Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ আঞ্জুমানআরা আনছারী / মনোজগতের বিউপনিবেশীকরণ এবং অমিয়ভূষণ মজুমদারের মধু সাধুখাঁ

আঞ্জুমানআরা আনছারী / মনোজগতের বিউপনিবেশীকরণ এবং অমিয়ভূষণ মজুমদারের মধু সাধুখাঁ

প্রকাশঃ February 22, 2017

আঞ্জুমানআরা আনছারী / মনোজগতের বিউপনিবেশীকরণ এবং অমিয়ভূষণ মজুমদারের মধু সাধুখাঁ
0
0

উপনিবেশবাদ ও উপন্যাস

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আবহে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আত্মবিস্মৃতির সন্ধিলগ্নে উপন্যাস নামক সাহিত্য প্রকরণের আর্বিভাব। এইসময় বাংলার লোকায়ত মনন, কথকতার কালবাহিত পরম্পরা, বিষয় ও প্রকরণের দেশজ স্মৃতি সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে ঔপনিবেশিক মহাসন্দর্ভ পাশ্চাত্য রীতিকে একমাত্র বরণীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে উপন্যাসের এমন একটা ধরন ক্রমশ বুদ্ধিজীবী শ্রেণির দ্বারা গৃহীত ও পরিপুষ্ট হয়েছিল, যা কাহিনি বিবরণের দেশীয় ধরনকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে ভিন্ন এক ধারা। এ নিয়ে যে গভীর কোনো প্রশ্ন তোলা সম্ভব, প্রথমদিকে আমাদের উপনিবেশী মননে সেই চিন্তার ছায়া পর্যন্ত পড়েনি। পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললেও ঔপনিবেশিক শক্তি তাদেরকে নির্মমভাবে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে। তবে প্রতিবাদের ভাষা থেমে থাকেনি। ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও রুচির প্রভাবে উপন্যাসের যে ধারা গড়ে উঠেছিল তার বিপরীতে ভিন্ন একটি ধারাও চলেছে। বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত যে সাহিত্য রচিত হয়েছে তার প্রায় অধিকাংশ রচনাতেই বি-উপনিবেশায়ন কিংবা উত্তর-উপনিবেশবাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের রচনা থেকে শুরু করে বর্তমান লেখকদের রচনার সবটাই এর অন্তর্ভুক্ত। ঔপনিবেশিক প্রভাবে আমাদের উপন্যাস যেমন প্রভাবিত হয়েছে, তেমনি প্রভাব-মুক্তির চেষ্টাও কম হয়নি। উপনিবেশ স্থাপনকারী শক্তি তার নিজের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে যতই চাপিয়ে দিক না কেন, তা শেষপর্যন্ত দেশজ সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি মিশে যেতে পারে না। বিপরীতমুখী একটা অন্তঃস্রোত সবসময় নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ভ্রুণের মতো লালন করে। গভীর আত্মিক সংকটের মধ্যেও দায়বদ্ধ ব্যক্তি ও সমষ্টি মিলে কিছুটা রক্ষণশীলভাবে হলেও নিজেদের ইতিহাসকে অর্জিত সম্পদরূপে ধরে রাখে। একারণেই প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসন এবং তার শিক্ষা ও আধিপত্য সত্ত্বেও আমাদের সাহিত্যকে একেবারে পরাস্ত বা লুপ্ত করতে পারেনি। কেননা আমাদের সাহিত্যে উত্তরাধিকার হিসেবে আছেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, জসীমউদদীন, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, আবু ইসহাক, শহীদুল্লাহ কায়সার, ভগীরথ মিশ্র, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মহাশ্বেতা দেবী, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, দেবেশ রায়, অভিজিৎ সেনের মত সাহিত্যিক- যারা নিজস্ব ঐতিহ্যের অন্বেষণে লেখনি ধারণ করেছেন এবং উপনিবেশের প্রভাবমুক্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন।

 

উপন্যাস ও রাজনীতি

উপন্যাস ব্যক্তি-মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। আর ব্যক্তির জীবনভাবনা বা সাহিত্য উৎপ্রেক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতি। ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যে উপন্যাস, তাতে রাজনীতির প্রসঙ্গ আসাটা অবশ্যম্ভাবী। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ হয়ে পড়ে রাজনীতির শিকার। কর্তৃত্বের অভিলাষে ক্ষমতাবানেরা গড়ে তোলে উপনিবেশ। ঔপনিবেশিকতা একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়; সমাজ-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য চেতনার স্বভাবিক গতিকে কৃত্রিমতায় ঢেকে দিয়ে উপনিবেশিতের উপর চাপিয়ে দেয় নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি। সময়ের ব্যবধানে শোষিত মানুষের অগ্রগণ্য চিন্তশীল ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত হয়ে ওঠে, তারা উপনিবেশের বিপরীতে দাঁড়াতে চায়। তাদের প্রজ্ঞাশাসিত মনন গড়ে তোলে উপনিবেশোত্তর চেতনা কিংবা বি-উপনিবেশায়িত তত্ত্ব। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বি-উপনিবেশবাদী চৈতন্যের সূচনা এবং এখনও তা চলছে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন দেশগুলোর উপনিবেশিকরণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।

বিশশতকের দ্বিতীয় দশকে ভারতবর্ষের উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। এইসময়ে উপনিবেশ-কবলিত এলাকায় তিন ধরনের মতাদর্শিক সংঘাত দেখা যায়- পূর্ব বনাম পশ্চিম, আধুনিকতা বনাম ঐতিহ্য, অতীত বনাম বর্তমানের। উত্তর-উপনিবেশবাদ প্রতিরোধী জ্ঞানভাষ্য তৈরি করতে গিয়ে বি-উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া গ্রহণ করে। বি-উপনিবেশায়নের তৎপরতা তৈরি হয় উপনিবেশায়িত প্রক্রিয়া সচল থাকা অবস্থাতেই। আর এই প্রতিরোধ তৈরি হয় দুই ভাবে-

১.   প্রাক্-ঔপনিবেশিক চিন্তাকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে;

২.   প্রাক্-ঔপনিবেশিক চিন্তার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।

বি-উপনিবেশায়ন উত্তর-উপনিবেশবাদেরই একটি প্রক্রিয়া। উপনিবেশোত্তর মূল্যবোধ স্বভাবে প্রতিবাদী ও বিনির্মাণপন্থী। বি-উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া ঔপনিবেশিক প্রতাপের আনুকূল্যে গড়ে ওঠা আধিপত্যপ্রবণ প্রতিবেদনকে অস্বীকার বা বিনির্মাণের মাধ্যমে নতুন প্রতিবেদন তৈরি করে। বি-উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-

১.   জাতি, জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কিত আলোচনা;

২.   ভাষাকেন্দ্রিক আধিপত্যের বর্গকে ভেঙে ফেলা;

৩.   ঔপনিবেশিক শাসন বা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান;

৪.   দেশজ ইতিহাস-ঐতিহ্যের সন্ধান;

৫.   প্রাক্-ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে চিহ্নিত করা;

৬.   কেন্দ্র  ও  প্রান্ত – এই ধারণাকে নিশ্চিহ্ন করা;

৭.   নিম্নবর্গের অবস্থানকে সোচ্চার করে তোলা।

 

অমিয়ভূষণ মজুমদার এবং বি-উপনিবেশায়িত উপন্যাস

অমিয়ভূষণ মজুমদার (১৯১৮-২০০১) বাংলা সাহিত্যের একজন বিরলতম প্রতিভাবান লেখক যিনি জনপ্রিয়তার হাতছানি এড়িয়ে নিঃসঙ্গ স্বতন্ত্র এক সাহিত্যভুবন নিমার্ণ করেছেন। নির্মোহ-নিরাসক্ত ভঙ্গিকে নিজ সত্তায় ধারণ করে বিশশতকের পঞ্চাশের দশকে বাংলা সাহিত্যে পদার্পণ করেন ভিন্নধারার এই জীবনশিল্পী। তিনি যেন গল্প উপন্যাসের বিষয়বস্তুর অস্থি-মজ্জার ভিতর প্রোথিত করে দেন তাঁর প্রজ্ঞাশাসিত মননশীল সৃষ্টিপ্রতিভাকে। তাই তাঁর বর্ণনায় একধরণের নৈর্ব্যক্তিক কথকের ভঙ্গি লক্ষ করা যায়। তাঁর বিষয়ভাবনাও সম্পূর্ণরূপে মনন-নির্ভর। নির্মাণশিল্পীর মতই বিষয় ও আঙ্গিকের কৃৎকৌশলে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। বিবর্তনশীল সময়ের সাথে সাথে তিনি নিরন্তর বৈচিত্র্য-সন্ধানী; তাঁর উপন্যাসে তাই গড়ে উঠেছে জীবনের নবীনতর প্রতিবেদন। তাঁর রয়েছে নিজস্ব এক ইতিহাসচেতনা যাকে তিনি অনবরত পুনর্নির্মাণ করেছেন। নিম্নবর্গীয় চেতনেঋদ্ধ এই ইতিহাসবোধের সাহায্যে তিনি পেরিয়ে যান ঔপনিবেশিক আবহের জটিল পিছুটানগুলি। আধিপত্যবাদী চেতনার বিপরীতে তাঁর উপন্যাস যেন মূর্ত প্রতিবাদ। তাঁর নয়নতারা (১৯৫৫), গড় শ্রীখণ্ড- (১৯৫৭), দুখিয়ার কুঠি (১৯৫৯), নির্বাস (১৯৫৯), মহিষকুড়ার উপকথা (১৯৮১), রাজনগর (১৯৮৩), মধু সাধুখাঁ (১৯৮৮), ফ্রাইডে আইল্যান্ড অথবা নরমাংস ভক্ষণ এবং তাহার পর (১৯৮৮), চাঁদবেনে (১৯৯৩) প্রভৃতি উপন্যাসে আমরা যে অমিয়ভূষণ মজুমদারকে পাই সেখানে তিনি নির্মাণ করে চলেন বাংলা উপন্যাসের বিকল্প বয়ান, যা বিকল্প চেতনায় ঋদ্ধ। বিকল্প সৃজনী ভাবনা; এককথায় জীবন-পুনঃস্থাপনার বিকল্প এক সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন তিনি। বি-উপনিবেশায়নকে তিনি স্বাধীন শিল্পসৃষ্টির আবশ্যিক প্রকরণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ঔপনিবেশিক সমাজ-সংস্থার আনুকূল্যে বাংলা উপন্যাসে যে প্রতিবেদন গড়ে উঠেছিল, অমিয়ভূষণ মজুমদার উপনিবেশোত্তর অবস্থান থেকে তার বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন। উপনিবেশ যখন গোটা সমাজে দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে, তার সর্বব্যাপ্ত মহাসন্দর্ভের বাইরে জাতীয় বা আঞ্চলিক সত্তার নির্মাণ অসম্ভব হয়ে যায়। উপনিবেশোত্তর রচনাপ্রণালী সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে সর্বাত্মক প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। অমিয়ভূষণ মজুমদারও তাঁর রচনার প্রতিটি অনুপুঙ্খে ও প্রকরণে ঐ মহাসন্দর্ভের আধিপত্যকে অস্বীকার করেছেন নিজস্ব শিল্পপ্রতিভা দিয়ে।

উপনিবেশবাদ ও দেশজ আত্মীকরণ

আমাদের দেশ উপনিবেশের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এলেও ঔপনিবেশিক প্রভাব এখনো রয়ে গেছে; আমাদের চিন্তা-চেতনা ও শাসনকাঠামো থেকে ঔপনিবেশিক আচরণ পুরোপুরি দূরীভূত হয়নি। উপনিবেশ-উত্তর কিংবা স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রেই ঔপনিবেশিক জ্ঞানের স্পর্শ লেগে আছে। উপনিবেশিত মনের চিন্তাকাঠামো জুড়ে এখনও আছে ঔপনিবেশিক ভাবনা। এখনো আমাদের মনে অপরতার বোধ ক্রিয়াশীল; আমরা তাই নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির বিষয়ে হীনন্মন্যতায় ভুগি।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে আমাদের সাহিত্য ইউরোপীয় সাহিত্য দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বলা যায়, আমাদের নিজস্ব সাহিত্যের ধরনকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে ইউরোপীয় সাহিত্যের ধরন সেখানে স্থান করে নিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পাশ্চাত্য সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সম্পূর্ণরূপে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত হতে পারেন নি। দেশীয় বিষয় থেকে কাহিনির উপাদান সংগ্রহ করলেও পাশ্চাত্যের আঙ্গিকের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

অথচ মহৎ সংস্কৃতির শিক্ষা হলো- কোনো জাতি বা রাষ্ট্র অন্য সংস্কৃতি থেকে যা কিছু নিজের মধ্যে গ্রহণ করবে তা যুক্তি দিয়ে, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকে পরিশীলিত করে জারিত করে নেবে- যাকে বলা যায় সফল আত্মীকরণ। তা না করে আমাদের ভারতীয় মানস অবাধে পাশ্চাত্য চিন্তা-ধারাকে গ্রহণ করেছে। অবশ্য এর পিছনে ঔপনিবেশিক চাপ ক্রিয়াশীল ছিল। ফলে নিজস্ব পটভূমি ছেড়ে, দেশজ ও লৌকিক সত্তাকে বাদ দিয়ে আমাদের উপনিবেশায়িত মন পাশ্চাত্যের দৈনন্দিন জীবনের গ্লানি, বিবর্ণতা ও পঙ্কিলতাকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপাদান ভেবে গ্রহণ করেছে। আমরা নিজেরাই মাইকেল মধুসূদন দত্তের মধ্য দিয়ে সচেতনভাবেই পাশ্চাত্য প্রভাবকে মেনে নিয়েছি। এর ফলে সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে আমাদের দেশীয় প্রকরণ ও শৈলী ক্রমশ সরে যেতে থাকে। এই সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলাকালে অধিকাংশ সাহিত্যিক গড্ডল স্রোতের ঢেউয়ে নিজেদের ভাসিয়ে দিলেও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও শোনা গেছে। আর এই প্রতিবাদী মনন থেকেই গড়ে উঠেছে বি-উপনিবেশায়িত তত্ত্ব এবং রচিত হয়েছে উত্তর-উপনিবেশায়িত সাহিত্য। এই প্রতিরোধী মনোভাব থেকেই ঔপনিবেশিক শক্তির চাপিয়ে দেয়া সাহিত্যের ধারা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি সাহিত্যিকগণ হয়ে উঠেছেন শিকড়-সন্ধানী। উপন্যাসের আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তাঁরা অন্বেষণ করেছেন দেশজ রীতি। বিষয়ের ক্ষেত্রেও তাঁদের লেখায় উঠে এসেছে নিম্নশ্রেণির মানুষের জীবনবাস্তবতার চিত্র; যে নিম্নশ্রেণিকে ব্রাত্য হিসেবে দূরে সরিয়ে রেখেছিল ঔপনিবেশিক সময়ের শিক্ষা-সাহিত্য। তাঁরা তুলে ধরেছেন গ্রামবাংলার লোকায়ত জীবনের চিত্র- যা ছিল উপেক্ষিত, অবহেলিত। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা পাই অমিয়ভূষণ মজুমদারের সাহিত্য, যেখানে তিনি সূক্ষ্মভাবে ঔপনিবেশিক চরিত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।

ফ্রাইডে আইল্যান্ড অথবা নরমাংস ভক্ষণ এবং তাহার পর উপন্যাসে তিনি যেমন একটি দ্বীপের ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির মাধ্যমে উপনিবেশবাদীদের আধিপত্যের চিত্র তুলে ধরেছেন তেমনি মহিষকুড়ার উপকথায় দেশজ কৃষ্টি-সংস্কৃতি, প্রথার অন্বেষণে ফিরে গেছেন বাংলার লোকায়ত জীবনের কাছে। মধু সাধুখাঁ উপন্যাসে মধুর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ফিরিঙ্গি বলাইয়ের দেশভাবনার বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছেন। বিষয়বস্তু এবং প্রকরণ উভয় দিক থেকেই তিনি উপন্যাস সম্পর্কিত ধারনার বি-উপনিবেশায়ন ঘটিয়েছেন। এই বি-উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে তিনি যেমন প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভাবনাকে রূপান্তরিত করেছেন তেমনি কখনো কখনো অবক্ষয়িত আধুনিক সভ্যতার বিপরীতে আঁকড়ে ধরেছেন প্রাক্-ঔপনিবেশিক কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের রীতিনীতিকে।

 

মধু সাধুখাঁ : ঔপনিবেশিক বয়ানের পটভূমি

তথাকথিত সভ্য ও পরিশিলিত জগৎ সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যে যে ঔপনিবেশিক প্রকল্পনা তৈরি হয়েছিল, মধু সাধুখাঁ (১৯৮৮) উপন্যাসে অমিয়ভূষণ মজুমদার তার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। এই উপন্যাসের মধু পাশ্চাত্যের আধিপত্যকে অতিক্রম করেছে তার নিজস্ব যুক্তি ও চিন্তা-চেতনা দিয়ে। মধু সাধুখাঁ একজন বাঙালি বণিক। বাংলার পূর্ব প্রান্ত থেকে ধরলা, মানসাই পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে সে অগ্রসর হয় বরেন্দ্র ভূমির কামতা রাজ্যে। এই যাত্রাপথে তার সঙ্গী হয়েছে মাঝিমাল্লা, ক্রীতদাস বদর এবং ফিরিঙ্গি বলাই। অমিয়ভূষণ মজুমদার আমাদের জানিয়ে দেন যে, এই ফিরিঙ্গি বলাই আসলে ইংরেজ পর্যটক রালফ্ ফিচ্। দেশভ্রমণ আপাত উদ্দেশ্য হলেও তামাকের বীজের ব্যবসা এবং জেসুইটসদের মতো খ্রিস্টধর্ম প্রচার করাই বলাইয়ের মূল উদ্দেশ্য। মাথায় সাদা আঁশ মেশানো বাদামি চুলের এই বাবুর দৃষ্টিতে- গোটা পৃথিবীকে নাকি দু’ভাগে ভাগ করা: একভাগে পর্তুগিজ, আরেক ভাগে ইস্পেনি হার্মাদরা। নাইজেরিয়ার সাহিত্যক চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল এপার্ট’ উপন্যাসের রেভারেণ্ড জেমস স্মিথও মনে করেছিল পৃথিবীটি দুভাগে বিভক্ত- সাদা ও কালো; কালো আবার দুষ্টের প্রতীক।

অমিয়ভূষণ বলেন, এদের, অর্থাৎ আংলিশদের ভাগে নবডংকা। মধু শুনে হো-হো করে হেসে উঠছিল। মাইরি, আমাদেরকে একদম ভাবল না তোমার ফাদার পোপা। গম্ভীর কৌতুকের মধ্য দিয়ে  আমাদের  এবং  তোমাদের – প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এখানে। এভাবেই বিভাজন তৈরি করা হয় গোটা পৃথিবীকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য – এই দুটি ভাগে ভাগ করে। বিভাজনটি ঘটে উপনিবেশবাদী ইংরেজদের মাধ্যমে। এরপর প্রাচ্যকে নিকৃষ্ট ঘোষণা করে তাদেরকে মার্জিত করার দায়িত্ব হাতে নেয় তারা। প্রাচ্যকে এভাবে ‘অসভ্য’ আখ্যায়িত করে বিনির্মাণের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তি প্রাচ্যকে শাসন করার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং গড়ে তুলেছে আধিপত্যবাদী প্রাচ্যতত্ত্ব। এই প্রাচ্যতাত্ত্বিকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় মূল্যবোধ, যেমন খ্রিস্টধর্ম, ইংরেজি শিক্ষা ও পশ্চিমা আদর্শ দিয়ে যতটা সম্ভব স্থানীয় সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করা এবং সেখানে ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে প্রতিস্থাপিত করা। ১৯৩৫ সালের ৭ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং একটি কমিটি গঠন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষে ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রসার ঘটানো। তিনি স্থির করেন, ব্রিটিশ সরকারের মহান উদ্দেশ্য হবে ভারতবর্ষের স্থানীয় অধিবাসীদের ভিতর ইউরোপীয় সাহিত্য-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটাতে হবে। বেন্টিংয়ের এই উদ্দেশ্য সফল করার শর্ত হিসেবে লর্ড মেকলে গভীর উদ্যম নিয়ে কাজ করেছিলেন। ফলে, তিনি মাইনিউটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন নামক একটা দলিল তৈরি করেন. যেখানে তিনি বলেন- বর্তমানে আমাদের এমন একধরনের ভারতীয় নাগরিক শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে যারা আমাদের ও যাদেরকে আমরা শাসন করি তাদের মধ্যে দোভাষীর কাজ করবে; যারা শারীরিকভাবে এবং গাত্রবর্ণের দিক থেকে হবেন ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতদর্শ, নীতিবোধ ও বুদ্ধির দিক দিয়ে হবেন খাঁটি ইংরেজ। মেকলে এভাবেই দুই বিপরীত পৃথিবীর মিশ্রণে একটি শংকর জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন- যে-জাতি কখনোই পুরোপুরি ইংরেজ হবে না আবার দেশজ সত্তার কাছেও ফিরতে পারবে না। মেকলে ভারতবর্ষে শুধু উপনিবেশের জ্ঞান নয়, ইংরেজি ভাষারও বিস্তার চেয়েছিলেন। এ সম্পর্কে পরমেশ আচার্য বলেন-

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ডেসপ্যাচই ঔপনিবেশিক শিক্ষার কাঠমোগত সংস্কারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রচেষ্টা। মেকলের শিক্ষানীতির মূল চরিত্র বজায় রেখেই এ সংস্কারের চেষ্টা করা হয়। সেই সঙ্গে দেশীয় পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্যকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বলা হয়, প্রাচ্যবিদ্যাকে উপেক্ষা করা হবে না, তবে ইংরেজি শিক্ষাকে উৎসাহ দেওয়া হবে। আরো বলা হয়, মুষ্টিমেয়র উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হবে ইংরেজি। কিন্তু সাধারণের প্রাথমিক শিক্ষার বাহন হবে বাংলা।

এভাবে উপনিবেশিত ভারতবর্ষে শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে ইংরেজরা মূলত তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত অনুগত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছে। উনিশ শতকের নব্যশিক্ষিত ইয়াং বেঙ্গল  শ্রেণিটি মেকলের এই পরিকল্পনারই ফসল। এটা সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিক একটি প্রক্রিয়া, যে-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশজ অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে আর এর পরিবর্তে ‘আত্ম’ (সেলফ) এবং ‘অপরে’র (আদার) নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যাবে। পরিবর্তিত এই জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের কথাই পাওয়া যাবে অমিয়ভূষণ মজুমদারের উপন্যাসে। এই লেখার পরবর্তী অংশে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close