Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আমার প্রথম বই আমার প্রথম বই পাখিতীর্থদিনে > মাসুদ খান

আমার প্রথম বই পাখিতীর্থদিনে > মাসুদ খান

প্রকাশঃ June 23, 2017

আমার প্রথম বই পাখিতীর্থদিনে > মাসুদ খান
0
0

আমার প্রথম বই পাখিতীর্থদিনে > মাসুদ খান

কবিতা-অরণ্য হলো সেই রহস্যমেদুর রেইন ফরেস্ট, যেখান থেকে অক্সিজেন নেয় বহু-বহু বিষণ্ন ফুসফুস আর ত্যাগ করে খেদ ও নির্বেদ, গ্লানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড, এমনকি কখনো-কখনো মনোক্সাইডও। আর সেই বৃষ্টিবন ওইসব বিষ ও বিষাদকে ফের রূপান্তরিত করে ফেলে দ্রুত অম্লজানে। কবিতার রয়েছে সেই অভিনব সালোক-সংশ্লেষণী ক্ষমতা।

রহস্য ও বিস্ময়-জাগানিয়া এমনই এক প্রপঞ্চের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি দীর্ঘদিন, নিস্তারহীন এক দীর্ঘ সফরে। কবিতা-কবিতা করে কত উন্মাদনা, কত বয়ে যাওয়া, বখে যাওয়া, কত অতিরেক আর অপচয়ে ভরা উন্মাতাল সকাল-সন্ধ্যা-রাত্রি আমার, আমাদের!

গত শতকের আশির দশকের মধ্যপর্ব থেকে নব্বই-এর প্রথমভাগ। বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে তখন চলছে এক উত্তেজনার কাল। তরুণ প্রজন্মের ভেতর দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে সেই উত্তেজনা। ওইসকল জ্বর ও উত্তাপে আমিও তপ্ত ও উত্তেজিত তখন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নৃতত্ত্ব, শিল্পকলা, ইতিহাস আর পুরাণের নানা রঙের ঢেউ, জমকালো মেঘ-রৌদ্র তখন খেলা করছে আমার আর সতীর্থদের কবিতায়। ছন্দ, অলঙ্কার, শব্দচয়ন, কয়েনেজ, ভাব, ভাষা এসব নিয়ে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা ও ভাঙচুরে আমরা তখন অকাতর, বেহিসাব। শব্দের ওজোঃগুণের, শব্দের ঝংকারের প্রেমে মশগুল আমি তখন। তাপ ও ঘোরের ভেতরে থেকে ততদিনে ‘বৈশ্যদের কাল’, ‘ত্রিজ’, ‘ধূলিবিদ্যা’, ‘স্রোত’, ‘কোলাজ’, ‘সার্কারামা’, ‘সিলিকন চিপ…’, ‘সিমেন্ট/আরসিসি’, ‘পরমাণু’, ‘আপেল’ ‘এপ্রিল’ ’কন্যাসংহিতা’ এগুলি লেখা হয়ে গেছে। সে-ও কয়েক বছর ধরে। তারপর উত্তেজনা একটু থিতিয়ে এলে, কিংবা উত্তেজনাপর্ব বহাল-থাকা অবস্থাতেই, শহর যখন পুড়ছে তুমুল আগুনে তখন যেমন হঠাৎ ইচ্ছা করে- শহর থেকে দূরে গিয়ে হাঁটি ঝিরঝির বৃষ্টির ভেতর, হাওয়া খাই মনোরম আবহাওয়ায়, অনেকটা সেরকম ইচ্ছা করছিল আমার। কোনো ক্লান্তি বা একঘেয়েমি থেকে নয়, এমনিতেই।

তখন আমি বগুড়ায় থাকি। ছোট ও নিরিবিলি একটি শহর। বেশ কয়েক বছর ছিলাম বগুড়ায়। এই কয়েক বছরে কত সখ্য, কত মাখামাখি, কবিতা-কবিতা ক’রে কত পাগলামি, কত বয়ে যাওয়া, প্রাণপাত্র উপচে কত ছলকে-ছলকে-পড়া…। প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে সারাদিন নিংড়ে নিচ্ছি প্রভূত প্রাণশক্তি আর তা উজাড় করে ঢেলে দিচ্ছি আমাদের সান্ধ্য আড্ডাগুলিতে। আমাদের দিনযাপন তখন কবিতাযাপনের নামান্তর। কবিতাকে সাক্ষী রেখেই আমাদের সূর্য উঠছে, সূর্য ডুবছে। কবিতার আবহেই আমাদের নিরন্তর ডুবে থাকা, কবিতার কোহলেই নিবৃত্তি আমাদের তাবৎ নেশা ও পিপাসা, কবিতা থেকেই অক্সিজেন গ্রহণ, আবার কবিতাতেই ত্যাগ আমাদের সকল আক্ষেপ, অভিমান, ক্রোধ ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড। নিরীক্ষার ঘোর ও রেশ পুরাপুরি কাটেনি তখনো। “একটি চিত্রিত হরিণের পেছনে একটি চিত্রিত বাঘ ছুটছে” ধরনের নিরীক্ষাধর্মী কবিতাও লিখছি, আবার পাশাপাশি এরকমও ভাবছি- নিরীক্ষার জটিল স্রোতে সাঁতার না কেটে সহজ-সাধারণ বিষয় নিয়ে অনুভূতি ও কল্পনার বিন্যাস ঘটিয়ে কবিতা করা যায় কিনা, করলে কীভাবে করা যায়।

ঘুরে বেড়াচ্ছি উত্তরবাংলার বিভিন্ন এলাকায়- পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহি, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন পল্লিতে। এসব অঞ্চলের মৃত্তিকা কোথাও ঝুরঝুরে বেলে, কোথাও বেলে-দোআঁশ, আবার কোথাও-বা শক্ত, আঠালো লালমাটি। মাঠের পর মাঠ- কখনো সবুজ, দিগন্তপ্রসারিত অবারিত সবুজ গালিচা; আবার কখনো ধূসর, ঊষর- পুরনো, ময়লা, দাগদাগালিতে-ভরা, দাগটানা মানচিত্রের মতো। মাঝে-মধ্যে লোকালয়, জ্যোৎস্নায় ভিজতে থাকা কুঁড়েঘর, ভেঙে-যাওয়া হাট, মেঠোপথ, পথের পাশে চায়ের দোকান। শেষশীতের শুষ্ক আবহ, রুক্ষ ভূপ্রকৃতি। এসবের মাঝেই হঠাৎ সুনীল শুশ্রূষার মতো দেখা মেলে কোনো পুষ্করিণীর কিংবা কোনো এক দীর্ঘিকার। কাকচক্ষুকালো জল; লোকে শখ করে নাম দেয় ‘সাগর’– রামসাগর, নীলসাগর, জয়সাগর, হুড়াসাগর। অথবা ময়দান-আকারের এক দিঘি। ময়দানদিঘি। স্পষ্ট বরাভয়ের মতো বিরল দু-একটি নদী। শান্ত, স্বচ্ছ, শীর্ণকায়া, বালিবক্ষা, কিন্তু গতিপথ বঙ্কিম। “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।” নদীর নাম মহানন্দা, বেরং, ডাহুক, ঘাঘট, বুড়ি যমুনা, তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, কালিন্দী, আত্রাই…।

সেই আদিগন্ত সমতল ভূআয়তনের এককোণে পড়ে আছে একটি শহর। কুড়িগ্রাম। অখ্যাত, নিরীহ, ছোট্ট ও ছিমছাম। ধরলা নদীর বাঁকে। সে-নদীর প্রবাহ ইস্পাত-পাতের মতো চকচকে ও ক্ষুরধার। এই সেই নদী যেখানে ফাঁদে পড়ে বগা কাঁদে আর বগী ঘুরে-ঘুরে উড়তে থাকে তার চারপাশ ঘিরে। খুবই শাদামাটা, আটপৌরে এক বঙ্গশহর। কিন্তু অদ্ভুত এক মায়া ও কুহক সারাক্ষণ লেগে থাকে শহরটির গায়ে। সেখানকার ধরলা নদী সাড়া দেয় গ্রহ-উপগ্রহের আকুল আহ্বানে। উতলা হয়ে ওঠে। মাঝে-মধ্যে ঝোড়ো হাওয়ার উস্কানিতে বড়-বড় ঢেউ তুলে বয়ে যায়। আবার শান্ত হয়ে আসে যখন, তখন, মাছরাঙা আর পানকৌড়ি, দুই বৈমাত্রেয় ভাই, বাসা বাঁধে নদীর বুকে। স্ত্রীপুত্রকন্যাসহ তারা কলহ করে। কুড়িগ্রামের বয়নকুশলী বাবুই পাখিরাও কী এক নাক্ষত্রিক কারণে থেকে-থেকে ভুলে যায় বয়নসূত্র হঠাৎ। আর শাস্ত্রবাক্যে-বাঁধা যত গৃহনারী- বিবিধ বেড়া ও প্রাচীর ডিঙিয়ে এসে ভিড় করে দাঁড়ায় নদীকূলে। তখন কী যে সপ্রতিভ হয়ে ওঠে তারা! প্রকাণ্ড ক্রিস্টালের মতো সপ্রতিভ।

এরকমই একসময় ও পরিবেশে রচিত পাখিতীর্থদিনে-র কবিতাগুলি। গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে, বন্ধুবান্ধবদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায়। বইটি খুব আগ্রহ ও যত্ন সহকারে প্রকাশ করেছিলেন অধুনালুপ্ত ‘নদী’ প্রকাশনের তাজুল হক। দারুণ সুন্দর একটা প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন প্রিয় শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য। সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

বিচিত্র সব উৎস থেকে- এমনকি বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জগৎ থেকেও- আহরণ-করা শব্দ ও বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটেছিল আমার সেই প্রথম বইটিতে, ঘটেছিল অনেকটা অনিয়ন্ত্রিত কল্পনারাশির ক্রীড়া ও বিচরণ। সেইসঙ্গে ছিল আধার ও আধেয়গত, ভাষা ও শৈলীগত নিরীক্ষা। মশগুল থেকেছি শব্দের ওজোঃগুণ আর ধ্বনিঝঙ্কারের প্রেমে। কাব্যের লাগামছেঁড়া ঘোড়া-ছোটানোর সেই বেহিসাবি দিনগুলিতে আমার কাব্যকৃতি হয়তো সুযোগ পায়নি কেলাসিত হবার, অনেক ক্ষেত্রেই। তখনকার অনেক কবিতাতেই ঘটেছে সঙ্গতি- ও সুষমা-ভঙ্গ (এখন যে ঘটে না, তা নয়, অহরহই ঘটে)।

বহুকাল হলো বাজারে নেই বইটি। নতুন দিনের নতুন হাওয়ার ঝাপটায় বইটি এখন বিস্মৃতপ্রায়ও বটে। সবকিছুই হারিয়ে ফুরিয়ে যায় একসময়।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close