Home লিটল ম্যাগ “আমি কিন্তু গল্প লেখার জন্য দৌড়াদৌড়ি করি নাই…” / হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার [পর্ব ২]

“আমি কিন্তু গল্প লেখার জন্য দৌড়াদৌড়ি করি নাই…” / হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার [পর্ব ২]

প্রকাশঃ April 15, 2017

“আমি কিন্তু গল্প লেখার জন্য দৌড়াদৌড়ি করি নাই…” / হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার [পর্ব ২]
0
0

“এই যে আহমাদ মোস্তফা কামাল, শাহীন আখতার, শাহনাজ মুন্নী ছেলেদের মধ্যে ওয়াসী কবিদের মধ্যে কই…কবি ওই মোহাম্মদ রফিক, হাবীবুল্লাহ সিরাজী আছে বেঁচে…কে…আর এখন অনেকেই তো চলে গেলেন, আছেই বা কে? তবে আশাটা আছে, কবে কে কখন ঝিলিক দিয়ে উঠবে বলা মুশকিল…‘যে কবির বাণী লাগি…”

[সম্পাদকীয় নোট : ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় প্রকাশিত লিটল ম্যাগ ‘চিহ্ন’ পত্রিকার রিভিউ করতে গিয়ে আমরা এর আগে ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব প্রকাশ করেছিলাম। আজ প্রকাশিত হলো ওই সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব। সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ বলে আমরা কয়েকটা পর্বে এটি প্রকাশ করছি।]

চিহ্ন : এক ধরনের স্বাধীনতা তো আপনার জীবনে ছিলো তাহলে…

হা. আ. হ. : স্বাধীনতা। বাবা ওসব খবরই রাখতো না। কঠিন কঠোর শাসন, সে শাসনটা মূলত কতগুলো বিশেষ কারণে। প্রথম কথা হচ্ছে উনি যেখানে যে জিনিসটা রাখতেন সেটা হাত দিয়ে নাড়িয়ে অন্য জায়গায় রাখা যেতো না, উনি ধরে ফেলতেন। আর তাকে না বলে কোন জিনিস কাউকে দেওয়াও যেতো না। কোন জিনিস নিজে নিয়ে এসে রাখাও যেতো না। তাছাড়া উনি শাস্ত্র মেনে চলা মানুষ। যে মুহূর্তে আমি ক্লাস নাইনে উঠলাম তখন তিনি আমার বন্ধু হয়ে গেলেন, আর বকাবকি নেই। প্রাপ্তি তো ষোড়শী বর্ষে, ষোড়শ বয়স হলে পুত্রের সাথে মিত্রের মতো আচরণ করতে হবে, এটা বাবা মানতেন। সুতরাং বাবা আর কখনই বকাবকি করেন নি আর এ দেশে আসার পরে সম্পূর্ণ আমার উপর ডিপেন্ড করতেন। আমার তখনই নাম ছিলো এই ছেলেটা বাংলায় ভালো, লিখতে পারে ভালো আর ইংরেজিটাও খারাপ না, ইংরেজি গড়গড় করে পড়ে মানেটাও বলে দেয়। এগুলো আমার অভ্যেস করে নেওয়া, এমন নয় যে- আমি জানতাম বলেই পারতাম। মূলত রাতের বেলায় আমি নোট রেডি করে কন্ফার্ম করে রাখতাম। সংস্কৃতেও তাই, ঝরঝর করে পড়তে পারতাম তাতেই আমার টিচার খুশি। ম্যাথমেটিক্স একেবারেই পারতাম না। এজন্যে মদন বলে আমার একটা বন্ধু ছিলো, সকাল হলেই ওকে বলতাম অংকগুলো টুকে দে, পার কর। রাতে আমার জন্য ও অংক করে রাখতো। জিওগ্রাফি তারপরে হিস্ট্রি, এগুলো তখন খুব ভালো স্ট্যান্ডার্ড ছিলো। হিস্ট্রির রমেশচন্দ্র মজুমদারের মোটা বই ছিলো ভারতবর্ষের ইতিহাস। তখন এই সমস্ত বইগুলো আমাদের আউট অফ সিলেবাস হলেও আমি সেগুলো সব পড়েছি। ডেভিড কপারফিল্ডের একটা ভার্সন স্কুলে পাঠ্য ছিলো। আমার মামাতো ভাই তিনি স্কুলে পড়তেন, তার ঐ বই নিয়ে আমি ক্লাস ফোরে পড়ার সময় পড়েছি। তাছাড়া ক্লাস এইট নাইনের বিভিন্ন বই, শিবনাথ শাস্ত্রীর বই, প্রবন্ধ, তারপর সেই সময়কার উপন্যাস, বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র এদের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের উপন্যাস পাওয়া যেতো। সমস্ত বই গোগ্রাসে পাঠ করতাম, পাঠেতে মন লাগতো এবং সেটা যে মনে থাকতো এটা আমার মনে আছে। আর এমনই ছিলো আমার পাঠাসক্তি, আমার গ্রন্থাসক্তি এবং প্রথম দিকে ঠিক যা হয় তাই। হেমেন্দ্রকুমার রায় সব্যসাচী- যে সমস্ত ডিটেক্টিভ এবং রোমান্সকর বই আছে, অভিযানের বই আছে- বইগুলোকে খুব প্রিয় মনে করতাম। এগুলোই হচ্ছে সেরা সাহিত্য এর মধ্যে আবার দ্বিধার কি আছে কিংবা এর চেয়ে বড় সাহিত্য আর কি হতে পারে! ওইগুলোর খুব ভক্ত এবং কিছু পয়সা জমলেই বর্ধমানে গিয়ে দামোদর পুস্তকালয়ে গিয়ে বলতাম যে কি কি এসেছে! তো যে পর্যন্ত কুলাতো নিয়ে চলে আসতাম। মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গাছে যেমন কুল হয় তেমন জঙ্গলেও কুল হতো, এগুলোকে বলতো বনকুল। প্রচুর পরিমাণে হতো। আমাদের একটা কাজই ছিলো পকেটে একটু গুড়ো নুন নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। কেউ খবরই রাখতো না। কি কি খাওয়া যায় এই হলো আমাদের সন্ধানের বিষয়। কাঁচা কদবেল খাওয়া যায় কিনা, বেল খাওয়া যায় কিনা, আমাদের ওখানে বেল খাওয়া যেতো না। তারপরে বঁইচি খাওয়া যায় কি না। কোনো কোনো বনকুল ভিতরে রয়েছে, পাড়তে গেলে বড় বড় মাটির চাঙ্গড় দিয়ে তার উপর পা দিতে হবে নইলে কাঁটা তো আছেই। সর্বশেষ চাঙ্গড়ে পা দিয়ে দেখি- চন্দ্রগোখরা সাপ, ওরে বাবা প্যাক করে ফিরে চলে আসা। সেজন্য বলছি যে সাপের মাথায় পা দিয়ে কি করে তালগাছে উঠে তাল পাড়া। বাজপড়া তালগাছ, তার মাথায় উঠে পড়া এবং সেখান থেকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে পুকুরের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া। কেউ বারণ-টারণ করেনি কোনদিন। শুধু লোকের ক্ষতি করলে সেটা মুশকিল হতো, তবে লোকের ক্ষতি তেমন করতাম না। এইসব নিয়ে আমার বাল্যকাল খুব ভালো কেটেছে।

চিহ্ন : তাহলে আপনার গল্পের মধ্যে যে ইমাজিনেশন তার সব এগুলোই?

হা. আ. হ. : এগুলো থেকেই। আমি কিন্তু গল্প লেখার জন্য দৌড়াদৌড়ি করি নাই। ইন সার্চ অব স্টোরি আমি কোনদিনই নই। এখনো আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে আমি গল্প তৈরি করাতে পারদর্শী নই। অনেকে গল্প তৈরি করে দিতে পারে আরকি! ঐ একটা জায়গাতে আমার ঘাটতি আছে।

চিহ্ন : কিন্তু আপনি যে গ্রামগুলোর বা পরিবেশের কথা বলছেন সেরকম আর একটা গ্রাম আপনার মধ্যে আসতে পারে। হয়তো সেটা প্রত্যক্ষ নয় কিন্তু ওটা বানিয়ে তোলা যায়।

হা. আ. হ. : সে তো এমন কিছুই নয়। একটা গ্রাম আর একটা গ্রামের ফটোকপির মতো তো আমার সমস্ত সোর্স ওখান থেকেই এবং প্রকারন্তে সত্যি। আমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক পড়েছি যখন অধ্যাপনা করি সিরাজগঞ্জ কলেজে। তারপরে প্রেমেন্দ্র মিত্রের তেলেনাপোতা আবিষ্কার অনেক পরে পড়েছি। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের ইন্দিরা ছোটবেলাতেই পড়েছি।

চিহ্ন : কিন্তু এখন যাদের এই জীবনটা নেই তারা যদি এখন লিখতে চায় কিংবা এখন যারা লিখছে তাদের তো এই জীবনটা নেই সেক্ষেত্রে আমরা তো অনেক কিছুই দেখতে পাব না?

হা. আ. হ. : যদি আউট অফ ইমাজিনেশন কিছু লিখতে চায় তাহলে হতে পারে, আমি জানি না। আমার তো নেই। আমি অভিজ্ঞতা ছাড়া লিখতেই পারি না।

চিহ্ন : তাহলে এখনকার যে অবস্থা সেটার মূল কারণ শেকড়ের যে জায়গাগুলো কিংবা বড় হওয়ার যে বিষয়টা আপনি বললেন ‘দুরন্ত কৈশোর’ এই কৈশোর যদি না থাকে, এই অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা না থাকে তাহলে গল্প তৈরি হবেই বা কি করে?

হা. আ. হ. : এ আর আমি জানি না। আই এ্যাম ইন ডাউট এবং এখনকার যারা লেখক আছে তারা কি করে লেখে কি জানি, ঢাকাকেন্দ্রিক জীবন নিয়ে লেখে কিংবা শৈশব গ্রামে কেটেছে। কলকাতার লোকজন কিভাবে লেখে- ওখানে তো কলকাতা শহর ছাড়া বাংলা সাহিত্যের আর খবর নেই। হয়তো দৌড়ে-টৌড়ে গ্রাম থেকে ঘুরে এসে লেখে। ওটাও কিন্তু কলকাতাভিত্তিক। হুগলিতে নয় বর্ধমানে নয় কোথাও সাহিত্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।

চিহ্ন : শকুন থেকে সাবিত্রী উপাখ্যান কিংবা বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প অথবা আগুনপাখি এগুলোর মধ্যে তো এই গ্রামটাই এই কৈশোরটাই এই যৌবনটাই দেখি- এটারই একটা রেনোভেশন?

হা. আ. হ. : আমার মনে হয় এই জগৎটা যে পেয়েছে সে কিন্তু ভাগ্যবান। সে স্বীকার করুক বা না করুক। আর এই জগৎটা যে পায়নি অর্থাৎ শৈশবহারা মানুষ আমার মনে হয় সত্যিকারের মানুষ হতে পারে না, অসুবিধা আছে তাদের। অনেক ঘাটতি থেকে যাবে তাদের। সবাই হয়তো অপুর মতো হবে না তবে একটা শৈশব আমাদের থাকা দরকার। যেখান থেকে বড় হয়- যেমন সোজা কোনো বটগাছ হয় না, সেটা চারা লাগাতে হয় তারপর সেই চারাটা আস্তে আস্তে বড় হয়।

চিহ্ন : এই যে লেখার ইন্সপেরেশন এবং হাসান আজিজুল হকের তো অনেক বন্ধু ছিলো কিংবা সেই সময়ে এই রকম লাইব্রেরিতে পড়া, বড় হওয়া এই সমস্ত অনুভূতির মধ্য দিয়ে তা আরও অনেকে বড় হয়েছে, সবাই তো লেখক হয়নি। তাহলে লেখক হওয়ার জন্য ভেতরে যে প্রণোদনাটা সেটা কি আসলে স্বতঃস্ফূর্ত কিংবা আপনি টলস্টয় বা দস্তয়ভস্কি পড়লেন…

হা. আ. হ. : মনে হয় একটু স্বতঃস্ফূর্ত বটে। হিউম্যান নেচার তো একরকম হয় না, সব শিশুও একরকম হয় না। কল্পনাপ্রবণ শিশু আছে স্বার্থপর শিশু আছে- নানান রকম। এতটুকু শিশুই কিন্তু চূড়ান্ত রকমের স্বার্থপর। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সেই গল্পটা আছে না…। শিশুও তো নানান রকম হয়ে যায়, নষ্টও হয়ে যেতে পারে। তবে আমার তা হয় নি কেন জানি! বন্দুক ছিলো বাড়িতে, চাচার সঙ্গে অথবা বাবার সঙ্গে শিকার করতে যেতাম আনন্দও পেতাম, পরবর্তীতে ভেবে দেখলাম যে, ‘দ্যা শ্যুড ব্যাড’। খেলাধুলাতে ভীষণ মনযোগ ছিলো। ফুটবলটা কি-যে কীভাবে ভালোবেসে খেলেছি। রাখালদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে এমন করে চার্জ করলে যে আমার পশ্চিম-মুখো পা সোজা উত্তর-মুখো হয়ে গেল। তারপর পায়ে আর বল ঠেকাতে পারিনি। কলেজেও চলে আসলাম আর খেলা হয়নি তা না, হলে আমি ফুটবল কিন্তু ভালোই খেলতাম। আই ওয়াজ এ গুড রানার। সত্যি বলেই বলছি, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলেই, ‘আমি ফার্স্ট রানার’। তাছাড়া লং জাম্প হাই জাম্প। অবস্টাকেল দিয়ে যে রেসটা করে- হার্ডল। দৌঁড়াতে শুরু করলাম আমি এগিয়ে আছি তারপর দেখলাম আমার পাশে একমাত্র মনোজ কুমার পাল রয়েছে আর কেউ নেই। তারপর সর্বশেষ যখন পার হতে হবে একটা শতরঞ্জি পাতা আছে যার দুপাশে ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে, সেই শতরঞ্জির তলা দিয়ে গিয়ে ছুঁতে হবে। শতরঞ্জির পরেই হচ্ছে টার্গেট। আমি তখন কয়েক হাত এগিয়ে শতরঞ্জির তলায় ঢুকে পড়েছি। কে করেছে তা আমি জানি না। দুইপাশ থেকে এমন করে চেপে ধরলো যে আমি হাজড়-পাজড় করে শতরঞ্জি থেকে বের হতে পারি না। ইতোমধ্যে আমার পাশের ফাঁক দিয়ে আর একজন বেরিয়ে চলে গেছে। আমি যখন বের হলাম তখন দেখি যারা অংশগ্রহণ করেছিলো তারা সবাই আমার সামনে। এই রান, লং জাম্প, আবৃত্তি পারি আর না পারি করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি হলো আমাদের স্কুলে তাতেও আছি অথবা মেঘনাদবধ কাব্য পড়তে হবে সেখানেও। মহারাজা মনীশচন্দ্র নন্দীর পৌত্র সৌমেন্দ্র চৌধুরী নন্দী স্কুল পরিদর্শনে আসবেন তার জন্য প্রশংসা বাক্য লিখতে হবে রাজা মহারাজাধিরাজ সম্বোধন করে। আমাকে মনে হয় হিন্দুরা একসেপ্ট করেছিল তা না হলে এই ভালোবাসাগুলো কোথা থেকে পেয়েছি। আমাদের যে হেডমাস্টার ছিলেন বাংলা এবং ইতিহাসের তিনি বলতেন- এই তোর খাতা দেখছি রে দুনম্বর কম দিলাম- নইলে বাহাদুরী করবি রে…লেটার মার্ক পেয়েছি, সেজন্য আটাত্তর দিয়ে রাখলাম।

চিহ্ন : ষাটের দশক থেকে এই আজকে পর্যন্ত এটাতো একটা দীর্ঘ জার্নি, এই সময়ের মধ্যে আপনি গল্প লিখেছেন, কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন- বিশেষ করে সত্তরের পর। সে প্রবন্ধগুলোতে নতুন কিছু চিন্তা আছে এবং এগুলোর বিকল্প কোন পাঠ এখনো তৈরি হয়নি কিংবা দেখা যাচ্ছে না সেভাবে। এগুলোতো আপনার বোধ-বুদ্ধিরই ব্যাপার, ভাষা ও সংস্কৃতি, তাদের মধ্যে সম্পর্ক, সংস্কৃতি কি ইত্যাদি। তারপরে যে উপন্যাসটা ২০০৬-এ, আর এখন তো অনুবাদ করছেন। আসলে একজন লেখকের যে জার্নি সে জার্নির কি কোন ফেজ বা স্পেল থাকে?

হা. আ. হ. : আমার মনে হয় না।

চিহ্ন : হেমিংওয়ে আজ থেকে বিশ বছর আগেও আপনি পড়েছেন, তখন অনুবাদ করতে ইচ্ছা হয়নি কিন্তু এখন কেন হচ্ছে? এবং গত পাঁচ-সাত মাসে দেখছি এই ধরনের লেখাগুলো, যেগুলো অনুবাদ হচ্ছে এবং হওয়া উচিত কিংবা গ্রেট রাইটার যারা- হেমিংওয়ে, ফকনার এই দুই-তিন জনের কথা মাঝে মাঝেই আপনার মুখে শুনছি এবং আপনি পড়েই বলছেন অসাধারণ গল্প এমন গল্পতো আমি নিজেও লিখতে পারিনি। আজকাল যারা লেখালেখি করছে তাদের তো এগুলো পড়া উচিত। বিশ্বসাহিত্যের যে গল্প বা আঙ্গিনা তার সঙ্গে একটা যোগাযোগ।

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। আমি একটা যোগাযোগ রাখতে চাই প্রাণপনে এবং এটা আমি করেই যাবো যতোদিন আমার জ্ঞানবুদ্ধি চিন্তাশক্তি থাকবে ততদিন। এই যে আমি মার্কেস, কোয়েৎজির লেখা পড়ছি। তারপর তুমি যার কথা বলছো, যার বাহাদুরি আমার একদমই পছন্দ হয় না- মিলান কুন্ডেরা। সবচেয়ে খারাপ লাগে ও একেবারে ভিতর থেকে কমিউনিস্ট-বিরোধী¬ কোনো যুক্তিতর্ক দিয়ে নয়। ওর দেশে অর্থাৎ চেকে, ওখানে কিছু কমিউনিস্ট রয়েছে তারা যেভাবে সমাজটাকে দেখতে চেয়েছে বানাতে চেয়েছে, ও ভেবেছে যে- তাঁরা নিগড়ে বাঁধতে চেয়েছে।

চিহ্ন : লেখকদের কমিউনিস্ট বা একটু বামপন্থি হওয়া একটা স্বাভাবিক বিষয় এবং এটা তাদের ভেতরেই তৈরি হয়। তাহলে আবার হঠাৎ করে এর মধ্য থেকে কেউ কেউ বেরিয়েও যাচ্ছে।

হা. আ. হ. : কিছুদিন আগে পাঁচজন এসেছিলো চায়না থেকে, তারা স্বীকার করলো যে- উই ক্যান নট রাইট এ সিঙ্গেল লাইন এ্যান্ড পাবলিশ ইট উইদাউট পারমিশন অভ গভর্নমেন্ট। তাহলে তো বেঁধে মারা গো। এবং কোন প্রতিকার নেই- অপ্রতিকার্য। চায়না আস্তে আস্তে ফ্রী হচ্ছে- জাপানও। তাই কাউকে তো ছোট করার কারণ নাই। আমাদের বাঙালিরাও কিন্তু ছোট নয়। আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ কিন্তু খুব বড়, একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব বড়। যাই বল জন্মেছে এখানে সাহিত্যিক। এই দেশে আনফরচ্যুনেটলি পিছু হটতে শুরু করলো সাতচল্লিশের পর থেকে। সাতচল্লিশকে ধরে নিয়ে সামনে এগোনো- ওরা ত্রিশ চলে আসবে, মানিকের মতো বুড়োরা লিখবে। সরদার জয়েনউদ্দীনের লেখা দেখ, তারপর রশিদ করীম, ওর বড়ভাই আবু রুশদ মতিনউদ্দিন- এই সবকিছু…। আধুনিকতার চিহ্ন পর্যন্ত রাখতে পারেনি, কেন এ কি কথা! এরা সকলেই তখন জীবিত। পঞ্চাশ সালে মানিক জীবিত, তারাশঙ্কর তো একাত্তর সাল পর্যন্ত জীবিত, সাড়া দিচ্ছে- সবশেষে বাংলাদেশ নিয়েও লিখেছেন তিনি।

চিহ্ন : কিন্তু আমাদের এরা পিছিয়ে গেল কেনো?

হা. আ. হ. : আমি জানি না। কেন গো? আমরা কি একধরনের আলাদা দেশ হওয়ার পরে সবকিছু আলাদাভাবে করবো, বিশেষ করে যার ভিত্তিতে দেশটা স্বাধীন হয়েছে সেইটার উপরে বেশি গুরুত্ব দেবো।

চিহ্ন : এইটা কি বাঙালি মুসলমানদের কোন রিজার্ভেশন যে ধর্ম ও সংস্কৃতির কোন দ্বন্দ্ব সেই জায়গা থেকে কিছু?

হা. আ. হ. : তাও তো ঠিক মনে হয় না। এই যে সরদার জয়েনউদ্দীন লেখায় হিন্দু চরিত্র অনেক আছে। যেমন নয়নঢুলি। ১৯৫৬ সালে তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস আদিগন্ত হিন্দু-চরিত্র আছে। তো সেটাও বলা যায় না। মিড-ফিফ্টিজ থেকে কিন্তু আর অতটা শুরু হয়নি, তখন থেকে শামসুর রাহমানের আবির্ভাব- যদিও সে কেবল আসছে। আমরা যখন ‘পূর্বমেঘ’ বের করছি তখন শামসুর রাহমান এসে গেছেন, সৈয়দ শামসুল হকের নামটাও তখন শোনা যেতো, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দের নাম তখন বেশ শোনা যায়।

চিহ্ন : হঠাৎ করে ঊনসত্তর সালের দিককার ‘পূর্বমেঘ’-র একটা সংখ্যা দেখলাম। আপনার জীবন ঘষে আগুন গল্পটা ছাপা হয়েছিলো, ঐ সময়ে নাম-টামগুলোতো খুব চোখা ছিলো। এগুলো আসলে চিন্তা কিংবা সংস্কারমুক্তির ধারণাই ভেতরে ডেভলাপ করে এসেছে। এছাড়া পাতালে হাসপাতালে, মা মেয়ের সংসার।

হা. আ. হ. : একধরনের নির্ভিকতা কাজ না করলে আসলে হয় না। জিয়াউর রহমানের আমলে ‘পাতালে হাসপাতালে’ লেখা কঠিন না কিংবা ‘খনন’ পূর্ববাংলার খাল-খনন পরিকল্পনা, সেটাকে চূড়ান্ত বিদ্রুপ করেছি। পাবলিক সার্ভেন্ট এমন কিছু ভালো গল্প নয় কিন্তু ধরেছিতো আচ্ছা করে, তারা টের পায় এখন- তাদের চার পয়সা মূল্য নেই।

চিহ্ন : সত্তরের দশকে আপনাদের বন্ধু-বান্ধব পরিমণ্ডলের যারা ছিলেন, তাদের তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে বড় একটা ভূমিকা আছে।

হা. আ. হ. : আছে আছে…এখানে একটা বড় অবদান আছে। প্রগতিশীল শিক্ষকরা বরাবরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে- আমাদের আগেও তারা ছিলেন। এই যেমন হাবিবুর রহমানের মত তেজস্বী লোক, মেরেই তো ফেলল তাঁকে। সালাহ্উদ্দিন স্যারের মতো লোক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো মুক্তবুদ্ধির মানুষ। সব বড় বড় শিক্ষক- ইনাদের কাছে আমরা মোটামুটি পড়েছি। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এবং মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ‘পূর্বমেঘ’ বের করাটা বাংলাদেশের সাহিত্যে একটা ঘটনা। ওখানে অ্যারিওপ্যাজিটিকা, শোকাচ্ছন্ন স্যামসন লেখা হচ্ছে একই সাথে বরেন্দ্র জাদুঘরের মখলেসুর রহমান সাহেবের লেখা বেরুচ্ছে। স্যার পণ্ডিত ছিলেন, তপন রায় চৌধুরীর বন্ধু উনি, ক্লাসমেট। মখলেসুর রহমান এমন লোক যে, একবার হোস্টেলে এসে বলছে যে আমার সঙ্গে এক ভাই এসেছে- আসলে তার স্ত্রীকে পুরুষ মানুষ সাজিয়ে নিয়ে এসেছেন। মখলেসুর রহমান সাহেব এমন মজার মানুষ ছিলেন। সনৎ, আমি, আলী আনোয়ার, শহিদুল ইসলাম- রাতে তো বসা হতোই তাছাড়া শুক্রবারে শুক্রবারে শুধু বাড়িতে বসা হতো। ঐ সময়ে আমরা ক্লাব থেকে নাটক করেছি অনেক। নাজিম মাহামুদকে ডেকে আনা হলো।

চিহ্ন : নাজিম মাহমুদের অনেক গুণ ছিল, সুদর্শনও …

হা. আ. হ. : নাজিম মাহামুদের মতো বিশাল মনের মানুষ, আমাকে বলতো যে, ইউ আর মোর দ্যান মাইসেলফ- কোনদিনও ভোলা যাবে না। আমাকে একবার যখন সংবর্ধনা দিল- ‘স্বনন’ তখন নাজিম মাহমুদ বলেছিলেন, পরজন্ম আছে কিনা জানি না, যদি থাকে তাহলে হাসান আজিজুল হকের মতো কাউকে নয় হাসান আজিজুল হককেই আমি বন্ধু হিসেবে পেতে চাই। কত বড় আসলে…চিন্তা কর। মাতিয়ে রাখতেন এই শামসুর রাহমান, তসলিমা নাসরিন, তাঁর ক্লাসমেট আনিসুজ্জামান সবাই…

চিহ্ন : আপনার ‘প্রাকৃত’ সম্পাদনা হলো…সম্ভবত, ৯২-তে নাজিম মাহমুদই ক্যাম্পাসে এঁদের আনতেন…

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, বহু বাইরে থেকে আনা হয়েছিল। খান সারোওয়ার মুর্শিদ প্রকৃত গুণী মানুষ, তিনি আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন, কারণ এখনকার কোয়ালিফিকেশন অনুযায়ী আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার কোন উপায় ছিলো না। সে সময় আবুবকর সিদ্দিককে নেওয়া হলো। নাজিম মাহমুদই আবুবকর সিদ্দিককে এনেছিলেন। নাজিম মাহমুদের ব্যাকুলতার শেষ ছিল না। যা হোক আজকালকার এঁরা কেন যে বসে পড়লো…জানি না। এই যে আহমাদ মোস্তফা কামাল, শাহীন আখতার, শাহনাজ মুন্নী ছেলেদের মধ্যে ওয়াসী কবিদের মধ্যে কই…কবি ওই মোহাম্মদ রফিক, হাবীবুল্লাহ সিরাজী আছে বেঁচে…কে…আর এখন অনেকেই তো চলে গেলেন, আছেই বা কে? তবে আশাটা আছে, কবে কে কখন ঝিলিক দিয়ে উঠবে বলা মুশকিল…‘যে কবির বাণী লাগি…’

চিহ্ন : পাতালে হাসপাতালে কিভাবে প্রকাশিত হয়, স্যার?

হা. আ. হ. : পাতালে হাসপাতালে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার কোনো এক ঈদ সংখ্যায়। রাজশাহীর দৈনিক বার্তার সম্পাদক কামাল লোহানী আমাকে বললেন যে, হাসান আমি যাচ্ছি (ঢাকায়) আমাকে উনি (দৈনিক বিচিত্রার সম্পাদক) টেলিফোন করে বলেছেন যে, তোমার কাছে একটা লেখা আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি রাতেই লেখাটা শেষ করলাম এবং উনাকে দিয়েছিলাম। এভাবেই পাতালে হাসপাতালে দীর্ঘ লেখাটা পাঠানো হয়েছিলো।

চিহ্ন : মা-মেয়ের সংসার কোথায় বেরিয়েছিলো স্যার?

হা. আ. হ. : মা-মেয়ের সংসার বেরিয়েছিলো বড় অদ্ভুত জায়গায়। আলী আহমদ (আগুনপাখির আনুবাদক) আমাকে বললেন, আমাদের কাস্টমস থেকে একটা পত্রিকা বের করবো। তেমন কোনো উদ্দেশ্য নেই, করে রাখবো আর কি! আমাকে একটা গল্প দিন আপনি। গল্প গল্প, আমি এখন কি করবো, কোত্থেকে গল্প দেবো? ও বললো হাসান ভাই, আমাকে একটা গল্প দিতেই হবে। আর এই ফাঁকে লিখেছিলাম গল্পটা খুব দ্রুত। প্রায় একবারে, একবসাতে না হলেও, দুতিন বারের বেশি বসিনি। গল্পটা লিখে বেশ আনন্দই পেলাম। ভালোই লিখেছি আর কি! সুন্দরবন এলাকাতে আমার আগে একটু যাওয়া আসা ছিলো। বিশেষ করে ঐ জায়গায়, যেখানে মা-মেয়ের সংসার লোকেদের বসতি। সুন্দরবনের গায়ে কিন্তু একেবারে ভেতরে নয়, একটু পাশে। গল্পটা তো বেশ ভালোই, প্রশংসিত আর কি?

চিহ্ন : হ্যাঁ। হ্যাঁ। স্যার, একটা জিনিস মনে পড়লো। সেটা হচ্ছে যে, ‘রিভিশন’ (হ্যারল্ড ব্লুম-কথিত ‘প্রভাবের যন্ত্রণা’) বলে একটা কথা আছে। যেমন, আপনি স্যার এর আগে বললেন যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প, কিংবা দেব সাহিত্যকুটিরে যা বেরিয়েছিলো। তো সেটার পরে আপনি ষাটের দশকের দিকে ‘শকুন’ লিখলেন। এভাবে ষাট, সত্তর চললো, তারপর একটা দীর্ঘ সময় ধরে চললো। এখন যেটি বিষয়, সেটি হচ্ছে যে, এটার তো একটা ‘রিভিশন’ থাকা দরকার। অর্থাৎ উনাদেরটা পড়লেন, তারপর আপনি লিখলেন; আপনারটা আমরা পড়ছি, তারপর লিখছি। এই যে একটা ‘রিভিশন’। অর্থাৎ পাঠ ও পাঠসৃজন এবং পাঠসৃজনের ভেতর দিয়ে নতুন পাঠসৃষ্টি কিংবা সৃষ্টিশীল কিছু তৈরি। এই ‘রিভিশন’র ভেতর দিয়ে আজকাল যারা গল্প লিখবে তারা সেটা করবে। তবে যেটা বিষয়, সেটা হচ্ছে যে, আমাদের হাসান আজিজুল হকের গল্প পড়েনি এমন লোকও প্রচুর আছে। একটা হিপোক্রেসিও আমাদের জেনারেশনের মধ্যে আছে। যেটার ধার আপনারা কোনো দিনই ধারেননি। এখন বিষয়টা হলো, এ সময় যারা গল্প লিখছে, সত্তরে-আশিতে-নব্বইয়ে কিংবা এই সময় যারা গল্প লিখছে, তারা কী হাসান আজিজুল হকের গল্প পড়েছেন? গল্প লিখছে তারা! তারা কী লিখছে? আমি মনে করি হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার। এই ‘প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার’ বিষয়টা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। অনেকে বলতে পারে, ‘প্রতিনিধিত্বশীল’- আমি মনে করি না। কিন্তু আমি মনে করি আপনি প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার। এখন যিনি প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার, তাঁর গল্প না পড়ে আমি গল্প লিখবো কিভাবে? কিংবা কোনো রিভিশন তৈরি হতে পারে? আমার তো মনে হয়- পারে না। তো আমাদের জেনারেশনের যে জায়গাটা চলছে অর্থাৎ বাংলাদেশ হওয়ার পরে প্রায় ছেচল্লিশ বছর পার হয়ে গেলো। আর এ সময়ে শওকত ওসমানকে নিয়ে কাজ হয়েছে, সরদার জয়েনউদ্দীনকে নিয়ে হয়েছে, আপনাকে নিয়ে হয়েছে, হচ্ছে- ইলিয়াস, শহীদুল জহির, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি হচ্ছে। এঁদের প্রায় সমসাময়িক আপনি স্যার ষাটে লিখলেন ‘শকুন’। তারপরে ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। এরপর ষাট, বাষট্টি, চৌষট্টি, সত্তর, পঁচাত্তর, ছিয়াত্তর, আটাত্তরে লেখা চলছে; ছিয়ানব্বয়ে- আগুনপাখি ২০০৬-এ সাবিত্রী উপাখ্যান- এখনও লেখা চলছে। পড়ছি আমরা। কিন্তু এখন কি অবস্থা? এখন তো সরদার জয়নউদ্দীনের মতোও কিছুই পাচ্ছি না, আবু ইসহাকও পাচ্ছিনা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তো বাদই দিচ্ছি। এরপর ইলিয়াস খেটেখুটে যা-হোক অনেককিছু করলেন, ১৯৯৭তে তো মারাই গেলেন। তাহলে বিষয়টি হচ্ছে যে, এই লোকগুলোর নাম আমরা তো গুণছি। তাঁরা তো একটা পথরেখা তৈরি করেছেন। কিন্তু এখন আমি এই ২০১৬ সালে দাঁড়িয়ে বলতে পারছি না যে, তারপর জেনারেশন কারা? আমি এখন শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক, সত্যেন সেন, আবু ইসাহাক, জ্যোতিপ্রকাশের নাম বলছি। কিন্তু এরপর কারা? আমি যদি এখন সুশান্ত মজুমদারের কথা বলি, যদি নাসরীন জাহানের কথা বলি; প্রশান্ত মৃধা কিংবা ওয়াসীর, ইমতিয়ারের কথাও বলি- এঁরা কি আসলে ঐ জায়গায় দাঁড়াতে পারলো? এটা কি কংক্রিট একটা কিছু হলো আসলে? এখানে ইতিহাস সৃষ্টির ব্যাপার তো আর নেই। কারণ, বাংলাদেশে সাতচল্লিশ থেকে আরম্ভ করে ষাট-পয়ষট্টি বছর চলে গেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ছেচল্লিশ বছর, তারও আগের চব্বিশ বছর এখানে তো অন্য কোনো ব্যাপার নেই। আর যে মিডিয়া, যোগাযোগ, পেপার, পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়া- যতো রকমের মিডিয়া আছে, সমস্ত মিডিয়া এটা সেটা মিলিয়ে তো ‘মাফিয়া’ হয়ে গেছে। কোনো কিছু আমাদের তো অভাব নেই। সবকিছু আমাদের হাতের কাছে আছে। হিউজ ম্যাটার আছে। তাহলে স্যার নামগুলো তো পাচ্ছি না! শুধু ম্যাটার দিয়ে ভর্তি! এখন যেটা আমাদের আলাপ-আলোচনার জায়গা, সেটা হচ্ছে কী, আমরা তো গল্পকার চাই। আমরা কথক চাই। আমাদের কথার যে ঐতিহ্যিক কারুকার্য, সে কাজটায় যাতে ফ্রডনেস না থাকে, হিপোক্রেসি না থাকে। কারণ, সততা না থাকলে তো শিল্পী হওয়া যায় না। মিথ্যাচার করে কিংবা ‘আমি লেখক’ এই প্রচার করে, নিজের প্রচার নিজে করে, অন্যের দ্বারা প্রচার করে, সমিতি-সংঘের নামে প্রচার করে লেখক হওয়া যায় না। কিন্তু আমরা দেখছি যে, এর সবই এখন চলছে, মানে লেখালেখির বেসিক জায়গাটা নেই। আরেক দিকে আমরা দেখছি যে, সমাজের যে বাস্তবতা, সেখানেও- যে কৈশোর; যে যৌবন হাসান আজিজুল হকের ছিলো, সে কৈশোর যৌবনের জায়গাগুলোয় যারা এখন বড় হচ্ছে তাদের ভেতরে নেই! তাহলে আমরা কি সামনে আরো খারাপ একটা জায়গা দেখতে পাচ্ছি বা দেখতে হবে আমাদের?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। অন্ধকার একটা এসেছে, এটা ঠিকই। কোনো সন্দেহ নেই! আরো তো লেখক ছিলো তাইনা? আমাদের বয়সী লেখক হচ্ছে রাহাত খান, জ্যোতিপ্রকাশ, শওকত আলীও। এঁরা তো এখনো জীবিত, কেউ কেউ মারা গেছে, ইলিয়াসও চলে গেলো। তাহলে কি এটাই বলবো যে, লেখক ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মায় না, হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায় একজন লেখক, বাকিরা লেখক নয়। ঐ এককথাই আবার বলা আরকি- লেখক দল ধরে পাওয়া যায় না, ট্রেনিং দিয়ে পাওয়া যায় না। আগলি ডাকলিন গল্পটা কিন্তু খুব সত্যি, তাই না? সবচাইতে সুন্দর হাঁসের বাচ্চাগুলো জন্মের পরেই, আর কিছু দিন পরে কোথা থেকে একটা হাঁসের বাচ্চা এসে ওদের সঙ্গে যোগ দিলো যেটা সবচাইতে কুৎসিত দেখতে। মানে তার গায়ে কিছু নেই, ধরো রুয়া-টুয়া কিছু নেই, ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেইটাই হচ্ছে আগলি, সবচাইতে আগলি। বড় হতে হতে তারপরে দেখা গেলো ঐ হাঁসগুলো হাঁস হলো। আর ঐটা হলো রাজহাঁস। তখন বোঝা গেলো আগলি ডাকলিন। এই কথাটাই চলে গেলো প্রবাদবাক্যে, আরে ও তো ‘আগলি ডাকলিন’, ও তো আস্তে আস্তে হবে। রাজহাঁসের ছোট বাচ্চাগুলো কুৎসিত হবে দেখতে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথাৎ সাধারণ হাঁসের চাইতে দেখতে খারাপ হবে। তো আমাদের সেই ‘আগলি ডাকলিন’ আমি তাও তো দেখছি না যে দুই একটা একটু একটু করে আস্তে আস্তে রাজহাঁস হবে! মিডিয়াম কিছু জিনিস দেখতে পাচ্ছি। মাঝামাঝি ঐ দুই-একজনের নাম হয়তো করা যায়। আমার পক্ষে নাম করাটা উচিৎ হবে না। কিন্তু তাতে তো সামগ্রিকভাবে একটা সাহিত্যে কিছুতো যোগ হয় না, কিচ্ছু যোগ হয় না। তবে কি এইটেই বলবো, আজকের এই যে, ভয়ঙ্কর মিডিয়ার অত্যাচারে গ্রন্থপ্রকাশ, গ্রন্থপাঠ এবং রচনা সবটাই অ্যাফেক্টেড হয়ে গেছে খানিকটা! লিখলে কি হবে? তারপরে অনলাইনে লেখা দেয়া অনেকের অভ্যাস হয়ে গেছে। গল্পটা লিখেছি, কিন্তু অনলাইনে? আমি বললাম, আমি তো অনলাইন দেখি না। কাজেই গল্পটা পড়তেও পারি না। তাহলে এখন কি করা যাবে? নানানভাবে হচ্ছে। তাহলে এটা কি হতে পারে যে, একেক সময় এটা বদলে যায়?

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close