Home কবিতা অনিন্দিতা ভৌমিক > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

অনিন্দিতা ভৌমিক > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

প্রকাশঃ July 12, 2017

অনিন্দিতা ভৌমিক > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান
0
0

অনিন্দিতা ভৌমিক > গুচ্ছকবিতা

বাদামি অংশ থেকে  

(১)

ঘুরেফিরে সেই এক দখিনা হাওয়া

আর তাকে স্বাদু ভেবে নিচ্ছি

পা দু’টো নিচের দিকে ঝুলিয়ে

অপেক্ষা করছি

পুরোপুরি সংযত এক গৃহকর্ত্রীর

অনেকটা ঘষাঘষির মাঝেও যিনি

জলের কথা বলছেন

বেঁকে যাওয়া পিঠের মতো করে

বলছেন শেষ প্রজন্মের কথা

 

যার নির্মাণ এই অধ্যায়ের জন্যে নিষিদ্ধ

 

(২)

দাঁড়িয়ে থাকছি লাল পোশাকের ভেতর

চোখের তল বরাবর ফুলে উঠছে ক্লান্তি

এতো কিছুর পরেও

গলায় আটকে থাকা শ্লেষ্মার টুকরো

 

খরখরে চামড়ার শব্দ শুনতে পাই

মাথার তালুতে অনবরত

ঘষটে যাওয়া নুনদাগ শুনতে পাই

একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রাখি

কয়েক মিনিট আগে

যেখানে পায়ের উপর পা তুলে

তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করবো

গা এলিয়ে বসে থাকবো ঘুমন্ত মুখের কাছে

 

আর যে কথা বলছে পাশের ঘর থেকে

সে আমার সম্মোহন

যে হেঁটে আসছে শার্টের হাতা তুলে

আর ঝেড়ে নিচ্ছে সিগারেটের ছাই

সে আমার একরোখা সম্মোহন

 

(৩)

আর মনে রেখো

শেষ সত্য বলে কিছু

এখনও খুঁজে পাইনি

তিনটে অসমাপ্ত উপন্যাস আর

ডিমের কুসুমসহ তুলে রাখছি

ঈশ্বরহীন এই পৃথিবী

প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব যেভাবে কথা বলে ওঠে

অথবা দর্শন থেকে বেরিয়ে এসে

প্রশ্ন করে ঢিলেঢালা কামিজে

 

দু’হাতে অন্ধকার নিয়ে

এই ছুটে যাওয়া তো নিরাপদ দূরত্ব

চেয়ারে পা ছড়িয়ে

যাকে অভিবাদন করছি

উপড়ে ফেলা নখ নিয়ে তাকিয়ে থাকছি

গোলাকার সিঁড়ির দিকে

 

(৪)

তিনি পকেটে তুলে রাখেন

এই প্রবণতার উৎস

অনুবাদে যার অনিচ্ছা হারিয়ে যায়

নোংরা দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে

হারিয়ে যায় নিজেদের তৈরি নিয়ম

 

তিনি পুরনো সনেটের দিকে পাশ ফেরেন

ছোট ছোট চ্যাপবুক আর

পেশাদার পদ্ধতির কথা ভাবেন

কবিতা পাঠের আগে

যে কারণে তাকে সঙ্গলিপ্সু মনে হয়

 

তিনি বুঝতে পারেন যে অমরত্ব

আসলে তো মানসিক অবস্থা বিশেষ

আগামী বছরে যা লোপ পেতে থাকে

ডালের বাটিতে গুলে যেতে থাকে

নিচের তলানিটুকু

 

স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন এবার

ঠাণ্ডা হাত মুঠো করে ভাবছেন

ফুলে ওঠা ট্যারচা দাগের কথা

মাসখানেকের বেশি সময় ধরে

হয়তো অন্যরকম কিছু কবিতা লেখার কথা

 

(৫)

আমাদের দেখা হয় ভারী ছায়ার নিচে

কিছুটা অপ্রস্তুত আর কিছু চাপা গঠন

পেরিয়ে আমরা উঠে আসি

শেষবারের জন্যে

 

বিগত সপ্তাহের পাতায় চুমুক দিতে দিতে

মাথা নাড়েন গৃহকর্ত্রী

ঝকঝকে ভঙ্গিতে এসে দাঁড়ান যেখানে

তার চোখের পাতা আরও নোয়ানো

তার বিনুনির ভাঁজ

এই মুহূর্ত অবধি হেঁটে বেড়ায় নিচু স্বরে

 

অথচ কি গভীর বিষণ্ণতায়

তাকে দেখছি আমরা

দু-চারটে আসক্তির বিনিময়ে

হাতটা ব্যবহার করতে পারছি

তার ঠাণ্ডা কাঠের খুলিতে

 

বিশেষ করে বক্তব্য যখন স্পষ্ট

আর অনিবার্য থেকে তিনি

অনেকটা দূরে ছিলেন

 

(৬)

এভাবেই প্রত্যেক সিদ্ধান্তের শেষে

নিজের মুখ বুড়িয়ে যেতে দেখি

চিবুকের উপর গালের দাগের উপর

ছিটকে আসতে দেখি রোজের নির্দেশ

পায়ের দিকে যে শরীর গুটিয়ে রাখে

বুক থেকে খুলে রাখে ঘোলাটে নীল চোখ

 

অকারণ এই ভ্রমণ

ঘরে ঢোকার শব্দ নিভিয়ে দেয়

মাথা কাত করে দেয় ঘুমন্ত কফির কাপে

আমি তার পেটে হাত ঘষে দিচ্ছি

বিদেশি ভাষার কাছে ফেরত চাইছি

তার প্রকাশ্য ক্ষত

 

আমার পাতলা স্মৃতি

লেগে থাকছে মগজের কোষে

আমার গোস্তের টুকরো শুকিয়ে চড়চড় করে

 

(৭)

অনেকক্ষণ ধরে

কাঠের পাত্র তুলে রাখছেন গৃহকর্ত্রী

ঘন ডালপালা সরিয়ে

ফাঁকা করে রাখছেন কনুইয়ের ভর

তার নিষ্ক্রিয়তা আমাদের দিকে

তার গোর দেওয়া পাথর

শিথিল হয়ে যাচ্ছে জলীয় দ্রবণে

মেয়াদ উত্তীর্ণের আগে যেখানে

আরও কিছুটা সময় বহন করা দরকার

 

বায়বীয় এই স্তর

ঈষৎ আম্লিক প্রকৃতির

নুনের আধিক্য তাকে সূক্ষ্ম করে তুলছে

উপাদান ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘন চুলের ডগায়

 

নিজেকে বোঝার চেষ্টা করেন গৃহকর্ত্রী

মুখে হাসি ঝুলিয়ে দেখতে পান

গল্পের বাকি অংশ পেরেক দিয়ে সাঁটা

ক্ষীণ আলোয় যার টুকরো

এড়িয়ে যাওয়া যায়

চাদর টেনে দেওয়া যায় অবাঞ্ছিত শব্দে

 

অনিন্দিতা ভৌমিক > কবিতাভাবনা

কবিতা ভাবনা বলে নির্দিষ্ট কিছু সরল অথবা জটিল প্রক্রিয়া নেই আমার। নেই কোনো দু’চোখ বন্ধের আমেজ। নেই আধা-ঐশ্বরিক অনুভূতি। বড়জোর তার উপাদান আছে। নিতান্ত ছাপোষা ডাকনাম আর গানের লিপ আছে। এই যে একটা সরলরেখা হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে কেউ লিখে গেল প্রথম হরফ…দৃশ্য এবং চোখের পাতায় তাদের ছেদবিন্দুর উপস্থিতি খুঁটে নিই আমি। যথেষ্ট সময়ের দূরত্বে তাদের জারণ করি। তাপমাত্রা মেপে মেপে সাজিয়ে তুলি হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা এক বিক্রিয়াজাত বোধ। অর্থাৎ যা আমার কাছে শরীর  নিয়ে আসে না। বরং কিছু বিন্দু পরপর সাজিয়ে আমি তার পরিধি আঁকি। তার যোগাযোগ ও জাগরণের বিস্তৃতি আঁকি নিজস্ব মেজাজে।

আর সে কারো কাছে বেজে ওঠে নিখুঁত সোলো গানে…আবার কারো কাছে হারিয়ে যায় খুব মনেরাখা কোনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ছাড়াই…অথচ এটুকুই কবিতা আমার…আমার ভাবনা, আমার চিন্তা, আমার নির্মিত বোধের রূপ।

 

পাঠপ্রতিক্রিয়া > মাসুদুজ্জামান

ব্যক্তিক গহনতা থেকে উঠে আসা ভাষা আর অনুভবই কবিতা। সেই ভাষিক অনুভবময়তা কবির এতটাই নিজস্ব যে, আমরা তার কবিতা পড়তে পড়তে ঢুকে পড়ি কোনো পরাবাস্তবময় জগতে। মনে হতে থাকে কবিতাগুলি বয়ে আনছে সুদূরতার প্রতিভাস, বাস্তবের কুহক। কবিতা সংক্রান্ত এই কথাগুলি নতুন নয়। কিন্তু অনিন্দিতা ভৌমিকের কবিতা পড়তে পড়তে নতুন করে এই কথাগুলি মনে পড়ে গেল। তার কবিতায় একটা ছবি গড়িয়ে গিয়ে যখন আরেকটা ছবি তৈরি করে, তার মধ্যে লজিকাল কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু অনুভূতির সেতু তিনি তৈরি করে ফেলেন। ‘বাদামি অংশ’-এর প্রথম কবিতার এই পঙক্তিগুলিই যখন পড়ি, তখন এরকমই অনুভব জাগে :

পুরোপুরি সংযত এক গৃহকর্ত্রীর

অনেকটা ঘষাঘষির মাঝেও যিনি

জলের কথা বলছেন

বেঁকে যাওয়া পিঠের মতো করে

বলছেন শেষ প্রজন্মের কথা।

অথবা ধরা যাক দ্বিতীয় সংখ্যক কবিতার এই অংশটুকু :

দাঁড়িয়ে থাকছি লাল পোশাকের ভেতর

চোখের তল বরাবর ফুলে উঠছে ক্লান্তি

এতো কিছুর পরেও

গলায় আটকে থাকা শ্লেষ্মার টুকরো।

অনিন্দিতা নিজেও হয়তো তাই এইধরনের নির্মাণকে ‘আধা-ঐশ্বরিক অনুভূতি’ না বলে চিহ্নিত করেছেন আত্ম-অনুভবেরই ‘বিক্রিয়াজাত বোধ’ বলে উল্লেখ করেছেন, যে-বোধের সঙ্গে অন্য কোনো কবির কবিতাকে মেলানো যাবে না। অনিন্দিতার অনন্যতা এইখানে।

তবে অবাক হয় তখনই যখন তিনি কবিতা লিখে চলেন সহজ-সরল ছবির পর ছবি সাজিয়ে, কোনো রকম জাঁক তাতে থাকে না। কবিতাকে অতি-অভিনব করে তোলার ঝোঁকও তার মধ্যে দেখা যায় না। আমার কাছে অনিন্দিতার এই দিকটিই ভালো লেগেছে বেশি। এরকম আরো কিছু পঙক্তি তুলে ধরি :

[এক]

শেষ সত্য বলে কিছু

এখনও খুঁজে পাইনি

তিনটে অসমাপ্ত উপন্যাস আর

ডিমের কুসুমসহ তুলে রাখছি

ঈশ্বরহীন এই পৃথিবী

[দুই]

তিনি পুরনো সনেটের দিকে পাশ ফেরেন

ছোট ছোট চ্যাপবুক আর

পেশাদার পদ্ধতির কথা ভাবেন

কবিতা পাঠের আগে

যে কারণে তাকে সঙ্গলিপ্সু মনে হয়

[তিন]

বিগত সপ্তাহের পাতায় চুমুক দিতে দিতে

মাথা নাড়েন গৃহকর্ত্রী

ঝকঝকে ভঙ্গিতে এসে দাঁড়ান যেখানে

তার চোখের পাতা আরও নোয়ানো

তার বিনুনির ভাঁজ

এই মুহূর্ত অবধি হেঁটে বেড়ায় নিচু স্বরে

[চার]

আমার পাতলা স্মৃতি

লেগে থাকছে মগজের কোষে

আমার গোস্তের টুকরো শুকিয়ে চড়চড় করে

[পাঁচ]

নিজেকে বোঝার চেষ্টা করেন গৃহকর্ত্রী

মুখে হাসি ঝুলিয়ে দেখতে পান

গল্পের বাকি অংশ পেরেক দিয়ে সাঁটা

ক্ষীণ আলোয় যার টুকরো

এড়িয়ে যাওয়া যায়

চাদর টেনে দেওয়া যায় অবাঞ্ছিত শব্দে

পাঠক, এখানে অনেকগুলি অংশ উদ্ধৃত করলাম এই কারণে যে, লক্ষ করুন, অনিন্দিতার বলার ভঙ্গিটা কী শান্ত, মৃদু, ছায়াচ্ছন্ন, কিন্তু মনোগহনতার স্পর্শে ‍উজ্জ্বল, ছুঁয়ে যায় আমাদের মন। স্নায়ুকে সজাগ আর তীক্ষ্ণ করে তোলে। অনিন্দিতা, বলতেই হবে, কবিতায় নিজের স্বর আর বলবার ভঙ্গিটা খুঁজে পেয়েছেন। ক্রমশ তা যে আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা খুব জমকালো প্রখর চিত্রকল্প বা ইমেজ দিয়ে কবিতা নির্মাণ করেন, তারা এই কবিতাগুলি পড়লে বুঝতে পারবেন, কবিতা অন্যরকমও হয়। একজন গৃহকর্ত্রীর দিনযাপনের সামান্য কিছু টুকরো আমরা পাচ্ছি এই কবিতাগুচ্ছে। হয়তো এগুলি অনিন্দিতার প্রকাশ্যিতব্য পূর্ণাঙ্গ কোনো বইয়ের খণ্ডাংশ। কিন্তু তাতেই নান্দনিক যে প্রশান্তি পাওয়া গেল, সেই জন্য অনিন্দিতাকে অভিনন্দিত করি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close