Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান > বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো >> উপন্যাস [পর্ব ১৬]

আকিমুন রহমান > বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো >> উপন্যাস [পর্ব ১৬]

প্রকাশঃ June 4, 2017

আকিমুন রহমান > বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো >> উপন্যাস [পর্ব ১৬]
0
1

পর্ব ১৬ 

তারপর সারাটা দিনে একবারও সেই বেদনা ও আফসোসের বিষয়-আশয় মনে আসে না! এমনকী রাতের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রহরেও আর তাদের দেখতে পাই না। কোনো যন্ত্রণা, কোনো দুঃখ-শোক-তাপ, কোনো হায়-হুতাশ- কিছুই মনে আসে না।কিচ্ছু মনে থাকে না।

অথচ শেষরাতের এই শেষ সময়টাতে- এসব কেমন উৎপাত! ক্ষণে ক্ষণে এ কেমন  কান্না!

আমি ভালো নেই আমি ভালো নেই আমি ভালো নেই- আজ কতোকাল!

এমন নানান কথা এখন কেবলই মনে আসে।মনে আসে, আর মন শুধু পাথর-ভারী হয়ে হয়ে থাকে।

এই শেষরাতে, অন্ধকার ঘাটে বসে থাকা আমার মন শুধু কান্নার মতো টলমলো করতে থাকে!

কেনো এইসব কথা মনে আসা-যাওয়া করে? আগে তো কখনো এমন কথা মনে আসাআসি ছিলো না! কেনো এখন এরা এমন আসা-যাওয়া করে? কেনো এমন পোড়াতে থাকে আমাকে?

সেই যে তখন; যখন আমি প্রাসাদবাসিনী ছিলাম, যখন আমি হঠাৎ করে পেয়ে গিয়েছিলাম চব্বিশ বছর বয়সকে, সেই আমিটা কি এমন করে পুড়তে জানতো? পুড়তো তখনও?

কী জানি!

আমি এখন আর সেটা স্পষ্ট করে  মনে করতে পারি না!

কিন্তু এখন; রোজ শেষরাতের অন্ধকার ঘাটে বসা আমার অন্তরে দেখো, এখন কতো পোড়াপুড়ি! কতো হাহাকারের জল এখন আমার চোখে!

আমি সুস্থির নেই, আমি ভালো নেই আজ কতোদিন!

ঘোলা অন্ধকারে বসে থাকা আমার শরীর কতোবার এই কথা মনে করে করে, দমকে দমকে উঠতে থাকে!

তবে আমার এমন অস্থির অবস্থাটা থাকে শুধু আঁধার ভরা শেষরাতের কালে।শুধু ওইটুকু সময়েই থাকে।

তারপর দিন ফুটে উঠলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না। দিন দেখা দিলেই আমি অন্য্ কেউ একজন যেনো হয়ে যাই। সুস্থির একজন।

তার কোনো শোকতাপ নেই।তার অন্তরে পুরোনো কথার কোনোরকম ওড়াউড়ি নেই! দিন জেগে উঠলেই আমি অন্য আরেক আমি হয়ে যাই!

সেই আমি শুধু অপেক্ষা করতে জানে। সে শুধু পথ চেয়ে থাকে।

তার তখন কেবল পথ-চাওয়াটুকু থাকে।শুধু এই-ই!

ভোর আসে একদিকে, অন্যদিকে আমার চোখ পেতে রাখা শুরু হয়, দক্ষিণের দিকে।

তারপর কেবল দক্ষিণের দিকেই পলকহীন চেয়ে থাকার চেষ্টাটা করে যেতে থাকি, সমস্তটা দিন।

আসে নাকি? আসছে?

চেয়ে থাকি, চেয়ে থাকি।

চেয়ে থেকে থেকে আন্দাজ-অনুমানও করে যেতে থাকি!

কি আসতে পারে? কি? কি আসবে?

আসবে কি একটা কোনো পদ্ম্ ফুল?

প্রাচীন শ্লোকে শ্লোকে যাকে আমি শতদল নামেও ডাকতে শুনেছি, সেই ফুল কি ভেসে আসার কথা? সেই ফুলের ওপর বসে থাকবে একটি ভ্র্মর? সেই ভ্রমর এসে গুনগুনাবে? সেই সুর থেকে পাবো আমি নিদানের খোঁজ?

আমি জানি না শতদল বা পদ্মফুল দেখতে কেমন! কিন্তু ভূর্জপত্রে লেখা কিছু প্রাচীন শ্লোকে আমি পড়েছিলাম, সেই পুষ্পসাদা ও গোলাপি বরনের পাপড়িধারিণী!

আমার জন্য কি পদ্মপুষ্প ভেসে আসবে দক্ষিণ দিক থেকে?

নাকি দক্ষিণ থেকে জলের ওপর দিয়ে আধো ভাসা-আধো উড়ন্ত হয়ে হয়ে, আমার দিকে আসবে কোনো পক্ষী? কতো কতো শ্লোকে আমি সেই পক্ষীর কথাও পেয়েছি!

পুরাতন দিনের কোনো কোনো শ্লোক সেই পক্ষীকে হীরামন নামে ডেকেছে! আমি জানি তা!

কোনো কোনো শ্লোক ডেকেছে শুক পক্ষী নামে! সেও তো জানি আমি!

আরো জানি, সেই পক্ষী ত্রিকালদর্শী! বিবিধ নিদানের সন্ধান জানা থাকে তার! সেই পক্ষী কখনো একা থাকে, কখনো তার সাথে থাকে তার সঙ্গিনী! তার নাম সারি!

তারা জানে আসল স্ব্প্ন্ কন্যা কিম্বা স্ব্পনকুমারের সন্ধানও!

তবে কি আমার জন্য্‌ও আসবে এমনই এক শুক পক্ষী? নাকি, তার সাথে তার জুড়ি-তার সঙ্গিনী – সারি পক্ষীও আসবে?

শুক পক্ষী কিম্বা সারি পক্ষী-দেখতে কেমন!আমার তা জানা নেই। কিন্তু শ্লোকে শ্লোকে আমি কতো পড়েছি তাদের কথা! দেখলে ঠিক চিনে ফেলবো আমি।

তাহলে কি শুক-সারি এই দুইজনেই আসবে, আমার জন্য?

এই কথা মনে করে করে আমি একা একা হেসে সারা হই! কী সব আউলা-বাউলা কথা মনে আসে! দেখো তো, কেমন কেমন সব আবোল-তাবোল কথা মনে মনে ওঠানামা করে যায়!

এসব তো কেবলই শ্লোকের কথা! এসব সত্য তো নয়! মোটেও সত্য নয় তো!

তারপরেও কখনো কখনো মনে হতে থাকে- এই সবকিছুই সত্যি! সত্যি সত্যিই, এমনই ঘটবে! হয় ভেসে ভেসে আসবে শতদল পুষ্প বা পদ্ম! দিনের রোদ লেগে, তার পাপড়ির ওপর দিকের গোলাপি রঙ ঝিকিমিকি ঝিক করতে থাকবে!

ধীরে স্রোতে ভেসে ভেসে এসে থামবে সেই ফুল; এই যে ঘাটের কিনারে! আমার হাতের নাগালে!

আমার আশাভরা চোখ তখন আকুলি বিকুলি করতে থাকে! কখন আসবে? কখন!

তারপর হঠাৎই আবার যেনো হুঁশ ফিরে আসে। হেসে উঠে নিজেকে সামলাতে থাকি তখন! কী যে উদ্ভট কথা মনে আসে!

আমি কি জানি কী আসার কথা? জানি তো না!

তাহলে বরং শুধু পথ চেয়েই থাকি? আসুক, যা আসার! আসুক তার আপন নিয়মে!

রোজকার মতোই, এমন কতো কতো ভাবনার দোলাদুলি নিয়ে আজকের দিনটাও, এই তো যাচ্ছে! আজকে এই তো একুশ দিন যাচ্ছে!

অন্য্ দিনের মতো, আজকেও ভোররাতে উপচে উঠেছে জল, আমার চোখে। আজকেও সেই উথলে-ওঠা চোখের জল মুছতে মুছতে পুরো সকাল পার করেছি।

অন্য সকালগুলোর মতোই।

দক্ষিণের জল আজ সকালেও কিছুই ভাসিয়ে আনে নি।

কিন্তু অন্য্ দিনের মতোই, আজকেও, আমি সেইদিক থেকে একটুও চোখ সরাই নি! চেয়েই থেকেছি, আর দেখেছি তিরতির স্রোত একই রকমে এগোচ্ছে! আমার দিকেই এগোচ্ছে! আর কিছু নয়!

তারপর একসময় দুপুরও ফুরিয়ে গেছে!

আজকেও; সেই অন্যদিনের মতোই ঝুম, গনগনে রোদ আর নৈঃশব্দ্য নিয়ে দুপুর ঢলে গেছে, আমার পেছনে!

দক্ষিণের জলে ভেসে ভেসে আজকের সারাটা সকালে, পুরোটা দুপুরেও কিছুই আসে নি। কিছুই নয়!

দুপুর ফুরিয়ে এই তো বিকেল এখন।

অন্য্ দিনের মতো এই তো আজকেও, একটু আগেই; পেয়েছি বিকেলের কড়া, খরখরা বেলাটুকু।

সেই খরখরা বিকেলেও একই রকম শূন্য জলধারা- বয়ে বযে গেছে আমার সামনে দিয়ে! কিছুই আসে নি !

তারপর, এই যে বিকেল এখন মিহি রৌদ্রমাখানো।ঢলে-পড়া বিকেল।

আর একটু পরেই আসবে সন্ধ্যা!

তিরতির শূন্য্ জলস্রোত বয়ে বয়ে যাচ্ছে। বয়ে যেতে যেতে আমাকে যেনো বলে চলছে; শোনো শোনো ! এই তো আরেকটা দিনও, কেবল আশায় আশায়ই যাবে তোমার! কিছুই ঘটবে না! কিছুই আসবে না!

জানি তো, অন্য্ দিনের মতোই আজকের বিকেলও শুধুই নিষ্ফল যাবে! কিছুই আসবে না!

ভেবে ভেবে ক্লান্ত আমার মন করে কী, দক্ষিণ থেকে চোখ সরিয়ে আনে! কী লাভ এমন পলকহীন চেয়ে থেকে থেকে! কী ফল! কোনো ফল নেই!

এই কথা ভাবতে ভাবতে আমার কাহিল চোখের পাতারা আচমকাই মুদে আসে।

‘আজকে রাতে ফিরে গিয়ে, কড়ুই বৃক্ষের সাথে বিষয়টা আবার ফয়সালা করে নিলে কেমন হয়? আর কী দেখার আছে, বলো?’ বন্ধ্ চোখেরা আমার অন্ধ্ অন্তরকে এই কথা জিজ্ঞেস করে।

অন্তর তাদের জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে একটু বিস্রস্ত হয়ে যায়! কী উত্তর দেবো বলো? কি? কোনোরকমে এমন কিছু একটা কথা বলতে চায় আমার অন্তর, তবে সেই কথা সে শেষ করতে পারে না!

হঠাৎই আমার শরীর আমার অন্তরকে ঝাটকা ধাক্কা দেয়!

আমার বন্ধ চোখেরা ধুছমুছ চেয়ে ওঠে। তারপর হতভম্ব চাউনি দিয়ে দিয়ে তারা ওই আকস্মিক ঝাটকার কারণ সন্ধান করতে থাকে!

কেনো? কি? কি? কি জন্য এমন?

ওই দেখো, দক্ষিণে কী দেখা যায়!

দক্ষিণের স্রোতে ওই দেখা যায়, কী জানি একটা ভেসে আসে!

কী! কী! আমার পরান ধক করে ওঠে!

কে ভেসে আসো? কে আসছো?

আমি সেটা ধরতে পারি না! কেন না দক্ষিণের ওইখানটা থ্যাবড়া একটা বাঁক নিয়ে  চলে গেছে পশ্চিমের দিকে! এই ঘাট থেকে তাকালে ওইখানটা পরিষ্কার বোঝা যায় না। শুধু আবছা চোখে পড়ে বাঁক আর পাড়ের সবুজ ঝোপলতা!

সেই বাঁকের মুখের নদীস্রোতে, ওই দেখো কী জানি একটা ভেসে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে!

একটু একটু করে, এই তো আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ওটা!

ওটা দেখতে একখণ্ড তক্তার মতো! কালচে-বাদামী তক্তা, জল থেকে অনেকটা উঁচিয়ে আছে!

কী কী কী! কী ভেসে আসো আমার দিকে!

ও অপরাহ্ন্! ও মোলায়েম রোদ! ও খোলামেলা হাওয়া! ও নদীস্রোত ও বিকেলের নদীস্রোত- ভাসিয়ে আনছো তো তারে! ভেসে আসছে সে! আমার দিকে আসছে!

আসছে তো! আসছে!

আসছে আসছে! সত্যি যে আসছে!

আসছে আসছে!

কিন্তু কী! আমি যে বুঝতে পারছি না! যা আসছে সেটা কী!

ও বিমনা ঘাট, তুমি কি ধরতে পেরেছো ওটা কি? পেরে থাকো যদি, আমাকে বলে দাও! একবার কথা বলো! একবার বলে দাও, কী আসছে!

উল্লাসে উৎকণ্ঠায় আমি তছনছ হয়ে যেতে থাকি।তছনছ হতে হতে বিবশ হয়ে যায় আমার শরীর। আমি একরত্তি নড়ার শক্তি পাই না! থির বসে থাকি। থির।

আমার চোখেরা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধাক্কায় এমন জখম হতে থাকে যে,তারা একপলকের জন্য মুদে আসার শক্তি পায় না।

শুধু বিস্ফারিত চেয়ে থাকে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close