Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আত্মদহনের কবিতা > দীর্ঘকবিতা >> সেলিম মণ্ডল

আত্মদহনের কবিতা > দীর্ঘকবিতা >> সেলিম মণ্ডল

প্রকাশঃ June 23, 2017

আত্মদহনের কবিতা > দীর্ঘকবিতা >> সেলিম মণ্ডল
0
0

আত্মদহনের কবিতা

১.

কতভাবে হেরে যাব, প্রিয় জীবন?

নুনের ভার বইতে বইতে শরীরে দীর্ঘ বালিয়াড়ি

 

দূর থেকে দূরে, অতিনিকটে ফুটে ওঠে বিষাক্ত ধুতরা ফুল

উড়ে যায় অন্তরতম পরিযায়ী

 

ও জীবন, মুহূর্তের বাঁকা ঢেউয়ে এত পানি!

ভিজে যাই, তবুও পুড়ি বারেবারে…

 

এরপরও, কেন দ্যাখো পোড়ামুখে সোনাছাই?

আমি তো ছাইয়ের ভিতর সংসারের ময়লা মাজা কষাই

 

২.

সমস্ত পথই উল্টো হয়ে যায়

যে পথে চলি, সে পথের দু’পাশে জঙ্গল

ঘনঘন বেরিয়ে আসে কোনো ফণাওয়ালা ভবিষ্যতদ্রষ্টা সাপ

 

বিষহীন বিষাক্ত

এই জীবনে ছোবল আর ছোবল

দাগ পড়ে থাকে, দাগের ঘরবাড়ি

এবং বিষাদীয় শ্লেট ও শ্মশান

 

৩.

মুখের মন্দিরে ছায়াহীন ছায়া

ভালোবেসেছে যারা ভালো নেই, সুখী আমি

সুন্দর ছড়িয়ে দিই। ব্যর্থতার বিশাল গাছের ঝুরিতে

ঝুলতে থাকা সংসার ধাক্কা খায়

দোলনা দুলতে দুলতে বুঝে নেয় পৃথিবীর ঘূর্ণন

 

৪.

যত্ন বাড়িও না প্রভু আহারের শালপাতায়

পাত খেয়ে পাতে পড়ে থাকা মাংসটুকু শরীর

 

সুস্বাদু রান্নার পিছনে কত রক্তঘাম আছে

জানার বাইরে, জানতে গেলেই বেরিয়ে আসে জীবন

কিই বা পারি? ক্ষয়ে যাওয়ার সঞ্চয়টুকু ছাড়া?

 

আহার আমায় আহত করে না, নিহত করে

 

যত্ন বাড়িও না প্রভু, বুকে পাথর ফাটাও

আজ জবা ফুটুক

 

৫.

ঝুলতে ঝুলতে দড়ির টান বুঝে যায় ফাঁসমালিক

অক্ষমতার লড়াইয়ে পড়ে থাকে চকচকে হাততালি

মঞ্চে মঞ্চে কালো খুরের ঘোড়া

দৌড়ায়, অনর্থক দৌড়ায় এই হতভাগা কবি

 

৬.

আনন্দ ফিরে যায়, বেড়ে ওঠে করুণা

বহন বয়সের ভার বয়

টর্চ ফেলো দেখো ব্যর্থ মানুষের সুখী গৃহকোণ

আলোর অস্তিত্বে লড়ছে ঘর

ঝড়ে দুলছে বিস্তৃত বিষাদ যৌবন

 

৭.

এরপরও ভুলে যাওয়া

এরপরও একার নীরবতা ভাঙা

সংসারের পালে ধানবীজ পুঁতে বয়ে চলে হাওয়া

 

ভাত নেই হাড়ির চৌকাঠে

দরজায় টোকা মারে দায়িত্ব

 

সেভাবেই থাকো তুমি

যেভাবে ঘোড়ার খুরে চুমু তুললে জাগে রেসকোর্স

 

৮.

সংসার আমায় ছাড়ে না

চেয়েছি মুক্ত বিহগের মতো উড়ে যেতে

 

পালকের ছায়ায় কতটুকু ঘর হয়?

ডানার পরিধি জুড়ে পথ আর পথ…নকশা আঁকা গন্তব্যে

উল্টোমুখী রথ ছোটে

দড়িতে টান না বুঝে ঝোলে শূন্যে কালো বক

 

সংসার শুধুই মায়া, ছাড়ে না

শুভ্রতার বিনিময়ে নগদে দেয় সান্ত্বনা আর সান্ত্বনা

 

৯.

স্পন্দনহীন কাকবুকেও ভালোবাসা বৃষ্টির মতো তরল

অথচ, গড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না

এখানে বিস্ময় হয়ে ওঠে কুচকুচে কালো সিদ্ধান্ত

 

চাঁদ কেটে জোৎস্না আনা প্রেমিক-প্রেমিকা জানে

এই পৃথিবী কতটা শ্লথ বা কতটা দ্রুত?

 

১০.

উড়ুক্কু হাওয়ার ভিতর বাতাস নেই

আমার পরাজয়টুকুই আজকের নিশ্বাস

ল্যাবরেটরি থেকে দহন-গলন তুলে নিয়ে

দেওয়াল পুঁতি নিজের ভিতর

কানে আর্তনাদ আসে!

 

কোনো বিক্রিয়ায় জন্মায় না গাছ

বাতাস ও ছায়া গিলে নেয় হাওয়া

উড়ুক্কু হাওয়া

 

১১.

মাঝখানে বসে ভাবি কোন দিক আমার?

প্রত্যেকটা দিক থেকে বয়ে আসে হাওয়া

হাওয়ার ভিতর অসংখ্য ডোরাকাটা বাঘ

ইয়া বড়! ভয় পাই না একটুও

জঙ্গলের রাজত্বে লাফাই

অন্ধকারের ভিতর ডালপালা জড়িয়ে

লুকিয়ে পড়ি দিক সন্ধানে

কম্পাসের স্থূলতা নিয়ে বৈচিত্র্য

আজও বিভেদহীন

 

১২.

পিছোতে পিছোতে কোনোদিন সামনের জনকে

পিছনে ফেলে দেব

তাই দেখে হাততালি দেবে পড়শি ও বন্ধু

 

কেউ ছিল, কেউ আছে- কিছুই থাকবে না গণনায়

 

এই মরা ঘোড়ার খুর ঠোকরাবে ক্ষুধার্ত কাক

মাছি উড়বে, ফাঁকা মাঠে কেউ ফিরে তাকাবে না

 

দুর্গন্ধে সরে যাবে সকলে

একাই একার বিজেতা হয়ে ফিরব আজীবন

 

১৩.

বাতাস ঘন থেকে ঘন হয়

কোথায় সে মুখের আদল? নগ্ন প্রজাপতি

উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে ডানাপথ ছড়ায়

 

আহা রঙবাহার! বিমূর্ত ধারণার খোঁজ

নিখিলের নৈশব্দে কবেকার জাগরণ লেগে

মুখোশেই যাতায়াত আমার

গুপ্তচর সাজি, আসলে হৃদয়ে চোরের বসত

 

১৪.

অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছি

এরপর যদি ফিরে যেতে হয়- আয়ুক্ষয় হবে

জীবনকে তুড়ি মেরে কবেই উড়িয়ে দেওয়া যেত

 

জীবনকে আরও ভালোবেসে ফেলেছি পথকে রাস্তা ভাবি না বলে

কিন্তু আজ রাস্তায় এত ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে থাকে

নিজের দিকে তাকালে করুণা হয়

মনে হয়, সাড়ে তিন হাত কোনো সরু গলির ভিতর

আমি ঢুকে যাচ্ছি ভিক্ষা ছাড়াই

 

১৫.

ফিরেই কি তবে আসতে হবে?

সংসারের পোয়াতি মায়া নিশির ডাকে

রৌদ্র জলাঞ্জলি খেলা চাবুকে চাবুকে রপ্ত!

 

কবেকার শৈশবীঘ্রাণ বুকে জড়িয়ে

ঘুমোতে চায় বাপে-মায়ে

একা, একা বাষ্পীভূত অশ্রু মেঘে স্নান

 

আদরে জড়ায় গুল্মজীবন

ডাকে, পিছন ডাকে জীর্ণ জাতির হাহাকার

 

ভাত গলা বাড়ায়, ভাত হাত বাড়ায়

হাড়িতে ফুটতেই আছে জল আধসিদ্ধ কলজের উপর

 

১৬.

পাখির ঠোঁটে বিষ লুকিয়ে

ডানার অহংকারে যতটা গন্তব্য যাওয়া যায়

ততটাই আমার না চলা হবে

 

‘হেরো’- যে শব্দটার টুটি চেপে

চামড়া বদলে নিজের যে মাংসটুকু দেখাতে চেয়েছি

তা রান্নার স্বাদে পাতে পাতে যাবে হারিয়ে

 

সময় যেভাবে বড় করে দিচ্ছে আমায়

গার্ডারের টানে

কতটা আর স্থিতিস্থাপতকা ধরে রাখা যায়?

 

‘জন্মাবার বলে জন্মেছি’- এটাই আসলে ব্যর্থতার লড়াই!

 

১৭.

আজ কে দেখবে বুকে বাজে কুড়ুল ও কোদাল?

বাপ কাঁদে, মা কাঁদে

সংসার লবন ছিটোয়- আহা! কী স্বাদু আহার!

পেটের উপর দাঁড়িয়ে থাকা পেট, বয়সের আয়ু গোনে

সময় মাপে বুকে চলা অশ্রু জোয়ার

হাত থেকে হাত ক্ষয়ে যায়, প্রেম নাই, প্রেম নাই

ঝলসায় শুধু কাঁচা মাংসের মতো পোড়া হৃদয়

 

১৮.

তিন পা এগিয়ে যাই আর দু”পা পিছোই

হয়ত, এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একদিন বাড়ি পোঁছে যাব

 

বাড়ির দুঃখ-আনন্দকে দেখব ঘাড় ঘুরিয়ে

 

১৯.

গপগপ করে গিলে নিচ্ছ সময়

 

হা পেটে তাকিয়ে থাকি ফাঁকা স্টেশনের দিকে

টাটা, বাইবাই করে জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে পদক্ষেপ

 

মাড়িয়ে যাওয়া বালির ভিতর চকচক করছে ভবিষ্যৎরেখা

 

২০.

এ এক দানব জন্ম

সংসারে গিলে খাওয়া সুপুরুষের হাততালি পাওয়ার লোভ

 

কীসের কবিতা? কীসের বই?

যে জীবন এক পায়ে দাঁড়াতে পারে না

তাকে মঞ্চে না, ভিড় লোকাল ট্রেনের নির্দিষ্ট কোণে মানায়

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close