Home অনূদিত ছোটগল্প অজিত কাউর >> ব্লাডহাউন্ডস্ >> অনূদিত ছোটগল্প >>> উম্মে মুসলিমা অনূদিত

অজিত কাউর >> ব্লাডহাউন্ডস্ >> অনূদিত ছোটগল্প >>> উম্মে মুসলিমা অনূদিত

প্রকাশঃ April 30, 2018

অজিত কাউর >> ব্লাডহাউন্ডস্ >> অনূদিত ছোটগল্প >>> উম্মে মুসলিমা অনূদিত
0
0

অজিত কাউর >> ব্লাডহাউন্ডস্ >> অনূদিত ছোটগল্প >>> উম্মে মুসলিমা অনূদিত

 

[পাঞ্জাবি-ভাষার গল্প]

আমার মনে হয় আপনি সত্যিই বলেছেন যে এর আগে কখনও আপনি এরকম নির্জন শ্মশানের মতো বাড়ি দেখেননি। এ যেন একটা কবরস্থান যেখানে ভুতুড়ে অন্ধকার রাতে অতৃপ্ত আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। আপনার মনে হতে পারে এ বাড়ির বাসিন্দারা জীবিত কিন্তু আমরা আসলে মৃতেরও অধম।
যখন থেকে এই নরকে আমরা দিন কাটাচ্ছি তখন থেকেই আমার বাবা তার ঝুলেপড়া দড়ির খাটের ওপর সারাদিন শুয়ে থাকে। রাতে সে ছাদের ওপর এমনভাবে পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে যেন মনে হয় সে একটা কারাগার থেকে বের হতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
আপনি বিশ্বাস করবেন না কিন্তু আমি যা বলছি তা সত্যি। লোহার শিক দিয়ে ঘেরা থাকলেই তা কেবল কারাগার হয় না, আপনি যে-কোন জায়গাতেই নিজেকে অবরুদ্ধ ভাবতে পারেন, যদি তা খোলা ছাদও হয়।
শেষপর্যন্ত যখন আমার ছোট্ট সোনা বোনটার লাশ আমাদের দেয়া হলো তখন সেটা ছিল জোড়াতালি দেয়া একটা চটের ব্যাগের মতো। কিন্তু আমি এখনও স্পষ্ট তার ভীতি-বিস্ফারিত চোখ দেখতে পাই আর তার অসাড় ঠোঁট থেকে তীব্র আর্তনাদ শুনি।
হ্যাঁ, দুটো মৃতদেহই পাশাপাশি শোয়ানো ছিল। একটা বিন্দির। আমার ছোটবোন বিন্দি। ওটা ওর ডাকনাম। ওর আসল নাম ছিল সালবিন্দার কাউর। আর একটা মৃতদেহ বিন্দির বান্ধবী জিতির। ওর ভালোনাম ছিল সার্বজিত। যেন একজোড়া ঘুঘু ছিল ওরা। একসাথে স্কুলে যেতো আসতো। লেখাপড়া, সুতোকাটা, সেলাই, এম্রয়ডারি সব একসাথে। আহা সোনামনিরা আমার! এমনকি যখন মৃত্যু এলো তখনও দুজনা একসাথে। মৃত্যুর আগের সেই বিভৎস সময়টাতেও দুজনেই..
না, আমি কাঁদছি না। প্রচণ্ড ক্রোধে আমার শরীর কাঁপছে। যেন একটা কড়াইয়ে আমার ক্ষোভ, আমার ক্রোধ রেখে সেদ্ধ করা হচ্ছে। নিচে চুলার মধ্যে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আমি কাঁদছি? না, না, আমি আসলে নিজেকে সামলাতে পারছি না।
আমার সত্যিই মনে হয় সেই চুলা থেকে একটা জলন্ত কাঠ তুলে এনে সারা পৃথিবীতে আগুন লাগিয়ে দিই… একটা কুড়াল নিয়ে আমার চারপাশে যা আছে সব কেটে ফালি ফালি করি।
না, আপনি যা বলছেন তার কোন মানে নেই এ দেশে। এ দেশে আইনের ধার ধারে না কেউ। অনেকদিন ধরে ভেবে এখন আমার মনে হচ্ছে আমাদের আইনের মারপ্যাঁচে সুবিচার পাবার রাস্তা খোলা নেই। পুলিশের এফ.আই.আর ছাড়া আপনি আদালতে কোন আবেদন করতে পারবেন না। অভিযোগকারী যদি সমাজের প্রতাপশালী ব্যক্তি হন কেবল তার প্রতিবেদনই নিয়মমাফিক লিখিত হয়। প্রতাপশালী বলতে সে হতে পারে দুর্বৃত্তদের নেতা, হতে পারে তাদের মামা চাচারা রাজনীতিবিদ বা যাদের পকেটভরা টাকা। আর যদি তিনি সমাজের কেউকেটা না হন বা তার কোন গডফাদার না থাকে তবে আমার বাবা আর জিতির বাবার মতই বাধ্য হয়ে সব গুটিয়ে নিতে হবে। লিখিত এফ.আই.আর. ছাড়া আদালত কিছুই গ্রহণ করবে না। আর আদালতের রাস্তা বন্ধ মানে বিচারও বন্ধ।
দেখুন, আপনি হয়তো বলবেন আদালত থেকে সঠিক বিচার পাবারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? আদালতে তো আপনি আপনার নিজের লেখা রিপোর্ট দাখিল করতে পারবেন না। আপনাকে উকিলের মাধ্যমে যেতে হবে। তার মানে আবার আপনাকে সেই প্যাঁচের মধ্যে পড়তে হবে। আপনার অঢেল টাকা থাকলে একজন ঝানু উকিল নিতে পারেন। কিন্তু যার নেই তিনি একজন নবিশ নেবেন। প্রতাপশালী প্রতিপক্ষের চতুর কৌশুলির সাথে তিনি পেরে উঠবেন? বিচারক তো উকিলের যুক্তিতর্কের ওপরেই নির্ভর করবেন। তিনি তো কারো বেদনা-দুঃখ-ক্ষোভ দেখতে পাবেন না।
জানি, এসব অর্থহীন দীর্ঘ প্রলাপ। শুধু অন্ধগলির মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া। যখনই এসব ভাবি আমার মাথা চক্কর দেয়। আমার চারপাশ, পৃথিবী, আকাশ সব ঘুরতে থাকে। আমি কিছুতেই এসব থেকে বেরুতে পারিনা।
বাপু একটা কথাও বলে না। মা শোকে বিহ্বল। ভাই সারাদিন গুরুদুয়ারায় কাটায়। আপনাকে বলেছি বোধহয় আমার বাপু গুরুদুয়ারার একজন গ্রন্থিক। কিন্তু এই সময়টাতে তিনি কেবলই তার জীর্ণ খাটের ওপর শুয়ে থাকেন। তার পরিবর্তে ভাই সকালে উঠে গুরুদুয়ারায় গিয়ে বাপুর নির্ধারিত ধর্মীয় কাজগুলো সারে। রাতে ফিরে কোনমতে দু’লোকমা গিলে শুয়ে পড়ে, আবার সেই কাকভোরে বেরিয়ে যায়। বলতে গেলে তার বউই বাড়ির সবকিছু দেখভাল করে।
এই দুর্ঘটনার কথা শোনার পর আমি আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে এখানে এসেছি। আমিও এখানে তেমন কিছুই করছি না, কেবল পাড়া-প্রতিবেশীরা যারা আমাদের সান্ত্বনা দিতে আসে, তাদের সাথে দু’চারটে বাক্যালাপ ছাড়া। আর আপনার মতো যারা খবরের কাগজের লোক তাদের সাথে তো বলতেই হয়। …এভাবেই আমার দিন যাচ্ছে, নিরানন্দ, অসহ্যকর।
রাতের অন্ধকারে আমি প্রায়ই আমার মায়ের বিছানা থেকে তার ফোঁপানোর শব্দ পাই। তিনি কেন দিনের বেলা কাঁদেন না? কেন কেবলই রাত্রিবেলা? বলতে পারেন?
কী অদ্ভূত এই মৃত্যু! যে-ছিল আমাদের ভালোবাসার ধন, আমাদের আদরের মনি, যে চিরতরে চলে গেছে না ফেরার দেশে- তার জন্যে কেউ কেন চিৎকার করে ওঠে না, কেন দেয়ালে মাথা ঠোকে না, কেন বুক চাপড়িয়ে কেঁদে বুক ভাসায় না?
জানি আমাদের এ ক্ষত কোনদিন শুকাবে না। যে ক্ষতি আমাদের হয়েছে তা কোনদিনই পুরণ হবার নয়।
যদি কেউ না কেঁদে তার গভীর বেদনা পুষে রাখে, তবে তা জমতে জমতে ভেতরটা কংক্রিট হয়ে যায়- দেখুন আমার বাপু আর মাকে।
মানুষজনের কথা বলছেন? মানুষজন এখানে এসে কী করে জানেন? ঘুরে-ফিরে ওই একই কথা নিয়ে আলোচনা। এতে কী বেদনা লাঘব হয়? হয় না। বেদনা, ভালোবাসা সবকিছুর জন্যই দরকার সমাধান। বেদনা যত গভীর হবে, আপনি তত একা হয়ে পড়বেন।
না, আপনার কাছ থেকে আমি মহানুভবতা আশা করছি না। কারণ আপনি আমাদের না আত্মীয় না প্রতিবেশী। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি আপনার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা এই পরিণতি থেকে আমাদের উদ্ধার করা। তাই আপনার কাছে নিজেকে মেলে ধরতে চাচ্ছি। কারণ বিন্দি আর জিতির মৃত্যু নিয়ে নিজের লোকজনের সাথে কথা বলাও মুশকিল।
কিন্তু আপনাকে বলাটা একটু আলাদা। যদি আপনার কলম কারো চোখ খুলে দেয়, কারো বিবেককে নাড়া দেয়, সেই উর্দিপরা নেকড়েগুলোকে চিনতে সাহায্য করে, যাদের ফিটফাট পোশাকের নিচে চাকুর চেয়েও ধারালো রক্তচোষা দাঁত আর থাবা রয়েছে, তাহলে আলাদা কথা। মৃতেরা আর ফিরে আসবে না কিন্তু তারা নিশ্চয় …কী জানি, জানিনা।
বিশ্বাস করুন তারা একেকটা শকুন, পুরোদস্তুর শকুন। তারা একটানা মাংস ভক্ষণ করতে পারে যদি তা জীবিত প্রাণীরও হয়।
আমি দুঃখিত আমার উচিৎ আপনাকে সরাসরি ঘটনাটা বর্ণনা করা কিন্তু কেন জানি আমার চিন্তাভাবনা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ভাবনাগুলো তো এমন নয় যে তা কোঁচকানো শাড়ি, ভালো করে ঝাড়লে বা ইস্তিরি করলেই টানটান হয়ে যাবে। কেন জানি বারবার পেঁচিয়ে যাচ্ছে। এজন্যে আমাকে মাফ করবেন।
কী যেন বলছিলাম? ও, সেই নেকড়েগুলোর কথা। কী আশ্চর্য! নেকড়েগুলোর কথা বললেই সেই কুকুরগুলোর কথা মনে আসে। এ ভাবনাগুলোর সাথে বিন্দির মৃত্যুর সম্পর্ক নেই কিন্তু এতদিন পরেও জানিনা কেন তা আমাকে চাবকাতে থাকে।
আমার বিয়ের আগে আমি আর বিন্দি একই বিছানায় শুতাম। বিন্দি আমার অনেক ছোট। আমার পর আমার ভাই তারপরে বিন্দি। বিন্দি সবার ছোট বলে সবারই খুব আদরের ছিল।
একটা সময় বিন্দি ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠতো। আসলে ঠিক চিৎকারও না, ওটা ছিল একধরনের গোঙানি। যেন কেউ তার গলা টিপে ধরছে আর সে নিজেকে তা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে। আমি তাকে নাড়া দিয়ে আদর করে ডাকতাম ‘বিন্দি, এই বিন্দি’। সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসতো। আমি তার ভয়মিশ্রিত কান্নাজড়ানো চোখ দেখতে পেতাম। সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকতো। তাকে দেখে মনে হতো সে তখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সে এক ভয়াবহ অন্ধকার গুহা আর আগ্রাসী থাবা থেকে মুক্ত। আমি তার চোখ মুছিয়ে দিতাম আর বারবার তাকে প্রবোধ দিতাম, ‘বিন্দি দেখ, এই যে আমি। এইতো আমি তোর কাছে। কেন ভয় পাচ্ছিস?’
আপনি কি ভয়াল স্বপ্নভাঙা কারো বিস্ফারিত চোখ দেখেছেন কোনদিন, যে জাগ্রত কিন্তু তখনও সেই ভয়ঙ্কর স্বপ্নের মধ্যেই বিচরণ করছে? শুয়ে আছে স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে একটা ঠাণ্ডা পাথরের মতো? যেন সেই ভয়টা গোধূলির নিচে একটা নেকড়ে হয়ে তার চারপাশে হাঁটছে?
না, তার স্বপ্নের সেগুলো আসলে নেকড়ে ছিল না। তারা ছিল একপাল কুকুর, রক্তলোলুপ কুকুর।
আমি তাকে যখন ধাক্কা দিয়ে জাগাতাম, তার মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতাম সে আস্তে আস্তে বাস্তবতায় ফিরে আসতো। তার ভীতিবিহ্বল চোখ স্বাভাবিক হয়ে আসতো।
চেতনা ফিরে পেয়ে যখন সে দেখতো আমি তাকে জড়িয়ে ধরে আছি, সে নিরাপদ বোধ করতো। আমি তাকে আদর করতাম, একটু হাসাতে চেষ্টা করতাম যাতে সে তার ভয়ঙ্কর স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এরপর সে একটু ম্লান হেসে চোখ মুছে ফেলতো। সম্ভবত তার তখন মনে হতো সে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসছে। তার চারদিকে নিরাপত্তা-প্রাচীর। কুকুরগুলো আর তার দিকে ছুটে আসতে পারবে না।
কখনও কখনও সে তার স্বপ্নের কথা আমাকে সবিস্তারে বলতো-
‘জানিস আপা, আমি স্বপ্ন দেখি আমি যেন এক জঙ্গলে হারিয়ে গেছি। ঠিক জঙ্গলও না যেন বুনো কাঁটাঅলা ঝোঁপঝাড়। না আলো না অন্ধকার। যেন রাত নেমে আসছে আর সাথে সেই আদ্ভূত আওয়াজ। কিন্তু গভীর অন্ধকারেও সে কাঁটাআলা ঝোঁপঝাড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত সেটা দিনের বেলা কিন্তু আমার মনে হয় নিকষ কালো রাত।’
‘আমি সে জঙ্গলে পথ হারিয়েছি। মনে হয় সঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কিন্তু আবার নিজেকে ভুলপথে দেখি। আমি দিকভ্রষ্ট হয়ে ঘুরতে থাকি, অন্য রাস্তা দিয়ে বের হতে চাই কিন্তু শেষপর্যন্ত দেখি সে রাস্তাও আমাদের বাড়ির দিকের রাস্তা নয়।’
‘ঠিক সেইসময়ই কুকুরগুলো ডাকতে থাকে। আমি নিজেকে ঝোঁপের আড়ালে লুকাতে চাই কিন্তু হঠাৎ দেখি সেই ঝোঁপঝাড় সব বিলীন, লুকানোর কোন জায়গা নেই। আমি প্রাণপনে দৌঁড়াতে থাকি আর কুকুরগুলোও পেছন পেছন আমাকে তাড়া করে। আমি এখনও স্পষ্ট দেখতে পাই তাদের জিভ বেরিয়ে আসা মুখ, তীক্ষ্ম দাঁত, হাঁপানো শরীর আর রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। একটা লোহার রিং ছুঁড়ে আমাকে ঘেরাও করছে। আমি বেরুবার পথ পাচ্ছি না। তারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তখন আমি চিৎকার করে উঠি…’
তারপর বিন্দি কেমন শিউরে ওঠে। ওর চোখে এক অদ্ভূত ভয় উঁকি দিতে থাকে।
আমি ওকে বুকের সাথে শক্ত করে ধরে রাখি।
‘বোকা মেয়ে! স্বপ্ন দেখে কেউ এরকম ভয় পায়? বাস্তবে সবসময় স্বপ্নের উল্টোটা হয়। স্বপ্নে তুই যদি মারা যাস তার মানে তুই দীর্ঘজীবী হবি।’
জানিনা সে আমার কথা বিশ্বাস করতো কি-না, কিন্তু একটু পরেই আমার বাহুর ওপর ঘুমে ঢলে পড়তো
এখন মনে হচ্ছে ক্যানেলের কিনারে পুরোনো ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে সেই ভয়ঙ্কর দিনটিতে বিন্দি আর জিতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া সেই নরপশুটার সাথে তার স্বপ্নে দেখা সেই কুকুরগুলোর কোন পার্থক্য নেই।
আমি যদি কোথাও একটা বন্দুক পেতাম তাহলে সেই কুকুরগুলোকে গুলি করে মারতাম।
না, না আমি কাঁদছি না। আমি… আমি আসলে আপনাকে সেদিনের সেই ঘটনাটা বলতে চাচ্ছি।
সেদিন ছিল রোববার। খুব ভোরে জিতি এলে ওরা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সেসময় মা ওদের বলে-
‘শোনো মেয়েরা, আমি চুলাটা একটু ঠিকঠাক করতে চাই। তোমরা যদি লেখাপড়া রেখে ক্যানেলের ধার থেকে আমাকে একটু এঁটেল মাটি এনে দাও তাহলে আমি কাজটা সেরে ফেলতে পারবো।’
একটা বালতি নিয়ে ওরা ঘুঘুপাখির মতো বকমবকম করতে করতে ক্যানেলের ধার থেকে বালতি ভরে মাটি নিয়ে এলো। মা তো সেই মাটি দেখে খুশিতে আটখানা-
‘কী চমৎকার মাটি! এ মাটি দিয়ে তো মানুষও গড়া যায়!’
বিন্দি বললো- ‘মা, তাহলে একটা কথাবলা মানুষ বানাও।’
সবাই হেসে উঠলো।
আমি? না, আমি তখন এখানে কী করে? তখন তো আমার শ্বশুরবাড়িতে আমি। আমার ভাইয়ের বউ আমাকে পরে সব বলেছিল। মা একটা কথাও বলতে চায়নি। কেবল যেদিন বিন্দি আর জিতিকে দাহ করা হলো সেদিন সে বুক চাপড়ে-চাপড়ে লাত্থি মেরে সেই চুলাটা ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলেছিল। তারপর সেই থেকে ঘরে ঢুকে তার বিছানার সাথে আঠার মতো লেগে আছে।
মা যখন লাথি দিয়ে চুলাটা ভাঙছিল তখন সে এমনভাবে গোঙাচ্ছিল যেন কেউ তাকে ভোতা ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করছে।
তো প্রথমবার আনা মাটি বালতি থেকে ঢেলে ওরা দুজন আবার মাটি আনতে গিয়েছিল। পরে সেই বালতি ক্যানেলের ধারে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু তাদের দুজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তখনও দুপুর হয়নি। ওরা যখন বেরিয়ে যায় তখন সকাল এগারোটা সাড়ে এগারোটা হবে। দুপুরে খাবার নিয়ে আমার মা আর ভাবী অপেক্ষা করছিল ওদের জন্য। মা বিরক্ত হয়ে বললো- ‘মেয়েগুলো কেমন সৃষ্টিছাড়া! নিশ্চয় জিতিদের বাড়ি গিয়ে সব ভুলে বসে আছে!’
সন্ধ্যের একটু আগে বাবা বাড়ি ফিরলো। মা বললো যে মেয়ে দুটো সেই সকালে ক্যানেলের ধারে মাটি আনতে গিয়ে আর ফেরেনি। বাবা সঙ্গে সঙ্গে মাখন চাচা অর্থাৎ জিতির বাবা মাখন সিংয়ের বাড়ি ছুটলো।
ওখানেও মেয়েরা নেই।
বাবা মাখন চাচাকে নিয়ে হন্যে হয়ে ক্যানেলের ধারে খুঁজে বেড়ালো মেয়েদের। ডাকলো-
‘বিন্দি-ই-ই, জিতি-ই-ই…’
তারা মাটিমাখা একটা খালি বালতি কাত হয়ে গড়ানে পড়ে থাকতে দেখলো। বালতিটা তুলে নিয়ে তারা চোখের জল সামলাতে সামলোতে হতভম্ভের মতো বাড়ি ফিরলো।
দু’বাড়ির লোকজনই ওদের খুঁজতে থাকলো যদি তাদের অন্য বন্ধুরা বা কেউ তাদের খোঁজ দিতে পারে।
দু’পরিবারের লোকজন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাতেও বিন্দিদের স্কুলের শিক্ষক-ক্লাসমেটদের বাড়ি বাড়ি খুঁজে এলো। পাশের গ্রাম থেকে দু’জন সহমর্মী শিক্ষকও এসে তাদের সাথে যোগ দিল। কিন্তু কোথাও নেই তারা।
দেখুন, আমাদের বাড়ি থেকে ক্যানেলের দিকে যেতে একটা বাজার পড়ে। সেখানেও খোঁজ করা হলো। বেশিরভাগই বললো তারা দেখেনি। অল্প কয়েকজন বালতি হাতে তাদের যেতে দেখেছে বললো।
প্রথমবার যখন তারা মাটিভর্তি বালতি নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল তখন মুদি দোকানি রুল্ডু তাদের দেখেছিল। ভারি বালতিটার হাতল দুজন দুদিক থেকে ধরে দুলতে দুলতে ফিরছিল। রুল্ডু মজা করে বলছিল-
‘ও মেয়েরা, তোমরা এখনও মাটি নিয়ে খেল?’
‘না চাচা, মা চুলা মেরামত করবে বলে ক্যানেলের ধার থেকে এঁটেল মাটি নিয়ে যাচ্ছি’- বলেছিল বিন্দি।
রুল্ডু প্রশংসা করেছিল-
‘তাইতো বলি, ভালো মেয়েরা সবসময় তাদের মায়েদের সাহায্য করে।’
বাবা গুরুদুয়ারার গ্রন্থিক বলে সবাই তাকে চেনে। তাছাড়া সেজন্যে আমাদের পরিবারকেও সবাই সম্মান করে। কিন্তু সেদিন ঐসময় সবাই তাদের কাজে ব্যস্ত ছিল।
এটা একটা গ্রাম বলে কিছু লোক তাদের দেখেছিল এবং কথাও বলেছিল। ভেবে দেখুন এটা যদি একটা শহর হতো তাহলে কেউ কাউকে চিনতোও না। শহরে তো পাশের বাসার লোককেও কেউ চেনে না। এটা আমি জানি কারণ আমার স্বামী শহরে কাজ করে। না, সে কোন অফিসে চাকরি করে না, একটা স্কুলে পড়ায়।
এমনকি জিতির বাবাদের অবস্থাও ভালো। না, আপনি ঠিকই বলেছেন, আহামরি এতো জমাজমি নেই। যাদের প্রচুর জায়গাজমি আছে বা খুব প্রভাবশালী পরিবার, মানুষজন তাদেরই সম্মান করে। এ ছাড়া যারা মানুষের মনে ভয় ধরাতে পারে তাদেরকেও। যেমন ধরুন পুলিশ ইন্সপেক্টর। সে যখন কোন তদন্তের জন্য গটমটিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে তখন মানুষজন হাত জোড় করে উঠে দাঁড়ায়।
দেখুন, তদন্ত-টদন্ত আজকাল উর্দিধারীদের একটা প্রাত্যহিক কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। এমনকি পাঞ্জাবে সহিংসতার প্রথমদিকেও এরকম হয়েছিল। কোন ঘটনা ঘটলেই তারা হুড়মুড়িয়ে গ্রামে ঢুকে কোন কারণ ছাড়াই বকাবকি, গালিগালাজ, মারধোর পর্যন্ত করে। বাড়িতে ঢুকে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের লাথিগুতা মারে। বাড়ির মেয়ে-বউদের সামনেও সাদা চুল বলে কাউকে ছাড় দেয় না।
মনে হয় তাদের যেন মেয়ে-বোন নেই। এমনকি তারা মায়ের জন্মও না। যেন উর্দি পরে আকাশ থেকে অবতরণ করেছে।
জানি রাগ করে কোন লাভ নেই। রাগ হলে শরীর জ্বলে যায়। জলন্ত চুলার ওপর হাড়ি বসালে এর কানা তেঁতে ওঠে। আসলে আমি আপনাকে বলতে চাচ্ছি গত সাত, আট অথবা নয় বছর থেকে এই কুলঙ্গারগুলো উর্দি পরে খ্যাপা ষাঁড়ের মতো গ্রামে ঢোকে। আর ঢুকেই ওরা যাচ্ছেতাই কাণ্ড করে।
আমরা কী করেছি? কী আমাদের দোষ? ভালো হয় আপনি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন। একসময় তারা বলে আমরা নাকি সন্ত্রাসী যুবকদের গ্রামে আশ্রয় দেই। আবার বলে তাদের খেতে দেই, রাতে বাড়িতে থাকতে দেই। বলে-
‘তোমাদের ঐ মেহমানরা কারা? কেন এসেছে? নিশ্চয় কাউকে খুন করে এখানে এসেছে। কেন ওদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছ?’
কখনও কখনও তারা অকারণে গ্রামের যুবকদের ধরে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক পেটায়। যখন ছেলেগেুলোকে তাদের বাবা-মায়েরা আনতে যায়, তাদেরকেও চাবকায়। তারপর টাকাপয়সা হাতিয়ে নিয়ে ওদের ফেরত দেয়। বাবা-মায়েরা ঈশ্বরের কাছে শোকর করে যে তাদের বাচ্চাদের অন্তত জীবিত ফেরত পেয়েছে।
আপনি যে হরেক পদের উর্দিধারী দেখছেন ইদানিং, এখানে তা সত্যিই অদ্ভূত। আমার স্বামী বলে এদের এক জাত থেকে আরেক জাত আলাদা। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমি কিছুতেই এদের আলাদা করতে পারিনা। ওদের সবাইকেই এক মনে হয়। মানে সবধরনের উর্দির নিচেই নেকড়ে ওঁৎ পেতে আছে। সবগুলো এক।
ও হ্যাঁ, আপনাকে জিতির বাবার কথা বলছিলাম। মাখন চাচা। তাদের জমিজমা বেশি না হলেও মানুষজন তাদের শ্রদ্ধা করে। কারণ চারিত্রিক পবিত্রতাকে অশ্রদ্ধা করা খুব সহজ নয়।
জিতি বিন্দির সাথে একই স্কুলে পড়তো। সে সবসময় বলতো যে সে পড়াশোনা না শেষ করে স্কুলে শিক্ষকতা করবে। যদি উচ্চশিক্ষা নিতে পারে তাহলে কলেজে পড়াবে আর বেতনের সব টাকা সে তার বাবার হাতে তুলে দেবে। বিন্দি আর জিতি দুজনেই বলতো তারা বিয়ে করবে না। বিয়েকে তারা ভয় পায়। তাদের একমাত্র ইচ্ছে ছিল তারা লেখাপড়া শেষ করে স্বনির্ভর হবে।
না, আমি কাঁদছি না। ভাবছি, একদিন তো সবাইকেই মরে যেতে হবে। সেই মহান কারিগর যা বানিয়েছে একদিন তার সবই ভেঙে যাবে। কিন্তু যাদের মৃত্যুর কথা আমি আপনাকে বলছি এ মৃত্যুতো সেরকম নয়। এই বয়েসে তাদের মতো মেয়েদের এ দুনিয়াকে তোয়াক্কা না করে হেসেখেলে বেড়ানোর সময়। যৌবনে পা দেয়ার আগেই রক্তলোলুপ কুকুরগুলো তাদের খেয়ে ফেললো!
এটা কীধরনের মৃত্যু!
যখন রাতের আঁধার চারিদিক ঢেকে দেয়, দীর্ঘ কাহিনিকে ছোট করতে তখনও অনুসন্ধান চলে।
প্রতিটি মানুষ গভীর সন্তাপে রাত কাটায়। গোটা গ্রামটাই যেন দুঃশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন।
সকালে উঠেই বাবা, মাখন চাচা, আমার ভাই, জিতির দু’ভাই আর কজন গণ্যমান্য মানুষ হরগোবিন্দপুরের থানায় গিয়ে রিপোর্ট দাখিল করে।
না, আমাদের ভীম গ্রামে কোন থানা নেই। কিন্তু অনেকদিন ধরেই কেউ জানে না কোন থানার পুলিশ আমাদের গ্রামের মানুষজনদের ধরপাকড় করে। এমনকি গত মাসেও কারা করেছিল। আসলে গ্রামবাসীরা নিজেরাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে শত শত অভিযোগ এনে গ্রাম থেকে তা সরিয়ে দিয়েছিল। ঐ যে চারপাঁচজন পুলিশ তারাই সারাদিন গ্রাম চষে বেড়ায়। লোকের বাড়ি বাড়ি মাগনা খায়, মুরগী চুরি করে রান্না করে আর রাতে মদ খেয়ে হৈ-হুল্লোড় করে। এদের মধ্যে অন্তত দু’জন ভুড়িআলা ষাঁড়। এরা গ্রামের যুবতী মেয়েদের দিকে লোলুপদৃষ্টি দেয় আর শীষ দিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করে। এদের কোন ধরনের শালীনতাবোধ নেই। এদের ইঙ্গিত এতো কুৎসিত যা চিন্তা করা যায় না। এগুলোই শহুরে জীবন আপনি বলবেন। আমিও আমার স্বামীর সাথে শহরেই থাকি যদিও আমি গ্রামের মেয়ে। আমি অবশ্য একা একা খুব কমই বাইরে যাই।
দিব্যি দিনের আলোয় হারিয়ে যাওয়া তাদের দুটো মেয়ের বিষয়ে রিপোর্ট দিতে তারা সবাই হরগোবিন্দপুরের থানায় গেল। কিন্তু পুলিশ ইন্সপেক্টর তাদের রিপোর্ট গ্রহণ করলো না। কারণ যে দু’জন ধড়িবাজ পুলিশকে সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের গত মাসেই অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের লোকজন বললো যে তাদের একজনের নাম পরশুরাম দেব আর একজনের নাম তারা জানে না। সেই পরশুরামকে গত সপ্তাহে গ্রামে সাইকেলে করে ঘুরতে দেখা গেছে। সে খামোখা ঘুরেটুরে আবার চলে গেছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টর কোন রিপোর্ট লিখলো না। উপরন্তু হারিয়ে যাওয়া মেয়ে দু’টোকে তাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করার পরামর্শ দিল। তাছাড়া সে নিজেও খুঁজবে বলে দিল।
প্রতিদিন সকালে বাবা আর মাখন চাচা পঞ্চায়েত প্রধানসহ হরগোবিন্দপুর থানায় হাজির হতে লাগলো। তারা বারবার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে পরশুরাম দেবের নাম বললো। কিন্তু সত্যি কথা কিছুই হলো না। তাদের রিপোর্টও নথিভুক্ত করা হলো না।
চতুর্থ দিন ইন্সপেক্টর বললো-
‘আপনারা তো প্রতিদিনই দলবেঁধে আসছেন। বেশ এখন চলুন পরশুরামের গ্রামে গিয়ে দেখি কিছু করা যায় কি না। যান একটা ট্যাক্সি নিয়ে আসুন।’
এখন আমাকে বলুন এটাই কি পুলিশের কর্তব্য? যেসব মানুষ এমনিতেই প্রতিদিন একটু একটু করে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে তারাই পুলিশের তদন্তের জন্য ট্যাক্সি নিয়ে আসবে?
যাই হোক ট্যাক্সি আনা হলো। ইন্সপেক্টরের সাথে বাবা আর মাখন চাচা দুজন কনস্টবেলসহ ট্যাক্সিতে উঠে বসলো।
পরশুরামকে তার গ্রামে পাওয়া গেল না। কিন্তু ব্যাপারটা হলো পরশুরামের বাড়ি মধ্যে একমাত্র ইন্সপেক্টরই গেল এবং বেরিয়ে এসে সে বললো যে পরশুরাম বাড়ি নেই। তারপর সবাই ফিরে এলো।
এটা কোন অনুসন্ধানের ছিরি হলো? আমি আপনার ওপরই ছেড়ে দিলাম এর বিবেচনার ভার।
এটা বোঝাই যাচ্ছে যে ইন্সপেক্টর ভেতরের ব্যাপার সব জানে এবং কেন সে রিপোর্ট লেখেনি।
পঞ্চম দিন।
দিনটিকে সত্যের অপলাপ দিবস বলা যেতে পারে। প্রতিটা দিনই পরিহাস হয়ে ফিরে আসছে আর প্রতিটি রাতে সব আশার মৃত্যু ঘটছে। আমাদের গ্রামটা যেন একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়লো। মানুষজন তাদের প্রতিদিনের কাজে হাত দিতে পারছিল না। হাজার হোক মেয়ে দু’টো তাদের নিজেদের গ্রামের। মানে তাদেরই অবুঝ শিশু, কী মিষ্টি আর সরল! এতো তাদেরই বিপর্যয়!
পঞ্চম দিন মধ্যরাতে কয়েকজন পুলিশ গ্রামে ঢুকলো। তারা নাকি খবর পেয়েছে দু’টো মৃতদেহ ক্যানেলের ধারে পড়ে আছে। কিন্তু তা অন্তত কুড়ি মাইল দূরের মরু এলাকায়। পুলিশরা বললো- ‘চলুন, গিয়ে দেখুন তারা আপনাদেরই মেয়ে কিনা।’
গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষ সে রাতে একত্রিত হলো। তারা পুলিশদের বললো যে এতো রাতে মৃতদেহ সনাক্ত করা কঠিন হবে কারণ তাদের ভাষ্য অনুযায়ী মৃতদেহ বড় রাস্তা থেকে অনেক দূরে। সেখানে এখন কোন আলো থাকার কথা নয়।
‘ভোর হওয়া অব্দি আমরা অপেক্ষা করি। এমনিতেই অনেকদিন চলে গেছে। কয়েক ঘণ্টা কী আর এমন। এখন তো রাত দুটো।’
কিন্তু পুলিশরা তা মানলো না। তারা বললো যে আপনারা আমাদের সাথে গেলে কিছু করতে পারবো, না গেলে পৌরসভার লোকজন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেবে।
বেওয়ারিশ! এটা শুনে কেউ কি ফিরে যেতে পারে? ওরা তো তাদের নিখোঁজ মেয়ে দু’টোও হতে পারে। প্রায় ষাট জন মানুষ ত্বরিতবেগে ট্রাকে উঠে হরগোবিন্দপুরের দিকে যাত্রা শুরু করলো।
তারা সেখানে পৌঁছে দেখলো একটা মিনিবাসের মধ্যে দুটো উলঙ্গ মৃতদেহ পড়ে আছে। চারদিক ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে লাশপচা গন্ধ। কোনকিছুই ঠাহর করা যাচ্ছিল না। লোকজন ইন্সপেক্টরকে বললো-
‘একটা টর্চ জোগাড় করে দিতে পারলে ভালো হয়। অন্ধকারে যেখানে মুখও দেখা যাচ্ছে না সেখানে কীভাবে আমরা তাদের চিনতে পারবো?’
‘আমি কি এখন দৌড়ে টর্চ ফ্যাক্টরিতে যাবো?’ ইন্সপেক্টর বিস্মিত হয়ে খেঁকিয়ে উঠলো। তারপর তার একজন লোককে বললো-
‘হারনামিয়া, বাস ছাড়ো। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বাটালায় নিতে হবে। অন্ধকার হোক আর আলো হোক যাদের সন্তান তারা ঠিক চিনে নেবে।’ সে বাবা আর মাখন চাচাকে ফোঁড়ন কেটে বললো-
‘মনে তো হচ্ছে না এরা আপনাদের সেই নিখোঁজ মেয়ে দুটো। সেজন্যে এসব ধানাইপানাই করছেন!’
সবাই সেই মিনিবাসে বাটালা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ভাবলো অতদূর যেতে যেতে নিশ্চয় সকালের আলো ফুটবে আর তারা তখন মৃতদেহ দুটো দেখতে পারবে।
কিন্তু ইন্সপেক্টর তাদের সাথে কথা না বলার চেষ্টা করছিল। মনে হচ্ছিল যতক্ষণ না সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মৃতদেহ সনাক্তের জন্য আমাদের লোকজনের কাছে দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার চিন্তা দূর হচ্ছিল না। সে মৃতদেহ বেওয়ারিশ ঘোষণা করবে এবং পৌরসভার অফিসারদের অনুমতি নিয়ে তাদের দাহ করবে।
তারপর সেই ছাইগাদা থেকে কী খুঁজে পাবে লোকজন?
ইন্সপেক্টর দু’তিনবার কর্কশভাবে বললো-
‘এখন সবাই বাড়ি ফিরে যান। আমরা যদি কিছু জানতে পারি তখন নিজেরাই আপনাদের জানাবো। দেখছেন না আমরা সেরকম চেষ্টাই করছি? পুলিশ কখনই খামোখা বসে থাকে না। আপনাদের মতো লোকজনদের জন্যই আমাদের রাতদিন এত হয়রানি!’
কিন্তু আমাদের লোকজন একটি কথাও না বলে ওখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো।
আমার মনে হয় যদি সেখানে শুধু বাবা আর মাখন চাচা থাকতো তাহলে ইন্সপেক্টর সরাসরি বলে দিত, ‘না মশাই, ওরা আপনাদের মেয়ে নয়।’ তারপর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দিত। কিন্তু ষাট জন নাছোড়বান্দা গ্রামের মানুষের সামনে সে তা করতে পারলো না।
এই ষাট জন ট্রাকে করে তাদের সাথে যাবে বলে দিল।
যখন বাস ড্রাইভার মৃতদেহ নিয়ে মিনিবাসটা চালাতে গেল তখন ওটা স্টার্ট নিচ্ছিল না। কেন নিচ্ছিল না তা কেউ বলতে পারে না। আসলে বাসটি কোত্থেকে যেন পুলিশরা হাতিয়ে নিয়ে এসেছিল। ইন্সপেক্টর হতাশ হয়ে একবার ড্রাইভারের কাছে গেল, একবার দাঁত খিঁচিয়ে বাসটা ঝাঁকুনি দিল, শেষে ইঞ্জিনের ডালা খুলে ইঞ্জিন পরীক্ষা করতে করতে ড্রাইভারকে বললো, ‘এ যাচ্ছেতাই ইঞ্জিন দিয়ে কী করতে পারবে? এ তো হাজার গুঁতোতেও নড়বে না। আমার সাধ্যমতো আমি চেষ্টা করছি কিন্তু আমার তো হাত-পা কাঁপছে।’
বাবা আর অন্যেরা বললো যে, যদি বাসটা না চলে তাহলে তারা মৃতদেহ দুটো ট্রাকে তুলে নিয়ে যেতে পারবে। তারা বললো, ‘আমরা লাশ বাটালায় নিতে পারবো।’ কিন্তু ইনন্সপেক্টর তাদের কথায় কর্ণপাত না করে হাত লম্বা করে দিয়ে তাদের পথ আটকালো যাতে তারা লাশ দুটো দেখতে উঠে না পড়ে।
ঠিক সেইসময় সবাই দেখলো বাটালার দিক থেকে একটা বাস এদিকেই আসছে। ইন্সপেক্টর সেটা থামিয়ে সব যাত্রীকে নেমে যেতে হুকুম দিল। ড্রাইভার আর ঝাড়ুদারকে লাশ দুটো মিনিবাস থেকে এনে ওই বাসে তুলতে বললো এবং বাটালার দিকে ফিরতে আদেশ দিল।
সেই সময় আকাশ থেকে অন্ধকার সরে যাচ্ছিল। এ বাস থেকে ও বাসে লাশ পরিবর্তনের সময় বাপু স্পষ্ট দেখলো লাশদুটো বিন্দি আর জিতির। মাখন চাচা আর বাবা যেখানে ছিল সেখানেই বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো। তাদের চোখ স্থির, ঠাণ্ডা, ঈষৎ হা-হয়ে-থাকা মুখ। মৃত গাছের শাখার মতো তাদের দু’হাত দেহের দুদিকে ঝুলছিল।
মৃতদেহ থেকে পচা গন্ধ আসছিল। তাদের চেহারা এমন ভয়াবহ ও বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তাদের চেনা প্রায় দুঃসাধ্য।
হৃদয় খান খান করে বাপুর চিৎকার বেরিয়ে এলো। সে মাথা থেকে তার উষ্ণিস টেনে খুলে ছিঁড়ে দু’টুকরো করে দু’মেয়ের উন্মুক্ত মৃতদেহ ঢেকে দিল।
আমাকে মাফ করবেন। আমি অনেক সময় নিচ্ছি এসব বলতে। এসব কথা সহজে বলা যায় না। আপনি বলছিলেন আমি কেন মাঝে-মাঝে ফুঁপিয়ে উঠছি। কেন একটানা হাউমাউ করে কেঁদে নিজেকে হালকা করছি না। আপনি ঠিকই বলেছেন। হাত-পা ছড়িয়ে বিধ্বস্ত খাটের ওপর শুয়ে ছাদের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকা আমার বাবার কোন কান্না শুনেছেন? তিনিও কেবল তার স্বপ্নের মধ্যেই কাঁদেন।
আমরা সবাই লাশ। আমরা কেউই দিনের বেলা কাঁদতে পারি না। রাতে আমরা আমাদের চিতা থেকে উঠি আর তা কাঁদতে কাঁদতে প্রদক্ষিণ করি।
যখন ইন্সপেক্টর আমার বাবার আকাশ-মাটি কাঁপানো হৃদয়-বিদারক চিৎকার শুনলো আর তার উষ্ণিষ ছিঁড়ে মৃতদেহ ঢাকতে দেখলো, তখন সে তার কৌশল পরিবর্তন করলো। সে পঞ্চায়েত প্রধানকে একদিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো-
‘দেখুন এ লাশ দুটো যদি আপনাদের মেয়েদের হয়ে থাকে তাহলে তাদের ভাগ্যে যা ঘটেছে তার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু কেউই জানে না কোন পরিস্থিতিতে তাদের জীবন দিতে হয়েছে। এখন মানুষজন যা বলবে একেক জন তার একেক রকম ব্যাখ্যা করবে। পুরো গ্রামেরই এতে বদনাম হবে। আপনারা সবাই আপনাদের বউ-বাচ্চাদের প্রতি দায়িত্বশীল। সরদার সাহেব, বিশ্বাস করুন আমার নিজেরও বোন বা কন্যা রয়েছে। আমি সবই বুঝি। কিন্তু আপনাদের কাছে অনুরোধ, যতক্ষণ না ময়নাতদন্ত শেষ হয়ে মৃত্যুরহস্য উন্মোচিত হচ্ছে ততক্ষণ আপনারা শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। আর না হলে যা ইচ্ছে তাই করুন। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আপনারা যতই দাবি করেন ওরা আপনাদেরই মেয়ে, ময়না তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাবে না। আমি আমার কর্তব্য পালন করছি। এখন আপনারা কী করবেন আপনারাই জানেন।’
‘আমাদের কাছ থেকে আপনি কী আশা করেন?’- বললেন পঞ্চায়েত প্রধান।
‘দেখুন আপনারা বিবেচনা করুন। এটা মান-সম্মানের ব্যাপার। আমি চাই না আপনাদের গ্রামের কোন কলঙ্ক হোক’- ইন্সপেক্টর পরামর্শ দিল।
‘আর এটা কীভাবে বোঝাবো যে আমি কেন আপনাদের সাথে-সাথে আছি। এটা একটা সমস্যা বটে। আপনারা অবশ্যই আমাদের সহযোগিতা করতে এসেছেন। কিন্তু প্রতিটি মানুষেরই তো উচিত পুলিশকে সহায়তা করা, তাই না?’
সহজ সরল গ্রামের মানুষেরা ইন্সপেক্টরের কথায় খানিকটা আশ্বস্ত হলো। যদিও একবুক বেদনা নিয়ে তারা অপেক্ষায় ছিল কিন্তু তারা বুঝলো না ইন্সপেক্টরের এসব কথাবার্তা পুলিশের চতুরতা ছাড়া আর কিছু নয়।
পুলিশকে ময়না তদন্ত করতেই হবে। কিন্তু ইন্সপেক্টর চাচ্ছিল ময়না তদন্তের সময় লাশ দুটোকে বেওয়ালিশ প্রতিপন্ন করতে যাতে পৌরসভার লোকজন বেওয়ারিশ লাশ দাহ করে ফেলে। আর কোনধরনের প্রমাণও না থাকে।
যাই হোক, সবাই বাটালায় পৌঁছালো। ময়না তদন্তও হলো। যখন আমাদের লোকজন লাশ চাইলো তখন কর্তব্যরত ডাক্তার বললো-
‘লাশ দু’টোতো বেওয়ারিশ। পুলিশ চলে যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেছে। সুতরাং দাহের জন্য এখন পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।’
ইন্সপেক্টরকে আশেপাশে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। কাজ শেষ করে সে আগেভাগেই কেটে পড়েছে। আমি আবার বলছি, আমাদের লোকজনদের ধোঁকা দিয়ে ইন্সপেক্টর তার নিজের পরিকল্পনামতোই কাজ করেছিল।
এখন তাদের একটাই আশা এস.ডি.এম-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মৃতদেহ দুটো ফেরত পাওয়া। চার-পাঁচ জনকে নিয়ে বাপু এস.ডি.এম-এর কাছে গেল। বাকিরা লাশের ওপর নজর রাখার জন্য ওখানে থেকে গেল।
ইন্সপেক্টর এমনভাবে সবকিছু ঠিক করে রেখেছিল যে আমাদের লোকজনের করার কিছুই ছিল না। কাউকে জিজ্ঞাসা করারও কিছু ছিল না তাদের। তারা যখন সময়ক্ষেপন করছিল তখনই পৌরসভার কর্মচারীরা লাশ তুলে নেবার জন্য ভ্যান নিয়ে এলো। নিশ্চয় ইন্সপেক্টর গা ঢাকা দেয়ার আগেই এসব ব্যবস্থা করে রেখে গিয়েছিল।
জিতির বাবা আর ষাটজন গ্রামবাসী প্রচণ্ডভাবে প্রতিরোধ করলো। যখন আপনার হারানোর কিছুই থাকে না তখন আপনার প্রতিরোধ চিৎকারে পর্যবসিত হয়।
এরকম নিস্ফল বিরোধিতার মুখে লাশবহনকারী ভ্যান নিয়ে পৌরসভার কর্মচারীরা সটকে পড়লো।
এর কিছুক্ষণ পর ইন্সপেক্টর তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাসপাতালে এলো। সে আমাদের লোকজনকে গালি দিতে দিতে হাসপাতালের বারান্দায় লোকজনের সামনে মাখন চাচাকে মারধর করলো।
‘খানকির পোলা! তোরা তোদের মেয়েদের দেখে রাখিসনি কেন? তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পেটে বাচ্চা বাধিয়ে যখন ক্যানেলে ডুবে আত্মহত্যা করতে যায় তখন তোরা এসে পুলিশের সাথে ঝামেলা পাকাস। পুলিশ কি-না করে! তোদের নষ্ট মেয়েদের দেখে রাখা আমাদের কাজ?’
যখন পঞ্চায়েত প্রধান কিছু বলার জন্য মুখ খুললো তখন ইন্সপেক্টর তার তলপেটে দিল একটা ঘুষি। বললো-
‘শুনুন সরদারজি, আপনি গ্রামে ফিরে গিয়ে আপনার কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করুন। এটা আমার এরিয়া। ভেবে দেখুন আপনারা যা করেছেন তার বদলে আপনাদের আমি ভালো উপদেশ দিয়েছি কিনা। গর্দভের দল! মাথায় গোবর ভরা!’
যখন আমাদের যুবকেরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে রক্তচক্ষু নিয়ে নিজেদের ভেতর জটলা করছিল তখন ইন্সপেক্টর চিৎকার করে বললো-
‘এই খবরদার! বেশি ফাল পাড়বি না। আজকাল সরকার এমন আইন করেছে যে যদি একবার গারদে ঢোকাতে পারি তাহলে তোদের মায়ের দেয়া জানটা আর ফিরে পাবি না।’
মাখন চাচা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এসে বললো-
‘আপনি এতো অমানুষ কেন? ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে গেছেন, না? আমরা আমাদের দু’দুটো নিষ্পাপ বাচ্চাকে হারিয়েছি। আপনি হুমকি ছাড়া তো আর কিছুই দিতে জানেন না। এটাকে কি বিচার পাওয়া বলে? আপনি আপনার উর্দির দাপটে আমাদের পিষেফেলা ছাড়া আর কী করেছেন?’
ইন্সপেক্টর পরিহাসের সাথে জবাব দিল-
‘কে জানে, আপনারাই আপনাদের মেয়েদের গলা টিপে মেরে ক্যানেলের ধারে ফেলে এসেছিলেন কি না! এভাবে কথা বললে আমি আপনাদের গ্রেফতার করে জেলে ঢোকাতে বাধ্য হব। অনেক জাঠ পুরুষ তাদের বিপথগামী মেয়েদের এভাবেই মেরে ফেলেছে। এসব তো নতুন না।’
ঠিক সেইসময় বাবা এস.ডি.এম-এর দেয়া চিঠি নিয়ে ফিরে এলো।
ইন্সপেক্টর আমাদের লোকজনের কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর করলো। কিন্তু সাথে সেই বাণী-
‘আমি সবই জানি। কেবল আমিই আপনাদের সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছিলাম। মেয়ে দু’টো হয় আত্মহত্যা করেছে না হয় আপনারা তাদের মেরে ফেলেছেন। নতুন করে তদন্ত এড়াতে চাইলে এখানে এই বাটালায় তাদের মৃতদেহ সৎকার করে ফেলুন। গ্রামে নিয়ে যেতে দিয়ে আমি তো আপনাদের গ্রামকে বিপদগ্রস্ত করতে পারি না।’
তো বাটালায় তাদের দাহ করা হলো। দুই পরিবারের লোকজন ব্যাগভর্তি ছাই আর হাড়গোড় নিয়ে বাড়ি ফিরলো।
বাবাকে তো পবিত্র গ্রন্থ থেকে অসংখ্যবার মৃতদের শেষকৃত্যে প্রার্থনাসংগীত উচ্চারণ করতে হয়েছে এর আগে। বলেছি তো আপনাকে যে, বাবা গ্রন্থিক হিসেবে গুরুদুয়ারায় যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। কিন্তু যখন আপনার নিজের বুকে আগুন জ্বলে তখন কি সব মনে রাখা সম্ভব? এমনকি ঈশ্বরকেও!
আমার ভাবতে অবাক লাগে বাবা শ্মশানে সেদিন কীভাবে শেষকৃত্যের শ্লোক আওড়েছিলেন। তিনি কি নিজে পেরেছিলেন? একজন পিতা কি তার নিজের রক্তমাংসের শেষকৃত্য উদযাপন করতে পারেন? সেদিন কি ঈশ্বরও কেঁদেছিলেন? পৃথিবীটা কেঁপে উঠেছিল?
যা বলছিলাম, না, সেই রিপোর্ট এখনও লেখা হয়নি। পুরো গ্রামবাসী সম্ভাব্য সকল দরজায় মাথা কুটলো। তারা জেলা প্রশাসকের কাছে গেল, সিনিয়র পুলিশ অফিসারের কাছে গেল, এমনকি চণ্ডীগড়ের গভর্নরের কাছেও ধরনা দিল। সবখান থেকে একই উত্তর, ‘না, দেশের অবস্থা আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। ব্যাপারটা নিয়ে আপনারা একদম ভাববেন না। এর একটা সুরাহা হবেই।’
কিন্তু তদন্তের সময় সবাই একই কথা বললো যে ঘটনার কোন সাক্ষ্মী নেই।
আমার এতো রাগ হচ্ছে যে মনে হচ্ছে তাদের প্রত্যেককে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘ওরে জানোয়ার! তোদের যদি বাপের জন্ম হয় তাহলে কি তোরা সাক্ষ্মীর কথা জিজ্ঞাসা করতে পারিস? প্রমাণের কথা বলতে পারিস?’
কিন্তু প্রমাণ ছিল।
বিন্দি আর জিতি যেদিন ক্যানেলের ধারে মাটি আনতে গিয়েছিল সেদিন থেকে প্রায় একমাস হয়ে গেল। সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়। কিন্তু আপনাকে সত্যি বলছি, সেই সময়টা যেন স্থির হয়ে আমাদের সবার বুকে পাথর হয়ে জমে আছে।
সেই সময়টা যেন কিছুতেই অতীত হয়ে যাচ্ছে না। ঘা মারছে, রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অশরীরী আত্মার মতো সময়টা আমাদের ঘিরে রেখেছে।
হ্যাঁ, এইমাত্র আপনি যে আর্তনাদ শুনলেন, সেটা আমার বাবার গলা দিয়ে বের হলো। আপনার মনে হতে পারে কেউ ভোঁতা ছুরি দিয়ে কারো গলা কাটছে। শব্দটা ঠিক চিৎকারও না আবার হুঙ্কারও না। যেন কাউকে কেটে দু’টুকরো করা হচ্ছে।
যে-মুহূর্তে বাবার চোখে একটু ঘুম নামে ঠিক সেসময়ই এমন হতে থাকে।
প্রথমদিকে আমি ভয় পেতাম। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি নিশ্চিত বাবা যতদিন বাঁচবেন ততদিনই ওরকমটা হতে থাকবে।
প্রতিটা মানুষই তার ভাগ্যের অন্ধকার চার দেয়ালের মধ্যে একা-একা ঘুরতে থাকে। সেখানে অন্য কেউ ঢুকতে পারে না।
একসময় ঘুমের মধ্যে যে রক্তলোলুপ কুকুর বিন্দিকে আক্রমণ করতো, এখন মনে হচ্ছে সেই কুকুরগুলোই বাপুর স্বপ্নে আসে তাকে কামড়াতে থাকে। ক্রমাগত কামড়াতে থাকে।

লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি

অজিত কাউর : ভারতীয়-পাঞ্জাবি লেখক। তিনি ১৯৩৪ সালে লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তার প্রাথমিক লেখাপড়া। পরবর্তীকালে দেশভাগের পর দিল্লি চলে আসেন। এখানে তিনি অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। নারী এবং সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে তিনি পাঞ্জাবি ভাষায় উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন। তাঁর কাজগুলোর মধ্যে খানাবাদোস, গুলবানু, মেহাক ডি মাউত, ধূপওয়ালা শহর উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৮৫ সালে ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। পদ্মশ্রী উপাধির মতো বিরল সম্মাননাও তিনি অর্জন করেছেন।  প্রতিবছর সার্ক লিটের‌্যারি ফেস্টিভালেরও আয়োজক তিনি।  অজিত কাউরের ‘ব্লাডহাউন্ডস’ গল্পটি ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

উম্মে মুসলিমা : বাংলাদেশের কবি ও কথাসাহিত্যিক।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close