Home কবিতা আপন মাহমুদ > একগুচ্ছ কবিতা >> কবিতা লেখা >>> কবিতার মূল্যায়ন : ফেরদৌস মাহমুদ

আপন মাহমুদ > একগুচ্ছ কবিতা >> কবিতা লেখা >>> কবিতার মূল্যায়ন : ফেরদৌস মাহমুদ

প্রকাশঃ September 13, 2017

আপন মাহমুদ > একগুচ্ছ কবিতা >> কবিতা লেখা >>> কবিতার মূল্যায়ন : ফেরদৌস মাহমুদ
0
0

আপন মাহমুদ, আমাদের কবিতার আকাশ থেকে অকালে ঝরে-পরা আরেকটি নক্ষত্র। মাত্র একটি কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছিল তাঁর সকালের দাঁড়ি কমা– কিন্তু তাতেই পাঠকের মনে গেঁথে গিয়েছিল তাঁর কবিতা। আপনের জন্ম ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি আর মৃত্যু হয়েছে ১২ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে। ৩৬ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। কিন্তু আমাদের তরুণ প্রজন্মের কবি হিসেবে পাঠকের মনে যে অভিঘাত তৈরি হয়েছিল, এককথায় তাকে অবিস্মরণীয় বলা যায়। অকালপ্রয়াত এই কবিকে নিয়েই তীরন্দাজের এই আয়োজন। তাঁর মৃত্যুদিনে কয়েকটি লেখার মাধ্যমে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

আপন মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা

ও মেঘ, বউয়ের মতো মেঘ 

এক.

ও মেঘ, বউয়ের মতো মেঘ; আমাকে প্রেমিকার

মতো ভেজাও—দ্যাখো, চিন্তার সোনালি আঁশ শুকিয়ে

যাচ্ছে। আমি তেমন প্রার্থনা জানি না- বড়জোর

ছেলেব্যাঙ-মেয়েব্যাঙে বিয়ে দিতে পারি- থু লেপে

ভিজিয়ে দিতে পারি নিজের শুকনো ঠোঁট।

মেঘ, তুমিও কি অপচয়ের ভয়ে আর আগের মতো

ঝরো না- জলখরচের ভয়ে আমি যেমন কান্নাকে

দূরে রাখি- থাক অতো হিসাব-নিকাশ- দ্যাখো,

চালতাফুল তাকিয়ে আছে অবিবাহিত খালাতো

বোনের মতো! যদি ভেজাও তুমি- হবো শাপলায়

ভরে যাওয়া মাঠ।

 

শুনো; গল্পের উঠান কি একাই ভিজবে আমাদের

সর্দি-কাশির অজুহাতে! এসো, ছাতাহীন হাঁটুরের মতো

ভিজি- আরো কাছে গিয়ে দেখি আষাঢ়ের ভেজা বউদি।

ও মেঘ, বউয়ের মতো মেঘ; আমাকে প্রেমিকার

মতো ভেজাও।

দুই.

জানালা থেকে দুই মিনিট দূরে, যে মাঠ ঘাসের ভেতর একাকি

ভিজে- আমি তাকে ভগিনীর বয়ফ্রেন্ডের মতো হিংসা

করি। কেননা, ডাক্তার তাকে কখনোই ভিজতে ‘না’ করেনি- তার

নেই সাইনোসাইটিস ঝামেলা, মোবাইল ভেজার ভয়।

সেদিন দূর থেকে তাকে ভিজতে দেখে আমি শেষ সিগারেটটিও

জ্বালিয়ে ফেলি- সিগারেটের সঙ্গে পুড়তে পুড়তে ভাবছিলাম : আগামী

আষাঢ়ের আগেই ঘরটা বাইরে নেওয়া যায় কি-না- ভাবতে ভাবতেই

পাড়ার মাস্তানের মতো ঝড়ো হাওয়া এসে জানালা বন্ধ করার নির্দেশ

দিলো-আর আমি ভয় পেয়ে, গুমের ভেতর থেকে ঘুমের ভেতর চলে

গেলাম।

ঘুম থেকে বেরিয়ে দেখি, ওই বর্ষী-তৃপ্ত সবুজ মাঠেই একটা গরু ঘাস

খাচ্ছে একা- যার রাখাল হয়তো কখনোই খুঁজে পাবে না। তার হারিয়ে

যাওয়া বাঁশি।

তিন.

আমাদের আঁকাআঁকির স্কুলে, ব্ল্যাকবোর্ডে যে, কদমফুল এঁকেছিলেন

বর্ষা ম্যাডাম- তার ব্যাঞ্জনা কতটুকু, কার দিকে ছড়ালো- এ নিয়ে

কখনোই ভাবিনি- কেনোনা, চকে আঁকা ওই ফুল মুছে গেলেও

বর্ষা ম্যাডাম থেকে যান- আর রঙিন ছাতা মাথায় নেলপলিশ-পা

টিপে টিপে হেঁটে বেড়ান। পৃথিবীর পথে-পথে।

বর্ষা ম্যাডাম খুবই ম্যাডাম-কোনো না, ব্ল্যাকবোর্ডের উচুতে

কদমফুল মুছতে মুছতে তিনি আমাদের নাভীও দেখান।

আর কে না জানে, গভীরতা ও ব্যাঞ্জনার দিক থেকে নাভীফুলই

সবচেয়ে এগিয়ে।

চার.

আমাদের উদীচী ও চারুকলার। আপুরা এবারও বেশ নাচ দেখালেন।

বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানে— কেউ কেউ যথারীতি পুরনাে রবিঠাকুরকেই নতুন করে।

ঝরাতে চেষ্টা করলেন- মঞ্চ থেকে একটু দূরে, বৃষ্টি ও ভেজাবালিকাদের

প্রতি মুগ্ধতা রেখে আমরা গল্প করছিলাম- আমাদের একজন সিগারেট

ধরাতে ধরাতে বলল, “ছাত্রী হােস্টেলের মেয়েরাই সবচে কার্যকর

বৃষ্টি— কেননা, ওদের শুকাতে দেওয়া একটা পুরনো ওড়না দেখেই

তুমুল ভিজে উঠি আমরা ।”

আরেকজন কিছুটা অনাসক্ত গলায় বলল, “বাদ দে, ওই সব বৃষ্টি-টিষ্টি-

কোথাও একটা কলার ভেলাও দেখছি না যে ভাসবো- ভাসতে না জানলে

জাহাজ তো দূরের কথা একটা কাগজের নৌকাও হওয়া যায় না।

এভাবেই, একথায়-ওকথায় রাত বাড়ে- আমাদের বর্ষাবিষয়ক আড্ডাও

যায় ভেঙে- কেবল গল্প পড়ে থাকে ছাতা ব্যবসায়ীদের ঘিরে!

 

পাতার গান

একদিন সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে, তনুশ্রীদের ওড়নার মতো

কোনো এক দ্বিধাগ্রস্ত বিকালে- আমিও বাজাবো বাঁশি- বাঁশি

শুনে দু’একটা পরোপকারী গাছ মাথা ঝাকাবে, হয়তো

ঝরে পড়বে দু’একটি শুকনো পাতা

 

জেনে যাবো, ঝরে পড়ার আগে পাতাদের গান

কোথায় থাকে।

 

কথা, নিজের সঙ্গে

সারাদিন ছেলেটার কিশোর হওয়ার চেষ্টা- নাটাই, ঘুড়ি আর

কাঠের বন্দুক নিয়ে নাড়াচাড়া, গোল্লাছুটের গল্প…

ছেলেটি বড় হতেই চায় না, অথচ তার মাথায় অনেক আগেই

উঁকি দিয়েছে দূরের কাশবন, বাজারের ব্যাগও উঠেছে হাতে…

আমি তাকে আয়নায় গিয়ে দেখি, টুকটাক বয়স কমাবার কথা

ভাবি-বলি, বড় হতে হতেও তো ছোট হওয়া যায়, না-কি?

 

যাদের ভয়ে ইদানিং শাকিল

…এভাবেই হ্যান্ডমাইকে নিজের ক্ষুধা বিক্রি করছিলেন শাকিল (১১)। নানা, সে আসলে বিষের ফেরিওয়ালা। যা খেয়ে ‘চিৎ হয়ে মরে’ ইদুর-চিকা ও তেলাপোকার আত্মীয়-স্বজন । হাঁটবার যে কোনো ভিড়ে, যে কোনো গলিতে তার দেখা পাওয়া যায়। গোপনে বলি : এ বিষ খেয়ে তার বড় বোন শান্তিও মারা গেছে ।

সেন্স অব থার্ডওয়ার্ল্ড ভেবে জানা যায়, শাকিলেরা ভাত ভালোবাসে খুব, আর প্রতিটি ভাতই জল্লাদের দাতের মতো। যা কি-না এখানকার খাদ্য-মন্ত্রীরও আছে। এছাড়া পৃথিবীর হাট-বাজারে অমন শাকিলের সংখ্যা কত তার আজো কোনো হিসাব নেই। যদিও প্রতি মিনিটে আমেরিকার যুদ্ধ ব্যয়…। প্রতিবেশি একজন অন্ধোপ্ৰায় ভদ্রলোক জানান, হ্যান্ডমাইকটি শাকিল পেয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে। যার হাতলে আঁকা আছে একজন দরিদ্র পিতার হামাগুঁড়ির পথ। যে পথে নির্দেশিত রয়েছে অগনিত শাকিলের ভাতের ইতিহাস। এরই মধ্যে শাকিলের বিরুদ্ধে শব্দদূষণের অভিযোগ করেছেন বণিক সমিতির নেতারা। যাদের ভয়ে ইদানিং শাকিল…

সংকোচের অহেতুক ওড়না

আরো বালকবেলায় নির্জন গলি-ঘুপচিতে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতাম— কাউকে আসতে দেখলেই নিজেকে মনে হতো বেয়াদপ- মনে পড়ে, নাটকের নারী-চরিত্র করতে গিয়ে যেদিন ব্ৰা ধার চাইতে গেছি বিউটি অথবা শেফালির কাছে- সেদিনও ফিরতে হয়েছে সংকোচের অহেতুক ওড়না নিয়ে! অথচ, একটি রক্ষণশীল ব্রা থেকে একটি স্যাকুলার প্যান্টি পর্যন্ত যেতে কি কি করতে হয়, এখন আমার সবই জানা

ইদানীং প্রায়ই শুনি মেধাবীরা বেয়াদপ হয়- তাই আমিও চুপে চুপে নিজেকে কিছুটা বেয়াদপ ভাবি, মেধাবী ভেবে বেয়াদপ সতীর্থদেরও দি-ই ক্ষমা করে – যদিও নদী-মৃত্যুর কথা শুনে এখনো হাসতে শিখিনি।

এখন যে কোনো জায়গায়, যে কারো সামনে দাঁড়িয়েই আমি প্রস্রাব করতে পারি- লজ্জা পাই না, নিজেকে দমকলকর্মী-দমকলকর্মী মনে হয়- শুধু বুঝতে পারি না, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার সংকোচ ঘুচানোর জন্য এ শহরকে থ্যাংকস দেওয়া উচিত কি-না।

আপন মাহমুদ > ‘প্রজাপতি’ কবিতাটি যেভাবে লেখা হলো

প্রজাপতি

মায়ের উদ্দেশে বাবা যে চুমুটা ছুড়ে দিয়েছিলেন

বাতাসে- শুনেছি সেই হাওয়াইচুমুটা থেকেই জন্ম নিয়েছে

পৃথিবীর প্রথম প্রজাপতি

 

মা, পৃথিবীর যেকোনো নারী থেকে যাকে কখনোই আলাদা করা

যায় না- তাকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত- বিভ্রান্ত সেই প্রজাপতিটার ডানা থেকে যখন

টুপটাপ ঝরে পড়ছিল রঙের আকুতি- রঙের সেই অপচয় ঠেকাতেই সম্ভবত

জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর আর সব প্রজাপতির

মাকে বাবা খুঁজে পেয়েছেন সেই কবে! অথচ, তার মুখের দিকে তাকিয়ে

কখনোই মনে হয়নি- জীবনে একটাও প্রজাপতি তার খোঁপায় বসেছে।

রাত করে ফিরি, মিছিলেও যাই— এসব কারণেই বাবার বকাটা খেয়েছিলাম। সাড়ে তেইশ টাকা নিয়ে বাড়ি-ছাড়া সেদিন জানতামই না কোথায় যাব। কিলোমিটারের মতো পথ দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ছোটভাই শাহেদ কাঁধব্যাগের পকেটে তিনশ টাকা দিয়ে বলেছিল ‘মা দিছে’। তখনো ভেজা ছিলো চোখ, সেদিন কেন্দেছিলাম প্রায় দুই কিলোমিটার।

শেষ পর্যন্ত মামার কাছেই গেলাম। সুনামগঞ্জ- ছাতক পেপার মিল। গিয়ে দেখি সুরমা নদী- নদীর বুকে পল্টুন-ঢেউয়েরা যাকে দোলনা করে দেয়। সেই পন্টুনের উপর গুরুগম্ভীর স্টার সিগারেট আর দেশলাই বুকে যে ছেলেটি বসেছিলো একা, সেই ছেলেটি, সেদিনের আগে আর কোনো নদীর প্রেমে পড়েনি। সুরমা-প্রেমই আমাকে ছাতক কলেজে ভর্তি হতে বলেছিলো।

ইন্টারমিডিয়েট এমন একটা সময়- যেখানে বাপ্পি বিশ্বাস আছে—আছে হ্যাপিদি (বাপ্পির বড় বোন)- পাশাপাশি দুটো বাগানও ছিলো (ওদেরটা ফুলের, মামাদেরটা সবজির)। বাপ্পি বিশ্বাস মানে আলতামাখা দুটো পা, নুপূরের রিনিঝিনি— বাপ্পি বিশ্বাস মানে ক্ল্যাসিক নৃত্য, অষ্টম শ্রেণী। বাপ্পি খুব সকালে পূজার ফুল তুলতো- খুব সকালে তখন আমারো ঘুম ভাঙতো। একদিন সেই ফুল থেকেই (দেবতার ফুল) বাপ্পি আমাকে একটা রক্তজবা দিয়েছিলো। ঈশ্বর কী সেদিন থেকেই আমাকে তার প্রতিপক্ষ ভাবছে? না হয় আজো কেনো রক্তজবার কথা মনে এলে রক্তটা প্রধান হয়ে উঠে। কে জানে…

যাই হােক, ছাতকের তিনটা বছর সুরমা যতটা নদী ছিলো, তারচে’ অধিক ছিলো বাপ্পি বিশ্বাস । হিন্দু কেনো হইনি, হিন্দু হলে কি হয়! হয়েই যাব, তাহলে রবীন্দ্রনাথ…! এমন সব ভাবনা আমাকে তখন বিভ্রান্ত করেছিলো। যদিও এখন জানি, মানুষ যত মানুষ হয়ে ওঠে, ধর্ম তত দূরে সরে যায়।

দু’হাতে দুটাে বইয়ের ব্যাগ, পিঠে আরেকটা আমি ফিরে আসছি। নদী ছেড়ে। পূজার অর্ঘ্য ছেড়ে। ভারি পায়ে। ত্রিশ কি পয়ত্রিশ পা এসে যখন দু’হাতের দু’ব্যাগ রাস্তায় রেখে পিছনে তাকাই- দেখি, বাপ্পি দাঁড়িয়ে জানালায়- ভেজা চােখ- তখন আমার পা আরো ভারি হয়ে উঠছিল। তবু আমি ফিরে আসছি, যুদ্ধে যাওয়ার মতো…। আমার উদ্দেশে বাপ্পি সেদিন একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়েছিলো হাওয়ায়। সেই ফ্লাইং কিস বা উড়ন্ত চুমুটার তাড়া খেয়ে খেয়ে একটা সময় আমি সরে সরে যাচ্ছিলাম পরিবার থেকে, বন্ধুদের মুখ থেকে, এমন কি নিজের কাছ থেকেও৷

কত কী ভাবতাম। এ নিয়ে! মনে হতো আমি যেখানেই যাই চুমুটা আমাকে অনুসরণ করে। এমন কি মদের টেবিলে বসলেও মনে হতো পানশালার আলো-অন্ধকারে শীতের রাতের বাদুরছানার মতো চুমুটা ডানা ঝাপটায়। মাঝে মাঝে এই ভেবে পুলক অনুভব করতাম যে, পৃথিবীর বাতাসে একটা নির্ভেজাল চুমু মিশে আছে, যা আমার। মন খারাপ হলে ভাবতাম- দূরে, সাইবেরিয়ার কোনো এক বরফখণ্ডের নিচে আমার চুমুটা বুঝি আটকা পড়ে আছে। না হয় আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে কেনো- মন খারাপ হবে কেনো। শীতকালে যখন অতিথি পাখি আসে- তখন মনে হয়। এইসব পাখিদের ভিড়ে আমারও একটা পাখি আছে— কেনোনা সেই উড়ন্ত পাখিটা পাখিও তো হতে পারে। প্রজাপতি দেখলেই মনে হতো। (এখনো হয়), এসব প্রজাপতি হয়তো আমার সেই চুমুটা থেকেই জন্ম নিয়েছে।

ছাতক থেকে চট্টগ্রাম যাই ’৯৫তে। ওই সময় অনেক বার বিষয়টি নিয়ে কবিতা লিখতে চেয়েছি। পারি নি। একবার ফ্লাইং কিস শিরোনামে ৫ লাইন লিখেছিও :

বাতাসে বেড়ায় ভেসে বিজাতীয় চুমু

জায়গা হয়নি যার কোনো এককালে

হিন্দুর চুমু বলে মুসলিম গালে

ভাসমান চুমুটাকে কালের পাথর

লুকাতে পারেনি। আজো ধর্মের আড়াল

২০০৩’র নভেম্বরে ঢাকায় আসি। ওই সময় সাত/ আট মাস ঘুমোবার জায়গা ছিলো না। একসময় পরিবাগের বস্তিতে উঠি (অধুনালুপ্ত)। কাঠের দােতলা। উপরে টিন। তখন ইটের নাম ছিল বালিশ। মশারি ছিল না (মশারা ছিলেন)। পুরো রুমটাই ছিল বিছানা। ২০০৫ সাল। একদিন রাত বারোটার পরে উবু হয়ে শুয়ে কবিতা লিখার চেষ্টা করছিলাম, মনে পড়ছিলো বাপ্পির মুখ, অনেক ঘাম, অনেক মোশা, কিছুতেই লিখা আসছিলো না, ভাবতে ভাবতে কাগজের উপরেই ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়- দেখি, কাগজ কিছুটা ভিজে গেছে ঘামে। কলম খোলাই ছিলো। ভেজা কাগজেই কবিতাটা লিখে ফেলি। ভাবতে হয়নি। একটুও।

 

ফেরদৌস মাহমুদ > মৃত্যুযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া আপন

যেটুকু পথ পেরোতে বন্ধুদের তিন মিনিট লাগতো- তা অতিক্রম করতেই আমার লাগতো কমপক্ষে ত্ৰিশ মিনিট- এভাবেই একদিন আমি খুব পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম- পেছনে তাকালে আমাকে দেখতে পেতো না কেউ- পেছনে কেবল ঝরাপাতার ওড়াউড়ি, ফেল করা বালকের মুখচ্ছবি… [দৌড়, আপন মাহমুদ]

আপন আমার বন্ধু, তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ লিখতে হাত কাঁপে। বিশ্বাস হতে চায় না। যিনি নিজেকে সকলের চেয়ে পিছিয়ে থাকার কথা বলেন, তিনি-ই ১২ সেপ্টেম্বর ২০১২ নতুন একটি দিন শুরু হওয়ার মুখে চলে গেলেন কবি-বন্ধুদের মধ্যে সকলের আগে না ফেরার দেশে, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে! আমাদের কখনই জানা হবে না। আরও বছর বিশেক বেঁচে থাকলে তিনি কি ধরনের কবিতা লিখতেন!

আমাদের মনের পর্দায় আপন আর কখনই বুড়ো হবে না! সারা জীবনই তার কবিতা পঠিত হবে। একজন তরুণ কবির কবিতা হিসেবে। যেমনটা হয় সুকান্ত ভট্টাচার্য, আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শামসের আনোয়ার, ফাল্গুনী রায়, শামীম কবির, সুমন প্রবাহনের মত বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য অকালপ্ৰয়াত কবিদের!

আপনের সঙ্গে কবে প্রথম পরিচয় হয়েছিল কিংবা কে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল ঠিক মনে করতে পারি না। সম্ভবত ২০০৪-এর প্রথম দিকে শাহবাগ আজিজ মার্কেটের দোতলায় শামীমুল হক শামীমের ‘লোক’-লিটলম্যাগ চত্বরের সামনে কিংবা পিজির বহির্বিভাগের সামনে। ওই সময় এই দু’জায়গা ছিল আমাদের প্রথম দশকের কবিদের নিয়মিত মিলনকেন্দ্র।

আপন আমার চেয়ে বয়সে বছর দেড়েকের বড় ছিল, এরপরও ফেরদৌস ভাই বলে সম্বোধন করত। কেন এই সম্বোধন ছিল ঠিক বলতে পারব না। তবে ওর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতে সময় লাগেনি। আর সেই বন্ধুত্ব কতটা গভীর হয়েছিল তার প্রমাণও পেয়েছি বহুবার।

মনে পড়ছে ২০০৪ সালের শেষের দিকে আমি জয়েন করি দৈনিক আজকের কাগজে। ওই সময় কলিগ হিসেবে পাই আপন মাহমুদকে। প্রথমদিন মধ্যরাতে অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় কিভাবে ফিরব এ নিয়ে যখন আমি দ্বিধান্বিত, তখন আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় আপন। তার শাহবাগ, পরিবাগের ছোট্ট বাসায় নিয়ে যায় আমাকে। সেখানে দুইজনের সঙ্গে শেয়ার করে টিনসেডের এক বাসায় থাকত সে।

ভাবতে খুব অবাক লাগে, কবি-বন্ধুদের মধ্যে ঢাকা থাকার জন্য সবচেয়ে স্ট্রাগল করতে হয়েছে আপন মাহমুদকে। জীবিকার সন্ধানে আপন ঢাকা আসে ২০০৪ সালে। আজকের কাগজে চাকরি হওয়ার আগ পর্যন্ত ওর ঢাকায় থাকার কোনো ভালো জায়গা ছিল না, ওকে থাকতে হতো দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে যে ছিল একটি বাড়ির কেয়ারটেকার। আপনকে ওই বাসায় রাতে ঘুমাবার জন্য ঢুকতে হতো লুকিয়ে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে তারপর। এক্ষেত্রে আপন কখনও কখনও রাত একটার আগে ওই বাসায় ঢুকতে পারত না । দেখা যেত গেটের বাইরে পায়চারী করে সকলের শুয়ে পড়ার অপেক্ষায় সময় পার করতে হচ্ছে তাকে। প্রথম দিকে ঢাকায় রাত কাটাবার জন্য এই ছিল যার সংগ্রাম, সে-ই আমাকে নির্দ্বিধায় একরাতের জন্য আশ্রয় দিয়েছিল সেদিন!

২.

আপন মাহমুদ মাঝে মাঝে কথা বলত অনেকটা কবিতা আবৃত্তি করার ঢঙে, মনে হতো যেন কোনো মঞ্চনাটকে সংলাপ দিচ্ছে। ওর এই কবিতা আবৃত্তির ভঙ্গিতে কথা বলা আমাদের কারও কারও কাছে ছিল হাসির খোরাক। তবে এটুকু বুঝতে পারতাম, ওর ওভাবে কথা বলার মধ্যে থাকত তীব্র আবেগ আর বিষগ্নতা। ওই সময় দেখতাম নিজের গ্রাম লক্ষ্ণীপুরের কড়ইতলার কথা বলতে বলতে নস্টালজিক হয়ে উঠছে।

মনে পড়ছে ২০১০ সালে টাঙ্গাইল কবিতা উৎসবে গিয়েছিলাম। আমি আর আপন। ওখানে দেখা হয় দেশের ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবির সঙ্গে। ওই যাত্রাটা আমাদের জন্য ছিল যেমন আনন্দের, তেমনি দুর্ভাগ্যেরও। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুরোটা সময় আড্ডায় আড্ডায় বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে দুপুরের খাওয়ার পর। আড্ডায়-আনন্দে আমরা এতটাই মেতে উঠেছিলাম যে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে শিশুদের জন্য বানানো দোলনায় দোল খেতে থাকি আর লোহার তৈরি পাতে পিছল খাওয়ার চেষ্ট করি। আর এই সময়েই বিপত্তিটা ঘটে। আপনি পা পিছলে পড়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় পা। আমার সেদিন খুব খারাপ লেগেছিল এটা ভেবে, ওই দুর্ঘটনার আগেও ওর মুখে যে প্রাণখোলা হাসি ছিল মুহূর্তেই তা হয়ে উঠেছিল বিষন্ন। আমার সেদিন টাঙ্গাইল থাকার ইচ্ছে থাকলেও ওখানেই আপনের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ওকে নিয়ে ফিরে আসি ঢাকা। এরপর মাসখানেক ভাঙা পা নিয়েই আপনকে অফিস করতে হয়েছিল।

৩.

২০১১ সালে কথাপ্রকাশ থেকে বের হয় আপনের প্রথম কবিতার বই সকালের দাঁড়ি কমা। বইটি খুব সহজেই তরুণ কবিতাপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওই বছরই ১২ ফেব্রুয়ারিতে আপন ইত্তেফাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। মনে পড়ছে ওই সাক্ষাৎকারটি যেদিন ছাপা হয়, আমি সেদিন গিয়েছিলাম মধুপুর শালবনে। ওই দিন হঠাৎ-ই মোবাইলে আপনের কল আসে, জানতে চায় ইত্তেফাক দেখেছি কি-না। ইত্তেফাক পত্রিকাটা যেন অবশ্যই দেখি। ঢাকায় ফিরে পত্রিকাটা দেখব বলে লাইন কেটে দেই। পরে অবশ্য ঢাকায় ফিরে আর পত্রিকা দেখার কথা মনে থাকে না। আপন আমাকে পুনরায় ফোন দিয়ে মনে করিয়ে দেয় পত্রিকাটি দেখার কথা। পরে আমি ওই সংখ্যাটি সংগ্রহ করে দেখি সাক্ষাৎকারে আপন তার প্রিয় বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছিল আমার নাম।

সাক্ষাৎকারটিতেই আপন আরও বলেছিল, “সমকালীন সাহিত্য নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। সাহিত্য নিয়ে যারা রাজনীতি করেন, তারা যত বড় লেখকই হন না কেন আমার চেয়েও খারাপ। লেখক হওয়ার চেয়ে ‘মানুষ’ ভালো। পৃথিবীর জন্য ভালো মানুষ দরকার।”

পৃথিবীর জন্য যে ভালো মানুষের প্রয়ােজনের কথা আপন বলেছিলেন, তা আসলে আপন নিজেও যেন হতে চেয়েছিলেন। কোনো সাহিত্যিক কেওয়াজে তাকে কখনও দেখা যায়নি। তবে সমসাময়িক অনেক সাহিত্যিক কোন্দলই আপনাকে যে মানসিকভাবে পীড়িত করেছিল এটা তার উক্তি থেকেই টের পাওয়া যায়!

আজ নিশ্চয় প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আপনের কবিতার! কেননা, আপন আজ জাগতিক সব হিসাব নিকাশের ঊর্ধ্বে। ‘কবিতার প্রকৃত মূল্যায়ন’ কথাটার মধ্যে হয়ত ভারিক্কি চাল আছে, যা হয়ত ৩৬ বছর বয়সী আপনের সাথে ঠিক খাপ খায় না। এরপরও আজ যখন আপন নেই তখন আর তার কবিতার প্রকৃত মূল্যায়নের কথা বলতে দ্বিধা নেই। একজন কবি যতক্ষণ দৈহিকভাবে বেঁচে থাকেন ততক্ষণ প্রতি মুহূর্তেই সম্ভাবনা থাকে নিজেকে নিত্য-নতুনভাবে কবিতার নানা দ্যোতনায় তুলে ধরার। প্রয়োজন হয় অসংখ্য প্রত্যাখ্যানকে উপেক্ষা করার। কিন্তু কবি যখন প্রয়াত হন, যখন থেমে যায় তার কাজ তখনই শুরু হয় তার কবিতার প্রকৃত বিচার যেখানে ব্যক্তিগত শক্রতা কিংবা মিত্রতা সবই অপ্রাসঙ্গিক!

আপনের সকালের দাঁড়ি কমা বইটি শুরু হয়েছে ‘মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়া’ শিরোনামের সিরিজ কবিতা দিয়ে। এ সিরিজে কবিতা রয়েছে ১০টি। কবিতাগুলি পাঠ করলে স্পষ্ট টের পাওয়া যায় একজন কবি নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিতে ধারণ করে, স্মৃতির সাথে চিন্তাকে মিলিয়ে দিয়ে তাকে কিভাবে কবিতায় রূপান্তর করেন। টের পাওয়া যায় একজন কবি কতটা অনুভূতিশীল আর আবেগপ্রবণ হলেই কেবল লিখতে পারেন এরকম কবিতা –

মায়ের উদ্দেশে বাবা যে চুমুটা ছুড়ে দিয়েছিলেন বাতাসে

শুনেছি, সেই হাওয়াই চুমুটা থেকেই জন্ম নিয়েছিল

পৃথিবীর প্রথম প্রজাপতি

মা,পৃথিবীর যেকোনো নারী থেকে যাকে কখনোই আলাদা করা

যায় না- তাকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত-বিভ্রান্ত সেই প্রজাপতিটার

ডানা থেকে যখন টুপটাপ ঝরে পড়ছিলো রঙের আকুতি- রঙের

সেই অপচয় ঘোচাতেই সম্ভবত জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর আর

সব প্ৰজাপতির

(মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়া-১)

‘মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়া’ কবিতায় খুব সাবলীলভাবে উঠে আসে একজন মায়ের সাথে সম্পর্কিত সম্পূর্ণ জগত, যেখানে রয়েছে মায়ের প্রতি বাবার প্রণয় অনুভূতির কথা, মায়ের প্রতি সন্তান হিসেবে তার শৈশব স্মৃতিসহ নিজস্ব অনুভূতির কথা, একজন নারী হিসেবে দূর-গ্রামে বসবাসরত মায়ের অভিজ্ঞতার সরল চিত্র। কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে আমাদের ভয় হয়, মাকে নিয়ে লেখা আপন মাহমুদের এ সিরিজটি কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত ক্লিশে হয়ে যাবে, কেননা কেবল বাংলা সাহিত্যে নয় সারা পৃথিবীর সাহিত্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমান কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে মাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পাঠশেষে মনে হয়, আপন মাহমুদ সফলতার সাথেই উৎরে গেছেন কবিতাটিকে প্রচলিত ধারার বাইরে নিয়ে গিয়ে আলাদা মাত্রা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ‘মা’কে কেন্দ্র করে লেখা প্রচলিত কবিতাগুলির অধিকাংশেই থাকে মাতৃবন্দনা, এখানে একরৈখিক মাতৃবন্দনা নয়, রয়েছে মাকে সামনে রেখেই একজন সন্তানের জগত সম্পর্কে নিজস্ব ধ্যান-ধারণার বয়ান ।

বইয়ের অন্যান্য কবিতাগুলোতেও টের পাওয়া যায় একজন কবির শৈশবের দেখা গ্রাম, বাল্যস্মৃতি, কুয়াশা, মৃতনদী, ব্যক্তিগত প্রেম, সম্পর্কের ভেতরের আত্মদ্বন্দ্বসহ বিচিত্র বিষয়। আপন মাহমুদ তার কোনো কবিতাতেই প্রচলিত ছন্দের পথ ধরে হাঁটেননি। তিনি কথার মধ্যে বিচিত্র চিত্রকল্প ঢুকিয়ে দিয়ে কথাকে কবিতায় পরিনত করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন সহজাত আবেগময় অনুভূতিকে ছেটে না ফেলে গভীরভাবে স্থান দিতে, যা আমাদের ভেতরের কোমল অনুভূতিকে অনেক সময় স্পর্শ করে। এরকম আবেগময় অনুভূতিই তাকে দিয়ে সাবলীলভাবে উচ্চারণ করিয়ে নেয় কিছু সহজ সত্য –

বস্তুত, কতগুলো মৃত নদীতেই আজন্ম সাঁতরায় মানুষ, কতগুলো ভুল মানুষ আর ভুল সম্পর্কের যোগফলই মানুষের প্রাপ্তি (সাঁতার)

৫.

সকালের দাঁড়ি কমা বইটি প্রকাশের পর আপন বেশ কিছুদিন খুঁজছিলেন কবিতার নতুন পথ। বেরুতে চেয়েছিলেন প্রথম বইয়ের ঘোর থেকে। অন্যরকমের কিছু কবিতাও লিখেছিলেন। মৃত্যুর মাস-তিনেক আগে আপনের সাথে কালের কণ্ঠের অফিসে দেখা হলে আমাকে বলেছিলেন ‘হাত তুলেছি সাব এডিটর’ নামে একটি কবিতার বই করবেন। ওই বইয়ের জন্য লেখা কিছু কবিতাও শুনিয়েছিলেন সেদিন। বিচ্ছিন্নভাবে সেখানকার কোনো কোনো কবিতা ছাপাও হয়েছিল কয়েক জায়গায়। একটি কবিতা হচ্ছে এরকম –

এইমাত্র একটি বকুল ফুলের অহেতুক- মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতের ডাক নাম পতনমুখী। মহাকাল থেকে দূরে, ছুটিপুর নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের পরিছন্ন কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছেনি।

বকুলতলা প্রতিনিধি জানান, বড় বোন শেফালি-বিউটিদের সঙ্গে কলিবেলা থেকেই পতনমুখীর খোলাখুলি সম্পর্ক ছিল। যারা মনে করতো ; সেই-ই প্রকৃত ফুল, রঙিন তরুণ-তরুণীদের মনে সৌন্দর্য ও সুগন্ধিবিষয়ক বিভ্রান্তি ছড়ানােয় যার ভূমিকা থাকে অথবা পুস্পকুড়ানিদের হাত হয়ে শাড়িঘেরা মেয়েদের খোঁপায় ঝুলতে পারার মধ্যেই বকুল-জীবনের সার্থকতা। ধারণা করা হচ্ছে, বড়দের কাছে খোপায় বুলাও বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রেরণা নিয়েই পতনমুখীর বেড়ে ওঠা। কিন্তু ঘটনার সময় আকাশে জোছনার দুর্ভাগ্যক্রমে; একজন অজ্ঞাত পরিচয় নিশাচর। ওই সময় বকুলতলায় পায়চারি করছিলেন। যার পদপিষ্ট হয়ে পতনমুখী নামে ওই বকুল-বালিকার অকাল মৃত্যু হয়। ড্যাফোডিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রশাসনের চোখে হত্য ও আত্মহত্যা সমান অপরাধ। কেননা, দুটাে ঘটনায়-ই আমাদেরকে লাশ উদ্ধার করতে হয়। অভিযোগ পেলে রাত জাগার অপরাধে নিশাচরদের বিরুদ্ধেও ক্রসফায়ারের গল্প লিখা হবে।

[হাত তুলেছি সাব-এডিটর, সপ্তসিন্ধু ২৬ মার্চ ২০১২ সংখ্যা]

কবিতাগুলিতে আপন চেয়েছিল দীর্ঘদিন তার মফস্বল ডেস্কে কাজ করতে গিয়ে যে সমস্ত মফস্বলীয় সংবাদ এডিট করতে হয়েছে সেই অভিজ্ঞতা তুলে আনতে। কে লিখবে আজ আপনের না-লেখা কবিতাগুলো! মৃত্যুর মাস তিনেক আগে থেকে আপন মেডিটেশন করতে শুরু করেছিল। ওর হার্টে সমস্যা ছিল, ওর বাবা ক্যানসারের রোগী, মা অসুস্থ অথচ গোটা পরিবার নির্ভরশীল ছিল ওর একার আয়ের উপর। আপনের ধারণা হয়েছিল মেডিটেশন করে নিজের রোগ ভালো করবে এবং দূর করতে পারবে জীবনের সমস্ত ভার!

আপন আজ শুয়ে আছেন তার প্রিয় গ্রামের মাটিতে। আপনের লেখাগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন হােক এটাই কামনা করছি।

[সৌজন্যে : ‘লোক’, বর্ষ ১৩, সংখ্যা ১৬, নভেম্বর ২০১২]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close