Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অন্যলোকের স্বর > কার্ল পেরিন >> কল্পবিজ্ঞান >>> অনুবাদ :  মাইনুল ইসলাম মানিক

অন্যলোকের স্বর > কার্ল পেরিন >> কল্পবিজ্ঞান >>> অনুবাদ :  মাইনুল ইসলাম মানিক

প্রকাশঃ June 26, 2017

অন্যলোকের স্বর > কার্ল পেরিন >> কল্পবিজ্ঞান >>> অনুবাদ :  মাইনুল ইসলাম মানিক
0
0

অন্যলোকের স্বর
মুহিতকে জিজ্ঞেস  করলাম, “আমাকে এসব করতে বলছো কেন?”

“কারণ আমি দেখেছিলাম স্বর্ণার শেষকৃত্যে তুমি কতোটা অঝোর ধারায় কেঁদেছিলে।”

এটা সত্য। স্বর্ণার মৃত্যুতে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। সে ছিলো ছাব্বিশে পা রাখা এক মোহনীয় তরুণী এবং প্রতিশ্রুতিশীল। ইংরেজি বিষয়ে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে একটি মাল্টিলেভেল কোম্পানিতে যোগদান করা স্বর্ণার প্রেমে পড়ে যেতো যে কেউ,  প্রথম দেখাতেই। আমরা কখনো পরস্পরের প্রেমে পড়িনি, কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন এক অসংজ্ঞায়িত সম্পর্ক ছিলো যা নিতান্তই অনুভবের বিষয়। এ সম্পর্ক প্রেম বা বন্ধুত্বের ঊর্ধ্বে কিংবা তার চাইতেও বেশি কিছু। আমরা দু’জন আমার সহকর্মী রাশেদ ও তার বান্ধুবী তিথীর সাথে প্রায়ই ক্যাফে কর্ণারে দেখা করতাম, আমাদের তুমুল আড্ডা হতো, হই হুল্লোড়, তর্কে কেটে যেতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্বর্ণা কবিতা ভালোবাসতো ভীষণ। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ আর ফ্রস্ট ছিলো খুব পছন্দের। কবিতার প্রসঙ্গ এলেই আমরা তার মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে উঠতাম। একটার পর একটা কবিতা মুখ উপচে পড়তো তার, আর আমরা এক ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তাম।  সেই দিনগুলো আমার মনে পড়ে খুব। শেষ পর্যন্ত রাশেদ ও তিথীর সম্পর্কের জল নদী গড়িয়ে সাগরে যায়। কিন্তু সকল জলই সমুদ্রে গড়ালে প্রবাহমানতা হারায়। রাশেদ ও তিথী ধীরে ধীরে  সম্পর্কের ঘূর্ণাবর্তে পরস্পরের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, মনের চেয়ে শরীরের টানই মুখ্য হয়ে ওঠে ওদের। মাত্র ছ’মাস যেতে না যেতেই ওরা সম্পর্কের টানপোড়েন অনুভব করে। এরপর একদিন ওদের সম্পর্কটা ছিন্ন হয়ে যায়। সম্পর্ক ছিন্ন হবার পর থেকেই তারা একজন অপরের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।
আমি মুহিতের দিকে মুখ তুলে তাকালাম এবং বললাম, “তুমি যা বলছো সেটি অসম্ভব মনে হচ্ছে ।” মুহিত ছিলো স্বর্ণার আরেক বন্ধু। তার কম্পিউটার তৈরির একটি কোম্পানি ছিলো। কম্পিউটারগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কাজ করতে পারতো। মুহিত আমাকে বললো, “এখন তুমি যা করতে পারো সেটি সত্যিই অত্যন্ত বিস্ময়কর হবে। স্বর্ণাকে  আমাদের মাঝে ফিরে পাওয়ার মতো ব্যাপার হবে সেটা ।”
দুই মাস আগে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া স্বর্ণার মৃত্যুর বিষয়টি আবার মনে পড়লো।  সে অফিস সেরে বাসায় ফিরছিলো। পথিমধ্যে ট্রাফিক সিগনালের রেডলাইটে তার গাড়িটি আটকা পড়ে যায়। হঠাৎ এক মদ্যপ ড্রাইভার রেডলাইটের মধ্য দিয়ে উল্টো দিক হতে ছুটে আসে এবং স্বর্ণার গাড়ির একপাশ গুঁড়িয়ে দেয়।
মুহিতের ধারণাটা আমার কাছে অদ্ভূত মনে হলো। আমি ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের কথা অথবা ‘দ্য মাঙ্কিজ পাও’ গল্পে ঘরে জবুথবু থাকা সব জিনিসপত্রের কথা ভাবলাম। মুহিতের অভিপ্রায় আমাকে বিচলিত করে তুললো, কিন্তু একই সময়ে আমি এক ধরনের নিষিদ্ধ কৌতূহলও অনুভব করলাম। দু’দিন পর আমি মুহিতের দোকানে গেলাম।  দোকানের নাম ছিলো ডিজিটাল ইওরস। স্বর্ণার কাছ থেকে বছরের পর বছর ধরে পাওয়া সব টেক্সট-বার্তা তাকে ডাউনলোড করতে দিলাম। ডাউনলোডকৃত টেক্সট বার্তাগুলো যে প্রক্রিয়ায় কাজ করবে সেটি সে আমাকে ব্যাখ্যা করলো। মুহিত স্বর্ণার  সব বন্ধুর কাছে গিয়েছে এবং বন্ধুদের কাছে স্বর্ণার পাঠানো টেক্সট বার্তা ও ছবিগুলো সে সংগ্রহ করেছে। তারপর সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হতে আরো অনেক ডকুমেন্টস সংগ্রহ করে। সেগুলো থেকে মুহিত স্বর্ণার বলা কথাবার্তার উপর একটা ডাটাবেজ তৈরি করলো। এই ডাটাবেজের উপর ভিত্তি করে সে এমন একটি স্নায়বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে যা কিনা স্বর সনাক্তকরণ করতে পারবে। স্নায়বিক নেটওয়ার্কটি  যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করতে সক্ষম। নেটওয়ার্কটি একবার অনলাইনে সক্রিয় করা হলে এটি লোকজনের আলাপচারিতা  নিয়েও কাজ করতে পারবে। যে কেউ এই স্নায়বিক নেটওয়ার্কের সামনে কিছু বললে সেসব কথাবার্তাও এই নেটওয়ার্কটি পূনরাবৃত্ত করতে সক্ষম। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর মুহিত যন্ত্রসৃষ্ট একটি বিশেষ  স্বর তৈরি করে ফেললো,  যেটি স্বর্ণার প্রকৃত কণ্ঠস্বরের কাছাকাছি স্বর হয়ে উঠতে পেরেছে।  যন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট এই স্বরটি স্বর্ণার স্বরের এতটাই কাছাকাছি হয়ে উঠলো যে, সত্যিকারের স্বর্ণাই বুঝি কারো সাথে কথা বলছে।
মুহিতের এসব কাণ্ডকারখানা দেখে এক অজানা আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করে। মুহিতের এইসব কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজের কথা ভাবলে আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। আমি আসলে এসব নিয়ে ভাবতে চাইছি না। বাসায় ফিরে পরের দুটো মাস খুব শঙ্কা নিয়ে কাটিয়ে দিলাম। আমি স্বর্ণার কথা  না ভেবে থাকতে চাইলাম, কিন্তু কোনোভাবেই সেটি পারলাম না। মানুষের ভাবনা-দুর্ভাবনাগুলো পোষা বিড়ালের মতো। দূরে কোথাও রেখে এলেও ফিরে আসে চুপিচুপি। জ্বালাতন করতে থাকে অবিরত। আমি যতো বেশি ভাবনা হতে দূরে থাকতে চাই, ততোই ভাবনার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাই। ভাবতে থাকি। দুর্ঘটনার আগ মুহূর্তে ফোনে ঘণ্টা দুয়েক আমাদের আলাপ হয়েছিলো সেদিনের ছোটখাটো ব্যাপারগুলো নিয়ে। সে সম্ভবত সারাদিনের সবগুলো ঘটনা জমা করে রাখতো আমার জন্যে। সেগুলো এক নিশ্বাসে বলেই তারপর থামতো। আমরা প্রায় প্রতি শুক্রবারই ক্যাফে কর্ণারে যেতাম এবং সেটা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত থাকতাম।
আড্ডা শেষে প্রায়ই বাসায় ফেরা হতো না আমার। থেকে যেতাম স্বর্ণার বাসায়। মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম সোফায়।
আমি বান্ধুবীদের ব্যাপারে প্রায়ই স্বর্ণার  পরামর্শ চাইতাম। সে শান্তস্বরে সবসময় একইরকম ভাবনা প্রকাশ করতো। তার মনে হতো, এরা আমার জন্যে যথোপযুক্ত নয়। আমি নিজেও তাদের কারো সাথেই দীর্ঘকালীন সম্পর্ক বজায় রাখতে পারিনি। কেন পারিনি আমি এর পেছনের কারণটা এখন জানি। আমি এদের সবাইকে স্বর্ণার সাথে তুলনা করতাম এবং তাদের মধ্যে অনেক কিছুর অভাব দেখতে পেতাম।
স্বর্ণার সাথে যখনই দেখা হতো, আমরা পরস্পরকে চুমু খেতাম, নিতান্তই সহোদরসুলভ চুমু। এক সন্ধ্যায় আমি কোনো এক বন্ধুর প্ররোচনায় মদ্যপান করি। আমার মনে হতে থাকে পৃথিবীটা এতোদিনে সত্যিই ঘুরছে। পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীরে ধীরে আরো বাড়তে থাকে। আমি স্বর্ণার কাছে ছুটে যাই। আমি তখন তীব্র নেশার ঘোরে। তাকে চুমু দেয়ার সময় শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। তৎক্ষণাৎ শরীরে একটা শিহরণ খেলে যায়। আমি আরও কিছুটা বন্য হয়ে উঠি। কিছু সময় পরে সম্বিৎ ফিরে এলে তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করি I প্রত্যুত্তরে সে শুধু বলে, “ঠিক আছে, মাহিন। আমি কিছু মনে করিনি।”
আমি  রাশেদ ও তিথীর ব্যাপারেও ভাবতাম, ভাবতাম যৌনতায় গড়ানোর পর তাদের সম্পর্ক কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেলো। আমি স্বর্ণার সাথে আমার বন্ধুত্ব হারানোর ব্যাপারে ঝুঁকি নিতে চাইতাম না। সুতরাং সেই অসংলগ্ন  মুহূর্ত থেকে আমি তাকে কখনোই এমনভাবে স্পর্শ করতে চেষ্টা করিনি যেভাবে কোনো ভাই তার বোনকে স্পর্শ করে না। ওই দিনের বাজে ঘটনাটির পর আমি সব বন্ধুকে এড়িয়ে চলতে শুরু করি, এমনকি স্বর্ণাকেও। শুক্রবার রাতে ক্যাফে কর্ণারে যাওয়ার পরিবর্তে আমি বাসায়ই থাকতাম এবং টেলিভিশন দেখতাম।

স্বর্ণাকে নিয়ে মুহিতের প্রজেক্টের কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। কিছুদিন পর এক বন্ধুর সাথে আলাপচারিতায় স্বর্ণার প্রসঙ্গ উঠে আসে। তার কাছ থেকে জানতে পারি মুহিত প্রজেক্টটি সমাপ্ত করেছে। এটি ইন্টারনেটে রিমেম্বারস্বর্ণা.কম নামে খোলা হয়েছে। এটা করতে মুহিতের মাসখানেক সময় লেগেছিলো কিংবা তার কাছাকাছি। বন্ধুটি আমাকে জানায়, “মুহিত অনেকটা এরকমই বলেছে। তোমার কাছে বোধ হবে,  জীবন্ত স্বর্ণাই কথা বলছে তোমার সাথে।”

আমি স্বর্ণাকে এভাবে অনুভব করতে চাই কি না, সে ব্যাপারে সন্ধিহান ছিলাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটি, যার সাথে ছাদে বসে জ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয়ে অসংখ্য রাত কাটিয়েছি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে একসাথে ছুঁয়ে দিয়েছি বৃষ্টি; আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর আবার তাকে দেখতে চাওয়ার, তার কণ্ঠস্বর শুনতে চাওয়ার ব্যাপারটি কেমন হবে! আবার যখন কম্পিউটারটি বন্ধ করবো, তাকে আরেকবার হারানোর মতো সীমাহীন বেদনা কি আমাকে গ্রাস করবে না? এভাবেই কেটে গেলো আরও কয়েকটা দিন। নিজের উপর  নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে একদিন রিমেম্বারস্বর্ণা.কম ঠিকানায় লগ ইন করলাম। স্বর্ণার সপ্রাণ প্রতিরূপ ভেসে এলো কম্পিউটারের স্ক্রিনে। আমি বিহ্বল হয়ে পড়লাম। তার কণ্ঠস্বর শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারবো কি পারবো না এই শঙ্কায় আমি প্রায় লগ আউট করে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। তখনই সে হঠাৎ বলতে শুরু করে। আমি একটা টেক্সট বার্তা দেখতে পাই, তার শব্দগুলো ভেসে আসছিলো স্বর্ণার কণ্ঠস্বর থেকে। এই টেক্সট বার্তাটি সে তার বোন নাহিদাকে লিখেছিলো। স্বর্ণা সেই বিশেষ বার্তায় তার বোনকে বলছিলো, “আপু, আমি মাহিনকে খুব কাছের প্রিয় মানুষ হিসেবে তীব্রভাবে অনুভব করি। সে যে আমার কতোটা কাছের,  সেটুকু বোঝাবার ভাষাজ্ঞান আমার নেই। আমি আমার অবশিষ্ট জীবনের সবটুকু তার সাথে কাটিয়ে দিতে চাই। এর মানে হলো, আমার ইচ্ছে আমরা দুজনে ঘর বাঁধি। কিন্তু সে বোধ হয় আমার সাথে ঘর বাঁধতে আগ্রহী নয়। এটা ভাবতে আমার খুব খারাপ লাগছে।”
কথাগুলো শুনেই আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। অবিরাম আমার মাথা ঘুরতে থাকলো। মনে হলো শরীর বুঝি বিবশ হয়ে যাচ্ছে। হাজার রকমের ভাবনা ঘুরপাক খেতে থাকে আমার মনে। যদি স্বর্ণার সাথে বিয়ে হতো আমার, হয়তো সেদিন যে স্থানে তার গাড়িটা ট্রাফিক সিগনালে আটকা পড়েছিলো, তাকে সেখানে থাকতে হতো না। আমার প্রিয় বন্ধুটি বেঁচে থাকতো। এসব ভাবতে ভাবতে নিজেকে ভীষণ বোকা আর অপরাধী মনে হতে থাকে। আমি আর কিছু শুনতে চাইলাম না। কম্পিউটারটা বন্ধ করে দিয়ে বিমুঢ় হয়ে বসে রইলাম…।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close