Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো / পর্ব ২

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো / পর্ব ২

প্রকাশঃ November 11, 2016

আকিমুন রহমান / বিকেলের নদীস্রোতে অশ্রুবিন্দুটি ভেসে এসেছিলো / পর্ব ২
0
12

10635838_10203626632121590_5228163348278699094_n

উপন্যাস / পর্ব ২

দিনে দিনে, কীরকম বোবা-হিম থেকে থেকে, দাদা তার পনেরো বছর পূর্ণ করে। তখন হঠাৎ একদিন দেখা যায়-সে কেমন একরকম একটা কাজ করা শুরু করেছে। বিষয়টা জপ-তপ পালন করার মতো।কিন্তু আবার যেনো তা জপ-তপও নয়। কোনো রকম নিয়ম-বিধি পালন করাকরির কোনো বিষয় নয় সেটা। কেবল থির বসে থাকার একটা ব্যাপার।

দেখা যায় সকালের সূর্যের দিকে মুখ করে সে বসে আছে। চোখ বন্ধ তার। শরীর শান্ত হিম। সকলে বোঝে, ও ধ্যানে বসেছে। এটা কি সূর্য তপস্যা?

কেউ নিশ্চিত হতে পারে না। সূর্য-তপস্যা হলে তো সেটা শুরু হবে ভোর-আঁধারে; তারপর প্রথম সূর্যরশ্মি জগত-সংসারকে একটু কেবল ছোঁবে, তখুনই শেষ হবে সেই তপস্যা। চোখ খুলে দেখবে তখন সূর্যকে, জগতের অন্য কিছুকেও।

দাদার ধ্যান তো সেই নিয়ম মানছে না!

সে কি ভোর-রাতে তপ শুরু করে? নাকি বেলা একটু ফিঁকে-ফরসা হলে করে? নাকি কখন! কেউ জানে না। যদি ভোর রাতেই শুরুটা করে, তাহলে সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই সেই ধ্যানের শেষ হয় না কেনো! সকাল পেরিয়ে মধ্যদিন যায় যায়, তার তো ধ্যান শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

সকলে বোঝে, কখন জানি গোপনে গোপনে দাদা পৌঁছে গেছে তপস্যা-কর্মের একেবারে শেষ বা মধ্য পর্যায়ে। তাহলে এই নিয়েই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলো সে এতোদিন! নিরালায় একা একা এইপথ ধরে হাঁটা শুরু করেছে! সকলের প্রাণ কষ্টে খাবলি-জাবলি খেতে থাকে। কখন গেলো পুত্র এই পথে! কখন! একটা কোনো জনের নজরে পড়লো না বিষয়টা! পড়লে তো তাকে নিবৃত্ত করার একটা চেষ্টা অন্তত করা যেতো! হায়রে!

হায়! এই কী সন্ন্যাসের পথে যাওয়ার বয়স!

দাদার এই ধ্যান-জপ শুরু করাকরিটা কারো নজরে আসে নি, সেটা কিন্তু ঠিক কথা নয়। আমি তো ঠিক দেখেছিলাম, ও জানি কীসব গোপন কাজ একলা একলা করতে শুরু করেছে।

সেইসব কাজের খানিকটা করার জন্য ও থাকছে দোতলার পশ্চিমের সুমসাম ধ্যানঘরে। খানিকটা করছে বাবার পড়ার ঘরে। আমি প্রায় প্রায় দেখেছি- পশ্চিমের ধ্যানঘর থেকে বেরিয়ে দাদা ঢুকছে বাবার পাঠকক্ষে।

দেখে দেখে আমার মন খুশীতে ছলবল করে উঠেছে প্রথম প্রথম।

মনে হয়েছে, এইবার তবে যদি বাবার পড়ার ঘরে ঢোকা হয়! দাদা যখন যাচ্ছে ওই ঘরে, তবে আমিও তো যেতে পারি ওর সঙ্গে সঙ্গে। তাহলেই তো আর আমার ভয়টা থাকে না!

আমি তো কতো চাই ওই ঘরে যেতে। কিন্তু একা যেতে ভয় করে। দরজা খুলে বইভরা ঘরটার দিকে যতোবার তাকিয়েছি, ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেছি। কোনোদিন ভেতরে ঢোকা হয় নি।

দাদার সঙ্গে এখন তবে আমাকে নিক?

সেই কথার কোনো উত্তর করেনি তো সে তখন। কেবল কতক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে, তারপর জোর হাতে দরোজাটা বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ দরোজার সামনে দাঁড়ায়ে থেকে থেকে আমার কিন্তু খুব মনে হয়েছে, দাদার চোখেরা যেন কেমন মেঘলাদিনের মতন ঘোলা ঘোলা দেখাচ্ছে! কেমন যেন ঘোলা ঘোলা!

কেনো আমি আগেই তবে এই কথাটা বড়োদের বলে দিইনি?

এইভাবে আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলার নিয়ম যে নেই – এই বাড়িতে।

ঘরের অন্য সকলে তখন মনে করে চলেছে যে, দাদা এই যে এমন পাঠকক্ষে ঢুকে থাকছে – তার কারণ আর কিছু না! কারণ হচ্ছে, বাবাকে ভুলতে পারে নাই এই ছেলে। সেই কারণেই হয়তো একা একা বাবার বইগুলো নাড়েচাড়ে। নেড়েচেড়ে হয়তো ভালো থাকে। তো থাকুক না! অসুবিধা তো নেই।

অন্তর তো আর পিতৃহীন হয়ে কম জখম হয় নি। মা এই মনে করে করে দাদার বিষয়ে যতো নিশ্চিন্ত হয়ে উঠতে থাকে, আমি অন্তরে অন্তরে ততো ডাকতে থাকি মাকে। মা মা! দাদা ঠিক নেই! দাদা ঠিক নেই।

মায়ের নজর কেবল পড়ে থাকে তার পুত্রের আহারবিধির দিকে। ছেলে খাওয়ার পাতে বসলো কিনা যথাসময়ে। ঠিক আছে তো তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা? অরুচি অনীহা বিতৃষ্ণা – পেয়ে বসে নাই তো! তবেই বুঝতে হবে – ছেলে তার ভালো নেই। তবেই দুর্ভাবনায় পড়তে হবে। নয়তো, ভাবনার কিছু নেই ছেলেকে নিয়ে। মা ভয়-ভাবনার কোনো কারণ দেখেনি তখন।

কেননা দাদা তখন খাবার-পাতে বসে চলছিলো নিয়ম মাফিক। কিন্তু কী খাচ্ছিলো -সেটা খেয়াল করতে যে দিনে দিনে ভুলে যাচ্ছিলো সে – সেটা কারো নজরে আসেনি।

অথচ এই এট্টুক এক আমি – আমার চোখেরা বলছিলো – ও ঠিক নেই, ঠিক নেই।

প্রতিবেলায় ওর মুখোমুখি আমার জন্যও পাত পড়ে। সেটাই রেওয়াজ এই বাড়িতে। আমি আগে এসে আমার পাতে বসি। বসে অপেক্ষা করতে থাকি ওর জন্য। ও আসে ঢিলা অনিচ্ছুক পায়ে। ওর পাতে বসে। খাবার মুখে দিতে থাকে, কিন্তু কী খাচ্ছে সেদিকে তাকাবার সময় যেনো নেই ওর। ওর মুখোমুখি বসা এই আমাকে খেয়াল করার বিষয়টাও ওর আর যেন মাথায় নেই।

ওর সামনাসামনি পাতে-বসা আমার হঠাৎ হঠাৎ ভয় হতে থাকে! বাবা চলে যাওয়ার পরে যেমন ভয় হয়েছিলো সেইরকম।

কিন্তু ভয় কেনো লাগবে! ও তো বাড়িতে আছে। মায়ের সঙ্গে আমার সঙ্গে – আমাদের বাড়িতে! তারপরও আমার কেনো ওকে দেখলেই ভয় করতে থাকে! কেনো মনে হতে থাকে – দাদা আর আগের দাদা থাকছে না! অন্য কে-একজন জানি হয়ে যাচ্ছে! অন্য কে-একজন যেন! আমি সক্কলকে বিষয়টা বোঝাতে গেলে কী – আমার কথা কেউ বুঝতেই চায় না। কই, কোথাও তো গোলমাল কিছু নেই!

গোলমাল আছে কিনা – সেটা বোঝা যায় – ওই তো দাদার পনের বছর বয়সের সময়। আমার বয়স তখন নয়।

তখন দেখা যায়, ও এক তীব্র-গহনরকমের তপস্যা শুরু করেছে। খুব জোর তপস্যা।

রাতের মধ্যপ্রহর থেকেই আর সে বিছানায় থাকে না। তখন ছাদের পুবমাথায় গিয়ে চোখ বুঁজে সেই যে পদ্মাসনে বসে, আর উঠতে চায় না। বেলা ক্রমে সকাল পার হয়ে দুপুরে পৌঁছায়, ওর জপ শেষ হয় না।

ওর জন্য করা প্রাতঃরাশের সকল আয়োজন – রোজ রোজ নষ্ট হতে থাকে। সে এসে আর প্রাতঃরাশের আসনে বসে না।

রোজ রোজ নিয়ম মেনে আমি তো এসে বসি প্রাতঃরাশের থালে। ঠিক ওর মুখোমুখি  পাতা আসনে। ওর জন্য, নিয়মমাফিক পাতা থাকে থাল। ঢাকা থাকে তাতে কী! খাদ্যের সুগন্ধ কী তাতে আটকায়।

ঢাকা-দেওয়া পাত থেকে হঠাৎ হঠাৎ দমকা ছুট দিয়ে আমার দিকে আসতে থাকে লুচির ওম ওম গরম গন্ধ। মোহনভোগের তপ্ত মিষ্টি সুঘ্রাণ পেতে থাকি আমি। বেগুণ ও আলুভাজার ঝালঝাঁজ এসে আমার জিহ্বাকে ঝটকা দিতে থাকে। ঢাকা-দেওয়া পাতের সন্দেশ থেকে আস্তে আস্তে জেগে উঠতে থাকে ভেজা ভেজা গুড়-গন্ধ!

কত কী ওর জন্য! যে কিনা এখন কতদিন হয়ে যাচ্ছে সকালের প্রাতঃরাশের দিকে ফিরেও তাকায় না। তাকাবে কী! দুপুর পর্যন্ত থাকছে তো ছাদে। সকালের প্রাতঃরাশে তো দূর, মধ্যাহ্নের পুরোটা পর্যন্ত থাকে ধ্যানে। তারপর বেলা যখন বিকালের দিকে পড়ি পড়ি, তখন পাওয়া যায় তাকে খাবার আসনে। পাওয়া যায় পাতের সামনে।

তখন তার একডুবে কোনোরকম স্নান সেরে আসা শরীর। ভেজা চুল থেকে পানি ঝরতে থাকে আবোল-তাবোল রকমে, টপটাপ টপটাপ। স্নান সেরে দেহ শুষ্ক করার বিধি নেই বুঝি ওর এই তপস্যায়?

ওকে দেখতে দেখতে এই কথাটাই শুধু মনে আসে আমার। কিন্তু কেমনে জিজ্ঞেস করি। আহার-পাতেও তো দাদা পুরো মৌন থাকে। কোনো কথা বলে না, কোনো কথা যেনো শুনতেও চায় না।

আমার তখন কখন আহার শেষ। তাও কক্ষের এককোণে, ছায়ার মতন নিঃঝুম হয়ে দাঁড়ায়ে, ওকে দেখতে বড়ো ভালো লাগতে থাকে আমার।

ওই তো দাদা। কী ঢ্যাঙা দেখাচ্ছে ওকে! আর দেখো, কোনো রকমে একখণ্ড শুকনো বস্ত্র কোমরে জড়িয়ে নিয়ে সে এসে বসেছে তার জন্য দুপুরে পাতা থালের সামনে। দেহখানা শুষ্ক করার অবকাশও তার নাই? আমাদের মা আর্তনাদ করে ওঠে তার পুত্রের দিকে তাকিয়ে।

খাওয়া পাতে কথা বলে না সে ঠিক, কিন্তু আহার শেষে মায়ের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মাকে কীসব ভারী ভারী কথা বোঝাতে থাকে দাদা। এই দেহ জল ও মাটি ছাড়া আর তো কিছু নয় মা! জলের সঙ্গে জলের আপনাআপনিই মিশে যাওয়াই তো নির্বন্ধ মা! একে আলাদা করে মুছে নেওয়ার কিছু নেই তো!

এইটুকু বয়সে এ কী কঠিন কথা শোনায় পুত্র! ডরে-ভয়ে মায়ের প্রাণ থরথর করতে থাকে। এ যে পনের বছর বয়সের একজনের মুখে বড়ো বেমানান! কিন্তু তার পুত্র তো পনের বছরেরই!

মায়ের শঙ্কা নিয়ে একটু যেন পরিহাস করে মায়ের পুত্রটি। এই যে মানব দেহ – সে তো জলও ধারণ করে!

ক্ষিতি অপ্ তেজ মরুৎ ব্যোম – প্রকৃতি এই নিয়ে গঠিত তো! এর সঙ্গে সর্বাংশে, সর্বপ্রকারে মিশে যেতে হবে। তবে যদি আত্মজ্ঞান জন্মায়। তবে যদি উপলব্ধি করা যায় এই মনুষ্য-জন্মের মাহাত্ম্য! আমার ভাই সেই সত্যকে পাবার সাধনা শুরু করেছে।

এই বাড়ির নিয়ম নেই যে, কোনো সাধনার আবেগ কোনো জনের অন্তরে জেগে উঠলে, তা থেকে সেইজনকে নিবৃত্ত করে। নিবৃত্ত করার কোনো প্রথাই নেই এই সংসারে। যা আসে, যেমনটা আসে, তাই নিয়তি-লিখন বলে ধরে নেয়াই বিধি এইখানে।

সেই বিধি মনে থাকে বলে আমাদের মা, তার পুত্রকে এমন অচিন সাধনার পথে যাত্রা শুরু করতে কোনো বাধাই দিতে পারে না। কিন্তু তার চোখ দেখে বোঝা যায় তার অন্তর পুড়ে যাচ্ছে। পুত্রের এই সাধনার বিষয়টি তাকে কষ্ট দিচ্ছে। এই যে পুত্র-এই একজন শুধু পুরুষ এখন, এই সংসারের। সে কেনো যাবে – এমন কঠোর ব্রত -পালনের দিকে!

এই যে কেবল পনের বছর বয়স – এখনই সে হয়ে আছে প্রায় একাহারী। সকালের আহার তো বন্ধই করেছে সে। দুপুরে আর সে কোনো আমিষ – সে মাছই কী মাংসই বা কী – এখন পাতে নেয় না। সন্ধ্যার মুখে ফলাহার মাত্র। হায়! এমন নবীন বয়সে – এ কোন বৈরাগ্য তাকে ঘিরে নিল!

বাবাকে হারানোর শোক থেকে কি এসেছে এমন জপ ও তপস্যার নেশা? এটা কি সেই বেদনাকে ভুলে থাকার চেষ্টা?

তাই যদি হবে, তবে সে তার মনের ব্যথাকে কি তার মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতো না? মা ও ছেলেতে মিলে গলা ছেড়ে ডাক-চিৎকার-বিলাপ ও অশ্রুপাত করে তো মনের ভার নামিয়ে দেয়া যেত!

আর, সংসারে বাবা মা তো কারোরই চিরদিন বেঁচে থাকে না। এই সত্য মেনে নেওয়া সহজ নয়, সেটা ঠিক। কিন্তু বিধির বিধান না মেনে আর কোন উপায় আছে মানুষের! কোনো উপায় নেই!

কত কত জটিল কথা না বোঝে মাযের সন্তান? সে কী এটা বোঝে না যে, বিধিলিপি খণ্ডায় না? কী দুঃখে তাকে তবে যেতে হবে সাধন-তপস্যার এমন কঠিন পথে! সে নিজের দুঃখ বোঝে, অভাগী মায়ের বেদনা বোঝে না? মায়ের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব যে পিতার অবর্তমানে পুত্রের ওপরই বর্তায়! হায়রে! দুঃখিনী মায়ের কথা স্মরণে আনার সময় নেই পুত্রের!

এতসব কথা আমি আমার মায়ের চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে দিয়ে উঠতে দেখি। ক্ষণে ক্ষণে উঠতে দেখি! ভাই কী একবারও দেখে না!

তো, এই এতো সবকিছুর মধ্যে আমার কথা যেন আমার মা ও ভাইয়ের কিছুমাত্র মনে পড়ে না। আমাকে দেখার জন্য গৃহকর্মীরা তো আছেই! তারা প্রতিজনই তো জানে কীভাবে এই সংসারের সন্তানকে প্রতিপালন করতে হয়। জানে কেমন কেমন রীতিতে, কোন কোন বয়সের সন্তানদের কোন কোন চলাচলতি শেখাতে হয়।

মা আমাকে মনে করে না ঠিক, দাদা আমাকে মনে রাখে না ঠিক; কিন্তু গৃহকর্মীরা আমাকে একটুও ভোলে না। তারা করে কী – এ বাড়ির নিয়ম-বিধি-সূত্র আমাকে – শিক্ষা দিয়ে যেতে থাকে। নীরবে ধীর-রকমে শিক্ষা দিয়ে যেতে থাকে।

এই যেমন, দাদা যেদিন থেকে প্রাতঃরাশ খাওয়া বন্ধ করে দিলো, সেদিন আমার বরাদ্দে ছিলো ভেজা ফলার। আর, ওর পাতে ছিল পাকা ফলার – এই তো-লুচি, মোহনভোগ, আলু ও বেগুনভাজা, আর খান কতক গুড়ের সন্দেশ।

আমার ভেজা ফলারে অমন মনোহর কোনো পদই ছিলো না। ছিলো কেবল অনেকখানি ভেজা-চিড়া, পাতের কিনারে রাখা মাটির খোরায় ঘরে-পাতা টক দই, দুটো সবরীকলা, একটুকরা আখের গুড় আর একটু নুন।

আমি সেদিন একা-একা অনেকক্ষণ দাদার জন্য অপেক্ষা করে করে শেষে, নিজের পাতের ভেজা ফলারে আঙুল রাখি।

চিরদিন ধরে, আহারের সময়ে, আমাদের দুই ভাইবোনের মুখোমুখি বসাই নিয়ম। দুই দিকের দুই কিনারে একসময় বসা থাকতো বাবা ও মা। এখন কেবল মা-একা । মা সেই সকালে দাদার জন্য বসে থেকে থেকে থেকে, মন বেজার করে করে করে, শেষে আমাকে বলে আহার শেষ করতে।

উল্টো দিকে ঢাকা দেওয়া দাদার থালা থেকে সুগন্ধ ঝিটকে-ছিটকে উড়ে-উড়ে আসতে থাকে আমার দিকে। একটু পর-পর আসতে থাকে, আর আমার মন খারাপ হয়ে যেতে থাকে। আমাকেও যদি দিত আজকে অমন পাকা ফলার!

আমাদের সংসারে বিধি এই, দাদা ও আমি – আমাদের পাতে রোজ একই খাদ্যবস্তু পাবো না। আমি যদি পাই ভেজা ফলার, তো দাদা সেদিন পাবে পাকা ফলার। অন্যের ভাগ্যে যতো মধুই জুটুক, তা নিয়ে নিজে যেন অসন্তোষে পড়তে যেও না! একরত্তি লোভেও যেনো টসকে উঠো না!

সেই শিক্ষা রক্তে গেঁথে দেওয়া চাই-ই। তার জন্যই এমন দুই পাতে দুইরকম খাদ্য দেয়ার বিধি-বন্দোবস্ত করে গেছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা!

সেইদিন দাদা তো এসে বসেনি তার প্রাতঃরাশের পাতে। আমি কেবল ছিলাম আমার ভেজা ফলারে।

তারপর থেকে রোজ এই যে আমার চলছে ভেজা ফলারের বরাদ্দ। আর, দাদার জন্য পাত পড়ছে পাকা ফলারের। সে যদি একটা দিন এসে বসে এই পাতে, তাহলেই কিন্তু এই বন্দোবস্ত বদলে যাওয়ার ফুরসতটা আসে! তখন ওর জন্য থাকবে ভেজা ফলার, আর আমার জন্য আসবে পাকা ফলারে সাজানো থালা।

দাদা যদি একটা দিন, একবারটি, একটু কেবল এসে পাতে বসতো সকালে! আমি মনে মনে দাদাকে কত ডাকতে থাকি। এই যে এই পনেরো-বছর-বয়সী দাদাকে!

[চলবে …]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(12)

  1. পড়ছি। এখনো মনতব্য করার মতো সময় আসে নি। মনে পড়ছে আকিমুন রহমানের রক্ত পুঁজে .. বইটি। একই রকমের একটা স্মৃতিচারণের প্রভাব আছে। বাঙালি মুসলমান পরিবারগুলোকে ধরার একটা চেষ্টা ছিলো গত শতকের আশির দশকের পটভূমিতে। এ উপন্যাসের ক্ষেত্রে আরও কয়েকটা কিস্তি পড়ে বলবো।

    1. ধন্যবাদ, পড়তে থাকুন উপন্যাসটা। আপনার পরবর্তী মন্তব্যের অপেক্ষায় থাকলাম।

    2. ধন্যবাদ আপনাকে।আরো ধন্যবাদ জানাই,রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি উপন্যাসটিকে মনে রাখার জন্যে।তবে প্রসঙ্গত বলি,ওই আখ্যানটি গত শতাব্দীর আশির দশকের পটভুমিতে দাঁড়িয়ে নেই।আছে সত্তর দশকের একেবারে গোড়ার দিকে।

    1. প্রিয় জাকিয়া এস আরা,ধন্যবাদ।আশা করছি একসময় এই লেখাটি আপনার কেবল “ভালোই” লাগবে না,অনেকখানি ভালো লাগবে!

  2. ভাল লাগছে।পড়তে পড়তে কখন বুঁদ হয়ে গেছি মনে নেই।দ্বিতীয় পর্বটি যেন ঝট করে শেষ হলো।দাদাটির চলে যাওয়া দিয়ে শেষ হলে খুশী হতাম।

    1. ধন্যবাদ শাহনাজ পারভীন!আমি গভীর অনুপ্রাণিত বোধ করছি।

  3. গভীর ও তীব্র নারীবাদী লেখক-চিন্তক আকিমুন রহমানের, এ বছর প্রকাশিত অনবদ্য উপন্যাস সাক্ষী কেবল চৈত্র মাসের দিন পড়ে আমি মহত্ত্বর মানবিক বোধে উদ্দীপ্ত হই এবং তাঁর মননশীল রচনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজ তথা কথাসাহিত্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহী হয়ে উঠি। তাঁর স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত প্রকাশভঙ্গি ও ভাষারীতির পাশাপাশি অসামান্য সংবেদনশীলতার পরিচয় এই উপন্যাসের দুই পর্বেও মুদ্রিত দেখতে পাই। বাবার ওভাবে চলে যাওয়া কিংবা দাদার মাত্র পনেরো বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণের ঘটনায়, পাঠক হিসেবে, যতোটা না বিচলিত হই তার চেয়ে ঢের একাত্ম হয়ে উঠতে পারি ভেজা ফলার খেতে বাধ্য শিশুটির প্রতি। টের পাওয়া যায় যে সে কন্যাশিশু। এই জায়গা থেকে উপন্যাসটি কোন দিকে বাঁক নেয় তা দেখাই এখন পাঠকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কেননা আকিমুনের অতল গহন মানবিক অনুভূতি আমার মতো প্রায়-অলস পাঠককেও অই বাড়ির বাসিন্দা করে তুলেছে এরিমধ্যে।

    1. আমি গভীর কৃতজ্ঞ বোধ করছি খালেদ হামিদী!জানবেন আপনার এই বাক্যাবলী- আমার জন্য বয়ে এনেছে নিজেকে এই রচনাটির সঙ্গে গহন রকমে লগ্ন করার তাড়া ও তাগাদা ও বাসনা ও সাধ ।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close