Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১৪]

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১৪]

প্রকাশঃ April 27, 2017

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১৪]
0
0

পর্ব ১৪

 

এই যে আমি এখন এক অচিন ঘাটের সিঁড়িতে বসা! জল-ছুঁই ছুঁই সিঁড়ি!

তবে, এই ঘাটকে আর এখন অচিন বলা যাবে কী!

আজ সাতদিন হয়, এ-ঘাটের সিঁড়িতে বসে থাকা হচ্ছে আমার! সাতদিনের পুরোটা দিন, অনেকটা সন্ধ্যা। এইখানে বসে থাকছি, বসে থাকছি।

বসে থাকতে থাকতে, হঠাৎ হঠাৎই চোখাচোখিটা হয়ে যাচ্ছে। সেইসাথে একটু অল্প হাসি বিনিময়ও কি হচ্ছে না? হচ্ছে।

আমার দিক থেকে খানিকটা ফিকে হাসি, ঘাটের সিঁড়িসকলের দিকে থেকে অনেকখানি ঢলমলে হাসি- এইরকম দেয়া-নেয়া নিত্য্ই হচ্ছে। সাতদিন ধরে প্রায় সকল সময় ভরেই হচ্ছে।

তবুও যতোবার এর দিকে চোখ যাচ্ছে, ততোবারই একে অচিনই মনে হচ্ছে।

অচেনা অন্য্ এই ঘাট।নতুন আরেক দুনিয়ার ঘাট।

তারপর এ-কথাও মনে আসছে যে, এখন আর কোনোকিছু আমার জন্য্ অচিন হলেই কী, না হলেই বা কী!

আমার নিজের জীবনই কী এখন আমার চেনা কিছু? না তো! না!

এই যে আমার জীবন- নিজের জীবন- একেই আর চেনা লাগে না। পুরো জীবৎকাল ধরে আমার সঙ্গে থাকা এই যে আমার দেহখানা-এরেও আর চেনা লাগে না।

জ্ঞান ফিরে পাবার পর থেকে, নিজেরেই আর চেনা লাগছে না!

জ্ঞান ফিরে পাবার পরে আজকে কতোদিন যায়? সঠিকরকমে মনে করতে পারছি না বটে, কিন্তু মন বলছে যে – এই আজ সাতদিন যাচ্ছে!

আজ সাতদিন ধরেই দেখা হচ্ছে এই ঘাটের সাথে। আর, এই সাতদিন ধরে দেখা-হওয়া এই ঘাটকে আমার অচিন লাগছে, প্র্তি মুহূর্তে।

এই যে এইখানে বসে আছি, এ এক অদ্ভুত ঘাট। পাড় থেকে নেমে গেছে সিঁড়ি।

ক্ষয়ে যাওয়া লাল ইটের সিঁড়ি। শিথিল শরীরের তারা সব। বড়ো প্রাচীন।

একটা কোনো সিঁড়িও আর আস্ত্ নেই এখন। ইট-সুরকি খসে গিয়ে গিয়ে প্র্তিটারই ভেতর থেকে মাটি উঁকি দিয়ে দিয়ে আছে।

সেই মাটি আবার খরখরা শূন্য মাটি নয়।

ভাঙা সিঁড়ির ভেতর থেকে শরীর-উঁচোনো সেইসব মাটির বুকে বুকে ঘাস। ডাটো সবুজ ঘাস।তারাও হয়ে আছে এখন, এই সিঁড়িসকলেরই অংশ।

যদিও এই ঘাটের দিকে, এর সিঁড়িগুলোর দিকে, বিশেষরকম নজর দেয়ার ফুরসতটা এখন নেই আমার! যদিও আমাকে নজর দিয়ে রাখতে হচ্ছে অন্য দিকে।অন্য্ কিছুতে।

তবুও ক্ষণে ক্ষণে আমার চোখ আপনা থেকেই ওই সিঁড়িদের ওপরই গিয়ে গিয়ে পড়ছে আর আটকে আটকে যাচ্ছে।

একঝলকের জন্য্ মনে হচ্ছে, থাকি না তাকায়ে শুধু এই নিরালা ঘাট ও তার একাকিনী সিঁড়িদের দিকে?

আমিই তখন আবার জোর ঝটকা দিয়ে দিয়ে সরিয়ে আনছি আমার মনকে, আর আমার এই চোখদের! সরিয়ে আনছি সিঁড়িদের কাছ থেকে।তারপর তাদের আবার স্থির মেলে রাখছি দক্ষিণের দিকে!

ওই দক্ষিণের দিকে চেয়ে থাকছি বলেই তো এখন আমার কোনো ফুরসত নেই!

আমার পাশে কেউ নেই, তবু আমি ঠিক বোধ করতে পারছি কে যেনো আমার পাশে বসে আছে। বসে বসে সে আমাকে কেবল তাগাদা দিয়ে চলেছে! তাড়া দিয়ে চলছে শুধু – দক্ষিণের দিকে চেয়ে থাকার জন্য্।

আজ সাতদিন হয় এইখানে বসে বসে চেয়ে থাকছি দক্ষিণের দিকে!

কেনো বসে থাকছি এমন? দক্ষিণের দিকে পলকহারা চোখে চেয়ে চেয়ে, কেনো বসে থাকছি এমন?

একে বসে থাকা বলে না।

যে আমাকে এইখানে পাঠিয়েছে, সে বলেছে; একে বসে থাকা বলে না! একে পথ চেয়ে-থাকা বলে।

আমি পথ চেয়ে আছি।আমি অপেক্ষা করছি।

কী যেনো আসার কথা ওই দক্ষিণ দিক থেকে। কী যেনো আসার কথা! আমার দিকে, আমার জন্য আসার কথা! এই শুধু জানি আমি। এর বেশী আর কিছু জানি না।

কে আসবে?

যে আসবে, সে কি মানুষ? কোনো পাখি? নাকি মরণ? দাদাই কি আবার এসে যাবে? নাকি বাবা? নাকি মা?

আমি জানি না!

যে আমাকে এইখানে পথ চেয়ে থাকতে পাঠিয়েছে, সে এর উত্তর দেয়নি।বলেইনি – যে আসবে, সে কে বা কী!

যে আমাকে এইখানে পাঠিয়েছে, সে কিন্তু জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মী নয়।

এটা আর কেউ। অন্য্ একজন। জ্যেষ্ঠাজনের সাথে আমার দেখা নেই অনেকদিন। অনেকদিন নাকি অল্পদিন- সেটাও সঠিকরকমে বলতে পারি না। তবে দেখা যে নেই, সেটা স্পষ্ট মনে করতে পারি।

আমি এখন সেই অন্য একজনের পাশে থাকি। অন্য একজনেরই সাথে থাকি।

থাকি, আমাদের প্রাসাদ থেকে দূরে! হয়তো বেশী দূরে নয়, কিন্তু আমার যেনো মনে হয়, সেই প্রাসাদ আর এই আমার নতুন বসত স্থলের দূরত্ব্ হচ্ছে যোজন যোজন।

তো, এখন বরং এই কথা থাক। যার কাছে এখন বসত করি, তার কথা থাক। সেই অন্য জনের কথা না হয়, স্প্ ষ্ট করে- খুব স্পষ্ট করে- একটু পরে বলি!

তার আগে বরং আমার এই পথ চাওয়াটার বিষয়-আশয়ই খোলাসা করে বলি।

এই যে এখানকার যে অন্য্ জন, সে বলেছে; এই অপেক্ষা করাটাই হচ্ছে এখন আমার একমাত্র্ ব্র্ত।বলেছে, মন-প্রাণ দিয়ে যেনো এই ব্র্ত পালন করে যাই আমি!

আমি তার কথা মান্য্ করছি। এই যে অপেক্ষা করছি! এই যে আমি এখন আমার ব্র্ত পালন করছি।

আমি বসে থাকছি ঘাটের সিঁড়িতে। জল ছুঁই-ছুঁই শেষ সিঁড়িটাতে বসে থাকছি, আজ সাতদিন হয়। আমার পায়ের পাতাদের ভিজিয়ে ভিজিয়ে ছুটে যাচ্ছে হালকা স্রোতেভরা জল। ছোটো এক নদী –এই তো বয়ে যাচ্ছে! দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাচ্ছে।

এ-নদীর দুই দিকে উঁচু পাড়। জনমনিষ্যি শূন্য- ঝুমনিরালা উঁচু পাড়! ওই পাড়ে যতোদূর চোখ যায়- ধু ধু কেঁপে যায় সবুজ শূন্যতা!

দেখে দেখে প্রাণের ভেতরে কেমন হু হু করে উঠছে আমার- একেক সময়!

এইপাড়ও একইরকম সবুজ! একইরকম বিজন! কিন্তু এইখানে এই একটুকরা ঘাট আছে। সেই ঘাটের সিঁড়িতে জলস্রোতের অবিশ্রাম ঝাপট লাগা আছে। ছলাৎ ছল আওয়াজ ওঠাটা আছে।

এই তো সাতদিন হয়- এইখানে আমিও আছি।

আর, আমার প্রাণের মধ্যে কেমন হু হু এক হাওয়া বয়ে যাওয়া-যাওয়ি আছে।

সরু উদাসীন নদীটার তিরতিরে জল- এমন ঝকমকে!

একটু ঝুঁকে জলের নিকট যদি হওয়া যায়,পরিষ্কার রকমে দেখা যায় মুখ। দেখা যায় চোখের কাঁপন, ঠোঁটের বাঁক।

আমি অপেক্ষায় থাকতে থাকতে করছি কী- একটু পরপর সেই জলে ঝুঁকে ঝুঁকে আমার মুখটাকেও দেখে নিচ্ছি।

এই তো দেখা যায় আমার মাথা। সেখানে এই এট্টুক গুঁড়িগুঁড়ি চুল!

আমার না দীঘল-মেঘ চুল ছিলো? তারা কই?

তারা খোলসের সাথে গেছে, সেইদিন!

এখন ন্যাড়া মাথা ঢেকে দেবার জন্য্ এই মাথা তুলছে, এট্টুক এট্টুক চুলেরা!

কালো তারা। কিন্তু কেবল উঁকি দেয়া, এই ছোট!

মুখের কি দশা আমার?

সেটা বোঝার জন্য্ জলে উঁকি দেয়ার দরকার আছে কোনো?

আমি তো আমার হাতদের দেখছি! দেখছি পায়ের পাতাদের। সকল খানের চামড়া এমন লালচে এমন পাতলা এমন ফিনফিনে দেখতে! বোঝা যায়, পোক্ত্ হতে অনেক দেরী– এই ত্ব্কের।

আমি বুঝতে পারি, আমার মুখের চামড়ার হালও এমনই।

আমার সবকিছু আবার নতুন করে হয়ে উঠছে। গজাচ্ছে চুল। জন্ম নিচ্ছে ত্ব্ক।

কতোদিন হয় ঘটেছিলো- সেই খোলস খসে যাবার ঘটনাটা?

অনেকদিন? নাকি অনেক দিন নয়? মনে করতে চাই। কিন্তু এটাও সঠিক রকমে মনে করতে পারি না। তালগোল পাকিয়ে যায়।

কেমন হয়েছি দেখতে এখন আমি? জলে মুখ দেখে স্পষ্টরকমে বোঝা যায় না মুখের দশাটা! আর, জল যে সঠিকটাই দেখায়, তার ঠিকঠিকানা কী!

প্রাসাদে কতো কতো আরশি ছিলো! আয়নায় আয়নায় অলিন্দ্ ঝলমল। এইখানে আয়নার কোনো চিহ্নমাত্র নেই। মুখ দেখার একমাত্র্ সম্বল এই কালো ঝকমকা জল।

আমি তার দিকে ঝুঁকে গিয়ে গিয়ে আমার মুখটা খুঁজি। সেই একদিন আচমকা চব্বিশ বছর হয়ে যাওয়া মুখটাকে! না, সে কোথাও নেই।

এখন যে মুখটার ছবি ফুটতে দেখি জলের আয়নায়, সে একটা বড়ো মানুষের মুখ।অনেক বড়ো মানুষের মুখ। তার ত্ব্ক নড়বড়ে, লালচে।

“তোমার লাবণ্য্ কন্যা, জানবে ঘাসের সবুজ! ফুরাবে না কোনোদিন!” যতোবার মুখের অবস্থাটা বোঝার জন্য্ জলের দিকে ঝুঁকছি, ততোবার এই একটা কথাই শুনতে পাচ্ছি!

অথচ, আমার চোখ তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে- এই মুখে কেবল আছে বয়সের চিহ্ন! রুখো বয়স্ক মুখ এক। সেইখানে কোনো লাবণ্য্ কোনো দ্যুতি- কিচ্ছুর কোনো ছোঁয়া নেই!

এইই আমার মুখ? চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার-আপনা থেকেই। দেখা আর হচ্ছে না আমাকে!

এদিকে দেখো, কী মিথ্যা এক কথা গুণগুণ করে যাচ্ছে নদীজল, আমার মুখের সামনে।

এটা আমি? কোন আমি? মরে-যাওয়া আমি?

খোলসটার সেই ফিসফাস কথা মনে আসে। সে বলেছিলো না, সে নিয়ে যাচ্ছে আমার চব্বিশ বছর বয়সটাকে? বলেছিলো না এখন থেকে আমার বয়স হচ্ছে পঁয়ত্রিশ? চিরকাল ধরে পঁয়ত্রিশ?

তাহলে এই মুখ সেই পঁয়ত্রিশ বছরের মুখ! তাহলে এখন আমার বয়স পঁয়ত্রিশ! পঁয়ত্রিশের মুখেরা এমন আনন্দশূন্য, বিভা-খোয়ানো হয়?

আহ! কোন কপাল লিখনের কারণে এমন দুর্গতি!

তবে, এই হাহাকারে থাকারও যেনো কোনো অধিকার নেই আমার।

এখন যার পাশে ঠাঁই পেয়েছি; সে বলেছে- এই পঁয়ত্রিশ বছর বয়সটা নিয়ে এখন যেনো আমি কোনোরকম ভাবনায় না যাই। বলেছে, আমি যেনো শুধু দক্ষিণে মন দিয়ে থাকি। ওটাই খুব দরকার এখন।

সে বলেছে, ওই যে দক্ষিণ- সেইদিক থেকে কী-জানি একটা আসবে! আমার জন্য আসবে।

এই তো আমার ডান হাতের দিকে দক্ষিণ। আমি পুবমুখী বসে আছি। জল-ঝুঁকে এই বসে আছি!

এই নদীটার কেমন অদ্ভুত স্ব্ভাব! উত্তরে সে বয়ে গেছে সটান সোজা। সেইদিকে তাকালে কতো কতো দূর পর্য্ন্ত দেখা যায়। আর এদিকে, এই যে দক্ষিণে- এই নদী সরল সহজরকমে বয়ে যায়নি।

দক্ষিণে তাকালে শুধু ঘাট বরাবর একটুখানি নদী চোখে পড়ে।তার আগে কী আছে! আছে আচমকা বাঁক নেয়া পাড়।ডানদিকে বেঁকে যাওয়া পাড়।

কাজেই আমি দক্ষিণ দিকে চেয়ে থাকলে কী, দূর দক্ষিণের নদীধারা তো চোখে পড়ে না আমার। শুধু চোখে পড়ে উঁচু সুমসাম পাড়! আর, কাঁপতে থাকা সবুজ- চোখে পড়ে!

তবু আমি সেইদিকেই চেয়ে থাকি।

আমি শুনেছি তো, আমার জন্য্ যা আসবে, সেটা এমনি এমনি দেখা দিতে আসবে না!

সেই না-জানি কী-টা আমার জন্য নিয়ে আসবে নিদানের খোঁজ। সেটা এলে আমার কপাল-লিখন বদলে ফেলার নিদানের সন্ধান পাবো আমি। আমি খোঁজ পাবো সত্যিকারের আমি-র!

আমি ওই না-চেনা, না-জানা জিনিসটার জন্য্ বসে আছি এই ঘাটে। আজ সাতদিন হয়।

না-জানি কী-টার আসার কোনো নামনিশানা নেই।আজ সাতদিন হয় তার আসার কোনো লক্ষণ দেখিনি! শুধু বসে আছি তার আশায়।

কিন্তু তাতে কী! তার পথ চেয়ে থাকতে বড়ো ভালো লাগছে।

ভালো লাগছে জলের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকতে। চলে যেতে যেতে জলেরা

যেই যেই কথা বলে যাচ্ছে, সেইসব কথা শুনতেও ভালো লাগছে।

কোন কথা বলছে জল-স্রোত?

বলছে কোন এ্ক কন্যার কথা!

সেই যে সেদিন, এমনকী নিজের খোলসকেও হারাতে বাধ্য্ হয়েছিলো যেইজন, জলেরা বলছে তার কথা! সেইদিন তার খোলসই শুধু আপনা থেকে খসে যায়নি; খোলসটা  কিনা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলো সেইজনের শরীরের বয়সটাকেও! পলকে যেই কন্যা পেতে বাধ্য্ হয়েছিলো পঁয়ত্রিশ বছর বয়সকে!

“তারপর কি হয়েছিলো? মনে আসে?” যেতে যেতে জলস্রোত যেনো শুধাতে ছাড়ে না!

“খুব মনে আসে।” মনে মনে আমার গলাও যেনো একটু উঁচোয়।

খুব মনে করতে পারি, খুব মনে করতে পারি, ঘড়মড়িয়ে বাজ পড়ার আগে, ওই কন্যার অন্তর কেমন যেনো রুখে উঠেছিলো! তার শরীর তখন মরণকে ডাকছিলো। সদ্য্ খোলস-খসে যাওয়া, রক্ত থকথকে নিরুপায় দেহটা তখন মরে যাবার জন্য্ একদম তৈরি হয়ে উঠেছিলো! ওই খোসা-খসানো, কদর্য শরীর নিয়ে কন্যা কী করবে! যন্ত্রণা থকথকা দেহ নিয়ে আর কেনো বেঁচে থাকা! তাই মরণকে ডাকছিলো সে তখন- সর্বদেহ দিয়ে!

তখন কেমন করে, কেমন করে তার দিশাশূন্য্ অন্তর বলে উঠেছিলো, সে মরতে চায় না? সে মরতে চায় না! সে যেতে চায় নিদানের সন্ধানে! যাবে সে নিদানের খোঁজে! কেমন করে পেরেছিলো? কে জানে!

 

তারপর কড়কড়িয়ে বাজ পড়েছিলো। কন্যা জ্ঞানহারা হয়ে গিয়েছিলো।

তারপর কি হয়?

তারপর তার জ্ঞান ফিরেছিলো। একদম পূর্ণ্ চেতনা পেয়েছিলো সে।

তখন সে দেখতে পেয়েছিলো, সে শুয়ে আছে ঝামা শক্ত্, শুষ্ক্ একটুকরা মাটিতে।

সে আরো দেখতে পেয়েছিলো, তার দু হাত খরখরা কর্কশ কিছু একটাকে জাবড়ে ধরে আছে।

‘এটা কি? আমি কি মরে গেছি? এই ভাবনায় টলে উঠতে উঠতেই কন্যা উঠে বসেছিলো।

‘আমি কি তবে বেঁচে নেই? আমি কোথায়? দুহাতে কোন জিনিসকে আঁকড়ে ধরেছিলাম?’

কন্যার কাঁপতে থাকা শরীরটা তখন দেখতে পেয়েছিলো এক আজব বিষয়! দেখতে পেয়েছিলো, সে আসলে এতোক্ষণ শায়িত ছিলো এক খোলা আঙিনায়। দূরে দূরে ওই কতো গাছ দেখা যায়। কিন্তু এই আঙিনাটুকু ফাঁকা খটখটা! সেখানে কেবল খাড়া হয়ে আছে অদ্ভুত এক গাছ! মরা গাছ। বহুদিন আগে পোড়া-আংড়া হয়ে যাওয়া গাছ।

কন্যা তখন পরিষ্কার রকমে বুঝতে পেরেছিলো; সে এতোক্ষণ যা জাবড়ে ধরেছিলো সেটা ছিলো ওই মরা গাছটার গুঁড়ি। মৃত অথচ কোনো এক আশ্চর্য কারণে খাড়া হয়ে থাকা কড়ুই গাছটার গুঁড়ি জড়িয়ে পড়েছিলো কন্যা, এতোক্ষণ!

‘আমি এখানে কেন’- কন্যার অন্তরে এই প্র্শ্ন জাগার আগে, তার দেহখানাই হঠাৎই ফুঁপিয়ে উঠেছিলো, ‘আমি কী মরে গেছি!’

“না, মরবে কেনো? মরার তো কথাই আসে না! তুমি নতুন জীবনে আছো। নিদানের খোঁজে যাত্রা করেছো তুমি, কন্যা! পথই যে এখন তোমার আবাস!’ কে যেনো মেয়েটার মনের কথা শুনে নিয়ে এই জবাবটা দিয়ে দিয়েছিলো।

কে?

দগ্ধ-ঝামা কালোকুষ্টি কড়ুই গাছ।

“বলো তো সেই কন্যা কোনজনা? বসত কোন ঘরে? এই শোলক ভাঙতে যে পারে,  ধন্যি বলি তারে!”  আজকে দেখো, যেতে যেতে হঠাৎ আমাকে কেমন এক শোলক দিচ্ছে সরলা নদীস্রোত!

এ শোলক ভাঙতে না পারে কে? আমি তো পারিই!

ও জলধারা! যেতে যেতে শুনে নাও, সেই কন্যা আবার কোন অচিন জনা? এই আমি সেই জন!

ও উত্তরগামিনী নদীস্রোত! যেতে যেতে জেনে যাও, আমি এখন বসত করি সেই দগ্ধ আংড়া কড়ুই গাছের সাথে।

এই যে দক্ষিণ দিকে চেয়ে আছি আমি। চেয়ে আছি অজানা, অচিন, অদেখার আশার আসায়!

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close