Home অনূদিত কবিতা অতনু সিংহ >> স্বনির্বাচিত দশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা

অতনু সিংহ >> স্বনির্বাচিত দশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা

প্রকাশঃ October 18, 2017

অতনু সিংহ >> স্বনির্বাচিত দশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা
0
0

অতনু সিংহ >> স্বনির্বাচিত দশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা                  

[উৎসর্গ নাদিয়া ইসলাম]

 ইবাদত

কবে বলো
কথার পর্দা সরিয়ে
সিঁড়ি দিয়ে নেমে
জলের মধ্যভাগে ভাসাবে আলতা,
অ্যালার্ম বেজেছে দ্যাখো
সঘন বরষায়
তোমাকে ডাকছে এই প্রাচীন শহর,
টইটুম্বুর,
আতরের ঘ্রাণ …
বেগনভেলিয়ার গাছে ঝুলে আছে সাপ…
কোথাও রক্তনদী
কোথাও আকাশের দিকে চেয়ে
কাতর মানু্‌ষ,
তাদের নীরব ডাকে
নেমে এসো
তোমার পায়ের ছাপে
সাঁজোয়াও ধুয়ে যায় …
কবে বলো কবে আর
কথার পর্দা সরিয়ে আমার পাঁজরে,
জ্বরের মধ্যভাগে,
পানিতে পানিতে ভাসাবে আলতা!

মাটির শোলোক

সমর্পণ আছে বলে কবিতা কবিতা
যেন চারা বরষা পেয়েছে বলে
একদিন আদরে আদরে খয়েরি শোলোক
সমস্ত আদর ঝেঁপে দিয়ে
বৃক্ষশরীর বুড়ো হয়ে গ্যাছে
তাহার ছায়ায় যদি একবার ঢেলে দিতে
তোমার গোপন ছায়া
তবে খুব দুনিয়াদারির হাওয়া
বসন্ত বাহারে বাহারে
চিরশ্যাম, চিরনীল
জলের আভাস,
ডুবো নদী জানে সমর্পণ করেছি বলেই
অনেক গভীরে ফোটে কবিতা-অতল
অতল এ ত্রিভুবন, শিবজটা
আকাশে ভাসায়ে রাখে চোখ

শ্যামলিনী

আমি তো আমার ভাষাতে মগ্ন! আমার মানুষীতে যেমন! তাই ভাষা নিয়ে এইভাবে ভাবি, কৃষিগন্ধ মাখা পূবের বাঙলা যদি না থাকতো, তবে কবেই শুকায়ে যেত পশ্চিমা কলিকাতার পশ্চিমা কূলের বাঙলা! অথচ কী আশ্চর্য জমিদারতন্ত্র দ্যাখো, কী আশ্চর্য কলোনি এখানে ভাষারে প্রমিত সাজায়ে পেটেন্ট নিয়াছে রুপিয়া যুক্তির অভিজাত আধারে! আমি ক্লেদ নিয়ে এসেছি সাহিত্যে, ভাষায়… আমি টের পাই সাতচল্লিশ-পূর্ব এই চরাচর বাংলার আমরি বাঙলায় রাজনীতি ছলবল… আমারে জাগায়ে রাখো আমার মানুষী তুমি, তুমিও ব্রিটিশ, তুমিও ঔপনিবেশিকতার ঝলমলে আঁধারে এসেছ এই ভাষার বহতায়… আমি তোমার গর্ভে আখর বুনি… আর পশ্চিমা লজিকহেতু কলোনি নির্জ্ঞান হেতু আমি গোঁফ দাড়ির পুরুষ তোমাতে বেয়াদপ মন্ত্রণা দিই হত্যার! তবু এই মাঠঘাট, হাওর, বিল, নদীনালা—এ সকল মানুষীর গর্ভ কি ফুরায়? লিখো লেখকিনী আবার আবার… আমারে ছাপায়ে বহু বহু দূর যেথা খুশী চলে যাও… তোমার গর্ভে আলোক, তোমার গর্ভে আবছা ভাষার আধার… আমাদের প্রিয়তা বাংলার আমরি বাঙলা ভাষা তোমার আমার!

বঙ্গবালা

আজ এই চিঠি সমাপন
আজ ঝিরি ব্যালকনি,
অরণ্যমুখে তুমি দুলে দুলে
চাদর বুনেছো
লক্ষ্মীর বাচ্চারা শুতে পাবে ব’লে,
আর অন্নভোগের শেষে
আমাদের বাচ্চারা যাতে
চাঁদ নিয়ে খেলাধূলা পারে!
আমরা তো এতদিন ঘেমেনেয়ে
শুনেছি অনেক
গোলাকার রুটি আর চাঁদের গোল্লা,
তুমি শুধু চাদর বুনেছো,
পাঠিয়েছো উনুনমঙ্গল,
ওই তো আতপের সুখে
দ্যাখো মানুষের হাঁড়ি ভ’রে গেছে
অন্নপূর্ণা জেগেছেন পদ্মায়,
বুড়িগঙ্গা নদীর কিনারে…
আমার স্বপ্নগুলি
আমার সকল উচ্চারণ
তোমারে লক্ষ্য ক’রে… 

মা তারা আসলে পাখি নাম

এবং ডেসিবেলে
কেঁপেছে চারটে দেওয়াল
ঘুলঘুলি থেকে মারহাবা
আকাশও কী দারুণ খসে গেছে,
বাতানুকূল তছনছ করে
এসেছেন তারা, ভোররাতে,
লাল আকাশের পাশে মুখ রেখে…
জিভ তার রক্তিম,
পায়ের নীচেতে বাঁধা সুরক্ষা-খনির নুপুর,
চুলের অরণ্যে আজও
চাঁদের অন্ধকার, মৃদুমন্দে পাখির আরাম,
তিনি তারা, আমি তাঁর কোহলসন্ধান

আমি তাঁর ত্রিকাল স্বপ্ন থেকে
বুনে ফেলছি রাত, তন্ত্রবিদ্যেরও আগে
সহজ-ফসলের কথা লিখছি স্নানের ঘোরে
তারা পাখি, পাখিমা তারাটির ডানা থেকে
শিখছি ভূতল-বিদ্যে আর
চরাচরে ট্রানজিস্টার
সুদূর বদ্বীপ থেকে অগ্ন্যুৎপাতের সংবাদ…
তারা মা মুণ্ডমালা খুলে রেখে
আমাকে শোনাচ্ছেন, নৌকা ভ্রমণের শেষে
মালভূমে মেয়েরা রোজ বাজায় পিয়ানো
গাছের কোটরে কেমনে রান্নাবাটি, আর কীভাবে
বালিতে সূর্য এঁকে সময়ের ওঠানামা,
বোনা হয় শীতের পোশাক,
কেমনে বাঁধতে হয় ত্রিনয়নী-বেরা
কীভাবে হামাগুড়ি, কীভাবে হেঁই-হো
ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে আয়না আয়না
কাজল-স্বপ্নে লাগে হকের আজান

আমার পাঁজর জুড়ে সারারাত
পলাশিয়া মেয়ে ও তাহার সে
পরমাপরম, সেই লাল,
আমি তাঁর ডানায় কণ্ঠ পেতেছি, আর
গাইছি, ‘সময় তো থাকবে না গো মা
কেবলমাত্র কথা রবে

কথা রবে কথা রবে মা

জগতে কলঙ্ক রবে…’
কথায় কথা কেঁপে যাচ্ছে,
চৈতন্য চক্কর দিচ্ছে গ্যালাক্সির তারানায়

আর ভোরবেলায় তারা মা, তারাপাখি
আমার সঙ্গে ছাদে যাচ্ছেন চরাচর দেখবেন বলে

চোদ্দটি ছিদ্রের মিথিক্যাল রাত

তেরো কিংবা চোদ্দ

সংখ্যা দুলে ওঠে তাহার ছিদ্র জুড়ে

 

রাতের আগায় টলমল করে ওঠে

তাহার ছিদ্রগুলি, তাহার প্রকৃতি-বোতাম,

বোতাম কিংবা নোলক কিংবা তালাচাবি

ছিদ্রের মুখে আটকে রাখে সে, কেননা

চাবি খুলে ফেলার আগে

তাহার চাই আস্ত কবিতা

তাহার শরীরে সাজানো ছিদ্রের ভেতরে

জাগতিক যত পথ,

 

কবিতার

ফুঁ এসে, কবিতার শরীর এসে, কবিতার

রস এসে খুলে দেয়

সিংহ-দরজা, ছিদ্রগুলি

জগতের মহা যা কিছু, যা কিছু

রসের নিমিত্ত, সব, পেয়ে যায়

এবং তাহার শরীরের তেরো কিংবা চোদ্দ সংখ্যার

ছিদ্রগুলি খুলে যায় একে একে

 

হাওয়া ঢোকে, কিলবিল তারাগুলি খসে পড়ে

ছিদ্রে তাহার, নক্ষত্রের জ্বর আসে ছিদ্রের আদিম আদিমে

এবং প্লাবনের ইশারা, তাহিতির ক্যাম্পফায়ার

দাবানলে ছুটে যাওয়া নীল ঘোড়া

আফিম খেতের পাশে রাখালের বাঁশি…

 

দৃশ্যের পরিপূর্ণ যা কিছু সতেজ সব

তাহার ছিদ্রের কাছে, তেরোটি তালা খুলে

তেরোটি কবিতার ঠোঁটে, নখে, মাংসের

গভীর তন্ময়তায় তাহার ছিদ্রে

আরব্যগহীন রাত, অথবা

কামাখ্যা পাহাড়, বশীকরণের গান…

তাহার ছিদ্র দিয়ে জাহান্নাম থেকে

দ্রুতগামী ট্রেন ছুটে গেছে বেহেস্তের দিকে

প্রথম আগুন কুড়িয়ে নিতে

 

আর

সে আগুন কুড়িয়ে কুড়িয়ে আমি লিখে ফেলছি

চোদ্দতম অন্তিম ছিদ্রের কথা, একদিন

ওখানেই জন্মান্তর, একদিন

ওখানেই শরীর পেয়ে গেছে নিরাকার

ব্রহ্ম, ওখানেই একদিন শরীর

খুঁজে পাবো আমি আর হল্লাজের কানে কানে

বলে দেবো, আমিও সত্য

কেননা তাহার ছিদ্র সত্য

কেননা তাহার ছিদ্র নম্বর চোদ্দের কাছে

আমার মরমীয়া, আমার মারফতিভোর

আমার আয়নানগর আমার ছিদ্রপুরাণ

তাহার বোতামের ভিতর আয়োজন

প্রকৃতি পরম

ছিদ্রের মহামায়া, মহা-মায়া রাত

 

কবুল কবুল

আমাদের মাঝখানে হারানো নদীর রেখা,
লুপ্ত সেতুর ডাক
অনেক পলির নীচে চাপা পড়ে আছে
আমাদের মাঝখানে বসতের লালস্মৃতি
ফেলে রেখে খেলনামানুষ
চলে গেছে নিজস্ব ভিড়ের ভিতরে
আমাদের মাঝখানে রক্ত ও অশ্রুপ্রপাত

আমাদের মাঝে তবু ছায়াপথ ভেসে আছে

আমি তো জানিনা কিছুই
একা একা ঘুরি রোজ বিষাদনগরে
তুমিও তো স্বপ্নের আঁকাজোকা শেষে
লুপ্ত পাখনা ভুলে পান করো জল আর
ঘুমিয়ে পড়ো
ডেকে ওঠো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
কাকে ডাকো?
যুদ্ধের আয়োজন আমি দুহাতে সরিয়ে
বালিশের ভাঁজে মুখ রাখি
দেখি চাদরের নীচে
তোমার শিকড়

ওই তো শিকড়ে বিবি অথৈজলের মহাকাশ

পরিতাপহীন আমাদের
নীলগ্রহ ভেসে আছে
চরাচর জুড়ে হংসের পাখা,
স্মৃতির আড়ালে…

কিছুই জানিনা আমি
শুধু এই ক্ষিতিঅপতেজমরুৎ‌ব্যোমের পাঠ
মাঝখানে সেতু ভ’রে ওঠে
আমাদের কৌমপ্রদেশে
জমে ওঠে চাষাবাদ
ওইখানে আমার নাভিতে তুমি
আমিও হামাগুড়ি তোমার পেটের ভিতর

কথা কও
একবার বলো কবুল কবুল

তিথি

স্কাইলাইন ধ’রে তুমি
কার কথা ভাবো,
কাহার পাঠানো চিঠি
তুমি হারায়ে ফেলেছো!
কাকে খোঁজো আলোয় হাওয়ায়,
অক্ষর কার! কার দূরাগত ঘ্রাণ!
নদীর গল্পগাছা, স্নানাবার গান…
কিছুই হারায় না, হারাবার কিছু নেই
সমস্তই শ্বাস-মূলে, সমস্তই
আলোয় বাতাসে, শরীরে তোমার
খুঁজে দ্যাখো খুঁজে দ্যাখো
ফিরে পাবে সকলই আবার

প্রবরণা পূর্ণিমা বহিছে দ্যাখো
বাংলার পানিতে পানিতে
আর আকাশতলায়!

পারাপার
যে ব্যথা বনস্পতি
তা থাকুক দেহের তরলে
তরঙ্গমালায়,
স্নায়ুতে শিকড় তার
ছড়ায়ে রয়েছে দ্যাখো জন্মসীমানায়…
যে ব্যথা স্নানাগারে, মন্ত্রপূত
ঘুমের ভিতর যে ব্যথা পারাবার,
সেসব গল্পের দিন, মায়াগান
ফেলে রেখে তুমি
অভিভাষণ পার হয়ে গ্যাছো,
আমার অক্ষরেখায় দ্যাখো পাতাবাহার,
বরষায় জেগে আছে!
প্রাচীন দুর্গ থেকে ভেসে আসছে কার ডাক!
শতাব্দীকাল কে যেন শুয়ে আছে ওইখানে
কোথাও যাওয়ার নেই তার
বাইরে বৃষ্টি অঝোর,
ব্যথার জন্মশিকড় মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে
আনন্দসঙ্গীত মেখে
এগিয়ে চলেছে জনপদ…

পদাবলী

অপেক্ষায় ডুবে থাকা সমস্ত শহর
ভিজে ভিজে একদিন
পদাবলী হয়ে যায়…

[প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ ঘুমের চেয়ে প্রার্থনা শ্রেয় থেকে]

কবিতা ভাবনা

অস্তিত্ব ও যাপনকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্মৃতি আর যৌথ বিস্মৃতির মধ্যে থেকে হাতড়ে হাতড়ে নিজেকে ও নিজের অপরকে খুঁজে বের করা, এই আত্মসন্ধানের প্রবাহের মধ্যে থেকেই তুলে আনা কিছু বাকি, যা কিনা ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী, যা কিনা জাগরণের মধ্যেই এক দেয়ালা… যে দেয়ালা  আয়াত ও মন্ত্রপূত যে দেয়ালা অপেক্ষার, অপেক্ষা অনন্তের, যে অপেক্ষা লেখক ও বাক্যের মেরাজ ও মৈথুনের… কবিতায় সেই অপেক্ষা লিখে যাওয়া>  মৈথুনের, ক্ষরণের, মেরাজের; শব্দে শব্দে নিজেরে পাওয়া, নিজের অপরকে, আর প্ৰকৃতি আর মৃত্যু!

অতনু সিংহ

নিবাস : সালকিয়া, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ

জন্ম : ২২/০৮/১৯৮২

পেশা : সাংবাদিকতা

 

প্রকাশিত গ্রন্থ

ক.  কাব্যগ্রন্থ :

নেভানো অডিটোরিয়াম, ২০০৯

ঈশ্বর ও ভিডিওগেম, ২০১৪

বন-পাহাড় থেকে সে কেনই-বা ফিরবে এ-কারখানায়

খ. গদ্যগ্রন্থ : ওপর লিখিত মনোলগ ও কয়েকটি প্যারালাল কাট, ২০১০

গ. স্বাধীন চলচ্চিত্র : প্রিয় মরফিন, ২০১২

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close