Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১১]

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১১]

প্রকাশঃ March 11, 2017

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১১]
0
0

পর্ব ১১  

তারপর আমি বুঝতে পারি না কেমন করে কী সব আশ্চর্য বৃত্তান্ত ঘটে যেতে থাকে। আমি বুঝতে পারি না, কেমন করে পেনসিল উঠে আসে আমার আঙুলে! কেমন করে কাগজে কাগজে শ্লোক গড়ে তুলতে থাকে আমার আঙুলেরা! আমি বুঝতে পারি না।

শ্লোকের পরে শ্লোক। গুচ্ছ গুচ্ছ শ্লোক। আমার শরীর ও অন্তরকে উথাল-পাথাল,  আউলা-মাউলা করে দিয়ে শ্লোকেরা ঝেঁপে নামতে থাকে! ফলে উঠতে থাকে।আমার নিজস্ব্ শ্লোক!

এসব কেমন কথা ছড়িয়ে থাকছে আমার শ্লোকে? এসব কী আমি লিখছি! আমি? কেমন করে পারছি! কেমন করে পারছি এমন সব অচিন-অজানা বিষয়ের কথা ফলিয়ে তুলতে? আমি বুঝে উঠতে পারিনা। অথচ দেখো, আমার আঙুলই তো রচনা করে চলছে এতোসব কিছু! দেখো দেখো, কেমন সব কথা ছড়িয়ে থাকছে শ্লোকে শ্লোকে!

ছড়িয়ে থাকছে, দূর কোন সেই লোকালয়ে ঘনিয়ে আসতে থাকা মেঘ- আন্ধার এক নিশীথের কথা। সে নিশীথ একাকিনী। এবং সে রোদনরত! অঝোরে কাঁদছে সে।

আহা! কেনো সে অমন রোদন-নিমগনা? দীর্ঘ্ শ্বাসের মতন করুণ এই জিজ্ঞাসা ছড়িয়ে পড়তে থাকে আমার শ্লোকে শ্লোকে।

তারপর শ্লোকেরা ছড়িয়ে দিতে থাকে আমার আকুলতার কথা।

কোন আকুলতা?

ওই যে সেই রোদন-উতলা নিশিথিনী, তার কাছে পৌঁছে যাবার আকুলতা! সেই রাত্রির সঙ্গে দেখা হবার ব্যাকুলতার কথা ছড়িয়ে পড়তে থাকে শ্লোকের পরে শ্লোকে।

নামহীন কোন এক দেশের, কদম্ব বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে, বৃষ্টি-ভেজা হবার সাধ- বেজে বেজে উঠতে থাকে কতো কতো শ্লোকে।

গৃহস্থ সন্ধ্যার রন্ধনশালায়, উনুন ও তার ধোঁয়ার সাথে বাস করার বাসনা ব্যক্ত্ হতে থাকে- অযুত অযুত শ্লোকে। নামহীন কোন এক জনপদের ছায়া-ঢাকা জনহীন পথে, একাকী হেঁটে যাবার বাসনা বেজে বেজে যেতে থাকে, অনেক অনেক শ্লোকে।

এ কী বিস্ময়! এ কী অশৈলী বৃত্তান্ত! এটা কেমন করে হয়!

লোকালয়ের নির্জ্ন পথ কোনখানে আছে? কোনখানে আছে সেই জনপদ, যেখানে যাবার জন্য্ এমন বেচইন – এমন অস্থির- আমার শ্লোকেরা?

শ্লোকেরা ব্যাকুল, নাকি আমার অন্তরই এমন উতলা হয়ে উঠেছে?

কিন্তু যেই দেশের কথা আমি আমার এ্‌ই জীবনে কখনো শুনি নি, যেই দেশ আদপেই আছে কিনা-তাও যেখানে জানি না, সেই দেশের ঝুম বৃষ্টির কথা আমার শ্লোকে ফলেই বা ওঠে কেমনে? আমার অন্তরই বা তার জন্য্ আউলা হয় কীভাবে!

এমন সব অচিন বাসনা, আমার মনে কেমন করে দেখা দিচ্ছে? কেমন করে? আমি কী ঠিক আছি! আমি উন্মাদ রোগগ্র্স্ত হয়ে পড়িনি তো! নাকি আমি লাভ করেছি দিব্য্ আনন্দ্ কে পাবার শক্তি? পেয়েছি আমি?

এইসব ভেবে ভেবে, ভয়ে ও আনন্দে আমি নিথর হয়ে যেতে থাকি। নিথর পড়ে থাকি অনেক ক্ষণ। তারপর আচমকাই আমার অন্ত্র ও চোখ কেঁদে উঠতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করতে থাকে।

নির্জ্ ন বিশাল পাঠকক্ষে একা একা আমি চিৎকার করতে থাকি।

দেখা যায়, হয়তো এই কিছুক্ষণ আমি শ্লোক ফলিয়ে উঠছি; মন ও দেহ শান্ত্, সুখী ও শিথিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায় আমার দেহ অন্য্ রকম ক্রিয়া করতে শুরু করেছে।

অকস্মাৎই দেখা যায় আমার দেহখানা থর থর থর কেঁপে উঠছে। হঠাৎই চিৎকারে চিৎকারে প্রাসাদটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে আমার আত্মা! চোখে জল টলটলাচ্ছে- সুখের জল!

এসব কী! কেনো এমন হচ্ছে! কেনো?

“বোঝো না কেনো? ইচ্ছার সাথে দেখা হয়েছে তোমার! তাই এমন! তারপরে তো এই্‌ই হওয়ার নিয়তি তোমার, কন্যা! তুমি তোমার ভাগ্য্ ফল ভোগ করছো এখন! এই কালের পরে আসবে আরেক নিয়তিফল ভোগের কাল!” গৃহকর্মী হঠাৎই সেদিন আমার পেছনে কথা বলে ওঠে।

“এই যে এখন এমন আনন্দকে পাওয়া- এটা যেমন ঘোর সত্য্; তেমন আরেকটা সত্যও আসছে তোমার দিকে! তখন, নিজেকে নিষ্ফল, নিরর্থক বোধ করার নিয়তিপ্রাপ্ত্ হবে তুমি। আসবে নিঃস্ব্, নিঃসম্বল হওয়ার কাল! যদি সেই অদৃশ্যের ডাকে তুমি সাড়া না দাও, রাহু তোমাকে আবারও গ্রাস করে নেবে!”

আমার সকল একাকী উল্লাসকে এইমতে স্তব্ধ ও নিভন্ত করে দেয় জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মী।

কখন সে এসে হাজির হয়েছে, এই পাঠকক্ষে? হঠাৎই এখন কেনো সে?

আজ কেনো সেই পুরোনো কথাটা– সেই নিয়তি লিখনের কথা- সেই অভিশাপের কথাটা- আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিতে এসেছে সে? আর, আবারও রাহু আমাকে গ্রাস করে নেবে- এই কথার মানে কী! রাহু কবে গ্রাস করেছিলো!

ঠিক আছে! ঠিক আছে! আমি আর কোনো কিছু জানতে চাই না! আমি আর সেই অভিশাপ-কথা মনে করতে চাই না! শুনতে চাই না কিছু। না!

আমি শুধু এই এখনকার এই সুখে ও উল্লাসে থাকতে চাই! এখনকার এই যে একটুখানি সাধ ও বাঞ্ছা- এইটুকুর সাথে থাকতে পারলেই আমার হবে! আর কিচ্ছু লাগবে না!

কেনো লাগবে? ইচ্ছার সাথে আমার দেখা হয়ে গেছে না?

ইচ্ছার সাথে আমার দেখা হয়েছে! সেই কোন আগে দেখা হয়েছে! অনেক দিন আগেই তো হয়েছে!

সেই দেখাটা হয়ে যাবার পরে, বেদিশা আমি যে, এই জ্যেষ্ঠাকেই ওই কথা জানাবার জন্য্ ছুট দিয়েছিলাম- সেই দিনটিও তো এখন অনেক পুরোনো হয়ে গেছে! সেই অস্থিরতার কালে, তার দেখা না পেয়ে আমি যে কষ্টটা পেয়েছিলাম, সেও তো এখন খুব পুরোনো কথা!

তাহলে এখন, এতোদিন বাদে, আমার সাথে ইচ্ছার দেখা হওয়ার কথা, নতুন করে আমাকে মনে করাবার কী দরকার পড়লো তার!

সেই কথা বলতে গৃহকর্মী এখানে কেনো আজ? কখন এলো সে!আমি তো তার পদশব্দ শুনতে পাই নি!

রন্ধনশালা না সেই কোন দূরে? নাকি সে মোটেও রন্ধনশালায় থাকছে না এখন? কেবল সর্বক্ষণ আমাকে চোখে চোখে রেখে চলছে সে? এবং এটাই হয়ে উঠেছে এখন তার একমাত্র্ কাজ? আড়ালে থেকে থেকে ওই্‌ই করে চলেছে তাহলে? কেন করছে?

এমন বিবিধ জিজ্ঞাসা আমার মনে নড়েচড়ে, কিন্তু সেসব শুধিয়ে লাভ তো নেই কোনো! এতোদিনে জেনে গেছি তো আমি; একদম জেনে তো গেছি যে, এই জ্যেষ্ঠা জন কোনো জিজ্ঞাসার উত্তর দেবার লোক নয়। সে কোনো জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে জানে না।

সে কেবল শরীরে হিম-জাগানো, ত্রাস-ঝটকানো দু-চারটা কথা আমাকে শোনাতে জানে। এবং যখন তার ইচ্ছা হচ্ছে, ওইই শুনিয়ে চলছে সে আমাকে। ওই একই কথা, ওই একই ভঙ্গীতে।ওই হঠাৎ আপনা থেকে এসে আলগোছে পেছনে দাঁড়ায়ে, হঠাৎই আমাকে মনে করিয়ে দেয়ার কাজ করছে সে। আর কিছু জানে না। আর কিছু নয়।

এই জ্যেষ্ঠাজনের ওইসব কথা সহ্য্ করে নেয়ার শক্তি আমার হয় নি ঠিক, আবার কেমন যেনো সয়েও গেছে।প্র্থম ঝটকায় কেমন ভয় পেয়ে যাই আমি, তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে কেমন যেনো ভোঁতা, নিঃসাড় লাগতে থাকে আমার। ভয়টা কেমন মিইয়ে যায় আমার মন থেকে। এইই হচ্ছে আজ কিছুদিন ধরে।

তাই এইবারও যখন সে ওই ভবিতব্যের লিখন ও আরো আরো সব ভয়-ধরানো কথা শোনায়, প্র্থমে আমি টলে উঠি খুব। তবে সেটা কেবল এক মুহূর্তের জন্য্।

তারপরেই আচমকা ভোঁতা হয়ে যায় আমার ভেতরটা। তখন মনে হতে থাকে, ওইসব কথাকে গ্রাহ্য্ করার কোনো দরকার নেই। মনে হতে থাকে এইসব ভয়ের ঝাপটা আসলে সত্য্ নয়। কোথাও কোনো ভয় নেই। রাগ তো নেইই। সত্য্ শুধু এই শ্লোক রচনা।সত্য্ শুধু এই উল্লাস! অগাধ অগাধ উল্লাস!

তাই জ্যেষ্ঠার কথাকে তাচ্ছিল্য করতে ইচ্ছা হতে থাকে আমার।আমি খুব খুব তাচ্ছিল্য্ করে যেতে থাকি তাকে, মনে মনে।

ধুর! আর কতো শুনবো, এর কথা? দরকার নেই তো কোনো! আর কেনো এই জনের কথা নিয়ে পড়ে থাকা? একদম অদরকারী-এইসব! কবে কোন নিয়তি-লিখন ফলতে আসবে, তার জন্য এই এখন তড়পাবো? কেন? আগে সেটা আসুক, তখন দেখা যাবে। আসুক তো আগে! এখন কি?

এখন আমার ভেতরে কি আছে?

আছে কেবল একটি সাধ – আছে শুধু এক অবিচল ইচ্ছার শিখা। আরো শ্লোক গড়ে তোলা চাই! আরো আরো শ্লোক।

সেটি করা ছাড়া আর কিছু করার নেই আমার! আর কোনোদিকে মন দেয়ার কিচ্ছু নেই।

তারপর আবারও শ্লোক রচিত হতে থাকে। শ্লোক শ্লোক শ্লোক! আমার নিজস্ব্ শ্লোক।

এভাবেই চলে যায় কতোদিন! আমার মনে হতে থাকে, এমনই বুঝি যাবে বাকিটা আয়ুষ্কাল! যাবে এমনই শ্লোক ফলিয়ে তুলে তুলে! যাবে এমনই উল্লাসে, আর গৌরবের বোধ নিয়ে নিয়ে!

হায়রে! সেটা যে কী ভুল ভাবনা ছিলো! কী যে ভুল ভাবনা! মূঢ় আমি শিগগীরই তা বুঝে ওঠার পরিস্থিতি পাই।

শ্লোক ফলাতে ফলাতে, হঠাৎ একদিন, আমার উল্লাস আচমকাই ঝটকা খায়। তারপর নিভু নিভু হয়ে আসতে থাকে।

কেনো? এমন লাগে কেনো?

কেননা সেইদিন আমি শ্লোক রচনা করতে করতে হঠাৎই বোধ করতে পারি, আমার আসলে কিছুই হচ্ছে না!

তখন দ্বিপ্র্হর! তখন জগত-সংসারের কোনোখানে সোনার বরণ আলো ও বৃক্ষবরণ শান্তির কোনো কমাকমতি নেই।

আকাশের গাঢ় নীল পাত্রে থাকা সোনালি সূর্য্মুখীটি তখন অপরূপ ডগমগ। মাটি সবুজে-সোনালিতে ভরাপুরা। হাওয়ায় হাওয়ায় সুগন্ধ্ ও শীতলতার শেষ নেই।

এমন পরিপূর্ণ্ তার মাঝখানে বসে, সেদিন অকস্মাৎই আমি বুঝে উঠতে পারি; আমি পঙক্তি রচনা করে উঠছি ঠিকই- কিন্তু ওই সকল পঙক্তির সবই নীরস। কোনোটাই প্রাণপূর্ণ্ নয়।

আত্মাশূন্য্, বিভাহীন, গুচ্ছ গুচ্ছ কিছু শব্দমাত্র এইগুলি। অতুল্য্ শ্লোক নয় তারা। কোনো পঙক্তিই অন্তরের গহনস্পর্শী লাবণ্য ধারণ করে নেই! তাতে প্রাণ নেই, দিব্য আলোক নেই। কেবলই শব্দ- কেবলই নীরক্ত, কাহিল শব্দ মাত্র তারা!

এ ছাড়া আর কিছু নয় তারা। আর কিছু নয়!

আমি তাহলে কী অর্জন করেছি!

নিষ্ফলতা ছাড়া আমি আর কিছুই অর্জন করি নি!

হায় রে! এসব কী রচনা করে উঠছি আমি! এ কেমন দীন-দুর্গতিগ্র্স্ত, ক্লিষ্ট শ্লোক!

ওরা এমন কেনো! নাকি আমার অন্‌তর-বাহিরই হয়ে উঠেছে এমন করুণ কাঙাল? সেই কারণে শ্লোকেরাও পাচ্ছে এমন জীর্ণ্ বিবর্ণ্ রূপ!

কতো কতো শ্লোক গড়ার না পরিকল্পনা নিয়েছিলো এই মন? সেইসব শ্লোককে লিখে উঠি যদি, তারাও তো তবে এমনই খসখসে, আত্মাহীন, শব্দমাত্র হয়ে উঠবে? হায় হায়!

এমন কেমন সর্বনাশ আমাকে ছোবল দিলো?

আমি এখন কী করবো!

এখন তবে কি বন্ধ করে নেবো, সব উদ্যোগ-আয়োজন? বাদ দিয়ে দেবো শ্লোক-রচনা? দিলাম না হয়!

কিন্তু তারপর?

তারপর আমি তবে কোন কারণে এই দেহ ধারণ করে যাবো? কেনো তবে দেহ ধারণ করে যাবো?

না না না! আমি পারবো না! পারবো না শ্লোকশূন্য্ দেহধারী হয়ে থাকতে!

আমি আবার চেষ্টা চালাবো। আবার!

আবার দেখবো আমি, লাবণ্য্ ও আত্মাময় শ্লোক গড়ে তুলতে পারে কিনা- আমার আঙুলেরা!

নিশ্চয়ই পারবে! পারবে ওরা!

এই মতো কতো কতো বিলাপ আর কতো কতো আফসোস নিয়ে আমি আবার শ্লোক গড়া শুরু করি।গড়তে থাকি গড়তে থাকি-

হায়! তারপর শ্লোক শেষে ঠিক বুঝে উঠি, এ শুধু শব্দপুঞ্জ মাত্র্। কোনো দীপ্তি নেই তাদের। শ্লোকে শ্লোকে যে মধুর স্ব্প্ন্ ঢেউ সৃজনের বাসনা করি আমি, সেই ঢেউ এইখানে নেই। একটুও নেই। হায়!

হায়! একদিন তো হতো!

একদিন, সুষমাভরা শ্লোকেরা এসেছে তো এই আঙুলে! একদিন, এই তো অল্প্ কয়দিন আগে!

পেরেছি না?

পেরেছি। আজ তবে কেনো অপারগ তুমি, হে আমার হাত? কোন দোষে?

আমার অন্তরাত্মা কাতরাতে থাকে।কাতরাতে কাতরাতে আবার শ্লোক গড়তে বসি আমি। আবার বুঝে উঠি- হয়নি! কিচ্ছু হচ্ছে না! আহ!

এভাবেই চলতে থাকে নীরস শ্লোক গড়ার যাতনা ভোগ করা। নিরুদ্ধার পীড়নে থাকার দিন- যেতে থাকে এইভাবে, বিলাপে বিলাপে।

তারপর একদিন টের পাই, আরো দুর্গতি এসে হাজির হয়েছে আমার জন্য্।

একদিন টের পাই, আরো বিপত্তি এসে আমাকে ঘিরে নিয়েছে!

আগে তবু যা-হোক কিছু শ্লোক গড়ে তুলতে পারতো আমার আঙুল। সেইসব পঙক্তি আলো ও প্রাণহীন হচ্ছিলো, সেটা ঠিক। কিন্তু পঙক্তিরা আসছিলো হড়বড়।

তারপর একদিন দেখি, আমার আঙুল থেকে যেনো শ্লোকেরা আর নেমে আসতে চাইছে না!

টের পাই, হুড়দাড় করে করে শ্লোকদের আসাটা যেনো কেমন শ্লথ, মন্থর হয়ে আসছে। টের পেতে থাকি, শ্লোকেরা যেনো বিমুখ হয়ে উঠেছে দেহ ধারণ করতে।

দেখতে পেতে থাকি, কেবল অল্পখানিক শ্লোক আমার চোখে ও আঙুলে থেবড়ে বসে আছে। তারা না জলের মতো ঝলকলিয়ে নেমে যেতে পারছে, না পাখির মতন ঝনাৎ উড়াল দিয়ে হারিয়ে যেতে পারছে।

কিছুই পারছে না। কিছুই পারছে না বলে, তারা গুটিকয়, নিরুপায় বসে আছে- আমার আঙুলে।

আমি অতি বিস্মিত হই। কেনো এমন হয়? তবে কী আমার আ্ঙুলেরা অসুখে পড়েছে? কোনো গোপন ব্যাধির কারণে ওরা বিবশ হয়ে যাচ্ছে? সেই কারণেই কি শ্লোক রচনা করা যাচ্ছে না?

কেমন নির্বোধ আমি! মনকে তখন কেমন চোখ ঠেরে চলছিলাম তখন! মনের ভেতরে অস্পষ্ট রকমে আসল কারণটা ঠিক নড়েচড়ে যাচ্ছিলো! অথচ এদিকে বাইরে আমি নিজেকে এমন বুঝ দিতে চাচ্ছিলাম যে, হয়তো এমনটা ঘটছে আঙুলদের অবশ হয়ে যাওয়ার অসুখ হয়েছে বলে।

কিন্তু খুব গোপনে মন ঠিকই জেনে উঠছিলো, এটা আঙুলের অসুখ নয়। এটা আমার সর্বস্ব খোয়ানোর লক্ষণ! আমার শ্লোক সৃষ্টির শক্তি ফুরিয়ে গেছে বা যাচ্ছে! না না! ভেতরে অস্পষ্ট রকমে যেই বোধই নড়ুক চড়ুক, সেটা বাইরের আমিকে আমি বুঝতে দিই নি একতিল। বাইরে থাকতে থাকি হতভম্ব্ একজন হয়ে। নিজের কাছেই নিজে ছলনা করতে থাকি- এই মতে।

দিনেরা তো সকল সময় যাওয়ার জন্য্‌ই আসে।আমার দিনগুলোও যেতেই থাকে। প্র্তিটা দিনই, একইরকম বদ্ধ্ ও নিরুপায় চোখে চেয়ে থাকে আমার আঙুলেরা। শ্লোকেরা কোথাও নেই। তারা আসে না!

আমি আর শ্লোক রচনা করে উঠতে পারি না। একটুও পারি না।

ভয়ে-ভাবনায় বেদিশা হয়ে হয়ে, খুব চাপ দিতে থাকি। ফলে ওঠার জন্য্ শ্লোকদের চাপ দিতে থাকি। খুব জোরাজুরি করতে থাকি।

হায় রে, তাও কী কোনো সুফল ফলে? না না!

জোর চাপাচাপির পরে দেখা যায়, কিছু একটা লিখে উঠেছি! কোনোরকম বাঁকাচোরা কিছু একটা! তারা শ্লোক নয়। বিকলাঙ্গ্, আত্মাহীন, ভীতিকর কিছু একটা! তাদের দেখে দেখে আমার অন্তরাত্মা ডুকরে উঠতে থাকে।

এসব কী এসব কী! কিছু না বুঝেই ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেতে থাকে আমার দেহ। কেবল ভয় পেতে থাকে।

তারপর একদিন, অন্তরের খুব গহনে চোখ বন্ধ করে লুকিয়ে থাকা সত্যটা হড়বড় হড়বড় করে বের হয় আসে। এসে, আমার মুখোমুখি দাঁড়ায়।

আমি পরিষ্কার বুঝে যাই, শ্লোকসৃষ্টির শক্তি আমি ফুরিয়ে ফেলেছি!

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close