Home ছোটগল্প অর্ক চট্টোপাধ্যায় > অনির্দেশ পাখি >> ছোটগল্প

অর্ক চট্টোপাধ্যায় > অনির্দেশ পাখি >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ December 20, 2017

অর্ক চট্টোপাধ্যায় > অনির্দেশ পাখি >> ছোটগল্প
0
0

অর্ক চট্টোপাধ্যায় >> অনির্দেশ পাখি >> ছোটগল্প

 

সেদিন, বিকেল যখন একটু একটু করে সন্ধ্যের দিকে সরে চলেছে, পার্কের কোণের বেঞ্চে পড়ন্ত আলো পোহাচ্ছে তিনজন বৃদ্ধা। চোখ তাদের অনেক অনেক বছরের পার। মধ্যিখানের মাঠে নাতি-নাতনীরা খেলা করছে। তিনজোড়া চোখ কখনো ক্রিকেট বল, ব্যাটের জোর পেলেই উড়ে যাচ্ছে দূরে, কখনো আবার ফুটবল, পায়ে পায়ে ঘুরে নিচ্ছে নতুন পুরনো পাড়া। আর উড়ে যাচ্ছে পাখিরা। প্রতিটা আলোর ছটার বাঁকবদল, ছায়াদের ভাব সম্প্রসারণ আর সন্ধ্যের দিকে ঐ অনিবার্য ঢলে পড়া দেখতে দেখতে সামনের একেকটা গাছ থেকে তীরবেগে বিভিন্ন দিকে উড়ে যাচ্ছে পাখির দল। কখন কি নকশায় উড়ে যাবে, ছেড়ে যাবে, কেউ জানে না, জানবে না কোনোদিন। গাছগুলোর দিকে বল চলে গেলে বাচ্চাদের কাছে পেয়ে পাখিরা তৎক্ষণাৎ উড়ে যাচ্ছে নতুন ঝাঁক বেঁধে, নতুন জ্যামিতির ছকে। প্রথম বৃদ্ধা প্রথম কথা বলে উঠলেন। প্রথম বলবেন বলেই তো তিনি প্রথম! এরপর যিনি বলবেন, তিনি দ্বিতীয়, আর তারপর সরল অনুমানে তৃতীয়। এই সহজ ব্যতিক্রমহীন পরম্পরায় কথা বলে যাবেন তিনজন, যতক্ষণ না পার্কের পশ্চিমপ্রান্ত ছাড়িয়ে শেষ আলো বাইরের বসতির দিকে চলে যাচ্ছে।
– তোমাদের ঐ গানটা মনে পড়ে, “উড় জায়েগা হংস অকেলা, জগদর্শন কা মেলা, জগদর্শন কা মেলা।”
– শোনা শোনা লাগে তাও মনে ঠিক পড়ে না।
– তা আর মনে পড়বে না? বেশ মনে পড়ে, সেই কোন যুগের রেডিওতে শুনেছি।
– কথা অল্প, অনেকক্ষণের বিস্তার। কুমার গান্ধর্ব। আহা গলাখানা!
– আমার কর্তার সাথে আমার আলাপ তো গানের মজলিশে। তখন কতো গান শুনেছি। আমাদের পুরনো বাড়িতে জলসা বসতো না! সেইখানে। প্রথম প্রেমপত্রেও একটা গান লিখে পাঠিয়েছিল, চেনা চেনা লাগে, তাও ঠিক মনে পড়ে না।
– তা তুমি এখানে একলা হাঁস কোথায় পেলে? এতো সব জুড়ে থাকা পাখি, উড়ে যায়, জগৎ দর্শনও হয়ত করে, তবে একা নয়, একা নয়।
– সেটাই তো ভাবছি। একা ওড়ে না, কাউকে না কাউকে সঙ্গে নিয়ে ওড়ে। অথচ কাকে নিয়ে কতজন উড়বে, আর গাছের অন্ধকারে কতজনকে ছেড়ে যাবে কিছুতেই জানা যায় না।
– তা তোমার বাপু অত জানার শখই বা কেন? আজকাল কুঁজো হয়েছি, কোমর ভারী হয়েছে আগের থেকে। তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারি না আর। আগে গাছের পাশ দিয়ে জোরে পা চালিয়ে গেলেই পড়ি কি মরি করে উড়ে যেত পাখির দল। সে কি কলরব!
– কলকাকলি বলো! ওদের ওড়ার স্পিড কিন্তু কমেনা। দশবছর আগে যা ছিল, এখনো তাই।
– কারণ দশবছর আগে এই গাছটায় অন্য পাখি থাকতো। ওরা বুড়ো হয়নি, শুধু বদলে গেছে।
– আর আমরা? আমরাও কি শুধু বুড়ি হয়েছি? বদলাইনি?
– বদলই বটে। মৃত্যুও তো একটা বদলই, তাই না? সেদিন হাসপাতালে ওরা যখন ফাঁকা খাটটা বার করে আনল ICU থেকে, যে খাটে আমার মেয়ে ছিল। খাটটা বদলে গেল, তাই না?
– হাসপাতাল থাক। আমরা বরং হাঁস আর পাতাল নিয়ে কথা বলি।
– হ্যাঁ। “উড় জায়েগা হংস অকেলা।” মেনে নিলেই তো হয়, নাকি। আমার পাঁচ বছরের নাতনীটাও কি আর তার সময় পর্যন্ত থাকল, বলো না? উড়ে গেলো। অসময় কি আর তাতে সময় হল?
– আহা থাক ওকথা!
– কথা তো থাকার জন্যেই। মানুষ চলে গেলেও তার কথা আর তাকে নিয়ে আমাদের কথা তো চলতেই থাকে। ঐ পাখি ওড়ার মত। পুরনো সন্ধ্যে, নতুন সন্ধ্যে, পুরনো পাখি, নতুন পাখি, পুরনো কথা, পুরনো হতে হতে আরও পুরনো কথা। এই যে আমার বর, দুবছর ধরে বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে রইলো। কি করলাম না বলো? যদি একদিন চোখের পাতার মতই ঠোঁটদুটো একটু নড়ে। নড়ল? শেষ নিঃশ্বাসটাও নিথর মুখ দিয়েই বেরল। ঠোঁটজোড়া জমে বরফ।
– আমার নাতনীটা আজ থাকলে এইখানেই খেলত তোমাদের নাতি-নাতনীদের সাথে। আগেকার সেই বিকেলগুলোর মতো। “আর কি কখনো কবে এমন সন্ধ্যা হবে?”
– হবে না। পাখি উড়বে বটে কিন্তু আমার মেয়ে আর রেগেমেগে এসে বলবে না, “মা, কতবার বলেছি, ঘড়ি পর না কেন? ছেলের হোম টাস্ক আছে না, খালি খেললে হবে?” হোম টাস্ক…সব টাস্ক শেষ করে আমার মেয়ে এখন বাড়ি চলে গেছে।
এইখানে বিরতি। পরিণতি নয়, বিরতি। শেষ আলো এখন পার্কের পশ্চিমপ্রান্তের পাঁচিল পেরিয়ে বাইরের বসতির দিকে চলে গেছে। তিন বৃদ্ধার কথা শুনে মনে হচ্ছিল পরচর্চা কথাটা নেহাতই অর্থহীন। তার সাথে পরনিন্দা কথাটাই বা কেন জোড়া হয় কে জানে? কথা বলা মানেই তো পরচর্চা। বিশেষত সেই সব অপরাপরদের নিয়ে যারা কথোপকথনের সময় উপস্থিত নেই। কথোপকথন মানেই প্ল্যানচেট। প্রশ্ন হল সেই প্ল্যানচেটের ভূতেরা যারা কথা বলছে শুধু তাদের মধ্যে তখন উপস্থিত নেই নাকি পৃথিবীতে কখনোই উপস্থিত নেই। তখন-কখনো আর কথক-পৃথিবী, এইটুকু তো ফারাক। তার বাইরে সবাই ভূত। যখন-তখন। যেখানে-সেখানে। এই আমাদের কথাই ধরুন না। এই বেঞ্চে এসে বসতাম মাঝে মাঝে ছেলেটার খেলা দেখতে। যখন সে ছক্কা মেরে পাখি উড়িয়ে দিত সামনের গাছ থেকে, তখন মনে হত হোম টাস্ক নয় নাই বা করল। বেঞ্চের কাঠের ভেতর আমার নিতম্বের যে স্পর্শখানা লেগে আছে, তার ভেতর থেকে এখন ছেলেকে বড় হতে দেখি। খাটটা বদলেছিল, আমি তো আর বদলাইনি। এরপর আমি, আমার বয়স এখন আর পাঁচ নয় মোটেই। মরে গিয়ে হঠাৎ তেড়েফুঁড়ে বড় হয়ে গেলাম। একদিন বিকেলবেলা খেলার পর চুপটি করে বসে আছি ঘাসের ওপর। কুবকুবো পাখিটা এসে আমার কাঁধে বসলো। প্রথমে ভয় পেয়ে গেছিলাম, অবাক তো বটেই। তাও বসে রইলো। কলকল করল না। নিথর হয়ে মিনিটখানেক কাঁধের স্পর্শ নিয়ে উড়ে গেল দূরে। ঐ স্পর্শের জোরে আমি এখন গাছে বসে আমার বন্ধুদের দেখতে পাই, ঠাকুমাকেও। সবশেষে আমি। আমার ঠোঁটের বরফ গ্লোবাল ওয়ারমিংয়ে গলে গেছে। মরে গিয়ে দিব্বি কথা ফুটেছে মুখে। নাতনী যখন পার্কের মাঠে ফুটবল খেলত আমি মাঝে মাঝে এই গাছের নীচটায় দাঁড়িয়ে ওপরের ছায়াচ্ছন্ন বাসাগুলোকে ঠাহর করার চেষ্টা করতাম। সেই দৃষ্টির জোরে ঐ বাসার ভেতর থেকে এখন নাতনীর খেলাধুলো দেখি আর গিন্নির মধুর বিলাপ। কিন্তু এখন দিনকালে বদল লেগে গেছে। আমাদের ছেলে, নাতনী আর বৌয়েরা এখন আর এখানে আসে কই? আর আমরাও বেঞ্চি, পাখি আর বাসার শরীরে আটক। বাইরে বেরতে পারি না। তাই খুব ইচ্ছে হলে এই আজকের মত পুরনো দিনের ম্যাজিক আলো নিয়ে আসি ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। পুরনো অ্যানালগ ফোটোগ্রাফে আটকে থাকা হলুদ আলোতে ভরিয়ে দিই বিকেল থেকে সন্ধ্যের দিকে সরতে থাকা পার্কটাকে। তখন সেই প্রাগাধুনিক আলোর ভেতর ওরা আমাদের আর আমরা ওদের দেখতে পাই, পায়। আমরা একে অপরের কাছে অনুপস্থিত থাকি, তাও চোখ চলে যায় অনেক অনেক দিনের পার। এই ম্যাজিক চলতে থাকে যতক্ষণ না ঐ ধার করে আনা দিনান্তের আলো পার্কের পশ্চিমপ্রান্ত ছাড়িয়ে বাইরের বসতির দিকে চলে যাচ্ছে। সেখানেও ম্যাজিক চাই তো। সেখানেও তো সন্ধ্যে নামে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close