Home অনুবাদ অ্যালেন মাবানকো > দৌড়ে পালানো লোকটি >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : রায়হান আরা জামান

অ্যালেন মাবানকো > দৌড়ে পালানো লোকটি >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : রায়হান আরা জামান

প্রকাশঃ August 12, 2017

অ্যালেন মাবানকো > দৌড়ে পালানো লোকটি >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : রায়হান আরা জামান
0
0

অ্যালেন মাবানকো > দৌঁড়ে পালানো লোকটি 

[সম্পাদকীয় নোট : কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জন্ম নেওয়া মাবানকো একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক। বর্তমানে ফ্রান্সের নাগরিক মাবানকো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। তিনি লেখেন ফরাসি ভাষায় এবং তাকে আফ্রিকার বেকেট বলে উল্লেখ করা হয়। ফ্রান্সে আফ্রিকান ডায়াসপোরা ধরনের রচনার জন্য তিনি একদিকে সমাদৃত হয়ে আসছেন অন্যদিকে তার লেখাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়। এই গল্পটি এরকমই একটি ডায়াসপোরা গল্প।]

আজ সতেরো বছর পরও, যখন সেদিনের কথা ভাবি- আমি একইভাবে আতঙ্কে শিহরিত হই। দরদর করে ঘামি, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, মুখ হা হয়ে ঝুলে পড়ে; যতদ্রুত সম্ভব আমি ছুটতে থাকি যাতে আমার পা দু’টো আমাকে প্যারির মঁত পারেঁসি বেঁভ্যু স্টেশনের অনন্ত করিডোর ধরে বয়ে নিয়ে যেতে পারে। সেই স্মৃতি আজও আমাকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার মাতৃভূমি কঙ্গো-ব্রাজাভিলের পয়েন্ট-নোরিতে অবস্থিত লুকুলা নদীর জলা-জোঁকের মতো সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমার উপর চেপে আছে। আজ যখন এই লাইনগুলো লিখছি, আমার অন্তরের ভেতর লম্বা লম্বা পদক্ষেপে দৌড়ানোর তীব্র মানসিক কষ্টের হৃৎস্পন্দন অনুভব করছি। আমি বাড়িতে, এমনকি স্কুলের দৌঁড় প্রতিযোগিতায়ও এতো জোরে কখনও দৌড়া্নই। খেলাধুলা, বিশেষ করে দৌড়ের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা ধরে গেছে। ফ্রান্সের রাজধানীতে সেদিন এমন কিছু ঘটেছিলো যার ফলে খেলাধুলার প্রতি এই বিতৃষ্ণা। আজ অব্দি সেদিনের মতো আমার সঙ্গে এরকম আর কিছু ঘটেনি। কৈশোরে যদি আমি ভালো দৌড়বিদ থাকতাম, তাহলে হয়তো সেদিন মঁত পারেঁসি বেঁভ্যু স্টেশনে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো না, জিহ্বা ঝুলে পড়তো না, পেশী ছিঁড়ে যাওয়ার মতোন অবস্থা হতো না।

কিন্তু এখন নিঃশেষ হয়ে যাওয়া যৌবন নিয়ে অনুতাপ করার উপযুক্ত সময় নয়; দুর্বল পা দু’টোকে দোষারোপ করে তাদের বিরক্ত করার সময়ও নয়। আমাকে দৌড়াতে হয়েছিলো, প্রতিমূহূর্তে বিপদ নিকটবর্তী হচ্ছে- এই ভয় নিয়েই দৌড়াতে হয়েছিলো। বলা হয়, এরকম ভয়ের কোনো কারণ ঘটলে মানুষের ডানা গজায়। অতিরিক্ত কিছু গতি পাওয়ার সময় আমি আমার সহপাঠী দুম্বার কথা ভাবছিলাম; দুম্বা দৌড়ে তার ছায়াকেও হার মানাতে পারতো। দৌড়ের মাঠে সে ছিলো আমাদের সৌভাগ্যের প্রতীক। সে কীভাবে এটা পারতো? সে নিজেকে বুঝিয়েছিলো, দৌড়টা ঘটে মস্তিষ্কে, কারণ, পা মস্তিষ্কের আদেশেই চলে। সুতরাং মস্তিষ্কই দৌড়ায়, তোমাকে শুধুমাত্র রাস্তার ছবি কল্পনা করতে হবে- প্রতি পদক্ষেপে পদক্ষেপে। এ ব্যাপারে আমরা ছিলাম সংশয়বাদী, কারণ আমরা এমন কারো কথা শুনিনি যার পায়ে মস্তিষ্কে লাগানো আছে! কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলাম দুম্বাই ঠিক। দুম্বার কয়েক মিনিট পরে যখন আমরা সমাপ্তি রেখা ছুঁয়ে দিতাম, ততক্ষণে দেখেছি দুম্বার ট্রেইনার তার জুতোর ফিতে খুলে ফেলেছে। ওই ট্রেইনার লোকটা আমাদের খোঁচাতে ভালবাসতো, বলতো, ‘তোমাদের মগজটা কোথায় থাকে বলতো?’

বিকট দৈত্যের মতো জনাকীর্ণ প্যারি স্টেশনে যখন আমি দৌড়াচ্ছিলাম, ফিসফিসিয়ে নিজেকে বলেছিলাম, আমাকে আমার ছায়ার চেয়েও দ্রুতগামী হতে হবে; যেটা দুম্বা দৌড়ের সময় আমাকে বোঝাতে চাইতো। আসলে আমি তখন তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম, তার পা আর মস্তিষ্ক আমিই ব্যবহার করছিলাম। মনে হচ্ছিলো, সে আমার কানে কানে বলছে, ‘দৌড়াও! দৌড়াও! দ্রুত! আরো দ্রুত! তোমার মস্তিষ্কের রাস্তা অনুসরণ করো, পেছনে তাকিয়ো না, নতুবা তারা তোমাকে ধরে ফেলবে।’

কিন্তু কথা হচ্ছে, স্টেশনটা আমার অপরিচিত ছিলো, একেবারে গোলক ধাঁধাঁর মতো। সেই অপরিচিত স্টেশনের পথ আমি কীভাবে কল্পনা করবো যাতে পেছনে লেগে থাকা উগ্র লোকটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারি। মনের চোখে শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম খোলা পতিত জমি। তখন ফ্রান্সে থাকার বয়স সবে আমার দু’মাস হয়েছে। আমি আমার চাচাতো ভাই জোঁদজোঁর সাথে গরজেস-লে-গঁজে নামের শহরতলিতে বাস করতাম। সে আমাকে সবসময় মঁত পারেঁসি বেঁভ্যু স্টেশন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতো। বলতো, ‘ওখান থেকে তোমার মালপত্র আমাকে বাড়ি পাঠাতে হতে পারে। তোমার ঐ জায়গাটা এড়িয়ে চলা উচিত। আসলেই জায়গাটা খরগোশের গর্তেভরা ঘিঞ্জি বস্তির মতো। ওখানে পথ খুঁজে পেতে তোমাকে কোনো মানচিত্রবিদের নাতনি বা এরকম কিছু একটা হতে হবে।’

তখন অব্দি আমি প্যারিতে গিয়েছি তিন-কী চার বার। আমার মনে পড়ে, আমরা প্রায়ই চ্যাতলেত-লে-হলসের ভেতর দিয়ে যেতাম; ওখান থেকেই আমরা জোঁদজোর বাড়ি যাবার জন্য ট্রেনটা বদল করে অন্য ট্রেন ধরতাম। প্যারিতে আসার জন্যও আমরা চ্যাতলেত-লে-হলসের রাস্তাটাই ব্যবহার করতাম। তাই যাবার ঐ একটা রাস্তার কথাই আমার মাথায় আসে। একদিন আমি নিজেই ট্রেনে চড়ি, হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকায় ফোরাম-দে-হলসের শহর থেকে বাইরে যাবার রাস্তাকে চিহ্নিত করে রাখি। বিপরীত দিক থেকে আসার সময় প্রথমে পড়বে অ্যারোনডিসমেন্ত পুলিশ স্টেশন, এরপর ফ্রসেজ রেস্তোরাঁ পেরিয়ে দি ত্রাসবুর্গ অ্যাভেনিউ ধরে এগিয়ে গেলে ডানপাশে পড়বে চ্যাতিউ-দ্য-য়ু, যেখানে আফ্রিকানরা জড়ো হতো। আফ্রিকার ক্ষুদ্র সংস্করণস্বরূপ চ্যাতিউ-দ্য-য়ু ছিলো আমাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল, আমাদের রাজধানীর মতো। আমার চাচাতো ভাই যখন আমাকে চ্যাতিউ-দ্য-য়ু রুজের চোরাকারবারি থেকে রেলের টিকিট কিনতে বলেছিলো, ততোদিনে ঐ রাস্তায় আমি বেশ কয়েকবার যাতায়াত করে ফেলেছি। আমি যেখানে চুল কাটাতাম সেই `আফ্রো ২০০০’ নামের নাপিতের দোকানটাও ছিলো ঐ রাস্তার ওপর।

কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ দৌড়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই দিনে, দুর্ঘটনাক্রমে আমি অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলাম। গরজেস-লে-গজেঁ থেকে আমি কোনো টিকিট কিনিনি, কিনবই বা কেন, যেখানে এরকম একতাড়া টিকিট আমি চ্যাতিউ-দ্য-য়ুয়ের কালোবাজার থেকে পেতে যাচ্ছি। আসল টিকিটের সাথে প্রেসে-ছাপা নকল সেই টিকিটগুলোর পার্থক্য কোনো টিকিট কালেকটরও ধরতে পারতো না। যেসব লোক কখনো ঐ এলাকায় আসেনি, তাদেরকে বিশ্বাস করানো যেত যে আমরা যুদ্ধ এলাকায় বাস করি; যেখানে রাস্তার কোণে কোণে ছুরি, সাব-মেশিনগান এবং গুলি সেট করা আছে।

ট্রেনে আমি ঝিমুচ্ছিলাম, অথচ অতি সতর্ক হয়ে বসেছিলাম। প্রতিটি স্টপেজে রেলের কামরার বাইরে এসে দেখছিলাম আশেপাশে পুলিশের পোশাকে কেউ আছে কিনা? তারপর আবার নিশ্চিত হয়ে বসছিলাম। একেবারে কোণ ঘেঁষে একমাত্র আমিই ‍ছিলাম না, লক্ষ্ করেছিলাম কিছু কিছু যাত্রী লাফ দেওয়ার জন্য আমার চেয়েও বেশি উদগ্রীব হয়ে আছে। আমি ছিলাম তাদের পথপ্রদর্শক, খরগোশ বা পাহারাদার; আমি রেলের কামরা ত্যাগ করতে উদ্যোগী হওয়ামাত্র তারা আমাকে অনুসরণ করতো। কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা না করেই তাদের জন্য ওটা ছিলো আমার প্রতি তাদের নিঃশব্দ ভ্রাতৃত্ববোধের উপহার। আমি ছিলাম সব থেকে ভীতু, তাই সবার চেয়ে সতর্ক পাহারাদার। অথচ আমাকে কান ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিলো না।

চ্যাতলেত-লে-হলসে ট্রেন থামার পর আমি ৪ নম্বর লাইনে থাকা ট্রেনে চড়ার সিদ্ধান্ত নিই, যেটা কিনা পর্তি-দি-ক্লিগনাকোর্তের দিকে যাচ্ছে; সেখান থেকে চ্যাতিউ-দ্য-য়ুয়ে নেমে যাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু দুর্ঘটনাক্রমে আমি বিপরীতগামী রেলে চড়ে বসি, যেটা পর্তি-দি-অরলেঁসের দিকে যাচ্ছিলো। তাই যাত্রাপথের কোনো স্টেশনের নামই আমি চিনতে পারছিলামনা…চ্যাতলেত, সিতে, সঁন্ত-মিশেল, ওদেন…

যখন আমরা মঁত পারেঁসি বেঁভ্যু স্টেশনে পৌঁছাই মনে হলো সবাই ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছে। স্টেশনের রেললাইনের ম্যাপে একনজর চোখ বোলাতেই আমি বুঝতে পারলাম ভুল রাস্তায় এসে পড়েছি, এখন আমাকে পর্তি-দি-ক্লিগনাকোর্তে ফিরে যাওয়ার ট্রেন খুঁজে বের করতে হবে।

সেই প্রশস্ত করিডোরে আমি অন্ধের মতো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। দিকনির্দেশক চিহ্নগুলো আমাকে আরো বিভ্রান্ত করছিলো। আমি একটা দলের সঙ্গে মিশে গেলাম, অন্যদেরকে এমনভাবে অনুসরণ করছিলাম যেন আমরা সবাই একই জায়গায় যাচ্ছি। হারিয়ে গেলে কোনো দলের সাথে থাকা ভালো, তাতে মনে হবে- বিভ্রান্তিতে পড়ে আমি অন্তত একা হয়ে পড়িনি…

না, তারা আমাকে ধরতে পারেনা। আমি অবশ্যই ইঁদুরের মতো ফাঁদে পড়তে পারিনা। একসময় আমার মনে হলো আমি নরম-উষ্ণ খাটে কাঁথা মুড়ি দিয়ে মুহূর্তে ঘুমিয়ে পড়েছি। মনে হলো যেন বৃষ্টি হচ্ছে, আমার ঘরের চালে বৃষ্টি পড়ার মৃদু আরামদায়ী শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

নিশ্চয়ই আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। কেননা, এরকম বৈপিরীত্য একমাত্র স্বপ্নেই ঘটে। মধ্যরাতের রাস্তায় কুকুরের ডাকে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তুমি যে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছো, বুঝতে পেরে নির্ভার অবস্থায় রান্নাঘরে গিয়ে পানি খেয়ে কম উত্তেজনাপূর্ণ স্বপ্ন দেখার জন্য আবার তুমি বিছানায় ফিরে এলে।

কিন্তু আমি স্বপ্ন দেখছিলাম না। স্বপ্ন দেখলে হয়তো চীনের গ্রেট ওয়াল দেখতাম, না হলে আকাশ থেকে পড়তাম, নতুবা আমার সহপাঠী দুম্বার চেয়ে আরও জোরে ছুটতাম; হয়তো দুম্বার কয়েক মিনিট আগেই সমাপ্তি-রেখা ছুঁয়ে দিতাম, যখন বাঁকা হাসি হেসে কোচ আমার জুতোর ফিতে ‍খুলে দিচ্ছে।

আমি সত্যি সত্যিই প্রাণপনে দৌড়াচ্ছিলাম, এমনভাবে যেন আমার লম্বা লম্বা পদক্ষেপের গতির উপর নির্ভর করছে আমার জীবন। সামনের জায়গাগুলো গিলতে গিলতে পেছনের বোঝাগুলো কাঁপিয়ে আমার পা’দুটো আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো।

হ্যাঁ, আমি সত্যিই দৌড়াচ্ছিলাম, এমনভাবে যাতে আমার পায়ের পেশী ছিঁড়ে যাওয়ার মতো হচ্ছিলো। ভাবছিলাম, অতিরিক্ত ওজন ঝেড়ে ফেলার জন্য আমার কি কাঁধের ব্যাগটা ফেলে দেওয়া উচিত? এই ছোট্ট জিনিসটাই বোধহয় আমার পালানোর পথে বাঁধা সৃষ্টি করছে, যদিও ব্যাগে ছিলো মোটে দুটো বই আর একটা খালি নোটখাতা। কিন্তু দৌড় প্রতিযোগিতায় একটা শার্টও ভারী লাগতে পারে; আর আমার চামড়ার জুতো জোড়ার ব্যাপারে কী করা যায়? নাহ্, আমি জুতো খুলে ফেলার কথা ভাবছিলাম না; টিভিতে দেখা কেনিয়ার দৌড়বিদদের মতো খালি পায়ে দৌড়ানোর কথাও চিন্তা করিনি।

সেদিন তিনজন টিকিট চেকার আমাকে তাড়া করেছিলো, তিনজনের দুইজন ছিলো সাদা, একজন কালো। দুইশো গজ দূরে তাদেরকে টিকিট চেক করতে দেখেই আমি দৌড়াতে শুরু করি; আর আমাকে দৌড়াতে দেখেই তারা আমাকে তাড়া করে। অবধারিতভাবে তারা ধরে নিয়েছিলো আমার টিকিট নেই, অথবা আমার কাছে লুকানোর মতো অন্য কিছু আছে। অন্য যাত্রীদের সামনে তাদের মতো সম্মানিত ইন্সপেক্টরদের বোকা বানানো লোককে তারা কীভাবে ছেড়ে দেয়?

দৌড়ানোর সময় আমার মুখ হা হয়ে ছিলো, সামনে কোনো যাত্রী পড়লে তাকে ধাক্কা মেরে পথ করে নিচ্ছিলাম। আমার মাথায় তখন কেবল একটা জিনিসই কাজ করছিলো, যেভাবেই হোক বাইরে যাবার রাস্তা বের করে বাইরে ভীড়ের মধ্যে মিশে যেতে হবে। চাচাতো ভাই জোঁদজো ঠিকই বলেছিলো, ‘মঁত পারেঁসি বেঁভ্যু প্যারির রেল ব্যবস্থার সবচেয়ে জটিল স্টেশন।’ আমি কোনো মানচিত্রবিদের নাতি নই, তাই বারবার ভুল পথ বেছে নিচ্ছিলাম। এমন একমুখী রাস্তায় যাচ্ছিলাম যেখানে লোকেরা আমার উল্টো দিক থেকে আসছিল। আমি নিচের দিকে নেমে যাওয়া চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছিলাম, ওপরে ওঠার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামছিলাম; এভাবে কোনো একটা প্লাটফর্মে এলাম যেখান থেকে একটা ট্রেন কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। আমি যখন একটা বগিতে উঠতে যাবো, ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের ঘণ্টা বেজে উঠলো আর বগির দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। প্লাটফর্মের শেষ মাথা লক্ষ করে আবার দৌড়ানো শুরু করলাম, যেখানে বাইরে যাবার একটা রাস্তা খোলা পাবো বলে আশা করছিলাম।

রেলের তিনটা লোক তখনও আমাকে তাড়াচ্ছে। প্লাটফর্মের শেষ মাথায় পৌঁছে দেখলাম সেখানে বাইরে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই, বরং সেখান থেকে একটা করিডোরের শুরু। আমি চিন্তা করার জন্য না থেমে দাঁতে দাঁত চেপে দৌড়াতে থাকলাম।

দূর থেকে আমি একজন ইন্সপেক্টরের চিৎকারের প্রতিধ্বনি শুনলাম, সে বলছিলো, ‘কুকুরীর বাচ্চাটাকে ছেড়ে দাও, জো। ওর জন্য আমরা নিজেদের মেরে ফেলতে পারিনা।’

পেছনে তাকিয়ে দেখলাম দুইজন আমাকে তাড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে, শুধুমাত্র একজন, একজন সেই কালো লোকটা তখনও আমার পিছে লেগে আছে। সে আমার মতোই কালো এবং ব্যাপারটাকে সে ব্যক্তিগত মিশন হিসেবে নিয়েছে।

সে কর্কশ স্বরে নিজেকেই বলছে, ‘তাকে ধ-রো! তাকে ধ-রো! ধ-রো!’

অন্য যাত্রীরা আমাকে ধরার কোনো চেষ্টা করছিলো না, তারা তো সেখানে অন্যের কাজ করতে আসেনি। তাদের অধিকাংশই বরং মজা করে দৌড় প্রতিযোগিতাটা উপভোগ করছিলো, যেখানে একই বর্ণের দু’জন রেলের করিডোরকে অলিম্পিকের স্টেডিয়াম বানিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।

আমি একটা বাঁক ঘুরতেই ওই কালো লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেলো। অবশেষে আমার ফুসফুস একটু শান্তি পেলো, শেষ পর্যন্ত আমি দম নিতে পারছিলাম।

আমি তখন হাঁটছিলাম, তবে দ্রুত। আমাকে সত্যি সত্যিই বাইরে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে, এই লম্বা লম্বা করিডোরে আর নয়।

কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম আমার বাঁ পায়ের জুতোটা ঢিলে হয়ে যাচ্ছে, ফিতে খুলে যাচ্ছে। আমি হাঁটু ভেঙে ফিতে বাঁধতে বসলাম।

‘হয়ে গেছে।’ যে-ই আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম, আমার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। দেখলাম, কালো লোকটা আমার সামনে, দুশো গজেরও কম দূরত্বে সে। কীভাবে লোকটা এখানে এসে পৌঁছালো, নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো পথ ধরে সে এসেছে।

আমি উল্টো দিকে ঘুরে আবার দৌড়াতে শুরু করলাম, যেদিক থেকে এসেছিলাম। অন্য দু’জন অফিসার যারা আমাকে তাড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিলো, তাদেরকে সামনে পাবো ভেবে আমি ডান দিকে ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’ ‍চিহ্নিত একটা এলাকায় ঢুকে পড়লাম। একটা করিডোর! ল-ম্বা করিডোর! যতোই দৌড়াচ্ছি ততোই করিডোরটা সংকীর্ণ আর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। হরর মুভির মতো কালো লোকটির পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিলো আমার পেছন পেছন।

করিডোরের শেষ মাথায় একটা বিবর্ণ বাতি লক্ষ করলাম, সেখানে নিশ্চিত বাইরে যাওয়ার রাস্তা আছে বলে ধরে নিলাম। তাই ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’ চিহ্নটাকে পাত্তা দিলাম না। আমি আলোর কাছে পৌঁছাতে চাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিলো আলোটা যেন আমার স্বাধীনতা, দিনের মধ্যভাগে নেমে আসা রাত্রির সুস্থির অবসান।

আমি তখনও জানিনা, ফাঁদে পড়ে গেছি। কারণ করিডোরের শেষ মাথায় বাইরে যাওয়ার রাস্তা থাকলেও সেটা বন্ধ ছিলো।

পেছনে কালো লোকটার অবজ্ঞাভরা কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম, ‘তুই মনে করেছিস স্টেশনটা তুই আমার চেয়ে বেশি চিনিস? বাস্টার্ড কোথাকার।’

‘যথেষ্ট হয়েছে।’ ভেবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পিছনে তাকিয়েও দেখলাম না। কালো লোকটা রাগবি বলের মতো আমাকে ধরে ফেললো। আমাদের পিছনে অন্য দুই ইন্সপেক্টর ভারি হাতির মতো লাফিয়ে উঠলো।

শার্টের কলার ধরে আমাকে উঁচু করে তুলে ধরে কালো লোকটি চিৎকার করে উঠলো, ‘তোমার পেপারস কই!’

আামি একচুলও নড়লাম না, যাতে সে আমার ডেনিম জ্যাকেটের পকেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, আমার পকেট ব্যাগ খুঁজে পায় এবং ব্যাগের মধ্যেকার জিনিসপত্র তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতে পারে।

‘তাহলে তুমি একজন আইনের ছাত্র আর তুমি রেল-কর্তৃপক্ষকে ধোঁকা দিচ্ছিলে! তুমি এই দেশে আফ্রিকানদের, মানে কালোদের বদনাম করছো। তুমি কি এটা জানো? এ-ই!’

যেহেতু আমার পকেটে দুশো ফ্রাঁ ছিলো, যা আমার চাচাতো ভাই ট্রেনের টিকিট কেনার জন্য আমাকে দিয়েছিলো, একজন ইন্সপেক্টর কালো লোকটাকে জরিমানা হিসেবে ঐ টাকাটা নিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিলো। সে বললো, ‘তুমি জরিমানা হিসেবে এই টাকাটা নিয়ে ওকে ছেড়ে দাও। আর ব্যাপারটা এখানেই শেষ করো।’

কিন্তু কালো লোকটা রাজি হলো না। সে বললো, ‘আমি এই আফ্রিকানদের চিনি। জরিমানা এদের জন্য যথেষ্ট নয়, এদের আচ্ছা করে পিটানো দরকার। চলো একে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাই।’

তারা আমাকে হাতকড়া পরালো। কালো লোকটি প্যারিতে বসবাসকারী আফ্রিকানদের অভিশাপ দিতে থাকলো, ‘এরা সবকিছু নষ্ট করে দিচ্ছে। আগে শহরে কতো শান্তি ছিলো। এদের সবগুলোকে সেখানে ফেরত পাঠানো দরকার যেখান থেকে তারা এসেছে।’ আমি তার কথার পশ্চিম ভারতীয় টানটা ঠিকই চিনতে পারলাম, সে মার্তিনিকের জ্যাকুইসের মতো করে কথা বলে। জ্যাকুইস গোসাঁইভিলে আমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতো। জোঁদজো লোকটাকে কখনো আমরা একই জায়গা থেকে এসেছি এই কথাটা মনে করিয়ে দিলে সে খুব বিরক্ত হতো। আসলে পশ্চিম ভারতীয়দের উৎস আফ্রিকা, অর্থাৎ আফ্রিকা থেকে এসেছে, এই বিষয়টাকে সে ঘৃণা করতো। মাঝে মাঝে সে এতোই বিরক্ত হতো যে আমাদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিত, এমনকি ফোনেও যোগাযোগ করতো না। কিন্তু প্রতিমাসের শেষে সে ফিরে আসতো; কারণ তার চ্যাতিউ-রুজের কালোবাজার থেকে ট্রেনের টিকিট কাটার প্রয়োজন পড়তো। সে জানতো যে সে সরাসরি টিকিট কিনতে পারবে না। কারণ চ্যাতিউ-রুজের টিকিট বিক্রেতারা মনে করতো পুলিশ তাদের উপর নজরদারি করবার জন্য পশ্চিম ভারতীয়দের গুপ্তচর হিসেবে ব্যবহার করে।

হ্যাঁ, সতেরো বছর পর আজ আমি সেই ‍দিনটির কথা মনে করছি যেদিন প্রথম আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেইদিনই আমি উপলব্ধি করি, একই বর্ণের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বর্ণবাদ সমস্যা নিয়ে আমার কিছু লেখা উচিত। যেদিন আমি আমার প্রথম উপন্যাস ‘ব্লু-ব্লাঁ-রু’ লিখি সেদিনও আমি মঁত পারেঁসি বেঁভ্যু স্টেশনের করিডোরে দৌড়ানো দীর্ঘ সেই দৌড়ের স্মৃতিতে তাড়িত হয়েছিলাম। আমি চ্যাতিউ-রুজের সেই টিকিট বিক্রেতাদের দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি ‘কালো এলাকার’ পরিস্থিতি অনুভব করতে পারছিলাম। আমি তাদের দেখতে পাচ্ছিলাম যারা কঙ্গোর কিশোর, যারা বাড়ি ফিরে যেতে চায়, তাদের কাছে ইউরোপ স্বপ্ন ফিরি করছে।

এরও অনেক বছর পর যখন আমি অন্য একটা উপন্যাস- ‘কালোবাজার’ লিখছিলাম, তখন সেই পশ্চিম ভারতীয় লোকটি, যে আমার পেছনে ছুটছিল, তার মুখ মনে করে আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছি। আমি তাকে আমাকে ভেঙাতে দেখি আর চ্যাতিউ-রুজের আফ্রিকানদের দুষ্কর্মের জন্য বকাবকি করতে শুনি। ডানপন্থি নেতা, যারা তখন সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করছিলো, তাদের স্বরে পশ্চিম ভারতীয় লোকটি কথা বলছিলো।

হ্যাঁ, সেদিন আমি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করা একটা চেয়ারে বসেছিলাম; এবং যখন পুলিশের আঙুল কালো লোকটার পূর্বাপর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য টাইপরাইটারের উপর নেমে আসছিলো, আমার মনে হচ্ছিল আমার আঙুলই কিছু লেখার জন্য নেমে এলো। এভাবেই যা আমি বলতে চাই, সেরকম একটা গল্প আমার মাথায় চলে এসেছিলো।

কালো লোকটাকে জরিমানা দিয়ে আমি পুলিশ স্টেশন ত্যাগ করি। কালো লোকটা সম্ভবত আমার মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করছিলো। এটাই হয়তো তাকে তার নিজের বর্ণের সম্মান কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দেবে বলে সে মনে করেছিলো। কিন্তু সেটা হতো কীসের সম্মান? এটাই ছিলো আমার নিজের কাছে আমার প্রশ্ন; আর আমার মনে হয় সারাজীবন আমার সকল লেখায় এই প্রশ্নটাই আমি নিজেকে করে যাবো।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close