Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ আবুল কাসেম / জটিলতার জ্যামিতি : কাওয়াবাতা, ওয়ে ও রবীন্দ্রনাথ

আবুল কাসেম / জটিলতার জ্যামিতি : কাওয়াবাতা, ওয়ে ও রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশঃ February 2, 2017

আবুল কাসেম / জটিলতার জ্যামিতি : কাওয়াবাতা, ওয়ে ও রবীন্দ্রনাথ
0
0

 

আবুল কাসেম / জটিলতার জ্যামিতি : কাওয়াবাতা, ওয়ে ও রবীন্দ্রনাথ

 

কেনজবুরো ওয়ের নোবেল বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘জাপান দ্য অ্যামবিগিইউআস অ্যান্ড মাইসেলফ।’ এই বক্তৃতার মাঝখানে তিনি সাহিত্যে জাপানের প্রথম নোবেল বিজয়ী কাওয়াবাতা সম্পর্কে বেশকিছু কথা বলেছেন। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার নোবেল বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘জাপান, দ্য বিউটি অ্যান্ড মাইসেলফ।’ জাপানি ভাষা থেকে বক্তৃতাটি অনুবাদ করেছিলেন আমেরিকার অত্যন্ত নামকরা এক জাপানি সাহিত্য বিশারদ। ইংরেজি বক্তৃতাটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর, তবে অস্পষ্ট, কেনজাবুরোর ভাষায়, ভাসা ভাসা, জাপানি ভাষায় একে বলে ‘অ্যাইমেইনা’। এই জাপানি বিশেষণটির অনেক প্রতিশব্দ রয়েছে ইংরেজি ভাষায় এবং নানাভাবে ব্যবহৃতও হয়। ক্যানজাবুরো ওয়ে মনে করেন, অস্পষ্টতা বা ভাসা-ভাসা ভাবটি কারওয়াবাতার বক্তৃতার নামকরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এটা অনূদিত হতে পারত ‘মাইসেলফ অব বিউটিফুল জাপান’ শিরোনামে।  পুরো অস্পষ্টতাটা এসেছে জাপানি ‘নো’ সাহিত্যের ‘আমি’ এবং ‘সুন্দর জাপানে’র যোগসূত্র থেকে। অনুবাদক বিষয়টা ধরতে পারেননি। এরকম একটি শিরোনামের ভেতর যে অনন্য রহস্যময়তা রয়েছে, তা শুধু জাপান নয়, পুরো প্রাচ্যচিন্তাকে ঘিরেই রহস্যটা ঘনীভূত হয়ে আছে।

এবার দেখা যাক, অনন্য রহস্যময় জিনিসটা কী। কাওয়াবাতার ঝেন বৌদ্ধমতবাদের প্রতি যে একাগ্রতা ছিল, ক্যানজাবুরো ওয়ে তাকেই অনন্য রহস্যময় ব্যাপার বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ শতকের লেখক হয়েও কাওয়াবাতা প্রাচীন মধ্যযুগের ঝেন সন্ন্যাসীর লেখা কবিতাকেই কেন নোবেল বক্তৃতায় উপস্থাপন করলেন? এই কবিতাগুলোর গভীরে যে সত্য নিহিত আছে, ভাষাগতভাবে তা প্রকাশ করা অসম্ভব। পাঠক কখনো আশা করতে পারেন না যে কবিতাগুলোর ভাব হৃদয়াঙ্গম করা যাবে। কবি বা এই ভাবধারার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বলে না দিলে ঝেন কবিতাগুলোর মর্মার্থ উদ্ধার করা মোটেই সম্ভব হবে না।

কেনজাবুরোর মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন কাওয়াবাতা এ রকম দুর্বোধ্য কবিতার কথা, যা কেবল দীক্ষিত ব্যক্তিরাই বুঝতে পারেন, স্টকহোমের শ্রোতাদের সামনে বলতে গেলেন? উত্তরটা তিনি নিজেই দিয়েছেন। বলেছেন, কাওয়াবাতার অসাধারণ কর্মজীবনে অতীত বিধূরতার সাহসী বিচরণ সবসময় লক্ষ করা গেছে এবং তিনি তাঁর অতীতচারী ধর্মবিশ্বাসের কথা অকপটে স্বীকারও করেছেন। কয়েক দশক ধরে কাওয়াবাতা একজন অন্তপ্রাণ তীর্থযাত্রী ছিলেন এবং তখন তিনি তাঁর সেরা গ্রন্থগুলো রচনা করেন। তীর্থযাত্রার বেশ ক’বছর পর তিনি স্বীকার করেছেন, কেন তিনি অনধিগম্য এই জাপানি কবিতার প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আর স্টকহোমের শ্রোতাদেরও বিপাকে ফেলে দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন কোন জগতে তিনি বাস করেন। তার নোবেল বক্তৃতার শেষ কথাগুলো এরকম : “আমার সৃষ্টকর্মগুলোকে ‘শূন্যতা’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু তা কোনোক্রমেই পাশ্চাত্যের নাস্তিবাদ নয়। আধ্যাতিœকতার ভিত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডোজেন ঋতু সম্পর্কিত কবিতার নাম দিয়েছেন ‘অন্তর্গত বাস্তবতা।’ তিনি গান করে যখন ঋতুর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলতেন, তখন ঝেন বৌদ্ধ মতাদর্শের গভীরতর পরিচয় ফুটে উঠতো। কাওয়াবাতার এই কথারই মূল্যায়ন করেছেন কেনজাবুরো ওয়ে। তিনি বলেছেন, এখানে আমি একজন সাহসী ও সৎ আত্মঅধিকার সম্পর্কে সচেতন লেখককে সনাক্ত করতে পারি, যিনি নিজেকে নীতিগতভাবেই ঝেন দর্শনের ঐতিহ্যিক স্বত্তাধিকারী বলে জ্ঞান করছেন এবং প্রাচ্যের চিরায়ত সাহিত্যের ভাবসৌন্দর্যকে সকলের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিত্যাপ্ত করে দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের নাস্তিবাদের সঙ্গে নিজের সাহিত্যে আরোপিত ‘শূন্যতার’ মতবাদকে আলাদা করে উপস্থাপন করেছেন।

তবে কেউ কেউ বর্তমানে বাস করে অতীতের দুর্বোধ্য বা তিক্ত কোনো কিছুকে ভাগাভাগি করতে কিংবা মস্তিষ্কে ধারণ করতে চান না। কেনজাবুরো ওয়ে সম্ভবত এজন্যই বলেছেন, আইক্যান নট আটার ইন ইউনিসন উইথ কাওয়াবাতা, দ্য ফ্রেইজ, জাপান, দ্য বিউটিফুল অ্যান্ড মাইসেলফ।

কাওয়াবাতার সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল ছাত্রাবস্থা থেকেই। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে চার বছর ধরে বন্ধ থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা ‘শীন-শিচো’ (নিউ টাইড অব থট) পুনঃপ্রকাশ করেন এবং তাতে ‘শোকনসাই ইক্কেই’ শিরোনামে একটি গল্প লেখেন। গল্পটি ইয়াসুকুনি উৎসব নিয়ে। এটি ১৯২১ সালের কথা। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ফ্যাকাল্টি পরিবর্তন করে সাহিত্য বিভাগে চলে আসেন এবং জাপানি উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে স্নাতক পর্যায়ে গবেষণাপত্র রচনা করেন। ১৯২৪ সালের অক্টোবর মাসে কয়েকজন তরুণ লেখককে সঙ্গে নিয়ে নতুন সাহিত্য পত্রিকা ‘দ্য আর্টিস্টিক এজ’ প্রকাশ করেন যার মূল কথা ছিল প্রাচীনপন্থী জাপানি লেখকদের পথ মাড়িও না। এটা ছিল মূলত ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ আন্দোলনের মুখপত্র। তাতে ইউরোপীয় প্রকাশবাদের প্রভাব সুষ্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় এবং কাওয়াবাতা ও ইয়োকোমিতসু তাদের দর্শনকে এ পত্রিকার মাধ্যমেই প্রচার করেন, যার মূল ভাবাদর্শ ছিল ‘নিউ ইমপ্রেশনিজম’।

স্নাতক হবার পরপরই বেশকিছু গল্প লিখে নাম করে ফেলেন কাওয়াবাতা। তার একটি গল্প ‘দ্য ড্যান্সিং গার্ল অব ইজো।’ এটি এক বিষন্ন ছাত্রের গল্প। ছাত্রটি একদিন ইজো পেনিনসুলায় হেঁটে যাচ্ছিল। সেখানে এক তরুণী নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখান থেকে সে টোকিওতে ফিরে গেল উচ্ছ্বাসময় উৎকর্ষ এক ভাবনা নিয়ে। তরুণটির মনে জ্ঞানানুসন্ধানের প্রবণতা দেখা দেয়। বিষন্নতা কাটিয়ে সে একটা দারুণ ভাবাবেগ অনুভব করে। অম্লমধুর প্রেম-উপলদ্ধির মধ্যে সে সুখ খুঁজে পায়।

কাওয়াবাতার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস স্নো কান্ট্রি। দীর্ঘ সময় নিয়ে লেখা। ১৯৩৪-এ শুরু, কিস্তিতে ছাপা শেষ হয় ১৯৪৭ সালে। স্নো কান্ট্রি হচ্ছে এক কঠিন প্রেমের গল্প। পাত্র টোকিওর এক কাব্য ও সঙ্গীতের অনুরাগী ব্যক্তি কিন্তু এসবের গভীর জ্ঞান তার মধ্যে নেই। পাত্রী প্রাদেশিক এক বাইজি। উত্তর জাপানের পাহাড়ঘেরা সুদূর ছোট্ট শহরে কোনো এক বসন্ত দিনে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এ উপন্যাস কাওয়াবাতাকে বিশিষ্টতম লেখকের আসনে বসিয়ে দেয়। আর উপন্যাসটিকে দেয়া হয় চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা। ই. জি. সেইডেনস্টাইকারের ভাষায়, ‘পারহ্যাপস কাওয়াবাতাস মাস্টারপিস’ এটা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কাওয়াবাতা সাফল্যের সঙ্গে লেখা চালিয়ে যান। প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত উপন্যাস থাউজেন্ড ক্রেইনস, দ্য সাউন্ড অব দ্য মাউন্টেইন, এবং দ্য ওল্ড ক্যাপিটাল। কাওয়াবাতার যুদ্ধোত্তর উপন্যাসগুলোর মধ্যে থাউজেন্ড ক্রেইনস (১৯৪৯-১৯৫১) এবং দ্য সাউন্ড অব দ্য মাউন্টেইন (১৯৪৯-১৯৫৪) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থাউজেন্ড ক্রেইনস বা হাজার সারসের জাপানি পরিভাষা হচ্ছে ‘সেমবাঝুরু’। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে ব্যর্থপ্রেম। আশাহত প্রেমিকের দু:খবেদনা। তবে উপন্যাসটি লালিত হয়েছে জাপানের ঐতিহ্যবাহী চা উৎসবকে কেন্দ্র করে। জাপানের উজি সিটিতে প্রতিবছর আগস্ট মাসে চা উৎসব হয়। শতশত বছর ধরে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উৎসবে চা পান করা হয় দেশীয় ঐতিহ্যে। এমনিতে সারা বছরই লক্ষ লক্ষ পর্যটক উজিতে চা পানের ঐতিহ্যবাহী কুটিরগুলোতে আতিথ্যগ্রহণ করে। এই চা উৎসব উপন্যাসটির এক সুন্দর পটভূমি রচনা করেছে। তবে তাতে বর্ণিত হয়েছে নিষিদ্ধ এক প্রেমের গল্প, যা হতাশা ও ব্যর্থতার। কিন্তু উপন্যাসের নায়ক পরলোকগত পিতার উপস্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়। তার মৃত্যুর পর আকৃষ্ট হয় তার কন্যার প্রতি, তবে সেই কন্যা তার কাছ থেকে পালিয়ে যায়। এখানে একটি চিরন্তন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতীকের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেটা হলো চায়ের উপকরণগুলি চিরন্তন, কিন্তু মানুষ ক্ষণস্থায়ী এবং দ্রুতগামী।

দ্য সাউন্ড অব দ্য মাউনটেন উপন্যাসেও একই থিম বা ভাবের প্রকাশ ঘটেছে। আকারে ইঙ্গিতে নিকটজনদের নিষিদ্ধ কদর্য প্রেমের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। আবার মৃত্যুর কাছাকাছি গেছে মানুষ। পটভূমি কাওয়াবাতার নিজের শহর কামাকুরা। নায়ক একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। সন্তানদের ওপর হতাশ এবং ক্ষুদ্ধ। স্ত্রীর প্রতি সকল আকর্ষণ হারিয়েছেন। পক্ষান্তরে প্রবলভাবে পুত্রবধুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। তাকে সে তার মৃত ভাবী, যার সঙ্গে তার অবৈধ সর্ম্পক ছিল, সেই সম্পর্কের সরস পরাকীর্ণ স্মৃতিকথা ও গল্প বলে আকৃষ্ট করতে চাচ্ছেন। কথার মধ্যে ভোগাসক্তির মাদকতা। একই ভোগ চিন্তা। ইঙ্গিত ইশারা।

কাওয়াবাতা নিজে যে উপন্যাসটিকে চমৎকার বলে বিবেচনা করেছেন সেটি হল দ্য মাস্টার অব গো। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত বইটি তাঁর অন্যসব বই থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাতে বর্ণিত হয়েছে মেজর গো-এর ১৯৩৮ সালের এক প্রতিযোগিতার অর্ধকল্প-কাহিনি। কাওয়াবাতা ‘মেইনিচি’ পত্রিকায় এ বিষয়ের ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদনও পাঠিয়েছেন। এটা ছিল মাস্টার শোশেইয়ের জীবনের শেষ খেলা এবং তাতে তিনি তার চেয়ে বয়সে ছোট প্রতিদ্বদ্বীর কাছে হেরে যান এবং এক বছর পর মারা যান। উপন্যাসটির গল্পে আছে চরম পরিণতিসূচক দ্বন্দ্ব, কোনো কোনো পাঠক মনে করেন এটি দ্বিতীয় (বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের সমান্তরাল) একটি প্রতীকী উপস্থাপনা।

আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় কাওয়াবাতা আতœহত্যা করেছেন (১৯৭২)। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজনেরা, বিশেষ করে স্ত্রী মনে করেন স্রেফ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। এক গবেষণায় ডোনাল্ড রিচি বলেছেন, গোসলের জন্য পানি গরম করতে গিয়ে ভুলক্রমে গ্যাসটেপে দুর্ঘটনা ঘটে। তার আত্মহত্যার ব্যাপারে নানা গল্পের জন্ম হয়েছে। কেউ বলেছেন, তিনি রুগ্নস্বাস্থ্যের কারণে (পারকিনসনস রোগাক্রান্ত) আত্মহত্যা করতে পারেন, কেউ কেউ বলেছেন, খুব সম্ভব অবৈধ প্রেমে পড়ার জন্য আত্মহত্যা করেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন, বন্ধু লেখক মিশিমার আত্মহত্যার (১৯৭০) কথা ভেবে ভেবে তিনি নিজেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তবে তিনি আত্মহত্যার কোনো নোট রেখে যাননি।

যৌবনদীপ্ত কাওয়াবাতা ছাত্রজীবন থেকেই জাপানি সাহিত্যের গতানুগতিক ধারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু শেষ জীবনে প্রথাগত ঝেন ধ্যানধারণায় এতটাই আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে, নোবেল বক্তায়ও তার বড় রকমের প্রতিফলন ঘটেছে। তাতে জাপানের ধ্যানধারণার ঐতিহ্যিক দিকটার পরিচয় পাওয়া গেছে গভীরভাবে। কাওয়াবাতা তাকেই জাপানের মহিমা বলে মনে করেছেন।

কেনজাবুরো তার স্বদেশী কবি কাওয়াবাতার আধ্যাতিœক কবিতার মধ্যে অস্পষ্টতা লক্ষ করেছেন। একথা তিনি নিজেই বলেছেন তার নোবেল বক্তৃতায়। বলেছেন ব্যক্তিগতভাবে তিনি এ-পথের যাত্রী নন, তার বিচরণের ক্ষেত্র ভিন্ন। তার বক্তব্যের শিরোনামে দ্য অ্যামবিগিউয়াস শব্দটি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই শব্দের বাংলা পরিভাষা অনিশ্চিত অর্থ অথবা দ্ব্যর্থবোধকতা।

প্রখ্যাত ব্রিটিশ কবি ক্যাথলীন রেইন একবার  উইলিয়াম ব্ল্যাক সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি অত অস্পষ্ট নন, যতটা দ্ব্যর্থবোধক। কেনজাবুরো জীবনের গভীরতর সত্যকে এভাবেই খোঁজ করেছেন এবং নোবেল বক্তৃতায় বলেছেনও যে, আমার সম্পর্কে এর (জাপান, দ্য অ্যামবিগিউয়াস অ্যান্ড মাইসেলফ) অন্যথা হবার সুযোগ নেই। আধুনিকতার একশ বিশ বছর পর বর্তমানে জাপান দ্ব্যর্থকবোধের সুমেরু-কুমেরুতে অবস্থান নিয়েছে। একজন লেখক হিসেবে এই মেরুকরণ তার হৃদয়ে ক্ষত চিহ্ন সৃষ্টি করেছে। কেন এ মেরুকরণ?

এই অনিশ্চিত দ্ব্যর্থক বা দোটানার ব্যাপারটা খুবই শক্তিশালী এবং অনুধাবন করে মনে হয় যে রাষ্ট্র এবং তার জনগণকে স্পষ্টতই নানাভাবে ভেঙে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। আধুনিক জাপানের জন্ম হয়েছে পাশ্চাত্যকে জেনে এবং অনুকরণ করে। তবে জাপানের নিজস্ব একটা শক্তিশালী ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি রয়েছে। জাপান এশিয়া তথা প্রাচ্যের দেশ। বুদ্ধিজীবীদের মতে, আধুনিক জাপানের পাশ্চাত্যপ্রীতি একত্রে তাড়িত পশুপালের ওপর যেন হায়েনার হামলা। এশিয়ার বাকি দেশগুলো থেকে জাপান নানা কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, রাজনৈতিকভাবে যেমন, তেমনি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবেও।

তবু জাপানের আধুনিক সাহিত্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর লেখকদের অবদানকে খাটো করে দেখা চলে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে এরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আশায় বুক বেঁধে জাপানের পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখেছেন। বুকে একটা প্রবল ব্যথা নিয়ে এরা দেখেছেন এশীয় দেশগুলোয় জাপানি সৈন্যদের বর্বরতা কতবড় অমানবিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এটা উপলদ্ধি করে এরা পাশ্চত্যের উন্নত দেশগুলোই নয় আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গেও জাপানের একটি সেতুবন্ধন রচনার প্রয়াস নিয়েছেন। এরা ভেবেছেন বাকি বিশ্বের সঙ্গে এভাবেই বিরোধ দূর করে মানবিক বন্ধুত্ব পুনঃস্থাপন সম্ভব হবে। কেনজাবুরো ওয়ে উচ্চাকাক্সক্ষা পোষণ করে বলেছেন যে, দৃঢ়ভাবে লেগে থাকলে ঐতিহ্যগতভাবে ওই সব লেখকের উত্তরসূরী হিসেবে তাদেরও লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে। জাপানে রাষ্ট্রীয় কিংবা জনসাধারণের আধুনিকতা-উত্তর অবস্থান পরস্পর বিরোধী, যদিও মনে হবে সাদৃশ্যপূর্ণ। জাপানের আধুনিকতার ঠিক মাঝখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসে আধুনিকতাটাকেই বিপথগামী করে তুলেছিল। এই যুদ্ধে পরাজয় হয় ছয় দশকেরও বেশি আগে, তবে উপযুক্ত সময়ে, নিজেদের পুন:প্রতিষ্ঠা করতে একটি সুযোগ এসে ধরা দিয়েছে। বিপর্যস্ত এবং পীড়াদায়ক দুর্ভোগের মধ্য থেকে যুদ্ধোত্তর জাপানের একশ্রেণির ঋদ্ধ লেখক সেই সুযোগটা গ্রহণ করেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হয়ে জাপানিরা নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে যে নৈতিকতার আশ্রয় গ্রহণ করে তার মূলে রয়েছে গণতান্ত্রিক মতাদর্শ এবং কখনো যুদ্ধে না জড়াবার সংকল্প। এটা আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও সত্যবর্জিত নয়, কারণ জাপানি জনগণ এবং রাষ্ট্র যে নীতির ওপর ভর করে আছে, তা নিষ্কলুষ নয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ওপর হামলার ইতিহাসে রঙিন কাগজ দিয়ে ঢেকে দেয়ার পরও হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক হামলায় মৃত ও আহত কিন্তু বেঁচে যাওয়া লোকেদের প্রতিচ্ছবি সেই নীতি-আর্দশের আশ্রয়কে মাঝে-মধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়।

২০১৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নপ্রাপ্ত দেশ ছিল জাপানও। এক জাপানি মহিলার আবেদনের প্রেক্ষিতে নোবেল কমিটি তা বিবেচনায় নেয়। বিবেচনার বড় কারণ এই যে, জাপানের সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, জাপান আর কখনো যুদ্ধে জড়াবে না, যা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভের অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু জাপানের আবে সরকার এবং তাদের মিত্ররা জাপান যাতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না পায়, সেসজন্য তৎপরতা চালায়। জাপান সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংবিধান সংশোধন করে যুদ্ধের দুয়ার খুলে দেয়া। আপাতদৃষ্টিতে এই সম্ভাবনাই প্রবল। সংবিধান সংশোধন করা হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভূমিকার কথাই বড় করে সামনে আসবে। তাতে জাপানের ভাবমূর্তি এবং বুদ্ধিজীবী ও রলখক-সাহিত্যিকগণ নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন। সম্প্রতি জাপানের বিশ্বময় জনপ্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামী তো বলেছেনই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আগ্রাসনের দায় উপেক্ষা করছে জাপান।

কেনজবুরো তার নোবেল বক্তৃতায় পাশ্চাত্যের একজন কবির কথা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আধ্যাতিœক ঘনিষ্ঠ সম¦ন্ধ বা তীব্র অনুরাগ ও আসক্তি অনুভব করি নোবেল বিজয়ী আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের কবিতার সঙ্গে। তার  মতে, উইলিয়াম ব্ল্যাক, যার লেখা ইয়েটস পুনর্মূল্যায়ন করেছেন এবং অধিক উচ্চতায় টেনে তুলেছেন, তার কবিতা এই শতাব্দীর ইউরোপ ছাড়িয়ে এশিয়া-চীন-জাপান সর্বত্র আলো ছড়িয়েছে। ইয়েটস কেনজাবুরোর ওপর এতটা প্রভাব বিস্তার করেছেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে লেখা একটি ট্রিলজির নামকরণ করেছেন ইয়েটস এর কবিতা ‘ভেনিলেশন’ থেকে শব্দ চয়ণ করে। নাম দিয়েছেন – অ্যা ফ্লেমিং গ্রীন ট্রি। ইয়েটসকে তার পছন্দ করার অনেক কারণ আছে। ফরাসি সাহিত্যে পড়ালেখা করতে গিয়ে পুরো ইউরোপীয় সাহিত্যে উৎসাহী হয়ে ওঠা তার পক্ষে মোটেও বিচিত্র ছিল না।

তবে ইয়েটসকে প্রাচ্যের মানুষ যে কবির জন্য বেশি চেনে তিনি এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঈশ্বরকে নিবেদিত রবীন্দ্রনাথের আধ্যাতিœক ভাবের কবিতাগুলো (মূলত গান) ইয়েটসকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। আধ্যাতিœক ধ্যানজগতে ইয়েটসের পথনির্দেশক রবীন্দ্রনাথ, একথা বললে বোধহয় খুব ভুল বলা হবে না। নোবেল বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘স্পিরিচুয়াল হিউমেনিটি’র কথা বলেছেন। প্রাচ্যকে  তিনি এর জননী বলে দাবি করেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নোবেল বক্তৃতায় কোনো মরমী বাউল বা লোকগানের আধ্যাত্মিক ও মানবিক মর্মবাণী উচ্চারণ করেননি। রবীন্দ্রনাথ কেন তা করেননি, বলা মুশকিল। কিন্তু ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্য রিলিজিওন অফ ম্যান বক্তৃতায় মরমী কবি হাছন রাজার গানের দর্শন ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “ইট ইজ আ ভিলেজ পোয়েট অফ ইস্ট বেঙ্গল হু ইন হিজ সঙস প্রিচেস দ্য ফিলসফিক্যাল ডকট্রিন দ্যাট দ্য ইউনিভার্স হ্যাজ ইটস রিয়ালিটি ইন ইটস রিলেশন টু দ্য পারসন।”

আরেক বাউল কবি ও সাধক লালন শাহের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অন্তরের গভীর আবেগ কারো অজানা নয়। রবীন্দ্রনাথের তাত্ত্বিক জীবনদর্শন এবং আধ্যাত্মিক ভাবনায় এই বাউলের কম-বেশি প্রভাবের কথা সবাই জানেন। রবীন্দ্রনাথ যে কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন, ভাবগত চারিত্রিক সমমর্মিতার দিক থেকে মরমী ও বাউল কবিদের ভাবলোক তাতে প্রতিভাত। স্পিরিচুয়াল হিউমিনিটির কথা যদি বলতেই হয় লালন এবং হাছনের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায়। প্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথ এই দুই লোকপ্রতিভাকে যেভাবে আত্মীকরণ করে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তা বিস্ময়কর।

কিন্তু প্রাচ্যের আধ্যাতিœক ভাবসৌন্দর্য যার কবিতায় প্রথম দেখেছে পাশ্চাত্যবিশ্ব সেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কেনজাবুরো একটি উক্তিও করেননি। প্রাচ্যে কবিতার ভাবসৌন্দর্যে আধ্যাতিœকতার গুরুত্ব অসীম।

রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির গানগুলোর মাধ্যমেই ইয়েটস, রোদেনস্টাইনসহ পাশ্চাত্যের কবি-শিল্পীরা প্রাচ্যের আধ্যাতিœক ভাবধর্মী কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার পেছনে ইয়েটস এবং রোদেনস্টাইনের ভূমিকার কথা কে না জানে?

তবে ইয়াসুনারী কাওয়াবাতা নোবেল পুরস্কারের ভোজ-বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করে বলেছেন, আলফ্রেড নোবেল বিভিন্ন ভাষায় কবিতা এবং গদ্যচর্চা করতেন, সে কারণেই বোধহয় বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদেরও তিনি পুরস্ফৃত করতে চেয়েছেন। আজ (১৯৬৮) থেকে পঞ্চান্ন বছর আগে প্রাচ্যের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পুরস্কার পেয়েছিলেন, যা এশিয়ার জন্য আত্মশ্লাঘার ব্যাপার।

আঠার বছর বয়সে দীর্ঘ এক রেলপথ পাড়ি দিয়ে কেনজাবুরো টোকিও আসেন। পরবর্তী বছরগুলোয় টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি সাহিত্যে লেখাপড়া করেন। এই সময় ফরাসি বিপ্লব ও রেনেসাঁ সাহিত্য এবং তার প্রফেসর ওয়াতানাবের প্রভাব তার মধ্যে দারুণ এক পরিবর্তন এনে দেয়। পরবর্তী জীবনে এবং সাহিত্যে, এমনকী তার নোবেল বক্তৃতায় প্রফেসার ওয়াতানাবে আশ্চর্য এক স্থান দখল কওে আছেন।

১৯৫৭ সালে কেনজাবুরো ওয়ে লেখালেখি শুরু করেন। তখনও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি সাহিত্যের ছাত্র। সেই সময় তিনি ছোটগল্প লিখতেন। ‘দ্য ক্যাচ’-এর জন্য আকুতাগাওয়া পুরস্কার পেয়ে যান। ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে তার কয়েকটি গল্প এবং উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে বাড নিপ্পিং, ল্যাম্ব সুটিং, লেভিস আর দ্য ডেড উল্লেখযোগ্য। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তার টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন কাটানো দিনগুলো নিয়ে লেখা  উপন্যাস দ্য ইয়ুথ হু কেম লেইট। এই উপন্যাসে জাপানের ওপর আমেরিকার দখলদারীত্বের কালো ছায়া সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিফলিত।

প্রায় সব উপন্যাসে কেনজাবুরো জ্ঞাত তথ্যাদির মানদণ্ডে অজ্ঞাত বিষয়ের মূল্যবিচার করেছেন। তার এ পারসনাল ম্যাটার (১৯৬৪) উপন্যাসে নিজের প্রতিবন্ধী পুত্রের জন্মলাভকে কেন্দ্র করে একজন দু:খ ভারাক্রান্ত পিতার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। এই ধারার অন্য উপন্যাস এবং গল্পগুলো হল : এ্যাঘাউই দ্য স্কাই মুনস্টার (১৯৬৯), দ্য পিন্ব রানার মেমোরেন্ডাম (১৯৭৬), রোজ আপ ও ইয়ং ম্যান অব দ্য নিউ এজ (১৯৮৬) এবং এ কুয়াইউ লাইফ (১৯৯০)। এই লেখাগুলোর মূলে রয়েছে তার প্রতিবন্ধী পুত্র হিকারির জন্য মর্মবেদনা। তিনি একবার বলেছিলেন, লেখকের কাজটা ভাঁড়ের কাজের মত, যে-ভাঁড় দু:খের মধ্যেও হাসির অভিনয় করে। সমালোচক তাকাশি তাচিবানা বলেছেন, “উইথআউট হিকারি দেয়ার উড বি নো ওয়ে লিটারেচার।” হিরোশিমা নোট এবং এ পারসনাল ম্যাটার সম্পর্কে কেনাজাবুরো দ্য প্যারি রিভিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এ পারসনাল ম্যাটারের চাইতে হিরোশিমা নোট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত কিছু বিষয় স্থান পেয়েছে এ পারসনাল ম্যাটারে। সেটা ছিল আমার কাজের সূচনা। লোকজন বলছে, আমি নাকি আমার পুত্র হিকারি এবং হিরোশিমাকে নিয়েই অনবরত লিখে যাচ্ছি। আমি একজন বিরক্তিকর মানুষ। আমি অনেক সাহিত্যপাঠ করছি, এটা ঠিক যে, যা কিছু ভেবেছি, যা নিয়ে লিখতে চেয়েছি, তার মূলে হিকারি এবং হিরোশিমা আছে।

অন্য ধারার উপন্যাস ও গল্পগুলো হল প্রাইজ স্টক (১৯৫৮), নিপ দ্য বার্ডস, সু দ্য কীডস (১৯৫৬), দ্য সাইলেন্ট ক্রাই (১৯৬৭) এবং সামার সল্ট (১৯৯৯)। এগুলোর মধ্যে লোকসাহিত্য, লোকবিশ্বাস ও লোকতাত্ত্বিক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। ওয়ে এইসব গল্প শুনেছিলেন তার দাদী, নানী এবং মায়ের কাছে। তার দাদী অসাধারণ এক গল্পবলিয়ে ছিলেন। তিনি গ্রামীণ জীবন এবং লোকঐতিহ্যের রক্ষাকবচের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন, যখন গল্প বলতেন। দ্য সাইলেন্ট ক্রাই উপন্যাসে তিনি জাপানের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে আধুনিক যুদ্ধোত্তর সংস্কৃতির সাংঘর্ষিক দিকটি রূপায়িত করেছেন।

কেনজাবুরো ওয়ের লেখক জীবনের আরেকটি দিক জুড়ে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিপর্যস্ত জাপান, নির্দিষ্ট করে বললে হিরোশিমা এবং ওকিনাওয়া।

তিনি হাসিখুশি একজন মানুষ, সব সময় প্রফুল্লভাব মুখে ধরে রাখেন। ব্যক্তিগতভাবে অমায়িক। ভেতরে জাপানি ঐতিহ্যের লালন ঘটলেও দৃশ্যতঃ আধুনিক পাশ্চাত্য প্রভাবিত জাপানি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। তবে তিনি নীতিগতভাবে একজন অ্যানারকিস্ট (নৈরাজ্যবাদী)। গণতন্ত্রের প্রতি গভীর আস্থাশীল। বাল্যকালে সম্রাটের প্রতি অন্যদের ঈশ্বরভক্তি সম্ভবত তার ধর্মের প্রতি আস্থাভক্তির বন্ধন শিথিল করে দিয়েছে।

কেনজাবুরোর ভাব, ভাষা এবং বিষয়বস্তু জটিল।

নিজের ভাষা সম্পর্কে দ্য প্যারি রিভিউ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জাপানি ভাষায় আমি একটি নতুন সাহিত্যিক স্টাইল সৃষ্টি করতে চেয়েছি। একশ বিশ বছর আগে আধুনিক জাপানি সাহিত্যের সূচনা হলেও এই দীর্ঘ সময়ে ভাষার কোনো উন্নতি হয়নি। ব্যাপ্তি আসেনি। যদি আপনি জাপানি লেখকদের, বিশেষ করে তানিঝাকি এবং কাওয়াবাতার দিকে তাকান, দেখবেন এরা ক্লাসিক্যাল ভাষারই চর্চা করেছেন। তাদের স্টাইল অপরূপ সুন্দর জাপানি স্বর্ণযুগের গদ্যের নিদর্শন, ছোটকবিতার ঐতিহ্যের সময়কার তানকা এবং হাইকুর সমপর্যায়ের। আমি এই ঐতিহ্যের ধারাকে সমীহ করি, কিন্তু তারপরও আমি ব্যতিক্রম কিছু একটা করতে চাই। আমি ফরাসি সাহিত্যের ছাত্র। ফরাসি ভাষা ও ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস-কবিতা পড়েছি, বিশেষ করে, কাফকা ও সার্ত্রে, অডেন ও এলিয়ট। তাদের প্রভাব আছে আমার ভাষায়। আট ঘন্টা ইংরেজি ও ফরাসি পড়লে দু-ঘন্টা জাপানি লিখেছি। প্রথমে বিদেশি ভাষায় পড়া তারপর দেশি ভাষায় লেখা। তা করতে গিয়ে আমি আমার ভাষাকে জটিলই করেছি।

কাওয়াবাতার উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পে ঝেন ধর্ম-দর্শনের প্রভাব নেই, তা বলা যাবে না। তবে জাপানি তো বটেই জাপানের বাইরের পাঠকের জন্যও তা খুব একটা সমস্যার কারণ হয়ে ওঠেনি। নোবেল বক্তৃতায় তুলে আনা ঝেন সন্ন্যাসী কবিদের দুর্বোধ্য কবিতার ভাববলয়ে শ্রোতাদের প্রবেশাধিকার নেই জেনেও তিনি শুধু ঐতিহ্যিক ও সৌন্দর্যের কথা মনে করে প্রাচ্যের এরকম সংবাদ দিতে চেয়েছেন।

কেনজাবুরো ওয়ে তার নিজেকে নিয়োজিত করেছেন হিরোশিমার পারমাণবিক বোমায় আক্রান্ত লোকেদের কথা বলার জন্য, আমেরিকার দখলদারীত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল আত্মহত্যার নরকপুরী ওকিনাওয়ার জনমানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবার জন্য, এমনকি জাপানের নিজস্ব কৃষ্টি এবং বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন ও দ্বিধাবিভক্তি, তার ভাষায় ‘অ্যামবিগিউইটি’ সম্পর্কে কথা বলা জরুরি। হিরোশিমা নোট’, ওকিনাওয়া নোট এবং নোবেল বক্তৃতায় এসবের সারবত্তা উঠে এসেছে।

কাওয়াবাতা, ওয়ে আর রবীন্দ্রনাথ এমন এক প্রাচ্য ঐতিহ্যের অধিকারী, যার দৃষ্টান্ত শুধু প্রাচ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close