Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৮]

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৮]

প্রকাশঃ January 21, 2017

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৮]
0
1

পর্ব ৮

বাবার পাঠকক্ষ থেকে আমাকে কখন বের করে এনেছিলো জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মী! আমি মনে করতে চাই। কিন্তু কিছুতেই সেটা ঠিকমতো মনে করতে পারি না! কখন? সেটা কি দুপুর ছিলো? ওইদিন দুপুরে? বিকেল ছিলো কি? নাকি সেই সকালবেলায়ই?

আমার স্পষ্ট মনে পড়ে না।

নাকি, আমি বাবার পাঠকক্ষে বন্দী হয়েছিলাম অনেক বছর? একদম বারো বছর? আধো অন্ধকার ঘরে অযুত-নিযুত গ্রন্থ, আর অনেক অনেক জোনাকের সঙ্গে-কাটিয়েছিলাম কি গুনে গুনে বারো বছর?

সঠিক করে বলতে পারি না। কেবল ধন্দ লাগে।

একবার মনে হতে থাকে – অল্প একটু সময়মাত্র ছিলাম আমি ওখানে। তারপরই খুলে গিয়েছিলো পাঠকক্ষের দরোজা। সেই খোলা দরোজার মুখে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মীকে।

এবং আরো একটা অচিন বিষয়ও দেখতে পেয়েছিলাম তখন! দেখতে পেয়েছিলাম,ওই যে জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মী- দাঁড়িয়ে আছে- পাঠকক্ষের খোলা দরোজার মুখে- সে কেবল একা দাঁড়িয়ে নেই।তার পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে আরো একজন!

কে ছিলো সেটা? সেটা ছিলো আকাশ। রোজকার চেনা আকাশটা নয়। আমি উঁকি দিতে দেখেছিলাম একটা অদ্ভুত আকাশকে! সবুজ আলোয় ঝলকাতে থাকা একটা আকাশ ছিলো ওটা। পক্ব্ লেবু-রঙ সবুজ আকাশ!

তখন হঠাৎ করেই কেমন অদ্ভুত একটা ভাবনা আমার মনে নড়ে উঠেছিলো। মনে হয়েছিলো, এই যে দরোজার মুখে দাঁড়ানো গৃহকর্মীটি- সে আদতে মানুষ নয়! মোটেও মানুষ নয়।

ওই যে বাইরে, দূরে, আকাশ আর আলো! ওরাই এমন মনুষ্য-কাঠামো নিয়ে দাঁড়ায়ে আছে, আমার সামনে।মানুষের মতো দেখতে! কিন্তু মানুষ নয়!

তখন আমার প্রাণে কেমন একটা তরাস ছলাৎকার দিয়ে উঠেছিলো।

এই মস্ত বাড়িতে আমি যে একা- আর যে আমার কেউ নেই- এই কথা খুব মনে এসেছিলো!

ভয় থেকে রেহাই পাবার জন্য্ তক্ষুণি তক্ষুণি আমি নিজেকে বকে উঠেছিলাম, কী আজগুবী চিন্তাওয়ালা রে! উদ্ভট ভাবনার আর শেষ রাখবে না, তাই তো? চিরকাল ধরে দেখে আসা এক সামান্য্ গৃহকর্মীকে নিয়ে এমনটা কেউ ভাবে? এই বংশের কেউ কোনোদিন ভেবেছে?

আমার মনে, পলকে, এমন জিজ্ঞাসাটাও চিলমিল করে ছুট শুরু করে! ছুটতে থাকে মাথা থেকে পায়ের পাতার দিকে!

“এমন কথা এমন করে কেউ ভাবে নি- এইকথা সত্য! কিন্তু তুমি তো অন্য্ কেউ নও! তুমি হচ্ছ্ তুমি! তোমাকে তো এমনই ভাবতে হবে কন্যা!” গৃহকর্মী আমাকে বলে।

আমার থতমত পায়েরা থমকে দাঁড়ায়ে যায়! আমি কী ভাবছি- সেই কথা সে জানছে কীভাবে! আমার অন্তরের গোপন ভাবনা টের পেয়ে যাচ্ছে আমাদের গৃহকর্মী! কেমন করে? এমন কি আগে হতো কখনো এই সংসারে? আমার অন্তর এবং শরীর আবার শিউরে ওঠে। এবং আমার  আবার ধন্দ্ লাগতে থাকে। এটি কি আসলেই চিরকালের পুরোনো সেই আমাদের গৃহকর্মীটি? নাকি অন্য্ কেউ? অন্য্ কিছু?

আমার ধন্দ্ হতে থাকে, কিন্তু মনে মনে আমি বুঝে উঠতে থাকি যে, কোনো ব্যাপার নিয়েই আর কোনোরকম প্র্শ্ন্ করাকরির দরকার নেই! কেন না কোনো প্র্শ্নেরই কোনো উত্তর আসবে না।

তবুও খটকা লেগে থাকে আমার চোখে ও মনে।

খটকা-ভরা চোখ ও মন নিয়ে গৃহকর্মীটির পিছু পিছু, আমি, বাবার পড়ার ঘরের দরোজা পেরিয়ে যাই।

তারপর বারান্দায় পা রাখি। কী জানি কোথায় নিয়ে যেতে চায় সে আমাকে!

যাই না! গিয়ে দেখি, কী করতে বলে সে আবার এখন!

যেতে যেতে দেখি কী- পড়ার ঘরের দরোজার পাশে ঝোলানো আয়নাটা খুব জোর আটকে নিয়েছে আমার চোখদের! আয়নাটাও আজকে, হঠাৎ, এমন করছে কেনো!

পাঠকক্ষে ঢোকার মুখে বসানো- এই যে আয়না- এটি বিশাল এবং খুব গোমড়া স্ব্ভাবের। ওটাতে এই যে এখন- টানা লম্বা ও হু হু শূন্য্ বারান্দাটার- ছায়া কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে। আর, সেখানে কাঁপছে আমার চোখের ছায়া।

আমাদের প্রাসাদে আসবাবের আতিশয্য্ নেই। এখানে বসার আসন আছে। অগুনতি আসন। কিনতু তার কোনোটিই নকশা শোভিত নয়। ময়ূর পেখমের নকশায় নকশায় ছাওয়া নয় কোনোটিরই পৃষ্ঠদেশ।

এই প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে পালঙ্ক আছে। অনেক পালঙ্ক্। সেসবের কোনোটাই ডানা-উঁচোনো পরী-মূর্তি-খচিত নয়। এইখানে অনেক সিন্দুক আছে। কিন্তু সে-সকল সিন্দুক ফিকে ধূসর বরণের। এই প্রাসাদে সোনা-রঙা সিন্দুকে সিন্দুকে পুষ্প ও প্র্জাপতি চিত্রিত নেই।

যা কিছু আছে-পালঙ্ক্, চেয়ার, সিন্দুক, আলমারী- সবকিছু সাদামাটা সাদাসিদে।

তবে একটা শুধু ব্যতিক্র্ম আছে এইখানে। সেটা ওই আয়না! কক্ষে কক্ষে, বারান্দায় বারান্দায়, দেয়ালে দেয়ালে, সিঁড়ির পাশে পাশে- অগুনতি  আয়না ঝোলানো আছে এই প্রাসাদে! বসানো আছে সকল কক্ষের- প্রবেশ দরোজার ঠিক পাশে! আয়নার পরে আয়না! নানান রকম তাদের শরীর! নানান রকম তাদের মেজাজ ও স্বভাব।

কোনো কোনোটা বিপুল গম্ভীর। ভারিক্কি তাদের দেহ! তাদের দিকে তাকালে- প্রাণ একটু কেমন ভয়ে- অকারণ ভয়েই ছাৎ করে ওঠে। কোনো কোনোটা খুশী ছলবলে। চিক্ব্ন ঝিলিমিলি শরীর তাদের। তাকালে মনে হয়, তারা হাসছে! হাসছে আর বলছে, ‘এলে?’

কোনো কোনো আয়না – গভীর লাজুক! চোখ তুলে তাকাবার জোরটা যেনো নেই তাদের কোনোজনের। কেবল চোখ নিচু করে চেয়ে থাকে তারা, মেঝের দিকে। কেবল নতচোখ তাদের। শুধু লজ্জা!

কোনোটা শুধুই বিমর্ষ্ মুখে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলে না, কাউকে দেখে না, কেবল দূরের দিকে চেয়েই থাকে ।

বাবার পাঠকক্ষের দরোজার বাইরের আয়নাটা ওইরকম। বিমর্ষ্, আনমনা। আছে, অথচ নেই স্ব্ভাবের! ওর দিকে তাকাবার সাধ আমার কোনোদিন হয়নি! ওরও কখনো আমাকে চোখে পড়েনি।

আজকে, এমন বেদিশা পায়ে পাঠকক্ষ্ থেকে বেরুতে বেরুতে কিনা, আচমকা আমার দৃষ্টিকে আটকে ধরে সে! কোনো দরকার তো নেই! কোনো আয়নায়ই তো আর আমার কিছু দেখে নেবার নেই। এই যে শীতল সুমসাম বারান্দা- তার ছায়াও নয়। নিজেকে তো নয়ই।

আমি ঝটমট দৃষ্টি সরাতে গিয়ে হঠাৎই শিউরে উঠি! আয়নায় ওটি কার মুখ দেখা যায়! ওটা আমি?

গড়ন বলছে ওটি আমারই মুখের গড়নের মতো। কিন্তু তাও যেনো ওটি আমার মুখ নয়! অবিকল সেই রকমের পান-পাতা মুখ। কিন্তু এমন রুখো এমন বয়স্ক্ দেখায় কেনো ওই মুখ? চৌদ্দ্ বছুরে যে মুখটাকে এই ভোরসকালেও চিনতাম আমি, আমার বলে চিনতাম, এই মুখে তো সেই নবীনতা নেই!

যেনো থেতলে গেছে- যেনো শক্ত্ ঝাপট এসে থেবড়ে দিয়েছে- এই মুখ! অনেক অনেক বড়ো হয়ে ওঠা এক মুখ ওটি! অনেক বয়সী এক শরীরের মুখ!

এটা কি আমি? আমি?

একপ্র্হর সময় ছিলাম না আমি বাবার পাঠকক্ষের ভেতরে? এক প্র্হরই তো? নাকি অনেক অনেক বছর? দশ বছর? বারো? তাই কি চোদ্দ্ বছরের মুখটাকে হারিয়ে ফেলেছি? এখন তবে আমার বয়স কতো? আমি তবে কে?

আমার প্রাণটা ছল্লাত করে ওঠে ভয়ে। এটা কী অশৈলী বিষয় নয়? এসব কি ঘটছে? নাকি আমি ভুল দেখছি? খুব ভুল? আতঙ্কে আমি চোখ বুজে ফেলি।

আমাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে গৃহকর্মীটি তার এগুনো বন্ধ্ করে। এসে দাঁড়ায় আমার পাশে।

“ওটা তুমিই!চোখ খোলো!” আমি শুনতে পাই।

আমি চোখ খুলি।দৃষ্টি আবার আটকে যায় আয়নায়। ওতে এখন কার ছায়া? আমার? আমি আয়নার সামনেই তো দাঁড়িয়ে, কিন্তু কই আয়না তো আমাকে দেখাচ্ছে না!

ধীর ধীরে, আয়নাটা, ওই তো জাগিয়ে তুলছে কেমন একটা শরীরের ছায়া।

আমি দেখতে পাই, আয়নায় ফুটে উঠেছে বিষম দগ্ধ্, কালো আংড়া, মৃত এক গাছের শরীর! তার সকল ডালপালা আকাশের দিকে উঁচোনো। ডালেরা কালোকুষ্টি, মরা!

এবং একই সঙ্গে আমি আবার নতুন করে শুনতে পেতে থাকি কেমন সেই ফিসফিসানির ধ্ব্নি। ফিসফিস কথা বলার আওয়াজটা আবার শুনতে পেতে থাকি।কে কি বলতে চাচ্ছে? আবার নতুন করে?

ভয় হতে থাকে খুব আমার! খুব জোর ছুট দিয়ে মায়ের ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছা হতে থাকে। আমি ছোটা শুরু করি।

“ভয় পেতে নেই, ধন! এটাই তুমি!” পেছন থেকে গৃহকর্মীর গলা আমাকে ডাকতে থাকে।“যেয়ো না! থামো। থাকো এইখানে।”

আরো কিছু বলতে থাকে সে, কিন্তু সে সকল কথা আর আমি শুনতে পাই না। ফিসফিসানির জোরালো আওয়াজ – তার কথাদের কেমনে জানি- ভাসিয়ে-সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে।

আমি ছুটতে থাকি।যতো ছুটতে থাকি, ততো অষ্ফুট ফিসফিস আওয়াজ ক্র্মে যেনো স্পষ্ট হতে থাকে। আমি শুনতে পেতে থাকি ডাক!

কে যেনো ডাকে! আয় আয় আয়! এসো এসো এসো! আয়!

আমার ছুট শ্লথ হয়ে আসে। কে ডাকে? আমাকে ডাকে? কে?

“ওই ডাকের উত্ত্র দাও!”  কোন পেছন থেকে গৃহকর্মীর গলা ভেসে আসে।

‘কেনো?’ আমার তেরিয়া কণ্ঠ্ ফুঁসে উঠতে থাকে।

“সাড়া দিতে যতো বিলম্ব্ হবে তোমার কন্যা, নিদানের সন্ধান পাবার পথ ততো দূরে থাকবে তোমার!”

‘নিদান!’

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. এই ৮ম পর্বে উপন্যাসটি অলৌকিকতার দিকে বাঁক নেয় বলে প্রথমত ভ্রম হয়। আসলে অতল গহন বাস্তবতাই রূপকায়িত হয়ে চলেছে এই উপন্যাসে। নারীর মানুষিক অস্তিত্ব অস্বীকারের যে মূল আয়োজন চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে তা-ই অসামান্যরূপে প্রকাশিত হয় পাঠকক্ষ এবং আয়নারাজির প্রতীকে।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close