Home অনুবাদ আমা আতা আইদু > দক্ষিণ থেকে আসা খবর >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদক : ইশরাত তানিয়া

আমা আতা আইদু > দক্ষিণ থেকে আসা খবর >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদক : ইশরাত তানিয়া

প্রকাশঃ August 5, 2017

আমা আতা আইদু > দক্ষিণ থেকে আসা খবর >> অনূদিত ছোটগল্প >>>  অনুবাদক : ইশরাত তানিয়া
0
0

আমা আতা আইদু > দক্ষিণ থেকে আসা খবর 

 

[ঘানার বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ আমা আতা আইদুর জন্ম ১৯৪২ সালে। আফ্রিকার নারী লেখকদের সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন মোমবাসা ফাউন্ডেশন। পশ্চিমের সঙ্গে আফ্রিকার টানাপোড়েন হচ্ছে তাঁর লেখালেখির মূল বিষয়আশয়।  আফ্রিকীয় সমাজে নারীদের অবস্থান যে কতটা করুণ, সেই বিষয়টিও গভীর মনোযোগ পেয়েছে তাঁর রচনায়। এরকমই একটি ছোটগল্প হচ্ছে এটি।]

কোলা-বাদামের বিশ্রী স্তূপের দিকে তাকিয়েছিল ম’মা আসানা। থুতু ফেলে নলখাগড়ার গামলা তুলে নিল। তারপর গামলা নামিয়ে হাতে নিল একটা বাদাম। কামড় দিয়েই ছুঁড়ে ফেলল। আরেকবার থুতু ফেলে উঠে দাঁড়াল। অল্পক্ষণের জন্য একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করল সে। বাঁ কানের ঠিক নিচে। তারপর চোখ দুটো কুয়াশাচ্ছন্ন।

‘কাঠের গুঁড়িগুলো একটু দেখে আসা দরকার,’ সে ভাবল। মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা হাওয়া যেন চোখ দুটো ঝাপসা করে দিল। বাদামগুলোর দিকে ঝুঁকলো সে।

‘কত রকম বদনজর শিকারের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ঘাসের চারণভূমিতে, ধূলাবালির মধ্যে। তুমি তার কী জানো? এখনই এগুলো তুলে আনতে হবে।’

গরু-মহিষের খোঁয়াড় থেকে ফিরে আসার পথে ওর চোখ পড়ল বেমানান বৃত্তগুলোর দিকে। সেগুলো পুরনো মাটির গর্তকে নিশানা দিয়ে রেখেছে। সেই সব দিনে এমন সময়ে গর্তগুলো প্লাবিত হতো। প্রায় শেষ হয়ে আসা মৌসুমে যখন কেউ বাকিটুকুর জন্য খোঁচাত, গর্তগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা চাপা যৌন-উত্তেজনার সুখানুভূতি হতো। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা বউয়ের দিকে তাকিয়ে একজন স্বামীর যেমন লাগে।

গর্ভাবস্থা আর প্রসব এবং মৃত্যু আর ব্যথা; এবং আবারো মৃত্যু…যখন আর কোনো গর্ভধারণ নেই, কোনো জন্ম দেয়াও নেই, তখন আর মৃত্যুও নেই। কিন্তু একটি মৃত্যু রইল আর একটি ব্যথা।

একটা তাজা লাশ দেখাও যেন তোমাকে সেই পুরনো কান্নায় কাঁদাতে পারি।

মেয়েটির পেট ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। তারপর জরায়ুতে তোলপাড় শুরু হলে দরজায় গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। বিশ বছরে ও শুধু ফুসেনিকেই গর্ভে ধারণ করেছে, জন্ম দিয়েছে। বিশ বছরে তার প্রথম সন্তানই ছেলে। সেই দিনগুলো ছিল হরিণের। গর্ভবতী মাকে হরিণ এনে দেয়া হলে খুব ধমক খেতে হত। এখন সরকারের সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে অসভ্য পোচারগুলো হরিণ মেরে ফেলে। কী দুর্ভাগ্য হরিণীদের! মৃত হরিণগুলোও যেন দক্ষিণের বাড়িগুলোতে চলে যাচ্ছে।

সেইসব দিন! সময় যে কিভাবে যায়। কত জলদি নতুন যুগ চলে আসে। নাতিপুতি হয়ে গেলে কেউ কি আর বয়স কমে যাওয়ার আশা রাখে? ওর একটা নাতি হয়েছে আল্লাহর রহমতে।

সে যখন ঘরে ফিরে এলো, তখনো চুলার আগুন দাউ দাউ জ্বলছে। ম’মা আসানা হাত থেকে বাদাম নামিয়ে রাখে। গলা বাড়িয়ে কোণার দিকটা দেখে নেয়। কাঠের গুঁড়ি যা আছে অন্তত এই সপ্তাহ চলে যাবে। কালকে হাটে বেচা-কেনার তোড়জোড় করতে করতেই সন্ধ্যার বাকি সময়টা সে কাটিয়ে দিল।

সন্ধ্যার প্রার্থনা শেষ। ব্যাগের মধ্যেই টাকা ছিল। ঘাসের চারণভূমি তেমনি দাঁড়িয়ে হাওয়া ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফুসেনিও। মূল দরজার সামনে এলো ম’মা। দেখে নিল বাইরের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না। তারপর দরজা টানল। কোনো অবয়ব নয়, শুধু ঘাসের ওপর পায়ের হালকা খচমচ শব্দ শুনতে পেল।

‘এটা যদি আমার স্বামীর হতো।’

কিন্তু এই শব্দ অবশ্যই ওর স্বামীর ছিল না।

‘কে তুমি?’

‘আমি, ম’মা।’

‘তুমি, ঈসা, আমার ছেলে?’

‘হ্যাঁ, ম’মা।’

‘ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে।’

‘আমিও সেটাই ভাবছিলাম। তাই এখন এসেছি।’

কথাবার্তার এই পর্যায়ে দুজন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। দুজনই ইতস্তত করছিল। ওর মেয়ের জামাই’র কি ভিতরে গিয়ে হাওয়া আর বাচ্চাটাকে দেখে আসা উচিৎ ? নাকি না? এই অসুবিধার ব্যাপারে কিছু বলা হলো না। আর সবসময় শুধু একজনই সবকথা বললে কেমন দেখায়!

ম’মা আসানা তেমন কিছু দেখল না কিন্তু অনুভব করল ঈসা যেন যুদ্ধ জয় করেছে। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে এলো ম’মা। তারপর পিছনের দরজাটা বন্ধ করে দিল। ঈসা আগে আগে হাঁটল। যা হোক, ওরা খুব বেশি দূর গেল না। এক কোণে ঘুরে গেল। খোঁয়াড়ের দেয়ালের বাইরের দিকে আগ বাড়ানো দুটো খুঁটির মাঝখানে। ঈসার এটা প্রয়োজন ছিল। ওর মেরুদণ্ডের ভেতরের ঠাণ্ডায় এখন একটু আরামবোধ হচ্ছে।

‘ম’মা, ফুসেনি ভালো আছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘হাওয়া ভালো আছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘ম’মা আমাকে বলো, ফুসেনি খুব ভালো আছে তো?’

‘আ-হা, ছেলে! তুমি কেন নিজেকে এত কষ্ট দিচ্ছ? ফুসেনি একটা ছোট বাচ্চা, যে জন্ম নিয়েছে দশ দিনও হয়নি। আমি কী করে তোমাকে বলি সে খুব ভালো আছে? যেখানে বয়স্করা অন্য মানুষের গ্রামে থাকতে চলে যায়…’

‘ম’মা?’

‘কী হলো?’

‘নাহ্‌, কিছু না।’

‘বাবা, তোমাকে এই সন্ধ্যায় আমি সত্যি বুঝতে পারি না…একজন সাবালক হয়েও, তুমি যদি অন্য গ্রামে থাকতে চলে যাও, তুমি কি বলবে যে প্রথম ক’দিন তোমার খুব ভালো কেটেছে?’

‘না।’

‘তোমার কি ওদের খাবারের সাথে অভ্যস্ত হতে হবে না? কোথায় গেলে তোমার আর তোমার মেষের জন্য পানি পাওয়া যাবে, সেটা কি তুমি কি প্রথমেই খুঁজে বের করবে না?’

‘হ্যাঁ, ম’মা।’

‘তাহলে তুমি কেমন করে জিজ্ঞেস করো, ফুসেনি কি খুব ভালো আছে? নাভি তাড়াতাড়ি শুকাচ্ছে…আর কেনই বা হবে না? যত নাভি কেটেছি এর মধ্যে একটাতেও ক্ষত হয়নি। আমি কি এখন নাতির নাভি কাটব, যদি ক্ষত হয়? ওর পুরুষ অবস্থানের কথা জানি না। মাল্লাম খুব যত্ন করে, পরিষ্কার হাতে, ঠিকঠাক মতোই করেছে। তোমাদের পরিবার কি নাভিতে ক্ষত হয়ে যাওয়ার জন্য পরিচিত?

‘না, ম’মা।’

‘তাহলে তোমার আত্মা বুকের ভেতর শান্তি পাক। ফুসেনি ভালোই আছে কিন্তু কত ভালো জানি

না।’

‘তোমার কথা শুনছি। ম’মা?’

‘বলো, বাবা।’

‘আমি দক্ষিণে যাচ্ছি।’

‘কোথায় বললে?’

‘দক্ষিণে।’

‘কত দূরে?’

‘সাগর যতটা দূরে। ম’মা আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝতে পারবে।’

‘আমি কি আদৌ কিছু বলেছি?’

‘না, বলোনি।’

‘তাহলে এ কথা কেনো বললে?’

‘ঠিক বলিনি।’

‘তুমি সেখানে কী করতে যাচ্ছ?’

‘এই কিছু কাজ খুঁজতে।’

‘কী কাজ?’

‘আমি জানি না।’

‘হ্যাঁ, তুমি জানো, তুমি সেখানে ঘাস কাটতে যাচ্ছ।’

‘হয়তো।’

‘কিন্তু বাবা, ঘাস কাটার জন্য এত দূরে কেন যাবে? এখানে চারপাশে যা আছে সেটাই কী যথেষ্ট নয়? এই খোঁয়াড়ের পাশে, তোমার বাবা আর গাঁয়ের অন্য মানুষরা এখানেই ঘাস কেটেছে। তুমি এগুলোই কাটো না!’

‘ম’মা, তুমি তো জানো, সেটা আর এটা একই ব্যাপার না। এখানে ঘাস কাটলে মানুষ আমাকে পাগল ভাববে। কিন্তু ওখানে, ওরা শুধু সেটা পছন্দই যে করে তা নয়, ওদের সরকার এ জন্য টাকা দেয়।’

‘সে যাই হোক, আমাদের পুরুষরা ঘাস কাটার জন্য দক্ষিণে যায় না। এটা আরো উত্তরে যারা থাকে তাদের জন্য। ওরাই দক্ষিণে যায় ঘাস কাটতে। এটা আমাদের পুরুষদের জন্য না।’

‘দয়া করে একটু বোঝ ম’মা, এরই মধ্যে সময় চলে যাচ্ছে। হাওয়া সদ্য মা হয়েছে। ফুসেনি আমার প্রথম বাচ্চা।’

‘এবং এরপরও তুমি ওদের ছেড়ে দক্ষিণে যেতে চাও ঘাস কাটতে।’

‘কিন্তু ম’মা, এখানে থেকেই বা আমি কী করব? ওদের না খেয়ে মরতে দেখব? তুমি তো জানোই এবার কোলা ভালো হয় নাই। যদি ফলন ভালোও হতো, বিক্রি করে কত টাকাই বা পেতাম? ওদের চলত? সে কারণেই আমি যেতে চাই। বেচা-কেনার অবস্থা ভালো না। কবে ভালো হবে তাও জানি না। তাই এখান থেকে চলে যাওয়ায়ই ভালো।’

‘হাওয়া জানে এসব?’

‘না, জানে না।’

‘তুমি কি ওর ঘুম ভাঙিয়ে এসব বলতেই এত রাতে এসেছ?’

‘না।’

‘যাক, বুদ্ধি আছে।’

‘ম’মা, আমি সবকিছু আমাদুরের হাতে দিয়ে গেলাম। কাল সকালে সে হাওয়াকে দেখতে আসবে।’

‘ভালো।’

‘কখন আমরা তোমাকে আবার দেখতে পাবো?’

‘ঈসা।’

‘ম’মা।’

‘কবে ফিরবে?’

‘জানি না, হয়তো আগামী রমযানে।’

‘ভালো।’

‘তাহলে আসি?’

‘আল্লাহ তোমার সহায় হোক।’

‘তাঁর নবী তোমাদের সাথে থাকুক।’

 

ম’মা সরাসরি বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখে ঘুম নেই। আর ঘুমাতে পারবেই বা কী করে? সকাল হয়ে এলো। ওর চোখ তখনো খোলা।

‘পুরুষের হেজে হাওয়া নাভির জন্যই কি শুধু একটা পরিবার পরিচিত হয়? না, অবশ্যই না। এটা আমরা, আমাদের হতভাগ্য মেয়েরা; নিশ্চিত মেয়েদের কিছু সমস্যা আছে…আমরা আমাদের পুরুষদের ধরে রাখতে পারি না। এটাই বা কেমন? আল্লাহ, কী করে এমনটা হয়?’

‘বিশ বছর আগে। বিশ বছর, হতে পারে আরো আগে…আল্লাহ আমাকে শক্তি দাও যেন আমি হাওয়ার কাছে বলতে পারি।’

‘নাকি আমার এখন বাজারে যাওয়া উচিৎ। ফিরে এসে বরং বলা যাবে। নাহ্‌। হাওয়া, হাওয়া, কেমন গাছের গুঁড়ির মতো সটান শুয়ে আছে! এভাবে কোনো মা ঘুমায়? হাওয়া,হা-ও-য়া! ওহ! তোর এখন একলা থাকা ঠিক না। এভাবে যদি মরার মতো ঘুমাস, রাতে বাচ্চা কাঁদলে টের পাবি?’

‘মেয়ের কথা শোনো! কী সব প্রশ্ন করছে! সকাল হয়ে এলো। আমি তো ভেবেছি মরেই গেছিস। শীত লাগলে একটা কম্বল গায়ে দে। তোকে কিছু বলতে চাই। আমার কথা শুনে যা।’

‘হাওয়া, ঈসা দক্ষিণে গেছে।’

‘আমার দিকে এমন জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছিস কেনো? বললাম তো ঈসা দক্ষিণে গেছে।’

‘তোর আর বলার কী আছে? আর ও তোকে সাথে নিবেই বা কেমন করে? এত ছোট বাচ্চা। নাভিটা পর্যন্ত শুকায় নাই।’

‘কাল রাতে ও চলে গেছে। তুই আর জিজ্ঞেস করিস না, কেনো তোকে জাগালাম না। জাগালে কী আর হতো? শোন্‌, ঈসা এখানে বসে বসে তোর আর ফুসেনির না খেয়ে থাকা দেখতে পারবে না।’

‘ও দক্ষিণে গেছে কাজ খুঁজতে আর…হাওয়া, তুই কই গেলি? ঈসা কি আর তোর জন্য দরজার কাছে অপেক্ষা করছে? পাড়াশুদ্ধ লোক এখনও ঘুমায়, এতো চীৎকার করতে পারব না…বাচ্চাদের মতো করিস না তো! মা হয়েছিস এবার একটু বড় হ’… উঠে যাচ্ছিস কোথায়? কথা শোন্‌। ঈসা কাল রাতেই চলে গেছে। সরকারি বাস ধরবে। খুব ভোরে যে-বাসটা তামালে থেকে ছাড়ে সেটা। তাই… ’

‘হাওয়া, তুই কেন কাঁদিস? তোর স্বামী তোকে ফেলে কাজে গেছে সেজন্য? তাহলে কাঁদ, ও যেন আমাকে দেখাশোনা করার জন্যই টাকা আনবে, তোর জন্য না…’

‘আমি বুঝতে পারিনি বলছিস, হয়তো পারিনি…ফুসেনির ঘুম ভাঙিয়ে দিলি। এখন বাচ্চাটাকে খাওয়া আর কথা শোন।’

‘একজনের কথা তোকে বলব, সেও এমন ছোট বাচ্চা ফেলে চলে গেছিল।’

‘সে কি আর ফিরে এসেছিলো? না রে। সব বলব কিন্তু তুই ফিরে কোনো প্রশ্ন করবি না।’

‘সে যেত আর আসত। তারপর একদিন চলেই গেল। আর ফিরল না। অন্যদের মতো যে তাকে যেতে হয়েছিল তা নয়…’

‘আহা! ওরা ছিল সৈনিক। এক সৈনিকের গল্প শোন। ওর সৈনিক হবার দরকার ছিল না। ওর বাবা হলো এলাকার সবচেয়ে ধনী। এটা সত্যি যে, সে বাবার বড় ছেলে ছিল না। কিন্তু নিজের জন্য আর স্ত্রীর জন্য একটা কিছু সে করতেই পারত। সে কারো কথা শুনল না। সব ছেলে যেখানে বের হয়ে যাচ্ছে, সে কি আর বসে থাকতে পারে?’

‘ওদের পোশাক ঘষে ঘষে এমন ঝকঝকে করা হতো…তুই শুধু সেদিকে তাকিয়ে থেকেই নিশ্চিত চোখে কাজল দিতে পারতি। দক্ষিণ থেকে ফিরে মাটির উপর দিয়ে যখন হেঁটে যেত, আরে বাবা! ওদের জুতা যেন গর্জন করত! মায়েরা মেয়েদের বলতো বিয়েটা ঠিকঠাক মতো হলে সেটা কত ভালো। খুব কড়াকড়ি মায়েরা এসব বলত, অনেকক্ষণ ধরে। আর বাবারা ব্যস্ত হয়ে পড়ত বাগদান করে বিয়ের কথা পাকা করার জন্য। ওরা ভয় পেত, মেয়েদের অবস্থা যেন মিমুনাতে’র মতো না হয়! ওর বাবা গরু-মহিষ নিল, সবই নিল। তারপর মিমুনাত এক সৈনিকের সাথে চলে গেল। হায় রে, সেই থেকে মেয়ের কী বদনাম!’

‘এই মিমুনাত কিন্তু তোর বান্ধবীর মা না। মিমুনাত শেষ পর্যন্ত দক্ষিণে পালিয়ে গেল। পরে শুনেছিলাম, শহরে সে খারাপ মেয়ে হয়ে গেছে। দেদার টাকা কামাই করেছে।’

‘না, এখন আর ওর কথা শুনি না। মরে নাই এখনও। এসব মহিলা নাকি মরার সময় বাড়ি ফিরে আসে। সে তো এখনও ফিরল না।’

‘কিন্তু আমাদের ব্যাপার আলাদা। আমরা অন্য রকম। আমাদের তো আর বাগদান হয় নাই।’

‘ভাবছিস ‘আমরা’ কেন বললাম? আরে, আমরা মানে আমি আর তোর বাবা। এমন হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেনো? হ্যাঁ রে, তোর বাবার কথাই বলছি।’

‘না, তোর বাবা যে মরে গেছে, তোকে আমি মিথ্যা বলি নাই। চুপচাপ কথা শোন্‌। উনি দক্ষিণে গিয়েছিলেন বিবাহিত সৈনিক হিসাবে যেন ঘর পান সেজন্য।’

‘না, উনি তখনও ফিরে আসেন নাই। তবে এসেছিলেন এখানে, কিন্তু আমাকে নেয়ার জন্য না।’

‘উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমরা কি যুদ্ধের কথা জানি?’

‘যুদ্ধের কথা আমরা আবার জানি না? টিনের কৌটার মাছ, কেরোসিন আর কাপড়ের জন্য কম কষ্ট করেছি?’

‘হ্যাঁ, আমরা বলেছিলাম, জানি। তবে ভেবেছিলাম হয়তো ব্যাপারিরা এসব জিনিস আর আনছে না।’

‘উনি বলেছিলেন, ঠিক তাই। ব্যবসায়ীরা দক্ষিণেও এসব জিনিস ঢুকতে দিচ্ছে না।’

‘কিন্তু কেনো? জিজ্ঞেস করেছিলাম।’

‘ওহ! তোমরা জার্মানদের নাম শুনেছ? উনি আর ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না। বললেন, দক্ষিণের ওরা জার্মানদের নিয়ে অশ্লীল গান গাইছে।

‘কিন্তু আমরা কবে যাচ্ছি?’

‘তখন জানালেন, কেন উনি এখানে এসেছেন। আমাকে সাথে করে নিয়ে যাবার জন্য না। বললেন, দেখো, আমরা ছিলাম ইংরেজদের শাসনে। আর ইংরেজরা যুদ্ধ করছে জার্মানদের বিরুদ্ধে।’

‘জানিস মা, আমি ওনাকে ঠিক কী জিজ্ঞেস করেছিলাম? এসবের সাথে আমার-আপনার কী? কেন আমি আপনার সাথে দক্ষিণে যেতে পারব না?’

‘কারণ, আমাকে নাকি সাগর পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধ করতে হবে।’

‘অন্যের যুদ্ধে? মেয়েরে, তুই এমনভাবে প্রশ্নটা করলি, যেন আমি ওনাকে প্রশ্নটা করার সময় তুই সেখানেই ছিলি।’

‘উনি বলেছিলেন, ব্যাপারটা যত সহজ মনে নয় আসলে এত সহজ না।’

‘আমরা ওনার কথা বুঝলাম না। ওনার বাবাও যেতে মানা করলেন। বললেন, তোমার যাওয়া ঠিক হবে না। এতো আর আমাদের গ্রানশি আর গনিয়াদের যুদ্ধ না।

আমি ইংরেজদের চিনি কিন্তু জার্মানদের চিনি না। সে যাই হোক, ওরা ওদের দেশে যুদ্ধ করছে।’

‘ওর বাবা আমাকে বাজিয়ে দেখছিলেন। আমিও।’

‘উনি বললেন, একজন সৈনিকের সব সময় মান্যতা দিয়ে চলা উচিৎ।’

‘আমি ওনাকে অনেক কিছু দিতে চাইছিলাম। সাথে করে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু উনি শুধু কোলা নিলেন।’

‘তারপর খবর এলো কিন্তু মাথায় কিচ্ছু ঢুকল না। মাথাটা ছিল ফাঁকা। সবকিছু যেন জরায়ুতে গিয়ে পৌঁছল। তোর বয়স তখন তিন দিন।’

‘খবরটা ছিল আগুনের মতো। আগুনের মতোই পেটের গর্তে স্থির হয়ে থাকল। সময়ে সময়ে কেউ গুলি ছুঁড়ে দেয়, আমার গর্ভ তাপে জ্বলতে থাকে। সমস্ত নাড়ি ঝলসে দিয়ে পোড়াতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি পাগলের মতো চীৎকার করি। তখন আমার মাথায় ঢোকে।’

‘যখন তুই হলি, আমি নিজেকে বললাম, এটা কোনো ব্যাপারই না, মেয়ে হয়ে জন্মেছিস। আল্লাহ্‌’র দেয়া যে কোনো উপহার মঙ্গলকর। যাই হোক, উনি ফিরে আসবেন, আমাদের অনেক সন্তান হবে। অনেক ছেলে।’

‘হাওয়া, তোর অনেক জোর ছিল। কিভাবে বেঁচে গেলি, জানি না। তিন দিনের বাচ্চা তুই, আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গেল। ছোট নদীকে যেন হঠাৎই আগাম শুকনা-হিমেল উত্তুরে বাতাস হারমাটান এসেআঘাত করল। কিন্তু তোর সাংঘাতিক প্রতিরোধশক্তি ছিল।’

‘পরে অনেকেই বলেছে, দক্ষিণে গিয়ে সরকারি লোকদের কাছে যদি প্রমাণ করতে পারি আমি ওনার স্ত্রী, তাহলে অনেক টাকা পাব।’

‘কিন্তু আর গেলাম না। আমি তো ওনাকেই চেয়েছিলাম, সোনায় পরিণত ওনার শরীর না।’

‘আমার কোনোদিন দক্ষিণ দেখা হলো না।’

‘ অ্যাই, তুই কি ‘আহারে’ বললি? এই দুনিয়া অনেক দিন আগে সৃষ্টি হয়েছে, বুঝলি? বুড়ো চোখ যা দেখেছে, জোয়ান চোখ তা দেখে নাই। আর কোনোদিন ‘আহারে’ বলবি না।’

‘সরকারি লোক, যারা আসে আর যায়, শুধু বলে ব্যবসার অবস্থা ভালো না। ফের কৌটার মাছ আর কাপড়ের অভাব। হয়তো একদিন আমাদের ছেলেমেয়েদের সবকিছুই থাকবে।’

‘এবার ঈসা গেল দক্ষিণে। বউয়ের পেটে যখন ছেলে, খাসীর মাংসটুকু পর্যন্ত সে খাওয়াতে পারে নাই। হয়তো একদিন ফুসেনি তার স্ত্রীর সাথে থাকতে পারবে। একসাথে দুজন মিলে গরুর মাংস খাবে। হুম…ইসা হয়তো ফিরে আসবে।  আগামী রমজানে না হলেও পরের রমজানে।  এখন তুই জানিস, আরেক জন গিয়েছিল যুদ্ধে।  অন্যের যুদ্ধে লড়াই করতে।’

‘আমি এখন বাজারে যাব। জলদি উঠে ফুসেনিকে গোসল করিয়ে দিস। দেখি, কোলাগুলোর বদলে কী পাই। এত বাজে এবারের কোলা। যতটুকু চাল আছে দুজনের চলে যাবে, কিবলিস?’

‘ভালোই হলো। আজ সব টাকা শেষ হয়ে গেলেও মাছ কিনব। বাজারের সবচেয়ে বড় ঝলসানো মাছ যেটা। কতদিন ভালো কিছু খাইনা।’

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close