Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অর্ক চট্টোপাধ্যায় > কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে একটি দিন > ছোটগল্প

অর্ক চট্টোপাধ্যায় > কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে একটি দিন > ছোটগল্প

প্রকাশঃ June 20, 2017

অর্ক চট্টোপাধ্যায় > কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে একটি দিন > ছোটগল্প
0
2

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে একটি দিন

স্টুটোয়ো। জার্মান শব্দ। তিনটে সিলেবল। প্রথম সিলেবলের ‘স’ এর উচ্চারণ তালব্য-শ এর মতো। একই জায়গার আরেকটা নামও রয়েছে। একই শব্দের ভিন্নরূপ। যেন একটা নামে পোষায়নি। দ্বিতীয় নামটা ‘স্টুটহফ’। পলাশের এই প্রথম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প দেখার অভিজ্ঞতা। তাও আবার একা। পোল্যান্ডের গদাইনস্ক শহরে এসেছিলো একটি সম্মেলনে। শহর থেকে ঘন্টা দুয়েক দূরে স্টুটোয়োর ক্যাম্প। ভাবলো জার্মানি যখন যাবে তখন যাবে, আপাতত এ সুযোগ হাতছাড়া হতে দেওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না। যাকে বলে ডিজাস্টার ট্যুরিজম। এইসব জায়গায় যাওয়ার কথা ভাবলে একটু শিহরণ তো জাগেই। খানিক মরাল ডিলেমাও হয়। এইরকম জায়গা দেখতে যাওয়ার মধ্যে কি কোন মর্ষকাম নেই? হয়তো আছে। কিন্তু লোকে যায় বলেই তো ক্যাম্পটাকে মিউজিয়াম করে দেওয়া হয়েছে। এরকম করে ভাবাও হয়তো সম্ভব যে এসব জায়গায় যাবার মাধ্যমে মানুষ ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকে। মানুষজাতি যা যা ঘটিয়েছে তার ব্যপারে চোখ কান খোলা রাখা যায়। পরিস্থিতির যে বিশাল কিছু উন্নতি হয়েছে তা তো আর বলা যায়না। বিশ্ব বলে আর কিছু নেই বলে বিশ্বযুদ্ধ আর হয়না। কিন্তু তাতে আর কি এলো গেলো? দিব্যি যুদ্ধ হয়ে চলেছে একের পর এক। সন্ত্রাসের নামে। শান্তির নামে। পলাশকে যখন তার বাস স্টুটোয়োতে নামিয়ে দিলো তখন দুপুর ১২টা। ঝলমলে দিনের সিংভাগটাই রয়েছে ঘুরে দেখার জন্য। ক্যাম্পের আশেপাশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘরবাড়ি চোখে পড়লেও টাউন এখান থেকে বেশ অনেকটা দূর। বাস থেকে নেমে অধুনা-মডেলায়িত ট্রেনলাইন বরাবর হেঁটে পলাশ মিউজিয়ামের গেটের দিকে এগিয়ে গেলো। পিঠে ব্যাগ আর গলায় ঝোলানো ক্যামেরা।

 

লাগেজ রুমে ব্যাগ রেখে একটা বড়সড় মাঠের মধ্য দিয়ে পলাশ প্রথম যে ঘরটায় ঢুকলো সেখানে ঘরের মাঝখান বরাবর বিশাল একটা স্তূপ। কাছ থেকে বেশ কিছুক্ষণ দেখে বুঝলো শতসহস্র জুতোর স্তূপ। এই ক্যাম্পে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের জুতো। কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা ইতিহাসে এখনো পাল পাল মাছির ভিড়। যেন এখনো তারা শুকিয়ে আসা রক্তের গন্ধ পাচ্ছে। কাঁচ পেরিয়ে ওপাশে না যেতে পেরে এপাশেই ভনভন করছে। জুতোর পাহাড় দেখে পলাশের কিরকম গা গুলিয়ে উঠলো। তাড়াতাড়ি ঘরটা থেকে বেরিয়ে বাইরে রোদের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালো। আজ তার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হচ্ছে।  বামপন্থীদের বহুদিনের সাম্রাজ্য আগেই ভেঙে পড়েছে দুর্নীতি আর অপশাসনে। গত চার বছর ধরেই ‘পরিবর্তন’-এর সরকার। এবারও হয়তো পরিবর্তন অপরিবর্তিত থাকবে। চার বছরে কি আদৌ কিছু বদলেছে? আগামী চার বছরেও কি আর বিশেষ কিছু বদলাবে? খালি জুতোর পাহাড় বাড়বে। এটা বুঝে গেছে পলাশ। তাই স্টুটোয়োর ক্যাম্প দেখতে আসার দিন ইলেকশান হওয়ার এই সমাপতন তাকে বেশ আমোদ দিয়েছে।

 

এসব সাত-পাঁচ ভেবে আবার মিউজিয়ামে গিয়ে ঢুকলো পলাশ। সিনেমা হলে বসে মিনিট ২০-র একটা ভিডিও দেখলো এই ‘ডেথ ক্যাম্প’ সম্পর্কে। তারপর একে একে কমান্ডারের ভিলা আর বাঙ্কার পেরিয়ে ক্যাম্প-কিচেন। বন্দীদের শোবার ঘর, বাথরুম ছাড়িয়ে মেডিকাল রুম যেখানে এক ইনজেকশনে সকল যন্ত্রণার অবসান হতো। ক্যাম্পের যে দরজার নাম ‘ডেথ গেট’ তার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো পলাশ। মৃত্যুর একেকটা বিমূর্ত দরজা তো সবার জীবনেই থাকে যার মধ্যে দিয়ে সে প্রবেশ করে কিন্তু সেই দরজার এই মূর্ত দৃশ্যমানতা আর কজনই বা প্রতক্ষ করতে পারে। দরজা পেরিয়ে পলাশ পৌঁছল গ্যাস চেম্বারে। ক্যাম্পের এই জায়গাটার কথা সে সম্ভবত সবার আগে শুনেছে। ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ের একটা পাতা যেন জেগে উঠছে তার চোখের সামনে। গ্যাস চেম্বারের দরজায় রাখা ফুলের তোড়াগুলো স্মৃতি-বিস্মৃতির খেলায় মত্ত। স্মরণের ফুল জায়গাটার ভয়াবহতাকে বিস্মরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না কি? চেম্বার পেরিয়ে ক্রিমেটরি এবং গ্যালোজ। গোপনে হত্যা করার স্থান ছিল এই গ্যালোজ। ত্রিকোণ ফাঁসির কাঠে এখন শুধু হাওয়া ঝুলে রয়েছে। সে হাওয়ায় কেমন মরচে ধরার গন্ধ। পলাশ লক্ষ করলো বিরাট একটা কিউমুলো নিম্বাস ঢেকে দিয়েছে দুপুরের সূর্যকে। নিস্পন্দ ওয়াগনের সারি পিছনে ফেলে একটা ইউ টার্ন নিয়ে বেরিয়ে এলো পলাশ। পাশের রাস্তা বরাবর হেঁটে এগোতে লাগলো বিরাট মাঠের দিকে যেটাকে ম্যাপে ‘হলোকস্টাল সাইট’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন তা একেবারেই ধূ ধূ প্রান্তর। কাঁটাতারে ঘেরা। বাইরে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পলাশ। একা। আশেপাশে আর কোন জনমানুষ চোখে পড়ছে না। পায়ে চলা পথ একটু একটু করে একটা হাল্কা জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেছে।

 

পলাশ ভাবলো একটু হেঁটে ঢোকাই যাক না জঙ্গলে। খানিক এগোলে কাঁটাতারের এপাশে কয়েকটা বাড়ি চোখে পড়ছে। তার মানে ক্যাম্পের পেছনের দিকে জনবসতি আছে! হয়তো এই মিউজিয়ামের কর্মচারীদের থাকার জায়গা। পলাশ কিছুটা এগোতেই একটা কোর্টইয়ার্ড দেখতে পেলো। সেখানে বছর চারেকের ফুটফুটে মেয়ে তার মার সঙ্গে খেলছে। একটা হাওয়া ভরা প্লাস্টিকের নীল বল মেয়েটির মা ওপরদিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর বলটা নেমে আসার সময় হলেই মেয়েটি দুহাত বাড়িয়ে সেটা ধরার চেষ্টা করছে। বলের ওঠানামায় অনেকটা সময় লোফালুফি খেলছে। একবার ওপরে উঠছে, আবার নিচে নেমে যাচ্ছে। নিচে নেমে এসে যেন ওপরে ওঠাটাকেই বাতিল করে দিচ্ছে। আবার ওপরে উঠতে না উঠতেই নিচে নামার কথা ভুলে যেতে চাইছে। তাও ওপরে উঠতে হচ্ছে। তাও নিচে নামতে হচ্ছে। ঐ বলের ভেতর যে হাওয়া ভরা রয়েছে তা গ্যাস চেম্বারের গ্যাসের থেকে কত আলাদা! বলের ওঠানামায় ক্যাম্পের ইতিহাস একটু হলেও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। পলাশের চোখও নীল ওঠানামা ফলো  করে চলেছে। একবার ওপরে উঠছে, আবার  নিচে নেমে আসছে। সময়ের শীর্ষবিন্দু থেকে অধোবিন্দু পর্যন্ত সক্রিয় ঐ অভিকর্ষময় গতি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গভীরতা মেপে নিচ্ছে।

 

এরপর বৃষ্টি নেমে যাবে। মা মেয়ে উঠোন ছেড়ে ঘরের ভেতর ঢুকে যাবে। পলাশও ছাতা খুলে ফেরার পথ ধরবে। বিকেল চারটের সময় তার বাস। মেয়েটা হয়তো তার নীল বল নিতে ভুলে যাবে। কোর্টইয়ার্ডের ঠিক মধ্যিখানে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকবে সেটা। বৃষ্টির জল এসে নীল রং ধুয়ে দেবে হয়তো। হয়তো জলের একটা ফোঁটা ঢুকে পড়বে বলের ভেতরকার হওয়ার মধ্যে। ঠিক যেমন করে ইনজেকশন থেকে একফোঁটা বিষ ঢুকে পড়তো ক্যাম্পবন্দীদের রক্তের ভেতর। হয়তো এমনটা হবে। হয়তো এমনটা হবে না। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে পরিবর্তন ততক্ষণে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(2)

  1. বাহ! বেশ সুন্দর গদ্য তো! লেখকের জন্য শুভ কামনা। শুভেচ্ছা তীরন্দাজকে।

  2. গল্পটি রিপোর্টাজ ও স্মরণিকার সমন্বয়। উল্লেখযোগ্য, কথোপকথন নেই। তার জায়গা নিয়েছে লেখকের কথন। অবক্ষয় ও ধ্বংসের দুই ভৌগোলিক সমানুপতন কাহিনীর বার্তাটিকে স্পষ্টতর করে তুলেছে। লেখকের দৃষ্টিটি আমার মনে হয়েছে গল্পকারের চেয়ে বেশি একজন কবির। ভাল লাগল, বিষয়টি বেদনাও জাগাল অনিবার্যভাবে। এটাকে আমি আদর করে গল্পবীজ বলতে পারি কি ?

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close