Home আমার বইমেলা আমার বইমেলা / লিখেছেন সৈয়দ তারিক ও শামীম আহমেদ

আমার বইমেলা / লিখেছেন সৈয়দ তারিক ও শামীম আহমেদ

প্রকাশঃ February 14, 2017

আমার বইমেলা / লিখেছেন সৈয়দ তারিক ও শামীম আহমেদ
0
2

[সম্পাদকীয় নোট : বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। বইপ্রকাশ ছাড়াও এই মেলাটি আমাদের একধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়। একমাসব্যাপী এই মেলা তাই লেখকদের দারুণভাবে টানে। ‘আমার বইমেলা’ – ধারাবাহিক এই আয়োজনে বইমেলা নিয়ে শুরু হয়েছে লেখকদের নিজেদের কথা। আজ বইমেলা নিয়ে লিখলেন কবি সৈয়দ তারিক ও গল্পকার শামীম আহমেদ।]

সৈয়দ তারিক

যখন বানান করে পড়তে শিখেছি তখন আব্বা আমাকে একটি গল্পের বই কিনে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই বইয়ের ব্যাপারে দুর্মর আকর্ষণ জন্ম নেয়। স্বভাবতই, বইমেলার কথা যখন জেনেছি তখন থেকেই এর প্রতি প্রণয় অনুভব করেছি।

একাশি সাল থেকে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলায় যাওয়া শুরু। তখন মেলার আয়তন ছিল ছোট, লোকের ভীড়ও ছিল কম। ক্রমে এটি বিকশিত হতে শুরু করে। এদিকে নিজের লেখার সূত্রে সমবয়সী ও অগ্রজ কবি-লেখকদের সাথে  পরিচয়-যোগাযোগ হতে থাকে, লিটল ম্যাগাজিনে নিজেদের লেখা প্রকাশিত হয়, বাংলা একাডেমির বহেড়াতলায় লিটল ম্যাগাজিনের আলাদা অবস্থান হয় ও তা ক্রমে সমৃদ্ধ হতে থাকে। ফলে, বইমেলা শুধু বই কিনবার জন্যই নয়, লেখার সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ,

নতুন পরিচয়, আড্ডা ইত্যাদির এক চমৎকার পরিবেশ হয়ে ওঠে। আবার, ভাষা আন্দোলনের মাসে এইটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় ও বাংলা একাডেমিসহ পুরো এলাকায় ভাষা-সংস্কৃতি-প্রগতি-প্রতিবাদের নানা অনুষঙ্গ ও অনুষ্ঠান এতে যুক্ত থাকায় এই মেলার সাথে পুরো মাস ধরে এক অপূর্ব ভাবৈশ্বর্য সংলিপ্ত থাকে, যা চেতনাকে নানাভাবে উদ্দীপ্ত করে। এইসব অনুষঙ্গে আমার হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে।

বইমেলার প্রধান বিষয় বই। যেহেতু আমাদের দেশে নতুন বই প্রকাশিত হয় প্রধানত বইমেলাকে কেন্দ্র করেই, তাই নতুন বইয়ের মূল উৎস এই বইমেলাই। বইমেলার প্রথম দিকে আমার একটা কাজ ছিল সবগুলো স্টল ঘুরে ক্যাটালগ সংগ্রহ করা। তারপর ঘরে বসে আগ্রহের বইগুলো চিহ্নিত করা। যে কটা সম্ভব মেলাতেই কিনে নেওয়া, অন্যগুলো ধীরে সুস্থে বছর জুড়ে কেনার বাসনা। বইমেলায় প্রিয়জন ও পরিচিত জনেদের কিছু বই কিনতে হয় নানা কারণে, কেবল নিজের পড়বার বা সংগ্রহের আগ্রহেই নয়। নিজের প্রকাশিত বইও দিতে হয় কাউকে-বা সানন্দে, কাউকে অনুরোধের  চাপে। আবার, অনেকে তাদের বই দেন হাতে তুলে, প্রত্যাখ্যান করা যায় না : কিন্তু, তারপরেই কারো-কারো অনুরোধ আসে রিভিউ লেখবার। আর, হ্যাঁ, সুপ্রিয় কেউ একগাদা বই কিনে উপহার দিয়ে দেন। সে বড় প্রেমানন্দের বিষয়।

এককালে বইমেলার সময় প্রায় প্রতিদিন বা অধিকাংশ দিনই বিকালটা ওখানে কাটত। যাদের সাথে বছরের অন্যান্য সময় দেখা সাক্ষাৎ হয় না তেমন, তাদের অনেকের সাথেই দেখা হবার স্থান ওটা। এখন তো দেখা সাক্ষাৎ হবার অবকাশ কমেই গেছে। কারও সাথে একাধিক বছর ব্যবধানে দেখা হয়ে যায় বই মেলাতেই।

বইমেলার সাথে এখন নানা অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে। বইমেলার সন্নিকটে হুমায়ুন আজাদ ও পরবর্তীতে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড চিন্তা ও বই প্রকাশ বিষয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে কঠোর যুক্তিবাদিতা-ও ধর্মবিরোধিতা আর তার বিপরীতে  ধর্মপন্থী অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা বইমেলাকেও প্রভাবিত করেছে। বইমেলায় প্রকাশনালয়কে সাময়িক নিষিদ্ধকরণের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর তো পুলিশ কর্তৃক বইয়ের সেন্সরের আয়োজনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। ফলে চিন্তার প্রকাশ বিষয়ে লেখক ও প্রকাশকদের  বিশেষ সচেতন হতে হয়েছে। এই বিষয়টা আমাদের ভাবনার জগৎকে প্রভাবিত করছে নিশ্চয়ই।

ফেসবুক, ব্লগ ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম চিন্তা ও সৃজনশীল সাহিত্য প্রকাশের ক্ষেত্র এতটাই বিস্তারিত ও সহজ করে দিয়েছে যে সাহিত্যপত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা কমেছে খানিক। তবু, লিটল ম্যাগাজিন যৌথ উদযোগের বিষয়; আর, ছাপা পত্রিকার/বইয়ের নিজস্ব তাৎপর্যও রয়েছে। বইমেলা উপলক্ষে অনেক পত্রিকা এখনও বের হয়, হবে। এইসব উৎসাহময় তরুণদের প্রকাশনা ও উদ্দীপনায় বইমেলা থাকে প্রাণবন্ত। এটা আমার ভালো লাগে। আবার,মেলায় গণমাধ্যমের ক্যামেরাময় উপস্থিতি মেলাকে আরেক রকম সরগরম রাখে। সব মিলিয়ে বইমেলা এক দারুণ জমজমাট ব্যাপার।

তবু, মাঝে-মাঝে, মেলাকে দূর থেকে যাপন করতেই ভালো লাগে। যেতে পারি, তবু যাই না। মনে হয়, এতেও অন্যরকম আনন্দ। বোঝানো যায় না।

সৈয়দ তারিক : কবি

শামীম আহমেদ

বইমেলা নিয়ে আমাকে ভাবতে বললে আমি আসলে ভীষণ ভাবনায় পড়ে যাই। বইমেলা প্রথম কবে আমাকে আন্দোলিত করে মনে করতে গেলে মনে পড়ে যায় আমার স্কুল জীবনের কথা। আমার স্কুল মিরপুর বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৯৫ সালে একটা বইমেলার আয়োজন করে স্কুল প্রাঙ্গনে। ছোট ছোট দোকান। স্কুলের ছাত্র কিংবা অভিভাবকেরাই চালাচ্ছিলেন। হরেক রকম বই, নানারকমের প্রচ্ছদ, তাকে তাকে সাজানো, থরে থরে গোছানো। আমার বাসা ছিল স্কুলের ঠিক উল্টো পাশে, মাঝ দিয়ে মিরপুরের প্রধান রাস্তাটা চলে গেছে। স্কুল আর আমার বাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী ছিল মিরপুর ১১ নম্বরের কবরস্থান। স্কুলের পড়ালেখা শেষ করে সেই সময়েই রাতের বেলা বাথরুমের আলো জ্বালিয়ে, দরজা হালকা ফাঁক রেখে মশারীর ভেতর শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়তাম। ঘুমানোর আগে মাঝরাতে উঠতে হতো শেষবারের মতো জল-বিয়োগের জন্য। পাক-পবিত্র হয়ে এসে একবার দাঁড়াতাম খোলা বারান্দায় সে রাতে শেষবারের মতো। ঠিক উল্টো দিকে চোখে পড়ত আমার স্কুল, তার পাশেই মিরপুর কবরস্থান। কলামে কলামে কবর সাজানো, টিমটিমে বাতি জ্বলছে – আমার ভয় করত না। মাঝে মাঝে মনে হতো হেঁটে হেঁটে চলে যাই কবরস্থানে, মৃতদের সাথে কথা বলি, গল্প করি, জিজ্ঞেস করি তাদের প্রিয় বইয়ের কথা, গল্পের কথা, কবিতার কথা। মারা গেলে বই থাকে জীবনে? অথবা মারা গেলে আসলে যে জীবন জানি, তা কি জীবন নাকি মরণ! গ্রন্থিকগণ কী কহেন? জানি না।

স্কুলের উঠোন পেরিয়ে মেলা ছড়িয়ে যায় সাদা শার্ট পড়া সেই আমার জন্য, ধীরে ধীরে, রাস্তা পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, আর কী কী যেন পেরিয়ে পৌঁছে যাই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে। হা করে তাকিয়ে থাকি দিগন্তে, আকাশে। খেলা করি কল্পনার রঙে কাটাকুটি, মেঘেদের সাথে। বইয়ে বইয়ে ঘুরে বেড়াই, হাত বুলোই, প্রেম করি। দূর থেকে লেখকদের দেখি হেঁটে যান, হালকা মাথা নেড়ে ভক্তদের সাথে কথা বলেন, তাদের চোখের দিকে তাকান না, তাকিয়ে থাকেন অনেক দূরে। লেখকরা কি তবে অন্য দেশের মানুষ? ওখানে মেঘের ডানায় বসে জোছনা রাতে তারা কুয়াশার কালিতে গল্প লেখেন, তারাদের কান্না ধুয়ে কবিতা লেখেন, তারপর নিশ্চয় ডানামেলা ঘোড়ায় চেপে মর্তে নামেন, বইয়ের পসরা সাজিয়ে মানুষদের স্বর্গের স্বাদ দেন।

আমার চোখে বইমেলা, কলম্বিয়ার ঘন জঙ্গলে তৈরি হওয়া জাদুবাস্তবতার চাইতেও বাস্তব যেখানে জাদুকর সব লেখকগণ, কবিতা আর গল্পে ভরা তাদের স্বপ্নের ক্যারাভান। এতদিন পর আজ ওই ক্যারাভানে চড়ে আমিও কি একদিন হারিয়ে যাব মেঘের দেশে? জানি না…

শামীম আহমেদ : কবি, গল্পকার, গবেষক।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(2)

  1. মাঝে মাঝে মনে হতো হেঁটে হেঁটে চলে যাই কবরস্থানে, মৃতদের সাথে কথা বলি, গল্প করি, জিজ্ঞেস করি তাদের প্রিয় বইয়ের কথা, গল্পের কথা, কবিতার কথা। মারা গেলে বই থাকে জীবনে? অথবা মারা গেলে আসলে যে জীবন জানি, তা কি জীবন নাকি মরণ! গ্রন্থিকগণ কী কহেন? জানি না।””””

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close