Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আত্মস্মৃতি অর্ধচেনা গৃহের ডাহুক > আত্মস্মৃতি >> রাসেল রায়হান

অর্ধচেনা গৃহের ডাহুক > আত্মস্মৃতি >> রাসেল রায়হান

প্রকাশঃ June 20, 2017

অর্ধচেনা গৃহের ডাহুক > আত্মস্মৃতি >> রাসেল রায়হান
0
0

আত্মস্মৃতি > অর্ধচেনা গৃহের ডাহুক >> রাসেল রায়হান

অনেকদিন বাদে পাবলিক লাইব্রেরিতে ঢুকলাম। একজন আসার কথা ছিল, রাস্তায় জ্যামে আটকে আছে, ভাবলাম লাইব্রেরি থেকে ঘুরে আসি। বহুদিন যাই না। প্রথম যখন ঢাকায় আসি, লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ে থাকতাম প্রায়ই। ক্লাস সিক্স থেকে আমার সকাল-সন্ধ্যা টানা লাইব্রেরিতে বসে থাকার রেকর্ড আছে। দিনের পর দিন স্কুল পালিয়ে গিয়ে বসে থাকতাম। আর এইট থেকে তো চাকরির কল্যাণে টানা আড়াই বছর লাইব্রেরিতেই কাটিয়েছি। ক্লাস এইটে থাকতে একটা বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরিতে পিয়ন হিসেবে ঢুকেছিলাম। ম্যাকফারসন পাবলিক লাইব্রেরি। আড়াই শ টাকা বেতন। আমার স্কুল ছুটি হয়ে যায় চারটায়, পাঁচটা থেকে আটটা পর্যন্ত লাইব্রেরি। বের হতে হতে নটা-সাড়ে নটা বাজে প্রায়ই। পৌনে পাঁচটা থেকে গিয়ে বসে থাকতে হতো আমায়। দোতলায় লাইব্রেরি, নিচতলায় সূর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক। লাইব্রেরিয়ান আসা পর্যন্ত ওখানে বসে থাকি। বসে বসে মায়াবী আপাদের দেখি। বড় বড় পেট নিয়ে পরামর্শ নিতে আসা গর্ভবতী মহিলাদের দেখি। নীরবে নীরবে প্রেমে পড়ে নীরবে নীরবে ব্যর্থ হওয়া আমার অজস্র নারীদের একজন ছিলেন সূর্যের হাসির এক স্বাস্থ্য আপা। দোতলায় ওঠার আগ পর্যন্ত টিভি দেখার ভান করে বসে বসে ক্লিনিকের সেই আপাকে দেখতাম। তার শ্যামলা মুখের এক টুকরো হাসি দেখার জন্য বুকটা আকুপাকু করত। কখনো যদি ‘কেমন আছ রাসেল’ বলে একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, সারারাত ক্লাসের পড়া হতো না।

লাইব্রেরিয়ান, যিনি একটা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার, বড় মামার বন্ধু, ভারি গোঁফে তা দিতে দিতে রোজ একটা নতুন চকচকে ফনিক্স সাইকেলে করে চলে আসেন। কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায়। এসেই এনার্জি গ্রুপের লোগোঅলা রিংয়ে ঝোলানো একগোছা চাবি ধরিয়ে দেন। বড় লোহার গেট খুলে সাইকেলটা ভেতরে ঢুকিয়ে লোহার গেটের সঙ্গে লকতালা মারি আমি। তারপর দোতলায় গিয়ে লাইব্রেরি খুলি। একবার তালা মারতে ভুলে গিয়েছিলাম। রাতে সাইকেল খুলে নামাতে গিয়ে দেখি তালাই মারিনি। ভাগ্যিস চুরি হয়নি। তারচেয়েও বড় ভাগ্যিস, স্যার খেয়াল করেননি।

লাইব্রেরি খুলে আমার প্রথম কাজ ছিল কাঠের ফ্রেমে একটা বড় পেরেক দিয়ে ফুটো করে সাত-আটটা দৈনিক পত্রিকা বেঁধে ফেলা। তারপর স্যারকে পানি খাওয়ানো। এরপর আটটা পর্যন্ত আমার কোনো কাজ নেই। বেছে বেছে গল্পের বইগুলো পড়ি। কেউ কিছু বলে না। বাধা দেওয়ার কেউ নেই। মাঝে মধ্যে লাইব্রেরিতে আসা দুয়েকজনকে বই খুঁজে দিতে হয়। মাঝেমধ্যে স্যারের বন্ধুরা এলে আলুর চপ, সবজির চপ আনান। বলে দেন, রাসেল, চপ বড় বড় দেখে আনিস। আমি বড় বিরক্ত হই। বেছে বেছে ছোট চপ নিয়ে আসি। এনে দিয়ে আবার বই পড়তে বসি। লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে আসতে আসতে যে বইটা পড়া শেষ হয় না, সেটা বাসায় নিয়ে যাই। রাতে বাসায় বসেই পড়ে ফেলি। এমনিতে টানা আড়াই বছর এর মধ্যে ভালো-মন্দ বহু বই পড়ে ফেলেছি।

ক্লাস সিক্সেই আমরা মূলত একটা জেলা শহরে থাকতে আসি। আমরা মানে আব্বা, আম্মা, আমি আর আমার ছোট দুই ভাই। এর আগে থাকতাম একটা উপজেলা শহরে। নদীর পাশ ঘেঁষে দোতলা কাঠের ঘর আমাদের। ভাড়া বাসা। স্পষ্ট মনে আছে, পাঁচশ টাকা ভাড়া ছিল। আমি আর আমার ছোট ভাই নিচলায় ঘুমাই, দোতলায় আব্বা-আম্মা। একদম ছোট ভাইটার তখন জন্ম হয়নি। শুয়ে শুয়ে নদী থেকে ভেসে আসা লঞ্চের ভোঁ শুনি আমি, ছোট ভাই ঘুমায়। নদীর পাড়ে ‘ছইলা’ গাছ ছিল। এর ফলটা হতো বড়-সড় লাটিমের মতন। দর্শনীয় ছিল ছইলা ফুল। রাতে ছিঁড়ে নিয়ে নিচের একটা অংশ ব্লেড দিয়ে সামান্য কেটে পানি ভরা থালায় দাঁড় করিয়ে রাখি। সকালে উঠে দেখি ফুলটা ফুটে ছড়িয়ে আছে। এই ফুলে পাপড়ি নেই। লাল লাল সুতার মতন, ফুলঝড়ির মতন অজ¯্র পরাগদ- ছড়িয়ে থাকত। সেগুলিকে একটানে ছিঁড়ে ফেললে ভেতরে দেখা যেত জমে আছে আধ চামচের মতন মধু। সে মধুর স্বাদ অমৃতসমান। অনেকগুলি ফুল যখন ফেটে ছড়িয়ে থাকত, অপূর্ব দেখাত। এই ফুলটা দেখি না কত বছর।

একবার এই নদীতে ডুবে মারা যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। তখন আমাদের সাথে আমার ফুপাত বোন থাকে, নূপুর আপা। শাবনূরের চেহারার সাথে তার দারুণ মিল। তখন জানা ছিল না, শাবনূরেরও সত্যিকারের নাম নূপুর। নূপুর আপা পাক্কা সাঁতারু। দল বেঁধে নদীতে গোসল করতে যায়। সপ্তাহে দুদিন হাট : শনি আর মঙ্গলবার। এই দুদিন দূরদূরান্ত থেকে নৌকায় বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে মানুষজন আসে, বিক্রির জন্য। সব নৌকা বাঁধা থাকে বাড়ির সামনের ঘাটেই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গোলের নৌকা। বিশাল বিশাল নৌকা। দোতলা ঘরের সমান উঁচু। যারা সাঁতার জানে, তারা ধুপধাপ করে উপরে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নূপুর আপা ঝাঁপাত। সাঁতার শেখার পওে আমিও অনেক লাফ দিয়ে নেমেছি। সবচে উপভোগ্য ছিল পানিতে পড়ার আগ পর্যন্ত সেকেন্ডর ভগ্নাংশ সময়টুকু। বুক-টুক খালি হয়ে যায়, ভরশূন্য লাগে।

একবার আমাকে নৌকায় বসিয়ে রেখে নূপুর আপা দলবল নিয়ে সাঁতরাতে চলে যায়। প্রত্যেকের সাথে একটা করে খালি কলস। সেই কলস উপুড় করে সাঁতরালে ক্লান্তি আসে না। যেহেতু তখনও সাঁতার জানি না, এই রহস্য জানা ছিল না। ভেবেছিলাম কিছু একটা সাথে থাকলেই মানুষ আর ডোবে না। আমি দুবার নূপুর আপাকে ডাকলাম, নূপুর আপা, আমি নামব। সে শুনতে পেল না। তখন খুঁজতে লাগলাম, ঠিক কী নিয়ে ঝাঁপানো যায়। খুঁজে দেখি একটা ছোট্ট বৈঠা রাখা আছে। ওটাকে টেনে আনলাম। তারপর সেটাকে হাতে নিয়ে দিলাম লাফ। তারপরের স্মৃতি আর মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরে আসে টের পাই, আম্মার কোলে শুয়ে আছি। আম্মা পাগলের মতো কাঁদছে। চেনাজানা সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উন্মুখ হয়ে। এক কোনায় অপরাধীর মতো মুখ কওে নূপুর আপা বসে আছে। তার সারা গা ভেজা। তার ফোলানো-ফাঁপানো চুল মাথার সঙ্গে লেপ্টে আছে, সেখান থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। কাঁদছে কিনা বোঝার উপায় ছিল না। মুখ ভেজা, সেটা চুল থেকে ঝরে পড়ছে, না চোখ থেকে, কে বুঝবে।

তার ঠিক একদিনের মধ্যে আমি সাঁতার শিখে যাই। আব্বা একজোড়া নারকেল বেঁধে আমাকে নদীতে নিয়ে গেল। পরদিন দেখি যে নদী আমায় গিলে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছিল, তার বুক চিওে সাবলীলভাবে সাঁতরাচ্ছি। ছোট একটা অ্যালুমিনিয়ামের কলস ছিল, তা নিয়ে ঐ নদী পাড়ি দিয়েছি অজ¯্রবার।

সবসময় নদীর পাড়েই পড়ে থাকতাম। ভাটার সময় অনেকদূর পর্যন্ত পানি নেমে যায়। তখন পাড় ঘেঁষে অপরিচিত জেলেরা জাল ছুড়ে মাছ ধরে। আমি তাদের পেছন পেছন থাকি। একটা কারণ ছিল অবশ্য। জাল টেনে উঠিয়ে জেলেরা জালের ভেতরের সবকিছু তীরে ছড়িয়ে দেয়। তারপর মোটামুটি বড় মাছগুলি বেছে কোমওে ঝোলানো বাঁশের ঝুড়িতে ফেলে। তখন খুঁজলে দুচারটা ছোট মাছ পাওয়া যায়। সেগুলি আমি পরনে থাকা হাফপ্যান্টের পকেটে ঢোকাই।

আর একভাবে মাছ পাওয়ার কথা মনে পড়ে। ভাটার সময় নদীর তীরে বিশাল বিশাল পুকুরের মতো কেটে রাখত অনেকে। জোয়ারে সেগুলি ভরাট হয়ে যেত। তারপর আবার ভাটিতে পানি নেমে গেলে গর্ত-অলা এসে সেই গর্ত সেচত। তখন সেখানে পাওয়া যেত অনেক মাছ। তাদেও মাছ ধরা হয়ে গেলে আমরা বাচ্চারা দল বেঁধে ওখানে নেমে যাই। অনেক মাছ পাওয়া যায়। জেলের পেছনে ঘোরার চেয়ে এটা লাভজনক।

আরও একভাবে মাছ ধরার পদ্ধতি বলি। এটা অবশ্য বাগেরহাটের একটা গ্রামের বর্ণনা। ঐ গ্রামে আমার নানীর বাড়ি ছিল। নানা ওখানে শিক্ষকতা করতে গিয়ে নানীকে পছন্দ করে। নানী তখন ক্লাস ফাইভে পড়তেন। আমার নানী অসম্ভব জ্ঞানী মহিলা ছিলেন। আমার শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে তার সাথে। তিনি আমায় সুকুমার রায়ের ছড়া শোনাতেন। জানি না কোত্থেকে সুকুমার পড়েছিলেন। তার নিজস্ব একটা ট্র্যাংক ছিল। সেই ট্র্যাংকের চাবি সবসমং তার কোমরে ঝোলানো থাকে। সেই ট্র্যাংকে তার সমস্ত পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে মুড়ি, বিস্কুট, চালভাজা, গুড়ো দুধ, কলা, আর দুয়েকটা ধর্মীয় বই। আর পৃথিবী খোলার একমাত্র চাবিটি তিনি কখনো হাতছাড়া করতেন না। আমার সমস্ত শৈশব দখল করা নানীর গল্প আলাদা কখনো করব।

আমার নানা নানীর বাড়ি কিছু জমি রেখেছিলেন। ধান কাটার সময়ে, সম্ভবত হেমন্তকাল, ঠিক মনে নেই, যদ্দুর মনে পড়ে শীত লাগত, সেই সময়ে নানীর সঙ্গে যাই। নানার জমি গ্রামের এক পরিবারের কাছে দেওয়া। তারাই চাষবাস করে। ধান কাটার পর একটা অংশ নানীকে দেয়। তাই দিয়ে নানীদের চলে যায়। নানা বেঁচে নেই। আমায় নিয়ে নানী চলে যেতেন গ্রামে। আসার সময় ট্রলার ভরে ধান নিয়ে আসতাম। সে আরেক অভিজ্ঞতা। ভোরবেলা ট্রলাওে উঠলে সন্ধ্যায় এসে গ্রামে পৌঁছতাম। নানীর বাড়ি আমার বন্ধু রনি আর হাসিব। রনি নানীর ভাইপোর ছেলে, আর হাসিবের ভাইয়ের সাথে আমার এক খালাতো বোনের বিয়ে হয়েছে। রনির মতো অশ্লীল আর পাকা ছেলে আমি এই জন্মে আর দেখিনি। জগতের সমস্ত যৌনতার জ্ঞান তার ছিল। তার কল্যাণে অজস্র ভুলভাল যৌনতার জ্ঞান নিয়ে আমি ঘুরেছি বহুদিন। ধানকাটার পরের সময়টাতে একটা অদ্ভুত উপায়ে সে টাকা আয় করত। সেই টাকা রাখার পদ্ধতি ছিল আরও অদ্ভুত। ঘরের চালার ফাঁকে টাকা রেখে দিত, একদম বাইরে, খোলা জায়গায়, কেউ ধারণাই করত না। শুধু আমায় দেখিয়েছিল। আর রাখত জামার হাতায়। হাতায় যে দুই ভাঁজ করা কাপড়টা সেলাই করে দেওয়া হয় তার একটা অংশ সে ব্লেড দিয়ে কাটত, তারপর পাজামার ফিতা ঢুকানোর মতো মুড়িয়ে মুড়িয়ে টাকা রেখে দিত। রনি ছিল আমার প্রাণের বন্ধু। তার টাকা আয়ের পদ্ধতিটা বলি। ধানা কাটা হয়ে গেয়ে সে একটা বস্তা আর কোদাল নিয়ে ক্ষেতে চলে যেত। একটু খুঁজলেই বের করে ফেলা যায় অসংখ্য ইঁদুরের গর্ত। রনি কোদাল দিয়ে সেগুলি খুড়ত। খুঁড়লেই বের হয়ে আসে রাশি রাশি ধানের ছড়া। থরে থরে সাজানো। সম্ভবত ইঁদুরেরা সারা বছরের খোরাকির জন্য জমায়। ইঁদুরের সেই খোরাকি বস্তা ভরে নিয়ে গিয়ে রনি বেচে দেয়। তা দিয়ে জিলিপি খায়। শহরে এসে রসময় গুপ্তের চটি বই কিনে নিয়ে যায়। আমি গেলে সেই বই আমায় পড়তে দেয়। সে ভালো রিডিং পড়তে পারে না। আমি পড়লে সেটা শুনে সে আরাম পায়।

এসবের পরেও তার কাছে ভালো টাকা থেকে যায়। সেগুলি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখে। টের পেলে তার মা, আমার দুঃসম্পর্কের মামী, টাকাগুলো নিয়ে যায় বলে এসব পদ্ধতি আবিষ্কার তার।

মাছ ধরায় আসি। মাছ ধরতাম আমি আর হাসিব। নোনা পানির ছোট্ট নদী। পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেক ম্যানগ্রোভ গাছ। ভাটার সময়ে পানি নেমে অনেক দূর চলে যায়। তখন তীরের কাদামাটিতে দেখা যায় হাজার হাজার গর্ত। গর্তগুলো একটা আঙুল ঢোকানো যায়, এই সাইজের। এক একটা গর্তের মধ্যে থাকে জীবন্ত ‘ডগরা’ মাছ। আমরা বলতাম দগরি। গর্তের দুপাশে হাত ভওে চাড় দিলেই এক একটা মাছ উঠে আসে। আমি আর হাসিব একটা পাতিল নিয়ে যেতাম। পানিতে অর্ধেক ভরে সেটা সাথে রাখতাম। এক একটা মাছ ধরেই পাতিলে ছেড়ে দিতাম। একসমং ক্লান্ত হয়ে গেলে দুজনে নদীতে নেমে যেতাম। ইচ্ছেমতন ডুবানোর পড় দেখা যেত থুতনি আর নাকের নিচে গোঁফ-দাড়ির মতো কাদার রেখা। সেই গোঁফ-দাঁড়ি মুছতাম না। বড় ভালো লাগত আমাদের। মনে হতো বড় হয়ে গেছি। বাড়িতে আসার আগে দুজনে মাছ সমান ভাগ করতাম। বাড়তি থাকলে সেটাকে নদীতে ছুড়ে দিতাম।

নদী একবার আমায় তার ভেতরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। অসফল হওয়ার পর প্রতিশোধস্বরূপ সে নিজে আমার মধ্যে চলে আসে। রক্তে মিশে যায়। আমাদের নিজেদের বড় নৌকা ছিল। একটা না, একাধিক—একটা ডুবলে আরেকটা। খুব বড়ো, ঢাউস, কালো নৌকা। এই বড় দাঁড়! সেই নৌকায় আব্বা প্রতি সপ্তাহে কয়েকটি হাটে মুদি জিনিস নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন। যেদিন যেইখানে হাটের দিন, সেদিন সেখানে যেতেন। যেভাবে অন্যরা নৌকা নিয়ে আমাদের ওখানে আসত। বছরে একবার হালখাতা হয় । তখন এলাহী ব্যাপার ঘটে। মাইক ভাড়া করে হিন্দি গান বাজাতে বাজাতে আব্বা নৌকায় যান হাটে হাটে। ছোট্ট ক্যাসেটে গান বাজে। ক্যাসেটের ঠিক সামনে থাকে মাইক্রোফোন। কোনো স্কুল-কলেজের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ঘাট থেকে চিৎকার আসে, এইখানে স্কুল। পোলাপান পরীক্ষা দেয়। মাইক বন্ধ করো। মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হালখাতায় আমিও মাঝে মাঝে গেছি আব্বার সাথে। চমৎকার সব স্মৃতি। …মাইকে গান বাজছে, আমি তাকিয়ে আছি দূরে ক্রমশ গতিশীল গ্রামের দিকে। কোথাও খোলা মাঠে তালগাছের সারি। সেইসব গাছে বসে আছে ঝাঁক ঝাঁক শকুন। কয়েকটা দূর থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে উড়াল দিচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি। পাশ দিয়ে হয়তো অন্য আরেকটা নৌকা গান বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে অন্য কোনো হাটে। আব্বা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কোন হাটে যাও? তারা বলে, শাপা হাটে। ছোট্ট কৌতুহলী চোখ তাকিয়ে থাকত সেই নৌকায়। সেখানেও অন্য কোনো বালক বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছি… কখনো মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আমি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পাঠ করছি, ‘ফাল্গুনে শুরু হয় গুনগুনানি/ ভোমরাটা গান গায় ঘুমভাঙানি/ একঝাঁক পাখি এসে…’, কিংবা ‘তারা একটি দুটি তিনটি করে এলো/ তখন বৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া বইছে এলোমেলো…।’

সে এক শৈশব ছিল। শৈব মানেই মামাবাড়ি। শৈশব মানেই শালিক আর ডাহুক ধরা। শৈশব মানেই… লক্ষ লক্ষ জিনিস বলা যাবে। ডাহুক ধরার স্পষ্ট একটি স্মৃতি বলি…

হালকা সবুজ ঝোপ। কিছুক্ষণ আগে ‘জোবা’র পানি নেমে গেছে। সব ঝকঝকে, তকতকে। উজ্জ্বল একটা আভা চারদিকে। সেই আভা ভেদ করে ‘কুয়োক কুয়োক’ করে ভেসে আসছে পরিচিত পাখির ডাক। ডাহুকের বাচ্চা। সম্ভবত ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে আছে। নখের ডগা থেকে ঠোঁটের ডগা পর্যন্ত মিশমিশে কালো হয় ডাহুকের বাচ্চাগুলি। মা ডাহুকটা আছে কি না, কে জানে! অবশ্য ডাহুকেরা পাতিকাকগুলোর মতো বজ্জাত না, নিরাপদ পাখি, ঠোকরায়-টোকরায় না। আব্বা একবার বলেছিলেন, ডাহুকেরা রাতভর ডাকতে ডাকতে গলায় রক্ত তুলে ফেলে। সেই রক্ত ডিমে মাখালে ডিম থেকে ছানা বেরোয়। কালো মিশমিশে সেসব ছানাও বড় হয়ে রাতভর ডাকে। এবার ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা শেষ করে নানাবাড়ি আসার সময়েই প্রতিজ্ঞা করে এসেছি, একটা ডাহুক জোগাড় করে নিয়ে পুষব। যখন বড় হয়ে ডিম পাড়বে, আর সারারাত ডেকে ডেকে গলায় রক্ত তুলে ফেলবে, সেই রক্ত আমি সুন্দর করে ডিমে মাখিয়ে দেবো। ডাহুকদের যেহেতু হাত পা নেই, ডিমে ঠিকমতো মাখাতে পারে না বলেই বাচ্চাগুলো অমন কালো হয়। নইলে টুকটুকে লাল হতো। আমি মূলত একটা লাল ডাহুক পুষতে চাই।

পরনের লাল ইংলিশ প্যান্টটা খুলে ন্যাংটো হয়ে গেলাম। পানি নেমে যাওয়ার সময় ঝোপের গোড়ায় কিছু কাদার আস্তরণ রেখে গেছে। প্যান্টে লাগার সমূহ সম্ভাবনা। দুইটা মাত্র প্যান্ট আমার। একটার আবার জিপার নষ্ট. সেফটিপিন দিয়ে আটকে রাখি। সেটা পরা একটু রিস্কি। অনেক সময় সেফটিপিনের পিন খুলে সেটা যথেষ্ট অনিরাপদ হয়ে ওঠে। যেহেতু তাদের মগজ নেই, তাই তারা বোঝেও না, ঠিক কোথায় বিঁধতে হবে। দুপুরবেলা সেফটিপিনঅলা প্যান্টটা ভিজিয়েছি। এখন এটায় কাদা লাগলে সবার সামনে ন্যাংটো হয়ে ঘুরতে হবে। তারচে এই নির্জন পূর্ববিকেলে এখানে ন্যাংটো হওয়া ভালো। প্যান্টটা একটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে বিসমিল্লাহ বলে মাথা ঢুকিয়ে দিলাম ঝোপে। হুড়হুড় করে ছড়িয়েছিটিয়ে গেল সাট-আটটা ডাহুকের বাচ্চা। একটিকে ধরতে পারলাম খপ করে। আরগুলো লাফ দিয়ে পাশের ভরাট ডোবায় পড়ে ডুব দিলো। হাতের বাচ্চাটা ঠোঁট বাঁকিয়ে ঠোকরাতে চাইল, সুবিধে করতে পারেনি।

একহাতে বিশেষ কায়দায় ধরে রেখে প্যান্ট পরতে পরতে খেয়াল করিনি, হাতের চাপে বাচ্চাটা মরে গেছে। আমার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম এটাকে পুষব। আবার নতুন একটা ধরতে হবে। কাল আসব ভেবে মন খারাপ করে হাঁটতে থাকি।

সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারিনি আমি।

নানাবাড়ি ছিল নদী ভাঙন এলাকা। একসময় ছোট লঞ্চ থেকে নেমে নানাবাড়ি যেতে অনেক সময় লাগত। সেটা আস্তে আস্তে কমে যেতে লাগল। নদী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল। এখন সে বাড়ির চিহ্নও নেই। সব নদী গর্ভে। মাঝে মাঝে স্বপ্নে সেই ডাহুকগুলোকে দেখি। ঘুম ভেড়ে তাদের জন্য মন পোড়ে আমার। কোথায় আছে সেই ঝোপ? কই থাকে তারা। নাকি অন্য কোনো নদীর পাড়ে, অন্য কোনো ঝোপে বাসা বেঁধেছে তারা? অন্য কোনো বালক কি ইংলিশ প্যান্ট খুলে এখনো তাদের ধরার জন্য ছুটে যায়? তারা কি আবার চেনা সেই বাড়িতে ফিরে আসে। নাকি অর্ধচেনা কোনো জায়গায় আবার ঘর বানায়?

আমিও তো ঘর বানিয়ে বসে আছি অর্ধচেনা একটা শহরে। আমার দিকেও তো মাঝেমধ্যে ধেয়ে আসে অচেনা হাত। আমিও লুকাই…

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close