Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১৫]

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১৫]

প্রকাশঃ May 18, 2017

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [পর্ব ১৫]
0
0

পর্ব ১৫

যেতে যেতে চলে যাচ্ছে কতো কতো দিন!

আমিও অপেক্ষায় আছি, এই ঘাটে বসে আছি, আজ কতো কতো দিন!

কই, দক্ষিণ থেকে বয়ে আসতে থাকা নদীজল তো কিছুই ভাসিয়ে আনছে না!

শুধু ঝিকিঝিকি স্রোত নিয়ে নিয়ে ছুটে আসছে এলেবেলে উদাসীন কালো জল।একই রকম করে!

সেই স্রোতে একটা সবুজ ঘাসের টুকরোও ভেসে আসছে না তো! এমনকী একটা মরা ডালও তো আসতে দেখা গেলো না কোনোদিন! এই এতোগুলো দিনের মধ্যে কিছুই ভেসে আসতে দেখলাম না তো আমি! দেখলাম, শুধু জল আসে!

শুধু জল আসে। শুধু জল। উদাসীন আনমনা জল!

সেই জল দক্ষিণ থেকে এগিয়ে এসে একটুখানি ঝাপটা দেবেই দেবে এই ঘাটকে। বরাবর এইই্ দেখে যাচ্ছি আমি, আজ কতোগুলো দিন ধরে!

জলস্রোত ঝাপটা দিয়ে চলছে, এই ঘাটকে সকল সময়ই, সেই একই রকম করে! কিন্তু কিছুই ভেসে আসছে না।

যেদিন জল-লাগোয়া সিঁড়িতে বসে আমি পা ভিজিয়ে রাখছি জলে, তারাও ঝাপটা পাচ্ছে তখন, একই রকমে।

সেই সামান্য্ ধাক্কাটুকু দিয়ে, জলস্রোত তারপর ছুটে যাচ্ছে উত্তরে। কোন দূরে কোন দূরে! সেই একই রকমে।

জলের মিহি কলকল আছে নদীর শরীরে। ওইটুকুই শুধু শব্দ এইখানে। নয়তো অন্য সবখানে নৈঃশব্দ্য!

মস্ত গম্ভীর রকমের নৈঃশব্দ্য – সকল সময়েই ছড়িয়ে থাকছে পাড়ে পাড়ে- একই রকমে! সেই প্রথম দিনে যেমন পেয়েছিলাম, ঠিক তেমনই। এই এখনও একই রকম!

কই, কিছুই তো ঘটছে না! কিছুই তো আসছে না!

কী নাকি আসার কথা! আসে নি তো আজও!

তার আসার তো কোনো লক্ষণও নেই!

আমি বসে আছি তার আসার আশায়।

আসবে সে?

শুনেছি আসবেই সে।

কিন্তু কই, আসছে না তো!

আমার এখন শুধু পথ চেয়ে থাকা। শুধু দক্ষিণের দিকে তাকিয়ে থাকা।

আজ রাত ফুরালে পূর্ণ্ হবে একুশ দিন।আমি আজ একুশ দিন ধরে পথ চেয়ে আছি।

কই, কিছুই তো আসে না?

কিছুই আসছে না।

রোজ রাতের শেষ  প্রহরে এসে বসি এই ঘাটে।

তখন মাটিতে অন্ধকার, আকাশেও অন্ধকার। আশপাশ নিঃঝুম। পাখি ডেকে ওঠারও আগের সেই ক্ষণে; আমি চলা শুরু করি। েএই ঘাটে আসার জন্য্ চলা শুরু করি। তারপর, খুব ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাই, ঘাটে।

জোর পায় হাঁটা যায়; কিন্তু ভয় হয়, আমার পায়ের আওয়াজে না বৃক্ষলতার ঘুম ভেঙে যায়! শেষ রাতের ঘুম! থাকুক ওটা গাঢ় হয়ে মাটি ও বৃক্ষ-গুল্ম ও আকাশের চোখে। অল্প খানিকটা সময়ই তো এমনটা থাকবে!

তারপরেই তো জেগে ওঠার সময়টা আসবে। আপনা থেকেই জেগে ওঠার সময়! তখনই জাগুক না সকলে?

কিন্তু এখন নয়! এই অসময়ে কোনো জন যেনো আমার কারণে না জেগে ওঠে! আমার কারণে যেনো ঝামেলায় না-পড়ে কেউ! তাহলে আমার লজ্জার শেষ থাকবে না! এমনই মনে হতে থাকে আমার।

সেই সময়টাতে রোজ আমি নিজেকে পুরো হাওয়ায় ভাসতে থাকা ধুলোর মতন শব্দহীন করে ফেলার চেষ্টাটা চালাতে চালাতে এগোতে থাকি! থির অন্ধকারের ভেতর এক সচল অন্ধকার!

ধীর সর্ন্তপন কদমে, একদম তুকে তুকে, আমি এসে বসি ঘাটের সিঁড়িতে; রোজ।

সচল অন্ধকারটা শেষে এসে মিশে যায় স্থির অন্ধকারের সাথে।

ঘন অন্ধকারে মোড়ানো এই ঘাটে এসে আসন নেয়ার প্রথম দিকে, আমার মনে হতো, রাতের এই শেষ প্রহর কী দীর্ঘ্! কী না-ফুরন্ত্! কী ভয়ানক কালো- এই আঁধার!

মন তখন হায় হায় করে উঠতো! মনে হতো, এই অন্ধকারে বসে থেকে, আমি কেমন করে বুঝতে পারবো- দক্ষিণ থেকে কিছু আসছে কিনা! কিছুই যেখানে দেখা যায় না; সেখানে কী করে বোঝা সম্ভব যে, দক্ষিণ থেকে কিছু আসছে? ভেবে ভেবে প্রথম কয়দিন আমার অন্তর ছটফটাতো! বেহিসাব ছটফট করতো!

তবে এখন দিনে দিনে, ধীরে ধীরে, আমার জানা হয়ে গেছে; শেষ রাতের এই আঁধার বেশীক্ষণ থাকে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুব আকাশে জেগে ওঠে ঝলমলে একটা তারা! শুধু একা এক তারা!

সেই তারার আলো এসে ঘাটের অন্ধকারকে ফিকে করে দেয়।দক্ষিণ দিককেও আর তখন থমথমা, দূর অদেখা বলে মনে হয় না।

তখন মনে হতে থাকে; এই ঘাটে আমি যেমন বসে আছি, পুবমুখী একজন। আকাশের পুবঘাটেও তেমনি এসে বসেছে এক তারা!পশ্চিমের দিকে তার মুখ! সেও কি আমার মতোই একলা বসে আছে?

রোজ তার দিকে চেয়ে চেয়ে থাকি অপলক।

রোজ তার দিকে চেয়ে থাকতে, আস্তে আস্তে, কতো কতো কথা যে মনে আসতে থাকে! আর ধীরে ধীরে আমার মনের ভেতরে কেমন ধক করে করে উঠতে থাকে! কেনো যে! বুঝে উঠতে পারি না!

রোজ রোজ, কেনো যে তখনই, কতো রকমের কথা মনে এসে যায়! কতো যে সব অদ্ভুত কথা!

অথচ এই যে প্রত্যেকটা দিন; সমস্তটা দিন ধরে, জলের দিকেই চেয়ে থাকি! ওই দক্ষিণের দিকেই তো চেয়ে চেয়ে দিন পার হচ্ছে এখন! কই, ওই সবদিকে তাকিয়ে তো এমন এমন নাই-কথা মনে আসে না?

কোনো কথাই তো মনে আসে না! মনে আসে না কোনো শোক-তাপ, কোনো আফসোস! কিচ্ছু না!

অথচ, যেই শেষরাতের শেষদিকে পুবের আকাশে তারাটা এসে বসে; যেই তার দিকে একটু চেয়ে থাকি, অমনি চোখ জলে ভরে আসে। ঝলক দিয়ে দিয়ে জল জাগনা দিতে থাকে চোখে! তারপর হুড়মুড় নেমে আসতে থাকে! আমার বারণ শোনে না। কোনো মানা মানে না!

আর তখন, আমার অন্তরের ভেতরেও কেমন মোচড় পড়তে থাকে।খামচে ধরতে থাকে আমার পরানটাকে, কিসে যেনো!

আজ কতোদিন হয়-আমি ভালো নেই! কতোদিন হয় আমি সুস্থির নেই! কতো দিন হয়ে গেছে- কিচ্ছু ঠিক নেই আমার!

মনে আসে, আমি প্রাসাদকন্যা! সেই আমি আজ কোথায়!

আমি প্রাসাদকন্যা! একদা সেই প্রাসাদে আমার বাবা ছিলেন। মা তো ছিলেনই। আর ছিলো আমাকে দরদ-করার সেই একজন! আমার দাদা! আমি ভালো ছিলাম তখন! ভালো ছিলাম?

সেই শিশুবেলায় ভালো ছিলাম নাকি?

আজ কোথায় সেই প্রাসাদ? সেই শিশুবেলা আজ কই? বাবা হয়তো এখনও আছে, কিন্তু কপালগুণে সেই বাবা আমার থেকেও নেই! নাকি দূর বিদেশে, বাবারও দেহান্ত ঘটেছে! কী জানি!

বাবার কথা মনে এলে, মন এমনই অনিশ্চিত হয়ে যায়!

কিন্তু দাদার কথা মনে আসে যেই, অমনি মন স্থির সুনিশ্চিত গলায় বলতে থাকে, দাদা আছে।আছে ও।

সেই শেষরাতে, তারাটার দিকে থির চোখে চেয়ে থাকতে থাকতে, আমি শুনতে পাই আমার মনের কথা। মন বলতে থাকে, দাদা আছে! দাদা বেঁচেই আছে! ওর দেহান্ত হতেই পারে না!

তারপরই আমি ভেতরে-বাহিরে মলিন হয়ে যাই!

জল-ডুবুডুবু চোখে তারাটার দিকে চেয়ে চেয়েই আমি মনকে শুধাতে থাকি; বলো তো, দাদার সেই বেঁচে থাকায় কোন ফল? আমার জন্য্ সে কি ফিরে আসবে? এখন দাদা কই, আমিই বা কই?

এই কথা মনে আসে, আর দরদর জলের তোড়ে চোখেরা ভেসে যেতে থাকে।

শোনা তো আছে যে, আমি এক উচ্চ বংশের সন্তান! কোন অর্থে এই বংশ তবে উচ্চ বংশ? এই প্র্শ্ন্ টা তখনই আবার নতুন করে মনে আসে!

ওই যে মস্ত প্রাসাদটা ছিলো, ওইটা থাকার কারণে ওটি উচ্চ বংশ?

নাকি, এই যে এইভাবে বংশের কোনো কোনোজন বিবাগী হয়ে নিরুদ্দেশে চলে যেতে পারে, কোনো কোনো জন ইচ্ছা হলেই ইচ্ছামৃত্যু নিতে পারে, সেই কারণে এটা উচ্চ বংশ?

বা, এই যে বংশের একমাত্র জীবিতজন – এই যে কন্যা; তাকে অপার পাথারে ভাসায়ে যেতে-এমনকী মায়েরও কুণ্ঠা হয় না যে বংশে, এমন কুণ্ঠাশূন্য্ মা থাকে বলেই এটা উচ্চ বংশ?

আর আমি? আমি কি? সব-খোয়ানো একজন।

তারপর অবস্থার চাপে পড়ে যে-কিনা নিদানের খোঁজে যেতে নিজের মনকে সম্মত করিয়েছে, সে-ই বা কোন উচ্চ চলাচলতির মানুষ?

তার শ্লোকেরা উড়ে না গেলে, তার দেহের খোলস আপনা থেকে খসে না গেলে, সেও কি তার আরামের নিবাসকে ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে যাওয়ার সাহস দেখাতো কদাপি?

দেখাতো না।

এটা কি উচ্চ বংশের সন্তানের লক্ষণ?

এইসব কথা সেই তারার আলো-মাখানো অন্ধকারে বসে বসে রোজকার ভোররাতে আমার মনে আসতে থাকে। আমার চোখ তখন দরদরাতে থাকে। নিজেকে তুচ্ছ মনে হতে থাকে। অনেকখানি ঘৃণা হতে থাকে! একটুও ভালো লাগতে থাকে না তখন নিজেকে! কিছুমাত্র্ নয়।

তখন খুব বুঝতে পারতে থাকি; আমি ভালো নেই! আমি আজ কতো দিন হয়, ভালো নেই! কিছু মাত্র্ ভালো নেই। প্রাসাদে যখন ছিলাম, তখন কি ভালো ছিলাম? সেই কথা মনে আসে, নিজেকে তখন বিপুল বিপন্ন লাগতে থাকে!

মনে হতে থাকে, উত্তরে ওই যে নদী কোন দূরের দিকে চলে গেছে- পাড় ধরে ধরে হেঁটে হেঁটে চলে যাই তবে এক্ষুণি সেই দূরের দেশে। চলে যাই।

থাকুক পড়ে এইসব কিছু। এই পথ-চাওয়া। দক্ষিণের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দিন পার করা। থাকুক পড়ে।থাকুক পড়ে এই থির বসে থাকার জীবন।

আমার এক্ষুণি চলে যাওয়া চাই! এক্ষুণি!

মনের মধ্যে এমন ভাবনার তাণ্ড্ ব চলতে থাকে বলে আমি প্রায় কোনোদিনই সূর্যোদয়কে দেখতে পাই না। একটা দিনও আমি সূর্যের উঠে আসাটাকে খেয়াল করতে পারি না! খেয়াল করে উঠতে পারি না তার দুদ্দাড় জোর লাফটাকে!

সূর্যের কথা খেয়ালে আসে পরে। যখন কিনা পুবদিক থেকে আচমকাই রোদ ছুটে এসে আমার মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে, তখন যেনো আচমকাই আমারও হুঁশ ফেরে!

যেই কিনা পুব দিক থেকে দকমকিয়ে রোদ আসতে থাকে আমার দিকে; তখনই শুধু ওইসব যাতনা-দেওয়া ভাবনারা হঠাৎই, ঝুপ্পাত করে, খসে যায় আমার শরীর থেকে। খসে যায় আমার অন্তর থেকে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close