Home আমার বইমেলা আমার বইমেলা / ‘একুশে বইমেলা প্রাণের বিকাশ আত্মার বিচ্ছুরণ’ > তমাল রায়

আমার বইমেলা / ‘একুশে বইমেলা প্রাণের বিকাশ আত্মার বিচ্ছুরণ’ > তমাল রায়

প্রকাশঃ February 18, 2017

আমার বইমেলা / ‘একুশে বইমেলা প্রাণের বিকাশ  আত্মার বিচ্ছুরণ’ > তমাল রায়
0
1

 

“শুধুমাত্র মাতৃভাষার জন্য যে লড়াইটুকু আমার মত নগণ্য মানুষের, তার দৌলতেই তো কখন সীমানা, কাঁটাতার মুছে, আমরা এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। এ আমারও দেশ। এ আমার বইমেলা। ছোট পত্রিকা বা সিরিয়াস বই- পাতা থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, আর আমি থেকে আমরায় বিস্তৃত হচ্ছি। ভালোবাসা কবে যে এই বই আর মেলাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের জীবনে, তা আজ বুঝি এই বই আর অক্ষরের সাথে এতগুলো বছর সহবাস করে। স্রেফ বই আর অক্ষরকে সাথী করে এ আমার, আমাদের উদযাপন, মেলাকে কেন্দ্র করেই।”

Tamal sobi
লেখক

 

মার হাত ধরে সেই না শীত না গরম, আঁধার ছুঁই ছুঁই ভোরে বেরিয়ে পড়তাম। মা ছিলেন আদ্যন্ত স্পোর্টস পারশন। তার সাথে কি আর হাঁটায় পাল্লা দেওয়া যায়! আমি পিছিয়ে পড়ছি বারবার। আমাদের জেলাশহরে তখনও সেভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি কি, তেমন কে আর বুঝে উঠেছে! পয়লা বোশেখ ছিলো বরং সকলের। মা আসলে অনেক কিছুর পথিকৃৎ ছিলেন। একুশে নিয়ে অনুষ্ঠান তো মারই শুরু করা, প্রভাতফেরিও। বড় হতে বুঝলাম,একুশ আসলে কি! স্মৃতিকাতর বাঙালির কাছে একুশতো আবার মাথা উঁচু করে হাঁটতে শেখা। বাঙালি আত্মানুভূতির গর্বিত পদচারণা। যেহেতু সেই কোন ছোট্টবেলা থেকেই বই আর লেখালিখি নিয়েই কাটতো আমাদের সময়, তাই বইমেলা কবে যেন অজান্তেই আমাদের সঙ্গী হয়ে গেছিলো,আমার কিশোর বয়সের। আসলে কত বই পড়লাম, তাতে কতগুলো লাল ঢ্যাঁড়া মারা, তা থেকে কত কোটেশন অনর্গল বলে যাবো…আর বান্ধবীরা হা করে তাকিয়ে থাকবে…জামার কলারটা একটু তুলে নেওয়া, ভালোবাসা যেভাবে তৈরি হয় আর কি। কোলকাতা বইমেলা তো আমাদের সাথেই বড় হয়েছে বছর বছর, কবে অজান্তে সেও আমাদের বন্ধু হয়ে গেছিলো, আজ আর মনে নেই। মেলার মাঠে বসে, একসাথে বন্ধুরা গান গাইছি, কবিতা আবৃত্তি করছি উচ্চগ্রামে। আর আমাদের ঘিরে ধরছে একে একে অনেকে। আর ভীড়ের মধ্যে কোনো কুহেলিকাময় চোখ হয়ত আমাকেই অনুসরণ করছে, যে ক’দিন পর আমার বন্ধু হয়ে উঠবে। মেলা শেষ হয়ে গেলে কি অপরিসীম শূন্যতা, যেন আত্মীয় বিয়োগ ঘটেছে। দাঁত পড়ে গেলে যেভাবে শূন্য দাঁতের জায়গায় চলে যায় জিভ বার বার অজান্তেই,সেভাবেই আমরাও শূন্য গড়ের মাঠের(ময়দান) কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে,কি অপরিসীম ব্যথা!

ঢাকা পৌঁছনোর পরই সে ফোন করেছিল আমায় –‘দাদা এসেছেন?’ আমি কেবল হুঁ বলেছিলাম। তখনও সন্ধ্যে নামেনি বহেরাতলায়। দেখি আবার ফোন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ঝুপ করে আমায় প্রণাম করলো। বুকে জড়িয়ে অনুভব করছি তরুণ কবির আনন্দঘন হৃৎস্পন্দন। ছেলেটা সুদূর সিলেট থেকে এসেছে আমার সাথে দেখা করতে। হাঁফাচ্ছে, ঘাম চকচক করছে কপালে। বললাম জল খাবে, হাসলো। মানে খেলেও হয়, আবার না খেলেও। এই ছেলেটি আমার কে? বন্ধু? বয়সে আমার থেকে অনেকটাই ছোট, দাদা বলে ডাকে। সে কি আমার কাছে কিছু প্রত্যাশা করে? তেমন কিছু না’তো। স্রেফ চোখের দেখাটুকু দেখতে এসেছে। ও তাহলে আমার আত্মীয়। পূর্বজন্মের কেউ? হবেও বা। এখন, সে আমার আত্মীয় হল কি করে? কেন বই আর অক্ষর জুড়ে দিচ্ছে আমাদের, অক্ষর কি আর কাঁটাতার মানে? রক্তের সম্পর্কের থেকেও বড় হয়ে সে এসে দাঁড়িয়েছে আমার কাছে। বহেরাতলার ওই চাতালে তখন বই উদবোধন হচ্ছে। যার বই সে ছাড়া আর কিছু বন্ধু-বান্ধব,যিনি উদ্বোধন করছেন, তিনি সামান্য অগ্রজ। আপাতত হাততালি। বই এর ফিতে কাটা হল। আমি আর আমার সেই সিলেটি ভাই অবাক চোখে দেখছি, চোখে আমার জল। হয়ত এই সদ্য প্রকাশিত বইটি, কিছুদিন পর বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ হয়ে উঠবে। এবার ওরা নেমে আসছে। পরের ছেলেটি বা মেয়েটির বই উদ্বোধন হবে, তাই তারা দাঁড়িয়ে একপাশে। আমার গা শিরশির করছে। আমার চোখের সামনে কত অলিখিত ইতিহাস, সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি আমিও। চোখ জলে চিকচিক করছে। কেন যে এই সময়ে বেয়াড়া কান্না আসে। একদিন এভাবে তো আমারও বই প্রকাশ, কোলকাতা বইমেলায়…সন্ধ্যে নামছে…ওমা চোখ পড়লো ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের স্টলে, পুলিশ বই পড়ছে খুব মন দিয়ে। পুলিশও তাহলে বই পড়ে? কত নিন্দা শুনি যে, তাদের সম্মন্ধে!

সোহরাওয়ার্দিতে পৌঁছতেই পেছন থেকে দৌড়ে এলো, এক লিটল ম্যাগের তরুণ সম্পাদক। হাতে গুঁজে দিলো, তাদের পত্রিকা। পড়ে মতামত জানাতে হবে কিন্তু দাদা। সে আসলে এক প্রকাশনীতে চাকরি করে, তাতে তার সম্পাদনা কিন্তু থেমে থাকেনি। দুচোখ ভরা স্বপ্ন।

– তুমি আমায় চেনো?

– হুঁ

– কি করে?

– যার চেনার সে ঠিক চিনে নেয় দাদা!

– তাই?

এ ছেলেতো ভাব-রসের নাগর। জীবনের সার সত্যটুকু বলে দিলো, কত অল্প কথায়।

তারপর কিছুক্ষণ সেও আমার সাথী, মেলা সঙ্গী। এখানে অন্যপ্রকাশ, ওই তো দিব্যপ্রকাশ, ওই যে ওটা ইত্যাদি, আর এটা মাওলা ব্রাদার্স। ‘আমি যেটায় ছিলাম, সেটা চৈতন্য, চেনেন চৈতন্যর মূল কাণ্ডারীকে?’ একটু আগেই আলাপ হয়েছিল। তাই বললাম – হ্যাঁ। স্টলগুলোতে গিজগিজ করছে ভীড়। সেলস কাউন্টারে বিলের পর বিল হয়ে চলেছে চোখের পলক পড়বার আগেই। কারা যেন বলে, বই আর বিক্রি হয়না। আমি তো উল্টোটাই দেখছি। ফাঁক পেয়ে জিজ্ঞেস করছিলাম এক সিনিয়র লেখককে। তিনি বললেন, না বিক্রি তো কমেনি! কিন্তু পাঠকের মান নেমেছে! এত উন্নত চিন্তা ভাবনা বোঝার মত গভীরতা আমার কখনোই ছিলনা। এই তুচ্ছ আমি অত বুঝি কি করে! জানি লেখকের কাছে পাঠকই কবিতা! আর বইমেলা মানে সেতুবন্ধন, লেখক, পাঠক, প্রকাশক। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা। দীর্ঘসময় প্রাণখোলা আড্ডা। বইমেলা মানে সেই হারিয়ে যাওয়া কুহেলী আঁখি, যাকে আমি আজও খুঁজে বেড়াই, প্রতিটি মেলায়…

ওপার থেকে ফোন, বহেরাতলা থেকে। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, রাজশাহী, হবিগঞ্জ বন্ধুরা সব হাজির হচ্ছে। আমি কেন আসছিনা? দ্রুত বেরুচ্ছি, পথে টিভি সাংবাদিক বন্ধুর সাথে দেখা। বললো, বাইট চাই। দাঁড়ালাম। আড্ডা আবার। ওপার থেকে ঘন ঘন ফোন। এক অগ্রজ লেখক সুদূর কানাডা থেকে এসেছেন। চলে যাবার আগে আলাপ করিয়ে দেবে, আমার বন্ধুরা তাঁর সাথে। স্টল বন্ধ হচ্ছে একে একে। আমি ঘোর-লাগা-চোখে দেখছি, সব কিছু। শুধুমাত্র মাতৃভাষার জন্য যে লড়াইটুকু আমার মত নগণ্য মানুষের, তার দৌলতেই তো কখন সীমানা, কাঁটাতার মুছে, আমরা এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। এ আমারও দেশ। এ আমার বইমেলা। ছোট পত্রিকা বা সিরিয়াস বই- পাতা থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, আর আমি থেকে আমরায় বিস্তৃত হচ্ছি। ভালোবাসা কবে যে এই বই আর মেলাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের জীবনে, তা আজ বুঝি এই বই আর অক্ষরের সাথে এতগুলো বছর সহবাস করে। স্রেফ বই আর অক্ষরকে সাথী করে এ আমার, আমাদের উদযাপন, মেলাকে কেন্দ্র করেই।

প্রাণের বইমেলা। সে কোলকাতা বইমেলা হোক বা একুশে বইমেলা। মাতৃভাষার এ হেন উদযাপনে আমি আজও বুঁদ। হে আমার মাতৃভাষা, তোমায় প্রণাম।

তমাল রায় : কথাসাহিত্যিক। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ঐহিক’ পত্রিকার সম্পাদক। নিবাস কলকাতা।  

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close