Home অনুবাদ আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা [পর্ব ২] >> অনূদিত উপন্যাস >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা [পর্ব ২] >> অনূদিত উপন্যাস >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

প্রকাশঃ September 5, 2017

আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা [পর্ব  ২] >> অনূদিত উপন্যাস >>> এমদাদ রহমান অনূদিত
0
0

আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা (আংশিক)

পর্ব – ২

“কিছুক্ষণ নীরব থেকে বুড়ি ফের কথা বলা আরম্ভ করল : ‘তোমরা কি আমার নাম জানো?’ দুই ভাই এবার একসঙ্গে কথা বলে উঠলাম : ‘না, আমরা তোমার নাম জানি না।’ শুনেই বৃদ্ধা বলল : আমার নাম অরণ্যের ডাইনি। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই আমি এই অরণ্যের মালিক। এই পাখিগুলি ছাড়া (মহিলা আঙুল দিয়ে পাখিদের দেখায়) এই গহীন বনে আর কেউ থাকে না। এদেরকে আমি মানুষ থেকে পাখি বানিয়েছি যারা একদা ঠিক তোমাদের মতোই আমার এই অরণ্যে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছিল।”

প্রাচীন পালকওলা বৃদ্ধা নারীর প্রশ্নগুলি শেষ হতেই ভীতসন্ত্রস্ত গলায় তাকে বললাম : ‘তোমার অরণ্যে প্রবেশের জন্য আমরা অত্যন্ত দুঃখিত হে প্রাচীনা নারী। আমি কৃতজ্ঞ থাকব যদি তুমি কিছুক্ষণ আমাদের কথাগুলি মন দিয়ে শোনো, তাহলেই বুঝতে পারবে যে তোমার অরণ্যে প্রবেশের পূর্বে আমরা ঠিক কোন সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম।’ ‘ঠিক আছে পুত্ররা, আমি তোমাদের কথা শুনতে চাই’, কথাগুলি বলতে গিয়ে বৃদ্ধা নারী বারবার উটপাখিটির দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল, উটপাখিটি আমাদের ঘিরে দৌড়চ্ছিল। আমি তখন তার এই দিকচিহ্নহীন অরণ্যে প্রবেশের কথা বলতে শুরু করলাম, আমার ছোটভাই, আলাবি, ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। ‘তাহলে, শোনো আমাদের কাহিনী, আমাদের বাবা-মা এতোই দরিদ্র হয়ে পড়েছেন যে তারা আমাদেরকে অন্যকিছু দিবেন কী, একটু খাবারও দিতে পারছিলেন না। অবস্থা এতোটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল আমাদের জন্য, কোনও উপায়ান্তর না দেখে আমরা দু’ভাই ঠিক করলাম কোনও দূরদেশে চলে যাব আর কাজ করব। এভাবে কাজ করে করে যখন আমরা পয়সা জমাতে পারব তখন বাড়ি ফিরে গিয়ে তাদেরকে সেই পয়সা দিয়ে দেব।’

কথা শুনে মহিলা কিছুটা যেন স্থির হলো শুধু তার মুখখানি ছাড়া। বুড়ির দন্তহীন মুখখানি অবিরাম নড়ছিল যেন সে কিছু খাচ্ছে। বুড়ির একটু স্থির হয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাখিগুলিও তার মাথায়, কাঁধে স্থির হয়ে বসে পড়ল। বসে এমনভাবে আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল যে মনে হচ্ছিল তারাও আমাদের দুর্দশার করুণ কাহিনী শুনছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বুড়ি ফের কথা বলা আরম্ভ করল : ‘তোমরা কি আমার নাম জানো?’ দুই ভাই এবার একসঙ্গে কথা বলে উঠলাম : ‘না, আমরা তোমার নাম জানি না।’ শুনেই বৃদ্ধা বলল : আমার নাম অরণ্যের ডাইনি। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই আমি এই অরণ্যের মালিক। এই পাখিগুলি ছাড়া (মহিলা আঙুল দিয়ে পাখিদের দেখায়) এই গহীন বনে আর কেউ থাকে না। এদেরকে আমি মানুষ থেকে পাখি বানিয়েছি যারা একদা ঠিক তোমাদের মতোই আমার এই অরণ্যে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছিল। হ্যাঁ, আমার নাম ‘অরণ্যের ডাইনি’, মহিলা তার নামটি আবারও আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে তার পাখিগুলি তার চারপাশে গোল হয়ে চক্কর খেতে থাকে, কিছুক্ষণ পর সেই আগের মতো তার মাথায় ও ঘাড়ে স্থির হয়ে বসে পড়ে যেন আমাদেরকে দেখাচ্ছে যে তারা বৃদ্ধাকে কত সম্মান করে। তারা গহীন বনের শব্দহীন নীরবতায় স্থির হয়ে থাকে আর আমাদের কথাবার্তা শুনতে থাকে।

মহিলাটি যখন তার নাম ‘অরণ্যের ডাইনি’ বলল, আর এটাও বলল যে তার এই পাখিগুলি একদিন মানুষ ছিল; শুধু বিনা অনুমতিতে তার অরণ্যে প্রবেশের পূর্বে, তখন প্রচণ্ড ভয়ে মনে হচ্ছিল আমরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যাব। ছোট ভাইটি মুখে কিছু বলতে না পেরে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকে, আমি তার চোখে চোখ রাখতে পাড়ি না, দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে মাটির নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকি; একই ভয় আমাদের দু’ভাইকে গ্রাস করে ফেলেছে। সেই ভয় আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় বুড়ি যখন আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে তার উটপাখিটির বিষয়ে আমরা কিছু জানি কি না, আমরা বলি : ‘না’। আমরা না বলার সে বলতে শুরু করে : উটপাখিটিকে ভাল করে দেখো (আঙুল তুলে সে ওই পাখিটিকে নির্দেশ করে)। আমরা যখন তাকে বললাম যে হ্যাঁ, দেখেছি, তখন সে বলল : উটপাখিটি একদা অত্যন্ত রূপসী এক নারী ছিল কিন্তু সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করে আমার স্বামীকে বিবাহ করেছিল তার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হবার পরপর; তারপর আমি এই নারিকে ক্ষমতাবলে উটপাখি বানিয়ে ফেলি। তারপর তার পিঠে চড়েই আমি চলাফেরা করতে থাকি যেন সে একটা ঘোড়া। সে যখন নারীরূপে ছিল, তখন লোকে তাকে আতা নামে ডাকতো। এই আতা উটপাখিতে রূপান্তরিত হবার পর প্রতি মাসে সে একজোড়া ভয়ংকর ডিম পাড়ে মানবশিশু জন্ম দেবার পরিবর্তে। এই দুটি ডিম অতি ভয়ংকর হয়ে থাকে। তাদেরকে যতোই তা দেয়া হয় ততই তারা বদলে যেতে থাকে, আশপাশের সবকিছুকেই তারা বদলে দিতে থাকে; যারা আমার এই অরণ্যে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে ডিমগুলি তাদেরকে অন্য কিছু বানিয়ে দেয়, আর তারা আমার দেয়া শাস্তি ভোগ করতে থাকে। বিনা অনুমতিতে অরণ্যে প্রবেশকারীদেরকে বিভিন্ন রূপ ধরে শাস্তি ভোগ করতে হয়। তারা নানা রকমের প্রাণিতে পরিণত হয়।

ডাইনি বুড়ি আমাদেরকে যত তার কাহিনী বলছিল আমরা যেন ততোই হতবিহবল হয়ে পড়ছিলাম, এমনকি কথা বলবার শক্তিও হারিয়ে ফেলছিলাম। কী মনে যেন বুড়ি আর তার পাখিগুলির দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটু থেমে আবারও বুড়ি কথা বলতে শুরু করল : তোমরা কি আমার কঠোর আইনকানুন আর নির্দেশগুলি মেনে চলতে পারবে? তার এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যখন বললাম আমরা তার সমস্ত নির্দেশ রক্ষা করে চলতে পারব, তখন মহিলা বলল : ঠিক আছে, যদি তা ঠিক মতো করতে পারো, তাহলে তোমরা দুজন এই বিস্তীর্ণ অরণ্যে প্রচুর পয়সা আর ধনসম্পদের মাঝে থাকতে পারবে। কিন্তু ব্যাপারটা অত্যন্ত সন্দেহজনক, কারণ এ পর্যন্ত যারাই এখানে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছে তাঁদের কেউই আর তাদের নগরে কিংবা গ্রামে ফিরে যেতে পারে নি। আর তোমরা যেভাবে আমার কাছে আমার আইন ও নির্দেশগুলি পালন করবার কথা বললে, ঠিক আছে, তাহলে চলো আমার সঙ্গে। সে ক্ষমতার এমন এক সুরে আমাদেরকে তার সঙ্গে যাবার কথা বলল যে তার উটপাখিটি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল তার এখন কী করা উচিৎ। উটপাখিটি বৃদ্ধা ডাইনির সামনে তার পিঠ পেতে দিতেই সে চড়ে বসল আর তার পাখিগুলি যেমন করে মহিলাকে ঘিরে চক্কর খেতে শুরু করল আর গভীর দুঃখে বুক ফাটিয়ে কাঁদতে শুরু করল ঠিক তেমনি আমরাও তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।

তখনও দুই মাইলও পথ যাইনি, হাঁটতে হাঁটতে আমরা অরণ্যের এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম, যে-জায়গাটি কোলাবাদামের গাছে ভর্তি। মহিলাটি প্রথমে আমাদেরকে কোলাবাদাম গাছগুলির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল, তারপর বলল : আজ থেকে তোমরা এই গাছগুলির পাহারাদার নিযুক্ত হলে। কোলাবাদামগুলি, যা এই গাছগুলিতে ফলেছে, এগুলি তোমাদের জন্য। যদি তোমরা ইচ্ছা করো, তাহলে তোমরা এই বাদামগুলিকে পার্শ্ববর্তী বাজারে বিক্রির জন্য নিতে পারো। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবে। বাদাম বিক্রির পয়সাগুলি খরচ না করে জমিয়ে রাখবে, যাতে তোমরা গ্রামে ফিরে গিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ পয়সা তোমাদের বাবা-মা’কে দিতে পারো। এরকম কিছু কথা বলবার পর বুড়ি আমাদেরকে একটি কুঁড়েঘরের কাছে নিয়ে গেল। কুঁড়েঘরটি কোলাবাদাম গাছগুলির কাছাকাছি। বুড়ি আমাদেরকে এই ঘরটিতে বসবাস করবার জন্য বলল। হঠাৎ চোখে পড়ল, কুঁড়েঘরটির সামনে বেশকিছু অদ্ভুত মূর্তি যেন কেউ মন্ত্রবলে বানিয়ে রেখেছে। মূর্তিগুলি সব এক লাইনে দাঁড় করানো আর ঘরটির দিকে মুখ করা, আর এই মূর্তিগুলির একেবারে বাম পার্শ্বে মাটি খুঁড়ে বানানো হয়েছে গভীর এক গর্ত, সেই গর্ত আবার ঢাকা দেয়া হয়েছে কাঠের ঢাকনা দিয়ে। আমাদেরকে কুঁড়েঘরটি দেখানোর পর মহিলা উটপাখিটির পিঠ থেকে নেমে এল, সঙ্গে সঙ্গে তার পাখিগুলি উড়ে গিয়ে বসে পড়ল সেই মূর্তিগুলির ওপর। তারপর সেও মূর্তিদের দিকে যেতে শুরু করল, পিছু পিছু আমরাও সেদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বুড়ি যখন মূর্তিগুলির একেবারে কাছে চলে গেল, গিয়েই আঙুল তুলে ঢাকনা দেয়া সেই গর্তের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে আমাদেরকে সাবধান করে দিল যাতে আমরা যেন ভুলেও কখনও গর্তটির ঢাকনা না সরাই, কিংবা কখনওই যেন গর্তের ভেতর কী আছে তা দেখবার ইচ্ছা না করি। আর যদি তার এই নির্দেশ অমান্য করি, তার অর্থ হবে- আমরা তার নির্দেশের বাইরে চলে গেছি, আর ঠিক তখনই এর ফলস্বরূপ আমাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। কথাগুলি বলবার পর, আরও একবার সে তার নির্দেশগুলি আমাদেরকে মনে করিয়ে দিল, ইতোমধ্যেই যা সে আমাদেরকে দিয়ে ফেলেছিল আর আমাদেরকে সেগুলি রক্ষা করবার কথা বলে ফেলেছিল, আর আমরাও তাকে তার নির্দেশগুলি সদা মেনে চলব বলে কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু মাটির গভীর গর্তটির ভেতর কী আছে কিংবা কেনই-বা আমরা গর্তের ঢাকনাটি সরাবো না- এ ব্যাপারে একটা শব্দও সে উচ্চারণ করল না।

তারপর সে মূর্তিগুলিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে শুরু করল। ঠিক যেমন করে সে মূর্তিগুলিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল আমরাও তাকে ঠিক তেমনি করে অনুসরণ করতে লাগলাম। এভাবে কিছু সময় কেটে গেলে সে আবারও বলতে শুরু করল- এই মূর্তিগুলির সকলেই একদিন মানুষ ছিল কিন্তু সে তার মন্ত্রবলে তাদেরকে এরকম নিশ্চল মূর্তি বানিয়ে রেখেছে। কারণ- এরা সবাই বিনা অনুমতিতে তার বনে প্রবেশ করেছিল। পুনরায় সে আমাদেরকে তার নির্দেশ পালনের কথা ব্যাখ্যা করে বোঝালো, আর এও বলল যে আমরা দুই ভাইও একদিন এরকম মূর্তিতে রূপান্তরিত হবো যদি কখনও তার আদেশ অমান্য করি। বুড়ি যখন এভাবে কথাগুলি বলছিল আমার তখন আর বুঝতে বাকি থাকলো না যে এই অরণ্যে কেউ যদি একবার ঢুকে পড়ে তাহলে তার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া অসম্ভব; আর তাই, এরকম মূর্তি হয়ে যাবার চাইতে যে করেই হোক এই স্থান ত্যাগ করে অন্য কোথাও কাজের সন্ধান করতে হবে। আমরা এভাবে মূর্তি হয়ে বেঘোরে জীবন দিতে চাই না। হঠাৎ প্রবল বিতৃষ্ণা আর বিরক্তির সঙ্গে মহিলা আমাদেরকে বলল- ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, একবার যখন তার অরণ্যে প্রবেশ করেই ফেলেছি, এখন তার কাছে পরীক্ষা দেওয়া ছাড়া ফিরে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। সে এখান থেকে চলে যাওয়ার পর আমরা যদি বন ছেড়ে পালিয়ে  যাওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে মন্ত্রবলে আমাদেরকেও সে এরকম মূর্তি করে সাড়া জীবনের জন্য রেখে দেবে।

আর এখন, তার কাছ এই ব্যাপারটা যখন শুনলাম, আমাদের মনের ভেতর নতুন ভয়ের জন্ম হলো। আমাদের জানা ছিল না যে আরও কতকিছু করতে সে আমাদেরকে বলবে আর আমরাই বা কীভাবে তাতে সম্মতি দেব! যাই হোক, কথা শেষ করেই অরণ্যের পালকওলা রমণী বা ডাইনি দ্রুত চলে গেল তার উটপাখির কাছে যাকে সে মন্ত্রবলে নারী থেকে উটপাখি বানিয়েছে, সে তার পিঠে চড়ে বসল, তারপর ধীরে ধীরে সেই কুঁড়েঘরটির পেছন দিকের এক সরু পথ ধরে চলে যেতে লাগল, তার পাখিগুলিও গভীর বেদনায় তার দিকে উড়ে যেতে যেতে কাঁদতে শুরু করল, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদেরকে ভয়ে বিস্ময়ে হতবিহবল করে দিয়ে বুড়ি অন্তর্হিত হলো। বুড়ি আর তার পাখিগুলিকে আমরা দেখতে পেলাম না সেই সরু পথের কোথাও। হয়তো পাখিগুলিসহ বুড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল কিংবা মাটির ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিছুই বুঝতে পারলাম না। ব্যাপারটা আমাদের জন্য নতুন ভয় আর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল।

অরণ্যের সেই মহিলা কিংবা পালকওলা ডাইনি বুড়ি সরু পথে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর আমি আবার সেই মূর্তিগুলির কাছে চলে এলাম। আর পরম বিস্ময়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এবার খুব ভাল করে দেখে বুঝতে পারলাম যে তারা ঠিক আমাদের মতোই মানুষ যদিও তাদের শরীর কাদামাটি দিয়ে গড়ানো। মানুষগুলির কাদামাটির শরীরকে স্পর্শ করা মাত্রই বুঝতে পারলাম তাদের ভেতরের রক্তের প্রবাহ আর উষ্ণতা, আর মাঝে মাঝেই মনে হতে লাগল তারা যেন চোখ দিয়ে ঈশারা করছে, আবার কখনও মনে হলো তারা তাদের হাত, পা আর মাথাকে নাড়াতে চাইছে। নিশ্চল মূর্তির এমনধারা ব্যাপার দেখে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার ধারণা হল যে লোকগুলি এইসব মূর্তির ভেতর এখনও জীবিত আছে যদিও তাদের শরীর এখন কাদামাটিতে পরিণত হয়েছে। মূর্তিগুলির চারদিকে ভাল করে নজর দিয়ে দেখলাম ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে পড়া অনেকগুলি চাবুক পড়ে আছে। দেখে আর বুঝতে বাকি রইল না যে অরণ্যের পালকওলা এই বৃদ্ধা এই মাটির মূর্তিগুলিকে খুব নির্দয়ভাবে চাবুকপেটা করে।

মূর্তিগুলির আশপাশ ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে আমি ঘরে চলে গেলাম, আলাবি আর আমি একটাও কথা না বলে ঘরের মাটিতে বসে পড়লাম আড় বাম হাত গালে ডীয়ে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইলাম, জঙ্গল এখন এত নীরব হয়ে আছে যেন এক সমাধিক্ষেত্র। এভাবে কিছুক্ষণ যাবার পর কিছুটা যেন ভয় আর নিদারুণ দুঃখের বোধ আমাদেরকে মুক্তি দিল; তখন আমি বাইরে বেরুলাম। কিছু শুকনো ডালপাতা জোগাড় করে ফের ঘরে এসে ঢুকলাম। চুলায় সেই শুকনো ডালপাতার আগুন জ্বাললাম। অল্প কিছুক্ষণ সেই আগুনের কাছে থাকায় শরীরের হারিয়ে যাওয়া উত্তাপ যেন আবার ফিরে পেলাম। তারপর ঘর ছেড়ে বিস্তৃত অরণ্যের ভেতর বহুদূর চলে গেলাম। অরণ্যের গাছগাছালি থেকে বড় বড় তাজা ফল পাড়লাম, ফলগুলি নিয়ে ফের আসলাম কুঁড়েঘরের সেই আগুনের কাছে। চুলার আগুনে কয়েকটি ফল পুড়িয়ে নিলাম, সঙ্গে সঙ্গেই আগের সেই ভয় যেন ফিরে এল। পোড়া বাদামগুলিকে যখনই খেতে শুরু করলাম, কাদামাটির মূর্তিগুলির দিকে তাকিয়ে আমাদের মনে হলো- তারাও এই পোড়াবাদাম খাওয়ার জন্য কাতর মিনতি করছে।

রাত নেমে এলে গহীন এই অরণ্য ঘন অন্ধকারে ডুবে গেল। আমরা ঘরটির কাছেই এক জায়গায় ডালপাতার ঢিবি বানিয়ে আগুন জ্বাললাম, ঘুমিয়ে পড়বার আগে। কিন্তু রাতের ঘুমের শান্তি যেন খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল, যখন সেই বৃদ্ধা নারী তার ভয়ংকরদর্শন উটপাখিটির পিঠে চড়ে ঠিক কুঁড়েঘরটির সামনে এসে থামল। তখনও ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকা আলাবি জেগে উঠল বুড়ির পাখিগুলির যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে। বুড়ি যখন নিশ্চিত হলো যে আমরা এখনও ঘরটিতেই আছি, তখনই সে চলে গেল মূর্তিগুলির কাছে। উটপাখির পিঠ থেকে নেমেই আনকোরা এক বোঝা চাবুক সে হাতে তুলে নিল, চাবুকের বোঝাটি সে উটপাখিটির পেছনে বেঁধে রেখেছিল। বোঝায় কমপক্ষে একশটি চাবুক তো হবেই। তারপর আমরা কোনমতে উঠে দাঁড়ালাম, কুঁড়েঘরটির খুঁটি ধরে থাকলাম শক্ত করে, ডুবে গেলাম শব্দহীন এক নীরবতায়, আর ভয়ে কুঁকড়ে যেতে যেতে তাকিয়ে রইলাম বুড়ির দিকে। দেখলাম সে একটা চাবুক টান মেরে তুলে নিলো, তারপর চলে গেল মূর্তিগুলির একেবারে ডানদিকে। তারপরই চাবুকের বেদম প্রহার শুরু হলো। মন্ত্রবলে কাদামাটির মূর্তি হয়ে যাওয়া মানুষগুলিকে সে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাবুকপেটা করতে থাকল যতক্ষণ না চাবুকটি ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেল। বুড়ি যতক্ষণ তাদের মারল ততক্ষণ রাগে সে ফোঁসফোঁস করছিল, তার নাক আর মুখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিল; এবং তার গলায় কর্কশ ঘেসঘেস শব্দ হচ্ছিল। সে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ আর অপমান করছিল। যতক্ষণ না প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মূর্তিগুলি কাঁদতে শুরু করল ঠিক ততক্ষণই অরণ্যের ডাইনি তাদেরকে চাবুকপেটা করতে থাকল।

চাবুকগুলো ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে যাওয়ার পর থামল বুড়ি, দ্রুত চড়ে বসল উটপাখিটির পিঠে, আর সঙ্গে সঙ্গে যেন হাওয়াও হয়ে গেল। ভয়ে আমরা একেবারে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। বুড়ি চলে যাওয়ার পর দুই ঘণ্টা পর্যন্ত কাদামাটির মানুষগুলো যন্ত্রণায় গঙ্গাচ্ছিল।

তারপর, সকাল সাতটার দিকে, গতকালের থেকে যাওয়া ফলগুলি খেয়ে শেষ করার পর আমরা আমাদের কাটারিগুলিকে হাতে তুলে নিলাম, চলে গেলাম কাছের তালগাছগুলির কাছে। কাটারির সাহায্যে তালের পাতাওলা বাগু কেটে নামালাম। পাতাদিয়ে বানিয়ে ফেললাম বেশ কয়েকটি ঝুড়ি। ঝুড়িগুলি নিয়ে তারপর চলে গেলাম কোলাবাদাম পাড়তে। দুইহাতে টেনে ছিঁড়ে ছিঁড়ে তালপাতার ঝুড়ি ভরে ফেললাম আমরা, তারপর বয়ে নিয়ে চললাম ঘরের দিকে।

পরদিন সকালে ধরে নিলাম যে ডাইনি বুড়ি কাদামাটির মূর্তিগুলিকে চাবুক মারতে আসবে, কিন্তু সে এলো না। সকাল প্রায় নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আজ কীভাবে এই লোকগুলিকে সে চাবুক মারে সেটা দেখবার আশায়, কিন্তু ন’টাতেও আজ তার পাত্তা নেই। তারপর কোলাবাদামের ঝুড়িগুলিকে আমরা নিকটবর্তী এক বাজারে বয়ে নিয়ে গেলাম ঠিক যেরকম করে বুড়ি আমাদেরকে প্রথমদিন বলেছিল। আর, হ্যাঁ, এরকম গহীন অরণ্য মাঝে এত বড় আর জনাকীর্ণ বাজার আছে দেখে আমরা আশ্চর্যই হয়ে গেলাম। গভীর জঙ্গলে এরকম বড় বাজার থাকতে পারে বলে আমাদের কোনও ধারনাই ছিল না। আর একটা কথা বলে রাখি- জনাকীর্ণ এই বাজারটিতে সওদা করতে আসা লোকদের কথা বলার ভঙ্গি, চলাফেরা সব কেমন জানি সন্দেহজনক ঠেকছিল।

তারপরও আমাদের আনন্দ হলো। বাদামগুলিকে বেশ ভাল দামেই বিক্রি করতে পারলাম। সেই পয়সা থেকে কিছু খরচ করে কিনলাম কোকো-ইয়্যাম আর কিছু বিচিত্র ধরনের খাবার কিনে আবারও কুঁড়েঘরটিতে ফিরে আসলাম। ফিরেই ঘরের এক কোণার দিকে বেশ গভীর করে এক গর্ত খুঁড়ে ফেললাম। গর্তে কোলাবাদাম বিক্রির পয়সাগুলি ফেলে কাঠের ফলক দিয়ে ঢেকে রাখলাম। মাটির এই গর্তটিই এখন আমাদের টাকার সিন্দুক। তারপর থেকেই আমরা বাজার বারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রতি পাঁচ দিন পর সেই কাঙ্ক্ষিত বাজার বার। পালকওলা বুড়ির নির্দেশ মতো ভুলেও কখনও ঢাকনা দেওয়া মাটির সেই গর্তটির ভেতর কী আছে ভুলেও তা দেখতে চাই না। ডাইনি বুড়ি ঢাকনা যাতে না সরাই সে ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিল আর গর্তটিও ছিল কাদামাটির মূর্তিগুলির এক পাশে, আর গর্তটি দেখবার কোনও অনুমতি ছিল না।

এভাবে চার দিন কেটে গেলে সেই বুড়ি আবারও আবির্ভূত হলো। মূর্তিরুপী মানুষগুলিকে নির্দয়ভাবে চাবুকপেটা করল। আজ সে আরেক বোঝা চাবুক নিয়ে এসেছে। বোঝা থেকে একটার পর একটা চাবুক তুলে নিয়ে লোকগুলিকে মারলো যতক্ষণ না বোঝার সবগুলি চাবুক বেদম মারে চিঁড়ে ফালাফালা হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল, সেই প্রথম দিনের নির্দয় অত্যাচারের পর যেরকম হয়েছিল। মূর্তিগুলিকে সে অবিরাম চাবুক মারছিল, আমি তাকিয়ে দেখছিলাম মারতে মারতে সে কেমন নির্দয় হয়ে উঠছে, আর জানি না কী কারণে হঠাৎ আমি এক দৌড়ে তার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম, তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েছিলাম আর কাদামাটির মূর্তিগুলিকে আর চাবুক না মারার জন্য অনুনয় করছিলাম। সে আমার কথা শুনে ক্রোধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল আর আমার চোখে চোখ রেখে বলে উঠল- তোমরাও পালিয়ে যাবে ভেবো না। কয়েকদিনের মধ্যে তোমরাও এরকম মূর্তি হয়ে যাবে। আমাকে এরকম কথা বলার পর, ভয়ে দ্রুত তার কাছ থেকে সরে আসলাম, এক দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লাম। মূর্তিগুলিকে অত্যাচার আর কুৎসিত গালিগালাজ শেষ হলে বুড়ির মন যখন তৃপ্তিতে ভরে উঠল, তখন সে তার উটপাখিটির পিঠে চড়ে বসল, তারপর তার পাখিগুলিকে সঙ্গে নিয়ে চলে যেতে লাগল। পাখিগুলি এখন মর্মভেদী চিৎকার করছিল তাকে অনুসরণ করতে করতে।

দুই বছরের বনবাস আর প্রচুর পয়সা জমানোর পর আমরা সানন্দচিত্তে গ্রামে ফিরে যেতে মনস্থ করেছি, কিন্তু করলে কী হবে? দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের ছোটবোন, আশাবি, যাকে আমরা গ্রামে বাবা-মা’র কাছে রেখে এসেছিলাম, সে ঠিক সেই সময়ে গ্রাম ত্যাগ করল। আশাবি আমাদের সন্ধানে বের হয়ে পড়ল যখন বাবা ও মা আমাদেরকে ফিরে পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠলেন। তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে আমরা বন্য পশুর শিকারে পরিণত হয়েছি না কি গহীন বনে হারিয়ে গেছি। আশাবিকে তারা বললেন যেখানেই আমাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে, আমাদের সঙ্গে টাকাপয়সা থাকুন বা না থাকুক, সে যেন অবশ্যই আমাদেরকে তাদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

গহীন বনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘপথ পার হবার পর একদিন সকালে আমাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়ে গেল, বাজারে আম্রেয়া তখন কোলাবাদাম বিক্রি করছিলাম। প্রথমে তো আমরা তাকে চিনতেই পারিনি, কিন্তু সে যখন আমাদেরকে নমস্কার করলো তখন আমরা চিন্তাও করতে পারছিলাম না যে লোকচক্ষুর অন্তরালে এরকম এক গহীন আর বিপদসংকুল জায়গায় সে চলে আসতে পারে। সে যখন আমাদেরকে তার এখানে আসার কারণটি বলল, ব্যাপারটা তখনই বুঝতে পারলাম; তারপর তাকে দেখতে পাওয়ার আনন্দে সম্ভাষণ জানালাম। তারপর আর বেশিক্ষণ আমরা বাজারে থাকলাম না যা আমরা বরাবর করে আসছিলাম গত দুইটি বছর ধরে। সেদিনের মতো বিক্রিবাট্টা বন্ধ করে, আশাবিকে সঙ্গে করে আবার অরণ্যে সেই কুঁড়েঘরে ফিরে আসলাম।

আজ, এটুকুই। আমার লোকেরা শোনো, কাল রাতে আমি আবারও আমার প্রথম অভিযাত্রার কথা বলব। আজ তোমাদের মঙ্গল কামনা করে বিদায় বলছি।

কথা শেষ হলে আমার লোকেরা পিপার তাড়িটুকু শেষ করল, তারপর তারা গান গাইলো, নৃত্য করল তারা কিছুক্ষণ, আর তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে গেল।

প্রথম রাতের আসরে তারা তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলি আনতে ভুলে গিয়েছিল!

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বগুলি পড়ুন নিচের লিংকে

পর্ব ১

আমোস তুতুওলা > অরণ্যের পালকঅলা রমণীর উপকথা >> ধারাবাহিক উপন্যাস >>> অনুবাদ : এমদাদ রহমান

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close