Home কবিতা আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে > বর্ষার পদাবলী >> এই সময়ের ৩২ জন কবির কবিতা

আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে > বর্ষার পদাবলী >> এই সময়ের ৩২ জন কবির কবিতা

প্রকাশঃ August 3, 2018

আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে > বর্ষার পদাবলী >> এই সময়ের ৩২ জন কবির কবিতা
0
0

আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে >> বর্ষার পদাবলী >> এই সময়ের ৩২ জন কবির কবিতা 

 

মুজিব ইরম >> গোপীভাব

 

কর্তালি হয়েছি শেষে নামের কীর্তনে, তুমি তুমি তুমি নাম তনে আর মনে। বাইচের নৌকা নিয়ে যাবো বহু দূর, আমিও এঁকেছি ভোর উদ্ধত ময়ূর। নয়া জলে নয়া নাও তরতর চলে, যৈবতি বিলের জল তুমি তুমি বলে। তোমার দেহেতে ঢেউ ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে, একাকী ধানের গাছ মধ্যবিলে নড়ে। পাড়ভাঙ্গা নয়া পানি আমাদের মনে, কীর্তনে হয়েছি ফানা রটে জনে জনে।

আফালি বাতাসে গীত পসিল মরমে, কর্তাল নিয়েছি হাতে বেসুরা ইরমে।

 

মাসুদুজ্জামান >> মেষপালকের গান

 

আকাশ বিষণ্ন নদী তরঙ্গিত দিন
নৌকোর নির্জন ছায়া ভস্ম দিয়ে তৈরি
এরকমি এক-একটা মুহূর্ত
এক-একটা বর্ষণের রাত
আমার নিজের ছোট্ট ঘরে কখন যে সে
ঢুকে পড়েছে- আকাশ বিষণ্ন নদী
ফেনায়িত, তপ্ত, জল,
তীব্র ঘূর্ণি আর স্রোতের ভেতর দিয়ে
সেই থেকে আমি ছুটছি…
ছুটতে ছুটতে পেছনে ফেলে এসেছি
মেষপালকের ঝাঁক, গমক্ষেত
আর পুষ্পোদ্যান
নদীর মধ্যেই এখন নদী, তুমুল দিন
পাখি ওড়াউড়ি বিষণ্ন বিধুর
মেঘ থেকে মেঘে নক্ষত্র ছাড়িয়ে
শূন্যে ভাসমান নৌকোর মতোই
দিগভ্রান্ত আমি আর এক-একটা দিন

 

সুধীর দত্ত >> কয়েক পঙক্তি আর্দ্র বিন্যাস

 

গড়াচ্ছে কার্নিশ বেয়ে হু হু করে  জল।/ মাসুদুজ্জামান /
চেয়েছেন কয়েক পঙক্তি আর্দ্র বিন্যাস…/
ভাবতে ভাবতে জানলায় সপসপে ভেজা একটি রোঁয়া-ওঠা কাক /
চঞ্চুটি বাড়িয়ে ধরল, দাও।/
কানা-ভাঙা ব্রিটানিয়া হলুদ চাকতির মতো ছোট একটি গোল /
দত্ত-গিন্নি সস্নেহে উড়িয়ে দিলেন, ওঁ স্বধা।/
গড়াচ্ছে কার্নিশ বেয়ে হু হু করে জল।/
পাথর চুঁইয়ে নামছে জল /
গড়াত যা একদিন আগুনে আর অন্ন ফোটাতেন কবি, /
শব্দগুলি হাঁড়ি থেকে অসম্ভব সাদা/
উড়ে যেত বৃষ্টির ভিতর পুণ্যলোকে। /সামগানে
মুখর পাখিরা।/
আজ সেই বৃষ্টি এল, ডাকছে না মত্ত দাদুরী, তবু /
একটানা এস্রাজে ধূন, অনৈসর্গিক/
আপনিও কি শুনতে পাচ্ছেন?মেঘদল/
এইমাত্র ক্রুজে চড়ল, সমুদ্র সাঁতরে ঠিক পৌঁছে যাবে
ছেঁড়া কিছু অভ্র পঙক্তি নিয়ে।/

 

ফেরদৌস নাহার >> বৃষ্টির সেলফোন

বৃষ্টিরা পিকনিকে গিয়েছিল আটলান্টিক পারে
সেখান থেকে ফিরে চিঠি লেখে সমুদ্রের কাছে
টই টই ঘুরে বেড়ায় টরন্টোর ডাউন টাউনে
আজ বহুদিন হলো তারা চুপচাপ বসে আছে
বাস থেকে নামতেই ভিজে একাকার, টপ টপ জল ঝরছে চুল বেয়ে
মেতেছে বৃষ্টিশব্দ। কে যেন বলছিল, মেয়েরা আজকাল চুপ হয়ে গেছে
ঘর থেকে বের হয় না একেবারে, শুধু মাঝে মাঝে কাকে যেন চিঠি লেখে
তাহলে কী হলো আজ! কাল যদি রোদরং আজ কেন জলরং ছবি
প্রাচীনকালের পথে একা একা হেঁটে বেড়ায় পুরাণের বিশাখা-পার্বতী
গতকাল ছিল রোববার, সেলফোনে জমেছিল ছয়টি ভয়েজ মেসেজ
সারাদিন সেলফোন অফ ছিল বলে অনেকেই মনে মনে খুঁজেছে তাহলে
খুঁজুক- দু’একটি চোখের জল সহসাই মনে পড়লো অন্টারিও লেকে
আর যে দৃষ্টিবাণ পুড়িয়েছে নিমগ্ন সোপান, পোড়ামাটি তাকে ডেকে আনে
এসব পুরানো কথা নিয়ে অনেক ব্যবসা হলো ভাই, এবার ফেরা যাক
বৃষ্টি মেয়েরা কি তবে আরো একবার পিকনিকে যাবে সমুদ্রেরই কাছে
ভিজতে ভিজতে আজ সেলফোন সেকথাই বলছিলো একান্তের কানে
মদ রুটি মাংসের সংগ্রহ ভালোই আছে, বর্ষাটা কাটিয়ে দেয়া যাবে
জানি না শীতের আগে বৃষ্টিরা আর ক’বার ফুলতোলা সোয়েটার বুনবে
এবং সেসব নিয়ে কেন যে বহুদিন কোনো কবিতা খুঁজবে না আমাকে

 

 

শান্তা মারিয়া >> এক বর্ষায় প্রেমের গল্প

 

তেমন নিবিড় শ্রাবণ কখনো আসেনি আগে।পৃথিবীর যাবতীয় কৃষ্ণমেঘ নত হয়ে ঘিরে ধরলো আমাদের। বহু আগে বৈদিক কুয়াশায় হয়তো এমনি আবৃত ছিল সত্যবতী পরাশর। মাটি থেকে উর্ধ্বমুখী বৃষ্টির দেয়াল। হ্যাঁ, জানি এরও চারপাশে রয়েছে ব্যস্ত সড়ক, বাংলাদেশ ব্যাংক, সচিবালয়ের তড়িঘড়ি আমলার নথিপত্র।তবু বৃষ্টির চাদরে নাগরিক দেহ মুড়ে আমরা হেসেছি পিথাকানথ্রোপাসের হাসি। ত্রিশ লক্ষ বছর পরে হঠাৎ এসে উঁকি দেওয়া নিবিড় শ্রাবণে পৃথিবীর প্রেমের গল্প খেলা করে আমাদের ত্বকের গভীরে। তেমন গহীন ভোর, ঝুম বৃষ্টি কখনো আসেনি আগে।কতবার ভীষণ হেলায় ধরেছি বৃষ্টির হাত। সে মৃদু হেসে উপহার দিয়ে গেছে আরো কিছু অঝোর বর্ষণ।তৃষিত স্বর্গ থেকে কতবার ঝরেছে আলোক। কতবার মরূভূমির বাতাসেরা শুনিয়েছে বৃষ্টিহীনতার গান।এক বর্ষায় প্রেমের গল্প শেষ হয় নাকি?সম্পূর্ণ প্রেমের গল্প তোমাকে শোনাবো কোনো মহামেঘ তেমন বর্ষণ উপহার দিতেই পারেনি।

 

কামরুল ইসলাম >> দলছুট জলের খেলা

 

একটি কালো ছাতার নিচে একজন শল্যভাষাবিদ
বৃষ্টির সুনসান ছেড়ে অধস্তন টর্চের আলোয়
একটি বাগানের দিকে এগোচ্ছেন একা-

ব্যাঙ ডাকছে পাশের নালায়, সংগীতের রঙ ধরে
অন্ধকারের বাহাস ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে দূরে

সমূহ উদ্ধারে নেমে আসছে সূর্যের বাড়ন্ত বুক
সেখানে মুখের দিকে মুখ আর অরণ্যের ডাক
সৌভিক শান্ত অনাচারও পতঙ্গপাখায় মিশে গেছে

রাতের এরকম ফাঁদেই তীর্থের সম্ভ্রম, যেন
মেহগনির জায়মান মস্তিষ্কের অবিরাম ছকে
অনাহুত জলের ছন্দের মানচিত্র ধরে, কিছুটা
আড়ালের স্বপ্নের মোড়কে; বন্ধনহীন নৃত্যের

সরল আরশিতে চারপাশে জেগে উঠছে ঘাস
উঠোনের দশ কোণে যেন এক পরিণত মুখস্থ হাত
সাঁঝের অতিথি হয়ে জ্বেলে দেয় আলো-

দলছুট জলের খেলায় ভরে উঠছে তাবৎ আঙিনা

 

জুননু রাইন >> এয়া

 
ক.

শহরে এসে বৃষ্টি ভিজে যায়
পানি যায় চোখের দূর সীমানায়
দূর থেকে দূর হারিয়ে গেছে
এখন আমাদের দুরত্ব ঠিকানাহীন
তুমি পাখি দেখ, ফুল দেখ, দেখ মানুষ
আমিও দেখি-
দেখতে দেখতে দেখাগুলো শেষ করে ফেলি।
খ.

বর্ষার প্রচ্ছন্ন পাড়ায় তোমার মৃত্যুর ছাঁট এসে পড়ে
আমার ভুলে বিস্ময়ের ফুলগুলো শুধু বকুলেই ঝরে।

 

 

তুষারকান্তি রায় >> বর্ষার কবিতা

 
প্রাককথা

উড়োমেঘে এই যে খানিক বৃষ্টি হয়ে গেলো,
এই যে রাখালের মাঠ থেকে
ডেকে উঠলো হারানো বাছুর;
হাঁসেরা পুকুর ছেড়ে শব্দ করতে করতে চলে যাচ্ছে;
হাততালি দিচ্ছে ন্যাংটো বিভোর,
ভেজা ঘাস থেকে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা স্নিগ্ধ,
আমি তাকে অনুরাগ বলে ডাকি –
আমি হাঁটছি, আর
সোঁদা গন্ধে ভরে উঠছে পুরনো সম্পর্ক!

মন-বাদল

ঝাঁকড়া চুলের কমবয়সী মেঘ
মাঠ পেরিয়ে আলতো ডানা মেলে
মাথার উপর আকাশ হয়ে গেলি
নকশা তুলে বাড়ালি উদ্বেগ
সন্ধ্যা হঠাৎ টুপটিপটাপ জল
চমক দমক গায়েতে বিদ্যুৎ
কাছে দূরের গন্ধ ভেজা হাওয়া
মেঘ চরানো জলযাপনের ছল
আচমকা তুই উথালপাথাল নীল
থইথই সুর খেলার বারান্দায়
ঝামুর ঝুমুর নামিয়ে বিরামহীন
দিনরাতদিন লিখিস জলমিছিল
আসলে তুই ঘুমের ভিতর ঘুম
পাখির খেলা খেলতে শেখা মন
তোকে ছোঁয়ার ইচ্ছে নিয়ে বুকে
জানলা খুলে দাঁড়ালো নিঃঝুম
অপেক্ষা

এই তো সন্ধ্যা ঘনালো
হাওয়ায় মেঘের ঢল নেমে এলো মাথার উপর
রাস্তা, রাস্তার মোর সব জড়ো হলো বর্ষার তলায়
কেবল একটা ফুলবাগানের মোড়
ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে রইলো রজনীগন্ধার মতো
খানিক বাদে বাদে রাস্তার লাল সবুজ আলোয়
জ্বলে উঠতে লাগলো তার
অপেক্ষার মুখ …
গৌরমল্লার

বর্ষাকে ডেকে,
বৃষ্টির অনুষ্ঠানে উড়ে যাচ্ছে রাত,
জল পেয়ে জেগে উঠছে বাতিল পাণ্ডুলিপি;
খেলতে খেলতে নেচে বেড়াচ্ছে শব্দের পাহাড়,
হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে ঘুমন্ত জানালা
আঁকড়ে ধরছে পঙক্তি,
তার আঙুলের ছোঁয়ায় ফুটে উঠছে
দেবদারু- ফার- পাইন, বনদেবীর
শঙ্খে লুকোনো নয়নতারা ;
যুযুধান পাতায় লতায় জড়িয়ে যাচ্ছে
রাতপুরুষের মুখ, আর
অস্থায়ী লিখে জড়িয়ে নিচ্ছে মেঘের অন্তরা!
জলদুত

আকাশে মেঘদূত
বাতাসে রিমঝিম
নাগাড়ে ঝরঝর
বর্ষাপূর্তি
ঝরছে প্রিয় গান
কবিতা থইথই
খিড়কি খোলাপাতা
ভরসা ফুর্তি
উড়ছে দিনরাত
চলছে কথকথা

মেঘের মল্লার

গাছের জানলায়
মুছেও মোছে না যে
শ্রাবণ পোড়া চোখ
শব্দ উড়ে বসে
শব্দহীনতায়
পায়ের পাতা জলে
দাঁড়িয়ে বুড়ো বট
একলা চেনা পাখি
বিষাদে নির্জন
স্মৃতির তারে ভেজে
পাগল কাটা ঘুড়ি

মরমী স্বরলিপি
পুরনো গুঞ্জন
শাম-এ-গজল

হা হা করে হাসতে হাসতে খালি হয়ে যাচ্ছে
সপসপে শ্রাবণের মেঘ;
ফিসফিস স্বরে কথা বলছে বেদম বাতাস ,
ঈশানের হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে রাস্তার গাছ …
টপটপ ভিজে যাচ্ছে মিনিবাস স্ট্যান্ড,
চৌমাথা, শের-ই-পঞ্জাব, ঘুপচির পানের দোকান,
ভেঙে গেলো শক্তিগড়ের মেলা,
ভিজে গেলো টিপের পাতা, নেলপালিশ, আয়না,
ন্যাপথলিন, মোবাইলের কভার …
ল্যাম্পপোস্টের ছানিপড়া আলোর নিচে
হেলান দেওয়া
পল্টুদার যৌতুকে পাওয়া সাইকেল
দোকান বন্ধ করেই ফিরে যাবে
কলোনির চালাঘরে।
ক্যারিয়ারে বাজতে থাকবে ‘শাম-এ-গজল’

উন্মুখ

এই যে আমার গদাইলশকরি,
এই যে আমার উলটেপালটে যাওয়া
আবহাওয়ার পূর্বাভাষ, আর
অনভিজ্ঞ ঋতু পরিবর্তনের ধকল সহ্য করে গড়ে ওঠা
অবাকভাষায় হিজিবিজি আঁকা লেখা,
আমার বাড়ির ঠিক-ঠিকানা …
তুই খুঁজে পাবি তো শ্রাবণ!

তুই এলে
অপেক্ষা থেকে বেজে উঠবে অলৌকিক বৃষ্টিপ্রলয়!

 

জাহানারা পারভীন >> বনভূমির গান

 

পথ হারানোর গল্প বলেছি তোমাকে?
কোন অমাবশ্যায় হারিয়ে গেছে একপাটি জুতা
কোন বর্ষায় ছুটে গেছি ছাতার কারখানায়…
শহরে আসার প্রথম দিনেই নেমে গেছি ভুল স্টপেজে…
অন্ধকারে চুলের সিথির মতো পথ ধরে যেতে যেতে
হয়তো কোনওদিন বলা হবে না
সেই বনের নাম, যেখানে গিয়ে আত্মহত্যাপ্রবন মানুষেরা
পথ ভুলে আসা পর্যটকের হাত চিরে লিখে দেয় নিজের নাম
চোখের সামনে থেমে গেছে মূর্ছা যাওয়া লাটিমের দম
মাটি চাপা কুয়োর ওপর দাড়িয়ে শুনেছি
বহুকাল আগে ডুবে যাওয়া বালকের দীর্ঘশ্বাস
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তোমার কাছেই পৌছতে চেয়েছিলাম
ফেলে আসা কানের দুল ফেরত আনব বলে…
অথচ দিলে ভুল ঠিকানা

 

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য >> ঝিমিঝিম ডাকঘর

 

আমার ছড়িয়ে থাকা রাত, সপ্তবদ্ধ গানের করতাল বৃষ্টি, বৃষ্টির ক্যানভাসে আঁকা ঝড়ের বিদায় শব্দ—সূর্যের উত্তরে অন্ধকার। অন্ধকারে জেগে ওঠা স্তব্ধতার ঘোর। এইসব আমাকে দিয়েছে চরাচর। বর্ষাস্নাত তারাদের ক্ষয় দেখেছি। তার হাত চক্রমনে ক্রমশ নিহত মৃত্যু। সেই মৃত্যু অভিলাষ করি। বুকখোলা জেগে থাকে আমার রাত। জেগে থাকে আমার ছড়িয়ে থাকা রাত। জেগে থাকে রাতের নিঃস্ব খড়খড়ি।

কোনোদিন ভীষণ রাতে বৃষ্টি হবে। আকাশের তারাগুলি বৃষ্টিতে ভিজে হবে আমার চোখের মতন সহজ। তুমি কি সেদিন আকাশ দেখতে আসবে? যে চিঠি লিখেছিলে ইথারের ডাকঘরে সেই চিঠি আজো মহাশূন্য ঝুলে আছে—দীর্ঘশ্বাসের পাহাড়। একটা ঝুলন্ত পাহাড়ে ছিলো উদ্যান। উদ্যানের সব উইপিং-উইলোর পাতায় লেখা ছিলো তোমার চিঠি, ছিলো বা শিকিপাখায়। দুঃখি ময়ুর কোনোদিন ভুলে গেলে প্রিয় নাচ, পালক ছড়িয়ে রাখে চিঠির খাতা। কখনো তোমার চিঠি পড়েছিলাম চালতার পাতায় লেখা। তোমার চোখ বৃষ্টি হয়ে নেমেছিলো পাতার শিরায়। তোমাকে পড়তে গিয়ে হলাম বৃষ্টির পাঠক। আর সে বৃষ্টির মধ্যে কাঁপে অচিন বাতাস। ইদানীং চালতার বন ঝিমিঝিম ডাকঘর। প্রিয়তম হাওয়া, তুমি হও এইখানে অবিনাশি ঝড়।

যদি আমি মরে যাই কোনোদিন বৃষ্টির ভিতর, আমার চোখ দুটি যদি হয়ে যায় বৃষ্টির বকুল—শাদাটে সন্ধ্যায় তুমি গন্ধ নিও কাদার পাশে। তারপর উড়ে যেও তোমাদের দেশের মাঠে। মাঠের খরায় বুনে দিও আমার কান্নার ঘ্রাণ। ঘ্রাণের টানে আসবে নদী, বিস্মৃতির নদী।

মেঘ ভাসলে মাঠের চোখে ছায়া পড়ে। ঝরাপাতার শব্দ হয় ঝাঁপতাল, বিকেল আর সন্ধ্যাকে করে মোহময়। কোনোদিন প্রিয়তম করতল ভুলিয়ে দেয় একটি মদের বোতল। তারপর মদ ফিরে আসে। মদ সেতো কুকুরের মতো, পায়ে পায়ে ঘুরে; বিশ্বাস রাখে। মদের গ্লাস প্রতিদিনই মাতাল হয়ে কাঁদে। আর আমি রোদনহীন। কান্নাগুলি জানিয়ে দেয় যাপনের মানে।

এইটুকু বৃষ্টি লিখে ক্লান্ত হয়েছি, এইটুকু গন্ধ ছুঁয়ে কুসুম। পুষ্পের মৃত্যুতে কেঁদেছে ফুলারণ্য, তুমি অন্যঘরে। বসত অদূরে ঝিলমিল। পল্লবিত ডালে পাতারা অস্থির। আমি এইটুকু বৃষ্টি লিখেই ক্লান্ত হয়েছি। এই ক্লান্তি নিয়ে তোমাকে কতোখানি ছোঁয়া যায়?

আকাশ ভরে শাদা মেঘ চরে। তারপরও বৃষ্টি আসে সকালে। কাজে যাই। দিনটা বড় দীর্ঘ হয়ে যায়। দিনভর বৃষ্টি হলে একটা কাক আর ভিজতে পারে না—চুল খুলে টাঙিয়ে রাখে উনুনের ধারে। উনুন একটা বৃষ্টিদগ্ধ সূর্যমুখী। তোমার সঙ্গে দেখা হয়। একটি পাতা ফিরিয়ে দিই। পাতাটা কে দিলো কবে! ঝড় দিয়েছিলো বুঝি কোনোদিন ছিন্ন বৈভবে। এই গ্রামে থাকি শহরশেষে, এই শহরে থাকি গ্রাম শেষে। ওগো দিন, তুমি সন্ধ্যার পর আমাকে নামিয়ে দিও অজানিত পথের ধারে।

 

অপরাহ্ণ সুসমিতো >> বর্ষাবই

 

তোমার দই চুমুকে আমি মুখ ডুবিয়ে দিই আর তুমি হৈ হৈ করে ওঠো …
রেগে যাও কপট আমি দুধু ছানা হই তোমার প্রশ্রয় চামচে
নান রুটি ছিঁড়ে আলু ভাজি করে করে মুখে তুলে দিই,তুমি আঙ্গুল চেটে দাও আমার
হাবলুটাবলু হয়ে তোমার তলপেটে নাক ঘষি বাইরে আচানক চেরাপুঞ্জি নামে থৈ থৈ।

একটা দোলন দাও তোমার কাঁচা হলুদ শরীরে ,আলনা থেকে লুকিয়ে ফেলো ফুল তোলা পেটিকোট,
লজ্জা পাও ব্লাউজটাও সরাও। আমি বলি তুমি কী ৩৪?
তুমি ধুমধুম কিল দাও আমার পিঠের চাতালে
ও মনা আজ বয়াম ভর্তি জলপাই আচার রৈ রৈ।

টিভিতে সুচিত্রা সেন এলোকেশী শাড়ি …
ঘন বনের পাশে মোটর বাইকে করে চুল খোলা উত্তম কুমার
পৃথিবীটা যদি স্বপ্নের দেশ হতো বলে গান গায়
নিচের সড়কে ঝাঁকা মাথা করে চলে যায় এক জোনাকী দূর ফেরিঅলা
তোমার চুল নিই নাকে মুখে উছিলা কী মাখো ..ওলো ওলো আজ বৃষ্টি খৈ খৈ।
টেবিলে পড়ে থাকে তোমার ঠোঁট ছোঁয়া চা কাপ,তলানীতে সিলেট চা
তুমি উঠে গেলে এক চুমুকে খেয়ে ফেলি তোমার উষ্ণীষ সেই মধু চা
রান্না ঘরে তোমার টুংটাং দুপুরের অবিরাম বৃষ্টিণূহ এলুমিনিয়াম বাসন,
ফ্রিজ থেকে কাঁঠালের বিচি আজ বুঝি কেবল ভর্তা হবে?
অসভ্য,দাঁড়াও না আজ তোমাকে কসম ভর্তা করবো ভাত ঘুমে
এই শোনো এই শোনো আজ আমরা স্পেড ট্রাম পই পই।
বর্ষা নেমে যাবে বর্ষাতি ছাড়া আমাদের বন পদাবলী
তুমি গা ঘেষে শুয়ে ডাকবে চিত্রল হরিণ ডলফিনের ছবি দেখতে দেখতে
আমি তোমার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে কামড় দিব …
বলবে আহ কী মরণ দাপিদাপি হোক,প্রতিবেশী জানুক গাঢ় প্রণয়
ওলো যাপন ওলো এক জীবন ওলো মূর্ছনা ওলো ওলো
সারাদিন আজ মনের শরীর,জুঁই জোনাকি দাপাদাপি ইয়োগা
এসো সেই সূত্র পড়ি আজ কেবল সেই বর্ষাবই।

 

নুসরাত নুসিন >> গ্রামকীর্তন

 

কোনো বর্ণনায় নেই। বর্ষায় নেই। দোলনার ঋণ।
আচারের মতো তোলা থাক এটুকু সঞ্চয়।
আমাদের যূধবদ্ধ দিন একাকি মরেছে।
তাই গোলাঘর নাই।
পরিভ্রমণের কালে যেটুকু অগস্ত্যযাত্রা— তার ছেদচিহ্ন আঁকি।
গোপন পৃষ্ঠা খুললে এ কেবল নাগরদোলা—ছায়া ও ছাতিমের ঋণ।
বন্দি শিহরণ থেকে যেটুকু জেগেছে যাত্রা
দূরে যেতে যেতে ফিরে এসে
আলনায় মজেছে।

 

 

সারাজাত সৌম >> ইল্যুশন

 

পাতাটিকে নৌকা ভাবি—
আরও কোটি কোটি নৌকা
—এই বৃষ্টির দিনে
কম্পমান, ঝরে পড়ে হাওয়ায়
জলে ও জঙ্গলে
হলুদ কিংবা সবুজ—
শরীর ভরা আলো, কেউ কেউ খসে যায়
উড়ে যায় কোনো কোনো পাখির থেকে দূরে
—ছোট্ট সোনার মাছি
যেন তার সমস্ত চোখের দেখাই ভুল
তবুও তো যে কোনো পাতার পিঠে
লিখে রাখা যায় আমাদের স্কুল
এমন বৃষ্টির দিনে
তুমি নৌকা ভাসাও
এমন বৃষ্টির দিনে
তুমি অন্য কোথাও
এককেটা হীরার হরিণ থেকে ভেসে আসা সুর
আমাদের ইঞ্জিনে এসে পুড়ে যায়
পুড়ে যায় আমার সমস্ত দিনের কোকিল।

 

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়  >> বর্ষার পদাবলী

খরায় পুড়ে যায় মানচিত্র
তবুও বৃষ্টির গন্ধে কখনও কখনও
পোয়াতী নদীর জলে শস্যস্বপ্ন …
এক টুকরো মেঘ
তার দিকে চেয়ে থাকা তৃষাতুর
কলমকাটি আকাঙ্ক্ষার গান
বাঁশের ছাতাটি নিয়ে বটতলে গাঁগুটা রাখাল
কদমফুলের ঘ্রাণে বেঁজে ওঠে বাঁশি
নিম্নচাপ তুমিই তো শ্রীরাধিকা
কলসী কাঁখে নিয়ে এলে আমাদের বর্ষাকাল
আমাদের ভরন্ত পুকুর।

 

পিয়াস মজিদ >> মেঘভূমি                         

 

বর্ষা খুলে খুলে আমাকে তার
বিভা দেখায়,
দেখি-
অভিরূপ মল্লারের দল
সুরে আর জলে
উপগত আনন্দে-শীর্ষসুখে
আকার পায় সব নিহিত রোদন।
একলা বাগান, কুসুমশোভা
ভূমিকম্প শেষ হয়
অশেষ শুধু হৃদ-কদমের কম্প;
এই আমি
মাহ ভাদরের শূন্য মন্দিরে
বিরহে ঘেমে-নেয়ে পূর্ণতা পাই।
বৃষ্টিকান্তা মেয়ে
ঊষর আকাশ-প্রেমে
উড়ে যায় ঝাঁকে ঝাঁকে;
মেঘলা রুমাল।

 

আশরাফ জুয়েল >> আশ্চর্য ফুটতে থাকো তুমি

 

মেঘেদের ইশারায় আশ্চর্য ফুটতে থাকো তুমি; অথচ, বৃষ্টি অধ্যুষিত সন্ধ্যার খুরে এখনও বাজছে মখমল ঘোড়া। মাপজোখ শেষে পৃথিবী গড়িয়ে পড়ছে তোমার খাঁজকাটা চুলের সিঁড়ি বেয়ে, অবৈধ জনশ্রুতির দৃশ্যপটে। অগ্রাহ্য বর্ষায় ঘৃণা আর ভালোবাসার সরাইখানাতে এখনও উৎকীর্ণ রয়েছে চুমুর অতিথি, ভুলের স্মারক এবং সমকালের ডিঙি।

লগ্ন সর্বস্ব ঘড়ির দিকে সহসা বেঁকে যায় তোমার সাঁড়াশি নগ্নতা, আলোক-সংশ্লেষের ভিন্নতা মুছে ফেলে নেমে আসে ঝিম ঝিম স্পর্শ, আর, আঙুল হারিয়ে যায় ধাতব তারল্যে, বরফের অরণ্য, যেখানে ঘনীভূত আগুনই মুখ্য।

নির্বিঘ্নে খুলে রেখে এসো যৌবন; কাম পরিহার করে বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করা শিখে গেছে আমাদের জেদি ইন্দ্রিয়।

শুধু দৃষ্টির চাবুক ভরে নিয়ে এসো জমাট পানীয়, খেয়ালের সরঞ্জাম, গ্রীবার আশ্রয়, আকাশের সম্ভাবনা।   ঢের আষাঢ়ের সান্ধ্য-শরীরে ঘোষিত ফুসফুস ওড়াবো। দেখো, গোধূলির সব বায়ু খরচ হয়ে যাবে সেদিন।

 

অনুপমা অপরাজিতা >> বৃষ্টি সমীপেষু

 

যোজন যোজন জুড়ে পড়ে আছে অমনিশা
শীর্ণ হাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পরান খোঁজে
অলিগলি নদী বালুচরে জলৌকা
আর নিঃঝুম নৌকো
কিছুটা আরাম খুঁজে নেয়
শুদ্ধ বৃষ্টিজল।
দগ্ধ ক্ষতে লুব্ধ তারা লবন ছিটায়
মেঘের আড়ালে অমিতাভ নীল ঘাতক
এই বরষায়
শেষ ভরসা তোমাকেই
কদম্বের ঘ্রাণে মেতে ওঠে শালিকের দেশ
শরতের বাতাসে কাশের গুচ্ছ
মুখরিত মন্দিরের দ্বরে আর পথে পথে
সন্ধ্যামালতি জবাফুল পাতা গাঁ ও অন্যেরা
বৃষ্টিনুপুরে নেচে ওঠে সমীপেষু
ওঁ সাহা ওঁ হৃদয়

 

নাহিদ ধ্রুব >> অলীক

যদিও বৃষ্টি থেমে গেছে খুব ভোরে
তবু সারাদিন মুখ করে আছে কালো
সারারাত ধরে ঝরে গেছে সব পাতা
তোমায় ভেবে ভেবে বিদ্যুৎ চমকালো
পত্রিকা হাতে খুঁজতেছি শিরোনাম
সকাল বেলায় পরোটা ডুবছে চা’য়ে
একা শালিক নিয়ে এলো সংবাদ —
ট্রেনলাইন ধরে হেঁটে গেছি খুব ভোরে
একা একা আমি চলে গেছি বহুদূর —
ছাতা হাতে মেঘ ডাকছিলো নাকিসুরে
ভেবেছি আকাশ ভাঙবে আমার মতো
যেভাবে তুমি হারায়েছো বুড়ো ঝড়ে
ভয়ে ভয়ে আমি পালায়েছি মন ছেড়ে
ঝড় এসে যদি ফের ভাঙে ডালপালা
বৃষ্টির দিনে তোমার, আমার স্মৃতি —
মুছে গেছে আজ, নাই কোন ঠিকানা!

 

রোজেন হাসান >> সমুদ্রের স্মৃতি

সেইত সমুদ্র এই চূড়ার সবথেকে উঁচুতে
যার মৃত্যু শূন্য-নকশাতে পুড়ছে, শাদা অববাহিকার
ত্রিশূল আর হরিৎ, মিশছে স্বশূন্যে

ওই একা দীর্ঘতার নীচে জলদেবীর ঐর্শ্বয
বিলীয়মান, আর  তুমি শাদা পাথরের স্মৃতিতে
প্রশ্ন করো শবদেহ
সেইত সমুদ্র
সব বর্ণ-জলের পতঙ্গ।

আর জল আর জল স্রোতঋণ
তোমার হৃদয় থেকে উঠে আসে বৃষ্টির পাহাড়।

 

 

তিথি আফরোজ >> মনের ভেতর চুমু

 

তুমুল জ্যোৎস্না কাঁঠাল গাছের পাতায়
নগ্ন জানালায় চোখ খোলা-
মোড়ক খুলে লম্ফ দেয়া সোনাব্যাঙ
জীবনের সিন্দুক ঢেলেছে সবুজ পথে
অতপর তুমুল জ্যোৎস্না গড়িয়ে
খইফোটা বর্ষায় আঁচল ভিজিয়ে
ওম দেয় মনে, বনে ও পরানে।
কদম এর ডগায় সুরেলা বর্ষণে শিহরণ
শিরশিরিয়ে গড়ে তোলে অতল সমুদ্র
সমুদ্র দেখেছে বৃষ্টির বলয়
আর বৃষ্টি তাহাদের অতল;
এতসব অতলে সুরে নির্বাক।
শালিক গান গায়
জোড়া ভাঙে বা গড়ে ফুটন্ত বৃষ্টিতে
স্নান করে, অশুভ হয়ে।
তারা বসন্তে হোক আর বর্ষায় হোক
কোকিলের কুহুতান শোনে মনে সর্বদা
আর ঘুন্টি বাজায় চুমুর চপচপ শব্দে।
উড়ে আসে চুমু যোজন দূরত্বে
বাহিরে বৃষ্টি নাচে
মনের ভেতর চুমু
সুর বান্ধে
অতন্দ্র সুর

 

মোস্তফা হামেদী >> স্যাডিস্ট গাছ

 

লেবুর বাগানে জমজমিয়ে বৃষ্টি নামলো
বেদনানাশক এ বৃষ্টি
বাজারের ব্যাগ চুইয়ে পড়ছে
ফোঁটা ফোঁটা
আনাজ কলার গা থেকে
লাবণ্য ঝিলকায়
পাতাদের সম্মিলিত আওয়াজ
ঘন হয়ে এলো
কান পেতে শুনবার কথা
পানি নেমে যাওয়ার ধ্বনি
মাটির ফুটানি ভেঙে
সে ক্রমাগত
গোল পাকিয়ে চলেছে
ঘুরে ঘুরে নাচছে
স্যাডিস্ট কোনো গাছ
বৃষ্টি শুনছে, বৃষ্টি শুনছে

 

ফারহানা রহমান  >> বর্ষায় বাজে বেদনার সুর  

এখনো বর্ষা আসেনি
তবু ভিজছে দু চোখ অবিরত
এতো যে প্রখর তাপ
তাতে কি তপস্যা হবে?
জীবন স্পর্শ চায় জলের
তবে বর্ষার অবিরাম কোলাহলে
কেন এত দীর্ণ হাহাকার শুনি?
এক বর্ষা শেষে অন্য বর্ষার যে পথচলা
অস্ফুট পিপাসা ভেসে থাকে সেখানেও,
যে একাকী রথ হারিয়েছে পথ উইলো বনের ধারে
কৃষ্ণপক্ষের মায়াবী জ্যোৎস্না সেখানেও ঝরে
শেষ রৌদ্রদিনে বাবলা গাছের সিথানে মেশে যে আকাশ
সেখানেই বর্তুল পৃথুলা ওড়ে নীল শাড়ি পরে।
পুরোপুরি কখনোই নয়
বরং অংশত তুমি আর আমি আসি কাছাকাছি
বড় বেদনার সুরে
তাই প্রতিটি বৃষ্টির পর বিচ্ছিন্ন হই
আমি আর আমার হৃদয় বারেবারে…।

 

ইয়ার ইগনিয়াস >> অদম্য আষাঢ়

 

স্নিগ্ধ হাওয়ায় বাজে পাতার পিয়ানো।মিকাঈলের বিপরীতে পাল বেঁধে উড়ে কৃষ্ণমেঘ। উড়ন্ত মেঘের শার্সিতে সূর্যসত্ত্বা মুছে গেলে, অসম্ভব অস্থৈর্যে কাঁদে আকাশ। বেহুলার ভানে ভেজায় মৃণ্ময়-মাদুর। উর্বশীর কামার্ত বুকের ঢেউ নিয়ে জেগে ওঠে মুমূর্ষু নদী। স্মৃতিঘরে যুগপৎ জাগে বৃশ্চিকা বৃষ্টি। চোখ তার চিরসুপ্ত নদী, বিরহে বেজে ওঠে তুমুল। অনবদ্য আষাঢ়ে ভেসে যায় অতীত পৃথিবী আমার। কদম্বের দম্ভে

দাঁড়িয়ে ঠায়, ভিজে যাই, সর্বস্ব ভাসাতে

 

ভাবি-  অদম্য আষাঢ় কতটাই বা ভেজাতে পারে, যতোটা ভিজি চোখের জলে!

 

 

সায়মা হাবীব >> পাতন

 

ভাঙছে কে— তার স্বরধ্বনি দেখছি, যে দৃষ্টি
টাপুরটুপুর পড়ে, পাপড়ি-খসার চাইতে চতুর গন্ধের
টঙ্কার তাকে টাঙিয়ে দেয় দৃশ্যময়— এহেন
অবিমিশ্রতা যদি ছেঁকে তুলতে না পারি, যদি
ছাইয়ের রক্তে কয়েক ফোঁটা মেদুর ছায়া
না পড়ে, তায় ওরা আবার নিজেদেরও পোষ্য হয়,
তবে এসব আমি বলছি না তো, বলছে যে-দিন
নিঃস্ব হয়

 

চাণক্য বাড়ৈ >> সমুদ্র-শুভেচ্ছা

 

পঞ্জিকার মুদ্রিত হরফ থেকে নেমে এসো বর্ষাকাল- জলজ পালক ঘষে মুছে ফেলি রৌদ্রকাতর দিনের পাণ্ডুলিপি- বেজে উঠুক হাওয়া-বাঁশি, জলঘুঙুর। পড়ে থাক সোনালি চিরকূট- সম্পাদিত মুহূর্তগুলো।

মেঘবালিকার ভেজা চুল থেকে চুইয়ে পড়ো তুমুল শ্রাবণ। ওয়েবের পরাবাস্তব জানালায় উঁকি দিয়ে দেখি একটি বিষণ্ন বিকেলের মৃত্যু কতটা মনোরম। আর কতটা স্নিগ্ধ তার লাশবাহী মেঘের ভেজা কফিন থেকে ঝরে পড়া বিস্রস্ত তরল।

আন্দামান নিকোবরের প্রতিবেশিনী, নীলমেঘপরি- বাতাসের টমটম থেকে নেমে এসো আমার উঠোনে- মেঘমল্লারে নির্ভুল নেচে নেচে স্নেহার্দ্র হাতে ছড়িয়ে দাও সমুদ্রদেবীর পাঠানো উপহার… বৃষ্টি-

 

সেঁজুতি বড়ুয়া >> এমন বৃষ্টিতে, কাছে যেতে নেই 

 

দরজা খুললাম। জানালা খুললাম। আকাশে মাটির সোঁদা গন্ধ
আকাশে প্রকৃতি বৃষ্টিস্নাত। মেঘ মল্লার গান গাইছে।
যত দূর চোখ উড়ে যায়, ভিজে যায় মন পশলায়
সুর হেঁটে যায় টুপটাপটুপ। সুর ভিজে যায় মেঘতন্দ্রায়
তুমি স্নান করো, সে নেচে ওঠে, ও গেয়ে ওঠে টলমল মেঘে
জলাশয়গুলো বর্ষার গানে এদিক-ওদিক উপচে পড়ছে…
মাঝ নদী থেকে জেলে ফিরছে। ক্লান্ত শরীরে টুপটাপটুপ
মেঘ ঝরছে নদী উপচে, বর্ষার মাস ময়ুর নাচছে
নদী হাসছে উদ্যাম স্রোতে, উত্তাল ঢেউ হানছে
স্নিগ্ধ বরষা ভিজে একসার। ভরা যৌবন বনজঙ্গলে
হে শ্যামল রূপ, হে সজল ঘাস- ওখানে কেমন বৃষ্টি হচ্ছে?
সে শুধু হাসছে, মাথা নাড়ছে : আসো স্নান করি মৈনটঘাটে!
মৈনটঘাট জলে থৈ থৈ। আকাশে কালো মেঘ আর মেঘ
খোশগল্পের অবিরাম ধারা, আনমনে শুধু গান বাজছে
মেঘতন্দ্রায় সুর ভিজে যায়। সুর হেঁটে যায় টুপটাপটুপ
নানা চেহারার মেঘ ছুটছে, টইটুম্বুর নিংড়ানো মেঘ
লাল আভাময় চকচকে মেঘে বিপন্ন মন পেখম মেলে
মৈনটঘাটে বিরহ বাদল কারো পাতা জালে পা রাখছে
গুরুগর্জন মেঘবর্ষণে মন দুলছে, সাঁতার কাটছে
ল্যান্ডস্কেপে প্রকৃতির নেশা জড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে
নদী জলরঙ, অ্যাক্রিলিক মেঘ- বর্ষার যোগসূত্র
মাটি ভেদ করে কচি চারা জাগে। স্বপ্ন, বীজ বুনছে
এমন বৃষ্টি – চোখ ভিজে যায়, গল্পটা কাল শুনবো
জানালা বন্ধ, দরজা বন্ধ।তখনো ঝরছে টুপটাপটুপ…

 

গিরীশ গৈরিক >> বৃষ্টি বনাম অশ্রু

 

ভাতের থালায় বর্ষার নদী থৈ থৈ করে
এ যেন আমার মতো ক্ষয়ে যাওয়া প্রায়-মানুষের চোখের জল।
সেই জলে ভেসে যাচ্ছে আপনজনের মৃতদেহ–
কোনো মৃতদেহের পাশে বেহুলা নেই–একা লখিন্দর–একাকী নির্জন কবি।
এভাবে এক এক করে মা বাবা ভাই বোনের মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখলাম
হঠাৎ দেখি আমারই মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে উবু হয়ে।
টুপ করে আমার মৃতদেহ থালা থেকে সরাতেই ঘটল–অবাক কাণ্ড
একি! থালা ভর্তি ভাতের পাহাড়–ভাতগুলো পাথরের তৈরি।
আমার মায়ের ভাতারের ভাত দেবার কোনো যোগ্যতা ছিলো না–
তাই মায়ের চোখের জল ভাতের থালায় জমে জমে থৈ থৈ নদী।
নদীর পাড়েই শ্মশানঘাট–এই ঘাটে প্রতিদিন ভেসে আসে–
ঈশ্বর আল্লাহ যিশু ও বুদ্ধের মৃতদেহ।
সেই প্রতিটি মৃতদেহে মানুষের রক্ত দিয়ে কেন যে লেখা থাকে—
‘হে মানবজাতি তোমরা আমাকে ক্ষমা করো
তোমাদের পরস্পরের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করার জন্য।’

 

পরিতোষ হালদার >> কফিহাউস

 

কফিহাউস থেকে পালাতে গিয়ে যখন ধরা পরে যাই, তখন বন্ধুদের কেঊ কেউ আমাকে শ্রাবণমাস বলে ডাকে। আমিও চিৎকার করি-দেখ, তোদের কবিতায়ও আছে অজস্র নদীর শব্দ।
তোরাও শিশির ভেজা গঙ্গাফড়িং।
একবার বৃষ্টি আমার প্রেমিক ছিল। শহরের রাস্তায় ভিজতে ভিজতে কতবার বলেছি- বৃষ্টি তোমার জন্মদিন কবে?
সে কখনও তারিখ বলেনি, শুধু নামতার মতো মুখস্ত করিয়েছে-

টাপুরটুপুর….
টাপুরটুপুর….

তোমার কাছে যাইনি বলে কোন সোমবার যদি অভিমান করে. যদি বেহালার তার নিজেদের টান বদল করে নেয়;
তুমি মোমবাতি নিভাতে নিভাতে আরও একবার বলো-
জন্মের আগে আমরাও আগুন ছিলাম।

 

ইমেল নাঈম >> বৃষ্টি মুখর বিভব

 

ভালোবাসা ঝরছে, তারও আগে ঝরেছে গোলাপ
এলায়িত, অলস মানুষগুলো অনধিকার চর্চায় ব্যস্ত…
শুধু লাল নীল রঙে রাঙিয়ে নিচ্ছে নিজেকে,
প্রত্যেকে যেন সার্কাস দলের ক্লাউন কিংবা জোকার
হাসিমুখে যে যেভাবে পারছে ছুঁড়ছে অঙ্গভঙ্গি,
তুমুল বৃষ্টিতে কারা ঠোঁটে আঁকছে সাহসী চুমু?
তা নিয়ে হুল্লোড় বাঁধলো সামাজিক মাধ্যমে
কতটা প্রেম, কতটা সাহস— তা নিয়ে ভাবল না কেউ,
সবাই কানাঘুষো করতে লাগল উচ্ছন্নে যাওয়ার
নিজের অপ্রাপ্তি, অক্ষমতাগুলোকে ঢাললো ক্রোধে
আমিও প্রেমিক ছিলাম, বৃষ্টিতে হুড খোলা রিকশায়
ভিজতে ভিজতে দুজনে চলে যেতাম এধারওধার
বৃষ্টিতে একবারও চুমু আঁকতে পারিনি ওই ঠোঁটে।
কিছু চুম্বন তুমি লিখে রেখেছিলে আমার গায়ে
তার সমান্তরালে এঁকে নিয়েছিলাম গুহা চিত্র…
দেখো, তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা সেই চুমুটার দিকে
অনুভব করো বয়স কমে যাচ্ছে তোমার,
ইচ্ছে হচ্ছে টাইম মেশিনে চড়ে চলে যাই
বছর সাতেক আগে; অথচ, বদলে গেছে সময়
শুকিয়ে যাচ্ছে ঠোঁট, গলার শব্দরা অস্পষ্ট হচ্ছে।
জানি না, অপ্রাপ্তিগুলোকে কেন রোমন্থন করছি?
সম্পর্কের মাঝে চুমু একটা অমোচনীয় সীলমোহর,
যা লেগে থাকে আজীবন, সম্পর্কের শেষেও
গায়ের মাঝে মিশে যায়, কিছুতেই মোছা যায় না
দুজনেই বিপরীত মেরুতে বসে অনুভব করছি,
কিন্তু কাছে আসতে পারছি না, বলতে পারছি না
সবটা কালো নিয়েই শেষ হয়ে গেছে আমাদের
কাছে আসতে পারছি না, শুরু তো দূর… বহুদূর…
ঝরছে তুমুল বৃষ্টি ভিতরে, বাইরে, সবখানে।

 

সাঈদা মিমি >> আমি খেলি

আমি খেলি, খেলি শূন্যতর বোধের সাথে অনিশ্চিত
যাপনের খেলা- দেখি, ভাতঘুমে জারিত পুরুষ
নিষিদ্ধ স্বপ্নে তার মুখ ভরে ওঠে লোভাতুর হাসিতে

বলি, এরকম বেঁচে থাকা অর্থহীন তবু রমণের
দিনগাঁথা মনে পড়ে গেলে আরও কিছুদিন
আয়ু পেতে সাধ জাগে!

ভিজি, শ্রাবণের মেঘকাতর রাত্রিনির্জনে,
সুখ কিনি, বেঁচে থাকা-
প্রাচুর্যে ভরে ওঠে স্বপ্নখেলা রঙচঙে দিন।

ভাবি, প্রসারিত চাওয়া যত পিষ্ট হলো-
বিবিধ বাজারে বসে নিলামের
হাট, অর্থভোজি শকুনেরা থাবা ছুঁড়ে দ্যায়।

 

অশোক কর >> রাতভর বৃষ্টি

 

নিয়ম না মানা চিরকালের স্বভাব সম্পর্কের-,
অনুশাষণের ছুরি অন্তরাত্মা কেটে রক্তাক্ত করুক
কি আসে যায় তাতে?
চিরাচরিত সম্পর্ক ধুলো হয়ে জমে থাকে অভিধানে;
ঝাউপাতা শোন, দুরন্ত বাতাস
তোমার উষ্ণতাকে ছুঁয়ে থিতু হতে চায়,
তারও আছে সম্পর্কের অবিরাম বোঝাপড়া,
নি:সঙ্গ রাত্রি তাকে ঘিরে নাচে-,
রাতভর বৃষ্টি ওকে ডাকে-,অবারিত খোলা চারপাশ,
তবু ঝাউপাতার মায়া ওকে খুব টানে! খুব টানে!
রাতভর বৃষ্টিই এঁকে দেয় নতুন সংজ্ঞা সম্পর্কের!

 

রিকি দাস >> অধরাউন্মাদ বৃষ্টি

 

বিস্ময় সে দৃষ্টি, এপাশ-ওপাশ যার মাঁড়িয়ে যায় দূর সরিষার ক্ষেত; হলদে রঙে বিরল অনুভুতি নিয়ে জন্মেছিল যে শব্দমালা। ডোরাকাটা পর্দার হৃদয় ফুঁড়ে, কথায় কথায় হারিয়ে যায় মেঘের রাজযোটক হয়ে গড়ে ওঠা বধ্যভূমি। বিস্ময় সে দৃষ্টি; আজ ভুলে যাচ্ছি গত শ্রাবণে তোমার সৌন্দর্য্য, নীলের স্বর্ণখনি, ছোটবেলার ফ্রক! অনন্ত লতাগুল্মের মাঝে সাজানো চক্র; কখনো অধরা ঝরাপাতা, কখনো গভীর থেকে গভীরে উন্মাদ-বৃষ্টি….

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close