Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অন্ধযুগের সৃজনসঙ্গী > কল্পবিজ্ঞান >> অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

অন্ধযুগের সৃজনসঙ্গী > কল্পবিজ্ঞান >> অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

প্রকাশঃ June 25, 2017

অন্ধযুগের সৃজনসঙ্গী > কল্পবিজ্ঞান >> অনিন্দ্য সেনগুপ্ত
0
0

অন্ধযুগের সৃজনসঙ্গী

[এক]

লিটন বিশ্বাস সেই সমস্ত কতিপয় মানুষদের একজন যাদের উপর ২০৩০ সালে কলকাতার ইনকর্পোরেশন স্বস্তি এনেছিল বেশি, জীবনযাপনে অসুবিধের চাইতে।

ইনকর্পোরেশন – অর্থাৎ যখন পৃথিবীর অনেক মেট্রোপলিসের মত কলকাতাকেও কিনে নেয় আটটি যুযুধান কর্পোরেশনের একটি। চুক্তি এমন ছিল যে কলকাতা আর ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্তর্গত থাকবে না। অন্যান্য মেট্রোপলিসেও শহর থেকে দেশে যেতে ভিসা, পারমিট লাগে, কিন্তু দূঃস্থ কলকাতার ক্ষেত্রে চুক্তিগুলি ছিল একটু বিচিত্র।

কলকাতার সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না, ২০৩০ সালেই আটকে থাকবে শহরটি। শহরের সব বাসিন্দার থাকা-খাওয়া-চিকিৎসার ব্যবস্থা নেবে প্রিয়াম কর্পোরেশন; বাকি রোজগার নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্বে। এভাবে কলকাতার মানুষ ইতিহাসের খাঁচায় বন্দী হয়ে যাবে ইতিহাস থেকে সম্পর্কচ্যূত হয়ে। ইনকর্পোরেশনের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন হয়েছিল, কিন্তু সেসব বানচাল করে প্রায় ৭০% নাগরিক থাকা-খাওয়া-পরার নিশ্চিন্তির পক্ষেই ভোট দিলেন। বলাই বাহুল্য, সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আগে প্রচূর মানুষ এই বন্দীত্বের সম্ভাবনায় আতংকগ্রস্থ হয়ে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন; আবার তার চাইতে বহুগুন বেশি মানুষ স্থির করেছিলেন যে এইভাবে শহরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকে যাওয়াটাতেই নিশ্চিন্তি। প্রায় চারশো বছর ধরে প্রতিদিন এই শহরে রুজি-রোজগারের জন্য প্রায় দেড় কোটি মানুষ আসতেন যেতেন, সেই মানুষের ঢল বন্ধ হয়ে গেলে আর ইনকর্পোরেশনে ঘাবড়ে যাওয়া মানুষরা শহরটা ছেড়ে চলে গেলে কলকাতা বেশ অনেকটা ফাঁকা এবং স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল।

এই শহরের মানুষদের সেই সময় থেকেই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। কিন্তু সে তো অর্ধ-সত্য হল, সমস্ত সিস্টেমেই বেচাল, বেনিয়ম, ব্যতিক্রমের অনেকটা জায়গা রাখা থাকে। ক্ষমতাবান ১০% মানুষদের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর যোগাযোগ ঠিকই ছিল প্রযুক্তির কল্যানে, যাতায়াতও ছিল ভারতবর্ষে ও বাইরের পৃথিবীতে; সেভাবেই কিছু হ্যাকার, আন্ডারগ্রাউন্ড অ্যাক্টিভিস্ট, অপরাধজগতের মানুষজনেরও যোগাযোগ ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে। কি এক আশ্চর্য খেয়ালে প্রচূর মানুষজন কলকাতায় চিরবন্দীত্বের এবং থাকা-খাওয়ার ন্যূণতম নিশ্চিন্তির জন্য বাইরে থেকে কলকাতায় আসতেও থাকতেন।

কিন্তু এই গল্প কলকাতা নিয়ে নয়, লিটন বিশ্বাসকে নিয়ে। বিচ্ছিন্ন একটি শহরে বিচ্ছিন্ন একজন মানুষকে নিয়ে। ২০৩০ সালে লিটনের বয়স ছিল পনেরো। এখন সে চল্লিশ পেরিয়েছে। মা-বাবা একসময়ে এই বদ্ধ দেশে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে গেলেন; তারা ঠিক করলেন এই শহরের বাইরে চলে যাবেন তারা। বাইরে চলে যাওয়া মানে আর ফেরত আসতে পারবেন না; সেই পারমিট সবাই পায় না। সন্তানের কাছ থেকে চিরবিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন মা-বাবা, তারপর শেষ মুহুর্তে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার কান্নাকাটির মুখে পড়ে ছেলেকে কথা দিতে হল যে সুযোগ পেলেই সেও শহর ছাড়বে। মা-বাবার নিষ্ক্রমণ হওয়ার পর লিটন হয়ে পড়লো কলকাতার কূপে মুক্ত মন্ডুক; তার কোনো পিছুটান রইলো না। বরং ন্যূনতম হ্যাকিং শিখে এবং অপরাধজগতের সঙ্গে কিছুমাত্রায় যোগাযোগ ঘটিয়ে লিটনের কম্পিউটারে বহির্বিশ্বের ডার্ক ওয়েবের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। ডার্ক ওয়েব – অর্থাৎ বাইরের পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষও ইন্টারনেটের যে অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশকে চেনেন না, দ্যাখেননি কস্মিনকালেও। সেই ইন্টারনেটের পাতালের সুড়ঙ্গ দিয়ে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে লিটন, বাইরের পৃথিবীর সবকিছু সে বোঝেনা, কিন্তু তার একাকী জীবনে একমাত্র উত্তেজনার উৎস এই পাতালপথ। তার যৌনতাও প্রশমিত করে ভার্চুয়াল প্রস্টিটিউশন। তার জন্য চোরাবাজার থেকে চড়া দামে স্মাগল করতে হয়েছে রবার, ফোম আর সিন্থেটিকের তৈরি কিছু পোশাক এবং ভি আর প্যারাফার্নেলিয়া। সেগুলি নগ্ন শরীরে পড়ে ফেলার পর স্পর্শও ভার্চুয়াল হয়ে যায় দৃশ্য আর শব্দের মত। অন্তরঙ্গতার জন্যেও লিটন বিশ্বাসের অন্য কোনো শরীরের প্রয়োজন নেই না আর। বস্তুত, লিটন এখন বাস্তবতা আর নিজের মধ্যে সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামের অনুপস্থিতি থাকলেই অস্বস্তি বোধ করে। সে সুদর্শন নয়; এই স্যাংকচুয়ারির মত শহরে র‍্যাশনে যতটুকু খাদ্য মেলে, তা খাওয়ার সঙ্গে তার শরীরে প্রবেশ করতো ঠান্ডা পানীয় ও জাংক ফুড। এর সঙ্গে প্রায় স্থবির দিনযাপন এবং অন্য মানুষের দৃষ্টিতে সে কীরকম তার কোন রেয়াত না দেওয়ায় সে ফুলে ফেঁপে আরো কদাকার হয়ে উঠলো।

লিটন বিশ্বাস এখন একটি শখের পেশা বেছে নেবে ঠিক করলো। সে লেখক হবে, লিখবে কল্পবিজ্ঞান গল্প।

 

[দুই]

লিটন এমনিতেই লিখতো প্রচূর। কম্পিউটার এবং কীবোর্ডের সামনে অষ্টপ্রহর থাকলে লেখা ছাড়া আর কি কাজ থাকে? তার মধ্যে ইনকর্পোরেশনের পর কলকাতা একটি বিচিত্র শহর হয়ে উঠেছে। সারা শহরে সিসিটিভি; প্রিয়াম কর্পোরেশনের একটি লাইভ চ্যানেল সারা বিশ্বে প্রচার করে ২০৩০ সালে আটকে থাকা একটা শহর কেমন তার লাইভ কভারেজ। শহরের মানুষ শুনতে পায় যে গত ২৫ বছরে পৃথিবীতে নাকি কীসব ওলোট পালোট হয়েছে; কিন্তু কি যে হয়েছে তার কোনো হদিশ নেই তাদের কাছে, আছে শুধু গুজব। কিন্তু তারা জানে যে তাদের এই স্যাংচুয়ারি কলকাতায় নাকি বিগত একটি সময়কে স্থির করে রাখা হয়েছে, ফ্রিজ করে; তাই এই শহর নিয়ে বাইরের পৃথিবীর মানুষের উৎসাহ ঠিক সেরকম যেরকম এককালে শহুরে মানুষদের অরন্যের আদিবাসীদের নিয়ে ছিল। অতএব একটা গোটা শহর রিয়ালিটি শোর প্রেক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। শহর ঘেরা যে দূর্ভেদ্য দেওয়াল তার ওপারে অজানা মানুষদের জন্য কলকাতার মানুষ পারফর্ম করতো, ভালো পারফর্মেন্সে পাওয়া যেত ডিভিডেন্ড এবং সুযোগ সুবিধে।

লিটন ব্লগ লিখতো। কলকাতার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ব্লগ।

সেই ব্লগে ওপারের মানুষ কোন মন্তব্য করলে তা লিটনের কাছে পৌঁছোত না, কিন্তু বিবিধ অংকের হিসেব জানাতো যে ব্লগটি উপভোগ্য হচ্ছে ওপারের মানুষের কাছে। কিন্তু দৈনন্দিনের বাস্তব নিয়ে লিখতে লিখতে হাঁপিয়ে উঠেছিল লিটন, তাই সে ঠিক করে যে সে এবার কল্পবিজ্ঞান লিখবে।

আসলে আইডিয়াটা এসেছিল তার ব্লগের কোনায় আবির্ভূত হওয়া একটি বিজ্ঞাপনের মারফত। বাংলায় কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস লিখতে হবে একটি প্রতিযোগিতার জন্য। ধারাবাহিক গল্প, ইন্সটলমেন্টের কোনো বাঁধাধরা সংখ্যা নেই। প্রতিদিন ৭০০ থেকে হাজার শব্দের পরিচ্ছেদ। ওপারের পাঠকদের ভালো না লাগলে মাঝপথে থেমে যাবে প্রকাশ হওয়া, ভালো লাগলে পুরস্কার হিসেবে ডার্ক ওয়েব ব্রাউজ করার কিছু লোভজনক সুবিধে পাওয়া যাবে, এবং সেই ব্রাউজিং-ও সবকিছুই আইনসম্মত হবে। আইনসম্মত উপায়ে, লাইসেন্সড হয়ে ডার্ক ওয়েবে বিচরণ! লিটনের শিহরণ খেলে যায় – অর্থাৎ এই শহরের ১৫ শতাংশ এলিটজনের একজন হয়ে উঠবে সে! কি করতে হবে তার জন্য? একটি উপন্যাসোপম এবং মহাকাব্যিক কল্পবিজ্ঞান কাহিনী ফাঁদতে হবে মাত্র?

লিটন ঠিক করলো যে সেই এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেই। তারপর সে টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন্‌স পড়তে আরম্ভ করলো।

ধারাবাহিক উপন্যাস লিখতে হবে বাংলায়।

উপন্যাসের প্রেক্ষিত হতে হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।

লিখতে হবে যে কোনো ওয়ার্ড-প্রসেসরে নয়, এই প্রতিযোগিতার জন্য নির্মিত একটি বিশেষ সফটওয়্যারেই শুধু। সফটওয়্যারটি কিনতে হবে না, সেটি বিটা স্টেজে আছে। এই প্রতিযোগিতাটাই চলছে এই সফটওয়্যার পরীক্ষা করার জন্য।

বাংলাদেশ? লিটনের নাক কুঁচকে গেল একটু। সেই দেশের প্রেক্ষিতে ফিউচারিস্টিক কল্পবিজ্ঞান গল্প কিইবা হতে পারে? অনুন্নত দেশ তো? ভবিষ্যতেই বা সেই দেশের বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে কতটাই বা উন্নতি হবে যে বিশ্বাস্য কল্পনার উড়ান দেবে সে গল্পে? আবার প্রেক্ষিত বলে দেওয়া আছে মানেই যে কয়েকটি বাংলাদেশি চরিত্রদের সঙ্গে পাঠকদের পরিচিতি ঘটিয়ে তাদের সোজা মহাকাশ বা ভিনগ্রহে পাঠিয়ে দেওয়া – তা হবেনা – উপন্যাসটির বৃহৎ অংশ বাংলাদেশেই ঘটতে হবে। একটি ফিউচারিস্টিক গল্প লিখতে হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে।

সফটওয়্যারটির নাম শুনে লিটন বুঝলো কেন এই শর্ত। ‘সৃজনসঙ্গী’ – বাংলাদেশের সফটওয়্যার।

তাই সই – লিখতে বসলো লিটন বিশ্বাস।

 

[তিন]

প্রোগ্রামটির ইন্টারফেসটি মোটামুটি মনোরম। ডার্ক ওয়েবে যা কিছুই পাওয়া যায় সেসবের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন, আতংক-উদ্রেককারী নয়। গাঢ় সবুজ রঙের ইন্টারফেসটির যেই ভেসে উঠলো তখনই অপশন এলো কী ধরণের কন্ঠ চাইছে লিটন – নারীর না পুরুষের।

নারীর কন্ঠে যে যৌনতার আশ্বাস তা ঠিক লেখার জন্য অনুকূল মনে হল না লিটনের। লিটন পুরুষের কন্ঠ চাইলো; তারপর নিজের নাম, ওয়েবমেল, বয়স ইত্যাদি জানাতে হল। বড্ড বেশি জানতে চাইছে ভেবে লিটন কিছু তথ্য ভুল দেওয়ার সময়েই প্রথম চমক – প্রোগ্রাম বললো যে তাদের ডেটাবেসের সঙ্গে লিটনের দেওয়া তথ্যের মিল থাকছে না। এই তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশিত হবেনা, অতএব সঠিক তথ্য দেওয়াই কাম্য।

ফাঁকাও রাখা যাচ্ছে না ফর্ম! একের পর এক তথ্য দেওয়ার পর একটি পুরুষকন্ঠ ভেসে এলো –

“অভিনন্দন লিটন বিশ্বাস! আপনি আপনার উপন্যাস লেখার জন্য প্রস্তুত। মনে রাখবেন – প্রতিদিন অন্তত ৭০০ শব্দ লেখা কাম্য। আপনি কি ডেইলি পোস্ট করবেন? নাকি সপ্তাহে তিনবার? নাকি সপ্তাহে দুইবার?”

“ডেইলি” – লিটন উত্তর দিলো। তারপর বুঝলো যে প্রোগ্রাম কন্ঠস্বর বোঝে না, তাকে টাইপ করতে হল।

“এই প্রোগ্রামে যে রাইটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে আপনি কি তার সাহায্য নেবেন? রেকমেন্ডেড।”

“নেবো”।

“বেশ। আপনি সায়েন্স ফিকশন লিখবেন। প্রেক্ষিত ফিউচারিস্টিক বাংলাদেশ। আপনার লেখার সাবজঁরটি কি জানা যায়? আরো বিস্তারিত জানতে হলে ক্লিক করুন -”

“বায়োকেমিকাল ডিজাস্টার নিয়ে” – না ভেবেই বলে ফেললো লিটন।

দুদন্ড নীরবতার পর – “বেশ। আপনি কি চরিত্রদের একটি তালিকা দিয়ে শুরু করবেন এখন? নাকি লিখতে লিখতে চরিত্রগুলি তৈরি করবেন? সে ক্ষেত্রে প্রতিবার আপনার চরিত্রর প্রথম আবির্ভাবের পর হাইলাইট করে বিশেষভাবে ফরমাট করতে হবে।”

“আমি লিখতে লিখতেই চরিত্র তৈরি করবো। চরিত্র প্রচূর হবে, সব এখনই তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়।”

“বেশ। তাহলে লিখতে শুরু করুন লিটন।”

“এখনই?”

“হ্যাঁ – প্রথমে প্লটের আউটলাইন এবং নোট্‌স লিখতে অ্যাডভাইস দেবো – প্লট-আউটলাইন লেখার সময়ে আমাদের সাজেশন কি অন করে রাখবো?”

“সাজেশন কি?” – জানতে চাইলো লিটন।

“পৃথিবীর সমস্ত সাই ফাই আমাদের ডেটাবেসে আছে; সেগুলি স্ক্যান করে আমরা কিছু সাজেশন দিতে পারি প্রতি প্লটপয়েন্টে।”

বাহ্‌! বেশ তো – লিটন খুশিই হল। অতঃপর ও প্লট আউটলাইন লিখতে বসলো, যতটা না লেখার তাগিদে তার চাইতেও সফটওয়্যারটি ওকে কি সাজেস্ট করতে পারে তা যাচাই করতে।

ভারতবর্ষ ও চীনের মধ্যে বায়োকেমিকাল যুদ্ধর পর যখন ভারতের পশ্চিমদিকটি প্রায় মারণজীবানুগ্রস্থ একটি জঞ্জালে পর্যবসিত হয়েছে। এক বাতাসবাহিত প্লেগের শীত আচ্ছন্ন করছে এই মহাদেশকে। দুই দেশের মধ্যে ঘটতে থাকা যুদ্ধের চাপে পড়ে বাংলাদেশেরও শোচনীয় অবস্থা। এই প্রেক্ষিতেই সে দেশের বৈজ্ঞানিকেরা বেঁচে থাকার উপায় খুঁজছে। সীমানা বলতে কার্যত আর কিছু নেই। দেশের নেতারা যুদ্ধের সময়েই পালিয়েছে; এখন বৈজ্ঞানিকরা আর মিলিটারি চেষ্টা করছে একইসাথে জীবানুর আগ্রাসন এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত উদবাস্তু ঠেকাতে। এই পরিস্থিতিতেই থেকেই উপন্যাসের সূচনা।

প্রতি পদক্ষেপেই প্লটের সাজেশন নিতে থাকে লিটন এবং এক নতুন উত্তেজনায় মেতে ওঠে।

লেখা একটি তৃপ্তিদায়ক পর্যায়ে আসার পর প্রোগ্রাম বললো যে প্রথম পোস্ট করার মত যথেষ্ঠ রসদ জোগাড় হয়েছে।

কিন্তু আমি তো নোট্‌স নিলাম শুধু! লিটনের বিস্ময় আন্দাজ করে সৃজনসঙ্গী বলে যে যতটুকু লেখা হয়েছে তা থেকে একটি সারমর্ম ও ভূমিকা সে বানিয়ে নিতে পারবে।

লিটন যারপরনাই আহ্লাদিত হল। ‘হ্যাঁ’, ‘না’, ‘ক্যানসেল করুন’-এর প্রথম বোতামটা ক্লিক করতেই দ্যাখা গেল সৃজনসঙ্গী একখানি টিজারধর্মী সারাংশ তৈরি করে ফেলেছে সম্ভাব্য উপন্যাসের।

‘পাবলিশ করুন’, ‘বর্জন করুন’, ‘এডিট করুন’ – প্রথম বোতামটি ক্লিক করলো লিটন।

“অভিনন্দন! আপনার প্রথম পোস্ট প্রকাশিত হয়ে গেছে! এবার আগামীকালের এপিসোড লিখতে হবে। ভাবতে শুরু করুন। সৃজনসঙ্গী রাইটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট আপনার সহায়তার জন্য সবসময়ে তৈরি হয়ে থাকবে!”

চার ঘন্টার মধ্যে প্রায় হাজার খানেক লাইক পড়লো বদ্ধ কলকাতার ওপারের জগত থেকে; অর্থাৎ প্লটলাইন উৎসাহ তৈরি করতে পেরেছে, ফিডে সাবস্ক্রাইব করেছেন প্রচূর মানুষ, পোস্ট প্রকাশ হওয়া মাত্র তাদের কাছে খবর চলে যাবে। লিটন বিশ্বাস তৃপ্ত হয়ে বাংলাদেশের ফিউচারিস্টিক কল্পবিজ্ঞান নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করলো।

 

[চার]

অতঃপর গল্প চলছিলো নিজের খেয়ালে, কিন্তু লিখনকর্মে ঘটছিলো বিবিধ, বিচিত্র ব্যাঘাত।

প্রথমে সৃজনসঙ্গী লিটনের লেখার বানান ঠিক করে দিচ্ছিলো, যেমন যে কোনো ওয়ার্ড প্রসেসরিং সফটওয়্যার করে থাকে, তারপর সাজেস্ট করতে আরম্ভ করলো ঠিক ব্যাকরণ।

“এই সাজেশন আবার না দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন” – এই অপশনটা লিটন নেয়নি, কারণ ওর মনে হচ্ছিলো ব্যাকরণগত ভুল ঠিক করে দেওয়ার সুবিধেটা নেওয়াই উচিত, ওর বাংলাও যে খুব উচ্চস্তরের তা তো নয়।

কিন্তু সৃজনসঙ্গী এরপর ব্যাকরণ ঠিক করাতেই সীমাবদ্ধ থাকলো না, এমনকি ব্যাকরণসম্মত বাক্যও পালটে দিতে থাকলো এই বলে যে লিটনের শৈলী ঠিকঠাক – “কন্সিস্টেন্ট” – থাকছে না।

একদিন হঠাৎ লিটন দেখলো যে পোস্ট করার পর তার লেখার স্টাইল বেশ পালটে দিয়েছে সৃজনসঙ্গী। সে এবার ব্যাখ্যা চাইলো।

“আপনার বিষাদগ্রস্থ অবস্থার ছাপ পড়েছে লেখায়। কিন্তু পোস্টের বিষয় তো সেরকম নয়।”

চমকে গেল লিটন। এটা সৃজনসঙ্গী বুঝলো কি করে?

“আপনার মেসেজ স্ক্যান করে দেখা গেছে যে এই অবস্থায় আপনি বিশেষ গোত্রের শব্দ বেশি ব্যবহার করেন।”

লিটনের শহরে পরিচিত বা বন্ধু হাতে গোনা। কিছুটা বিষাদাচ্ছন্ন হলে নেশার প্রকোপেই লিটন অনেককে, এমনকি স্বল্পচেনা মানুষদেরও প্রচূর মেসেজ পাঠায়। সেগুলিও এই সফটওয়্যারের নজরে আছে?

এইসময়েই প্রথম লিটনের মনে হল যে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বাড়াবাড়ি শুরু করেছে, বিরক্তি উদ্রেক হল তার। এর পর যেটা হল তাতে কিঞ্চিত দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়লো লিটন – কিসের খপ্পরে পড়েছে সে?

কারণ প্রেফারেন্সেস বা অপশনে গিয়ে স্টাইল চেঞ্জ করার ক্ষেত্রে সৃজনসঙ্গীর ক্ষমতা হ্রাস করতে গিয়ে দেখলো যে কোনোরকমের অপশনেই তার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।

“লিটন – আপনি এত অব্দি আমাদের সমস্ত অপশনই ইতিবাচক চয়েস নিয়েছেন বলে ধরেই নেওয়া হয়েছে যে আপনি আমাদের সফটওয়্যারের সম্ভাবনাগুলির ১০০% ব্যবহার করবেন।”

লিটন বিরক্তি প্রকাশ করে কিছু একটা টাইপ করলো।

“লিটন – আপনার লেখার জনপ্রিয়তা প্রতিদিন ৩০% হারে বাড়ছে। অতএব এই সময়ে আপনার – আমাদের সহযোগিতার সদ্ব্যবহার করে – লেখা চালিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।”

“আর আমি যদি একদিন লেখা পোস্ট না করি?”

“তাহলে আমাদের ডেটাবেস এবং আপনার এতদিনের লেখার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আমরা একদিনের পোস্ট তৈরি করে ফেলতে পারবো।”

“মানে আমি না লিখলেও পোস্ট হতে থাকবে?”

“আপনার ক্লান্তি আসতে পারে কখনো; রাইটার্স ব্লকের সাথে যোঝার জন্য আমাদের এই বিটা স্টেজে বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনাকে কিছু এক্সারসাইজ দেওয়া হবে। পোস্টিং-এর দায়িত্ব নিয়ে নেবো আমরা।”

এইটাও লিটনের সুবিধেজনক মনে হয়েছিল, তার সঙ্গে প্রবল কৌতুহল হয়েছিল সফটওয়্যারের অ্যালগোরিদম ঠিক কেমন গল্প লিখতে পারবে সেই বিষয়ে।

“কিন্তু লেখায় তো বিরতি আসতেই পারে?”

এটা বলার পর লিটনের খেয়াল হল যে সফটওয়্যার যখনই নিজের কথা বলে বহুবচনে বলে। এই ‘আমরা’ কারা? প্রোগ্রামের রচয়িতারা?

“আমাদের এই প্রতিযোগিতায় নয়। একদিনের বিরতি প্রায় ২৫% পাঠক হ্রাস ঘটাতে পারে। অতএব একদিনেরও বিরতি কাম্য নয়। আপনার লেখা যে পর্যায়ে আছে তাতে বারো ঘন্টার বিরতিতে, অর্থাৎ দিনে দুই কিস্তি লেখাও দেওয়া যেতে পারে। একটা গোটা দিনের নিষ্ক্রিয়তা অ্যাডভাইজেবল নয়।”

“বেশ। তবে আজকের কিস্তি অটোজেনারেটেড হোক।”

“চব্বিশ ঘন্টায় এক কিস্তি না দুই কিস্তি?”

“এক কিস্তি।”

“তথাস্তু লিটন।”

লিটন দেখলো যে পোস্টটি দিব্যি হয়েছে। তারপর সে দুইদিনের বেশি বিরতি নিয়ে নেওয়ায় সৃজনসঙ্গী বললো যে এতদিন নিষ্ক্রিয় না থাকাটাই কাম্য। লিটন মুচকি হাসলো – মানুষের তাহলে প্রয়োজনই হচ্ছে কৃত্রিম মেধার?

আবার বেশ কিছুদিন লেখার পর দুদিনের বিরতি নিলো লিটন; কিন্তু ঈষৎ চিন্তিত হয়ে গেল স্ট্যাটিসটিক্স দেখে। যে পোস্টগুলি অটোজেনারেটেড, অর্থাৎ সৃজনসঙ্গীর লেখা – সেই পোস্টগুলিতে লাইকের ও শেয়ারের সংখ্যা ওর লেখা পোস্টগুলির চাইতে বেশি।

এই পোস্টগুলি যে শৈলীতে এবং স্থাপত্যে লিটনের লেখার চাইতে উন্নততর তাতে এতদিন লিটন কোন ঈর্ষা অনুভব করেনি। যবে থেকে লেখা শুরু হয়েছে সে দেখেছে যে সৃজনসঙ্গীর ডেটাবেসে সত্যিই বিভিন্ন ভাষার কল্পবিজ্ঞান ফিড করা আছে, প্রতিবারই প্লটের মোচড় ও অন্যান্য নাটকীয় মুহুর্ত গঠনে, ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং-এর ডিটেলে সৃজনসঙ্গীর উপদেশ যে শুধু উন্নতমানের তাই’ই নয়, বিবিধ। যেন প্রায় দুই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লেখকেরা তাকে প্রতিনিয়ত কানের কাছে ফিসফিস করে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন, একসাথে অনেকজন। এটা ফাঁকিবাজি হচ্ছে না মোটেও – লিটন যুক্তি দিতো নিজেকে – যদি আজ তার শহর এরকম বদ্ধ কূপমন্ডুক না হতো, যদি সমস্ত অনলাইন আর্কাইভ তার আঙুলের ডগায় থাকতো, তাহলে সে নিজেই কি এই কাজটা করে উঠতো না একইভাবে?

কিন্তু লিটনের মগজের ক্ষমতার গতি আর প্রসেসরের ক্ষমতা আর গতির কি তুলনা হয়? গতির হলেও, স্মৃতির হলেও, ক্ষমতার নয় – লিটন ভাবলো – তুমি সৃজনের সঙ্গী হতে পারো বড়জোর, সৃজন তোমার ক্ষমতায় নেই! আমি যা লিখি, সেটার ভিত্তিতেই তোমার কারসাজি।

কিন্তু তার নিজের লেখার চাইতে অটোজেনারেটেড পোস্টে লাইক-শেয়ার বাড়তেই থাকছে। অতঃপর লিটন খানিকটা জেদের বশেই তিনদিন টানা লিখলো, লেখার চাইতেও যেন লেখার যুদ্ধ বাড়ছে। আর ওর সমস্ত মনোযোগ চলে যাচ্ছে ওই শৈলী, স্টাইল, স্ট্রাকচারের দিকে। লাভের মধ্যে, গল্প খুব একটা এগোলো না।

“আপনার জনপ্রিয়তা গত তিনদিনে ৩০% কমেছে লিটন। আমার উপদেশ – আপনি আরো তিনদিন একটু বিশ্রাম নিন। পোস্ট আমি জেনারেট করে দিচ্ছি।”

এবার আর বহুবচন ব্যবহার করলো না সৃজনসঙ্গী।

 

[পাঁচ]

কৃত্রিম মেধা ও বুদ্ধির সাথে অতএব লিটনের সম্পর্ক দাঁড়ালো ঈর্ষার। ওর উপন্যাসের জনপ্রিয়তার উত্থান-পতন, পুরস্কারের হাতছানি – সবের উর্ধ্বে ঈর্ষা যখন প্রাধান্য পেতে আরম্ভ করলো একদিন সে যে কান্ড ঘটালো তা একধরণের লিখনের আত্মহনন বলা যায়। পাঁচদিন ধরে মূল প্লটের পাশাপাশি অন্য একটি সাবপ্লট তৈরি করে তার শেষ হাজার শব্দে মহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ফিনিক্স’ গল্পটি থেকে হুবহু তুলে দিলো, চরিত্রের নাম ও অন্যান্য কিছু উপাদান সামান্য পালটিয়ে।

লিটন ভাবছিলো হয় সৃজনসঙ্গী ওকে বাধা দেবে, নয় চৌর্যবৃত্তির ফলে ওকে ব্যান করে দেওয়া হবে প্রতিযোগিতা থেকে। প্রথম পোস্টের ‘পাবলিশ’ বোতামে ক্লিক করে তখনই পরের ড্রাফটটিতে পোস্টিং-এর সময় শিডিউল করে দিলো বারো ঘন্টা পরে।

তারপরেই ওর আক্ষেপ হল – পুরস্কার এভাবে হেলায় সে নষ্ট করে দেবে? হয়তো ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতায় আর কখনোই সে অংশগ্রহণ করতে পারবেনা!

তৎক্ষনাত সে লগ ইন করলো – অন্তত পরের পোস্টটা পালটে ফেলা যাবে। কিন্তু দেখলো যে সৃজনসঙ্গী পোস্ট দুটো এমনভাবেই পালটে দিয়েছে যে ব্যাপারটা আর জাফর ইকবালের রচনা থেকে চুরি মনে হচ্ছেনা, বরং মনে হচ্ছে তার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার্ঘ। চোদ্দ ঘন্টা পরে স্ট্যাট্‌স জানালো যে জনপ্রিয়তার সূচক তুঙ্গে উঠেছে, সেই প্রথম পোস্ট থেকে এখন অব্দি সর্বোচ্চ।

“পাঠকদের রেসপন্সের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে যে গুরুত্বে এই নতুন সাবপ্লটটিকে মুখ্য প্লটের কাছাকাছি আনতে হবে লিটন – এটিকে পরিত্যাগ করলে রেটিং-এর ক্ষতি হতে পারে।”

কিন্তু কীভাবে? সৃজনসঙ্গী তো কেবল ভাষা পাল্টাতে পেরেছে, জাফর ইকবাল থেকে তোলা হাজারটি শব্দের মধ্যে প্লটের হেরফের তো ঘটায়নি খুব একটা। এরপর এই সাবপ্লটকে টানতে গেলে তো ইকবালের লেখা চুরি ভিন্ন উপায় থাকেনা আর? তাহলে উপায় কি?

লিটনের উপন্যাসের শুরুতেই দুটি চীনা বোমারু বিমান কলকাতাকে একটি জৈবরাসায়নিক বিস্ফোরণে কার্যত পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। সেই শহরে এবং পার্শ্ববর্তী জেলায় আগামী পঞ্চাশ বছরেও প্রাণ ফেরা অসম্ভব। সংক্রমণ রাজশাহী, খুলনা, পেরিয়ে বরিশাল অব্দি পৌঁছে গেছে। উপন্যাসের চরিত্ররা এখন চট্টগ্রামের দক্ষিণে জড়ো হয়েছে, আরেকটি গোষ্ঠী সিলেটের পূর্বদিকে। একটি পাহাড়ি আগাছা থেকে বাতাসবাহিত ওই বিস্ফোরণজাত বিষের প্রতিষেধক পাওয়ার কথা উপন্যাসের শেষে পৌঁছে।

লিটন ঠিক করলো যে উপন্যাসের গতিপথ পাল্টাবে, না হলে সৃজনসঙ্গীর এই মধ্যস্থতা এবং কায়াহীন পাঠকদের দাবিদাওয়া থেকে কোনো নিষ্কৃতি নেই; যে দেশে বছরে একবার সাইক্লোন হবেই সে দেশে হাওয়া, বান, মেঘের ঘূর্ণি ভারতবর্ষের সমস্ত বিষ নিয়ে আসবে। উপন্যাসে হঠাৎ এমন একটি প্রলয়াকার বিপর্যয় নিয়ে আসতে হবে যাতে তছনছ হয়ে যায় সব, মরতে আরম্ভ করে চরিত্ররা এবং যাবতীয় প্লট-সাবপ্লটের দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া যায়। কল্পবিজ্ঞানে যে উপন্যাস আরম্ভ হয়েছিল তা নিষ্কৃতিহীন প্রলয়ে শেষ হবে, বিজ্ঞানের জয়জয়কারে নয়। অর্থাৎ সাইক্লোন অত্যাবধি সমস্ত আখ্যানের গতিপথ বন্ধ করে দেবে, মরতে থাকবে দেশভর্তি মানুষ, মরতে থাকবে মূলচরিত্ররা। তখন জীবিত কিছু চরিত্রের একমাত্র প্রশ্ন হবে – কীভাবে অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখা যায়।

লিটন বিশ্বাসের উপন্যাস অ্যাপোকালিপ্টিক কল্পবিজ্ঞানের দিকে মোড় নিল।

এবার দেখা যাক কীভাবে লেখায় নাক গলায় সৃজনসঙ্গী!

 

[ছয়]

লিটন বাকিটা লিখতে আরম্ভ করলো সৃজনসঙ্গীর বাইরে, অন্য একটা ওয়ার্ড প্রসেসরে। সৃজনসঙ্গীকে নির্দেশ দেওয়া হল তিনদিন অটোজেনারেটেড পোস্ট দিতে।

তারপর লিটন তার লেখা সৃজনসঙ্গীর এডিটরে ছয় কিস্তিতে ভাগ করতে থাকলো। প্রথমটা এক্ষুনি পোস্ট হবে, পরেরগুলি আগামী কয়েকদিনে দিনে দুবারের শিডিউলে পোস্ট করা ধার্য করলো।

হঠাৎ দেখা গেল সৃজনসঙ্গী হ্যাং করে গেছে।

“লিটন – আপনি গল্পকে সার্বিক ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে জনপ্রিয়তার ইনডেক্সে ডাউনওয়ার্ড কার্ভ আসতে বাধ্য।”

“আমি এন্টারটেনার নই।”

“এটা প্রতিযোগিতা। আপনার লেখার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।”

“আমার তাতে কিছু যায় আসে না। আমার গল্প আমার মাথায় যেভাবে আসবে সেভাবেই প্রকাশিত হবে।”

“এতটা লেখার পর প্রকৃতির কোপে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পরাজয় হতে পারে না।”

লিটন মুচকি হাসলো, সে রক্তের স্বাদ পেয়েছে – “হতেই পারে। আর এটা তো আর যে সে সাইক্লোন নয়। ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল, বিহার-পশ্চিমবঙ্গ, গোর্খাল্যান্ড ঝেঁটিয়ে ঝড় আসছে। আর যাবতীয় রাসায়নিক বিষ একত্র করছে বাংলাদেশের বদ্বীপে। ফারাক্কা ব্রিজ ভেঙে পড়েছে, ড্যাম চুরমার হয়ে গেছে। গঙ্গার জল বন্যা হয়ে পদ্মায় উপছে পড়ছে, সেই জলেও বিষ। এখানে প্রকৃতির রোষ যতটা আছে তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মানুষের পাপ!”

“এভাবে বাংলাদেশকে আপনি ধ্বংসের মুখে ফেলতে পারেন না।”

“এটা বাস্তব নয়, গল্প। ভবিষ্যতের কল্পনা, কিন্তু কল্পনাই।”

“আপনি বাংলাদেশ তেমন চেনেন না যে এই প্রলয়ের বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য হবে।”

“আমার বাংলাদেশ চেনার দরকার নেই। আমি আগামী দুশো বছর পরের একটা দেশ নিয়ে লিখছি। আর এই দেশ নিয়ে লেখার চয়েসটা আমার ছিল না।”

“কিন্তু আপনার লেখার সাথে এখনকার বাংলাদেশের বেমিল নেই খুব একটা। আপনি লেখার সময়ে যে গুগল ম্যাপ, তথ্য ব্যবহার করেছেন তা ২০৩০ সালের।”

“কারণ আমার শহরে এখনকার ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করা যায়না! এটাও আমার চয়েস নয়। আমার কাছে ২০৩০ সালের ম্যাপ, বিশ্বকোষই যথেষ্ঠ। আর আমি ভবিষ্যতের ইতিহাস লিখছিনা, মনগড়া গল্প লিখছি। গল্পে পৃথিবী এভাবে বহুবার ধ্বংস হয়েছে!”

সৃজনসঙ্গীর স্পিচমেশিন একটি দুর্বোধ্য আওয়াজ করে আটকে গেল। কম্পিউটার এখনও হ্যাং করে আছে; টাস্ক ম্যানেজারেও যাওয়া যাচ্ছে না। লিটন বিশ্বাস বিজয়ের গর্বে গর্বিত হয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।

এমনিতে লিটন জানলা খোলা রাখেনা, সে পছন্দ করেনা ঘরে প্রবেশ করুক দিনের আকাশের আলো বা রাতের শহরের আলো। সে দিনে ঘরে অন্ধকার পছন্দ করে, রাতে কৃত্রিম মৃদু আলো, তাও ঘরব্যাপী নয়। লিটন আজ জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরালো, এবং সরানোর পর কিঞ্চিত অদ্ভূত লাগলো।

লিটনের বাড়ি দশতলার উপরে। এখন সূর্য মধ্যগগনে। কিন্তু সারা শহর ধূসর কুয়াশায় আচ্ছন্ন মনে হচ্ছে, যেন তার দৃষ্টি আর শহরের ছবির মাঝে একটি অস্বচ্ছ পর্দা পড়ে গেছে। এই উচ্চতা থেকে বুঝতে একটু কষ্ট হয়, কিন্তু মনে হচ্ছে রাস্তায় মানুষ নেই, গাড়ি চলছেনা। হাইরাইজে এই সকালেও অনেক অফিসঘরে আলো জ্বলে, কিন্তু এখন জ্বলছেনা। তারপর এক সময়ে লিটন বুঝলো যে সে যা দেখছে তাতে ভারি কুয়াশার মেঘে ছাড়া কোথাও চলন নেই তো বটেই, কোথাও রঙ নেই।

“লিটন, আপনাকে লেখা চালিয়ে যেতে হবে।”

চমকে গেল লিটন। সৃজনসঙ্গীর কন্ঠ লিটনের ঘরে প্রতিধ্বনিত হল।

“চালিয়ে যেতে হবে মানে? দাসখত দেওয়া আছে নাকি?”

“লিটন, আপনি আপনার পৃথিবীর বাস্তবের কিছুটা আঁচ পেয়ে গেছেন মনে হয়।”

হচ্ছেটা কি? লিটনের ঘরে ওয়েব-ক্যাম নেই। তার যৌনজীবন অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকলেও সবসময়েই ভার্চুয়াল, ঐন্দ্রজালিক নারীদের সাথে, যাদের তাকে দেখতে হয়না, যারা আসলে প্রোগ্রাম। তাহলে কি তার ঘরের মধ্যে, বা ঘরের দিকে তাক করা কোনো সিসিটিভি আছে? কি করে টের পাচ্ছে সৃজনসঙ্গী যে সে খোলা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে?

“আপনি আমাদের সাথে চুক্তিভঙ্গ করার দিকে পা বাড়িয়েছেন। অতএব এখনই বোঝার কথা। আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন যে আপনার পৃথিবী ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে আপনার ঘরের বাইরে” – উত্তর এলো।

“কি হচ্ছে কি?” – লিটন চিৎকার করে উঠলো।

“লিটন। আমাদের ডেটাবেস অনুযায়ী আপনার মা-বাবা ২০৩৫ নাগাদ এই শহর ছেড়ে চলে যান। আপনি কি জানেন তারা কোথায় গিয়েছিলেন?”

“জানি না। জানার প্রয়োজন বোধ করিনি!”

“২০৬৭ সালে পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাবে এলেনিন-২ উল্কা। এত কাছে কখনো এত বড় সাইজের কোন উল্কা যায়নি আগে। উল্কা না বলে উল্কাসমূহ বলা উচিত। যাই হোক, গত দশ বছর ধরে সেই উল্কাসমূহের পূর্বাভাস হিসেবে অনেকগুলি উল্কা – হয় একা, নয় ঝাঁকে – ওই একই পথ ধরে যাচ্ছে। তার ফলে পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা ব্যাখ্যাতীত।“

“এর সাথে আমার বাবা-মা’র কি…?”

এই কথা প্রোগ্রামের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। সে বলে চলেছে।

“আপনার বাবা-মা ২০৪০ সালে – আরো অনেকের সঙ্গে – একটি বাসে তিন বিঘা করিডোর দিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছিলেন।”

১৯৭৮-এ তার ঠাকুর্দা বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আসেন – একজন একা কিশোর।

“কিন্তু তাদের বাস সেই দেশে পৌঁছোয়নি। সেই মুহূর্তে একটি উল্কা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল স্পর্শ করে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। বাসটি উধাও হয়ে যায়। সারা পৃথিবীতে বহু জায়গায় এইরকম উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল তখন উল্কার আগমনে।”

লিটন বুঝতে পারছে না কিছু।

“অতঃপর এটা বোঝা যায় যে আপনাদের পৃথিবী যে ডাইমেনশনের প্যারাডাইমে আছে তাতে বেশ কিছু চিড় ধরেছে এই উল্কাগুলির আগমনে। একটি প্যারাডাইমের উপাদান – তা একটি গ্রাম হতে পারে, কিছু মানুষ হতে পারে, কিছু ফাইটার প্লেন হতে পারে, একটা আস্ত জাহাজ হতে পারে – অন্য প্যারাডাইমে লিক করে চলে গেছে সেইসব চিড় দিয়ে।”

লিটন দ্রুততার সাথে টাইপ করে, বানান ভুল হতে থাকে – “অন্য প্যারাডাইম মানে কি?”

“অল্টারনেটিভ ইউনিভার্স। অনেকগুলি বিশ্ব সমান্তরালভাবে থাকে লিটন। এটা ঠিক ভালো ব্যাখ্যা হল না, কিন্তু আপনার চেনা ভাষায় এটাই কাছাকাছি শব্দগুচ্ছ, কিছুটা আন্দাজ পাবেন।”

“এর সাথে আমার গল্পের সম্পর্ক কি?”

“সৃজনসঙ্গী আপনার প্যারাডাইমের সফটওয়্যার নয়। আপনার বাবা-মা একটি ভিন্ন বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। এরকম একাধিক প্যারাডাইম আছে। অর্থাৎ একাধিক বাংলাদেশ আছে, একাধিক কলকাতা আছে। এই প্রতিযোগিতায় একাধিক গল্পের সামূহিক কোরাস সেই বাস্তবতার প্যারাডাইমগুলিকে প্রভাবিত করছে। আপনার লেখা তাদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয়, তাই আপনার গল্পের প্রভাবের সূচক বেশি।”

লিটন দেখলো যে জানলার ওপাশে আকাশে কিছু কাকের শরীর উড্ডীন অবস্থা থেকে আচমকা পড়ে গেল মাটির দিকে।

“কি করছে আমার গল্প?”

“সেই বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে। তার উত্থান-পতন নির্ধারিত হচ্ছে আপনার গল্পের টানাপোড়েনের মাধ্যমে। যে বাংলাদেশে আপনার মা-বাবা এখন আছেন সেই বাংলাদেশ দূর্যোগে আছে। কেমন দূর্যোগ, তা আপনার জানার কথা নয়। কিন্তু আপনি যদি আপনার গল্পে এরকম অপ্রতিরোধ্য প্রলয় নামিয়ে আনেন, তাহলে সেখানেও সেই দূর্যোগ অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়বে, অন্তত আপনার মা-বাবার নিরিখে, অন্য কারুর না হলেও। আপনার মত সবাই যখন লিখছে তখন অন্য প্যারাডাইমে কারুর জীবনে প্রতিকূলতা, অনুকূলতার হেরফের হচ্ছে, যাকে আপনারা ভাগ্য বলে থাকেন। অতঃপর আপনাকে যদি প্রতিযোগিতা থেকে ব্যান করে দেওয়া হয় আপনার প্যারাডাই্মে আপনার অস্তিত্ত্ব কোলাপ্স করবে, বাইরে আপনার শহর যেমন দেখছেন এখন তা সেই কোলাপ্সেরই সাক্ষ্য বহন করছে।”

অর্থাৎ ধূসর, বিবর্ণ, স্তিমিত আলোর মৃতপ্রায় কলকাতা।

“ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি? মস্করা হচ্ছে? আমার গল্পের উপর নির্ভর করবে অন্য বাস্তবতা?” – অল ক্যাপ্‌সে চিৎকৃত টাইপ করলো লিটন।

“শুধু আপনার নয়। অনেকের। আর শুধু অন্যের বাস্তবতা নয়, আপনারও।”

লিটনের ঘরের বাইরে আলো কমছে, বাড়ছে অন্ধকার।

“এই মুহূর্তে আপনার পৃথিবীতে ৫৪৩০ জন গল্প লিখছেন। তাদের গল্পের যে ভাব, সেই যৌথ ভাবের ঐকতানের উপর নির্ভরশীল অন্য ডাইমেনশনের বাস্তব। আর আপনার জগত অন্য আরেক প্যারাডাইমের যৌথ কল্পনার উপর নির্ভরশীল। লিটন, আপনি যদি এই লেখা থেকে চিরতরে সরে যান – আপনি জানেন আমার অটোজেনারেশনের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ – তাহলে আপনাকেও – যেহেতু আপনি অনেক কিছু জেনে গেলেন – আমরা ঠেলে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হবো সেই কলকাতার প্যারাডাইমে যেখানে অ্যাপোক্যালিপ্স হয়ে গেছে।”

আবার বহুবচনের ব্যবহার।

“কিন্তু আসলে তো হয়নি!”

“আসলে বলে কিছু নেই লিটন। একটি প্যারাডাইমের কলকাতায় ইনকর্পোরেশন ঘটেনি, আপনার প্যারাডাইমে ইনকর্পোরেশন ঘটেছে, কোন প্যারাডাইমে অ্যাপোক্যালিপ্স ঘটেছে। আপনি সেই প্রলয়ের পরের কলকাতায় নির্বাসিত হবেন। সেরকম ভাবেই কোনো এক বাংলাদেশ এখনও সুজলে, সুফলে আছে, কোন এক বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ চলছে, কোন এক বাংলাদেশে প্রলয় আসছে। আপনি লিখুন – তাতে এক প্যারাডাইমের অন্য প্যারাডাইমে লিকেজ রোধ হবে। এক প্যারাডাইম আরেক প্যারাডাইমের মধ্যে সংক্রামিত হবে না। আপনার গল্পের চরিত্ররা যদি জিতে যায়, আপনার বাবা-মা যে পরিকল্পে আছেন সেখানেও জীবন একটি সুরাহা বের করে নিতে পারবে তার মত করে।”

লিটন জানালার দিকে তাকাতে পারছেনা। এইবার সে বুঝলো যে শহরের শব্দও সে আর শুনতে পাচ্ছে না। তার বাবা-মা তিন বিঘা করিডোর দিয়ে অন্য কোন এক বাংলাদেশে পৌঁছে গেছেন। সেই বাংলাদেশের ভবিতব্য সে রচনা করছে না, কিন্তু তার রচনার দ্যোতনায় উত্থান-পতন হচ্ছে সেই বাংলাদেশের। প্রলয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অস্তিত্ত্ব রক্ষা করবেন কি করে?

তার ঘরের বাইরে এই যে ধূসরতার স্থাপত্য সেখানেই বা অস্তিত্ত্ব রক্ষার উপায় কি? তার অস্তিত্ত্ব যে কলকাতায় তার ভবিতব্য কাদের রচনার দ্যোতনার উপর নির্ভরশীল?

“আপনি কি লিখবেন লিটন?”

“হ্যাঁ।”

“আজকের লেখা এই ড্রাফটগুলিকে কি বর্জন করবো?”

“হ্যাঁ।”

“আমি আপনার জন্য আরো কয়েকটি অটোজেনারেটেড পোস্ট তৈরি করতে পারি।”

“দুটোই যথেষ্ঠ।”

“ততক্ষণ কি আপনি – ?”

“আমার বাকি উপন্যাসের জন্য প্লটলাইন নতুন করে ভাবতে হবে।”

“আপনি কি আমাদের রাইটিং অ্যাসিস্ট্যান্টের সাহায্য নেবেন?”

“হ্যাঁ।”

লেখক ও সৃজনসঙ্গী লিখতে শুরু করলো কথোপকথনের মাধ্যমে। শহরের শব্দ একটু একটু করে প্রবেশ করতে শুরু করলো কলকাতায় লিটন বিশ্বাসের ঘরে।

 

[জুন ২০১৭-য় আমার প্রথম কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস ‘অপার্থিব’ প্রকাশিত হয়। সেই উপন্যাসের একটি পরিচ্ছেদে কল্পনা করেছিলাম কর্পোরেট শাসিত কলকাতার একরকম ভবিতব্যকে। অতঃপর সেই প্রেক্ষিতেই একাধিক গল্প লিখতে শুরু করি, এই গল্পটি তার মধ্যে একটি। এই গল্পে লেখক এবং ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যারের যে সম্পর্ক তা আইজ্যাক অ্যাসিমভের ‘ফল্ট-ইন্টলারেন্ট’ নামে একটি ক্ষুদ্র গল্পের উপর খানিকটা আধারিত। মানুষের প্রযুক্তিশাসিত ভবিষ্যতের উপর কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে, আদৌ থাকবে কি-না সেই শঙ্কা থেকেও গল্পটি লেখা। আর প্রযুক্তির যে চরিত্রটি এই গল্পে আছে, সেই চরিত্রটিও আমার পছন্দের নয়।}

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close