Home আমার বইমেলা আমার বইমেলা > শান্তা মারিয়া / হামিম কামাল

আমার বইমেলা > শান্তা মারিয়া / হামিম কামাল

প্রকাশঃ February 16, 2017

আমার বইমেলা > শান্তা মারিয়া / হামিম কামাল
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। বইপ্রকাশ ছাড়াও এই মেলাটি আমাদের একধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়। একমাসব্যাপী এই মেলা তাই লেখকদের দারুণভাবে টানে। ‘আমার বইমেলা’ – ধারাবাহিক এই আয়োজনে বইমেলা নিয়ে শুরু হয়েছে লেখকদের নিজেদের কথা। আজ বইমেলা নিয়ে এবার লিখলেন কবি শান্তা মারিয়া ও গল্পকার হামিম কামাল।]

শান্তা মারিয়া

“তারুণ্যের বন্ধুরা সুদূরে চলে গেছে। কিন্তু বইমেলার আকর্ষণ আজও আছে। ছোটবেলা থেকেই বই আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আর মেলায় গেলে লেখকবন্ধুদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায়। সেটার আকর্ষণও কম নয়। বইমেলা তো আমার কাছে তাই বন্ধুদের সমাবেশ।”

 

বইমেলা। শব্দটি শুনলেই একরাশ স্মৃতি মনে ভিড় করে। সেই কোন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাংলা একাডেমির বইমেলায় যাওয়া। বইয়ের সঙ্গে আমার ভালোবাসা চার বছর বয়স থেকে। আমি তখন নিজে পড়তে শিখি বানান করে করে। আমি যখন ছোট তখন বাংলা একাডেমির বইমেলা এত বড় ছিল না। একাডেমি চত্বরেই ছোট আকারে স্টল সাজিয়ে বসতেন প্রকাশকরা। ছোটদের বইও পাওয়া যেত। বাবার সঙ্গে বইমেলায় গিয়ে দু’হাত ভরে বই কিনতাম আমি ও আমার একমাত্র ভাই। হায়াৎ মামুদ, মুনতাসীর মামুন, এখলাসউদ্দিন আহমেদ, শাহরিয়ার কবীর, মোহাম্মদ নাসির আলী, সাজেদুল করিম, হালিমা খাতুন আরেকটু পরে মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই কেনার জন্য ব্যস্ত থাকতাম আমরা। বাবার সঙ্গে অনেক লেখকের চেনাজানা ছিল। বইমেলায় গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা হতো। পরিবেশটা তাই সবসময়েই মনে হতো আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার মতো আনন্দের। একুশের দিন সকালে ফুল নিয়ে শহীদ মিনারে যেতাম বাবার সঙ্গে। ফিরতাম বইমেলা ঘুরে। হাতে থাকতো প্রিয় বই। একবার নয়, অনেকবার মেলায় যাওয়া হতো। একুশের দিন বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে নিজের কবিতা আবৃত্তিও করেছি অনেকবার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বইমেলায় যেতাম বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে। টিউশনির টাকা ফেব্রুয়ারিতে পুরোটাই চলে যেত বই কিনে। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে থাকার সময় তো মনে হতো বাড়ির আঙিনাতেই বইমেলা চলছে। নিজের কবিতার আবৃত্তির ক্যাসেট বিক্রির জন্য ৯৭-তে বইমেলায় নিজস্ব স্টলও দিয়েছি। সেসময় আমরা বন্ধুরা একে অন্যকে মেলা থেকে বই কিনে উপহার দিতাম। প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ পাওয়া গেলে আনন্দটা আরও বাড়তো। আর বাংলা একাডেমির পুকুরের পাশে, বটতলায়, বহেড়াতলায় আড্ডার তো কোনো তুলনাই ছিল না। নব্বই দশকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সেসময় টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বইমেলা ছড়ানো ছিল। আবৃত্তির ক্যাসেট বাজতো। সেটা ভালোই লাগতো। কিন্তু কিছু খাবারের স্টলের বিদঘুটে নাম ছিল আপত্তিকর। মেলার সুন্দর পরিবেশটাকে একটু যেন আহতই করতো খাবারের স্টল এবং ওইসব স্টলে বখাটেদের আড্ডা।

তারুণ্যের বন্ধুরা সুদূরে চলে গেছে। কিন্তু বইমেলার আকর্ষণ আজও আছে। ছোটবেলা থেকেই বই আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আর মেলায় গেলে লেখকবন্ধুদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায়। সেটার আকর্ষণও কম নয়। বইমেলা তো আমার কাছে তাই বন্ধুদের সমাবেশ। ফেব্রুয়ারি মানেই ভাষার মাস আর ফাল্গুনের বাসন্তী আমেজ। বইমেলা শুরু হলেই আমার মনের ভিতর বেজে ওঠে একান্ত আপন বাঁশির সুর।

শান্তা মারিয়া : কবি, সাংবাদিক।

 

হামিম কামাল

“বইমেলায় আমি এমন অনেক বই দেখতে পাই যে বইগুলো আমি নিজে লিখে যেতে চেয়েছিলামআমি দেখতে পাই ওগুলো আমি যেমন করে লিখতে পারতাম তার চেয়েও অনেক ভালো করে লেখা হয়ে গেছেআবার এমন অনেক বইয়ের দেখা আমি পেয়ে যাই যেগুলো আমার সামনে একটি নতুন পৃথিবীকে উন্মোচন করেআমার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা, ঠুলি এঁটে আড়াল করে রাখা জগৎটা এতো বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে, এতো বিভিন্ন প্রকারের আয়নায় দেখা যেতে পারে তা আমি হয়তো ভাবতেই পারিনি।”

বইমেলার জন্যে সারা বছরের একটা অপেক্ষা কাজ করে এটি যেমন সত্য, তেমনই সত্য- এই অপেক্ষা, মানে সবুরের বিপরীতে মেওয়াটুকু মেলে না ঠিকঠাক। এখানে আয়োজকদের কোনও প্রমাদ আছে তা বলছি না। প্রমাদ যা আছে তা আমার নিজের। কোনও কিছুর ওপর যখন আপনি প্রত্যাশা আরোপ করবেন তখন তার সমানুপাতে মনোবেদনা তৈরির উপলক্ষও কিন্তু বাড়ে। প্রত্যাশা যখন প্রাপ্তির সঙ্গে মেলে না, ওই মনোবেদনার ভর অনুযায়ী দর মেটাতে তখন নিঃস্ব হবার দশা। এক্ষেত্রেও তাই হয়। বইমেলা নিয়ে আমার প্রত্যাশা অনেকটা সত্য-ধার্মিকের ঈশ্বর দেখার প্রত্যাশার মতো। প্রত্যাশা এর তীব্রতা নিয়ে বিরাজ করে এবং ঈশ্বরকে দেখাও যেন একরকম হয়। কিন্তু মনটা কোনওভাবেই ভরে ওঠে না।

মেলায় যখন পা রাখি তখনকার অনুভূতি আমি অনেকের সঙ্গেই মিলিয়ে দেখেছি, বেশ মিলে গেছে। আমাদের মনে হয়েছে শ্বাস নেবার জায়গায় বুঝি চলে এসেছি। বুকটা যেন অনেক হালকা হয়ে গেছে। যতবার মেলায় এসেছি আমি ভুলে গেছি পরিবার সমাজ সংসারের সঙ্গে আমার বিপুল বিরোধ। নিজের ভেতর প্রতিনিয়ত হেরে যেতে থাকার জমাট গ্লানির পাথর ভেঙে টুকরো হয়েছে। আমি আমার নিজের ভুলগুলো, নিজের ক্ষুদ্রতাগুলো আবিষ্কার করতে পেরেছি। কারণ আমি নিজের ভেতর ডুবে যাওয়ার অবসর ওই মেলায় আমি পেয়েছি।

প্রশ্ন উঠতে পারে এতো মানুষের ভিড়ে, এতো পরিচিতের ভিড়ে যেখানে কণ্ঠের ওপর কণ্ঠ, তর্কের ওপর তর্ক, আলোর ওপর আলোর ঝলক, হত্যাকারীর নীরব অনুসরণ, এসমস্ত কিছু লেজে চড়িয়ে আমি কী করে আমার মন স্থির হওয়ার ‘অবকাশ পাচ্ছে? উত্তরটা দেওয়ার চেষ্টা করা যাক। বইমেলায় আমি এমন অনেক বই দেখতে পাই যে বইগুলো আমি নিজে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। আমি দেখতে পাই ওগুলো আমি যেমন করে লিখতে পারতাম তার চেয়েও অনেক ভালো করে লেখা হয়ে গেছে। আবার এমন অনেক বইয়ের দেখা আমি পেয়ে যাই যেগুলো আমার সামনে একটি নতুন পৃথিবীকে উন্মোচন করে। আমার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা, ঠুলি এঁটে আড়াল করে রাখা জগৎটা এতো বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে, এতো বিভিন্ন প্রকারের আয়নায় দেখা যেতে পারে তা আমি হয়তো ভাবতেই পারিনি। আরও আছে। এমন সব মানুষের দেখা আমি ওখানে পাই যাদের মতো আমি হতে চেয়েছিলাম। কিংবা আজীবন সাধনা করে তাদের নখের যোগ্যও হয়ত পারব না হতে।

এসমস্ত অনুধাবন আমার ভেতর অবকাশের আনন্দ তৈরি করে। আমি ভেবে দেখেছি, এই অবকাশের অনুভূতির জায়গায় তো ঈর্ষার চোখাল দাঁতের নিচে পড়ে আমার রক্তক্ষরণও হতে পারতো। তা না হয়ে বরং এমন ভারমুক্ত স্বাধীন কেন লাগছে? পরে উত্তর যা পাই তা কিছুটা পরোক্ষ। এর উত্তর পেতে বিখ্যাত কবি শেখ সাদীকে নিয়ে চালু এক কিংবদন্তীর দ্বারস্থ হতে হবে।

শেখ সাদী তার বিখ্যাত এক শ্লোকের তিন লাইন লিখে চতুর্থ লাইন আর মেলাতে পারছিলেন না। শ্লোকের প্রথম বাক্যটি বালাগাল উলা বিকামালিহি; ইসলাম ধর্মাবলম্বী সমাজে বহুল চর্চিত শ্লোকটির বাক্যমালা। এর তৃতীয় লাইন অব্দি লিখে শেখ সাদী থমকে গেলেন। শত কসরতেও কোনওভাবেই আর মনমতো চতুর্থ বাক্য তৈরি করতে পারলেন না। মনে এই খেদ রেখে তিনি ঘুমোতে গেলেন। স্বপ্নে তার মস্তিষ্ক ধীর হলো, বিশ্রাম পেল, স্মৃতি রক্ষার্থে গল্প তৈরি করতে শুরু করল। তখনই তিনি পেয়ে গেলেন এর চতুর্থ বাক্যটি। সল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি। তার ঘুম ভেঙে গেল।

সাদীর মনে ঠিক সেই মুহূর্তে কি একটা অবকাশের অনুভূতি তৈরি হয়নি? বইমেলায় ওসবের ভেতর দিয়ে আমি ‘কী যেন পেয়ে যাই অমন করে। এটাই অবকাশরহস্য। আমার বইমেলা।

হামিম কামাল : গল্পকার।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close