাসে ব্যক্তি আসছে নানান রঙে, নানান ঢঙে।
আমাদের এই উপমহাদেশে ব্যক্তির বিকাশ প্রথম থেকেই বাধা পেয়ে এসেছে। এখানে ব্যক্তিপ্রবরটি জন্ম থেকে পঙ্গু ও দুর্বল। পাশ্চাত্যের সর্বত্রই যেহেতু ব্যক্তি সর্বস্বতার জয়গান, আমাদের এখানেও তাই জন্ম-রোগা ব্যক্তিটির দিকেই আমাদের লেখকদের অকুণ্ঠ মনোযোগ। বাংলা উপন্যাসে প্রথমে এই রুগ্ন ব্যক্তির শরীরে একটু তেজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলো, কিন্তু সেই নকল তেজ তাকে শক্তি জোগাতে পারেনি। কেবল তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল উপন্যাসগুলোয় বরং দেশের কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতাকে প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের মর্যাদাই দেওয়া হয়। অথচ অন্যান্য সাহিত্যের উপন্যাসে তখন প্রচলিত সংস্কার, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে অবিরাম আঘাত করা হয়েছে।
ঔপনিবেশিক শক্তির উপহার এই খঞ্জ ব্যক্তিটিই হয়ে ওঠে লেখকদের আদরের ধন। তাকে নানাভাবে তোয়াজ করাই এখন আমাদের ঔপন্যাসিকদের প্রধান কাজ। দেশের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, এবং আবার স্বপ্নদেখার অসীম শক্তি আমাদের চোখে পড়ে না। এজন্য শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত মানুষকে নিয়ে যখন লিখি তকনো পাকে-প্রকারে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিই মধ্যবিত্তকে এবং শক্তসমর্থ, জীবন্ত মানুষগুলোকে পানসে ও রক্তশূন্য করে তৈরি করি। বাংলাদেশে এখন চলছে শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে মধ্যবিত্তের বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া। ফলে আমাদের সংস্কৃতির বুনিয়াদ চলে যাচ্ছে আমাদের চোখের আড়ালে। আমাদের গান, আমাদের ছবি আমাদের কবিতার উৎস যে জীবন ও সংস্কৃতি তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটায়, সংখ্যার দিক দিয়ে বিস্ফোরণ হলেও, আমাদের উপন্যাস দিন দিন রক্তহীন হয়ে পড়ছে। একই কাহিনী নানান বয়ানে শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। তবে ক্লান্তিও লেখকরা লুফে নেন জীবনে একেই একমাত্র সত্য বলে জাহির করার সুযোগ খোঁজেন।

১৪০৩

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close