Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৯]

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৯]

প্রকাশঃ January 29, 2017

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো [৯]
0
0

পর্ব ৯

না না! সেই ফিসফিস ডাকের জবাবে কোনোরকম সাড়া আমি দিই নি। জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মীর গভীর অনুনয়েও না।

কেনো সাড়া দেবো! কী বলবো! আমার তো কিছু বলার নেই।

কোথায় যেতে ডাকছে আমাকে! কোথায় যাবো? আর, এই ডাকটা কে দিচ্ছে আমাকে? কে ডাকছে! কেনো?

ডাকেই যদি, তবে এমন ফিসফিস করে কেনো? জোরে নয় কেনো?

দেখো তো, এই ফিসফিসানির বিষয়টাই আমাকে ভয়ে কাতর করে ফেলছে। তারপর, তার ডাকে সাড়া দেয়ার শক্তিটা আমি পাই কেমনে?

আমি একটুও সাড়া দিই না।

ডাক আসতে থাকে। আর, আমি ভয় থকথক শরীর নিয়েও এমন নড়িচড়ি এমন বসে থাকি, এমন ভঙ্গি করে করে দীপ জ্বালিয়ে তুলতে থাকি- যেনো আমি কোনো কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। যেনো কোথাও কোনো ফিসফিস আকুল ডাক নেই, আমার জন্য। আয় আয় আয়- এসো এসো এসো-

ডাক আসতে আসতে ক্র্মে দেখো ডাক থেমে যায়। বাতাসে আর কোনো ফিসফাস অথির আয় আয় শোনা যায় না।

যেমন আপনা-আপনি জেগে উঠেছিলো, দেখো তেমন আপনা-আপনিই মিলিয়ে গেছে অশৈলী ফিসফাস! আহ!

আমি বুঝতে পারি,সাড়া না দিয়েই ঠিক করেছি। সাড়া দিইনি বলেই তো এমন নিরাপদ নিস্তার পেলাম! যেমনে এসেছিলো– আয় আয় আয় এসো এসো- তেমনিই নেই হয়ে গেছে! সাড়া যে দিই নি, খুব ভালো করেছি। একদম ঠিক! আমার জন্য্ নিদান আবার কি? আমি তো কোনোরকম অসুখে নেই, ঝঞ্ঝাটে নেই! তাহলে আমার জন্য আবার নিদানের দরকার পড়বে কেনো!

গৃহকর্মী নিশ্চয়ই উল্টা-পাল্টা কিছু একটা বলেছে।আমি ঠিক আন্দাজ করতে পারি, সে যা হোক একটা কিছু বলে আমাকে বুঝ দিতে চেয়েছে। ওটি গুরুতর কোনো কথা নয়।

এইমতে নিজেকে বুঝ দিয়ে চলি আমি। এবং ক্র্মে নিজেকে নিজের এই বুঝ দিতে পারার বিষয়টাকে ভালো লাগতে থাকে আমার।

নিজের বিবেচনা শক্তির তুখোড় দশা দেখে বিহ্বল হয়ে যেতে থাকি। এবং আমার বিবেচনা শক্তিকে আমি নিজেই প্র্শংসা করে করে থইহারা হয়ে যেতে থাকি।

কী চমৎকার! এই তো আমি নিজে নিজে নিজেকে সামলে নিতে পারছি! আমি সমর্থ্! আমি অকাজের নই! বাহ! নিজের আপনার-জন কেউ নেই তো কী! আমিই তো আছি আমার জন্য্। আর কাউকে লাগবে না আমার না! কাউকে না!

গৃহকর্মীর কথা শুনে সাড়া দিয়ে উঠলে, শেষে, কী বিপত্তি হতো- কে জানে!

আমি বুঝে উঠতে পারি, ওর কথা পারতে গোনায় ধরা যাবে না। একদম পাত্তা দেয়া যাবে না।

“তোমার জন্য্ এই ডাক- আর কেবল একবার আসবে!” সেদিন হঠাৎ করে কখন যেনো গৃহকর্মী আমার পেছনে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ থির দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর আমার পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করে।

বড্ড মন্থর, বড়ো উদভ্রান্ত যেনো শোনায় তার পদশব্দ্। তার গলাও যেনো কেমন আশাহীন ভয়ার্ত শোনায় আমার কানে। এমন তো মনে হয়নি তাকে এর আগে কোনোদিন!

তাকে পেছনে নিয়ে চলতে চলতে আমি বিস্মিত হই, কিন্তু ঘাড় ফিরিয়ে তাকে দেখে নেয়ার কোনো তাগাদা আসে না আমার মনে।

তখন সন্ধ্যাকাল। তখন আমি সন্ধ্যাবাতি জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে আমাদের প্রাসাদ-অলিন্দকে বলছিলাম, ‘অন্ধকারও সুন্দর! কখনো কখনো আলোর চেয়েও সুন্দর! চেয়ে দেখো ওই প্রাঙ্গনের দিকে, অলিন্দ্! এমন গহন- এমন জেদী আঁধারের কোনো তুলনা হয়?’

অলিন্দ আমার কথা চুপচাপ শুনতে শুনতে, আমাদের দূর আঙিনার অন্ধকারকে দেখে নিচ্ছিলো তখন। আমার কথার কোনো জবাব সে কখনো দেয় না। কিন্তু খুব মন দিয়ে যে শোনে সে, সেটা আমি পরিষ্কার ধরতে পারি।

তো, জবাব না দিলেও আমার অসুবিধা হয় না। আমার তো দরকার কেবল আমার গড়া পংক্তিগুলো কাউকে শোনানো। ওকে শোনাই। মন খুশীতে টলটলিয়ে উঠতে থাকে।

তো, সেদিনও সন্ধ্যায় সন্ধ্যাবাতি জ্বেলে দিতে দিতে আমি কথা বলছিলাম অলিন্দের সঙ্গে। গৃহকর্মী তার কাজ ফেলে কখন এসে দাঁড়িয়েছে আমার পেছনে, আমি প্র্থমে বুঝতে পারি না। কিন্তু তার কাতর ও কাহিল পদশব্দেরা অল্ক্ণের মধ্যেই আমার খুশীকে ধুপ করে নিভিয়ে দেয়।

তারপর তার বলা সেই কথা আমার সমস্তটা শরীরে এসে ধাক্কা মারে। দীপশিখা জ্বালিয়ে তুলতে থাকা আমার হাত, মুহূর্তে, অবশ হয়ে যায়। আবার নতুন করে, কেমন এক প্রকার ভয় আমাকে পেঁচিয়ে ধরতে থাকে। আমার পায়েরা নড়ার শক্তি পায় যেনো আর!

তাও আমি স্বাভাবিক থাকার ভঙ্গী করে এগোতে থাকি। চলা শ্লথ হয়ে ওঠে ঠিক, কিন্তু হাঁটা থামাবার সাহস পাই না আমি।

“তোমার জন্য্ ওই ডাক আর শুধু একবার আসবে! আর একবার কেবল! সাড়া না দিলে- তোমার কপাল-লিখন খণ্ডানোর আর কোনো রাস্তা থাকবে না। সেই সর্বনাশ নিয়ে দেহ-ধারণে কী ফল!”

তারপর শিখা প্রজ্বলনের সকল শক্তি হারাই আমি। আমার হাতেরা বিবশ হয়ে ওঠে মুহূর্তে। পায়েরা এগোবার নিয়ম-রীতি পুরো বিস্মৃত হয়। আমি হিম, স্তব্ধ শরীর নিয়ে অর্ধ আলো-জ্বালা, অর্ধ্অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়ায়ে থাকি।

পেছনে জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মীও কি আমারই মতন তবদা-লাগা দশা নিয়ে দাঁড়ায়ে ছিলো? নাকি চলে গিয়েছিলো? আমি জানি না। শুধু টের পেতে থাকি আমার পুরোটা শরীরে আর আমার অন্তরে আগুন জ্ব্লে উঠছে।ধীর আগুন ধীরে ধীরে দাউদাউ হয়ে উঠছে। আমি পুড়ে যাচ্ছি। আমার খুশীরা পুড়ে যাচ্ছে।

কেনো এমন করে আমাকে আতঙ্কগ্র্স্ত্ করে তোলে এই জ্যেষ্ঠা জন? কেনো সে চায় না আমার সুস্থির আনন্দের কালটা টিকে থাকুক? কেনো সে বলে কোনো এক কপাল-লিখনের কথা?কেনো সে খেয়ালে আনে না যে, আমার সঙ্গে শেষপর্য্ন্ত্ ইচ্ছার দেখা হয়েছে? সে-ই না আমাকে ঠেলে দিয়েছিলো,ইচ্ছাকে খুঁজে বার করার কাজে? ইচ্ছার সাথে তো আমার দেখা হয়েছে।দেখা হয়েছে।তাহলে এখন কেনো সে আমাকে নতুন রকমে ভয় দেখায়?কি চায় এই জ্যেষ্ঠা জন?কী চায়!

চিৎকারে চিৎকারে প্রাসাদ-অলিন্দ্ ও কক্ষ্ সকল ও রন্ধ্ন শালা ও আঙ্গিনা ছিঁড়ে ফেলার বাসনা হতে থাকে আমার। নিজেকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দেবার বাসনাটা আবার জোর গর্জ্ন করে উঠতে থাকে।

আবার কী এক তাজ্জবের ব্যাপারও ঘটতে থাকে, দেখো তো! এতোখানি কষ্ট ও ক্রোধের ধাক্কা সইতে সইতেই টের পাই,আমার অন্তরে ও বাহিরে বওয়া শুরু করেছে এক স্রোতধারা। ইচ্ছার সাথে দেখা হবার সুখ ও আহ্লাদের স্রোতধারাটি, দেখো, এমন অসময়েও, কেমন ঝাপটা দিচ্ছে! কেমন কুলু কুলু বওয়া শুরু করেছে আমার অন্তরে –বাহিরে।

কেমন করে ইচ্ছার সাথে দেখা হলো?কেমন করে!

সেকথা যখনই মনে করতে যাই,মনে আসে দীপ জ্বালাবার কর্ম্ ভার পাবার কথাটা। এই বংশের কোনো সন্তান কখনো এমন কর্ম করার দায়ভার পেয়েছিলো কি? কী জানি!

আমি শুধু জানি,আমাকে পেতে হয়েছে। ওই কর্মটি আমার ওপরে চাপিয়ে দিয়েছে আমাদের গৃহকর্মী।

তখন অনেক অনেকদিন হয়- আমার জন্য আসা ফিসফিস ডাক বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তখন অনেকদিন হয়, ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার বাঞ্ছাও মরে গিয়েছিলো আমার মন থেকে।

তখন, প্রাসাদের আয়নায় আয়নায় মৃত এক বৃক্ষের দেহ দেখা দেওয়ার ঘটানাটাও খুব পুরোনো হয়ে গিয়েছিলো।  অথচ তখনও আমার সামনে কতো কতো দিন! কতো কতো রাত! হাজারে-বিজারে দিন-রাত্রি!

আমি কী করবো এইসব দিনরাত্রি নিয়ে! কী করবো এতো এতো রাত ও দিন নিয়ে!কী করবো। ওই নিরর্থ্ক দিন ও রাত্রির বোঝা বয়ে বয়ে তখন,আমি হয়রান হয়ে যাচ্ছিলাম কেবল।

দিনভরে কোনো কর্ম নেই।জেগে থাকি রাত ভরে।কিচ্ছু করার নেই। এই বেঁচে থাকা নিয়ে আমি কী করবো!মা যদি থাকতো,তার কাছ থেকে পরিষ্কার করে জেনে নেয়া যেতো-এই কথার উত্তর।বা দাদাও যদি সংসারবাসীই থাকতো,ওকে জিজ্ঞেসও করতে হতো না;আপনা থেকেই আমাকে জানিয়ে রাখতো উত্ত্রটা।

হায়!আমার জন্য্ কেউ নেই!এটাকেই বোধ হয় কপাল-লিখন বলে ডাকছে গৃ্হকর্মীটি,তাই না?

রোজকার মতো সেদিনও, এই দীর্ঘ্শ্বাস নিয়েই,দিন শুরু করেছিলাম।

তবে সেদিন সকালবেলায় আমি প্রাসাদের বারান্দায় বারান্দায় এলেবেলে হাঁটতে হাঁটতে টের পাই, আমাদের বাড়িটি যেনো কেমন অচিনরকম নির্জ্ন লাগছে। যেনো বড্ডই সুনসান!বড়োই যেনো বিজন ধু ধু  লাগে।এমন কেনো লাগে প্রাসাদটাকে আজ?

লাগে এই কারণে যে,খুব ভোরে, একদম সূর্য ওঠার আগে-বাড়ির গৃহকর্মীদের পুরো দঙ্গলটাকে বিদায় করা হয়েছে আজ। থাকার মধ্যে আছে কেবল ওই জ্যেষ্ঠা গৃহকর্মী। আর অন্য কোনো একজনও নেই!

‘এমন কেনো করলে তুমি?’ আমি জানতে চাই।

‘আজ থেকে প্রাসাদে সন্ধ্যাবাতি জ্বালিয়ে যাওয়ার কাজটা তোমার, কন্যা!’ আমার প্রশ্নের এই উত্তর দেয় জ্যেষ্ঠাজন।‘ দীপ জ্বালো, আর দেখো তো ইচ্ছার সাক্ষাৎ পাও কিনা!’

ইচ্ছার দেখা কেনো যে পেতে হবে আমাকে- এই কথাটা তাকে খুব জিজ্ঞেস করতে সাধ হয়। কিনতু আমি বুঝতে পারি, তাকে ওই প্রশ্ন করা বৃথা।

জ্যেষ্ঠাজন ওই প্র্শ্নের কোনোই জবাব দেবে না।শুনতে পেয়েছে-এমন ভঙ্গিটা পর্য্ন্ত  করবে না। তার চেয়ে বরং আমি নিজেই ঘুরে ঘুরে,ভেবে ভেবে, উত্ত্রটা বার করার চেষ্টাটা করি না?উত্তরটা আমিই খুঁজে পাই কিনা-দেখি না!

আমি চেষ্টা করি। কিনতু কোনো উত্তর পাই না।কোনো উত্তর নয়।কেবল সন্ধ্যাভরে দীপ জ্বেলে যেতে থাকি।

আমার তবে এই এক কর্ম করে্ করেই জীবন অবসান করার কপাল?

সমস্তটা দিন কর্মহীন,সমস্তটা দিন পা- ঘষটে ঘষটে হেঁটে হেঁটে প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে ইচ্ছাকে তল্লাশ করে করে কাটিয়ে দেওয়া শুধু? সন্ধ্যার আগে আগে- ব্য্সত দুহাতে- দীপদানে শিখা জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে রাতকে ঘনিয়ে আনা শুধু? এইভাবে কেটে যেতে থাকবে আমার দিন?এইভাবে?আর কিছু নয়?আর কিছু নেই?

তারচেয়ে যদি মরে যেতে পারতাম!মরণের কথা মনে আসে,কিনতু নতুন করে আত্ম্ হননের সাধ আর জাগে না।কেনো জাগে না?আমি কি তবে বেঁচে নেই? মরে-যাওয়া কেউ?

বারান্দায় বারান্দায় দীপদানে দীপদানে আলো জ্বালিয়ে দিতে দিতে এইসব কথা মনে আসে।চোখ জলে ভরে যায়।দাদাকে মনে আসে।

দাদা যদি বিবাগী না হতো-তবে ওর কাছ থেকে এখন আমি ধ্যান ও জপ-মন্ত্র নিতে পারতাম!দাদা!

দাদা যদি গৃহবাসী হতো,আমাকে কি এতোদিনেও বিদ্যাদান না করে থাকতো? থাকতো না।এখন যে কেউ নেই!

শুধু আমি আছি,বিদ্যাহীন।জপমন্ত্রহীন।অনর্থক আছি একজন।চোখ শুধু থেকে থেকে জলে ভরে যেতে থাকে।জলের তলে, কেমন অন্ধকারে চলে যেতে থাকে।প্রাসাদ ঘিরে থাকা বারান্দায় বারান্দায় শত দীপদানে আলো ঝিকমিকাতে থাকে,আর আমার চোখেরাই কিনা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যেতে থাকে!

যদি মরে যেতে পারতাম!

এমন ভাবনায় ভাবনায় কতো দিন চলে যায় কে জানে!দিন গোনা তো পাঠকক্ষে বন্দী হবার সেই সকালের পর থেকে, পুরোই বন্ধ করে দিয়েছি।সকাল কখন আসে, দুপুর কখন যায়,বিকেল ও মধ্যরাত কেমন করে আসে ও যায়-আর দেখতে পাই না।অথচ সর্বক্ষণ চেয়েই থাকি ওদের দিকে।কিনতু দেখো- কিছুই আর নজরে আসে না।

এখন শুধু এইটুকু খেয়ালে আসে যে,অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে আমাদের আঙিনায়। সন্ধ্যাবাতি জ্বালাবার সময় হয়েছে।

আমি কখনো ধীর হাতে,কখনো ত্র্স্ত হাতে সন্ধ্যাবাতি জ্বালাতে থাকি শুধু।আর কিছু নয়।

এইভাবে যেতে যেতে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সেইদিন,অন্যসকল সন্ধ্যার মতোই আমি তখন একে একে, প্রাসাদ-অলিন্দের সবকয়টা দীপদানে শিখা জ্বালানোর কর্মটি শেষ করেছি।কক্ষের বাতিদানে বাতিদানে সতেজ শিখারা ঝলকাচ্ছে,প্রাসাদের দ্বিতল ও একতলা ঘিরে থাকা অলিন্দের সবখানে নবীন সন্ধ্যাবেলার জোয়ান দীপশিখারা ঝমলাচ্ছে রোজকার মতোই;সবকাজ শেষ হয়ে যাবার পরে রোজকার মতোই আমার অন্তর তখন বোধ করা শুরু করেছে যে,আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি!এখন কেবল নিরর্থক নড়ানড়ি করে যাওয়া।নিরর্থক।

আমি ঝলমলে অলিন্দে দাঁড়ায়ে প্রাসাদের চারদিক ঘিরে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধকারের দিকে চেয়ে চেয়ে,রোজকার মতো,সেদিনও এই কথা মনে আনছিলাম।তখন হঠাৎ দেখি দীপশিখারা সকলে দীপদান থেকে উড়াল দিচ্ছে।প্রথমে একটি শিখা জোর ছুট দিয়ে আমার দিকে যাত্রা শুরু করে।সে এগুতে থাকে,অমনি সকল দিকের সকল শিখা আরো জোর ছুট দিয়ে দিয়ে এসে মিশে যেতে থাকে ওটির সঙ্গে।

শয়ন কক্ষের শিখারা আসে,পশ্চিমের ধ্যানঘরের শিখা আসতে কিছুমাত্র বিলম্ব করে না,বাবার পাঠকক্ষের সকল শিখা হুড়মুড় ছুটে আসে।এবং ওই প্রথম ছুটতে শুরু করা শিখাটির অংশ হয়ে যায়।ওরা কই যেতে চায়? কোথায় যাচ্ছে?

এই জিজ্ঞাসার মীমাংসা পাবার আগেই, আমি আমার পুরো শরীরে, জোর এক ঝটকা পাই।বিষম তেজালো সাদা ও সোনালী আলোর ঝটকা।আমার চোখ দৃষ্টিশূন্য হয়ে যেতে যেতে দেখে,আমার শরীরের সবখানে আলো ঝলকে ঝলকে যাচ্ছে।শুধু আলো শুধু সাদা আর সোনালী আলো।সেই আলো দেখতে দেখতে আমি পলকেই জ্ঞানশূন্য হয়ে যাই।

আমার যখন চেতনা ফিরে আসে,আমি দেখি আমি বারান্দায় মেঝেতে একাই পড়ে আছি।দেখি দীপদানের বারান্দার দীপদানের প্রায় সকল দীপই নিভে গেছে,দু একটা কেবল আলো দিচ্ছে, নিভু নিভু আলো।বাইরে আকাশে এখনও অন্ধকার।তবে সেটি যে ধীরে সরে যাচ্ছে,সেটা বোঝা যায়।আকাশে একটি তারা।খুব জ্ব্লজ্ব্লে।

সে আমার দিকে চেয়ে আছে কতোক্ষ্ণ ধরে? সে আমাকে উত্ত্র দেয় না।কিনতু আমার মনে হতে থাকে যে,সে যেনো ক্র্মে খুব ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তার এগিয়ে আসাকে দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ে গত সন্ধ্যাবাতির সকল শিখার এগিয়ে আসার কথা।আবার অদৃশ্য্ একটা আলোক-ঝড়ের ঝাপটা খাই আমি।

আর,আমার প্রাণের ভেতরে কেমন একটা বাসনা ঝটপটিয়ে ওঠে।বাসনা হতে থাকে বাবার পড়ার ঘরে ঢুকে যাবার।সাধ হতে থাকে শ্লোক রচনার।বাসনা জাগতে থাকে বাবার মতন শ্লোককার হবার।খুব ইচ্ছা হতে থাকে।পাগল রকমের ইচ্ছা।

ভোরের আধো আঁধার আর জ্ব্লজ্ব্লে তারাটার আলো শরীরে জড়াতে জড়াতে আমি ছুট শুরু করি প্রাসাদের পাঠ কক্ষের দিকে।ওটা যে বাবার পড়ার ঘর ছিলো,সে কথা তখন একটুও মনে আসে না। ওখানে যে বাবার পরে, দাদাও পাঠকর্ম্ সম্পন্ন্ করেছে,তাও আর স্মরণে আসে না।কেবল মনে হতে থাকে,ওই কক্ষ্ আমার!আমার!

সে আমার জন্য্‌ই অপেক্ষা করে আছে অযুত নিযুত বছর ধরে।আমার জন্য্‌ই!আমি শ্লোক রচনা করি না বলে,ওইখানে ঝুম পড়ে আছে মধ্য্ রাতের কবরস্থানের হিম নৈঃশব্দ। আমি নেই বলে ওইখানে দিন আসে না।বাতাস বয়ে যায় না।শুধু অন্ধকার শুধু ভয়-জাগানো নৈঃশব্দ্ ওইখানে।আমি যে নেই।

আমাকে-আমাকে যেতে হবে ওইখানে-ওই ঘরে-আমাকেও হতে হবে কারুকার।আমারও নিয়তি শ্লোক ফলিয়ে তোলা।আমার অন্তরাত্মা আকুল চিৎকারে চিৎকারে জগৎ-সংসার ফেঁড়ে ফেলতে থাকে।আমার শরীরটাকে চিরে ফেলতে থাকে।চিরে যেতে থাকা মুখ ও বাহু ও পাদুটাকে নিয়ে আমি পাঠকক্ষে ঢুকি।কারুকার সকল পূর্ব‌্ পুরুষ যে আসনে বসে গ্র্ন্থ রচনা করে গেছে,সে আসনে কখন যে বসে যাই –আমার খেয়ালে আসে না।কেবল খেয়ালে থাকে এক সত্য্।

আমি শ্লোক রচনা করছি!কাগজে কাগজে ফলিয়ে তুলছি আমার শ্লোক।

সেই ভোরে ক্র্মে সূর্য্ ফুটতে থাকে পুবের দিগন্তে।পাঠ কক্ষে    ্

বড়ো উদভ্রান্ত হয়ে আছি। নিজেকে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে ফেলছি ভেতরে ভেতরে।কিনতু উদভ্রান্তি ঘোচাবার কোনো উপায়  খুঁজে পাচ্ছি না।

কেবল নিষ্ফল মনে হচ্ছে নিজেকে।নিজেকে নিজেরই অসহ লাগছে।

দিনরাত্রি পার করাকে অসহ্য লাগছে।হাঁটা বসা দাঁড়িয়ে থাকা অথবা চলা-সব কিছু নিরর্থক মনে হচ্ছে।পুরো নিরর্থক।

আমি কী করবো!কী করবো এখন!

কাকে জিজ্ঞেস করি! কাকে জিজ্ঞেস করি এইকথা যে,এমন অবস্থা হলে কী করতে হয়! কীভাবে এমন অবস্থাকে সামাল দিতে হয়!কাকে জিজ্ঞেস করবো!

কেউ নেই আমার। রক্তের সম্পর্কের নিকটজন তো নেইই,দূরের কেউও নেই।থাকার মধ্যে আছে কেবল এক গৃহকর্মী!প্রবীণা সে।বিজ্ঞ তো বটেই।তবে বড়োই জটিল সেইজন!আমার কোনকথার উত্তর সে দেবে,আর কোনটার দেবো না-সেটি আমি নিশ্চিত জানি না।কিছুমাত্র জানি না।

আর,আমার ঘোর সন্দেহও আছে যে,আমার এই সঙ্কট ও যাতনার নিদান তার আদপেই জানা আছে কিনা!

সে হয়তো কেবল জানে আমাকে উসকে দিতে্‌ । আমাকে থাবড়া দিতে।ওই যে,বলছিলো না-এই প্রাসাদের পাঠকক্ষে ইচ্ছা বসত করে?আমাকে সেই ইচ্ছার খোঁজ করতে কেবল উসকে দিযেছিলো না সে? দিয়েছিলো।কিনতু একবারও সে আমাকে ভেঙে বলেনি কেনো সেই ইচ্ছাকে খুঁজে পেতে হবে!আমাকেই কেনো খুঁজে পেতে হবে?পেলে লাভটা কি? কিছুই বলে নি।

আমি কি শেষমেষ ইচ্ছাকে খুঁজে পেয়েছি? আমি নিশ্চিত জানি না। তবে একটা বিষমরকমের অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে দেখেছি আমি।ইচ্ছাকে খুঁজতে খুঁজতে আমি একদিন দেখি কী,আমার শ্লোক রচনার বাসনা হচ্ছে।খুব বাসনা হচ্ছে।

আমার শরীর ও অন্তরকে উথাল-পাথাল, আউলা-মাউলা করে দিয়ে শ্লোকেরা ঝেঁপে নামছে!যে আমি কিনা ছিলাম আদ্যোপান্ত অক্ষর জ্ঞানশূন্য,নিপাট বিদ্যাহীন;সেই আমি কিনা পড়ে উঠতে পারছি প্রাচীন শ্লোকরাশি!কেমন করে পেরে উঠছি?কেমন করে?

ভয়ে-বিস্ময়ে আমি থইথই করছি। তারমধ্যই দেখি, নিজস্ব শ্লোক গড়ে নেয়ার জন্য আমার শরীর তড়পাচ্ছে! আমার পরান পুড়ে যাচ্ছে। শ্লোক গড়ার বাসনা আমাকে ক্ষণে ক্ষণে তছনছ করে দিচ্ছে। আমার যাতনা হচ্ছে, পলকেই দেখি-সুখ হচ্ছে খুব!ওই বাসনা আমাকে চাবকাচ্ছে বলে, আমার সুখ হচ্ছে খুব!

এ কেমন অসুখ হয়ে যায় আমার? এই জিজ্ঞাসার উত্তর গৃহকর্মীর কাছে কতোবার জানতে চেয়েছি? কতোবার?

জানতে চেয়েছি অযুত-নিযুতবার!দিয়েছিলো সে কোনো উত্তর? কিছুমাত্র দেয়নি।

উপরনতু এমন ভঙ্গী করে চলছিলো সে, যেনো জবাব দেয়া তো দূরের বিষয়, আমার কোনো কথাকেই কিছুমাত্র গ্রাহ্য করার কিছু নেই।

তার অবহেলা ও উপেক্ষার আঘাতে কাঁদতে কাঁদতে কতো কতো প্রহর ঘুমিয়ে থেকেছি আমি, এই প্রাসাদের পাঠকক্ষে, সেসব কি বিস্মৃত হয়েছি আমি? হইনি তো।

কাঁদতে কাঁদতে কতো বার মনে এসেছে যে, আমার কেউ নেই। কোনো একজন নিকট মানুষও নেই আমার।

এবং এমন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যাবার পরে, একদিন যখন শেষ বিকালে আচমকাই জেগে উঠেছিলাম আমি, সেইসময় একটা বিস্ময়কর বৃত্তান্ত ঘটে।

সেইবার জেগে উঠে- আমার আর ঘরের বাইরে যাবার ইচ্ছে হয় না। পাঠকক্ষের কালো, নিরালা টেবিলটাতে বসার জন্য অস্থির লাগতে থাকে। বসি আমি।তারপর পেন্সিল কেমন করে উঠে আসে আমার আঙুলে, কেমন করে ভূর্জপত্রে শ্লোক গড়ে তুলতে থাকে আমার আঙুলেরা,আমি বুঝতে পারি না। শ্লোকের পরে শ্লোক। গুচ্ছ গুচ্ছ শ্লোক। একী বিস্ময়! একী অশৈলী বৃত্তান্ত! এটা কেমন করে হয়!

ভয়ে ও আনন্দে আমি চিৎকার করতে থাকি।একা একা চিৎকার করতে থাকি।বিজন বিশাল পাঠকক্ষে একা আমি চিৎকার করতে থাকি।

“ইচ্ছার সাথে দেখা হয়েছে যে!তারপর তো এই্‌ই হওয়ার নিয়তি তোমার, কন্যা!” আমার সকল একাকী উল্লাসকে এইমতে স্তব্ধ শীতল করে দিয়েছে গৃহকর্মীটি। কখন সে এসে হাজির হয়েছে,এই পাঠকক্ষে? রন্ধনশালা না সেই কোন দূরে? নাকি সে সর্বক্ষণ আমাকে চোখে চোখেই রেখে চলেছে? আড়ালে থেকে থেকে ওই্ই করে চলেছে তাহলে?

এমন বিবিধ জিজ্ঞাসা আমার মনে নড়েচড়ে ঠিক, কিনতু সেসকল নিয়ে পড়ে থাকার কোনো বাসনা জাগে না ভেতরে। থাকে কেবল এক অবিচল শিখা।আরো শ্লোক গড়ে তোলা! আরো আরো শ্লোক।

কিছু শ্লোক শেষ হয়, কিছু শ্লোক চোখে ও আঙুলে থির বসে থাকে। আর তারা আমাকে ঠেলতে থাকে ধ্যানকক্ষে যাবার জন্য। বলতে থাকে যে, রচনা করে ওঠার আগে একাকী ধ্যানগ্রস্ত হয়ে ওঠা বিষম জরুরি। ধ্যান করতে চলো। ধ্যানে যাও।

আশ্চর্য! ক্রমে ক্রমে যে আমার বাবা ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার করে-যাওয়া কর্মগুলো অনুশীলন করার পথেই যেতে হচ্ছে আমাকে! ওরা যা করতো, সেসব করা দেখি আমারও নিয়তি হয়ে উঠছে , দিনে দিনে! কেনো?

এরই নাম ইচ্ছাকে পাওয়া?

এই জিজ্ঞাসার কোনো মীমাংসা না পেয়েই আমি মগ্ন হতে থাকি জপে। সূর্যোদযের আগের অন্ধকার আকাশতলে বসে আমি ধ্যানলীন হয়ে চলি দিনের পর দিন। সন্ধ্যায় অস্তাচলমুখী আমি ধ্যান করতে থাকি।

কিসের ধ্যান, কেনো এই ধ্যান-কিচ্ছু বুঝি না! শুধু দেখি, কে যেনো আমাকে দিনভরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে-ধ্যান ও জপ সম্পন্ন করার জন্য। আমার কেবল আগুন আগুন লাগছে ভেতরটা! অশান্তি অশান্তি লাগছে। কিনতু যেই জপে বসা যাচ্ছে,যেই ধ্যানমগ্ন হওয়া যাচ্ছে,অমনই সব শান্ত,শীতল।সুখময় ও সুখকর।

অদ্ভুত তো!

এইভাবে যাচ্ছিলো দিন।এই কিছু সময় শ্লোক নিয়ে থাকা,এই প্রহরের পর প্রহর জপ নিয়ে থাকা।আমার ভালো লাগছিলো।আমি বুঝতে পারছিলাম,আমার ভেতরে জেগেছে দুই ভিন্ন বিষয়ের আরাধনা করার ইচ্ছা!

বাবার শ্লোক গড়ার সাধ ছিলো।ওটি আমার ভেতরে জেগেছে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গিয়েছিলো জপ-তপ-সাধনার পথে।আমার রক্তে সেই সাধনার ডাকও বেজে উঠছে। আমি দুটোকেই নিজের ভেতরে পেয়েছি। আহ! কী বিপুল ভাগ্যবান আমি!দুই কঠিনকে সাধনার ইচ্ছা-সম্পন্ন করেছে আমাকে প্রকৃতি! কী অবিশ্বাস্য ঘটনা!

এমন উল্লাস নিয়ে চলতে চলতে অকস্মাৎ একদিন আমি বোধ করতে পারি, আমার আসলে কিছুই হচ্ছে না! আমি পংক্তি নামাচ্ছি। কিনতু তার সকলই নীরস। বিভাহীন শব্দগুচ্ছ মাত্র। তাতে অন্তরস্পর্শী লাবণ্য নেই, প্রাণ নেই, দিব্য আলোক নেই।কেবলই শব্দ কেবলই নীরক্ত কাহিল শব্দ মাত্র তারা!

আর কিছু নয়। আর কিছু নয়।

ধ্যানে ছুটে যাচ্ছি। জপে মগ্ন হচ্ছি। কিনতু সে হযে উঠছে কেবলই আসন গ্রহণ।হয়ে উঠছে কেবলই চোখ-বন্ধ করে বসে থাকা মাত্র।অন্তরে,গহীনে, কোথাও কোনো আলো ঝলকে উঠছে না। কেবল থাকছে পড়ে এক নিকষ কালো অন্ধকার আকাশ। কোনো সূর্যোদয়ের দিগন্ত নেই, কোনো চাঁদের কিরণ ঝিলিক দেয় না কোনোখানেই।

দিনের পর দিন যায়। এমনই আশা ও তেজহীন হয়ে থাকে আমার সকলকিছু। আমার শ্লোকেরা, আমার ধ্যান ও জপ।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close