Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৬]

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৬]

প্রকাশঃ December 23, 2016

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৬]
0
3

উপন্যাস / পর্ব ৬

দিনে দিনে চূড়ান্ত লগ্নটি একেবারে নিকট হয়ে ওঠে। দিনের মধ্যাহ্ন থেকে, সম্ভবাটির ব্যথা শুরু হয়। সেই বেদনা প্রথমে আসতে থাকে ধীরে-থেমে থেমে থেমে। একটু কেমন টিমটিমে রকমের ব্যথা।

গোড়ার দিকে এমনই হয়- এমনটা হওয়াই রীতি-ঘরের সকলেই জানে। এই ব্যথার পরে আসবে মাঝারি রকমের ধাক্কা-দেওয়া ব্যথা। তারপর দুনিয়া লণ্ডভণ্ড করে দেওয়া ব্যথা। সেই সব ব্যথা-যন্ত্রণা আসবে একে একে। দিনে দিনে। এখন তো কেবল শুরুরটা  দেখা দিয়েছে। কাজেই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

ঘরের বয়স্করা তাই বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো বিচলন বোধ করে না। বরং রাত একটু বাড়ার দিকে যখন যেতে থাকে, তারা যেনো ক্রমে অনেকটা ভুলেও যায় সম্ভবাটির ব্যথা-ওঠার ব্যাপারটি।

তারপর রাত ধীরে ধীরে গহন হতে থাকে। আর দেখো কী কারবার! যেই যন্ত্রণা দেখা দেবার কথা আরো অনন্ত দিন দুই পরে, সেটি আচমকা এই প্রথম বারেই দেখা দিয়ে দেয়। ঝটকা একটা ধাক্কা দিয়ে বেড়ে ওঠে ব্যথা- খুব তাগড়া রকমের ব্যথা। বিষম বিষম রকমের যন্ত্রণা পেতে থাকে সম্ভবাটি।

লক্ষণে বোঝা যায় শিশুটির ভূমিষ্ঠ হবার ক্ষণ উপস্থিত। প্রসূতিরও অবস্থাও বেঠিক নয়। সকলে শিশুটিকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে, কিন্তু দেখা যায় শিশুটি মায়ের গর্ভ থেকে যাত্রা করছে না। কেবল ব্যথা দিচ্ছে, পথ খুঁজছে, কিন্তু যাত্রা করছে না।

কেনো! এটি কেমন ব্যাপার! পথের কোনোখানেই তো কোনো বিঘ্ন নেই! তাহলে বেরুচ্ছে না কেনো!

ঘরোয়া সর্ব টোটকা একে একে প্রয়োগ করা হয়। কোনোই সুফল ফলে না। যাতনা যেমন তীব্র ছিলো তেমনই থাকে।

ক্রমে আরে বিপত্তি দেখা দিতে থাকে। এতোক্ষণ দেখা গেছে- যন্ত্রণা সইতে সইতেও বধূটির পূর্ণজ্ঞান ছিলো। সে কঁকাচ্ছিলো, গোঙাচ্ছিলো, নিস্তার পাবার জন্য অষ্ফুট প্রার্থনাও করে চলছিলো।

কিন্তু তারপর একসময় দেখা যায়,কঁকাতে কঁকাতেই বধূটির চেতনা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে হঠাৎ। কিছুপরে আবার চেতনা ফিরে পাচ্ছে সে।এই সংজ্ঞা হারাচ্ছে, এই জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে। এমনটাই চলতে থাকে।

হায় হায়!এমনটা তো ভালো লক্ষণ নয়! এমনটা চলতে থাকলে তো সর্বনাশ ঘটবে। এমন হলে তো ক্ষয় হয়ে যায় মায়ের দেহের বল! নষ্ট হয়ে যায় গর্ভের শিশুকে বাইরে বের করে আনার শক্তি। এমন হলে সর্বক্ষেত্রে দেখা যায়, বাচ্চাটা মরে পেটের ভেতরেই, তবে সে সঙ্গে করে নিয়ে যায় মা-টিকেও।

এমন কঠিন উৎকণ্ঠার কালেই, সেই গহীন রাতেই, বুলবুলি পাখিদের কথাটা মনে পড়ে একজনের।

ওরা ডাকছে কি? শোনা কি যায় ওদের ডাক? কই! এই তো এমন নিরালা নিস্তব্ধ রাত! একটা কোনো আওয়াজ উঠছে না জগতের কোনোখানে! এমন কালে কোনো একটা পক্ষী ডেকে উঠলে- শোনা তো যেতো সহজেই! কই! বুলবুলির স্বর তো শোনা যাচ্ছে না! বুলবুলি তো দূর- কোনোরকমের কোনো পক্ষীকণ্ঠই তো ভাসছে না নিশুথি রাতের বাতাসে!

এ কী সর্বনাশা কথা! ওরা ডাকছে না কেনো এইবার?

ঘরের ভেতরে যন্ত্রণাকাতরতা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত সকলজন উৎকর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো ডাক শোনা যায় না।

ভয় ও উৎকণ্ঠার চাপ আর সইতে পারে না বলে জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মীটি শেষে মনস্থ করে যে, এই রাতের কালেই সে যাবে দূর-প্রাঙ্গনের কড়ুই গাছের কাছে। গিয়ে, স্বচক্ষে  সে দেখে আসবে বৃত্তান্তটা।

একলা, সকলের অগোচরে গৃহকর্মীটি উঠানে নামে। তারপর এগোতে থাকে দূর কড়ুই গাছটির দিকে। যেতে যেতে তার নজরে আসে, রাত আর রাত নেই! সে কখন ফুরিয়ে গেছে! যদিও মাটিতে, গাছে গাছে, এখনও অনেক অন্ধকার।

কিন্তু আকাশে আকাশে- ওই তো ঊষাকাল সমাগত! ওই দেখা যায় পুব দিগন্তে ফিকে লাল ও সাদার ঝলক!

কড়ুই গাছের ডালে ডালে, বসা আছে তো, জোড়ায় জোড়ায় বুলবুলি? গৃহকর্মীটির বেদিশা চোখেরা তল্লাশ করতে থাকে।

গাছের ডালপালা, পাতায় পাতায়, এলোমেলো ফাঁকা ফাঁকা অন্ধকার। তার মধ্যেও গৃহকর্মীটি দেখে, ডালে ডালে ঠিকই বসা আছে বুলবুলি। জোড়া জোড়া।

তবে তারা যেনো ঠিক আগের মতন নেই। আগে তারা বসতো ছড়িয়ে– বিছিয়ে।এ-ডালে সে-ডালে, জোড়ায় জোড়ায়।

আজকের এই সময়ে, তাদের বসাবসিটা যেনো কেমন তাজ্জব-রকমের দেখাচ্ছে! বসা আছে তারা ঠিকই, তবে পুরো গাছ জুড়ে জোড়ায় জোড়ায় বসে নেই।

সকলে বসা,তবে গাছ জুড়ে বসা নেই।বসে আছে গাছের একপাশের দু-তিনটা ডালে, গাদাগাদি করে বসা।

অথচ অন্যদিকে গুচ্ছের ডাল খালি পড়ে আছে! ওরা  ওদিকে বসতে তো যায়ই নি। ওদিকে ঘাড়ও ফেরাচ্ছে না কোনোজন। আজকে কেনো এমন করে বসে থাকা ওদের? কেনো? কোন কারণে? এবং সকলেই এমন চুপ কেনো? এমন হিম-চুপ?

গৃহকর্মীটি কিছুই স্পষ্টরকমে বুঝতে পারে না, তবে তার বড়ো অশান্তি লাগতে থাকে। তার মনে হতে থাকে, কিছু একটা অমঙ্গল- ঝুম দিয়ে বসে আছে- ওই ফাঁকা ডালগুলাতে।

এমন কেনো মনে হয় তার! এমন কল্যাণে-ভরা সংসারে অমঙ্গল আসবে কোনখান থেকে? কোন কারণেই বা আসবে? আলাই-বালাই দূরে যাক! দূরে যাক!

এমত ধন্দ নিয়ে ও দোষ-কাটানী মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে, সে কড়ুইগাছটির তলায় গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর মাথা উঁচিয়ে, ভালোরকমে নজর করে সে দেখে, এইখানে- এইসব ফাঁকা ডালগুলাতে- বুলবুলিরা বসবে কী! এইদিকের সবচেয়ে নিচু ডালটাতেই দেখো বসা আছে দুই দুইটা দাঁড়কাক!

তাগড়া তেজী তারা দুইজনই।

তবে একটাকে যেনো একটু ভোমা একটু ভারী-ভারিক্কি দেখায়! অন্যটা একটু যেনো ছিপছিপে, একটু যেনো রুখো রুখো! আর দেখো, কেমন আশ্চর্যের বিষয়! দাঁড়কাক দুটোর একটা মাদী আর অন্যটা যে মর্দা- এমন নয়! দুটাই মর্দা!

দুটো জোয়ান মর্দা দাঁড়কাক পাশাপাশি বসে আছে- এমনটা কে কবে দেখছে!

দেখে মনে হতে থাকে, ওরা কোনো একটা কঠিন কাজ করতে করতে হয়রান হয়ে গিয়ে যেনো এখন খানিকটা বিরতি নিচ্ছে। যেনো ওরা পাশাপশি আছে কিন্তু মিত্র নয় কেউ কারো। তারা আদপে একে অন্যের দু্শমনের অধিক দুশমন!

গৃহকর্মী আরো কঠিন চোখে তাকায় কাকদুটোর দিকে। বাড়ির এমন সংকটের কালে, গাছের ডালে, বুলবুলিদের সঙ্গে, এরা বসতে এসেছে কেনো? আর কোনো পক্ষী নয়, শালিখ নয়, টিয়া নয়, টুনটুনি নয়! বসতে এসেছে কিনা কাক! তাও নরম-দিল আর ছ্যাচড়া-নজরের পাতিকাক নয়। দামড়া শরীরের, নিদয়া দিলের দাঁড়কাক! দু্‌ই দুইটা দাঁড়কাক!

কাক যে অমঙ্গলের বার্তা আনে- সে কথা কে না জানে! গৃ্হকর্মীটিরও তো তা জানা আছে! এই দুই কাক আজকের এই দিনে, এইখানে কেনো? এরা তবে কোন অমঙ্গলের বার্তা এনেছে? কোন সর্বনাশের কথা জানাতে এসেছে, এই দুইটা? হায় হায়!

গৃহকর্মীটির অন্তর ফড়াৎ করে করে ফেঁড়ে যেতে থাকে। হায় হায়!

এদিকে, কাকদুটো গৃহকর্মীটিকে  একঝলক দেখে কী দেখে না- আচমকা যেনো কিসের থাবড়া খায় ওরা। পলকে, দুজনেরই, থির দশাটা দূর হয়ে যায়।

আচমকা রুখো রুখো গোঁয়ার ধরনের কাকটা হামলে পড়ে ভোমা সুবোধ ধরনের কাকটার ওপরে। ঠোকরাতে থাকে, আঁচড়াতে থাকে, ডাল থেকে ফেলে দেয়ার জন্য খুব ঠেলতেও থাকে।

নরমমুখের তেজীটা তখন ওর ওপরে চেপে বসতে চাওয়া তাগড়াটাকে জোর ঠেলা দিতে থাকে।ঠেলা দিয়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে থাকে। জোররকমে ডানা ঝাপটাতে থাকে, গোঁয়ারটাকে ধাক্কাও দিতে থাকে; কিন্তু কিছুতেই ওটাকে নিজের ওপর থেকে সরাতে পারে না। কিছুতেই নিজেকে ঠোঁকর ও আঁচড় থেকে রেহাই দিতে পারে না। নিজেকে কড়ুই ডালে পোক্তরকমে বসিয়ে রাখতেও পারে না।গুঁতা ও ধাক্কার ঠেলায় তার পা হড়কে হড়কে যেতে থাকে ডাল থেকে। সে প্রবলরকমে নিজেকে বসিয়ে রাখার চেষ্টাটা করতে থাকে ঠিক, কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না।

অবশেষে প্রায় থেঁতলানো ঘাড় ও ছিন্নভিন্ন ডানার সুশীল কাকটি যাতনায় কড়মড়িয়ে ওঠে। আপনা থেকেই ডানা ঝটপটিয়ে ওঠে তার।

গত্যন্তর না দেখে, সে, উড়াল দেয় ওপরের দিকে। তারপর উড়াল দিতে দিতে সে ডেকে ওঠে- কোক্কর খো! কোক্কর খো! খা খা খা!

কাকচরিত পারঙ্গম গৃহকর্মীটি পলকেই সেই ডাকের অর্থ বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, উড়ে যেতে বাধ্য হওয়া দাঁড়কাকটি কাঁদছে না।ওটি পরাজিত কাকের কান্নার শব্দ নয়!

গৃহকর্মীটি পরিষ্কার বুঝে ওঠে, হেরে যাওয়া দাঁড়কাকটির ওই ডাকের মধ্যে মিশে আছে অনিভন্ত ক্রোধের গরজানি ও ঘেন্নার ধ্বনি! ওই ডাকের মধ্যে বেজে উঠছে- গিলে ফেলতে বাধ্য হওয়া কান্নার শব্দ ও ধিক্কারের ধারালো আওয়াজ। কোক্কর খো! কোক্কর খো! খা খা খা!

দাঁড়কাকটি অভিশাপ দিচ্ছে। ঘেন্না জানাচ্ছে ডাকে ডাকে। কাকে যেনো বলছে- ঘৃণা-দবদবানো গলায় কাকে যেনো বলছে দাঁড়কাকটি-প্রতারক প্রতারক প্রতারক! অভিশপ্ত অভিশপ্ত অভিশপ্ত! অভিশাপ দেই অভিশাপ দেই!

সে কি জিতে-যাওয়া, অবিনীত কাকটিকে এই অভিশাপ দিচ্ছে?

গৃহকর্মীটি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে, ব্যাপারটি মোটেই সেরকম নয়। হেরে-যাওয়া কাকটি জিতে-ওঠা গর্বী কাকটিকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে ছিঁড়ে ফেলছে না। সে অভিশাপ দিচ্ছে অন্য-কাউকে। ওই অন্যজন- এই দুইজনের মাঝখানেই আছে। তবে আছে অদৃশ্য হয়ে। উপস্থিত নয় সে।তবে এই লড়াই ও হার-জিত-তাকে কেন্দ্র করেই।তার জন্যই।

এই তো ডালের ওপর শরীরভরা উল্লাস নিয়ে বসে আছে জিতে-যাওয়া কাকটি। অভিশাপের সকল রকমের আওয়াজ তার দিকে তেড়ে আসছে ঠিকই, ত্যাদড়া-গোয়ার কাকের কানে সেসকল অভিশাপ বাক্য যেনো কিছুতেই পৌঁছুচ্ছেই না। কিছুই যেনো শুনতে পাচ্ছে না সে।কিচ্ছু না।

বরং তার দেহখানা- জযের গর্বে ও গৌরবে ঘাড় ও ডানার পালক ফুলিয়ে ফুলিয়ে দুনিয়াকে জানান দিয়ে চলছে- সে জিতেছে! সে তার দখলদারী কায়েম করতে সমর্থ হয়েছে। দখল নিয়েছে সে। তাই, এখন, অন্য কোনো বাজে চিৎকার বা মাতমে কান দেওয়ার কিছু নেই।দরকার নেই কোনো।

পর্যুদস্ত ও আহত কাকটি শূন্যে,ওই উঁচুতে, অনেক অনেক ওলোট-পালট খেতে খেতে কতোক্ষণ চিৎকার করে। অভিশাপ দিয়ে চলে।তারপর অকস্মাৎ সে একটু নিচুতে নেমে এসে কড়ুই গাছটিকে ঘিরে পাক খেতে খেতে ছড়াতে থাকে সেই ডাক, খোক্কর কো! অভিশাপ! কোক্কর খো! প্রতারক প্রতারক! প্রতারক!

তাকে এবং কড়ুই গাছটিকে ঘিরে চক্কর দিতে দেখেও, দখলদারটির কোনো হেলদোল হয় না। সে নির্বিকার বসে থাকে, আর পলকে পলকে গাছের ডালে তার খর-ধারঅলা ঠোঁট ঘসতে থাকে।

কড়ুই গাছটাকে ঘিরে, গুণে গুণে তিনবার চক্কর দেয় নিরুপায় মার-সওয়া, খ্যাপা কাকটি। তারপর উড়ে যাওয়া শুরু করে উত্তরের দিকে।

কাক-ভোরের সেই সময়ে সমস্তটা আকাশ ভরে বাজতে থাকে তার অভিশাপের আওয়াজ।ছনছনাতে থাকে আকাশ। ভয়ে হিম ও আরো নিশ্চুপ হয়ে যেতে থাকে বুলবুলিরা।

অভিশাপ-দিতে দিতে চলে যেতে থাকা কাকটির দিকে তাচ্ছিল্য ও উপহাসভরা চোখে একটুখানি চেয়ে থাকতে দেখা যায় জিতে-যাওয়া কাকটিকে। কেবল একটু ক্ষণ। একটু ক্ষণ কেবল বাতাসে নড়তে থাকে অভিশাপের চিৎকার।

তারপর সকল আওয়াজ থেমে যায়।

সকল বিলাপ ও ক্রোধের শব্দ যখন থেমে যায়; চরাচরকে যখন শান্ত ও সুশীল মনে হতে থাকে; তখন বৃক্ষ-আসীন কাকটি ডেকে ওঠে-কা কা কা কা! এ আমার জয়!দখল আমার দখল আমার! তারপর উড়াল দেয় সেও।

আর কী আশ্চর্য! কাকটি উড়াল দেওয়ামাত্র কড়ুই গাছ থেকে তার পাতারা ঝরে পড়তে থাকে। বিষম বিষম তোড়ে ঝরে পড়তে থাকে রাশি রাশি পাতা। পাতাঝরার আওয়াজ উঠতে থাকে- সর সর সর- সিরি সিরি সিরি!

সেই আওয়াজকে আবার মুহূর্তে জড়িয়ে ধরে অগুনতি বুলবুলি পক্ষীর ডাক। পিহি পি পি! পিহি পিহি পুই পুই পি!

আর দেখো, তখন শিশুটিও পলকের মধ্যে ভূমিষ্ঠ হয়।কন্যা শিশু।

ওটি আমি।

সকলে আর তখন শিশুটিকে সামাল দেবে কী- মরমর-প্রায় প্রসূতিকে নিয়েই তাদের  মহা উতলা হয়ে উঠতে হয়।

এই সেই নিয়ে সেই বাড়ির রাত পোহায়।

পরদিন সকালে, বাড়ির সকলেরই মন খুব শান্তিতে ভরভরা। সকল আপদ-বালাই যে সুস্থির রকমে, সুমঙ্গল মতো শেষ করা গেছে, সেই স্বস্তিতে সকলের মন-প্রাণ খুব ফুরফুরে তখন সকলের।

এমন সময়ে, গৃহের মুরুব্বিজনের নজরে আসে, দূর প্রাঙ্গনে একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে আছে।

কি সেই ঘটনা?

না, বংশের সবচেয়ে প্রাচীন যে কড়ুই গাছটি ছিলো এতোদিন- সেটি মারা গেছে।

সেটিতে কখন যেনো বাজ পড়েছে। আর সেই সর্বনাশা বাজ কড়ুই গাছটাকে মেরে রেখে গেছে। পোড়া আংড়া হয়েও গাছটি মাটিতে থেবড়ে পড়ে যায় নি। সে খাড়া হয়ে আছে। খাড়া হয়ে আছে যেনো খুটখুটে কালো, খড়মড়ে আংড়া এক সর্বনাশ!

দেখে মনে হচ্ছে যেনো মারা গেছে সে আজ কতোকাল!অথচ তার তলে দেখা যায়- ওই যে রাশি রাশি পাতা- ওই যে কতো কতো ফুল-তারা সকলে ঝরা বটে, কিন্তু পুরোই তাজা, জ্যান্ত ও অমলিন।তাহলে গাছটি এমন ঠাটা-পড়া দগ্ধ, পোড়া-কাষ্ঠ দশা পায় কীভাবে!

এই তো গতকাল সন্ধ্যায়ও দেখা গেছে ওটি পাতা ও ফুল নিয়ে দাঁড়ায়ে আছে- প্রসন্ন মুখে।ওর শরীরের কোথাও কোনো অসুখ কী অসন্তোষের চিহ্নও তো দেখা যায় নি তখন!

একরাতের মধ্যে এমন কুমরণ মরতে হলো ওরে, কোন দোষে! এমন দগ্ধ করলো ওরে- কোন বজ্রে!

গতরাতে তো ঝড়-বাদলার নামনিশানাও ছিলো না! কাছে-দূরে কোথায়, রাতের কোনো একটা প্রহরে, কোনো বাজ পড়েছে, তারও কোনো আওয়াজ তো পাওয়া যায় নি। বাড়ির প্রতিটাজনে, পুরোটা রাত ভরে জেগে থাকা।

বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলে- কারো না কারো কানে কী তার শব্দ পৌঁছুতো না?কেউ তো তেমন কোনো কঠিন আওয়াজ শুনতে পায় নি!একটা কেউও তো শোনে নি!

আর,ওই তো জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মী- রাতের একদম শেষপ্রহরে বুলবুলি পাখির বৃত্তান্ত খুঁজতে নেমে গিয়েছিলো না সে উঠানে্? তারপর উঠান পাড়ি দিয়ে সে গিয়েছিলো না অনেকটা দূরের ওই কড়ুই গাছের নিকটে?

সেও তো সেসময় মাটিতে ও আকাশে মেঘ বা বৃষ্টির কোনো আলামত দেখে নি। বাজ পড়ারও কোনো চিহ্ণ দেখে নি তো সেও।

আর সে তো কিরা-কসম কেটে বারেবারে বলছে – সে ওই সময় কড়ুই গাছটাকে পুরা জ্যান্ত, পুরা জাগনা দেখেছে। সে তখন কড়ুই গাছের শরীরে আলাই-বালাইয়ের কোনো নমুনা-নিশানা পর্যন্ত দেখে নি।

তাহলে সেই ভোররাত থেকে এই সকালটুকু হওয়া মধ্যে- এইটুকু সময়ের ভেতরে- দূর আঙ্গিনার কড়ুই গাছটার এমন সর্বনাশ হলো কোন প্রকারে!

আতঙ্কে ঘরের প্রতিজনের প্রাণ ছাৎ ছাৎ করতে থাকে। কিছু না-বুঝেই ছ্যাতছ্যাতাতে থাকে।আর কেমন একটা কু-কথা গোপনে গোপনে সকলের অন্তরের ভেতরে আনা-গোনা করতে থাকে।

এটা কিসের আলামত? এমনটা তো এই বংশে আগে কোনোদিন ঘটতে দেখা যায় নি! হঠাৎ এরকমটা ঘটেছে, কোন কারণে? কিসের কারণে?

মুখে কেউ কোনোকথা বলে না। কোনো কিচ্ছু বলে না। তবে তাদের অন্তর অনেক রকম কথা বলতে থাকে। অনেক রকম কথা। সেটি ওই সদ্য-জন্ম নেওয়া শিশুটি বিষয়ে। মনে মনে নেড়ে-চেড়ে, নেড়ে-চেড়ে, তারা একটা বিষয়ে, ক্রমে নিঃসন্দেহ হয়ে ওঠে!

কি সেই বিষয়?

যে শিশুটি জন্মেছে সে যে কুলক্ষণযুক্ত- সে বিষয়ে কোনোজনেরই কোনো সন্দেহ থাকে না।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(3)

  1. টান টান উত্তেজনা নিয়ে পুরোটা পড়ে শেষ করেছি।কড়ুই গাছটির বাজ পড়ে মৃত্যুতে ডালিমকুমার গল্পের তালগাছটি মনে পড়লো।সব অশুভের অবসানে সেই তালগাছটিও মরে গিয়েছিল। ভাল লেগেছে।শুভেচ্ছা।

  2. এক থেকে ছ্য় অব্দি পড়ে ফেললাম, রূপকার্থে এক নিঃশ্বাসে। এমন নিগূঢ় অনুভুতিময়, চিত্রময়, শব্দময় ডিটেল আর স্বচ্ছন্দ নদীর মতো গদ্যশৈলী আমাকে অভিভূত করে রাখলো, যেন একটি অপূর্ব কবিতার চলনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। পরবর্তী পাঠের অপেক্ষায় 🙂

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close