Home সাক্ষাৎকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার >> “সেক্স নিয়ে সাহিত্য করা রিস্কি…”

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার >> “সেক্স নিয়ে সাহিত্য করা রিস্কি…”

প্রকাশঃ January 4, 2018

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার >> “সেক্স নিয়ে সাহিত্য করা রিস্কি…”
0
0

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার >> “সেক্স নিয়ে সাহিত্য করা রিস্কি…”

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ ৪ জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মৃত্যুদিন। এ উপলক্ষে কলকাতার নন্দন পত্রিকায় ছাপা হওয়া এই দুর্লভ সাক্ষাৎকারটি তীরন্দাজে প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশে স্বল্পপঠিত বলেই এটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। এই সাক্ষাৎকারে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এমন কিছু কথা বলেছেন, যার কথা অন্য কোনো সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায় না। ]

নন্দন : আপনার জন্ম তো বগুড়ায় নয়, মামার বাড়ি রংপুরে প্রথমে আপনার ছেলেবেলার কথা কিছু বলুন

ইলিয়াস : হ্যাঁ, আমি বগুড়ার ছেলে হলেও আমার জন্ম আমার নানার বাড়িতে। তখন সেটা ছিল অবিভক্ত বাংলার রংপুর জেলা। গ্রামের নাম গোটিয়া। এখন অবশ্য সেটা গাইবান্ধা জেলায়। আমার বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস সরাসরি যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। আমার জন্মের সময়ে বাবা ছিলেন বগুড়া জেলার মুসলিম লীগের সম্পাদক। পেশায় তিনি ছিলেন একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। চল্লিশের দশকের প্রথমে বগুড়া জেলায় মুসলিম লীগকে নিম্নমধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তের সংগঠনে রূপ দিতে বাবা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তবে সেই সময়ে দেশের দুই প্রধান সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে তারা মুক্ত ছিলেন না, যদিও একটা কথা আমি জোর দিয়েই বলব যে, এখনকার সাম্প্রদায়িকতাবাদের সঙ্গে তাদের মনোভাবকে একই বন্ধনীভুক্ত করে দেখা ঠিক হবে না। আমার বাবা ছিলেন সম্পূর্ণ লিবারেল ডেমোক্র্যাট। কেবলমাত্র মুসলমান মধ্যবিত্তের ঠিকানাই ছিল তাদের বাসনা।

তুমি জিগ্যেস করেছিলে আমার ছেলেবেলার কথা, আমি কিছুটা ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলাম। চার বছর বয়স পর্যন্ত আমার পিতামহের বাড়িতেই কাটে। বগুড়া শহরের অবস্থান করতোয়া নদীর ধারে, নদীর ঠিক ওপারেই নারুলি গ্রাম। সেই গ্রামেই তখন আমার পিতামহ থাকতেন। আমাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল বগুড়া জেলারই চন্দনবাইসা গ্রামে। আমার জন্মের অনেক আগেই দাদা নারুলিতে এসে বাড়ি করেছিলেন। যদিও নারুলির বাড়ির স্মৃতি আমার তেমন স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই সময়টা নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে। জীবনের প্রথম চারটে বছরে পিতামহের বাড়িতে। পিতামহ, কাকারা, ফুপুরা সব একসঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারে বাস করার সুযোগ আমার কেবল সেই সময়েই হয়েছিল। আমার বাবা ছিলেন বাড়ির বড় ছেলে, স্বভাবতই আমার দিকে সকলের একটু বিশেষ দৃষ্টি ছিল। কারণ, আমিও বাবার প্রথম সন্তান। কিন্তু আমার কাছে সব থেকে কাম্য ছিল আমার পিতামহের সঙ্গ। তিনি যথেষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। পুলিশের অফিসার ছিলেন। আমার জন্মের কিছুদিন আগে অবসর নেন। ইসলামের প্রতি ছিল তাঁর নিরঙ্কুশ আস্থা, যদিও অন্যান্য ধর্ম, বিশেষ করে সেমেটিক ধর্মগুলো সম্বন্ধে পড়াশুনা করতেন। দাদার বাড়ির কাছেই ছিল রেললাইন, সেখানে একটা রেলগেটও ছিল। আর ছিল রেলগেট খোলা আর বন্ধ করার জন্য একটি গুমটি ঘর। এই গুমটি ঘর যে পাহারা দিত তার নাম ছিল ঈশান। কিন্তু সবাই তাকে গুমটিওয়ালা বলেই ডাকত। আমার দাদা তাকে ডাকতেন ঈশান বলেই। ধর্ম বিষয়ক আলোচনায় ঈশানের খুব অদ্ভুত আগ্রহ। জীর্ণ, পুরনো ছাপা কাগজপত্র নিয়ে প্রায়ই সে আসত দাদার কাছে। ঈশানের একবার খুব ঝোঁক হয়েছিল ইহুদি হওয়ার। কিন্তু ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হওয়া যায় না, দাদার কাছে এই কথা জানার পর ঈশানের খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল।

নন্দন : আপনার স্কুল জীবনের সূচনা পর্ব কোথায় ?

ইলিয়াস : ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে সেন্ট ফ্র্যান্সিস স্কুলে আমি প্রথম ভর্তি হই। এই স্কুলে নিচু ক্লাসে ছেলেমেয়েরা একসাথে পড়ত। আমার বাবা এই সময়ে রাজনীতি নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে পারিবারিক বিষয়ে মন দেওয়ার সময় তার আদৌ ছিল না। আবার বাবা রাজনীতি করতেন বলে আমাদের আশে পাশে অনেক লোক থাকতেন। এদেরকে আমরা চাচা বলতাম। এই রকমই একজন ছিলেন সিদ্দিক চাচা। তাকে দিয়ে আমাদের দুই ভাইকে স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করান মা। সিদ্দিক চাচা ভর্তি করিয়েই খালাস। পরের দিন আর এক চাচা ভার নিলেন আমাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তিনি ভালো করে জানেন না যে আমাদের কোন স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। ঐ এলাকায় তখন বহু স্কুল। নওয়াবপুর প্রিয়নাথ স্কুল ছাড়া অন্য সব স্কুলই লক্ষ্মীবাজার এলাকায়। সেই চাচা আমাকে আর আমার ভাই শহীদুজ্জামানকে নিয়ে একটার পর একটা স্কুলে খোজ নিতে শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলের মেমসাহেবরা খাতাপত্রে আমাদের নাম খুঁজে পেলেন। এই স্কুলে আমরা বছর দেড়েক পড়েছিলাম। বাবার রাজনৈতিক সহকর্মী এরপর আমাদের ভর্তি করিয়ে দেন কলেজিয়েট স্কুলে। এখানেও দু’বছর পড়েছিলাম, তারপর চলে গেলাম বগুড়া জেলা স্কুলে। সেখান থেকেই ম্যাট্রিক পাস করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় বাংলা নিয়ে পড়লাম। আসল ব্যাপার কি জানো, আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই আমায় প্রচুর বই পড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তার নিজের ধর্মবিশ্বাস তিনি একবারের জন্যেও আমার উপর চাপিয়ে দেননি। এমনকি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় আচার পালনের জন্যও তিনি আমার ওপরে চাপ দেননি। স্কুলে নীচের ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই আমি নানা বিষয় নিয়ে বাবার সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিতাম। বেয়াদবি তিনি অনুমোদন করতেন না, আবার মতের অমিল হলে রাগও করতেন না। সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম।

নন্দন : আপনার প্রথম লেখা তো কবিতা এখনো কি কবিতা লেখেন ?

ইলিয়াস : কবিতা এখনো লিখি। ছাপার মতো হয় না, তবু লিখি। বলতে পারো লিখতে খুব ভালো লাগে। শুনবে আমার একটি কবিতা ? কবিতাটির নাম ‘লাশ’। এটা লিখেছিলাম ’৬৬ সালে।

 

নদীর ওপার বিজন মাঠে একটা কাচের ঘর

ডাক্তার হোসেন কাটছে কাহার লাশ?

উটের গ্ৰীবার মতোন আঁধার কাঁপলো থরথর

মধ্যরাতে নিলো না নিশ্বাস।

কে ছিল এই লাশের মালিক? কোথায় ছিল বাড়ি?

বাবা-মা ছিল? বৌ ছিল? সন্তান?

চলাকানো তার লবণ-লালে কে দিয়েছে পাড়ি? ক্ৰেজি কণ্ঠে তিমিরবরণ গান?

নন্দন : আপনার সৃষ্টিতে মানুষ দ্বন্দ্বসংশয়সহ যাবতীয় বিপরীত চেতনায় উপস্থিতি, কিন্তু অনেকে মনে করেন যে, প্রগতিশীলেরা একধরনের ঔচিত্যবোধের দ্বারা তাড়িত হন, মানুষকে তারা সব সময় দেখে ইতিবাচক রূপে এই তথাকথিত প্রগতিশীলতার নীতিবাদী খুঁতখুঁত মনোভাব মনে হয় আপনাকে তাড়িত করে না আপনি নিজে কী বলেন?

ইলিয়াস : কেবলমাত্ৰ সাহিত্য নয়, স্বাভাবিকভাবে যাকে নীতিবোধ বলা হয় তাতে আমার কোনো আস্থা নেই। নীতিবোধের যে ব্যাপার, সেটা আমার কাছে মনে হয় ব্ৰাহ্মসমাজের মতো ব্যাপার। বিষয়টা আমার কাছে খুব হাস্যকর মনে হয়। ন্যায়বোধ বা সত্য— এই সবকে আমি দেখতে চাই ম্যাটার অব ফ্যাক্ট হিসাবে। সাধারণ মানুষের ভালোভাবে বাঁচার কথা আমি কোনো নীতিবোধ থেকে বলি না, বলি সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞান থেকে। এটা খুব কমন সেন্স আমি যে ভাতটা খাচ্ছি, সেটা যে উৎপাদন করছে, সে এর সঠিক দাম পাচ্ছে না। এতে আমি গিল্টি ফীল করছি। এটা কিন্তু কোনো নীতিবোধের বিষয় নয়। তবে কমিউনিস্টদের মধ্যে একধরনের মানুষ আছেন যাঁরা নীতিপাগল। কিন্তু এই নীতিপাগল বিষয়টা আমি মনে করি মার্কসবাদের সঙ্গে খাপ খায় না। বুর্জোয়া সমাজ কিন্তু এই নীতিবোধ দিয়েই শোষণের কাজটা চালিয়েছে।

নন্দন : তাহলে কমিউনিস্ট মোরালিটি যে কথাটা আজকাল খুব শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

ইলিয়াস : কমিউনিস্ট মোরালিটি বলে যে  কথাটার আজকাল খুব প্রচলন হয়েছে সেটা অ্যান্টি মার্কসসিস্ট আমার মনে হয় না যে, এমন কিছু থাকতে পারে। তুমি যদি প্রলেতারিয়েতদের মোরালিটি বিষয়টা দেখ, তাহলে দেখতে পাবে যে, এই মোরালিটি কিন্তু এক-এক সমাজে এক-এক রকম। একটা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের কোনো প্রলেতারিয়েতের কাছে তুমি উচ্চ মানসম্পন্ন মানসিকতা আশা করতে পার না। কারণ, সেই শ্রমিকটি তো সেই বুর্জেয়া সমাজেরই প্রোডাক্ট… সুতরাং কমিউনিস্টদের জন্যে আলাদা কোনো নৈতিকতা থাকতে পারে, তা আমি মনে করি না। কমিউনিস্টদের মধ্যে যেটা আছে, সেটা হচ্ছে তাদের ডেফিনিট সোস্যাল কমিটমেন্ট, তাদের প্রোগ্রাম আছে। নির্দিষ্ট দর্শন আছে, কিন্তু দর্শন আর নৈতিকতা তো এক ব্যাপার নয়। অনেক কমিউনিস্ট লেখক আছেন, যারা মানুষের যৌনজীবনকে দেখতে চান না, কৃষককে মহান সংগ্ৰামী হিসাবেই দেখতে চান।

কেন ? সেই কৃষকের মধ্যে কি ফাঁকিবাজির ভাঁওতা থাকতে পারে না? এগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া একধরনের শুচিবায়ুতা। আমি মনে করি মানুষের বেঁচে থাকাটা বেসক্যালি পজিটিভ।মানুষ যে হাজার কষ্টের ভিতরও বেঁচে আছে, এটাই পজিটিভ। তাকে আলাদাভাবে পজিটিভ করে তোলার চেষ্টা করার কোনো অর্থ নেই।

নন্দন : যদি বলি বিকল্প নেই বলেই মানুষ বেঁচে আছে?

ইলিয়াস : শত কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকাটা মরে যাওয়ার থেকে ভালো। মানুষ তার ভালোমন্দ সব কিছু নিয়েই বেঁচে থাকে, চেষ্টা করে, সেটাই তার স্বাভাবিক প্রবণতা। আমার কাছে সাম্যবাদ হল একটা কাণ্ডজ্ঞানের, কমন সেন্সের ব্যাপার, পৃথিবীর যে সম্পদ, যে সুযোগ-সুবিধা আছে, এটা সবাই সমানভাবে ভোগ করবে- এর পাল্টা যুক্তি কী থাকতে পারে? নন্দন : আপনার সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনায় প্রবেশ করার আগে বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক একালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী হিসাবে আপনার কাছে জানতে চাই বাংলা ছোটগল্পের কোনো সংকট কি আপনি অনুভব করছেন?

ইলিয়াস : প্রথম আমাদের দেখা দরকার ছোটগল্পের চর্চার ঐতিহাসিক পটভূমিকাকে; বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থায় উৎপন্ন ব্যক্তির বিশেষ সমস্যা, সংকটকে কেন্দ্রবিন্দু করে তাকে তীক্ষ্ণভাবে দেখার জন্যে-ই বিভিন্ন ভাষায় গত দেড়শো বছর ধরে ছোটগল্পের চর্চা হয়ে আসছে। ছোটগল্পের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে— এই চরম জবাবটি শুনে মনে হতে পারে যে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থারও হাল মুমূর্ষু অবস্থায় এসে ঠেকেছে। যেমন, তুমি দেখো, মহাকাব্য বিদায় নিয়েছে সামন্ত ব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে-ই, অথচ মানুষের বীরত্ব এবং মহত্ব, দয়া এবং নিষ্ঠুরতা, করুণা এবং ক্ষমা এবং ঈর্ষা, ক্ৰোধ এবং ভালবাসা, ভোগ এবং ত্যাগের সর্বোচ্চ রূপের প্রকাশের মধ্যে সেই সময়ের মূল্যবোধ আর বিশ্বাসকে কিন্তু পরম গৌরবান্বিত করা হয়েছে মহাকাব্যেই। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অন্য যুগের পাঠকদের কাছে মানুষদের সেই দেবত্ব কিন্তু ক্রমেই লোপ পেয়েছে। কিন্তু আজও পাঠক মহাকাব্যের গৌরব নিয়ে উদ্ভাসিত হয়। মহাকাব্যের গৌরব বাড়ে। কিন্তু অন্য দিকে এসে মানুষকে, সমাজকে, আস্থাকে প্রকাশ করতে পারে না। নতুন সমাজে মানুষ অতিমানব নয়, সে নিছকই ব্যক্তিমাত্র। বুর্জোয়া সমাজে ব্যক্তির উত্থানের সাথে সঙ্গতি রেখে, সেই উত্থানকে প্রকাশের স্বার্থে, বিকাশের তাগিদে জন্ম হয় উপন্যাসের। প্রথম দিকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলিতে সমাজের নতুন মানুষ ‘ব্যক্তি’কে গৌরবান্বিত করার উদ্যোগ স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজস্যব্যবস্থার জন্যেই ব্যক্তিস্বাধীনতা যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্যাতসেঁতে কোটরে, তখন এই মাধ্যমটিই তার ক্ষয় ও রোগ শনাক্ত করার দায়িত্ব তুলে নেয় নিজের উপরে; আজ রোগ ও ক্ষয়ের শনাক্তকরণের সাথে আরো খানাতল্লাশি চালিয়ে ব্যক্তিমানুষের উদ্দীপ্ত হওয়ার সুপ্ত শক্তির অন্বেষণে নিয়োজিত হয়েছে উপন্যাসই। আর ছোটগল্প তো তার জন্মলগ্ন থেকেই বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির রোগ এবং ক্ষয়কে তীক্ষ্ণভাবে নির্ণয় করে আসছে। এই সমাজব্যবস্থার একটি ফসল হয়েও ছোটগল্প এই ব্যবস্থার শ্রীচরণে তার সিঁদুরচর্চিত মুণ্ডুখানি কোনোদিনই ঠেকিয়ে রাখেনি যে এর মহাপ্রয়াণ ঘটলে তাকেও সহমরণে যেতে বলে। এছাড়া, এই বুর্জোয়া শোষণ ও ছলাকলার আশু সমাধানের কোনো লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না।

আমাদের মনে রাখা দরকার, মানুষ কেবলমাত্র ইতিহাসের উপাদান নয়। মানুষ কোনো তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজনীয় উপকরণমাত্র নয়। উপন্যাস, ছোটগল্প চর্চার মতো শ্রমজীবীর জীবনযাপন এবং সংস্কৃতিচর্চার মধ্যে জীবনে গভীর সত্যকে অনুসন্ধানের ভিতর শিল্পচর্চার অর্থময়তা নির্ভর করে, তত্ত্বের ভিতরে যে সত্য আছে অনুসন্ধানের ফলেই তার উন্মোচন ঘটবে।

 

 

নন্দন : যৌনতা আপনার লেখায় নানাভাবে এসেছে নরনারীর যৌন সম্পর্ক ছাড়াও হোমো সেক্সচুয়্যালিটি বা মাস্টারবেশন আপনার লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে আমার মনে হয়, সাহিত্যে যৌনতা নিয়ে নাড়াচাড়া যথেষ্ট ঝুঁকির কাজ যৌনতা অনেক ক্ষেত্রেই সাহিত্যে সুষমার বদলে ভালগারিটির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, আপনার লেখায় যেখানে যৌনতা এসেছে, সেখানে কিন্তু সেটাই প্রধান নয় আপনারউৎসবগল্পে সেক্সুয়াল স্টিমুলেশনের সঙ্গে লিভিং স্ট্যান্ডার্ডের সম্পর্ক, কিংবা মাস্টারবেশন এসেছে চরিত্রের নিঃসঙ্গতার প্রেক্ষিতে আপনি কিছু বলবেন?

ইলিয়াস : (হাসতে হাসতে) তুমি ঠিকই বলেছ, সেক্স নিয়ে সাহিত্য করা রিস্কি | অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা লেজে-গোবরে হয়ে যায়। যৌনতাকে আমি কোনো সময়েই গ্লোরিফাই করিনি। তুমি লিভিং স্ট্যান্ডার্ডের কথা বলছিলে। ইউ আর ওয়ান হান্ড্রেড পারস্টে রাইট, আমি সেক্সের পেছনে লিভিং মানে ক্লাসকে দেখতে চাই, সোসাইটিকে দেখতে চাই। আর তুমি যে, মাস্টারবেশনের কথাটা বলেছি- হ্যা, ওটা আমার লেখায় শুরু থেকেই আছে। অনেক আগে, আমার প্রথম দিককার একটা গল্প আছে, একটা ছেলে মাস্টারবেট করছে, তার পরিচিত একটি বড়লোকের মেয়েকে কল্পনা করছে, কিন্তু কল্পনায় সেই মেয়েটিকে কিছুতেই আনতে পারছে না। সে কোনদিনও পারবে না। কারণ ঐ মেয়েটা তার আয়ত্তের অনেক বাইরে। বাস্তবে সে কোনো দিনই পারবে না মেয়েটির কাছাকাছি পৌঁছুতে। এই রেঞ্জটাই হচ্ছে class consciousness, sexual imagination এর সাঙ্গে class এর ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। ধরো তুমি কল্পনা করছ, you are having sex with Queen, her highness, I mean Queen Elizabeth the second, কিন্তু দেখবে, তুমি পারবে না, extreme moment এ যখন তোমার ejaculation হচ্ছে Elizabeth has disappeard, there lies some one else. ঠিক কিনা?এখানেই class ব্যাপারটা আসছে। এখানে তুমি একজন middle class character, কারণ তুমি তোমার sexual partner-এর উপর dominate করতে চাও। কিন্তু psychologically তুমি Elizabethকে dominate করতে পারো না, কল্পনাতে হলেও dominate করার মতো তোমার close রেঞ্জে যাকে পাচ্ছো…। এইভাবেই sexও যে শ্রেণী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, অনেক কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী তা বুঝতে চায় না, অশ্লীলতার কথা বলে। আমি মনে করি যে, একটা ছেলে যদি একটা মেয়েকে চুমু খায় এবং সেটা যদি অপ্রয়োজনীয় হয় তাহলে সেটা অশ্লীল, যে কারণে বাংলা সিনেমা অশ্লীল, সেখানে অহেতুক একটা ছেলে একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু পাশাপাশি একটা intercourse-এর detail description অশ্লীল নাও হতে পারে যদি তা প্রয়োজনীয় হয়। আর তুমি masturbation-এর কথা বললে। আমি masturbation-কে গুরুত্বের সঙ্গেই দেখি। যে লোকটা masturbate করছে, সে এক চূড়ান্ত lonely man, এর ভেতরে আমি society-কেই দেখি। কারণ সেই লোকটি unhealthy man এবং he is the product of unhealthy society। সে লোকটা psychologically unhealthy। কারণ sex এমন একটা বিষয় যেখানে you need a partner। যে লোকটা masturbate করছে, তার মানে তার কোনো partner নেই, অথবা he is incapable of having a partner, অন্তত partner নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে কিনা তা নিয়েও সে দ্বিধান্বিত। সে totally একজন lonely মানুষ। সমাজে তার usual সেক্সের সুযোগ নেই।

নন্দন : কিন্তু সব সমাজ তো আর sex free নয় যে চাইলে সঙ্গী পাওয়া যাবে

ইলিয়াস : Society is not free, the society is not healthy even. একটা sick society-তে মানুষ masturbate করে। তবে এটা কিন্তু শুধু sex free-এর ব্যাপার নয়। বহু married লোকও নিয়মিত masturbate করে। মানে যে ওই কাজটা করে, তার কোনো partner নেই, কিংবা যে partner আছে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, in his deep inside নিঃসঙ্গতা আছে, সে সব অর্থেই একজন partnerless man। একটা sick society-তে মানুষের এই অবস্থা হয়। আমেরিকার মানুষরাও masturbate করে। কিছু মনে কর না, আমার তো মনে হয় গর্বাচেভও masturbate করতেন। কারণ তিনি তো একটা sick society তৈরি করার হোতা।

নন্দন : আপনার চিলেকোঠার সেপাই কিংবা খেয়াকনামার চরিত্রগুলোর মধ্যে কি কোনো মডেল ছিল ?

ইলিয়াস : চিলেকোঠার সেপাইতে সেই অর্থে কোনো মডেল ছিল না। অনেক চরিত্র মিলেমিশে হয়তো একজন তৈরি হয়েছে। তার পরিচিত জনের ছায়া তো আছেই। নিজেও আছি অনেক জনের মধ্যে। তবে চিলেকোঠার সেপাই সম্পূর্ণ উপন্যাসটার মধ্যে প্রলেতারিয়েত চরিত্র বলতে যা বোঝায় তা আমার মনে হয় হাড্ডি খিজির; আনোয়ার, ওসমান হলো middle class। হাড্ডি খিজিরের মধ্যে আমি কোনো মিডল ক্লাস এলিমেন্ট ঢোকাতে চাইনি। তবে হাড্ডি খিজিরের মধ্যে অনেক চরিত্রের amulgamation আছে । খোয়াবনামার চরিত্রগুলো সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়। ’৪৭-এর দেশভাগ যে কত মর্মান্তিক, কত শোচনীয়, অর্থহীন হয়েছে তা দিনে দিনে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

নন্দন : এই উপন্যাসটাকে বলা যেতে পারে ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গের দলিল

ইলিয়াস : বাঃ, খুব সুন্দর কথা বলেছ। সেই সময়ে মুসলিম লীগের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা ছিলেন। তাঁরাও এই উপন্যাসে উপস্থিত। সেদিক থেকে দেখতে গেলে তুমি উপন্যাসটার ভেতরে সে সময়ের মুসলিম লীগের বিশিষ্ট নেতা আবুল হাসেমকেও খুঁজে পাবে। তারা সমসাময়িক শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের মতো চাইতেন মুসলমান ছেলেমেয়েরা হিন্দু ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলুক। কেবলমাত্র মধ্যবিত্তের বিকাশের বাসনা পূরণ করতে গিয়ে যে আন্দোলন তারা করলেন তা আদৌ সমৰ্থন করতে পারা যায় না।

নন্দন : খোয়াবনামের কথা যখন উঠল তখন আপনার কাছে হিন্দুমুসলমান সম্পর্ক বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই

ইলিয়াস : হ্যাঁ, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক বিষয়ে তোমারও বিশেষ আগ্রহ। তুমি জান, অর্ধশিক্ষিত বাঙালি মুসলমানদের ঘরে একধরনের বই থাকে ‘খোয়াবনামা’, চলতি কথায় বলে ‘খাবনামা’। ‘খাবনামা’ মানে সেখানে স্বপ্নের ব্যাখ্যা থাকে। ধরো, লেখা থাকে হাতির স্বপ্ন দেখিলে এই হবে। সে বইগুলো অল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত মুসলমানদের ঘরে খুব থাকে। সেইখান থেকে আমি আমার বইয়ের নামটা নিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল যে, এই বিষয়টা আমি জানি। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখলাম। এই ব্যাপারটা সব জানা নেই। চরিত্রগুলো অনেক সময় বাহাদুর হয়ে ওঠে, তারা অনেক সময়ই লেখকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এজন্য বই লেখার তাগিদে আমাদের বগুড়ার গ্রামে আমার খুব যেতে হয়। আর আমি তো গ্রামেরই লোক। বগুড়ার গ্রামগুলোতে আমি হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের একটা অদ্ভুত জিনিস দেখেছি, নিম্নবর্ণের হিন্দু, নিম্নবিত্তেরও বটে—নিম্নবর্ণ নিম্নবিত্ত কিন্তু অনেক জায়গায় সমার্থক, তাদের সঙ্গে নিম্নবিত্তের মুসলমানের সাংস্কৃতিক পার্থক্য অনেক কম। মধ্যবিত্ত মুসলমানের সঙ্গে মধ্যবিত্ত হিন্দুর যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য, সেই পার্থক্য কিন্তু নিম্নবিত্তের মধ্যে অনেক কম—যেমন ধরো, ঢাকা শহরে আমাদের ছেলেমেয়েদের দুর্গাপূজা সম্বন্ধে ধারণা কম। ওরা বলতে পারবে না, কে দুর্গা, কে পার্বতী, কে সরস্বতী। কিন্তু আমার বাড়িতে যে মেয়েটি কাজ করে, গ্রাম থেকে আসে, সে কিন্তু জানে। এই সর্ব পূজা-পার্বণে গ্রামের নিম্নবিত্তের মানুষের ধর্মনির্বিশেষে অংশগ্রহণ অনেক বেশি। বগুড়ার পোড়াদহে একটি মেলা হয়। সেই মেলার নাম হল সন্ন্যাসীর মেলা। সেই মেলায় একটা সন্ন্যাসীর মূর্তি তৈরি করা হয়। পরে সেটা পুজো করে বিসর্জন দেওয়া হয়। সেখানে সেটা কিন্তু একটা পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠানের রূপ নেয়। মেলা উপলক্ষে বাড়ির লোকদের আত্মীয়-স্বজনদের আনতে হবে, বিশেষ করে মেয়ে-জামাইকে আনতে হবে। তা না হলে সেই মেয়েদের পক্ষে শ্বশুরবাড়িতে থাকা মুশকিল হবে। এই মেয়ে নিয়ে আসছে, এটা কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সবাই। তুমি দেখবে যে হিন্দু-মুসলমানের কিছু কমন পারিবারিক বা সামাজিক উৎসব নেই। ওটা তো তাই, হিন্দু-মুসলমানের কমন উৎসব। এটা খুব আশ্চর্যের ব্যাপার না ? আমি দেখেছি বুড়ো নিম্নবর্ণের হিন্দু গরিব মানুষ আমায় বলেছে, দেখ তো, জামাইবাবাজী জীবনে আমার খোজ নেয় না, কিন্তু মেলার সময় সে ঠিক আসতে শুরু করেছে। এখন তাকে মেলা দেখার সব খরচ দিতে হবে। একই কথা গরিব মুসলমানের কাছেও শুনেছি, মাঘ মাসের শেষ বুধবার মেলাটা হয়। দুর্গাপূজা বা ঈদে ওখানে যে উৎসবটা হয়, তার থেকে অনেক বড় উৎসব হয় এই মেলা। এই জিনিসটা আমি আর কোথাও দেখিনি। বগুড়ায় শেরপুরে তুমি যাওনি, তোমার দিদিমার কাছে শুনো, শেরপুর একটা ঐতিহাসিক জায়গা। মানসিংহ সেখানে পুরীর জগন্নাথের মন্দিরের আদলে একটা মন্দির করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আবার সেই মন্দিরটা ভেঙে ফেলেছে। তবে মন্দিরটার কিছুটা এখনও আছে। শেরপুরের কাছে একটা জায়গা আছে কেল্লাতোষ। সেখানেও এই সন্ন্যাসীর মেলা হয়। আর সেখানেও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে শ্বশুরদের খরচ-খরচার একই অবস্থা দাঁড়ায়। জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরেও একই জিনিস হচ্ছে। এগুলো যে ফকির বিদ্রোহ করেছিল, আমার মনে হয় ওইসময় থেকে এই ব্যাপারগুলোর সূচনা হয়েছিল। আমার মনে হয় সন্ন্যাসীর মধ্যে ভবানী পাঠকও আছেন। হয়তো ভবানী সন্ন্যাসীও হতে পারে। এই জিনিসগুলো কিন্তু লেখকরা এড়িয়ে গেছেন। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ব্যাপারটা দেখতে গেলে অনেক নীচের দিকে যেতে হবে। একেবারে প্রলেতারিয়েত স্তরে; আর আমার মনে হয় caste ব্যাপারটা এইসব ব্যাপারে খুব ক্ষতি করেছে। কারণ বাঙালি নিম্নবর্ণের নিম্নবিত্তের হিন্দু ও মুসলমানরা কিন্তু অনেক ব্যাপারে অনেক কাছাকাছি আছেন। এটা কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্যে তুমি কখনও চিন্তা করতে পারবে না। আরবি-ফারসি সংস্কৃতির যে ব্যাপারটা বলা হয়, সেটা কিন্তু ওপরের স্তরে। নীচের স্তরে সেটা নেই। [সংক্ষেপিত]

সূত্র : নন্দন, জুলাই ১৯৯৬, কলকাতা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close