Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ ‘অনুর পাঠশালা’ : রচনার পঞ্চাশ বছর > সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শীলা বৃষ্টির লেখা >> ভূমিকা : আবু হেনা মোস্তফা এনাম >>> বিশেষ সংখ্যা

‘অনুর পাঠশালা’ : রচনার পঞ্চাশ বছর > সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শীলা বৃষ্টির লেখা >> ভূমিকা : আবু হেনা মোস্তফা এনাম >>> বিশেষ সংখ্যা

প্রকাশঃ July 17, 2018

‘অনুর পাঠশালা’ : রচনার পঞ্চাশ বছর > সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শীলা বৃষ্টির লেখা >> ভূমিকা : আবু হেনা মোস্তফা এনাম >>> বিশেষ সংখ্যা
0
0

অনুর পাঠশালা : রচনার পঞ্চাশ বছর > সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শীলা বৃষ্টির লেখা >> ভূমিকা : আবু হেনা মোস্তফা এনাম >> বিশেষ সংখ্যা

 

আবু হেনা মোস্তফা এনাম >> ভূমিকা

 

মাহমুদুল হক বাংলা কথাসাহিত্যের কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘অনুর পাঠশালা’ রচনার পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে তিনি এটি রচনা করেন। অভিনব আঙ্গিক, গঠনশৈলী ও নতুন চিত্রকল্পময় ভাষাবিন্যাসে ‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে এনে দেয় অভিনব গদ্যশিল্পীর মহিমা। উপন্যাসটি তিনি লিখেছিলেন একদিনে। জুলাইয়ের কোনো এক অগ্নিহাওয়ার দিনে মাহমুদুল হক স্ত্রী কাজলকে বলেছিলেন বাবার বাড়ি যেতে, বাড়িটার মধ্যে সারাদিন একা থাকতে চেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত আড্ডায় এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন :

‘আমি ওকে [স্ত্রী কাজল] বললাম, তুমি বাবার বাড়ি যাও, বাড়িটার মধ্যে আমি সারাদিন একা একা থাকবো। এর আগে তো কখনো একা থাকিইনি। ও আলুভাজি, ডিমভাজি আর পরটা তৈরি করে দিয়ে গেল। আমি বন্ধ জানালার পাশে বসে সারাদিন ধরে বইটা লিখলাম। সন্ধ্যায় ও ফিরে এল। তখনও লেখা চলছে, শেষ হয়নি তো। শেষ হল ভোর বেলা।’

‘অনুর পাঠশালা’ রচনার পর পাণ্ডুলিপিটি দীর্ঘদিন ফেলে রেখেছিলেন মাহমুদুল হক। উপন্যাসটি রচনার প্রায় তিন বছর পর মুহম্মদ আখতার সম্পাদিত ‘সমীপেষু’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, এপ্রিল, ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। এটি গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয় ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৩ সালে, বর্ণবীথি প্রকাশন ঢাকা থেকে। গ্রন্থাকারে মুদ্রণের সময় উপন্যাসটির নামকরণ হয় ‘যেখানে খঞ্জনা পাখী’। বর্ণবীথি প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী কাজী ফারুক ছিলেন পুরোনো বইয়ের ব্যবসায়ী, পুরানা পল্টনে তার বইয়ের দোকান ছিল। তিনি মাহমুদুল হকের কাছে বইটি প্রকাশের আগ্রহ ব্যক্ত করেন, নতুন নামকরণের ব্যাপারে মাহমুদুল হকের অনিচ্ছা থাকলেও তিনি প্রকাশের প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। ‘অনুর পাঠশালা’র নতুন নামকরণটি কাজী ফারুকের, তার যুক্তি ছিল- পত্রিকায় প্রকাশের ফলে সকলে উপন্যাসটি সম্পর্কে জ্ঞাত, নতুন নামকরণ হলে ব্যবসায়িক সুবিধাপ্রাপ্তি সম্ভব। ‘যেখানে খঞ্জনা পাখী’ শিরোনামটি পছন্দ না হলেও মাহমুদুল হক আর দ্বিমত করেননি, তাঁরই আগ্রহে বইটির প্রচ্ছদ করেন স্থপতি-বন্ধু রবিউল হুসাইন। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় মুদ্রণে, সাহিত্য প্রকাশ থেকে [ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪] ‘অনুর পাঠশালা’ নামেই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। সাহিত্য প্রকাশ-সংস্করণের প্রচ্ছদশিল্পী রোকেয়া সুলতানা।

‘অনুর পাঠশালা’ গ্রন্থাকারে মুদ্রণের সঙ্গে সঙ্গে ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে লেখক হিসেবে মাহমুদুল হকের রাজসিক আবির্ভাব ঘটে’। ‘দেশ’ সাময়িকীর ১৯৭৪, ৩০ মার্চ সংখ্যায়, সনাতন পাঠক ছদ্মনামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অনুর পাঠশালা সম্পর্কে লেখেন একটি ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা। আলোচনাটির দুষ্প্রাপ্যতার কথা বিবেচনা করে ‘তীরন্দাজে’র পাঠকসমীপে প্রকাশ করা হবে।

উল্লেখ্য যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরবর্তীকালে মাহমুদুল হকের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়েছিল। তবে সুনীলসহ সমকালীন অনেকের আলোচনা, এমনকি তাঁর সামগ্রিক রচনাকর্ম নিয়ে আলোচনা-সামালোচনা সত্ত্বেও মাহমুদুল হক এসব ব্যাপারে ছিলেন নীরব। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘…কলকাতার কাগজে প্রশংসা লিখেছিল বলে আমার নাচানাচি করা উচিত না। আমি কি লিখছি সেটাই তো বড় কথা।’

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় >> সত্যিকারের শক্তিশালী লেখক

 

[‘অনুর পাঠশালা’ রচনার পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ায় আমরা এই উপন্যাসটি সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোচনাসহ শিমুল মাহমুদ, আবু হেনা মোস্তফা এনাম, শীলা বৃষ্টি ও ইলিয়াছ কামাল রিসাতের চারটি প্রবন্ধ প্রকাশ করছি। এছাড়া পরবর্তী কালে এই আয়োজনের অংশ হিসেবে মাহমুদুল হকের কথাসাহিত্য সম্পর্কে আরো কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশের ইচ্ছা রয়েছে আমাদের। আয়োজনটি আপনাদের কেমন লাগছে অকুণ্ঠচিত্তে জানাবেন আমাদের। তীরন্দাজ আপনাদেরই পত্রিকা।

পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসটি ‘যেখানে খঞ্জনা পাখী’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে মুদ্রণের সঙ্গে সঙ্গে ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে লেখক হিসেবে মাহমুদুল হকের রাজসিক আবির্ভাব ঘটে’। ‘দেশ’ সাময়িকীর ১৯৭৪, ৩০ মার্চ সংখ্যার ‘সাহিত্য সংবাদ’-এ সনাতন পাঠক ছদ্মনামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাসটি সম্পর্কে প্রশস্তিসূচক আলোচনা লেখেন। রচনার শিরোনামটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা থেকেই তুলে দেয়া হয়েছে। আলোচনাটির দুষ্প্রাপ্যতার কথা বিবেচনা করে ‘তীরন্দাজ’এর পাঠকসমীপে ‘দেশ’-এ মুদ্রিত বানানরীতি অক্ষুণ্ন রেখে এখানে প্রকাশ করা হল। – অতিথি সম্পাদক]

 

সনাতন পাঠক (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) >> সত্যিকারের শক্তিশালী লেখক

 

মাহমুদুল হক একজন তরুণ লেখক। তাঁর উপন্যাসের নামটি ভালো নয়, দ্বিতীয় শ্রেণীর কাব্যগ্রন্থের মতন- (যেখানে খঞ্জনা পাখী)- মলাটটিও তেমন আকৃষ্ট করে না- কিন্তু বইটি পড়তে শুরু করলেই বোঝা যায় ইনি একজন সত্যিকারের শক্তিশালী লেখক। বাংলা গদ্যের ওপর প্রভুত্ব করার ক্ষমতা এঁর আছে।

বইখানি পড়ে মনে হয় ইনি একটি নাগরিক অপু চরিত্র সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এর কাহিনীর নায়ক চরিত্রের নাম অনু- একটি মেয়েলি নামের ছেলে, শহুরে, ইংরেজি লেখাপড়া করে, ধনী পরিবার- সে এসেছে তাদের গ্রামের বাড়িতে। এই ছেলেটির চোখ দিয়ে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন এক গ্রাম্য জগৎ, যা নিছক রোমান্টিক নয়- যেখানে আছে দারিদ্র্য ও কদর্যতা- তবু সেই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা মানুষের মধ্যে যে এক ধরনের সরলতা আছে তা এখনো কোনো কোনো সূক্ষ্ম হৃদয়কে স্পর্শ করে- যেমন এই লেখককে করেছে এবং রেখাচিত্রের মতন ছোটখাটো বর্ণনায় তিনি তা ফুটিয়ে তুলতে আশ্চর্যভাবে সক্ষম। তাঁর নায়ক এই নতুন অপু কিংবা নতুন ডাকঘরের অমল বাড়ির গণ্ডী থেকে বেরিয়ে যায়- লেখাপড়া না-জানা অকালপক্ক গ্রাম্য বালকদের মধ্যে সে মিশতে চায়- সে অবাক চোখে দেখে মুচিপাড়ার মেয়ে সরু দাসীকে। পূর্বকালের স্মৃতির মতন এইসব কিছুর মধ্যেই একটা মধুর ভালোলাগা মিশে আছে। উপন্যাসের এইসব অংশ চমৎকার। কিন্তু এর জন্য তার মা-বাবা কিংবা কিছু শহুরে চরিত্র মাঝখানে এনে তাদের অসারত্ব দেখাবার কোনো প্রয়োজন ছিল কি? সেটা কন্ট্রাস্ট হয়ে যায়- যা খাঁটি উপন্যাসের ধর্ম নয়। এই লেখকের কাছ থেকে আমরা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের আশায় রইলাম।

 

 

শীলা বৃষ্টি >> অনুর পাঠশালা : রক্তক্ষরণের মানবিক গল্প

 

মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে রচিত মাহমুদুল হকের প্রথম উপন্যাস ‘অনুর পাঠশালা’য় (১৯৭৩) জীবনের গভীর সংকটের আপাত নিশানা দেখা না গেলেও ব্যক্তির অন্তর্জগতের মৌনমুখরতা দিয়ে এমন একটি জীবনের কথা তিনি বলতে চেয়েছেন যে-জীবনের সম্ভাবনা প্রচুর কিন্তু সে-জীবন একই সঙ্গে দুঃখ ও অপচয়ে ক্লিন্ন। মাহমুদুল হক তাঁর প্রথম উপন্যাসেই জানান স্বপ্নহীনতার বার্তা; এ-থেকে তাঁর ঔপন্যাসিক চেতনার ঝোঁকও চিনে নেওয়া যায়। এটাও স্মরণযোগ্য, ১৯৬৭ সালে ‘অনুর পাঠশালা’ যখন রচিত হচ্ছে তখন নয়া ঔপনিবেশিকতার শিকার পূর্ববঙ্গসহ সমগ্র দেশে সামরিক শাসন বিরাজমান। ১৯৬৬ সালের বিখ্যাত ছয়-দফা আন্দোলনের জের তখনও কাটেনি। বরং এই সময় থেকে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া হয়ে ওঠে প্রবলভাবে দ্বন্দ্বময় এবং দেশজুড়ে চলতে থাকে ভিন্ন দিকে মোড় নেওয়ার প্রস্তুতি। বর্তমান ধারায় রচিত তাঁর উপন্যাসটি অন্তর্জগতের রক্তক্ষরণের মানবিক কাহিনি হয়ে উঠেছে।

প্রথম উপন্যাসেই মাহমুদুল হক তাঁর সীমানার সংকীর্ণ চৌহদ্দি ছেড়ে যোগ দেন ভুবনের উদার-খোলামেলা প্রাঙ্গণে। একদিকে একা একটি কিশোরের নিভৃতি, আরেক দিকে তার খেলার সঙ্গী-সাথীরা। তাদের নামগুলো থেকেই তাদের সঙ্গে অনুর পার্থক্য বোঝা যায়- ফালানি, ফকিরা, গেনদু ইত্যাদি। নিজে অনু সমাজের ওপরতলার বাসিন্দা কিন্তু তার মনের মধ্যে মুক্তির স্বপ্ন। ফালানি-ফকিরারা সেই মুক্ত পৃথিবীর বাসিন্দা। অনুর নিঃসঙ্গতা অস্বস্তি হয়ে তাকে সারাক্ষণ কষ্ট দেয়। ক্রমে অনুর পৃথিবীর নিঃসঙ্গতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলে পাঠক অনুভব করেন যে তা কেবল অনুর নিঃসঙ্গতাই নয়, সেখানে জড়িয়ে রয়েছে আরও আরও মানুষ এবং অন্য এক জটিল মনোজাগতিক ও পারিবারিক জীবনের বৃত্তান্ত। অনুর ব্যক্তিক নিঃসঙ্গতার উৎস তার নিজের অন্তর কিন্তু এর দায় বইতে হয় অনুর পিতা-মাতাকেও। এভাবেই সম্পর্কসূত্রগুলি উন্মোচিত হতে থাকে মাহমুদুল হকের নিপুণ শব্দবয়নে। অনুর নিরানন্দ, অনুর নিঃসঙ্গতা তার বেড়ে উঠবার পথে প্রবল বাধা কিন্তু তার চারদিককার নির্বিকার পরিস্থিতি তাকে ঠেলে দেয় এক আলম্বনহীন গন্তব্যের দিকে। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে পথও ছিল অনেক মানুষের ভিড়ে ভরপুর কিন্তু আধুনিক ‘পথের পাঁচালী’ মাহমুদুল হকের ‘অনুর পাঠশালা’তে গৃহ শান্তি নয়, বিচ্ছিন্নতার আশ্রয়। পাশাপাশি বসবাস করা মানুষেরা একজন আরেকজনের চাইতে দূরে অবস্থানরত। এমনই সে গৃহ যেখান থেকে পালিয়ে একেবারে দৃষ্টির আড়াল হয়ে যেতে চায় সেখানকার বাসিন্দা– পালাতে সে চায় নিঃসঙ্গতা থেকে। ‘অনুর পাঠশালা’ তাই মাহমুদুল হকের গড়া এক নিঃসঙ্গতার কারাগার।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র অনু, তার চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে সমস্ত কিছু এবং তার অনুভূতির জগতটাই গোটা উপন্যাসের পটভূমি তৈরি করে। অনুকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের ও ঘটনার আবর্তন সম্পূর্ণ নতুন এক স্বাদ নিয়ে আসে বাংলাদেশের উপন্যাসে। অনু একটি কিশোর চরিত্র কিন্তু ‘অনুর পাঠশালা’ কিশোর উপন্যাস নয়। অনুকে ঘিরে নির্মিত পরিবার-সমাজের পরিবেষ্টনী বৃহদর্থে অনুকে ছাড়িয়ে অনেকের কাহিনি হয়ে দাঁড়ায়। অনু-চরিত্রটির আবেগ-অনুভূতি এবং পরিণতি উপন্যাসটির মূল কেন্দ্রবিন্দু। এক সচ্ছল-উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান অনুর বাবা উচ্চ আদালতের আইনজীবী এবং তার মা গৃহিণী। একটি ত্রিমুখী অবস্থান থেকে উপন্যাসের সূচনা। সেই ত্রিমুখী অবস্থান ক্রমে বদলে যেতে থাকে যখন পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে অনুর মায়ের ইংরেজির শিক্ষক। এই চরিত্রটি শুধুই একটি চরিত্র নয়, এটির থাকে আরও সুদূরপ্রসারী বিস্তৃতি। অনু তার মায়ের কাছ থেকে জানতে পারে, লোকটা খুব ভালো, তিনি অনুকেও ভালোবাসেন। যেহেতু লোকটিকে অনুর মা ভালো বলেন এবং অনু তার মাকে ভালোবাসে, তাই চরিত্রটি অনুর সত্তায় একটি ইতিবাচক স্থান দখল করে। কিন্তু অনুর মায়ের ইংরেজি-শেখার শিক্ষকের সূত্রে পরবর্তীকালে তার আরও বিস্তারিত জানা হলে তা উপন্যাসে একটা মোড় রচনা করে। ইংরেজি শেখা শেষ হলে অনুর মা পালিয়ে যাবে অনুর বাবার কাছ থেকে, পালিয়ে গিয়ে নিজে একটা চাকুরি নেবেন। এখানেই অনু, অনুর বাবা, অনুর মা এবং তার ইংরেজির শিক্ষক উপন্যাসের ত্রিমুখী অবস্থানকে বদলে দেয়। ইংরেজির শিক্ষক উপন্যাসটিকে ঘুরিয়ে দেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে।

মাহমুদুল হকের পূর্বে বাংলাদেশের প্রচলিত উপন্যাসগুলি যে ধরনের কাহিনির রেখা অনুসরণ করে গেছে, সেখানে ঠিক এরকম কাহিনিবৃত্তের দেখা পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ বিষয়ভিত্তিক উপন্যাসে ভূমিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামোর সূত্রে জমিদার-জোতদার-মহাজন কিংবা ধর্মকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার সূত্রে পীর-ফকির-দরবেশ এসব চরিত্র-নির্ভর কাহিনি উপন্যাসে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। সেই সঙ্গে গ্রামীণ নারী চরিত্রগুলির উজ্জ্বল উপস্থিতি বাংলাদেশের উপন্যাসকে জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পান্বেষার অভিযাত্রী রূপে পরিচিতি এনে দেয়। একইভাবে শহরকেন্দ্রিক উপন্যাসে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যেকার সম্পর্কসূত্র গুরুত্ব লাভ করে। পূর্ববাংলার সমাজজীবন তখনও শিল্পাগ্রসরতার পরিণতিতে পৌঁছায়নি বলে পুরোপুরি শিল্পোন্নত শহুরে জীবনের ছবিও উপন্যাসে আসে না। শহর ও গ্রামের যৌথ জীবনের ছবি কোনো-কোনো উপন্যাসের আখ্যানে স্থান পেয়েছে, কিন্তু এসবের মধ্যে ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোককাহিনি প্রভৃতি অনুষঙ্গই প্রাধান্য পেয়েছে। এর বাইরে এই প্রথম শহর জীবনের সচ্ছল সীমানায় বিচ্ছিন্নতার শিকার একটি কিশোর মনকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লিখলেন মাহমুদুল হক। সেই সূত্রে ভিন্ন গল্পপরিসরে প্রবেশ করে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য। নারী-পুরুষের তথাকথিত ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনিও এটি হয়ে ওঠে না, যদিও উপন্যাসটির মধ্যে সেই সম্ভাবনার বীজ সুপ্ত রয়েছে। কাহিনির সংবদ্ধতার চাইতেও অনুভূতির সূক্ষ্মতায় জীবনের গতি-পরিণতি ও জটিলতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন একালের আধুনিক কথাশিল্পী মাহমুদুল হক।

‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসে চরিত্র-সংখ্যা কম। প্রতিতুলনায় চরিত্রের চিন্তনক্রিয়া উপন্যাসের ঘটনার গতিপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অনুর মনস্তাত্ত্বিক ভূমিতে একের পর এক উত্থান-পতন ঘটে। তার গৃহের জীবন এবং গৃহের বাইরের অবারিত জীবন, এই দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্র যেমন দেখা যাবে, তেমনি দেখা যাবে দ্বান্দ্বিকতাও। কেননা, গৃহের অভ্যন্তরে থাকা অনু গৃহ থেকে পালিয়ে যেতে চায় নিরুদ্দেশে; আবার, বাইরের জীবনে খেলার সঙ্গীসাথীদের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে সে ভুলে যেতে চায় ঘরে ফেরার কথা। অনুর মানসিক অবস্থাটাই উপন্যাসের মূলকথা। অনুর বাবা গৃহের মালিক, অনু এবং অনুর মা দুজনেই সেই মালিকের অধীন। উপন্যাসে সংকটের প্রাথমিক কারণ হয়ে দাঁড়ান গৃহের মালিক অনুর বাবা। অনু এবং অনুর মা দুজনের মধ্যেই লক্ষ করা যায় পলায়নপর সুদূরতা। অনু পালিয়ে যেতে চায় বাবা-মা দুজনের আশ্রয় থেকে। মাকে সে ভালবাসে, কিন্তু মায়ের কাছে পড়ে থাকলে তার পক্ষে স্বাধীন হওয়া সম্ভব নয়, কেননা, মা-বাবার বৃত্তে বন্দি। আবার, অনুর মা পালিয়ে যেতে চায় তার স্বামী বা অনুর বাবার কাছ থেকে। দুজনের মধ্যেকার পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা সম-স্বভাবী না হলেও এর মূলে থাকে এক স্থায়ী অস্বস্তি। বাংলাদেশের উপন্যাসে ‘অনুর পাঠশালা’-তেই প্রথম প্রকাশ পেল যে একটি ছেলে তার জন্মদাতা বাবাকে ঘৃণা করে। সেই ঘৃণা অকারণ নয়, তার যৌক্তিক কারণও জানা যায়, ‘অনু আব্বাকে সহ্য করতে পারে না। শয়তান মনে করে। ঘৃণা করে।… আব্বা অনেক দূরের মানুষ, সুদূর হিমালয়ের ওপার থেকে উড়ে এসে বাড়ির প্রাঙ্গনের ঘোড়ানিম গাছে ভয়ঙ্কর ইচ্ছে নিয়ে জ্বলন্ত বাদুড় ঝুলে থাকলে যেমন মনে হবে। কালো স্যুটে-মোড়া আব্বাকে তার অতিকায় বাদুড় মনে হয়।’ বাবা-মায়ের মধ্যে সৃষ্ট দাম্পত্য দূরত্বের শিকার অনু মনে-মনে তার মায়ের পক্ষ নেয়। উপন্যাসটি ক্রমবিকশিত নগরজীবনের নরনারীর সম্পর্কসূত্রের উন্মোচনের পাশাপাশি গার্হস্থ্য সন্ত্রাসের জটিল রূপরেখার চিত্র আঁকে। অনুর চোখ দিয়ে দেখা জীবনটাই উপন্যাসের মূল ক্ষেত্র। তাই এটি তার চিন্তন-চেতনা ও জীবনী-বয়ান। অনুর পাঠশালা প্রচলিত ঘটনা বা কাহিনির জমাটবদ্ধ রূপভিত্তিক কোনো উপন্যাস নয়। এটি অনুভূতিপ্রধান উপন্যাস, উপন্যাসটিতে অনুর চারিত্রিক বিস্তারের আশ্রয়ে তার জগতটাতেই প্রধান করে তোলো হয়েছে। সেই সূত্রে অনুর পিতা ও তার আইন-ব্যবসা সংক্রান্ত সংবাদ পাঠকের গোচরে আসে। অনুর মায়ের পরাধীন সত্তার জন্যে দায়ী করা হয় অনুর বাবাকে। অনু মনে-মনে তার বাবাকে এমনই নেতিবাচক অবস্থানে নিয়ে যায় যে সেখানে তাঁর জন্যে বিন্দুমাত্র প্রসন্নতা উপস্থিত থাকে না। মাহমুদুল হক তাঁর এই কাহিনিতে আধুনিক নগর-জীবনের এক নতুন ধরনের বিষাদভাষ্য নির্মাণ করেছেন। প্রচলিত বিশ্বাসকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে আপাত অভিনব কিন্তু সত্যিকার বাস্তবকে জায়গা ছেড়ে দিতে চান ঔপন্যাসিক। প্রচলিত বিশ্বাস, গৃহ মানেই শান্তির নীড়- স্বামী-স্ত্রী এবং একটি সন্তানের ছোট্ট সংসারটির যে এমন বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠা সম্ভব, সেটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু ‘অনুর পাঠশালা’য় তা-ই ঘটেছে। উপন্যাসের শেষ দিকে এসে আকস্মিকভাবে ঘটনা ভিন্ন খাতে মোড় নিলে তার ফলে একধরনের নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়। যদিও অনুর বাব-মায়ের পনেরো বছরের সাংসারিক জীবনে তা প্রত্যাশিত নয়। দীর্ঘকালীন অসুখ আর অস্বস্তির পরিণাম যে কোনো না কোনোদিন দৃশ্যমান হবেই, তা প্রত্যাশিত বলা যায়। যে-নাটকীয়তায় উপন্যাস সমাপ্তিমুখী, তা একই সঙ্গে অনু, তার মা, তার বাবা এবং তার মায়ের ইংরেজির শিক্ষক সবাইকে এক সূত্রে গেঁথে দিয়েছে। ঔপন্যাসিক এই উপলব্ধির দিকে ইঙ্গিত করেন যে পাঠশালা মানেই সর্বদা শৃঙ্খলা, নিয়ম আর বিন্যাসের জগত নয়, সেখানেও ঘটতে পারে বিশৃঙ্খলা, দেখা দিতে পারে নৈরাজ্য এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে নিয়ম-কানুন। অনুর চিন্তনরেখা নানা পথ পেরিয়ে এসে তারই পাঠশালায় অনিয়মের অমোচনীয় ছাপ রেখে যায়। পরিণতিটি আকস্মিক মনে হলেও অস্বাভাবিক মনে হয় না। অনুর এই পরিণতির পটভূমিতে অবশ্য রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। একে বিশ্বাসযোগ্য প্রেক্ষাপটে দাঁড় করাবার কুশলতা ঔপন্যাসিকের শিল্প-প্রচেষ্টা ও যুক্তির অনুসারী বলেই মনে হয়েছে। অনুর বাবা একদিনেই অনুর চেতনায় প্রতিনায়কে পরিণত হয়নি। এর পেছনে অনুর মায়ের সক্রিয় ভূমিকাটিও বিবেচনাযোগ্য। তিনি অনুকে বোঝান, তার বাবা আসলে ‘খুনিদের সর্দার’ এবং চোর-ডাকাতেরা সবাই টিকে আছে তারই কল্যাণে। তাছাড়া লুঠতরাজ আর মানুষ খুন করা লোকেদের টাকায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে অনুর বাবার সম্পদ। তাই অনুর মা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে চান। এই ধরনের সংলাপগুলো অনুর মায়ের এবং সেটা তারই কিশোর সন্তানের প্রতি। এ থেকে বোঝা যায়, অনু, তার মা এবং তার বাবার পারিবারিক সম্পর্কের অবস্থান কখনও একরৈখিক ছিল না। অনুর বাবা মানুষ হিশেবে কতটা খারাপ সেটার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনু যতটা না অর্জন করেছে, তার নিজের চেতনা দিয়ে, তারও অধিক সে লাভ করেছে তার মায়ের বর্ণিত কথকতার মাধ্যমে।

অন্তঃপুরের এমন আপাত শান্ত পৃথিবীর মধ্যেও যে তীব্র ঝড় আর দুর্যোগের ঘনঘটা সম্ভব, সেই ইঙ্গিত দেয় ‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসটি।

বহতা নদী যেমন আকস্মিক ঝড়ে কূলপ্লাবী হয়ে অকল্পনীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি অনুর নিজস্ব পাঠশালাতেও একদিন জাগে প্রচণ্ড ওলট-পালট। বাবা-মায়ের বাদানুবাদ তীব্র বিবাদের সৃষ্টি করলে অনু জীবনে প্রথমবারের মতো তার স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত অভিব্যক্তি প্রকাশ করে ফেলে। ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ বলে সে চিৎকার করে তার বাবার প্রতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এখানেই শেষ নয়, অনুর ছোঁড়া ক্রিস্টালের ভারি শিশির আঘাত তার বাবার কপালে রক্তপাত ঘটিয়ে দেয়। যদিও এ জন্যে অনুর মধ্যে মুহূর্তেই অনুশোচনা জাগে, তার মনে হয় তার বাবা নয় ‘যুগ-যুগান্তরের পর আজ সে নিজেই ভয়ানক দুঃখে ভয়ানক যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে।’ বেদনার মধ্য দিয়ে অনুর বৃহৎ প্রাপ্তির আকুলতা আরও গাঢ় হয়। সরুদাসী অনুর সেই প্রাপ্তির প্রতীক। ঋষিপাড়ার কিশোরী সরুদাসী অনুর মনের সেই অংশের ছায়া যে মনে-মনে অবাধ-উন্মুক্ত এক জীবনের প্রত্যাশী। সরুদাসী বয়সে তার চেয়ে সামান্য বড় হলেও অভিজ্ঞতায় সে অনুর চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। ঋষিপাড়ার দরিদ্র অথচ কোলাহলময় বৃত্তের বাসিন্দা সরুদাসী প্রতিমুহূর্তে বহমান জীবনের তরঙ্গে দোলায়িত। অনুর অন্তর্জগতে সে তাই সেই পৃথিবীর প্রতিনিধি, যে-পৃথিবী অনেক জানা আর অনেক দেখার সঞ্চয়ে ঋদ্ধ। বাবামায়ের সংঘাতময় অভিজ্ঞতার সাক্ষী এবং স্বয়ং অংশগ্রহণকারী অনুর মধ্যে সরুদাসীকে অন্বেষণের চেষ্টা সন্ত্রাসমুক্ত সহজ জীবনানন্দকে পাওয়ারই চেষ্টা। মাহমুদুল হকের এই উপন্যাসে অনুর জগতটাকে লেখক সংবেদনময়তার বিপরীতে স্বার্থক্লিষ্ট ও অপ-তৎপরতাপূর্ণ অবস্থান হিশেবে চিত্রিত করেছেন। যে-কিশোরের জীবনটি তখনও কেবল আরম্ভের অপেক্ষায়, সেই জীবনটি প্রবলভাবে বিষময় হয়ে ওঠে পরিবার-সমাজের অপরিণামদর্শিতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় ভাব হয়ে দাঁড়ায় শৈশব- এই সুগভীর জীবনবোধকে অস্বীকার করে উপন্যাসটির মূল্যায়ন অসম্ভব। শিশুকালই এখানে অনুর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং তার স্বার্থ-পরার্থের অভিজ্ঞতা জীবনের অপ্রত্যাশিত পরিণাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। অনুর কাছে ঋষিপাড়া এক ইতিবাচক গন্তব্য। যেহতু জীবনের অর্থনৈতিক অপূর্ণতার কার্যকারণ সম্পর্ক সম্বন্ধে সে জ্ঞাত নয়, ঋষিপাড়ার দারিদ্র্য-অভাবের জীবনও তার কাছে চেনা নয়। তার মন চেয়েছে একটা শান্ত হ্রদে জীবন চিরক্রীড়াময় থাকুক। যখনই সে বাবা-মায়ের পরিবারে প্রবেশ করে তখনই তার বহির্মুখী মন সক্রিয়তা পেতে থাকে, আর যখন সে বাইরে বের হয় তখন তার নিরুদ্দেশের ভাবনা হয় গাঢ়তর। তার মনের এসব আলোছায়া সম্পর্কে অসচেতন থেকে গেছে তার বাবা-মা। উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটে এক অন্তহীন হাহাকার ও শূন্যতাবোধের আমেজ ছড়িয়ে।

তবে উপন্যাসটি শেষ দিকে আমাদের নিয়ে যায় উপন্যাসটির সেই সূচনাবিন্দুতে। লেখক বিনয় মজুমদারের একটি কবিতার উদ্ধৃতি আছে, ‘স্বপ্নের আধার, তুমি ভেবে দ্যাখো, অধিকৃত দুজন যমজ / যদিও হুবহু এক, তবু বহুকাল ধরে সান্নিধ্যে থাকায় / তাদের পৃথকভাবে চেনা যায়, মানুষেরা চেনায় সক্ষম। / এই আবিষ্কারবোধ পৃথিবীতে আছে বলে আজ এ-সময়ে / তোমার নিকটে আসি, সমাদর নেই তবু সবিস্ময়ে আসি।’ এই পঙক্তিগুলো আমাদের ইঙ্গিত দেয় কি যে অনুর দুটি সত্ত্বা ছিল? না, এরা ডাক্তার জেকিল ও মিস্টার হাইডের মতো পরস্পরবিরোধী সত্ত্বা নয়। এরা দেখতে হুবহু এক হলেও আলাদা এবং আলাদা হয়েও এরা পরস্পরের সম্পূরক। এই অদ্ভুত মনস্তত্ত্বের বিষামৃতের তীব্রতায় এক অনন্যসাধারণ চরিত্র অনু। পরিচয় লুকিয়ে একই অনু বারেবারে নতুন-নতুন পাঠশালায় পাঠ নিতে যায়, পরিচয় প্রকট হলে সে অপাংক্তেয় ঘোষিত হয়। তবুও অনুরা বারেবারেই ফিরে আসে, পৃথিবীর পাঠশালায় সমাদরহীন অনুরা সবিস্ময়ে আসে।

 

অতিথি সম্পাদক >> এই পুরো আয়োজনটির অতিথি সম্পাদক : আবু হেনা মোস্তফা এনাম

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close