Home আত্মজীবনী আত্মজীবনীর মতো একটা কিছু > আত্মজীবনী >> আকিরা কুরোসাওয়া >>> অনুবাদ : পাপিয়া রহমান ও মাসুদুজ্জামান

আত্মজীবনীর মতো একটা কিছু > আত্মজীবনী >> আকিরা কুরোসাওয়া >>> অনুবাদ : পাপিয়া রহমান ও মাসুদুজ্জামান

প্রকাশঃ July 1, 2017

আত্মজীবনীর মতো একটা কিছু > আত্মজীবনী >> আকিরা কুরোসাওয়া >>> অনুবাদ : পাপিয়া রহমান ও মাসুদুজ্জামান
0
0

আত্মজীবনীর মতো একটা কিছু > আকিরা কুরোসাওয়া 

আকিরা কুরোসাওয়া- বিশ্ব-চলচ্চিত্র ইতিহাসের কিংবদন্তি এই জাপানি পরিচালক চমৎকার একটা আত্মজীবনী লিখেছিলেন ১৯৮১ সালে। আ্ত্মজীবনীর জাপানি নাম ছিল ব্যাঙের তেল বা Toad Oil, জাপানি ভাষায় 蝦蟇の油 Gama no abura।  সেটি তিনি লিখেছিলেন জাপানি ভাষায়। পরে ১৯৮৩ সালে এই আত্মজীবনীটি ইংরেজিতে Something Like an Autobiography নামে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। অনুবাদক Audie E. Bock। ইংরেজিতে অনূদিত এই আত্মজীবনীর বঙ্গানুবাদ ধারাবাহিকভাবে তীরন্দাজে প্রকাশিত হবে। ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হলো এই আত্মজীবনীর Preface বা ‘প্রাককথন’ পর্বটি। লিখেছেন কুরোসাওয়া নিজেই। ইংরেজিতে অনূদিত সংস্করণের শুরুতেই এই প্রাককথন অংশটি রয়েছে। তবে তারও আগে, একেবারেই শুরুতে আছে ইংরেজি অনুবাদক Audie E. Bock-এর Translator’s Preface-টি। ওই অংশটি পরে আত্মজীবনীর শেষে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হবে।

প্রাককথন

জাপানে যুদ্ধপূর্ব কালে এক ধরনের ভবঘুরে দেশ উদ্ধারকারী বিক্রেতার দেখা পাওয়া যেতো। এরা বিশেষ ধরনের প্রচলিত জাপানি মিক্সচার নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, সেটা লাগালে যে-কোনো কাটা দাগ ও পোড়া সেরে যেত। একটা বাক্সের চার দেয়ালে আয়না লাগিয়ে দশ-পা অলা ব্যাঙের চার পা সামনের দিকে আর ছয় পা পেছনের দিকে বেঁধে বন্দি করে রাখতো। ব্যাপারটা ছিল এমন যে, ব্যাঙ চারপাশের দেয়ালে নিজের অদ্ভুত চেহারা দেখে আশ্চর্য হবে আর তার দেহ থেকে নিঃসরিত হবে একধরনের তৈলাক্ত ঘাম। এই ঘামকে সংগ্রহ করে তিন হাজার সাত শো একুশ দিন ধরে ফুটিয়ে উইলো গাছের ডাল দিয়ে নাড়িয়ে এই অত্যাশ্চর্য মিক্সচার তৈরি করা হতো।

নিজেকে নিয়ে লিখতে বসে আমার নিজেকে ওই বাক্সবন্দি ব্যাঙের মতো লাগছে। বছরের পর বছর ধরে নানাভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছি- তা সেটা ভালো লাগুক আর নাই লাগুক। আমি হয়তো ওই দশ পা-অলা ব্যাঙ নই, কিন্তু চারপাশের আয়নায় যা দেখছি তাতে ব্যাঙের মতোই ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে আছি।

পরিপার্শ্বের চাপে আর ষড়যন্ত্রে নিজের অজান্তেই কেমন করে জানি না জীবনের একাত্তরটা বছর পার করে দিলাম। পিছনে ফিরে ভাবি, ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে কী-ই বা আমার বলার আছে। আত্মজীবনী লেখার কথা নানা সময়ে অনেকেই বলেছেন, কিন্তু মন থেকে সেভাবে কখনও সাড়া পাইনি। এর একটা কারণ হতে পারে হয়তো আমার নিজের অভিজ্ঞতা যা আমার কাছে অর্থপূর্ণ, অন্যের কাছে তা হয়তো কোনো অর্থবহন করবে না। অথবা এসব কথা কী আদৌ লিখে রাখার মতো কিছু? আসল কথা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যদি সত্যিই কিছু লিখতে হয়, শেষ অব্দি তা হয়তো আমার ছবি সংক্রান্ত বিষয়আশয়ই হয়ে উঠবে। সত্যি বলতে, ‘চলচ্চিত্র’কে বাদ দিয়ে ‘আমার কথা’ একটা বিরাট ‘শূন্যতা’ ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠবে না। সে যাই হোক, কিছুদিন হলো আমি এই ‘না’ বলা থেকে বিরত হলাম। এর কারণ মনে হয়, ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যঁ রেনোয়ার আত্মজীবনী পাঠের প্রভাব। রেনোয়ার সঙ্গে আমার একবার সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছিল। একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে খেতে আমাদের মধ্যে নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছিল। সে-রাতের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছিল, রেনোয়া জাঁকিয়ে বসে আত্মকথা লেখার লোক নন। এমন মানুষ যদি আত্মজীবনী লিখতে পারেন…ভাবনাটা মনে আসতেই আমার ভাবান্তর ঘটলো। মনের মধ্যে একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। আত্মজীবনীর মুখবন্ধে রেনোয়া লিখেছেন :

আমার অনেক বন্ধু আমাকে আত্মজীবনী লেখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন…এটা অবশ্য তাদের আর জানার কথা নয় যে, একজন শিল্পী নিজেকে একটা ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের সাহায্যেই নিজেকে মুক্তভাবে প্রকাশ করে থাকেন। তখনই তারা জানার জন্যে ঔৎসুক্য দেখান, লোকটা কে।

আরও যদি বলি,

সত্যিটা হলো, যে লোকটির জন্য আমরা গর্ববোধ করি, নানা বৈচিত্রপূর্ণ পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, বাল্যকালে যে নার্সারি স্কুলে থাকতে বন্ধুবান্ধব বানিয়েছে, যে গল্পটি সে পড়েছে তার নায়কের কথা ভেবেছে, এমনকি সেই কুকুরটির কথাও ভোলেনি যে-কুকুরটি ছিল তার চাচাতো ভাই ইউজেনির কুকুর। আমরা একা-একা আমাদের নিজের ভেতর দিয়ে চলি না, চলি এমন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যা আমাদের আকার দিয়েছে…আমি সেইসব মানুষ আর ঘটনার কথাই স্মরণ করতে চাই, যে-সব মানুষ আর ঘটনাগুলি, আমি বিশ্বাস করি, আজ আমি যা হয়ে উঠেছি সেটা হয়ে ওঠার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেছে।

জ্যঁ রেনোয়া, আমার জীবন ও আমার চলচ্চিত্র

এই আত্মজীবনীর অধ্যায়গুলো অন্যভাবে লেখার বিষয়টা, বলা যায়, রেনোয়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা। জাপানি পত্রিকা ‘শুকান ইয়োমিউরি’তে যেভাবে লেখাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, এখানে সেই লেখাগুলো অনেকটাই বদলে গেছে। আসলে রেনোয়ার সঙ্গে আলাপের একটা প্রচণ্ড প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। ইচ্ছা হতো আমি ঠিক যেন ওর মতোই বৃদ্ধ হই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আরেকজন মানুষের সঙ্গে নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পাবার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম, আর তিনি হলেন মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক জন ফোর্ড। একটাই দুঃখ, ফোর্ড কোনো আত্মজীবনী লিখে রেখে যাননি। সত্যি বলতে কী, রেনোয়া ও ফোর্ডের মতো বিখ্যাত মানুষদের তুলনায় আমি নিতান্তই তুচ্ছ একজন মানুষ। কিন্তু যখন এত এত মানুষ ‘মানুষ কুরোশোওয়া’কে জানতে চায়, তখন একটা দায়বোধ কাজ করে। আমি নিঃসন্দেহ যে, আমি এই বইতে যা লিখবো, তা কেউ মনোযোগ দিয়ে পড়বেন না। এই কথাটাও বলে রাখি, কী কারণে সেই ১৯৫০ সালে রাশোমন নির্মিতির বছরে এসে এই লেখাটা শেষ হলো (কারণগুলো পরে বলছি)। তবে লিখতে লিখতে একটা কথা ভাবছিলাম, কোনো অবস্থাতেই নিজেকে লজ্জা দিতে দ্বিধান্বিত হবো না। সহকারীদের যা যা বলি, তা যেন নিজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারি।

আত্মজীবনীর মতো একটা কিছু লিখতে বসে অনেক মানুষের সঙ্গে হাঁটুতে হাঁটু ঠোকাঠুকি করে খোলা মনে নিজের স্মৃতি রোমন্থন করেছি। আর সেই মানুষেরা হলেন : উইকুসা কেউনোসুকে (ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার এবং স্কুলের বন্ধু); ইনোশিরো হন্ডা (পরিচালক, সহকারী পরিচালক জীবনের বন্ধু), ইওশিরো মুরাকি (শিল্পনির্দেশক আমার ক্রু সদস্য), ফুমিও ইয়ানোগুচি (শব্দগ্রাহক, আমার মতোই পিসিএল ফল এবং তোহো চলচ্চিত্র কোম্পানির প্রাকযুদ্ধ কালের স্থপতিদের অন্যতম), মাসারু সাতো (প্রয়াত সংগীত পরিচালক সুরকার হায়াসাকা ফুমিওর ছাত্র, আমার সহযোগী), সুসুমু ফুজিতা (আমার প্রথম কাজ সুগাতা সানশিরোর নায়ক), উজো কায়ামা (অভিনেতা, যাকে আমি কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছি), কাশিকো কাওয়াকিতা (তোহা-তোয়া ফিল্মসের সহসভাপতি, তিনি এমন এক নারী যিনি বিদেশে আমার কাজগুলি ছড়িয়ে দিয়েছেন), অইদি বক্ (জাপানি ছবির মার্কিন বিশেষজ্ঞ, তিনি আমার ছবি সম্পর্কে আমার চেয়েও বেশি জানেন), শেনেবু হাশিমাতো (প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, রাশোমন, ইকিরু, সেভেন সামুরাই-এর চিত্রনাট্য রচনায় আমার সঙ্গী), ইওচি মাতসু (প্রযোজক, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইতালির সিনেসিত্তা ফিল্ম স্কুলের স্নাতক), রহস্যপূর্ণ কারখানার্ এক লোক (ওকে আমার খুবই আশ্চর্য়জনক একজন মনে হতো, বিদেশে আমার জীবনের অনেকটা সময় এই সুদর্শন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে কেটেছে), তেরুও নোগামি (আমার দক্ষিণহস্ত, সেই সুবাদে আমার দ্বারা সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত)- আমি মন থেকে এদের গভীর উষ্ণ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি।

পরবর্তী পর্ব ‘শৈশব-কাল’

 [চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close