Home পঠন-পাঠন আমার জীবনানন্দ >> মেঘ অদিতি ফেরদৌস মাহমুদ রুখসানা কাজল

আমার জীবনানন্দ >> মেঘ অদিতি ফেরদৌস মাহমুদ রুখসানা কাজল

প্রকাশঃ October 22, 2017

আমার জীবনানন্দ >> মেঘ অদিতি ফেরদৌস মাহমুদ রুখসানা কাজল
0
0

আমার জীবনানন্দ >> মেঘ অদিতি ফেরদৌস মাহমুদ রুখসানা কাজল 

[গুচ্ছ-১]

[সম্পাদকীয় নোট : প্রিয় কবি হলে তাঁর কবিতা পাঠকের অনুভবে অভিঘাত তোলে। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন এমনই একজন কবি। তিনি কতটা কীভাবে লেখক-পাঠকের মনে আলোড়ন তুলেছিলেন, পড়ুন সেরকম তিনজনের কথা। পরে প্রকাশিত হবে আরও কয়েকজনের লেখা।]

মেঘ অদিতি >> যেভাবে কবিতার জন্ম হয়
আজ
৬ কার্তিক, ১৪২৪। এবং অবিরাম বৃষ্টি। বৃষ্টি এলে ট্রাফিক সিগন্যালগুলো বৃষ্টি মেখে কেমন ফ্যাকাসে লাল হলুদে একাকার হয়। দ্রুত ধাবমান গাড়িগুলোকে সমান্তরালে রেখে আমি হেঁটে চলেছি শেষ বিকেলের আলো মেখে। এ দৃশ্যে কোনো শব্দ নেই। আলো আছে, আঁধারও। বাতিগুলোকে এখন লাল হলুদে খেলায় পেয়েছে। সেদিনও শেষবিকেলে যখন পাতা ঝরছিল টুপটাপ, তিনি হেঁটে চলেছেন সেদিন রাসবিহারী এভিনিউ ধরে। এসব দৃশ্যের ভেতর সেদিন কোথাও ছন্দপতন ঘটেনি।
একজন বিষণ্ণ অন্যমনস্ক মানুষ কি তখন কোনো কবিতা নিয়ে ভাবছেন… কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র না করে হেঁটে চলেছেন রাসবিহারী এভিনিউ ধরে… সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎই পেয়ে যাই কবিতার দু লাইন। রঙ ভাঙতে ভাঙতে আসে আলো। আলো ভেঙে ভেঙে রঙ। চৌকো জানলায় এবার গোলগাল সবুজ হবে ইলিউশন। থেমে থাকা গাড়িগুলোর জানলার কাচে এক-একটা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার পর চারদিকে আলতো ছড়িয়ে পড়ে গড়িয়ে নামতে থাকে নিচে। এ কেমন কার্তিক এবার, এ কেমন বিষণ্ণ আকাশ? দিনভর মন খারাপের বিষণ্ণ আলো লেগে থাকবে আজ শহরের সবগুলো গাছের পাতায় পাতায়। আজ হয়তো আমার কাছে শব্দের আসা যাওয়া অলক্ষ্যে, নিঃসাড়ে। আজ সারাদিন হয়তো কবিতার দিন…ওয়াইপারগুলোর ঘসামাজায় কাচে খুব ধীরে ফুটে ওঠে কার্তিকের ঘোলাটে আকাশ। নির্জনে বুকের খুব গভীর থেকে কেন যেন উচ্চারিত হয়, ‘সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চলে যেতে হয়’। সিগন্যাল সবুজ হয়। ফিরে আসে কেজো স্মার্ট দুনিয়া। আর সেসব কাজের মাঝে থেকে থেকেই ঘাঁই মেরে ওঠে মন খারাপ। এমন ভিজে মেঘের দিনে, এমন শীতল হাওয়া- জল টুপটুপ দৃশ্যের ভেতর পাতায় পাতায় জমে থাকে জলবিন্দু। জন্ম নেয় শব্দ, হয়ে উঠতে চায় কবিতা। সকালে সেই দু’লাইন কবিতার পরের লাইনগুলো কিছুতেই আর গুছিয়ে তুলতে পারি না। এসব সময় একান্তই আমার হবার কথা। অথচ অজান্তেই এই দৃশ্যে ঢুকে পড়ে পাশের ফ্ল্যাটের টিভির জোড়ালো শব্দ। ছেলের ঘর থেকে ভেসে আসে,

So, so you think you can tell
Heaven from hell
Blue skies from pain
এত কোলাহল… একা হতে চাই। এক মগ কফি নিয়ে বারান্দায় এসে বসি। নিচে জলজমা রাস্তায় ভারী হতে থাকা যানজটে বাতাসও কেমন থমকে গেছে যেন। ভাবি, নিজেকে আলগা করতেও জানতে হয়। জানি না বলে নির্জনতার খোঁজে আমি এ ঘর ও ঘর পালিয়ে বেড়াই যা আদৌ আমাকে নির্জনতার সন্ধান দিতে পারে না। মনে পড়ে যায় নির্জনতাপ্রিয় সেই বিচ্ছিন্ন ও বিষণ্ণ কবির কথা পৃথিবীকে যিনি দেখতে পেয়েছিলেন তার অন্য চোখ দিয়ে। কেন যেন আজ থেকে থেকে উঠে আসে এক একটা দৃশ্য।

সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চ’লে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি।
সেইসব একদিন হয়তো বা কোনো এক সমুদ্রের পারে
আজকের পরিচিত কোনো নীল আভার পাহাড়ে
অন্ধকারে হাড় কঙ্করের মতো শুয়ে
নিজের আয়ুর দিন তবুও গণনা ক’রে যায় চিরদিন

এই দৃশ্যে তিনি আসেন। বারবার ঘুরেফিরে আমাকে দেখেন। এবং তিনি হাসেন। আর আমি যেন ‘বিপন্ন বিস্ময় থেকে ফিরে আসি বিশুদ্ধ বিস্ময়ে’। ঝরে পড়ছে জল, অবিরাম। দূরের ঘরগুলোতে জ্বলছে ফ্যাকাশে সব আলো। মনের ভেতর, কলকল করছে অজস্র পাখি। কখনও ঝরঝর ঝর্ণা। যেন টানা অনেকগুলো রুক্ষ দিনের শেষে হঠাৎ চারপাশ কোমল সতেজ হয়ে উঠেছে। যতটা নিঃসঙ্গতা আমি খুঁজে বেড়াই তাতে তিনিই ধরা দেন বারবার। বারবার ধেয়ে আসা বেকারত্বের দুঃসহ সেসব দিনে তিনি কতটা একা হয়ে গেছিলেন ভাবি। এইসব দিনের সাথে পরিচয় যাদের আছে তারা জানে এ সময় কেমন। প্রতি পল কেমন গোত্তা খেয়ে খেয়ে চলে আর কাছের মানুষগুলো কেমন দূরে ঠেলে দেয়। আর এসব দুঃসহ দিন অনেকগুলো দিন না হয়ে যদি  অনেকগুলো বছর হয়, তাহলে জীবন হয়ে ওঠে নিস্তরঙ্গ। লেখার খাতা কেমন খোলা পড়ে থাকে। শব্দগুলো উড়ে যায় উজানী হাওয়ায়। অথচ আজ, এই দৃশ্যে তার হাসিমুখ ধরা পড়ে। তাকিয়ে দেখার আনন্দে যে মুখ হাসে। বহুদিন পর আবার তাঁর কাঁধে পাঞ্জাবির নিপাট ভাঁজে জীবন স্বস্তিদায়ক অভয় হাতটি রাখে। খোলা খাতায় আবার পরপর শব্দরা জমা হয়। প্রিয় নদীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালে বারবার মনে হয় জীবন আনন্দময়।

হে কালপুরুষ তারা, অনন্ত দ্বন্দ্বের কোলে উঠে যেতে হবে
কেবল গতির গুণগান গেয়ে—সৈকত ছেড়েছি এই স্বচ্ছন্দ উৎসবে

আর তাঁর শৈশব?
আকাশে তখন শুকতারা। রূপকথা দিনের ভেতর কোথাও ভোর নেমে আসে নিঃশব্দে। আধো ঘুমে জাগরণী সঙ্গীতের মতো বেজে ওঠে মা। বাবার গমগমে কণ্ঠ জুড়ে উপনিষদ। ঘুমচোখেই শোনে সে। মাথায় কোমল হাত, মা। মিলুর দিন শুরু হয়। বাড়ি-ভর্তি কত লোক। মোতির মা, শুকলাল, মোতিলাল, আলী মামুদ, ফকির। কারো কাছে রূপকথার সম্ভার, কারো কাছে বন জঙ্গলের দিনরাত, কেউ বা নদীর কথা বলে, কেউ শিখিয়ে দেয় ঘাসের যত নাম। প্রকৃতির সন্তান হয়ে বেড়ে ওঠে সে। প্রকৃতিও বড় উদারভাবে ছড়ায় রঙ, ফসলের মাঠ, নদীর সখ্য, ঋতুর বদল একটু একটু করে তাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। একটু বড় হলে ইশকুল নয় প্রথম পাঠ- মা’র কাছে যে মা নিজেও কবিতা লিখতেন। বড় হতে হতে মিলু যখন চেনা পৃথিবীর বাইরে এলো তখন এক অচেনা পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো নিজেকে একলা আর নিঃসঙ্গ মনে হলো।
মানুষেরা বার-বার পৃথিবীর আয়ুতে জন্মেছে;
তবুও কোথাও সেই অনির্বচনীয়
স্বপনের সফলতা—নবীনতা—শুভ্র মানবিকতার ভোর?
নচিকেতাজর্থুস্ট্র লাওৎ-সে এঞ্জেলো রুশো লেনিনের মনের পৃথিবী
হানা দিয়ে আমাদের স্মরণীয় শতক এনেছে?
অন্ধকারে ইতিহাসপুরুষের সপ্রতিভ আঘাতের মতো মনে হয়
যতই শান্তিতে স্থির হ’য়ে যেতে চাই;
কোথাও আঘাত ছাড়া—তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নাই
সন্ধে নেমেছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে এখনও। আর কেমন ঠাণ্ডা বাতাস। সুপুরী গাছগুলো একে অন্যের গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছে। পথ হাঁটার অনভ্যস্ততায় থেমে যাই কতবার। ভোরের আলোয় মুখে ফুটে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আর তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে পাশের মানুষটি বলে ওঠে এ সবই অনভ্যাসের ফল। অনভ্যাস, অনভ্যাস.. তাহলে তিনি? সে কি ছিলো না রোজকার অভ্যাস! পথ হাঁটা ছিলো তার পুরনো নেশা। কত পথ তিনি হেঁটে বেড়াতেন যে তার ইয়ত্তা ছিল কি! রোজকার হাঁটার ভেতর দিয়েই এসে যেত শব্দ নতুন কোনো ভাবনা। কখনও হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেতেন নদীর ধার ধরে হেঁটে চলেছে মিলু নামের ছোট্ট সেই ছেলেটা যাকে দূর্বা ঘাস আর মধুকূপী ঘাসের পার্থক্য শিখিয়েছিল সেই ফকির। হেমন্ত তাঁর প্রিয় ঋতু। ধানসিড়ি তার প্রিয় নদী আর হেঁটেচলা তার প্রিয় এক অভ্যাস। সেদিন শেষবিকেলে যখন পাতা ঝরছিল টুপ টাপ, তিনি হেঁটে চলেছেন রাসবিহারী এভিনিউ ধরে। এসব দৃশ্যের ভেতর কোথাও ছন্দপতন ঘটেনি।
একজন বিষণ্ণ অন্যমনস্ক মানুষ কি তখন কোনো কবিতা নিয়ে ভাবছেন…কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র না করে হেঁটে চলেছেন রাসবিহারী এভিনিউ ধরে। শেষ বিকেলের সেই ধূসর চিত্রে সেদিনও কি বাহ্যিক শব্দের কার্ফু, কিছু পর অন্তর্গত শব্দরা এক ট্রাম লাইন বরাবর শুয়ে থাকবে চিত্রার্পিত, হয়ত কবিতা, যেভাবে জন্ম হয় কোনো এক কবিতার।

কী একটা, কী যেন…অথচ বুঝতেই পারছিলাম না। এতক্ষণে দেখলাম ছোট মেয়েটাকে, হাতে লাল গোলাপ। ওর কাছেই দাঁড়িয়ে আমি। অথচ…যেন গাড়ির কাঁচ তোলা, আর বাইরের দুনিয়া থেকে কে যেন ফুল বাড়িয়ে দিচ্ছে…এ কি একটি সার্থক কবিতার জন্ম দেবার উপহার? তাহলে আমার দুনিয়া এত শব্দহীন, রঙহীন কেন, অথচ ফল্গুর মত নয়, বিচ্ছিন্ন হলেও এক একটি শব্দ, শব্দের পর এসে লাগছিলো স্বীয় অভিযোজনেই। আমি দেখছিলাম সেই শব্দকে, তার রঙ, রস, প্রিয়তা অথবা বিভ্রম ছুঁতে কখন প্রত্যক্ষ থেকে পৃথক, আমি…

তিনিও কি এমনই…

ফেরদৌস মাহমুদ >> জীবনানন্দ ঘাস হতে চেয়েছিলেন, হয়তো আমিও… 

আজ সকালে ঘুম ভাঙার পর যদি কেউ আপনাকে জিজ্ঞেস করে, ‘জীবনে কখনো ঘাস দেখেছেন’? নিশ্চয়ই হতভম্ব হয়ে প্রশ্নকর্তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকবেন। ভাববেন এ আৃবার কেমন প্রশ্ন! ঘাস দেখেনি এমন পাখি, এমন ব্যাঙ, এমন ফড়িং, এমন ঘোড়া, এমন গরু, এমন জেব্রা, এমন মানুষ, এমন হরিণ কিংবা এমন কোনো স্থল-প্রাণী আদৌ আছে কি? কেবল স্থল-প্রাণীর কথা ভাববেন এই কারণে যে, জলজ প্রাণী অর্থাৎ মাছেরা, কুমিররা হয়ত ঘাসের সাথে পরিচিত নাও হয়ে থাকতে পারে।

তবে আপনি রোজ সূর্য দেখার মতই নিশ্চিত আপনি ঘাস দেখেছেন, কেননা- আপনার পাড়ার মাঠ- স্কুলের মাঠ- মসজিদ-মন্দির বা গীর্জার মাঠ- গাঁয়ের মাঠসহ বলা চলে চেনা প্রায় সবমাঠই ঘাসে ভরা। এই ঘাস বৃষ্টিতে ভেজে, শীতে শরীরে শিশির মাখে, গ্রীষ্মে দুপুরের কড়া রোদে পুড়ে গরম হয়। এই ঘাসে ঘাসফড়িং লাফায়- পিঁপড়ে হাঁটাহাটি করে- ঘাসের ডগা ছিঁড়ে খায় পাড়ার গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন চতুষ্পদী। এই ঘাসে আপনি বেশিরভাগ পড়ন্ত বিকেলে হাঁটেন, দৌড়ান, বসেন বা কোনো নস্টালজিক সন্ধ্যায় নিজেতে বুঁদ হয়ে শুয়ে পড়েন মিটি মিটি নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে।

হয়ত মনে মনে আওড়ান তখন ওয়াল্ট হুইটম্যানের Leaves of Grass বইয়ের Song of Myself কবিতার কয়েকটি লাইন, যেখানে কবি নিজেই নিজেকে উদ্যাপন করতে চেয়ে বলছেন- I celebrate myself, and sing myself / And what I assume you shall assume / For every atom belonging to me as good belongs to you.

আচ্ছা কেউ যদি মানুষজন্ম না চেয়ে ঘাসজন্ম চায় কেমন হয় বলুন তো।  পাঠক হয়ত ভাবছেন ঘাস আবার কেউ হতে চায় নকি? চায়, জীবনানন্দ দাশ চেয়েছিলেন। আসুন জীবনানন্দ দাশের ‘ঘাস’ কবিতাটি পাঠ করি এবং কবিতাটির মধ্যে নিজেকে উদ্যাপন করি-

কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়

পৃথিবীর ভ’রে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;

কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস- তেমনি সুঘ্রাণ-

হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে!

আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো

গেলাসে গেলাসে পান করি,

এই ঘাসের শরীর ছানি- চোখে চোখ ঘষি,

ঘাসের পাখনায় আমার পালক,

ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার

শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।

২.

কবিতাটির প্রথম চার লাইনে দেখা যাচ্ছে এক ভোরের বর্ণনা। যে ভোরে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়েছে মাঠভর্তি সবুজ ঘাসে। জীবনানন্দের মতে এই আলো কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ। এই আলো ঘাসের সবুজের সাথে মেশায় কাচা বাতাবীর মতো অন্যরকমের সবুজ হয়ে গেছে ঘাস। আর তখনই একটি হরিণ এসে একটু একটু করে ছিড়ে খাচ্ছে কচি ঘাসের ডগা। কবিতাটির প্রথম চার লাইনের বক্তব্য বলতে, এই মায়াবী নিসর্গের দৃশ্যটুকুনই পাওয়া যায়।

জানি- আমি যদি আঁকিয়ে হতাম তাহলে হয়ত তুলি হাতে বসে যেতাম এই দৃশ্য আকার চেষ্টায়। রবীন্দ্রনাথ একসময় তার ‘বিচিত্রতা’ বইয়ের ৩১টি কবিতা লিখেছিলেন বারোজন শিল্পীর ৩১টি ছবি সামনে রেখে। আবার এমন নজিরও আছে, অনেক বিখ্যাত শিল্পীই কবিতার মধ্যের শব্দে শব্দে বুনা চিত্র নিয়ে তুলির টানে এঁকেছেন ছবি। এক্ষেত্রে আমার ছবি আঁকতে বসাটা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক কিছু হত না।

যদি কোনো জাহাজের কাপ্তান হতাম, চলে যেতাম জাহাজ নিয়ে সুন্দরবনের সাথের নদীতে কিংবা অচেনা বনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলাশয়ের পাড়ে যেখানে ভোর হলে হরিণ চড়ে বেড়ায় আর চারদিকের আলো হয়ে যায় কচি লেবু পাতার মতো সবুজ। আমি জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দূরবীণ হাতে দেখতাম ওই ভোরের আলোয় চড়ে বেড়ানো হরিণ।

আমি যেহেতু শিল্পী নই বা জাহাজের কাপ্তান নই, তাই কেবল এইসব দৃশ্যের কথা মুগ্ধ হয়ে ভাবি- আর বিস্ময়কর এক নৈসর্গিক শান্তির মধ্যে ডুবে যাই। প্রশ্ন জাগে কবি ভোরের ওই আলোকে কচি লেবু পাতার মতো বলছেন কেন? চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে শৈশবে দেখা স্কুলের লেবুপাতাভর্তি এক লেবু গাছ। যেখানে মাঝেমধ্যে ফুটে থাকতো শাদা লেবুফুল। কিন্তু ওই গাছটিতে কখনও লেবু হতে দেখিনি। গাছটিতে কেন লেবু হত না আজও আমার জানা হয়নি। আমি বাতাসে টের পাই ওই গাছের লেবুপাতার ঘ্রাণ।

চমকে উঠি কবিতাটির পরের লাইনগুলো পড়ে। লক্ষ করি জীবনানন্দ দাশ কচি লেবু পাতার মতো ভোরের আলোয় অসংখ্য ঘাসের ভিড়ে এক কচি ঘাসপাতা হয়ে জন্মাতে চাইছেন। জীবনানন্দের বহু কবিতার মধ্যেই এই পুনর্জন্মের ইচ্ছা ব্যক্ত হতে দেখি। ভাবি, পুনর্জন্মে  বা পুনরুত্থানে বিশ্বাসি না হলে হয়ত কবি হওয়াই সম্ভব না! কিন্তু যে জীবনানন্দ শঙ্খচিল, শালিক বা হাঁস হয়ে পৃথিবীতে আসতে চেয়েছিলেন- তিনি কেন আবার ঘাসজন্ম  চাইলেন?  কবিতাটির শেষ লাইনে বলা ‘সুস্বাদ অন্ধকার’ কথাটার মানেই বা কি? অন্ধকার কি কোনো খাবার যে সুস্বাদ হবে। আমি এর মানে খুঁজতে থাকি এবং একসময় ঘাস নিয়ে অসংখ্য স্মৃতি আমার মধ্যে খেলা করতে থাকে।

মনে পড়ে মাঠে খেলতে খেলতে পা ছিলে যাওয়ামাত্রই কচি ঘাস চিবিয়ে ক্ষতে লাগানোর কথা।

মনে পড়ে মাঠে বন্ধুদের মাঝে বসে বহুদিন ঘাসের শরীরে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে ভেবেছি, এইসব ঘাস দেখেই আবিষ্কার হয়েছে পৃথিবীর রাজকীয় সব কার্পেট ।

মনে পড়ে বহু দিন জীবনানন্দের কবিতার ‘‘আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো/ গেলাসে গেলাসে পান করি,/এই ঘাসের শরীর ছানি- চোখে চোখ ঘষি,/ঘাসের পাখনায় আমার পালক,’’- লাইন চারটিকে বোঝার জন্যই ঘাসের শরীরে নাক ঘষেছি এবং পেয়েছি ঘাসের সাথে মিলিয়ে কাচা মাটির অদ্ভুত ঘ্রাণ। বুঝেছি এই ঘ্রাণের মধ্যে যে মিষ্টি মাদকতা রয়েছে এটাকেই জীবনানন্দ বলেছেন হরিৎ মদ। এই মাদকতায়ই বারবার আচ্ছন্ন হতে চেয়েছেন মদকে মাতাল করে দেয়া কবি জীবনানন্দ দাশ।

মনে পড়ে বহুদিন ভেবেছি একটি সিনেমার শট নেয়ার কথা, যেখানে দৃশ্যটা হবে এরকম- দুজন তরুণ (হতে পারে কবি অথবা গল্পকার)  কথা বলছে একটি সবুজ মাঠে বসে সাহিত্য-দর্শন-মেঘ-নদী-ধর্ম বা বিজ্ঞান নিয়ে আর ক্যামেরা কখনও ক্লোজ শটে, কখনো লঙ শটে, কখনো টপ শটে দীর্ঘ সময় ধরে তরুণদের চারপাশে ঘুরপাক খাবে। এবং কখনো কখনো ক্যামেরায় ওই তরুনদের না দেখিয়ে কেবল তাদের আশপাশকে দেখানো হবে। তাদের সংলাপ চলতে থাকবে উঁচু নিচু ভলিয়মে।

৩.

এই যে এতক্ষণ জীবনানন্দের ‘ঘাস’ কবিতাটিকে কেন্দ্র করে এত কথা বললাম, আমার কিন্তু এখনও অন্ধকার কীভাবে সুস্বাদ হয় এই উত্তরটা জানা হলো না। আমি আওড়াচ্ছি কবিতাটির শেষ দুটি লাইন ‘ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার/ শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে’।

এখানে কি মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অন্ধকারের কথা বলা হচ্ছে, যে মাতৃগর্ভ হচ্ছে ঘাস-মাতার মাতৃগর্ভ। আমার তো মনে হচ্ছে তাই-ই, কেননা- শরীরের সুস্বাদ অন্ধকারের দেখা কেবল মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অনাগত শিশুটিই পায়। যেখানে মা যা খায় তাই-ই খায় শিশুটি। জীবনানন্দ চাচ্ছিলেন ওই ঘাস-মাতার গর্ভ থেকে বের হয়ে ঘাস হয়ে বেরিয়ে আসতে পৃথিবীতে!

কিন্তু জীবনানন্দ কেন ঘাস হতে চেয়েছিলেন, এর কারণ কি সমস্ত কোলাহলকে, সমস্ত বিষাদকে উপেক্ষা করে নির্জনতায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয়া। নাকি নির্জন সৌন্দর্য নির্মাণের প্রতি অবাক পিপাসা। জীবনানন্দের এই কবিতাটি পড়ে আমারও এক সময় ইচ্ছে হয় ঘাসের মধ্যের ঘাস হয়ে চুপচাপ বেঁচে থাকতে!

রুখসানা কাজল  >> তোমাকে ভালোবাসি জীবনানন্দ! 

নৈঃশব্দ্যের ঘর থেকে বেজে উঠলো ট্রামের ঘণ্টা। আজ কিছু তারা বৃষ্টিজলে গলে নেমে আসবে  পৃথিবীতে ।  বেত ঝোঁপে ভিজে ব্যাঙ ভুলে যাবে ইঁদুরের ঘর। দূর নক্ষত্ররা সাধ্যের বেশি আলো দিয়ে জাগিয়ে দেবে মানুষের মন। কেউ কেউ তোমাকে মনে করবে জীবনানন্দ দাশ।

ছেঁড়া জুতার ফিতেয় গিঁট বেঁধে কোনো এক যুবক কবি আর্ত রাত্রিতে নাগরিক অন্ধ বদ্ধ জলে আর্তি ছড়াবে, ওইখানে যেও নাকো তুমি-  ফিরে এসো, ফিরে এসো ঘাসমন মেয়ে!

গেল সারা রাত সারা দিন পৃথিবী কেঁদেছে গভীর শোকে। ধূলোমাটি লতাপাতা, নক্ষত্র ও চাঁদের কবি আমাকেও বিপন্ন অনুভবে জবাবাদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় যখন তখন। তোমার নিঃসঙ্গতার সবল আকর্ষণে আমি বহুবার ছুটে গেছি আর অনুভবের ঘরে জমিয়ে তুলেছি কালো পারদের মত নানা অনুভূতি। বহতা জল আর অতল স্রোতের নিপুন কারিগরি দিয়ে আমাকে তুমি নদী করে তুলেছ। অবিরাম জ্যোৎস্নায় ভরিয়ে দিয়েছ হৃদয়ের ক্ষত। একাকীত্বের ঘুম ঘরে ফুটিয়ে তুলেছ ঘুমভাঙা ডাহুক।

শুক্রবারের ভেজা দুপুরে একটি ঝিনুক খুঁজে ফিরেছিলাম।

শক্ত খোলসের বাহুতে যে আমাকে আশ্রয়  দেবে । নিয়ে যাবে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত গভীর জলের নিস্তরংগ নৈঃশব্দ্যে। আমার অস্থিরতার ধার ছুঁয়ে নেমে আসবে  হাজার বছরের নিঃশব্দ পথচলা। আমি মগ্নতায় মূক হব, মেঘের ফাঁদে জলবন্দি চাঁদের মতো চেয়ে দেখব নীচে বহু নীচে ভাটফুল, শটিবন, ডুমুরের পাতার ফাঁকে অন্ধকার ছেয়ে দিচ্ছে প্রেম। আমার ঘর থাকবে না। সংসার জল থই থই। সন্তানের ঘুনসিতে বাজবে নিরুদ্দেশের টুংটাং। আমি পাখি হব। উড়ে যাবো মরকতে মোড়া কোনো দারুচিনি দ্বীপে।

ওদের মুখে বিতৃষ্ণা মাকড়শার জালের মত ঝুলে আছে। সশব্দে ফেটে পড়ছে ক্ষোভ । আমার রক্তের ঠিকানায়  ওদের রক্তের মিল আছে কিনা সন্দেহ ছুঁড়ে দিচ্ছে সুউগ্র রাগে।

আমার ডাইনে , বাঁয়ে, সামনে, পেছনে অকাব্যিক কোলাহল ।  কর্কশ মুখরতা। রাগ ও আর্তনাদের ছিছিক্কার। বংশের মুখ রাখতে না পারার ধিক্কারে আমি ত্যাজ্য প্রায়।

আজন্মের অভিমন্যু আমি । গোলকধাঁধার উজ্জ্বল সেনাপতি। জানি তো আমার জন্যে চুল পর্যন্ত ছাড়  নেই কোথাও । দু হাতে চোখ ঢেকে বসে পড়ি। আমার স্বপ্নকল্পনার জাদুকর, আমাকে অলৌলিকে  নিয়ে যাও। নিয়ে চলো পাখির ডানার নীচে গভীর মায়াবী সেই অন্ধকারে। নির্জনতার কোলে মাথা গুঁজে আমাকে থাকতে দাও বছর বছর ।

দাও নিসংকোচ স্তব্দতা। দাও সোনালি ডানার আশ্রয়। বকফুল আকন্দপাতার শান্তি। ভাসাও ধানসিঁড়ি নদীটির জলে। উদোম। বস্ত্র নিষ্কাসিত পরম অধ্যাস ফেলে পদ্মভ্রুণের মতো!

হিজলের ফুল নেবে যুবক ?  বেতফল, মৃগহরিণীর গায়ে লেগে থাকা মিহিন জ্যোৎস্নার পরত?

চাঁদ ডুবে গেলে শস্যের ক্ষেত খুলে দেয় তার দুধেল বুক। উজান শিসে বয়ে যায় বাতাস। কোথাও ডেকে ওঠে ঘাই হরিণ। মেঠো ইঁদুর চাঁদ ভালোবেসে চেয়ে থাকে অনন্তকাল।

দিনের হতাশা পেরিয়ে অন্ধকার আর জ্যোৎস্না চুমু খায় সকর্ষে। খুলে ফেলে নিবাত আড়ষ্টতা। একটি সকাল জন্ম দেওয়ার আনন্দে অন্ধকার ঢেলে দেয় কাম, জ্যোৎস্নার শরীর বেয়ে জেগে ওঠে চরাচর। শিশু অংশুমালী জ্যোৎস্নাকে ডেকে বলে, মা আমি সফল সকাল এনে দেবোই।

কালিদহের জলে খুব ভোরে ঝরে পড়বে জারুলের ফুল, ভেসে যাবে নারদ নদ। তুলসী, আত্রাই পেরিয়ে বারনাই নদীর জলে নাটোরের কোল ছুঁয়ে। সেখানে বসে আছে বনলতা সেন। ঘরে ফেরার আনন্দ নিয়ে। সন্ধ্যার উষ্ণতা গায়ে জ্বেলে। নীলাচলে ঢেকে রাখা শান্তিজলের মায়াদ্রোণী হাতে।

ভেজা বালুচরে নাম লিখেছিলাম তোমার। আমার।

গভীর সমুদ্রের দূরাগত খাঁড়ির মতই ভয়ংকর সুন্দর ছিলে তুমি। সমুদ্রের নুন ঢেউ উত্তাল কামনায় যখন তখন আছড়ে পড়ে সাদা বালুচরে। তেমনি আমিও সকাল দুপুর, রাত্রি কি ভোর, বেলা অবেলায়, দেহও আত্মায় ঝাঁপিয়ে পড়েছি তোমার বুকে।

প্রেমেরও দায় থাকে। থাকে বেঁচে থাকার মগ্নসংগীত। তারা নিরন্তর বুনে চলে সবুজ সুতোয় স্মৃতি বিস্মৃতির অমর কথাকলি। গাঙুরের জলে ভাসা চাঁদ। বেহুলার নাকছাবি। সনকার হাহাকার।

তোমাকে ভালোবাসি জীবনানন্দ। মগজের ফাঁকা ভূমিতে তুমিই বিছিয়ে দিয়েছিলে শীতলপাটির মায়া ছায়া। বিমলানন্দ সে তো তোমারই সৃষ্টিকল্প। “তোমার পাখনায় আমার পালক,  আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন”-  এ তো তোমারই দেওয়া হৃৎকম্প।

ঘুঙুরের শিঞ্জন তুলে ঝরে পড়ে  শিশির। একটি গরম চাদরে লীন হয়ে থাকি দুটি দেহে,  “আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে –
সে কেন জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়?”

 

তোমাকে ভালোবাসি না জীবনানন্দ। জেগে দেখি দক্ষিণের বুক খোলা। উড়ে গেছে শরতের চাদর। বাতাস গুঙিয়ে কাঁদছে, “কতো দেহ এলো,- গেল,- হাত ছুঁয়ে-ছুঁয়ে / দিয়াছি ফিরায়ে সব,- সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে”

তুমি মৃত্যুপ্রিয়, জীবন পলাতক। ট্রামের ঘন্টাধ্বনি অযথাই বেজে গেছিল। তোমার দু কান জুড়ে ঢেউ তুলেছিল কীর্তিনাশা নদী, আয় আয় আয়, কোলে আয় বাছা।

বন তুলসীর ঘন ঝোপ, বুনোপালং আমরুলের হলুদফুল, অর্কফুলের বেগুনি হাসি মাড়িয়ে তুমি চলে গেছ ট্রামের ঘণ্টাধ্বনির সাথে। তোমার হৃদয় জুড়ে ঘাস। কেউ কি ডাকেনি কবি, যেও নাকো ওইখানে? ওখানে আকাশের পারে আকাশ। কেউ ফেরে নাকো আর কুড়ি কুড়ি বছরেরও পরে!

মেঘ কাঁদে বিনিয়ে বিনিয়ে মেঘময় সুরে “নক্ষত্রেরা চুরি করে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।” জানি এ জীবনে কোনো দিন ফিরে পাবো না তাকে! মৃত্যু  যদি কেড়ে নেয় স্মৃতি তো থাকে। সাধ্য কি কেউ মুছে নেয় স্মৃতিলেখাগুলো!

তোমাকে বড় ভয়ে ভয়ে ভালোবাসি কবি।

এই যে হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাজছে স্মৃতির ক্ল্যারিওনেট। অজস্র পালক ফেলে উড়ে যাচ্ছে স্মৃতি পাখিদল।

তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,
পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,
মানুষ র’বে না আর, র’বে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখন
সেই মুখ আর আমি র’বো সেই স্বপ্নের ভিতরে।

হিজলের মগ ডালে যে ঘুঘুটা থম দুপুরে একটানা ডেকে যায় সে পাঠায় জীবনের জয়গান। প্রেম আছে, প্রেম আছে। আছে বেঁচে থাকা। মৃত্যু, কে চায়!

মৃত্যু সে ত অপরিসীম শেষকথা। বিস্মৃতির খয়েরি  প্রান্তর। কেবলই অতল অন্ধকারে হাত ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়া প্রিয় ফুল, প্রিয় মানুষ, প্রিয় প্রেম, ভালবাসার শুভ দিন।

শিল্পকলার দেয়ালে বেশ উঁচুতে শাহাবুদ্দিন । তারও আরো উঁচুতে সুলতান। সুলতানের একপাশে  জয়নুলের তিনকন্যা। তখনো জানিনা কোনটা কার ছবি। ওরা ছবি তুলবে।  আমি লম্বুর হাঁটুতে পা রেখে দেখে নিই ভাল করে, কোনটা কার ছবি। হয়ত তখনই দেখে নিয়েছিলাম আমাদের জীবন, আমাদের সংগ্রামকে।

ওর মৃত্যুটা বাস্তব।

ভালবাসার জন্যে আমি বার বার জন্মেছি। জন্মাব। বার বার মরেছি। মরব। ভালবাসার অহংকারে  আমি এক মগ্ন মুখর পাগল প্রাণ।

আমি লিখেছিলাম জীবনানন্দ-

“হয়তো হাজার হাজার বছর পরে
মাঘের নীল আকাশে
সমুদ্রের দিকে যখন উড়ে যাবো
আমাদের মনে হবে
হাজার হাজার বছর আগে আমরা এমন উড়ে যেতে চেয়েছিলাম।

তুচ্ছ সকল সান্ত্বনা। তুচ্ছ এই জন্মমৃত্যু দিবস। আমার নৈঃশব্দ্যে বাজে হলুদ মগ্নতা। সেখানে সবুজ ভালবাসারা দিনরাত গান গায় এইভাবে-

কার মুখ? আমলকী শাখার পিছনে
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ একদিন দেখেছিলো, আহা।

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close