Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আমার মার্কিনবাস ও মিস ইনগেবর্গ লাসটিঙের জীবনচর্চা > ভ্রমণকাহিনি >> আহমাদ মাযহার

আমার মার্কিনবাস ও মিস ইনগেবর্গ লাসটিঙের জীবনচর্চা > ভ্রমণকাহিনি >> আহমাদ মাযহার

প্রকাশঃ June 22, 2017

আমার মার্কিনবাস ও মিস ইনগেবর্গ লাসটিঙের জীবনচর্চা > ভ্রমণকাহিনি >> আহমাদ মাযহার
0
0

আমার মার্কিনবাস ও মিস ইনগেবর্গ লাসটিঙের জীবনচর্চা

আহমাদ মাযহার

প্রবাসে অভিবাসী হব এমন কোনো ভাবনা বছর তিনেক আগেও আমার সুদূর কল্পনাতে ছিল না। তবে আমার জীবনে এমন ঘটনা আরো কয়েকবারই ঘটেছে যা ঘটবে বলে আমি কখনো আগে থেকে ভাবতে পারিনি। এবারে আমার নিউইয়র্কে আসাটাও অনেকটা এমনই ব্যাপার। কেবল নিউইয়র্কে আমি আসিইনি, এসেছি সরাসরি ইমিগ্র্যান্ট হয়ে। পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি এখানে আসবার নানা উপায় আছে। ভিন্ন কারণে এসে কেউ কেউ থেকে যান ভাগ্য বদলে আশায়। নানা সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তাঁরা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও পান। সেজন্য সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ভিসা পাওয়ার যাতনাভোগীরা সরাসরি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে যাঁরা আসেন তাঁদের মনে করেন ভাগ্যবান। আমাদের মার্কিন মুলুকে আসাটাও তাই অনেকের কাছে সে অর্থে পরম সৌভাগ্যেরই ব্যাপার। আমাদের সৌভাগ্য কেবল মার্কিন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পাওয়াতে সীমিত নয়! আমাদের রয়েছে ইয়োরোপীয় ধারার স্বচ্ছল ও সংস্কৃতিমান পরিবারের বহমান জীবনযাত্রার নিদর্শনবাহী একটি বাড়িতে সম্পূর্ণ নিখরচায় থাকবার সুবিধা। এই সুবিধা প্রায় নিঃশব্দে আমাদের জন্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন আমার স্ত্রী শিরীন বকুলের অগ্রজ জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম। তিনি গত শতাব্দীর আশির দশকে বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে এসেছিলেন। এখানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন বেশ কয়েক বছর। অসাধারণ মেধাবীদের মার্কিন নাগরিক হওয়ার যে সুযোগ আছে সেই সুবাদে তিনি বহু বছর ধরেই মার্কিন নাগরিক। তাঁর সম্পর্কে লিখতে গেলে অনেক কথা লিখতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতার একটি নিদর্শন তিনি ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক’ বা ‘বেন’-এর বিশ্ব-আহ্বায়ক। বহু বছর ধরে বিদেশে বাস করেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে নিজের মেধার ও সাংগঠনিকতার প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছেন। নিবিড় গবেষণা করে চলেছেন বাংলাদেশের সুশাসন নিয়ে। তাঁর গবেষণা দেশের ও বিদেশের বিদ্বৎমহলে সমাদৃত হচ্ছে। তাঁর কর্মক্ষেত্রের বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরার জন্য যে বিদ্যাবত্তা দরকার তা আমার নেই বলে এখানে সে প্রয়াস থেকে বিরত থাকলাম। নিজের মার্কিন নাগরিকত্ব লাভের অল্পকাল পরেই ভাই ও বোন, যথাক্রমে তাদের বউ ও স্বামী এবং তাদের অবিবাহিত সন্তানদের সকলের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসার আবেদন করেছিলেন। তার পরিণতিতে এখন আমাদের একটা বিরাট দলের কারো কারো ইমিগ্র্যান্ট হয়ে যাওয়া কারো-বা হওয়ার প্রাককালে উপনীত হওয়া! সবমিলিয়ে তাঁর এইসব নিকটাত্মীয়রা, এককভাবে তিনি যাদের স্পন্সর, এখন সংখ্যায় ১৯ জন। তিনি আবেদন করেই ক্ষান্ত দেননি, তাদের সকলের নিউইয়র্কবাস কুসুমাস্তীর্ণ করে দেয়ার জন্য একটি বাড়িও ক্রয় করে দিয়েছেন। আমার এই রচনার উপলক্ষ তাঁর এই বাড়ি ও তার ভূতপূর্ব জার্মান মালিক।

1 (2)

নিউইয়র্কে আমরা ড. নজরুল ইসলামের কিনে দেয়া যে বড়িতে থাকছি সেটি সত্তর-আশি বছরের পুরোনো এক ইউনিটের একটি কাঠের তিনতলা দালান। নিউ ইয়র্কের কুইনস বরো এলাকার জ্যামাইকায়- আরো নির্দিষ্ট করে বললে ব্রায়ারউড এলাকায়- এই বাড়িটির অবস্থান। বাড়িটির সদ্য ভূতপূর্ব মালিক ইনগেবর্গ লাসটিং ৮৫ বছর বর্ষীয়া বয়সের ভারে ন্যূব্জ জার্মান বংশোদ্ভুত একজন নিঃসন্তান নিঃসঙ্গ নারী। তাঁর স্বামীও পৃথিবী ছেড়ে গেছেন বেশ কয়েক বছর আগেই। বাড়ি হস্তান্তরের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করে ২০ মে ২০১৭ তারিখে জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু স্বদেশের কোনো এক ওল্ডহোমে কাটাবার অভিপ্রায়ে তিনি জার্মানিতে ফিরে গেছেন।

আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। আমার জন্ম বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত একটি পরিবারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও মাঝারি নাগরিক সাংস্কৃতিক মানকে ধরে রাখতে সক্ষম আর্থিক পটভূমির মানুষও নই বলে একটি ইয়োরোপীয় পরিবারের জীবনযাপনের বাস্তবতা সম্পর্কে খুব কমই জানা আমার। ইয়োরোপ-আমেরিকার সিনেমা দেখে কতটা আর আঁচ করা যায়! কারণ সিনেমার উপলক্ষ তো তাদের গার্হস্থ্য জীবন বর্ণনা নয়, গার্হস্থ্য তথ্য যেটুকু আসে সেটা পরিচালকের উদ্দেশ্য সিদ্ধির বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে। ফলে অনুভব করি যে পাশ্চাত্যের কোনো দেশে কোনো ইয়োরোপীয়ের সরাসরি সংস্পর্শে আসার সুযোগ না পেলে তাদের গার্হস্থ্যজীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা সম্ভব নয়!  বিত্তহীনের যেমন ইতিহাস নেই তেমনি তার সংস্কৃতিও নেই! বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সমৃদ্ধির সুবাদে ও বাংলাদেশের আশেপাশের কয়েকটি দেশে ভ্রমণের সূত্রে পাশ্চাত্যীয় জীবনধারার সামান্য পরিচয় পেলেও ইয়োরোপীয় গৃহাভ্যন্তরের সংস্কৃতির সামান্যই আমার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব হয়েছে। মার্কিনবাস দীর্ঘায়িত হলে হয়তো এ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ সম্ভব হতো। কিন্তু তা-ও হতো অনেক দীর্ঘসূত্রী ব্যাপার। সুতরাং এক মিস ইনগেবর্গ লাসটিঙের জীবনচর্চা থেকে পাশ্চাত্য জীবন সম্পর্কে হয়তো সামান্যই জানা সম্ভব! কিন্তু এই সামান্যই বা আমি কোথায় পাই!

নজরুল ভাই কিনবার অভিপ্রায়ে ব্রোকারের মাধ্যমে অনেকগুলো বাড়িই দেখেছিলেন। তাঁর বিবেচনায় ছিল এমন একটি বাড়ি যা যে-কোনো সাবওয়ে স্টেশনের কাছে হতে হবে যাতে আমার মতো গাড়িহীনদের চলাফেরা সহজ হয়। চেয়েছিলেন এমন একটি বাড়ি যা হবে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফুল ফার্নিশড’। কারণ তিনি আমাদের অসামর্থ্য সম্পর্কে সচেতন। তিনি জানেন বাড়ি পেলেও তাতে বসবাসের সাধারণ দরকারি সামগ্রীও আমাদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, ‘ফুল ফার্নিশড’ বাড়ি কিনতে গিয়ে তাঁকে অতিরিক্ত ‘তনখা’ও খসাতে হয়েছে, কিছুটা বিবাদও করতে হয়েছে মিস ইনগেবর্গ লাসটিং-এর সঙ্গে। ভদ্রমহিলার সংগ্রহের ১৮৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত Hardman Peck & Co-র পিয়ানোটিও নজরুল ভাই অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে রেখে দিয়েছেন। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ।

বাড়িটির যেখানে অবস্থান সেই এলাকটি বেশ নিরিবিলি। বাংলাদেশের খুব অভিজাত এলাকার তুলনায়ও এতটাই নিঃশব্দ যে থেকে থেকে পাখির ডাক কিংবা দূর দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির ইঞ্জিনের হিসহিসে শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। বাড়ির সামনের রাস্তায় কালেভদ্রে দু-একটা গাড়ির শব্দে আমাদের চমক ভাঙে। কারণ তখন মনে হয় বাড়ির সামনে যেন একটু বেশি শব্দ হলো। ঢাকায় আমরা এত বেশি শব্দের মধ্যে থাকি যে এ ধরনের শব্দের অস্তিত্বই প্রায় অনুভব করি না। এখানে দৈনন্দিন প্রয়োজনে একটা কিছু কিনতেও ১৫/২০ মিনিটের হাঁটা পথ পাড়ি দিতে হয়। সারি সারি বাড়িগুলোয় গ্যারেজ আছে বটে কিন্তু গাড়ি থাকে সেখানে কমই; থাকে রাস্তায়। কারণ হিসেবে জেনেছি গ্যারেজগুলো ছোট বলে গাড়ির জায়গা হয় না। এখানকার বাড়িগুলো অনেক বছর আগের তৈরি। তখনকার গাড়ি ছিল ছোট। এখন প্রায় পুরো নিউইয়র্কের আবাসিক এলাকাতেই গাড়ি থাকে রাস্তায়। পার্কিং পাওয়া অনেক সময় অসম্ভবও হয়ে ওঠে। অনেককেই দেখি গাড়ি পার্ক করতে হয় নিজের বাড়ি থেকে বহু দূরে গিয়ে। আরেকটা কথা, আবাসিক এলাকাগুলোতে কোন ধরনের বাড়ি কোথায় হবে তার মাস্টারপ্ল্যান আছে। সেটার ব্যত্যয় ঘটানো ক্ষমতাবানদের পক্ষেও সম্ভব নয়। ফলে প্রতিটি এলাকার চারিত্র্য বছরের পর বছর ধরে অক্ষত আছে। বাংলাদেশের মতো যে কেউই যেখানে সেখানে যে-কোনো বাড়ি ভেঙে যে-কোনো ডিজাইনে বাড়ি বানাতে পারে না। ফলে শহরের একটা পরিচ্ছন্ন চারিত্র্যসৌন্দর্য রয়েছে। বড় বড় দালানেরও অশ্লীল রকমের ভাব দেখানোর ব্যাপার নেই।

নিউ ইয়র্কের গণপরিবহণ-ব্যবস্থা মার্কিন মুলুকের অন্য রাজ্যগুলোর তুলনায় অনেক ভালো। এতটাই ভালো যে সবসময় নিউইয়র্কবাসীরা গাড়ি চালানও না। আমাদের প্রতিবেশীদের প্রায় সবারই গাড়ি রয়েছে। কিন্তু অনেক সময়ই তাদের দেখি পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে। অনেক ধনী মানুষকেও দেখছি চলেন গণপরিবহণে। বাইরে থেকে দেখলে আমাদের বাড়িটি তিনতলা, কিন্তু আসলে বেজমেন্টসহ ৪ তলা। বেজমেন্টে রয়েছে বইয়ের ঘর, বয়লার, হিটার, ওয়াশিং মেশিন, টুলবক্স, কম ব্যবহৃত হয় এমন জিনিসপত্রের সংগ্রহশালা। প্রচুর বৈদ্যুতিক সামগ্রী ব্যবহার করতেন ভদ্রমহিলা। সবগুলোর প্রয়োগ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত জেনে ওঠাও সম্ভব হয়নি। বাড়ির নিচতলায় রয়েছে বারান্দার মতো একটা অংশ। সেখানকার এক প্রান্তে টেবিল। পাশে নিচু আরেকটা বেতের টেবিলমতো রয়েছে। এর ওপরের পাটাতনের নিচের দিকটার ফাঁকা জায়গায় দরকারি স্টেশনারি সামগ্রী রাখা। আমাদের অনেক অফিসের এত বিচিত্র স্টেশনারি থাকে না। দেখে বোঝা যায় এর প্রায় প্রতিটি সামগ্রীরই নিয়মিত ব্যবহার ছিল। আমি আবিষ্কার করে চলেছি সেগুলোর মাজেজা। সেগুলো ব্যবহার করতে হলে জীবনযাপনের এই সাংস্কৃতিকতার চর্চার কতটা গভীরে যাওয়া দরকার অনুভব করেছি তা-ও। ড্রয়িংরুমের একদিকে রয়েছে টেলিভিশন ভিসিআর রাখার জায়গা, নানা ধরনের কয়েকটি সোফা রাখা আছে সেখানে। লিভিংরুমের এক সেলফে দেখলাম হালকা কয়েকটি ব্যয়ামের সামগ্রী রাখা। আলমারিতে কাপড়-চোপড়ের কমতি নেই। যাবার সময় অনেক কিছুই বিক্রি করে বা বিলিয়ে দিয়েও শেষ করতে পারেন নি। তিনতলার তিনটি বাথরুমে বিচিত্র রকমের টয়লেট্রিজ সাজিয়ে রাখা। সত্যি বলতে কি সেসবের অধিকাংশেরই ব্যবহার সম্পর্কে আমি এখনো অবহিত হয়ে উঠতে পারি নি। প্রতিটি তলাতেই রয়েছে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার। বাংলাদেশে আমরা যেমন সরাসরি টিউবলাইট ব্যবহার করি এখানে সেরকম নয়। ল্যাম্পশেড আছে কখনো ঝোলানো, কখনো ঘরের কোণে রাখা স্ট্যান্ডের ওপরে স্থাপন করা । বহুধরনের বাল্ব লাগানো শেসব শেডে। এগুলো জ্বালাবার ব্যবস্থাও বিচিত্র রকমের। কোনোটা জ্বালাতে হয় মোচড় দিয়ে, কোনোটা বা সাধারণ সুইচের মাধ্যমে। মোচড় দেয়ার ব্যবস্থাটা কেমন সেটাও আবিষ্কার করতে হয় আমাদের। কোনো কোনো জায়গায় বৈদ্যুতিক পাখা ও বাতি একসঙ্গে রাখা। চলানোর কায়দাও বিচিত্র। একটি দড়ি ধরে টেনে যদি বাতি জ্বালাতে হয় অন্য দড়িতে চালাতে হয় পাখা। এমনকি পাখার গতি বাড়ানো-কমানোর জন্যও দড়ি টানাটানির ব্যবস্থা। এ রকম জিনিসপত্র আমাদের দেশের অনেক ধনীদের বাড়িতেও এখনো পাওয়া যায় না। কারণ তাদের অর্থ কোনভাবে এলেও এই অর্থলাভের সঙ্গে জীবনচর্চার সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। ইনগেবোর্গ লাসটিঙের জিনিসপত্রের বিন্যাস ও ব্যবহার অনুমান করে এটুকু বুঝেছি এইসব সামগ্রী ছিল তাঁর জীবনচর্চার অংশ, বিলাসিতার সামগ্রী নয়।

আমাদের ধনীদের কাছে এইসব সামগ্রী বিলাসিতার বা দেখানেপনার জন্য! তাদের জীবনযাত্রায় এগুলোর ভূমিকা এখনো প্রবেশ করেনি। তারা দৈনন্দিন সামগ্রীর ব্যবহারে মিস লাসটিঙের মতো স্বাবলম্বী নন, কর্মচারীদের হুকুমপালন-নির্ভর।

প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শুনে বুঝলাম মিস লাসটিং খুঁৎখুতে স্বভাবের এবং স্বাবলম্বী নারী। ফলে শুভানুধ্যায়ীদের কায়িক সহযোগিতাও তিনি নিতে চান না। এ কারণেই স্বয়ংসম্পূর্ণতার চিহ্নে তাঁর বাড়িটি ভরপুর। দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের স্মৃতি তাঁর এই বাড়িতে। এখানেই কেটেছে তাঁর দাম্পত্যজীবন। নিঃসন্তান এই মহিলার স্বামীবিয়োগের পরের নিঃসঙ্গ জীবনও কেটেছে এখানেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জরার আক্রমণে ক্রমশ অশক্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু জীবনের সচলতাকে রুদ্ধ হতে দেন নি। বাড়ি বিক্রি করে ফিরে যাবার অগেও তিনি নিজে গাড়ি ড্রাইভ করেছেন। রান্নাঘরের তৈজসপত্র যা আছে তাতে বোঝা যায় যে, কোনো হালকাপাতলা সামগ্রী তিনি সংগ্রহ করেন নি। এখানে গৃহকর্মীসুলভ তো নয়ই, মানসিকভাবেই তারা হুকুমবরদার নির্ভর নন। আমাদের আলোচ্য বৃদ্ধাও একাকিনীই নিজহাতে গৃহকর্ম সম্পাদন করেছেন। তিনতলা বাড়িতে তিনি ছিলেন একা। শেষের দিকে অবশ্য একজন ভাড়াটে ছিলেন, কিন্তু তিনিও একাকিনী।  এই একাকি থাকার ব্যাপারটি যে কেবল এই ভ্রদ্রমহিলার আলাদা যোগ্যতা তা নয়। এ রকম জীবনযাপন সাধারণত ইয়োরোপ-আমেরিকার মূলধারার নাগরিকমাত্রই করেন।

আমার আগ্রহের জায়গা ইনগেবর্গ লাসটিং-এর জীবনযাত্রা এবং তাঁর বইয়ের সংগ্রহ। এতক্ষণ তাঁর জীবনযাত্রা সম্পর্কে সামান্য বললাম। আমাকে আরো অনেক কিছু শিখতে হবে তাঁর কাছ থেকে। পরে সে সম্পর্কে লেখা যাবে। এবারে আসি তাঁর ছোট্ট বইয়ের সংগ্রহের দিকে। বইয়ের সংগ্রহ পরিমাণে যে খুব বেশি তা নয়, কেজো বইয়ের বৈচিত্র্যও নেই তেমন। যদিও প্রতিটি ঘরেই রয়েছে বুকসেলফ। কিছু বই যে সম্প্রতি সরানো হয়েছে তা বোঝা গেল। অনুভব করেছি তিনি ঠিক বইয়ের সংগ্রাহক নন। সম্ভবত বই পড়া হয়ে গেলে তিনি ফেলে দিতেন বা বিক্রি করে দিতেন। সংগ্রহে খুব বেশি রাখতেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেটুকু আছে তা আমার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে জেনেছি পেশায় ভদ্রমহিলা ছিলেন শিক্ষক। বিশ্ববিখ্যাত ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। বেশ কয়েক বছরের সংগ্রহ একত্রে পেলাম। ভাষা শেখা বিষয়ক বেশ কিছু বই আছে। তাঁর সংগ্রহে জার্মান ভাষার বইও ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। কিছু কিছু বইয়ের জার্মান ভাষার নাম বুঝতে পারলাম লেখকদের নাম থেকে। বিশালাকৃতির একটা ওয়েবস্টার ইংরেজি-ইংরেজি অভিধান যেমন পেলাম তেমনি পেলাম ইংরেজি-ফরাসি-ইংরেজি এবং ইংরেজি-জার্মান-ইংরেজি অভিধান। ত্বকের যত্ন বিষয়ক কিছু বই দেখলাম জার্মান ও ইংরেজি ভাষায়। হার্বাল ওষুধ সম্পর্কে পড়াশোনা ছিল তাঁর। ইংরেজি ও জার্মান ভাষার বেশ কিছু বই দেখলাম সংগ্রহে। টেবিলের ওপর দান্তের ইনফার্নোর একটা ইংরেজি অনুবাদের কপি পড়ে থাকতে দেখলাম। পাতা উল্টে দেখি লাইনে লাইনে দাগিয়ে রাখা। বই ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম দুই খণ্ডে ইংরেজিতে লেখা ইতালীয় সাহিত্যের ইতিহাসের বই। পেয়ে গেলাম জার্মান কবি শিলারের তিন খণ্ডে সমাপ্ত কবিতাসংগ্রহ। সেটা জার্মান ভাষার! দেখলাম শেক্সপিয়ারের অনেকগুলো নাটকের টীকা-টীপ্পনিসহ বিশেষ ইংরেজি সংস্করণ। জার্মান ভাষায় ব্রেখটের নাটক যেমন পেলাম তেমনি পেলাম ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর বই। বেজমেন্টে একটা ছোট্ট ঘরকে লাইব্রেরি বানিয়ে নেয়া হয়েছিল। এখন আমি দু-এক কলি জার্মান শব্দের অনুশীলন করি গুগলের সহায়তা নিয়ে। বইগুলোর মধ্য থেকে হয়তো আবিষ্কার করতে পারব অনেক মূল্যবান কিছু। এখানে চটজলদি মনে পড়া কিছু বইয়ের কথা কেবল উল্লেখ করলাম।

মিস লাসটিঙের চায়ের সংগ্রহের কথা না বললেই নয়। গত প্রায় একমাস ধরে খেয়েও মিস লাসটিঙের সংগ্রহের বিচিত্র ধরনের চা আমরা চারজনে শেষ করতে পারি নি। তাঁর সংগ্রহে আছে এমনও চা যার গায়ের ব্যবহারবিধি লেখা জার্মান ভাষায়। গুগলের সাহায্যে অনুবাদ করে জানলাম সে চা খেতে হয় ঘুমানোর আগে। আর আছে বিচিত্র হারবাল চা। এক ধরনের শেষ হলে আমরা আরেক ধরনেরটা খাচ্ছি। তবে আমাদের জিহ্বা এখনো এসব চায়ের স্বাদ অনুভবের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।

লেখাটি আরো দীর্ঘ হতে পারতো। মিস লাসটিঙের জীবনচর্চার খুঁটিনাটি সম্পর্কে আরো কিছু বলা গেলে পাশ্চাত্যীয় জীবনচর্চার সঙ্গে আমাদের জীবনচর্চার পার্থক্যও বিশ্লেষণ করা যেত। তবে তার জন্য দরকার আরো গভীর চর্চা। সবেমাত্র যার সামনে উপস্থিত হয়েছি আমি। এখানকার দৈনন্দিনতার গভীরে প্রবেশ-প্রয়াসের মাত্রই যে শুরু আমার! গভীরে প্রবেশের জন্য কিছুটা সময় তো দিতেই হবে! এখন তারই অপেক্ষা।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close