Home চলচ্চিত্র অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক আজগর ফারাদি-র সাক্ষাৎকার > মাসুদুজ্জামান অনূদিত

অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক আজগর ফারাদি-র সাক্ষাৎকার > মাসুদুজ্জামান অনূদিত

প্রকাশঃ March 4, 2017

অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত  ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক আজগর ফারাদি-র সাক্ষাৎকার > মাসুদুজ্জামান অনূদিত
0
0

“আমি কোনো সমাপ্তিতে বিশ্বাস করি না” – আজগর ফারাদি

 

২০১৭ সালে বিদেশী ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের (Best Foreign Language Film) পুরস্কার পেল ইরানি চলচ্চিত্রকার আজগর ফারাদির The Salesman। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৭টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন – যে দেশগুলির একটি ইরান – এর প্রতিবাদে অস্কার পুরস্কার নিতে তিনি আমেরিকা যাননি। তাঁর হয়ে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন ইরানীয়-মার্কিন নারী-ব্যবসায়ী আনুশেহ আনসারী। ইরানের প্রচলিত ধর্মীয় পোশাক পরিধান না করে তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। ফারাদি যে একই সঙ্গে ধর্মান্ধতা আর মুসলিম বিদ্বেষ- দুইয়েরই বিরোধী- এ থেকে সেই ধারণাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইরানি চলচ্চিত্র, বলা বাহুল্য, ব্যতিক্রমী আর উল্লেখযোগ্য নির্মাণ হিসেব গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বচলচ্চিত্র দর্শক ও বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। আব্বাস কিয়ারোস্তামি (সম্প্রতি প্রয়াত), তাহমিনা মিলানি, জাফর পানাহি, সামিরা মাখমালবাফ, লায়লা হাতামি, মজিদ মজিদি – প্রমুখ ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক আজ বিশ্বখ্যাত। ইরানি চলচ্চিত্রকে তারা শুধু বিশ্বমানে উত্তীর্ণ করেছেন তাই নয়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও যে শিল্পোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়, স্থাপন করে চলেছেন সেই দৃষ্টান্ত। ২০১৭ সালের একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ বিদেশী চলচ্চিত্রের নির্মাতা ৪৪ বছর বয়সী আজগর ফারাদি এরকমই একজন প্রতিভাবান পরিচালক। শুধু এবছর নয়, ২০১২ সালে তার নির্মিত ‘আ সেপারেশন’ চলচ্চিত্রটিও এই একই পুরস্কার পেয়েছিল। বোঝা যায়, কত বড় মাপের একজন পরিচালক তিনি। ফেলিনি, ডি সিকা, বার্গমানের মতো তিনিও অর্জন করেছেন বিশ্বখ্যাতি। সমকালের উল্লেখযোগ্য ইরানি চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে কিয়ারোস্তামির পরেই সমীহের সঙ্গে উচ্চারিত হয় তাঁর নাম। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর নির্মিতিতেও খুঁজে পাওয়া যাবে অভিনবত্ব আর অনন্যতার স্বাক্ষর, যা তাঁর নিজস্ব নন্দনশৈলীরই অপূর্ব প্রকাশ বলা যায়। কিন্তু কোন অর্থে তাঁর চলচ্চিত্রগুলি অনন্য? এই প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যাবে নিচের সাক্ষাৎকারটিতে।

A Separation চলচ্চিত্রটি পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি নির্মাণ করেন The Past (২০১৩) শীর্ষক মুভি। মুভিটা মুক্তি পাওয়ার পর সেই সময়ে অনলাইন পত্রিকা Hazlitt–এর কালুম মার্শকে যে সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন, তাতেই তাঁর চলচ্চিত্র নন্দনভাবনার কথা বেশ ভালোভাবেই ব্যক্ত করেছেন। তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি এখানে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো। – অনুবাদক

 

প্রশ্ন : আপনি আপনার ছবিতে গ্লাস বা কাচের মোটিভ ব্যবহার করেন। এই মোটিভ সম্পর্কে কিছু বলেন।

ফারাদি : এই মোটিভের ব্যবহার শুরু হয়েছিল আমার প্রথম মুভি ‘ফায়ারওয়ার্কস ওয়েডনেজডে’র মাধ্যমে। ওই ছবিতে এমন একটা চরিত্র আছে, যে রাতে একটা জানালা বন্ধ করতে গিয়ে ভেঙে ফেলে। ধীরে ধীরে কাচের এই মোটিভ আমার পরবর্তী ছবিগুলোতে প্রাধান্য পেতে থাকে। আমার মুভিতে কাচের মোটিভ মূলত দুইটা ভূমিকা পালন করে : একটা হল, নির্দিষ্ট একটা চরিত্র এবং ক্যামেরার মাঝে কোনো কাচ বা জানালা স্থাপন করে চরিত্রটাকে ঝাপসা করে দেয়া হয় আর পরিবেশটাকে করে তোলা হয় রহস্যপূর্ণ। এই ধরনের দৃশ্যের মাধ্যমে এমন একটা ইম্প্রেশন মধ্যে তৈরি করা হয়েছে যে ওই চরিত্রটাকে আপনি ঠিক ঠিক বুঝে উঠতে পারবেন না। আমার ‘আ সেপারেশন’ মুভিতে এই মোটিভটাকে আমি আরও গভীরভাবে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেছি। চরিত্রগুলোকে ঘিরেই মোটিভটি আবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু অতীতে আমি একে যেভাবে ব্যবহার করেছি ‘দ্য পাস্ট’ মুভিতে সেইভাবে ব্যবহার করিনি। এখানে আপনি মোটিভটার ভিন্ন ব্যবহার পাবেন। লক্ষ্য করে দেখেছেন নিশ্চয়ই, যখন একটা কাচ চরিত্রগুলির মাঝখানে চলে আসছে, তখন ওই চরিত্রগুলির একজন আরেকজনকে চিনতে পারছে না। এরপর আবার যখন চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনো কাচ থাকছে না, তখনও আমরা অনুভব করতে পারি, ওই কাচই যেন চরিত্রগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। একটি চরিত্র আরেকটি চরিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন, কাচ আমার মুভির একটা গুরুত্বপূর্ণ মোটিভ।

আপনার সব মুভিতে জীবন কোনো-না-কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আকস্মিক ঘটনার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়। ছবি নির্মাণের এই পর্যায়ে গল্পগুলি  আবেগের ও নৈতিকতার পরিবর্তনকে ধরার জন্যে বদলে যেতে থাকে। যেমন ধরেন ‘অ্যাবাউট এলি’ ছবির কথা। ছবিটাতে একদল বন্ধু ছুটি কাটাচ্ছে। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ একজন উধাও হয়ে গেল। ‘আ সেপারেশন’ ছবিতেও দেখি, একজন মানুষ তার বৃদ্ধ বাবার দেখ-ভাল করার জন্যে সংগ্রাম করছে। এরপরই দেখছি লোকটা অ্যাকসিডেন্ট করছে, নতুন পরিস্থিতিতে তাকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। কিন্তু ‘দ্য পাস্ট’ ছবিতে এই ঘটনা আগেই ঘটে গেছে, তারপর শুরু হচ্ছে মুভির চলমান গল্প।

উত্তর : ‘দ্য পাস্ট’ ছবির সঙ্গে অন্য মুভিগুলোর পার্থক্য এইখানেই। আমার আগের ছবিগুলোতে আপনি যখন মুভিটা দেখছেন তখনই ঘটনা ঘটেছে। ‘অ্যাবাউট এলি’ ছবিতেও একটা মেয়ে আমাদের চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যায়। ‘আ সেপারেশন’ ছবিতেও, আমাদের চোখের সামনে একজন স্বামী আর স্ত্রীর সেপারেশন হয়ে গেছে। দুই ক্ষেত্রেই আমরা ঘটনা ঘটার মুহূর্তে এর অভিঘাত ও প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে থাকি। কিন্তু ‘দ্য পাস্ট’ ছবিতে মূল ঘটনাগুলি আগেই ঘটে যায়, চার বছর আগে। আমরা শুধু ওই ঘটনার ফলোআপটুকু দেখতে থাকি। এই ছবির সঙ্গে অন্য ছবিগুলির এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পার্থক্য- সময়ের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে। আর এটাই, সম্ভবত এই ছবির রিদম্, যা অন্যগুলির তুলনায় আলাদা। উদাহরণ দিয়ে বলি, ‘দ্য পাস্ট’ আর ‘আ সেপারেশন’- দুটো ছবিতেই কমন কিছু দৃশ্য আছে- বিচারলয়ের দৃশ্য। আ সেপারেশনে বিচারের দৃশ্যগুলি বেশ দ্রুত ঘটছে, ঘটছে সঙ্গে সঙ্গে, কারণ তখনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সেপারেশন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ‘দ্য পাস্টে’ ছবিটা যখন দেখছি, তার আগেই তাদের বিচ্ছিন্নতা ঘটে গেছে। ফলে, বিচারালয়ের দৃশ্যগুলির সময়টা শুধু নিয়মরক্ষার কাজ করেছে- দম্পতির দুটি চরিত্র শুধু কাগজে স্বাক্ষর করে সেপারেট হয়ে যাচ্ছে। ফলে, এই দৃশ্যটি ঘটেছে ধীর গতিতে। তারপরও এই দৃশ্যের আড়ালে আগুন জ্বলছিল।

আরেকটি মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, আমার মনে হয়, এ হচ্ছে এমন একধরনের গল্প যা কিনা নতুন কোনো ঘটনার দ্বারা গতি পায় না, গতি পায় কিছু তথ্য জানানোর মধ্য দিয়ে। মূল ফোকাসটা কেন্দ্রীভূত থাকে বর্তমান নয়, অতীত ঘটনা উন্মোচনের মধ্যে।

আপনি ঠিকই বলেছেন। আমার অন্য ছবিতে একটাই ঘটনা, এরপর যা কিছু ঘটে তা ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ঘটতে থাকে। কিন্তু এই ছবিতে ঘটনা ঘটে তথ্যকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ঘটনাগুলি থাকে ধুলার আবরণে ঢাকা, চরিত্রগুলির কাজ হচ্ছে ঝাঁট দিয়ে ওই ধুলাবালি সরিয়ে ফেলা। প্রত্নতত্ত্ববিদরা যেমন করেন, অব্যাহতভাবে খনন আর পুরাকীর্তির উপর থেকে ধুলা সরিয়ে নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলেন। একারণেই দর্শকদেরকে ধীরে ধীরে তথ্যগুলি জানানো হয়।

আপনার মুভিতে এমন অনেক কিছু থাকে যেগুলির কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এসব নিয়ে কোনো কথাও শোনা যায় না। যেমন ধরেন এই ছবির প্রথম স্বামীর কথা আমরা জানতে পারি না। অথবা আমাদের এটাও কখনও বলা হয় না, কেন মূল চরিত্রগুলি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। এই তথ্যগুলির কতটা আপনি অনুক্ত রাখবেন, গল্পটা লেখার সময়ে কী সেটা ভেবেছিলেন? আপনি কি জানতেন কতটা আপনি দর্শকদের সঙ্গে শেয়ার করবেন বা জানাবেন আর কতটা জানাবেন না?

অনেক সময় আমি জানতাম, সহজেই বুঝতে পারতাম- এই তথ্যটা শেয়ার করা যাবে না। অন্য অনেক সময়ে অবশ্য বুঝতে পারতাম না কোনটা শেয়ার করা যায়। আমার কথা হল, কেন আমাকে সবকিছু প্রকাশ করতে হবে? আমি মনে করি, সম্ভবত, প্রথম স্বামীর কথা বলে ফেলার চাইতে, দর্শকরাই তো কী ঘটেছিল গল্পের- সেই দিকটা নিজেরাই পূরণ করে নিতে পারেন। এটাই ভালো পদ্ধতি বলে আমি মনে করি। এই ছবিতে যদি প্রথম স্বামীটি সম্পর্কে কিছু বলে ফেলতাম, তাহলে দর্শকদের কল্পনাকে পূর্ণ করে ফেলা হতো। কিন্তু তার সম্পর্কে কিছুই না জানানোর ফলে, দর্শকদের কল্পনা গল্পটাকে সম্পূর্ণতা দিতে পেরেছে। তারাই গল্পটা তৈরি করে নিয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, আহমেদ তার স্ত্রীকে চার বছর আগে ছেড়ে গেছে। কেন ছেড়ে গেছে আমি তার একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারতাম, কিন্তু আমি সেটা চাইনি। কারণ একটাই, আমি চাইনা যে একজন কোনো দর্শকের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটা শেষ হয়ে যাক। আমি চেয়েছি দর্শকেরা মুভিটাকে তাদের মনের মধ্যে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাক, কিছু প্রশ্ন তাদের মনের মধ্যে আবর্তিত হোক- কেন সে ছেড়ে গেল? আমি মনে করি, কিছু না বলে আমি অনেক কথাই বলেছি মুভিটাতে। বলেছি পরোক্ষভাবে। যেমন ধরেন, আমরা জানি না কেন আহমেদ চার বছর আগে চলে গিয়েছিল, কিন্তু ঘটনা হল- সে যখন বাড়িতে ফিরে আসে, তখন সে সামাজিকভাবে যা কিছু দরকার, ঠিকঠাক করতে চায়, তার সম্পর্কে এইটুকুই বলা হয়েছে। আমরা কল্পনা করতে পারি, এটা হল সেইরকম একটা চরিত্র যে সব সময় সামাজিক প্রয়োজনে সবকিছু সুশৃঙ্ক্ষলভাবে করতে চায়, কিন্তু এসব সে করে কিছুটা নিষ্ক্রিয়ভাবে আর বুঝে ফেলে যে সে কিছুই করতে পারছে না। এটা হচ্ছে প্রকাশের এমন একটা ধরন যেখানে অনেক কিছু পরোক্ষভাবে বলা হল।

আমি এও মনে করি, আপনিই দর্শকদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন যে তারাই প্রশ্ন করবে। অনেক আগে থেকেই আপনি এটা করে আসছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের সনাতন রীতিটা হল, এক-একটা চরিত্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হবে যাদের সম্পর্কে অন্য চরিত্রগুলি দর্শকদের এমন কিছু বলবে বা জানাবে যাতে সেই চরিত্রগুলি কে, কেমন, অন্য চরিত্রগুলির সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক, সবাই তা বুঝতে পারবে। কিন্তু এই চলচ্চিত্রে আপনি তেমন কিছুই করেননি। এমনকি এটাও ঠিক পরিস্কার নয় যে, ছবিটার শুরুতে আহমদ যাদের সঙ্গে দেখা করছে কীভাবে তাদের জীবনের সঙ্গে সে সম্পর্কিত। বিশেষ করে বাচ্চাদের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক সেটা পরেও আমরা বুঝতে পারি না।

আপনি যখন একটা গল্প বলবেন, তখন আপনি গল্পের ভেতরকার ড্রামাটাকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন, সে সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকতে হবে। ড্রামা বা নাটকীয়তার এটাই বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- পরের দৃশ্যে ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে দর্শকরা তা ধারণা করতে পারবেন না। আমার কাছে এটা কোনো খেলা নয়, এর দার্শনিক দিক আছে। আর এটা আসলে জীবনের কথা, বাস্তব জীবনেই তো আমরা বুঝতে পারি না এখন যা ঘটছে ঠিক একটু পরে কী ঘটবে। জীবন একারণেই এত আকর্ষক। যেমন ধরেন, অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, কীভাবে আমার দেশের মানুষজন জীবনযাপন করে। কেন আমি সেখানে থাকতে চাই অথবা ফিরে যাই। আমি তাদের একটা কথাই বলি, ওই জীবনটা আমার কাছে খুবই আকর্ষক মনে হয়, বিশেষ করে আকর্ষক লাগে এই কারণে যে ঠিক এর পর কী ঘটবে আমি কখনও তা অনুমান করতে পারি না। সুইজারল্যান্ডে আপনি পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করে সুন্দরভাবে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু আমি কখনও সুইজারল্যান্ডে বাস করতে চাইবো না। কেননা, যদি আমি বুঝে ফেলি পরবর্তী পাঁচ বছর পর কী ঘটবে, তাহলে আমার তো কিছুই করার থাকবে না। আমি সেটা করতে আগ্রহী নই। আমার গল্পগুলিও এরকমই। আমি দর্শকদের বলতে চাই না যে, যে-গল্পটা তারা দেখছে একমিনিট পর সেই গল্পে কী ঘটবে।

‘আ সেপারেশন’ চলচ্চিত্রে, দর্শকদেরকে সহানুভূতি নাদির চরিত্রের প্রতি ঝুকে পড়ুক, আপনি সেটা চেয়েছেন। কিন্তু যতই সময় যেতে থাকে চলচ্চিত্রটিতে তার নৈতিকতার দিকটি জটিল করে দিয়ে তার প্রতি দর্শকদের সহানুভূতিকে অনিশ্চিত করে তুললেন। এই ছবির প্রধান চরিত্রটিই মনে হয় সরাসরি সহানুভূতি পেয়ে গেছে। আসলে এই চরিত্রটাকেই মনে হয় ছবির মধ্যে সুদৃঢ় একটা অবস্থান করে নিয়েছে আর সেই সবচেয়ে সুস্থিত। নৈতিকভাবে সে জটিল কোনো চরিত্র নয়।

প্রথম দর্শনে তা-ই মনে হবে : চলচ্চিত্রটাতে আহমাদ সবচেয়ে শান্ত এবং স্থিতিশীল একটা চরিত্র। কিন্তু এই ছবির একটা চরিত্র কখনও মনে করে না যে আহমদ সেই রকম একজন মানুষ। সেই চরিত্রটি হচ্ছে মেরি। মেরি মনে করে তার জীবনের যত সমস্যা, সে-সব সমস্যার সূত্রপাত ঘটেছে আহমাদ তাকে ছেড়ে যাবার পর। মেরি আহমদকে এটাও বলেছে যে, আহমদের এমন ভালোমানুষি ভাব দেখে তার গা গুলিয়ে যায়, অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমরা যদি উপর থেকে এই চরিত্রগুলিকে দেখি, হ্যাঁ, আহমদকে দয়ালু, মধুর মানুষ বলেই মনে হবে। শিশুদের সঙ্গে তার আচার-আচরণ তো খুবই ভালো। কিন্তু আমরা যদি গল্পের গভীরে যাই, তাহলে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না যে পরে যা কিছু ঘটছে তার জন্য আহমদই দায়ী। আহমদ এই চলচ্চিত্রে গোয়েন্দার মতো, যে কিনা একটা গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজছে। সে চাইছে, কে সবকিছুর জন্য দায়ী, কেউ একজন সেই রহস্য উন্মোচন করুক। কিন্তু ছবির শেষদিকে আহমদ বুঝতে পারে, যে-লোকটাকে সে খুঁজছে সেই লোকটা আসলে সে নিজেই। আর সম্ভবত সে যা করছে তা হল, নিজের পরিবারের এবং নারীর যে ক্ষতি সে করেছে সেটা চেপে যেতে চায়। কোনো মানুষ যদি দেখেন বেশ ভালো, বিনয়ী, তাহলে তাকে কিছুটা হলেও সন্দেহ করা যায়।

আমি মনে করি, আহমদের জীবনের সবচেয়ে মূল ঘটনাটা ঘটেছে তখনই যখন সে তার কন্যাকে তার মায়ের ব্যাপারে জড়িয়ে ফেলেছে।

হ্যাঁ, ঠিক। আহমদ মেয়েকে জোর দিয়ে বলেছে যে সে সত্যি কথাটা বলুক। আহমদ বিশ্বাস করে, সে-ই ঠিক কাজগুলি করছে। কিন্তু, কেন সে নিজেকেই বলছে না যে তারই সত্যি কথাটা বলা উচিত? আসলে মেয়েকে নির্দেশ দিয়ে সে তার মায়ের ভুলগুলি বোঝাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নিজে সত্যি কথাটা বলেনি। পুরা চলচ্চিত্রেই সে তার কৃতকর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্ত্ করে গেছে। এই চলচ্চিত্রে একটা কাজই তার সঠিক ছিল, মেয়েকে সে সত্যি কথাটা বলেছে।

কিন্তু অন্য দিক থেকে ভাবলে এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক পদক্ষেপ।

জীবনে সবসময় এরকমটাই ঘটে। সত্যি কথা বললে তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। এ জন্যেই বেশিরভাগ মানুষ মিথ্যা কথা বলে, কারণ, মিথ্যা বললে জীবনযাপন অনেক সহজ হয়ে যায়।

এই ছবি (দ্য পাস্ট) আর ‘আ সেপারেশন’ – দুটো চলচ্চিত্রই একধরনের জটিল, ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কেন আপনি দর্শকদেরকে এরকম অবস্থার মধ্যে ফেলে দেন? কেন তাদের কাছে সবকিছু পরিস্কার করে তুলে ধরেন না?

আমার কাছে এইভাবে ছবি শেষ করার অনেকগুলি যুক্তি আছে। আপনি যদি বলেন যে আপনার মুভিটা একটা বাস্তববাদী চলচ্চিত্র, অথবা ডকুমেন্টারি ধরনের, আপনাকে বাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত ও অনুগত থাকতে হবে। বাস্তব জীবনে আসলে কোনো কিছুই শেষ হয় না- কোনো গল্পের শেষ নেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলি, একজন পুরুষ ও একজন নারী যদি প্রেমে পড়ে, তাদের গল্প সেখানে শেষ হয়ে যায় না, চলতে থাকে। এমনকি তাদের বিচ্ছেদ ঘটলেও শেষ হয় না। আমি কোনো সমাপ্তিতে বিশ্বাস করি না। আমার কাছে শেষ হওয়াটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। অন্য কথাটা হলো, আমার চলচ্চিত্র শেষ হোক চাই না। আমি চাই মুভিটা শেষ হয়ে যাবার পরও দর্শকরা ছবিটাকে তাদের বাড়ি নিয়ে যাক। আমি ঠিক সেই জায়গাতেই আমার এক-একটা চলচ্চিত্র শেষ করি যেখান থেকে দর্শকদের মনে শুরু হয়ে যায় আরেকটি নতুন গল্প। যেমন ধরেন, ‘আ সেপারেশন’ চলচ্চিত্রের কথা, মুভিটা সেখানেই শেষ হচ্ছে যেখানে মেয়েটা ভাবছে সে বাবার সঙ্গে থাকবে না মায়ের সঙ্গে। আর এখান থেকেই শুরু হয়ে যায় আরেকটা নতুন গল্প। আমি আমার মুভিগুলি সেই জায়গাতেই শেষ করি যেখান থেকে শুরু হয়ে যায় আরেকটি নতুন গল্প। আমি দর্শকদের বিভ্রান্তির মধ্যে না রাখার ব্যাপারে ভীষণ সচেতন, কেননা তাহলে তারা মুভি দেখে কোনো আনন্দই পাবে না। এটা ঠিক, আমার মুভিগুলি মূলত ‘শেষ না-হওয়া’ মুভি (ওপেন এন্ডেড), কিন্তু মুভির গল্পগুলি কোন পথে এগিয়ে গিয়ে কীভাবে শেষ হবে, তার ইঙ্গিত থাকে। যেমন, ‘দ্য পাস্ট’ ছবির শেষে একটা চরিত্রের চোখ থেকে যখন অশ্রু ঝরে পড়ে, তখন বোঝা যায় গল্পটা কীভাবে শেষ হল।

কিন্তু সে-ও তো সন্দেহজনক একটা সমাপ্তি ছাড়া কিছু নয়, আমরা বুঝতে পারি না এর অর্থ কী। আপনি কি মনে করেন, ‘আ সেপারেশন’ মুভিটার কথাই ধরেন, কন্যাটি যদি বেছে নিত সে কার কাছে থাকবে – বাবা না মা – তাহলে দর্শকেরা বেশি তৃপ্তি পেত, নাকি কম?

মেয়েটিকে যদি নিশ্চিতভাবে বেছে নিতে দিতাম- সে বাবার কাছে থাকবে না মায়ের কাছে- তাহলে দর্শকেরা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি সুখী হতো, কিন্তু তারা মুভিটাকে ভুলে যেত। ঘটনা কী জানেন, এত বছর পরেও এখনও রাস্তায় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তারা আমাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী ঘটেছিল মেয়েটির জীবনে? গল্পটা যে শেষ হয়নি। দর্শকেরা এখনও মেয়েটির জীবনের পরিণাম নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমি যদি নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে মুভিটা শেষ করতাম, সেই গল্পটা তাৎক্ষণিকভাবে দর্শকদের ভালো লাগতো, কিন্তু আমি যেভাবে শেষ করেছি তাতে তারা গল্পটা সারাজীবন ধরে তাদের হৃদয়ে আর কল্পনায় নিজের নিজের মতো করে বয়ে বেড়াবে।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close