Home শ্রদ্ধাঞ্জলি আবু হেনা মোস্তফা এনাম >> শওকত আলীর ত্রয়ী : কালদীপিত অক্ষরমালা

আবু হেনা মোস্তফা এনাম >> শওকত আলীর ত্রয়ী : কালদীপিত অক্ষরমালা

প্রকাশঃ January 25, 2018

আবু হেনা মোস্তফা এনাম >> শওকত আলীর ত্রয়ী : কালদীপিত অক্ষরমালা
0
0

আবু হেনা মোস্তফা এনাম >> শওকত আলীর ত্রয়ী : কালদীপিত অক্ষরমালা 

‘একে এক নিবিছে দেউটি’- আজ ষাটের সূর্যপ্রতিম শওকত আলী [১৯৩৬-২০১৮] প্রয়াত হলেন। তাঁর প্রায়ণ আমাদের চলোর্মী চঞ্চল বর্তমান ও স্মৃতিপত্রে জানিয়ে দেয়- মৃত্যু সময় ও জীবনের সবচেয়ে করুণ ও কঠোর অভিজ্ঞতা। মৃত্যুর চঞ্চল স্পর্শ মানেই সময় ও জীবনের এক ধরনের পরিসমাপ্তি, স্থবিরতা। যদিও রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু এক নতুন স্নান; কিন্তু এই সত্য অনিবার্য যে, মৃত্যুর অগ্নিশিখা আমাদের জীবন ও বস্তুবিশ্বের যাবতীয় অস্তিত্বকে পরিণত করে এক মুঠি ধুলোয়। তবু সময় ও জীবন প্রবহমান, নিঃসীমের দিকে তার নিঃশব্দ যাত্রা। মৃত্যুর স্পর্শে জীবন রূপান্তরিত হয় অন্য এক বস্তুসমগ্রতায়, আর সময়ের করতলে রেখে যায় সৃষ্টিসমগ্রতার পুষ্পপত্র, চেতনাধারার অশ্রুবিন্দু। শওকত আলীর সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিজীবনের প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের সক্রিয় কর্মোন্মুখ চৈতন্যের লুব্ধ আলো মৃত্যুর পরও তাঁকে দেবে নতুন স্নান।
কেননা সময় কোনো বস্তুসত্তার স্বরূপ নয়, তা এক বিমূর্ত বোধ; কিন্তু সময়ের অদৃশ্য নিঃশ্বাসে আন্দোলিত হয় বস্তু, ব্যক্তি ও সমাজ। বস্তু ও ব্যক্তির অস্তিত্ব ও বিকাশের সমস্ত সূত্র তাই মূর্ত হয়ে ওঠে সমাজ-সংগঠনে, সময়ের পরিচিহ্নে। অদৃশ্য সময়ের অনিবার্য অভিঘাতে সংঘটিত হয় ব্যক্তি ও সমাজের রূপান্তরক্রিয়া। বাঙালি জাতির উত্তাল, অন্তর্দ্বন্দ্বময়, উৎকেন্দ্রিক এবং একই সঙ্গে প্রাণপ্রাচুর্যপূর্ণ অবিনশ্বর সময়; ষাটের দশকের অতলান্ত গৌরবের কথামালা শওকত আলীর ত্রয়ী উপন্যাস- দক্ষিণায়নের দিন [১৯৭৬], কুলায় কালস্রোত [১৯৭৭] পূর্বরাত্রি পূর্বদিন [১৯৭৮]। ঔপন্যাসিক ত্রয়ীকাহিনির অন্তর্স্রোতে উপন্যস্ত করেছেন সমাজ-রাষ্ট্র-সময় ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতের অনিবার্য অভিঘাতে ব্যক্তির উন্মূলিত অন্তর্চৈতন্য, দ্বন্দ্বময় মনস্তত্ত্ব ও নারীর আত্মজাগরিত ব্যক্তিত্বের মীমাংসা। ব্যক্তিচরিত্রের মনস্তত্ত্ব এই ত্রয়ী উপন্যাসে অনেকাংশে প্রবহমান সময়ের রূপকল্প।
সময় ও বাস্তবের বস্তুসমগ্রতার ভেতর থেকে বাস্তবাতিরিক্ত কল্পনাস্পর্শে ব্যক্তির শিল্পচিন্তা অগ্রসর এবং দূরবর্তী এক ভুবন নির্মাণ করে। আর উপন্যাস বোধ হয় সেই শিল্পচিন্তা প্রকাশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক এলাকা, যেখানে প্রতিনিয়তই নিরীক্ষা এবং রূপ বদলের নির্মম কীর্তি রূপায়িত হয়, যেখানে বাস্তবাতিরিক্ত জগৎ ব্যাপক জীবনাভিজ্ঞতার আধার হয়ে উঠতে পারে। হোসে সারামাগো যেটাকে বলেছেন অনেক নদীর সম্মিলিত প্রবাহে গঠিত সমুদ্র। তাঁর ব্লাইন্ডনেস উপন্যাস ওই কল্পবাস্তবের চমকপ্রদ রূপান্বয়। কিন্তু বাংলা উপন্যাসে ওই কল্পবাস্তবের চিত্রকল্প ও ব্যঞ্জনা খুব একটা দৃষ্ট নয়। বরং জীবন ও সমাজ বাস্তবতার দৈনন্দিন ঘটনাচিত্রেরই আবেগময় বিবরণ দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। এসব ঘটনাপারম্পর্যে সময়ের প্রতিচ্ছবি, সমাজিকতার সংস্কৃতি কোনো প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে না, ফলে অনেকাংশেই তা কালের নির্মম সিসিফাসে রূপান্তরিত হয়। কালের স্বাক্ষর অঙ্কিত করেও শিল্পের যে দূরগামী ও গভীরতলবর্তী সমুদ্রের আধার হয়ে ওঠার বিষয় থাকে, যেখানে শিল্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত জীবনের অন্তর্লীন একটি সম্পর্ক জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা বলে এবং সম্ভাবিত করে তোলে জীবনের অনিঃশেষ আকাঙ্ক্ষা। শওকত আলীর ত্রয়ী উপন্যাস আমাদের জীবনের ওই অনিঃশেষ আকাঙ্ক্ষাকে সম্ভাবিত করে তোলে। এই সম্ভাবনার ভেতর তিনি কোন জীবনাভিজ্ঞতা, কোন জীবনদর্শনের গল্প বয়ান করেছেন, তাঁর সমকালের পরিচিহ্ন নির্মাণের এই সূত্রটি আবিষ্কার করা যেতে পারে। এবং সময়ের এই রূপকল্প নির্মাণে ঔপন্যাসিক সংগ্রথিত করেছেন কয়েকটি সূত্র। প্রথমেই আমাদের লক্ষ করা প্রয়োজন ওই অবিনাশী সময়ের পরিচিহ্ন ও অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

সময়ের পরিচিহ্ন

বিশ্বব্যাপী উত্তাল রাজনৈতিক ঘটনারাশির অভিঘাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ষাটের দশককে নিক্ষেপ করেছিল নতুন অস্তিত্বসংকট, আত্মজিজ্ঞাসা ও সংবেদনার পরিপ্রেক্ষিতে। একদিকে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে শক্তি, শাসন ও আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ক্রমসম্প্রসারণ এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদ বা স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন বিস্তারেরও সূত্রপাত এই দশকের অভিজ্ঞান। এই তরঙ্গসঙ্কুল উত্তাল সময়ের গর্ভে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক জোটের পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে ওঠে জোট নিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তিসমূহও। ভিয়েতনামের হো চি মিন, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও চে গুয়েভারা, চীনের মাও সে তুং, তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়ার, মিশরের জামাল আবদেল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার সুকার্নো, লিবিয়ার গাদ্দাফি প্রমুখ নেতা বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও সমাজ রূপান্তরের আন্দোলনে কেবল বিপ্লবীদের মতাদর্শিক অনুপ্রেরণা নয়, তখন তাঁরা তরুণ সমাজের নিকটও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল ও নিপীড়ক সামরিক রাষ্ট্রশক্তিনিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ অর্থাৎ পূর্বপাকিস্তানও বৈশ্বিক অগ্নিস্ফূলিঙ্গের উত্তাপে নির্দ্বন্দ্ব ছিল না। বরং সুদীর্ঘকাল ইংরেজ-ঔপনিবেশিকতার অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে নতুন স্বৈর-সামরিক শাসন-শোষণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শৃঙ্খল-মুক্তির স্বপ্নে বাঙালি জাতিসত্তার চিন্তা, মনন, সাংগঠনিক সম্ভাবনা, শক্তি ও যুক্তিনিষ্ঠতা এই দশকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপাম্বয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যে। যদিও আন্দোলনের নানা গতিমুখের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সক্রিয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারা ও অন্যটি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ। শেষোক্ত ধারাটিই সহসা অঙ্কুরিত মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদী শ্রেণিনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক সক্রিয়তায় হয়ে উঠেছিল শক্তিময়, সক্রিয়; সমাজবিপ্লবের ধারাটি ওই উদ্দাম স্রোতে এবং পার্টি-অন্তর্গত তাত্ত্বিক সংঘাতে হয়ে ওঠে ক্ষীণ। অদৃশ্য শত্রুর মতো ওই সময়ের রক্তপাতকে, দৃশ্যাবলিকে শওকত আলী রূপায়ণ করেছেন তাঁর ত্রয়ী উপন্যাসে।
১৯৬৫-৬৯ কালপর্বে সংঘর্ষ-সংশ্লিষ্ট মধ্যবিত্তের বিচূর্ণ জীবনাকাঙ্ক্ষার রক্তাক্ত উপলব্ধি এবং ক্ষয়ের মধ্যে, বিপর্যয়ের অন্তর্স্রোতে ভাঙনের শব্দপ্রবাহে ব্যক্তিমনস্তত্ত্বের অন্তর্জালজটিলতা, চলিষ্ণু ঘটনারাশির প্রতিকূলে তার দ্বন্দ্বমুক্তি, অন্যদিকে ব্যক্তিচরিত্রের উন্মূলিত ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ ও অর্থ-আকাঙ্ক্ষার বিপুল বিস্তার ঔপন্যাসিক সংস্থাপিত করেছেন দ্রুত ক্রমপরিবর্ধমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।

লড়া্ইয়ের তত্ত্ব ও এলাকা

ক্রমরূপান্তরশীল জটিল এই কালের ঘনীভূত সংকট, যুদ্ধ, বিপ্লব, বিপ্লববিনষ্টির এবং ব্যক্তির অন্তঃশীল দৃঢ়চৈতন্যের উন্মিলন এই ত্রয়ী উপন্যাসে বিস্তৃত আয়তনে স্রোতোলিপিবদ্ধ। এই বিস্তৃত কাহিনির অন্তর্স্রোতের কেন্দ্রীয় প্রবাহ রোকেয়া আহমদ রাখীর জীবনের ঘনায়মান সংকট, আত্মজিজ্ঞাসা এবং ব্যক্তিত্বের অনিবার্য উন্মোচন হলেও কেন্দ্রীয় এই স্রোতের ফেনিল তরঙ্গে সমাবেশিত টুকরো টুকরো ঘটনার গীতোচ্ছ্বাস। রাশেদ আহমদ, বিলকিস আহমদ বুলু, মনি, সেজান, হাসান, জামান, মাজহার, পারভীন অথবা সুমিতার অভিযাত্রা কেন্দ্রীয় কাহিনির ওই গুঞ্জনকে করেছে গতিসঞ্চারিত। ফলে ব্যক্তি মনস্তত্ত্বের উজ্জীবন, বিকাশ ও পরিণামচিহ্নিত হলেও এই ত্রয়ী উপন্যাস যে প্রবহমান সময়ের চিহ্নবাহী, পূর্বেই আমরা এ কথাটি উল্লেখ করেছি-এই সময়খণ্ড উত্থিত ইতিহাসের অন্তরাল থেকে, সমকালীন রাজনৈতিক উত্তাপের গভীর থেকে। ইতিহাসের ছাত্রী রাখীর মনে প্রথম বর্ষেই উঁকি দিয়েছিল প্রশ্ন–প্রাচীন বাংলায় নাকি গণতন্ত্র ছিলো–মাৎস্যন্যায় বলে যে যুগটাকে চিহ্নিত করা হয়, সেটা নাকি আসলে গণতন্ত্রেরই যুগ?’ [দ.দি./৩০] অর্থাৎ ‘মাৎস্যন্যায়’ এবং ‘গণতন্ত্র’কে লেখক সমার্থক করে তুলেছেন। রাখীর অন্তর্চৈতন্যে উত্থিত ওই প্রশ্নের মীমাংসা সন্ধান ঔপন্যাসিকের অন্বিষ্ট নয়; বরং শব্দ দুটির সমবায়ী তরঙ্গ এই উপন্যাসের অন্তর্স্রোতে প্রবহমান।
‘মাৎস্যন্যায়’ অথবা সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট ‘গণতন্ত্র’- ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এই মতাদর্শের কাছে ব্যক্তি-মানুষের শ্রেয়চিন্তা, মনুষ্যত্ব ও মূল্যবোধ সমস্তই প্রাচীন, সভ্যতাবিমুখ। কেননা সভ্যতার আলোস্পর্শী গতিশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বের অভিজ্ঞানে অর্থই সমস্ত কিছু পরিমাপের মানদণ্ড। রাখীর সরকারি চাকুরে পিতা রাশেদ আহমদ, যিনি ভাবেন ‘একটা ভিত্তির উপর মানুষকে দাঁড়াতে হয়। সে যা-ই করুক না কেন। ফ্লোটিং রুটলেস অবস্থা শেষ পর্যন্ত পতন ডেকে আনবেই। একটা পারপাস অফ লাইফ থাকতে হয়, কোনো না কোনো ভাবেই।’ [দ.দি./৪৮] রাশেদ আহমদ জীবনে শান্তি আর সুখের সন্ধান করেছেন। তার ওই শান্তি ও সুখের পশ্চাতে অর্থের প্রবল প্রাচুর্য নয়, ক্রিয়াশীল ছিল গদ্বানিহীন, অপমানহীন, নিষ্পাপ জীবনের নিরবচ্ছিন্ন নিষ্কলুষ ঐকান্তিকতা। যদিও চৈতন্য-উত্থিত এই আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ রূপায়ণে তার চিন্তায় ভুল ছিল বলে তিনি ভেবেছেন, কিন্তু ব্যক্তির বিকাশ কি কেবল তার অন্তর্লীন ইচ্ছার শর্ত সাপেক্ষ? কেননা ব্যক্তি তো প্রকৃতপক্ষে সমাজ ও সময়ের অনিবার্য সমষ্টি। তাই বিকার, বিসংগতি, বিচূর্ণ, ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের মধ্যে সমাজের বিকাশ অবসরপ্রাপ্ত, বিচক্ষণ, প্রগতিশীল, সংস্কৃতিবান ব্যক্তি রাশেদ আহমদকে করে তুলেছে অন্তর্মগ্ন, উৎকেন্দ্রিক এবং যন্ত্রণাবিদ্ধ। পুঁজি ও পণ্যনির্ভর সমাজের বাস্তব চিত্র তার চেতনাস্পর্শিত :

‘এ যুগটাই তো টাকার যুগ, যেমন করে হোক, যে করে হোক টাকা চাই মানুষের। মানুষ টাকা চাই শুধু টাকার জন্য, কোনো কিছু বিল্ডাপ করার জন্য নয়। … সর্বত্র গোঁজামিল দেওয়ার চেষ্টা। আমার কী মনে হয় জানো? … আসলে একটা ঠিকেদারী সোসাইটি গড়ে উঠছে এ দেশে।’ [দ.দি./৪৭]

পুঁজির এই দখলদারিত্বের রাজনীতি ও পুঁজি-প্রতিযোগিতার বিপরীতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, সমাজের ইতিবাচক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাশেদ আহমদের আজীবনের স্বপ্ন। যিনি রাজপথে প্রগতিশীল দলের রাজনৈতিক মিছিলে আপন সন্তানের মুষ্টিবদ্ধ হাত; কণ্ঠে শ্লোগান; বাতাসে উড়ন্ত শুষ্ক চুল দেখে গৌরব বোধ করেন, সেই রাশেদ সাহেবের চৈতন্যের স্বাধীন সংস্কৃতির মধ্যে, তার নির্মোহ জীবনের সারল্যে বেড়ে উঠেছে ছোটো মেয়ে রাখী। জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সে নিরুদ্বিগ্ন, নিঃসঙ্কল্পিত ও নির্লিপ্ত; অথচ সে কী করবে-এই একই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে তার পরিপার্শ¦ থেকে। নিদারুণ এই প্রশ্নে সে বিক্ষিপ্ত, বিচলিত ও অসহায়। তবুও প্রথাগত জীবনকে অন্যদের মতো যাপনের চিন্তায় চাকরি, বিয়ে অথবা ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা-কী করবে এই দ্বন্দ্বও তাকে তাড়িত করে। শেষপর্যন্ত চাকরি অতঃপর বিয়ে করতে হয় তাকে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই রাখী জীবনের প্রথাগত চলিষ্ণুতাকে মেনে নিতে পারেনি। তার বোনের স্বামী হাসান তাকে ট্রাভেল এজেন্সি অফিসে চাকরি জোগাড় করে দেয়, কিন্তু এই চাকরি গ্রহণও তাকে অস্থির, বিচলিত ও অস্বস্তির ভিতর নিক্ষেপ করে। অন্তর্চৈতন্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্বের তীক্ষè যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় সে চিরদিনের মতো বাবার মুখোমুখি হয়। রাখী অধ্যাপনা করবেÑÑ এটা ছিল বাবার আকাঙ্ক্ষা। যদিও রাশেদ সাহেব জানেন ‘সব রকম চাকরিই সমান’; কিন্তু তার মনোকষ্টের বিষয় ছিল অন্যত্র- ‘লেখাপড়া শিখলে, ইতিহাস জানলে, কিন্তু তোমার সেই লেখাপড়াটা কোনো কাজে লাগাতে পারলে না-।’[দ.দি./৮৮]। লেখাপড়া কাজে লাগেনি, ব্রিটিশ কলোনিয়াল শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হলেও বাঙালি তখনও [এমন কী এখনও] নব্য কলোনিয়াল রাষ্ট্রে ইংরেজ প্রবর্তিত কেরানি তৈরির শিক্ষার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসেনি। এই শিক্ষা-সংস্কৃতির বাইরে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো, নতুন আর্থ-সামাজিক বিধিব্যবস্থা প্রবর্তন-যেটা সম্ভব সমাজতান্ত্রিক আদর্শে। ঔপন্যাসিক তাই চাকরি প্রসঙ্গে রাশেদ সাহেবের এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাখীকে সংশয় ও যন্ত্রণামুক্ত করেছেন। রাশেদ সাহেব ‘কি বলছিলেন সেদিকে তার [রাখীর] খেয়াল ছিল না। সে শুনছিল সারা ঘর জুড়ে আব্বার স্বর কেমন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, বাইরের আলোকিত রাত্রি এখন কোলাহলে মুখর।’ [দ.দি./৮৮]। সমস্ত স্থবিরতা, গ্লানি ও অপমানের বিপরীতে কোলহলমুখরিত আনন্দের মধ্যে, জীবনের চলিষ্ণুতার মধ্যে রাখীর মুক্তচৈতন্য উদ্ভাসিত হয়, পাস্পরিক কথপোকথনে উঠে আসে সেজানের প্রসঙ্গ এবং দ্বিতীয়বার অন্ধকার ঘর ভরে যায় বাইরের আলোর আভায়। এই আলোর রিফ্লেকশন সেজানের রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শকে সমর্থনের সাংকেতিক শুশ্রুষা-পরিচর্যিত। শওকত আলী এভাবে রাশেদ সাহেবের দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন পুঁজিবাদী রাজনীতির বৈশিষ্ট্য এবং সেই বিধিব্যবস্থা অতিক্রমণের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রিয়াশীলতা সঞ্চার করে দিয়েছেন ব্যক্তিচরিত্রের বহির্জগতে ও মনোলোকে।
ঔপন্যাসিক শিল্পীচৈতন্যের সচেতন প্রযত্নে ঠিকাদারি ও বাণিজ্যপুঁজিপরিপন্থী তাঁর সংগুপ্ত আকাঙ্ক্ষা উজ্জীবিত করেছেন। ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব দ্বিধা-জর্জরিত চৈতন্যের সুপ্ত প্রত্যাশা লেখকের একটি-দুটি বাক্যের ইঙ্গিতে, কাহিনির স্বতঃস্ফূর্ত গতিবেগে প্রতিবিম্বিত। ছাত্রজীবনেই আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী মনি, সেজানদের রাজনৈতিক চিন্তা, আদর্শ, ক্রিয়াশীলতা উপন্যস্ত কাহিনির অন্তর্স্রোতে প্রবহমান। রাখীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও অন্তর্জালজটিলতার বাইরে তার ব্যক্তি জীবনের নানা বাস্তবতার ভেতর সেজানের সংস্পর্শ ওই রাজনৈতিক অনুষঙ্গকে গতিশীল রেখেছে। অনেকাংশে ওই ঘটনাপুঞ্জ রাখীর সংগুপ্ত, অন্তর্মুখী চৈতন্য আলোড়িত করেনি, বরং বিরক্তি উদ্রেক করেছে। কেননা রাখীর বেড়ে ওঠার মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সংশ্রব নেই। কিন্তু ঔপন্যাসিক রাজনৈতিক তত্ত্ব, তর্ক ও পরিস্থিতির মধ্যে রাখীকে বারবার উপস্থিত করেছেন। সেজানের রেখে যাওয়া ‘বিপ্লব, বিপ্লবের পরিস্থিতি আর আন্দোলনের পদ্ধতি সম্পর্কে লেখা বই’ [কু.কা./১০৩] কিছু নাম-ঠিকানা, চিঠি, ইশতেহারের মুসাবিদা ইত্যাদি কাগজপত্রে ভর্তি ব্যাগ রাখীকে আরো জড়িয়ে ফেলে রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে। তার আত্মবিশ্লেষণপ্রবণ ও অনুসন্ধানী মনে বারবার রাজনৈতিক আদর্শ, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন জাগ্রত হয় :

‘এসব কথার অর্থ কি শুধু ব্যর্থ হয়ে যাওয়া? যে ত্যাগ কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারবে কি না কেউ জানে না, যে আদর্শ বাস্তবে কোনোদিন দেখা যাবে না-সে আদর্শের যে কী দাম থাকতে পারে সে কথা রাখী একদম বুঝতে পারে না।’ [কু.কা./১০৪]

এই অন্তর্দ্বন্দ্ব, আত্মজিজ্ঞাসা ও প্রশ্নের মধ্যে; প্রতিটি ঘটনার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও আত্মখণ্ডিত চেতনার অমীমাংসিত ভাবনারাশির মধ্যে রাখী তার মনোজগৎ থেকে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসে রাজধানীকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্য থেকে, মহিলা কলেজে চাকরির সূত্রে উপস্থিত হয় ঠাকুরগাঁওয়ে। ফলে নির্দ্বন্দ্ব নির্লিপ্ত গড্ডালিকায় আবেগের উন্মত্ত স্রোতে শ্যাওলার মতো ভেসে গিয়ে নয়, কলেজের শিক্ষকতা, সেখানে পশ্চাদপদ নব্যপুঁজিবাদী মানসিকতা লালনকারীদের বিরোধিতার মধ্যে রাখীর জন্য নির্মিত হয়েছে একটি বাস্তব প্লাটফর্ম। তার আত্মসচেতন আত্মজাগরিত চৈতন্যের উপলব্ধি; যদিও রাখীর এই উপলব্ধি স্বগতকথন বা মনোকথনময় নয়, বরং ঔপন্যাসিক রাখীর স্বগতচৈতন্যের ভাবনারাশির মধ্যে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিবিন্দু সংস্থাপনসূত্রে ব্যাখ্যা করেছেন চরিত্রের মনোভিজ্ঞান :

‘সময়টা ১৯৬৭ সাল হলেও উত্তরবঙ্গের সুদূর উত্তরে এই মহকুমা শহরের মিউনিসিপ্যালিটিতে পানি নেই, ইলেট্রিসিটি নেই। মেয়েদের স্কুলটা পুরনো। কিন্তু ছেলেদের কলেজের বয়স মাত্র বছর পাঁচেক। বড় জোতদাররাই হর্তাকর্তা। ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকেদারী, ডাক্তারী ওকালতি-এসব তাদেরই ব্যাপার। রাজনীতিতে তারাই সর্বত্র। ড্রামাটিক ক্লাব আছে, স্পোর্টস ক্লাব আছে, লাইব্রেরী আছে-সর্বত্র ঐ একই মাতব্বরি। নিজেদের এলাকার মান রাখবার জন্যে কলেজ করা হয়েছে। সেই একই উদ্দেশ্যে মেয়েদের এই কলেজটারও সম্ভবত আরম্ভ। ভাবখানা এরকম যে নতুন কিছু হোক, শহর হোক, আধুনিকও হোক- কিন্তু সবই থাকবে আমাদের হাতে। সেজন্য মিলাদ মহফিলে আমরাই টুপি মাথায় ওয়াজে সামিল হবো, আবার নাটকেও সাজ-পোশাক পরে রঙ মেখে আমরাই অভিনয় করবো। মুসলিম লীগ আমরা হবো, আমরাই আওয়ামী লীগ করবো আবার আমরাই জামাতে ইসলামীও করবো।’ [পূ.পূ./২০-২১]

একদিকে ধর্মীয় কুসংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের স্বার্থবাদী চক্রান্ত অন্যদিকে মফস্বলীয় রাজনীতির জটিল মেরুকরণ ও বিকাশমান সমাজ, যেখানে ‘নতুন চিনিকল হয়েছে, মাটিতে গভীর নলকূপ বসিয়ে আবাদ বাড়ানোর জন্যে আরম্ভ হয়েছে সরকারি উদ্যোগ। রাস্তা পাকা হওয়ায় শুধু রেলগাড়ি ভরসা নয়, এখন ঝকঝকে নতুন বাস চলতে শুরু করেছে।’ [পূ.পূ./২১]। ইংরেজরা তাদের বাণিজ্যের কাঁচামাল আনায়নের জন্য রেললাইন স্থাপন করেছিল ভারতবর্ষের শস্যশ্যামল অঞ্চলে, জনস্বার্থে নয়। যে ছোটো শহরে ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি, কিন্তু যাতায়াতের ঝকঝকে পিচ কংক্রিটের রাস্তা নির্মিত হয়েছে; এই পথ ধরে আসে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শোষণের মতোই রাখীদের স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের উদ্যোগকে নস্যাৎ করে দেবার ষড়যন্ত্র। ফলে পারিবারিক-সাংসারিক জীবনের সকল সূত্রবিচ্ছিন্ন রাখী পুনরায় হয়ে ওঠে উদ্বেগাকুল, সংকটাপন্ন এবং উৎকেন্দ্রিক। প্রবহমান সময়ের এই উত্তাল তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ধাক্কায় একদিকে প্রগতিশীল রাজনীতিতে বন্ধ্যাত্ব, গ্রুপিং অন্যদিকে সেজানের জীবনক্ষয়কারী রোগের জটিল মুহূর্তে রাখীকে তার দায়িত্ব নিতে হয়। কোনো সংশ্রব না থাকলেও রাখী ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক ঘটনার ঘূর্ণাবর্তে। দেবতোষদের মতো উগ্র বামপন্থী কর্মী, যারা মনে করে রাজনৈতিক সংগঠন নয় জনগণ নিজেদের প্রয়োজনেই বিপ্লব করবে। দেবতোষের এই চিন্তার বিপরীতে রাখীকে ভূমিকা রাখতে হয় নিজস্ব যুক্তি ও বিচারবুদ্ধিতে। দেবতোষের এই ভাবনার সঙ্গে সেজানের ছিল বিস্তর পার্থক্য, ফলে উভয়ের রাজনৈতিক চিন্তার বৈপরীত্য উভয়কে ঠেলে দিয়েছে পৃথক রাজনৈতিক দল ও প্রায়োগিক পদ্ধতির দিকে। বরং তেভাগা আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী কমরেড শফিউদ্দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতাসঞ্জাত উক্তি এই উপন্যাসের একটি ইতিবাচক দর্শন :

‘আপনাদের পলিটিক্স সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা বোধগম্য নয়। আসলে আপনারা মানুষের সঙ্গে সেই ভাবেই কমুনিকেট করতে চান, যেভাবে অন্য পার্টির লোকেরা করে। এলেন, দু চারজন চেনা জানা বড় গেরস্থের বাড়ি অতিথি হলেন মাতব্বর ব্যক্তিদের ডাকলেন-বোঝালেন-ব্যস পার্টি হয়ে গেল আপনাদের, আপনারা চলেও গেলেন। সাধারণ মানুষের কথা অবশ্যি আপনারা বলেন, কিন্তু ঐ রকম সমস্যার কথা তো অন্য পার্টির লোকেরাও আজকাল বলে। আপনারা কৃষকের কথা বলেন কিন্তু কৃষিজীবন সম্পর্কে কি আপনারা ভালোভাবে জানেন? গরু চুরি হয়ে যাওয়া যে ছেলেমেয়ে চুরি হয়ে যাওয়ার চাইতেও ভয়াবহ ব্যাপার সেটা বোঝেন আপনারা?’ [পূ.পূ./৬৬]

গ্রামীণ সমাজ ও কৃষিজীবনের পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে থেকে এসে কৃষক সংগঠন, কৃষিবিপ্লব সম্ভব নয়–অকস্মাৎ তাত্ত্বিক জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যে থেকে নয়, গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন কঠোর বাস্তবতা ও তেভাগা সংগ্রামের নির্মম সত্যের মধ্যে থেকে কমরেড শফিউদ্দিন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এই সুগভীর উপলব্ধির স্তরে। সেজানেরও ছিল এই বোধ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা, এ কারণে সে যেমন বামপন্থী দেবতোষের রাজনৈতিক কর্ম-পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে আস্থাশীল নয়, তেমনি জেলা শহরের এক পার্টি-নেতার জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে যাবার আহ্বান, দেশপ্রেমের উত্তেজিত আবেগ সে প্রত্যাখ্যান করে অবলীলায়। কিন্তু তার এই প্রত্যাখ্যান কেবল রাজনৈতিক আদর্শের বৈপরীত্যচেতনাজাত যুক্তিশূন্য ও প্রশ্নহীন নয়। ‘গ্রামের মধ্যে হরতালটা হবে কোথায়? চাষাবাদ বাদ দিয়ে কি তাহলে লোকজন ঘরে বসে থাকবে? আর জোতদারের মিছিলেই বা কিষাণ যোগ দেবে প্রাণের কোন তাগিদে?’ [পূ.পূ./৭৩]। তাহলে প্রাণের এই তাগিদ থেকেই সেজান শহর নয়; গ্রাম-জীবনের সঙ্গে, গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে, মাটি আর মানুষের সঙ্গে অস্তিত্ব মিশিয়ে নির্মিত হয়েছে। বন্ধু মনিও শহরের বিলাসময় জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগ্রহণের মতো ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন ছিন্ন করে ক্ষেত মজুরদের সঙ্গে নিড়ানির কাজ করেছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে, কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়েছে, নাইট স্কুলে পড়িয়েছে, জোতদারদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের সঙ্গে লাঠালাঠি করেছে।’ [পূ.পূ./৯০]। এভাবে মনি এবং সেজান হয়ে উঠেছে পরস্পর পরিপূরক। মনির অসমাপ্ত রাজনৈতিক কর্ম এবং আদর্শ, তত্ত্ব ও বাস্ততার আন্তঃসম্পর্কগত জটিলতার ব্যাখ্যা, তার প্রায়োগিক আয়োজন ঔপন্যাসিক সঞ্চার করে দিয়েছেন সেজানের ক্রিয়াশীলতা, কর্মস্পৃহা, আত্মত্যাগের অন্তর্স্রোতে। সেজানের রাজনীতি কেবল তত্ত্বনির্ভর ছিল না, ছিল তৃণমূল থেকে জাতীয় জীবনের গভীর সংকট ও সম্ভাবনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল ভবিষ্যৎ দূরদৃষ্টি। ডা. সুমিতার সঙ্গে তার বাক্যবিনিময়ের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র-রাজনীতির সংকটময় পরিপ্রেক্ষিত :

‘আমার ধারণা সামনে একটা খুব বড় আন্দোলন আসছেÑ এমন আন্দোলন এদেশে আর কখনো হয়নি। এই আন্দোলনে বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিতে হবে-কেননা এর পরই- বাঙালীর স্বাধীনতার প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠবে। এ আন্দোলন হবেই-কেউ ঠেকাতে পারবে না। অথচ মুশকিল কি জানেন, আন্দোলনের নেতৃত্ব ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে পুরো মাত্রায়-তার মানে আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি প্রোগ্রেসিভ ফোর্স নিজেদের সংগঠিত করতে না পারে।’ [পূ.পূ/১৩৮]

বিপ্লব যে সতত চলিষ্ণু একটি প্রক্রিয়া, সকল বৈষম্য থেকে মানুষের মুক্তির আন্দোলন যে কারো মৃত্যুতে নিঃশেষ হয় না, তা যে নির্দিষ্ট কোনো কালখণ্ডে সীমবদ্ধ নয়; তা যেমন মনির মৃত্যুর পর আমরা দেখি সেজানের চৈতন্যবিস্তৃত হয়ে এবং পরবর্তী কাহিনিক্রমে, রাখীর গর্ভে সেজানের সন্তানের মধ্যে সেই সম্ভাবনার বীজ রোপিত। নৈরাশ্য নয়, ব্যর্থতা নয়; জীবন যেমন অনিঃশেষ, জীবনের সম্ভাবনাও অনিঃশেষ। সতত প্রবহমান জীবনের ধারা জগতের সমস্ত প্রলয়ঙ্কর অগ্ন্যুৎপাতের মধ্যে, পাপ-পঙ্কিলতার মধ্যে, হঠকারিতা ও দুঃখের মধ্যে, ধ্বংস ও বিনষ্টির মধ্যে অনুসন্ধান করে রূপান্তরকামী গতিময় জীবনের সদর্থকতা। গর্ভের সন্তানের উদ্দেশে উচ্চারিত রাখীর স্বগতকথনে তারই প্রতিধ্বনি :

‘এখানে আমি হেঁটেছিলাম-তুইও হাঁটিস এখান দিয়ে; এখানে দাঁড়িয়ে আমি মিছিল দেখেছিলাম-তুইও দেখিস এইখানে দাঁড়িয়ে; সেজানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিলো এখানে, এই গাছতলায়-এখানে তুইও দাঁড়াস। আর এই যে রাস্তাটা, এই রাস্তায় সেজান মিছিল নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলো-তুইও এই রাস্তা দিয়ে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাস, হ্যাঁরে পারবি তো? ’ [পূ.পূ./১৬২]

বাংলাদেশের ষাট দশকের সমাজচৈতন্য, রাজনৈতিক ক্রমরূপান্তরশীলতা, মধ্যবিত্তশ্রেণির আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের দ্বন্দ্বময় স্বরূপ আমাদের আলোচ্য ত্রয়ী উপন্যাসে ব্যক্তি মনস্তত্ত্বের উজ্জীবনে সংস্থাপিত হলেও এর কেন্দ্রীয় স্রোতে আবর্তিত রাখীর নারীসত্তার গভীরে অন্তঃশীল ব্যক্তিত্ব-চেতনার উন্মোচন। খুব সচেতন প্রযত্নে লেখক এই ত্রয়ী উপন্যাসে নারীবাদী ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন কী না, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সমাজরূপান্তরের আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষায় মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শওকত আলী প্রচল সমাজ-সময়ের ঊর্ধ্বে প্রাচীন পুরোনো কাঠামো ভেঙে সর্বপ্রকার শোষণমুক্ত নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য যে সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম প্রয়োজন তার কেন্দ্রে সন্তান ধারণক্ষম নারীকে সংস্থাপন করেছেন। সম্ভবত এই কারণে এই ত্রয়ী উপন্যাস প্রেমের সম্পর্ক, বিকাশ এবং পরিণামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

শত্রুর মতো প্রেম

প্রেম বিষয়ে রাখীর চেতনায় কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি ছিল না। আবার আকস্মিকভাবে তার জীবনে প্রেমের আবির্ভাব ঘটেছে তাও নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তরুণ অধ্যাপক জামান তাকে ভালোবাসে। চাকরি এবং ব্যক্তিগত জীবনে জটিলতা, পিতৃবিয়োগের বেদনা ইত্যাদি একাধিক করুণ পরিস্থিতিতে যখন সে বিধ্বস্ত তখনই অনেকাংশে আকস্মিকভাবে তার জীবনে রাখীর ঘনিষ্ঠতা। তার বিষাদ, বিপন্ন, মলিন মুখাবয়ব রাখীর মনে অঙ্কুরিত করে সংবেদনা ও প্রণয়ের বীজ। জামানের ‘চুলভর্তি মাথার ওপর একটা হাত’ রেখে রাখীর সংগুপ্ত স্মৃতিতে জাগ্রত হয়েছে অসহায় নির্ঘুম অস্থির মনি ভাইয়ের যন্ত্রণা-কাতর মুখ। স্বল্প পরিচয়ের দ্বিধা অতিক্রম করে আজন্ম বেড়ে ওঠা শান্ত উত্তেজনাশূন্য নিরুদ্বিগ্ন রাখীর মনে হয়েছে ‘জামান যেন তার জন্ম জন্মের চেনা।’ [দ.দি./১০৮]। তবু জামানের প্রেম নিয়ে রাখী বারবার সংশয়ে, দোলাচলে বিদীর্ণ হয়। তার রুচিশীল সংবেদনময় মনোজগৎ কল্পনার ও দ্বন্দ্ব-বিশ্লেষণের আশ্রয়ে বাঙালি নারীর চিরন্তন সংসারকাঠামো, স্বামী-সম্পর্কের প্রথাগত অভ্যাসের মধ্যে রাখী নিজেকে সংস্থিত করেছে। কিন্তু বিয়ে অতঃপর সংসারের মতো বাস্তব সত্যের অনিবার্য ধাক্কায়, অনেক দ্বিধা ও সংশয়-উত্তীর্ণ হয়ে যে প্রেমকে রাখী গ্রহণ করেছিল, ক্রমেই সেই জীবন ও স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা লুণ্ঠিত হয় অতল ঘৃণার পঙ্কে। নিঃশব্দ রাত্রির শিশির পতন এবং অন্ধকার ঘরে চন্দ্রালোকের নৈসর্গিক পরিচর্যায় একটি-দুটি প্রশ্ন-সংলাপের ইন্দ্রজালে উভয়ের মনোজগৎ হয়েছিল উদ্বেলিত, আবেগায়িত। কিন্তু প্রেমের অর্থ কেবল শরীর নয়, প্রেম রাখীর রুচিশীল সংযমী চৈতন্যে ব্যক্তিত্বের দুর্দমনীয় অভিব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। জামান যখন তার অনাবৃত শরীর দর্শনের জন্য লোভী হয়ে উঠেছে, তার শরীরকে আপন করতলে নিংড়ে নিতে চেয়েছে তখনই রাখীর আত্মসচেতন অন্তর্চৈতন্যে জাগরিত হয়েছে নারীর স্বতন্ত্র সত্তা ও অস্তিত্ব। পিতৃতান্ত্রিক, পরিবারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও প্রচল সমাজসংগঠনের বিরুদ্ধে তার মনোলোকে সূচিত হয়েছে তীব্র প্রতিবাদের নিজস্ব ভাষা। জামানের এই শরীরসর্বস্ব কামপ্রবৃত্তির উদ্দাম স্রোতে রাখী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেও তার নারীসত্তার মর্মমূলে সূচিত হয়েছে ঘৃণা :

‘কিন্তু হায় শরীর! সেই মুহূর্তে কি শরীর কথা শোনে! শেষ মুহূর্তে জোয়ার ঠিকই উথলে উঠলো। আর তখন রাখীর ভীষণ ইচ্ছে হলো, জামানকে লাথি মেরে ফেলে দেয় বিছানা থেকে। শেষে, সেই মুহূর্তটিও পার হয়ে গেলে রাখীর ক্লান্ত মনের ভেতর থেকে কালো কালো ঘেন্না উঠে আসতে আরম্ভ করলো।
না, দুঃখ নয়-অপমান নয়-শুধু ঘেন্না।’ [কু.কা/১৮]

জামানের সন্তান গ্রহণের প্রতি অনাগ্রহ, ব্যক্তিত্বহীনতা রাখীকে করে তোলে আত্মবিবরবাসী, অন্তর্মুখী এবং অবশেষে বন্ধনবিচ্ছিন্ন। জীবনের সমস্ত বিশ্বাস, প্রেম, স্বামী, সংসার যখন মিথ্যে মরীচিকার চোরাবালিতে নিমজ্জিত তখন রাখীর চেতনা জুড়ে উদ্ভাসিত হয় সেজান। ব্যক্তি সেজান সম্পর্কে হৃদয়ের অন্তর্লীন আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং উদ্বেগের দ্বন্দ্বে বারংবার যন্ত্রণাতাড়িত, বিদীর্ণ, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে রাখী। সে প্রতিনিয়তই অস্বীকার করেছে সেজানকে, প্রত্যাখ্যান করেছে তীব্র তীক্ষè নিষ্ঠুর অপমানকর ভাষায়। এমনকি তীব্র আত্মসম্মানবোধের কারণে সেজান প্রত্যাশিত অর্থঋণ চেয়েও গ্রহণ না করায় রাখী অপমানিত হয় এবং সেজানকে তার আসন্ন বিয়ের সংবাদ জানিয়ে আসে, কিন্তু পরক্ষণেই অন্তর্দ্বন্দ্বে অন্তর্জগতের অবদমিত রোদনে সে হয়ে উঠেছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আহত কীট সদৃশ :

‘ছুটতে ছুটতে অন্ধকারে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পায়ে হোঁচট লাগিয়ে রাখী গলি থেকে বার হলো। কেবলি কেউ যেন তাকে ধিক্কার দিচ্ছে মনের ভেতরে। রাখী, কেন এসেছিলি তুই? কে আসতে বলেছিলো এখানে তোকে? কেবলি মনে হতে লাগলো, সেজান তাকে নিদারুন অপমান করেছে। এমন অপমান জীবনে কেউ তাকে কখনো করেনি। সারাটা পথ সে নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে এলো।’ [দ.দি./১৩৫]

সেজানকে তার মনে হয়েছে ‘শত্রু’। আবার পরস্পরবিরোধী সংশয়ে রাখী ভেবেছে ‘তবে কি সেজানকেই ভালোবেসে এসেছে সে এতদিন’ [কু.কা./২৪]। প্রেমের অপ্রাপ্তিজনিত যন্ত্রণা, আত্মপ্রকাশের ব্যর্থতাজনিত দুঃসহ গ্লানি রাখীকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করেছে দুঃখের সীমাহীন অগ্নিদগ্ধ পথে। সেজানের শিরা জেগে ওঠা খসখসে হাত, শুষ্ক চেহারা, ধূলিধূসর মলিন পোশাক দেখে রাখীর মনে হয়েছে ‘লোকটা ভ- আর ধড়িবাজ। হ্যাঁ, ধড়িবাজ আর ভীতু। আসলেই জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু বাইরে ভাব-খানা দেখাচ্ছে যেন বা ভীষণ সাহস ওর। আর ঐ রকম কথা মনে হওয়ার পর লোকটাকে তার করুণা করতে ইচ্ছে হলো।’ [কু.কা/৫২-৫৩]। কিন্তু সেজান তার অন্তর্স্বভাবের স্বমহিমায় নির্বিকার, ক্ষোভহীন ও নির্লিপ্ত; যাকে রাখী তার অবচেতন আবেগের মধ্যে, স্বপ্নময় আকাঙ্ক্ষার মধ্যে স্পর্শ করতে পারেনি, ধারণ করতে পারেনি আপন করতলে। আর্ট এক্সিবিশনের ঝুলন্ত পেইন্টিঙের মতোই সেজান রহস্যময় এবং সুদূরের। তাই তার নিঃসঙ্গ জীবনের অতলান্ত মগ্নতায় বুদবুদের মতো ভেসে ওঠে সেজানের অস্তিত্ব এবং উপন্যস্ত কাহিনির অনিবার্য গতিস্রোতে উভয়ের সাক্ষাতে ব্যক্তিচৈতন্যের অন্তর্জগৎ প্রতিনিয়ত অপ্রাপনীয়তার তীক্ষ্ণ আঘাতে রক্তক্ষত, দীর্ঘনিঃশ্বাসের গরলে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার রাখীর সংগুপ্ত চৈতন্যে অসুস্থ সেজানকে শুশ্রুষাদানের আবেগে জাগ্রত হয় অব্যক্ত ও দুর্দমনীয় প্রেম। রাখী সেজানের জীবন এবং মৃত্যুর সূক্ষ্ম সেতুর মাঝে দাঁড়িয়ে পরাজিত করতে চেয়েছে কালো মৃত্যুকে ‘মরে যাওয়া অতো সহজ নয়। আর মরণ যদি আসেও তাহলে সে দেখবে। দেখবে, কেমন করে মরে যায় মানুষ।’ [পূ.পূ./৬১]
বস্তুত রাখীর অসম্ভব মানসিক শক্তি এবং যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় স্থানান্তর ও চিকিৎসা-শুশ্রƒষার মধ্য দিয়ে সেজানকে অনিবার্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। অতঃপর একদিন বৃষ্টিময় দুর্যোগপূর্ণ রাত্রে তথাকথিত প্রগতিশীলদের হঠকারিতা ঠাট্টায় করুণ, উদ্ভ্রান্ত, বিধ্বস্ত সেজানকে গ্রহণ করে রাখী। তাদের ‘এ গ্রহণ যেমন নিঃশেষে নিবেদনও তেমনই নিঃশেষে।’ [পূ.পূ./১৪২]
রাখীর প্রেমকে ঔপন্যাসিক রূপায়ণ করেছেন একটি চিরায়ত ব্যঞ্জনায়। জামানের সঙ্গে তার সম্পর্কের অন্তর্বর্তী ব্যবধানে কোনো অস্পষ্টতা নেই, রহস্যময়তা নেই, না চেনার কোনো অবকাশ নেই। ফলে জামান ছিল সহজলভ্য; যা প্রাপণীয়, প্রাত্যহিকতায় সীমাবদ্ধ তা যেমন আবেগহীন তেমনি ব্যক্তিত্বশূন্য ওই প্রেম রাখীর অন্তর্চৈতন্যে কোনো প্রণয়স্পন্দন জাগরিত করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু ‘সেজানকে ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছে মনি ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে। কিছুটা শ্রদ্ধা, কিছুটা ভয়, আর কিছুটা অপরিচয়ের রহস্য-এই সব মিলিয়েই সেজান সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে উঠেছে তার মনে।’ [দ.দি./১৪০]। এই চেনার মধ্যেও অচেনা, ধরার মধ্যে অধরা, পাওয়ার মধ্যে না পাওয়ার রহস্যাচ্ছন্ন সেজানকে রাখীর দুর্দমনীয় অথচ অব্যক্ত প্রেম অপ্রাপণীয়তার যন্ত্রণায় চিহ্নিত করেছে ‘শত্রু’; ‘ধড়িবাজ’; ‘ভীতু’ এবং ‘ভণ্ড’ রূপে। এই না পাওয়ার দূরত্বই চৈতন্যের যে প্রেমকে জাগ্রত রাখে তার মূল্য চিরন্তন। রাখী এবং তার বন্ধু ডা. সুমিতার সংলাপে সেই চিরন্তন প্রেমের স্বরূপ প্রতিধ্বনিত :

‘আচ্ছা সুমি, যদি সেজানের সঙ্গে সেই প্রথমেই বিয়ে হতো আমার, তাহলে কী হতো বলতো? আমার সংসার হতো, সুখ হতো, ছেলেমেয়ে হতো-তাই না? … রাখী চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। … বলে, আমি তাহলে সেজানকে পেতাম না। সেজানদের কি সহজে পাওয়া যায়, বল? ’ [পূ.পূ/১৬০]

নারীবাদ : বিসংগতিসূত্র ও মীমাংসা

বিংশ শতাব্দীর ষাট-দশকোত্তর সাহিত্য সমালোচনায় নারীবাদী দর্শনের চর্চাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বসহ বিবেচিত হয়ে আসছে। আমাদের আলোচ্য ত্রয়ী উপন্যাস নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে, ঔপন্যাসিক কোন অভিজ্ঞতা ও দার্শনিক মীমাংসার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
জেন্ডার ইক্যুায়ালিটির প্রসঙ্গটি এখন তাৎক্ষণিক, আকস্মিক এবং ভিত্তিহীন কিছু নয়। যদিও ইতিহাসের সুদীর্ঘকালব্যাপী নারী পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য দ্বারা অবদমিত, নিপীড়িত, শোষিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে। নারীকে অবদমনের জন্য কালে কালে আরোপ করা হয়েছে শাষণের নানান দৃষ্টিনন্দিত কৃৎকৌশল। ফলে নারী হয়েছে বিভ্রান্ত, দিশেহারা; সে নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের সীমাহীন অন্ধকার কূপে। ফরাসি নারীবাদী হেলেন সিজো নারীর এই অধস্তনতাকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন-নারী ইতিহাসের সুদীর্ঘকাল জুড়ে নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছিল, নিজের কথা সে বলতে পারেনি, নারীর তাই কোনো ইতিহাস নেই। নারীর ইতিহাস রূপে যা রচিত হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে পুরুষ নির্মিত ও রচিত ভাবমূর্তি, যা পুরুষতন্ত্রের নিজস্ব চিন্তাকাঠামো দ্বারা নারীকে অধস্তন ও নির্যাতন করার নতুন কৌশলমাত্র। হেলেন সিজোর প্রতিধ্বনি তুলে ফরাসি আরেক নারীবাদী জেভিয়ার গোথিয়ার [New French Feminisms, NY. 1981] বলেছেন-নারীকে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ও দৃষ্টিকাঠামোর বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রাম করে লিখতে হবে নারীর নিজস্ব ইতিহাস। যে প্রসঙ্গটি ভার্জিনিয়া উলফ ১৯২৯ সালে প্রকাশিত তাঁর এ রুম অব ওয়ানস ওউন গ্রন্থে নারীর জীবনের অনুকূল শব্দ, বাক্য ও ভাষা সংগঠন, যা নারীর নিজস্ব ব্যক্তিসত্তাকে উন্মোচন করবে, এটি ব্যাখ্যা করেন। উলফ এ গ্রন্থে নারীর আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিত এবং নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য সম্পর্কিত কারণকে নারীর প্রতিনিধিত্বহীনতার মৌলিক সূত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। সিমোন দ্য বোভ্যেয়ার সেকেন্ড সেক্স [১৯৪৯]-এ স্তাঁদাল, ডি এইচ লরেন্স প্রমুখের সাহিত্যে পুরুষতান্ত্রিক ধারণানির্মিত ‘নারী’ কল্পমূর্তির স্বরূপ ব্যাখ্যাসূত্রে দেখিয়েছেন-পুরুষতন্ত্র নিজেকে উন্নীত করে আত্মার বা মনের পরিশুদ্ধতায় এবং নারী মাংসস্তূপময় শরীর রূপে হীন করে তোলে ও পুরুষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। পরবর্তীকালে ম্যারি এলম্যান থিংকিং অ্যাবাউট ওয়্যোম্যান [১৯৬৮] গ্রন্থে নারী-পুরুষের লৈঙ্গিক পার্থক্য চিহ্নিত করেন এবং নারী সম্পর্কে পুরুষের আর্থসামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গিজনিত কতগুলি ভাবমূর্তির উল্লেখ করেন। সেগুলি-নারী নিষ্ক্রিয়, অসহিষ্ণু, অস্থিরচিত্ত, যুক্তিহীন ইত্যাদি। মার্কসীয় নারীবাদ মনে করে পুঁজিনিয়ন্ত্রিত সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির মতোই নারীর অবস্থানকে প্রান্তিক করে তোলে। সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য থেকে সাম্রাজ্যবাদ-সমগ্র প্রান্ত বিস্তৃত নারীর সংগ্রামের ক্ষেত্র।
র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট সুলামিথ ফায়ারস্টোন নারী নির্যাতন, নিগ্রহ ও অধস্তনতার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়, চিহ্নিত করেন লৈঙ্গিক আধিপত্য। ঔপন্যাসিক শওকত আলী রাখীর ভূমিকার মধ্যে লিঙ্গবাদী সমাজের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকে বিপর্যস্ত করেছেন। সন্তান উৎপাদনের কারিগর রূপেই কেবল সমাজ নারীর ইমেজকে নির্মাণ করেছে, উপন্যাসে সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত জামানের ইচ্ছে-অনিচ্ছের ক্ষমতায়নকে মৌন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে রাখী। ঔপন্যাসিক রাখীর মাতৃত্বের আকাক্সক্ষা রূপান্বয়ের মাধ্যমে জেন্ডার ইক্যুয়ালিটিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও একটি উত্তেজনার ফলে দুর্ঘটনাবসত রাখীর গর্ভস্থ সন্তান মৃত্যুবরণ করে। মার্কসীয় নারীবাদের পরিপ্রেক্ষিতে সন্তান উৎপাদনক্ষম বলেই এই ভূমিকা নারীকে যেমন গৃহবন্দি করে ফেলে তেমনি শ্রমবাণিজ্যে নারী হয়ে পড়ে মজুরিবৈষম্যের শিকার। সম্ভবত এ কারণে মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা উজ্জীবিত হওয়া সত্ত্বেও ঔপন্যাসিক রাখীর গর্ভস্থ সন্তানকে ঠেলে দিয়েছেন মৃত্যুর অন্ধকারে এবং রাখীকে করে তুলেছেন বন্ধনহীন, সংশয়মুক্ত, দ্বীধা-উত্তীর্ণ। কেননা এর পরপরই আমরা দেখি রাখী অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করে চলে যায় ঠাকুরগাঁওয়ে। উল্লেখ্য যে রাখী ইতঃপূর্বে ট্রাভেল এজেন্সির চাকরি গ্রহণ করলেও সে সেই অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পক্ষপাতি ছিল না, এমনকি তার বাবা রাশেদ সাহেবও। এর কারণ পূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এভাবে সকল প্রকার মুনাফাকেন্দ্রিক শ্রমবাণিজ্যের বিপরীতে একটি স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বাধীন আর্থ-পরিপ্রেক্ষিতে রাখীকে সংস্থাপন প্রকৃতপক্ষে ঔপন্যাসিকের জীবন-দর্শনেরই মূর্তায়ন। অথবা সম্ভবত ঔপন্যাসিক আকাঙ্ক্ষিত সমাজ রূপান্তরের যে সম্ভাবনা ও ইঙ্গিত রাখী-সেজানের সন্তানের মধ্যে উজ্জীবিত করেছেন; যে সন্তানের নাম রাখী রাখতে চেয়েছে সেজান-তারই মধ্যে বিপ্লবী সেজানের অসমাপ্ত স্বপ্নকে পল্লবিত করতে চেয়েছেন। লিঙ্গভিত্তিক পুরুষতান্ত্রিক ইচ্ছে-অনিচ্ছের প্রতিফলনকে ঔপন্যাসিক অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে রোপন করেছেন শ্রেণিবিভাজনহীন সমাজ নির্মাণের স্বপ্নীল জীবনকোষ।
কিন্তু সেজানের নিকট আত্মসমর্পিত রাখীর ব্যক্তিসত্তা কখনো চূর্ণিত হয়নি, ধূলিলুণ্ঠিত হয়নি তার নারীত্ব। যদিও সেজানকে সে অনুনয় করেছে- ‘না শুধু জানলে হবে না। তোমাকে দেখতে হবে। আমার মনকে পায়ের তলায় মাড়িয়েছো সবাই, আমার শরীরকে কলঙ্কিত করেছো, আমার নামে অপবাদ দিয়েছো-আমি এখন কী করবো বলো। আমাকে দেখো আর বলো। বলো, আমি এই জীবন নিয়ে কী করবো?’ [পূ.পূ./১৪২]-এই উক্তিতে যে মধ্যম পুরুষকে রাখী তার আবেগময়, ক্রন্দনময়, সর্বস্ব হারানোর যন্ত্রণায় অভিযোগচিহ্নিত করেছে, তার কেন্দ্রে কে? সেই মধ্যম পুরুষ কোনো একক ও নির্দিষ্ট পুরুষ নয়; যে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি নারীর ব্যক্তিত্বকে মানবিক মর্যাদা দানে অস্বীকৃত, নারীর পৃথক ও স্বাধীন অস্তিত্বের বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক সেই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিই রাখীর লক্ষ্য। অন্যদিকে সেজানের নিকট এটি তার আত্মসমর্পণ নয়; এটি আত্মনিবেদন, যে নিবেদনের অন্তর্স্রোতে আছে নারীত্বের সম্মান, নারীর নিজস্ব সত্তার প্রবল উপস্থিতি। সেজানও নারীর মানবিক অস্তিত্বের প্রতি, নারীর স্বতন্ত্র চৈতন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ কারণে রাখী কী করবে সেজান তা জানিয়ে গেছে কিনা-সুমিতার এই প্রশ্নে রাখীর দীপ্ত অভিব্যক্তি- ‘আমি কী করবো না করবো, সে কথা ও বলতে যাবে কেন?’ [পূ.পূ./১৪৩]। নারীর নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা; নিজের কর্ম, রুচি, স্বাধীন চিন্তার, স্বাধীন অভিব্যক্তিপ্রকাশক ক্ষমতার এই স্বীকৃতি ঔপন্যাসিকের সচেতন নারীবাদী চিন্তারই স্বরূপচিহ্নিত।
যদিও বুলু চরিত্রে পরাজয় এবং মৃত্যুর মধ্যে তার পরিণাম দৃশ্যমান। কিন্তু বুলু ঔপন্যাসিকের আদর্শ নয়; এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। বুলু নারীত্বের অপমান, সামাজিক বিত্তবৈভব ও জৌলুসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যতটা দৃঢ় ও আত্মপ্রত্যয়ী হলে একটি ইতিবাচক পরিণামের দিকে অগ্রগামী হতে পারে তা তার চরিত্রে দৃশ্যমান নয়। তাছাড়া এই উপন্যাসের অপরাপর নারী চরিত্র, যেমন-পারভীন, নার্গিস, ইভা-এরা সমাজের প্রবহমান স্রোতে ভাসমান। বরং বুলু, পারভীন, নার্গিস অথবা মিসেস জোহরা হাফিজের রূপ-সৌন্দর্যকে আধুনিক হয়ে উঠবার চেষ্টায় ক্রমবিকশিত পুঁজিবাদী সমাজের বাণিজ্যিক উপকরণ রূপেই ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা ‘নারীর শরীর, শরীরে উপর শুধু নয় ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গও, নারীর ঘর, নারীর প্রকাশভঙ্গি, হাঁটাচলা, নারীর পোশাক, নারীর যৌনতা-যৌন ক্ষমতা ও অক্ষমতা-সবকিছুই তাই কঠোর মনোযোগের আওতায়। এর প্রতিটি ক্ষেত্র বাণিজ্য-সম্ভাবনায় ভরপুর, প্রতিটি ক্ষেত্র নানামাত্রার সহিংস আক্রমণের লক্ষ্য, তার উপাদানে পূর্ণ।’ [আনু মুহাম্মদ, নারীর জগত এবং কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্ত, ‘চন্দ্রাবতী’, ১ম সংখ্যা ২০০৬, পৃ.১২]। এ কারণে বুলুকে তার আজন্ম বেড়ে ওঠা শান্ত, সংসারমুখি জীবন থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে হয় মদ ও জুয়ার আড্ডায়; স্বামীর ব্যবসায়িক পার্টনারকে দান করতে হয় শরীর। অনিচ্ছাকৃত হলেও সমাজ অস্বীকৃত এই সম্পর্ক নারীর জীবনকে নিক্ষেপ করে উন্মার্গগামী হয়ে পতিতাপল্লির অন্ধকার কুঠরিতে অথবা উন্মাদ অথবা মৃত্যুর নির্দ্বন্দ্ব প্রকোষ্ঠে। যেমন কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের রোহিণী অথবা চরিত্রহীনের কিরণময়ী। পুরুষ এখানে শত অপরাধেও পদস্খলিত নয়, বরং স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত; কিন্তু অন্যপক্ষে নারীকেই বহন করতে হয় ক্ষতির, বিনষ্টের ও অস্পৃশ্যতার যাবতীয় গ্লানি। সমাজ-সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় আইন, প্রশাসনযন্ত্র, ধর্মীয় চেতনা-সমস্তই নারীর বিরুদ্ধে। সমাজের এই পুরুষতান্ত্রিক এবং নারীকে বাণিজ্যে পরিণত করবার পণ্য-সংস্কৃতির স্বরূপ উল্লিখিত চরিত্রের রূপান্তরে ও কাহিনিগুচ্ছে উন্মোচিত। এবং এই সংস্কৃতির বিপরীতে ঔপন্যাসিক রাখীকে উজ্জীবিত করেছেন দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞানে।
সম্ভবত, এ কারণে অবৈবাহিক সম্পর্কসূত্রে রাখীর গর্ভধারণে পিতা রাশেদ আহমদ দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, এমনকি প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ডা. সুমিতাও এটা প্রথমে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষু, কটাক্ষ এবং নারীর প্রতি প্রচলিত মূল্যবোধের ঊর্ধ্বে ওঠেন উভয়েই। ত্রয়ীর শেষাংশে সেজানের মৃত্যু সংবাদে জ্ঞানহীন কন্যার ‘সামনে রাশেদ আহমদের যে ব্যক্তিস্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে, তা সময় ও অভিজ্ঞতার ভারে অবসন্ন অথচ শুশ্রƒষাকামী পৌরুষের অমেয় সম্ভাবনা-শক্তির ইঙ্গিতে তাৎপর্যময়’ [রফিকউল্লাহ খান, বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ/৩০৭]। এই শক্তি ও সম্ভাবনা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিকার, বিসংগতি, চিৎকৃত নিনাদ ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নারীত্বের স্বীকৃতিতে :

‘রাশেদ সাহেব একসময় এগিয়ে এসে মেয়েকে তুললেন-পারেন না, শরীর কাঁপে, তবু তুললেন। তাঁর শরীর প্রকাণ্ড দেখালো তখন, সাদা চুলে আলো, আর পিতা সন্তাকে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যস্ত, ধ্বংস, কোলাহল, চিৎকার আর তার মাঝখানে দু’বাহুর ভাঁজের মধ্যে তুলে ধরা সন্তান নিয়ে ঐ পুরুষ।’ [পূ.পূ./১৫৯]

রূপকের মতো প্রতিবিম্ব

আমাদের আলোচ্য ত্রয়ী উপন্যাসের কাহিনিসংগঠন, চরিত্রাবলির টানাপোড়েন, অন্তর্মুখী মনস্তত্ত্বের বিকাশ ও পরিণাম অনেকাংশে রূপকের মতো প্রতিবিম্বিত, কিন্তু এ্যালিগোরিক্যাল উপন্যাস বলতে যে বিশেষ ফর্মের বিন্যাসকে নির্দেশ করে, এই ত্রয়ী উপন্যাস তা নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ; ষাটের দশকের জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি; সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা, কিন্তু তাত্ত্বিকতর্ক ও আত্মস্বার্থগত পাস্পরিক উত্তেজনা ও হঠকারিতায় ওই সম্ভাবনাসমূহের বিনষ্টের পরিপ্রেক্ষিতে ঘনীভূত রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হওয়া-এই কাহিনি-পারম্পর্যের সমান্তরালে রাখীর বৃক্ষের মতো ধীরগতিসম্পন্ন বিকাশ, তার মনস্তাত্ত্বিক ও সাংসারিক জটিলতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্ট হওয়া এবং চৈতন্যের সমস্ত দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে একটি মীমাংসায় উত্তীর্ণ হওয়ার কাহিনিপুঞ্জ পরস্পরিত হয়ে সৃজন করেছে একটি প্রচ্ছন্ন রূপকের ব্যঞ্জনা।
কাহিনিপুঞ্জের এই পরস্পরিত পরিণাম ঔপন্যাসিক আরো সচেতন শিল্পপ্রজ্ঞায় ক্রমরূপান্তরিত করেছেন টুকরো টুকরো ঘটনা বর্ণনার আশ্রয়ে। রাখীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে আনেকক্ষেত্রে ওই ঘটনার গীতোচ্ছ্বাস ব্যক্তিচৈতন্যের মৃদুকম্পিত আবেগ ও স্বপ্নময়তাকে করে তুলেছেন রূপকের পরিচর্যায় ব্যঞ্জনাময়। যেমন, প্রেসক্লাবের পেইনটিং এক্সিবিশন দেখতে গিয়ে সেজানের সঙ্গে রাখীর সাক্ষাৎ হয় দীর্ঘদিন পর; যে সেজান সম্পর্কে রাখীর অবচেতন মন সর্বদা ছিল উৎসুক, আগ্রহী, আবেগময় এবং ক্রমশ প্রণয়কাতর। তাই ‘গেটের ডান দিকে লনের উপর’ দাঁড়ানো সেজানকে দেখে সে চমকে উঠেছিল। তার কাছে চিত্রশিল্পের এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজমের জটিল রেখার বিচিত্র বিন্যাস যেমন দুর্বোধ্য তেমনি সেজান তার কাছে ভীতি, শ্রদ্ধা এবং কিছুটা অপরিচয়ের মিশ্র রহস্যে আবৃত :

‘… দেখুন আর্টের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।
ইতিমধ্যে সুমি এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। বললো, নে চল, এবার যাওয়া যাক।
কেন যে, রাখী ভেবে পায় না। বুকের ভেতরে কেমন করে ওঠে বারান্দার দিকে পা বাড়ানোর সময়। বারান্দায় পা রেখেছে, ঠিক তক্ষুণি এগিয়ে এলো, এসে একেবারে সামনে দাঁড়ালো।
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন। বোধ হয় মুহূর্তের জন্যই। রাখীকে দেখছে সেজান। রাখী একবার চোখ তুলে তাকিয়ে মুখ নিচু করে নিলো। কেবলি মনে হচ্ছিলো এই বুঝি জিজ্ঞেস করবে, রাখী তুমি কী করবে এবার?’ [দ.দি/৪৩]

আবার রাখী ট্রাভেল এজেন্সির চাকরি গ্রহণের পর ক্রমশ হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ, যন্ত্রণাবিদ্ধ ও দিশেহারা। এই যন্ত্রণা ও দ্বন্দ্বমুক্তির জন্য সে তার আজন্ম শুশ্রƒষাদানকারী বাবার সান্নিধ্যে আসে তখন বাইরের আলোকিত রাত্রি, রিকশার যান্ত্রিক ধ্বনি কোলাহলমুখরিত হয়ে প্রতিধ্বনি তোলে। সেজানের সঙ্গে তার সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেও বাইরের আলো ঘরের অস্বচ্ছতাকে, অন্ধকারকে আলোকিত করার দৃশ্যরূপময়তা পরস্পরিত হয়ে সৃষ্টি করে প্রতীকী অনুষঙ্গ। বাণিজ্যপুঁজিনির্ভর ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরির মধ্যে আত্মপরাভবের গ্লানিময় অন্ধকার যেন সেজানের রাজনৈতিক আদর্শে, আত্মত্যাগে আলোকিত হয়ে উঠেছে। এই আলো প্রক্ষেপণ ঔপন্যাসিকের শিল্পচৈতন্য ও রাজনীতিমনস্কতাকে করে তোলে রূপকায়িত :

‘… আজ সেজানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
রাশেদ সাহেব আগ্রহী হলেন, তাই নাকি, কোথায়?
পথে, রেস্তরাঁয় খেতে যাচ্ছিলো, আমিই সঙ্গে নিয়ে গেলাম। অনেক কথা বললো। সব রাজনীতির কথা-নিজের কথা একদম ভাবে না।
রাশেদ সাহেব একটু অন্যমনস্ক হলেন। রাস্তার আলো জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে আভা ফেলে গেলো একবার। রাখী শুনলো, হ্যাঁ ঐ মনির মতোই আর কি!’ [দ.দি./৮৯]

এক ধরনের সরল ও আচ্ছন্ন লিপিকৌশলে শওকত আলী বুনন করেছেন এই ত্রয়ী উপন্যাসের কাহিনিপুঞ্জ। যেমন-সেজান অসুস্থ রাখীকে হাসপাতালে রেখে গ্রামে চলে যাবার সিদ্ধান্ত জানালে রাখীর অন্তরাত্মা শীতার্ত নিসর্গের মতো নীল কষ্টের ঠাণ্ডা স্রোতে হয়ে ওঠে স্থির ও নিঃসঙ্গ :

‘… রাখী এবার আমাকে বাইরে যেতে হবে।/ বাইরে? কোথায়?/ গ্রামের দিকে।/ কেন, গ্রামের দিকে কেন? রাখী বুঝেও যেন বুঝতে চায় না।/ গ্রামের দিকে কাজ রয়েছে আমার।
তখন অনেক রাত। হেমন্ত-শীতের রাত। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরের কিছুই দেখা যায় না। সেজানের চোখের দিকে তাকিয়ে রাখী স্থির হয়ে যায়।’ [কু.কা/৭৮]

অকারণ উপমাক্রান্ত করে তোলেননি ঔপন্যাসিক তাঁর ভাষাকে। নিঃশ্বাসের মতো, আলো ও বাতাসের সমবায়ী অনুকল্পে কাহিনির গতিকে ঔপন্যাসিক যেমন প্রবাহিত করেছেন সারল্যে, তেমনি ব্যক্তির মনোজগৎ, আবেগ, উত্তেজনা এবং আকাঙ্ক্ষাকে পরিপার্শে¦র বর্ণময়তা, বস্তুবিশ্বের রেখা ও ধ্বনিময়তার সঙ্গে একীভূত করে দিয়েছেন। বাঙালি জাতির উত্তাল দিবারাত্রিসমূহের অত্যাশ্চর্য আবেগের কাহিনি রূপায়ণে তাঁর ভাষা নির্মেদ এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে স্বতঃস্ফূর্ত ও গতিশীল পারম্পর্যে পরিচর্যিত হয়েছে এক উত্তাল তরঙ্গবিক্ষুব্ধ কালের অভিজ্ঞান।
এই, তবে, শওকত আলী ত্রয়ী উপন্যাসে সময় ও সমাজবাস্তবতার প্রচলিত ছকের বাইরে নতুন কোনো কণ্ঠস্বর হয়ত সৃষ্টি করেননি, কিন্তু নতুন জীবনের সম্ভাবনার যে চিত্রসংকেত তিনি দিয়েছেন তা হয়তো দূর ভবিষ্যতে মানুষের বিবিধ শৃঙ্খল মোচনের ইতিহাসকে উজ্জীবিত করবে।
আজই, তাঁর প্রয়াণের এই হিমার্ত দিনে, আমাদের প্রত্যাশিত মন সেই স্বপ্নময়তায় পল্লবিত হতে চাই, হয়ত, এবং এই-ই অনিবার্য হোক যে, বহুকাল অতিক্রমের পরও আলো ও নিশ্বাসের মতোই নতুন প্রজন্মকে, শওকত আলীর কথাসাহিত্য দেবে দিশা, দেবে নতুন ভোরের সোনালি দিগন্ত।
তাঁর সৃষ্টি এবং আদর্শবাদী ব্যক্তিজীবনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close