Home অনুবাদ আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা [পর্ব ৩] >> অনূদিত উপন্যাস >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা [পর্ব ৩] >> অনূদিত উপন্যাস >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

প্রকাশঃ September 14, 2017

আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা [পর্ব ৩] >> অনূদিত উপন্যাস >>> এমদাদ রহমান অনূদিত
0
0

আমোস তুতুওলা> অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা (আংশিক)

পর্ব – ৩

ঘরে গিয়েই সে আশাবিকে দেখতে পেল যে ঘরের কোণায় বসে করুণ সুরে বিলাপ করছিল। তাকে দেখেই নিদয়া বুড়ি কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল : ‘তোর ভাইদের দেখছি না কেন? কোথায়, তারা কোথায়? তারা কি আমার ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে?’ বুড়ির বাজখাই গলার কথা শুনে আশাবির, যার চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছিল, আঙুল তুলে আমাদেরকে দেখায়, আর বলে : ওই যে দেখ, বুড়ি মা, ওই, গতরাতে আমার ভাইদুটি কাদামাটির মূর্তি হয়ে গেছে।

গল্পকথা’র দ্বিতীয় রাত

কাদামাটির মূর্তি হলাম 

গ্রামের লোকেরা আমার বাড়ির সামনে এসে জড়ো হলে তাদেরকে পিপা ভরে তাড়ি পরিবেশন করলাম। মদের নেশায় তারা মজে গেল। বিভোর হয়ে নাচে আর গানে কিছুক্ষণ মগ্ন হয়ে রইল, তারপর আমি আবারও আমার প্রথম অভিযাত্রার কাহিনিটা বলতে শুরু করলাম-

আমরা বনের সেই ঘরটিতে দ্রুত পৌঁছে গেলাম। মাথা থেকে তালপাতার ঝুড়িগুলিকে নামালাম, তারপর কোলা-বাদাম বিক্রির পয়সাগুলি মাটির সেই গর্তটিতে ফেলে দিলাম। তারপর শুরু করলাম রান্না। আশাবিকে নিয়ে আমরা যখন খেতে বসলাম, সে তখন আমাদেরকে বাবা-মা আর গ্রামের খবর বলতে লাগলো। সে বলল বাবা-মা এখনও সেই আগের মতোই চরম দরিদ্রই রয়ে গেছে। কথা শুনে আশাবিকে আমরা আশ্বস্ত করলাম যে খুব শিগগির তাদের এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। আমরা যখন ফিরে যাব, অনেক পয়সা সঙ্গে করে নিয়ে যাব, আর বেশিদিন তাদের এই অবস্থায় থাকতে হবে না। আমরা অনেক পয়সা জমা করেছি শুনে আশাবি খুশি হল।

খাওয়া দাওয়া শেষ হলে আশাবিকে আমরা সেই ঢাকনা দেওয়া মাটির গর্তটি দেখালাম। তাকে বার বার সাবধান করে দিলাম যাতে সে কখনোই গর্তের ঢাকনাটি সরাবার চেষ্টা না করে। কিংবা কখনো যেন গর্তে কী লুকানো আছে সেটা দেখার চেষ্টা না করে। তাকে আমরা বার বার বুঝিয়ে বলতে লাগলাম অরণ্যের ডাইনির সেই সাবধানবাণীর কথা- আমাদের প্রতি কঠোর নির্দেশ আছে ঢাকনা না সরাবার। গর্তের ব্যাপারে সাবধান করে দেবার পর আমরা তাকে মূর্তিগুলি দেখালাম। তার প্রথমেই মনে হল, এগুলি মূর্তি নয়, সত্যিকার মানুষ। সে যখন মূর্তিগুলিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল, মনে হল তারা যেন অভিমান করে স্থির হয়ে আছে। আমাদের ফিরে যাবার আর মাত্র ছ’দিন বাকি ছিল। মাটির গর্তের সমস্ত পয়সা আর বেশ কিছু মূল্যবান পোশাক নিয়ে এবার আমরা গ্রামে ফিরে যাব। পোশাকগুলি আমরা সেই বাজার থেকে কিনেছিলাম।

এক সকালে সেই বাজারে গেলাম কোলা-বাদাম বিক্রি করতে। রান্নাবান্না করার জন্য আশাবিকে রেখে গেলাম ঘরে। আমরা যাওয়ার পরপরই ডাইনি বুড়ি তার কিম্ভূত উটপাখিতে চড়ে আবির্ভূত হলো। তারপর, আগের দিনের মতোই মূর্তিগুলিকে চাবুকপেটা করতে লাগল। মূর্তিগুলিকে নির্মম নির্যাতন করার দৃশ্য আশাবি জীবনে প্রথম দেখল। এতে সে এতোই ভীত হয়ে পড়ল যে ঘর ছেড়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বাজারে আমাদের কাছে চলে এল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে সেই নিষ্ঠুর নির্যাতনের বর্ণনা দিল। আমরাও আর সময় নষ্ট করলাম না। দ্রুত ঘরের দিকে ফিরতে লাগলাম আশাবিকে সঙ্গে নিয়ে। এসে দেখি ততক্ষণে বৃদ্ধ মহিলাটিও চলে গেছে। যা-ই হোক, আমরা খাবার রান্না করলাম, তারপর তিনজনে মিলে খেলাম। খাওয়া শেষ করে ধীর পায়ে সেই মূর্তিগুলির কাছে দেখতে গেলাম যে আজ বুড়ি তাদের কতটা যাতনা দিয়েছে।

আমি, আলাবি আর আশাবি তো মূর্তিগুলিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম, দেখতে দেখতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, তিনি যেন তাদেরকে আবার আগের রূপ ফিরিয়ে দেন। তখনও বুঝতেও পারিনি, আশাবি এখান থেকে চলে গেছে। গিয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ঢাকনা দেওয়া গর্তটির কাছে। হঠাৎ আমরা তার চিৎকার করে বলা কথাগুলি শুনলাম : ‘গর্তে কী এমন ব্যাপার লুকোনো আছে যে লোকের তা দেখতে মানা, হুম?’ বলেই কোনো রকম দ্বিধা না করে সে গর্তের ঢাকনাটিকে একপাশে সরিয়ে ফেলল। সে দেখতে পেল গর্তের ভেতর একজোড়া উটপাখির ডিম। ডিম দুটিকে দেখেই সে তাদের বের করে আনলো। যখনই আমরা তাকে এসব করতে দেখলাম, সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম : ‘হায় হায়, ডিমগুলিকে গর্তে ফেলে দাও। জলদি। ফেলে দাও।’ আমি আর আলাবি মুহূর্তের মধ্যে মূর্তিতে পরিণত হলাম। আমরা অন্য মূর্তিদের একেবারে বাম পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নিশ্চল হয়ে গেলাম।

আশাবি প্রথমে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে আমরা আর আগের মতো নেই। আগের মূর্তিগুলির পাশে আমরাও মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে গেছি। সে কোথাও আমাদেরকে না পেয়ে দৌড়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল, সেখানে শুধু নিঃসঙ্গতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেল না। হতবিহ্বল হয়ে পড়ল আশাবি। এতটাই অস্থির হয়ে পড়ল যেন সে পাগল হয়ে গেছে। এক দৌড়ে সে আমাদের কাছে চলে আসল, আমাদের কাদামাটির শরীর ধরে ঝাঁকানি দিলো তার সমস্ত শক্তি দিয়ে, তারপর গলা ফাটিয়ে আমাদের নাম ধরে ডাকলো যাতে তার ডাক শুনে আমরা আবারও আগের রূপে ফিরে আসি। কিন্তু হায়, শত চেষ্টাতেও আমরা সেই মাটিরই মূর্তি থেকে গেলাম! সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল আর কাঁদতে শুরু করল অঝোর ধারায়। কাঁদতে কাঁদতে সে তার নিজেকে দায়ি করল, বলল- যদি সে আগে থেকে জানত তাহলে কখনওই গর্তের ঢাকনা সরাতো না, ডিমগুলিকেও বের করে আনতো না।

মুহূর্তের মধ্যে যেন রাতের অন্ধকার ঘন হয়ে নেমে এল। এই জঙ্গল আর আমাদের কুঁড়েঘরটি ডুবে গেল ঘন অন্ধকারে। আর এই অন্ধকারে আশাবি আজ একদম একা! তার আর কেউ রইল না। এটা তার গভীর দুঃখের কারণ হলো। আমাদের কাছে দাঁড়িয়ে তিক্ততা আর কয়েক ঘণ্টার কান্না শেষে একসময় সে ঘরে চলে গেল। কিন্তু ঘরে গিয়েও সে তার কান্না আটকাতে পারল না।

কিন্তু এই ব্যাপারটি আমাদের কাছে চরম বিস্ময়ের। মানুষ থেকে আমরা যখন কাদামাটির মূর্তিতে পরিণত হলাম, তখনও কেউ স্পর্শ করলে সেটা অনুভব করতে পারছিলাম। কেউ কিছু বললে শুনতেও পাচ্ছিলাম। সমস্যা হলো তখন, যখন আমরা কিছু বলতে গেলাম, আমাদের কথা কেউ শুনতে পেলো না। আমরা শ্বাস নিলাম, শ্বাস ছাড়লাম কিন্তু কেউ আমাদের বুকের ওঠানামা দেখতে পেলো না। অথচ আমরা সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম সেই আগের মতো যখন আমরা মূর্তি হয়ে যাইনি।

পরবর্তী সকালটি ছিল ভয়ানক যন্ত্রণার যখন ডাইনি বুড়ি তার হতচ্ছাড়া উটপাখিটিকে নিয়ে আমাদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। মাটিতে নেমেই সে একবোঝা চাবুক এনে রাখল আমাদের (মূর্তিগুলির) সামনে। তারপর তার পাখিগুলি যখন তার মাথা ও ঘাড়ে শান্ত হয়ে বসল, বুড়ি তখন ঢুকল গিয়ে ঘরের ভেতর। ঘরে গিয়েই সে আশাবিকে দেখতে পেল। আশাবি ঘরের কোণায় বসে করুণ সুরে বিলাপ করছিল। তাকে দেখেই নিদয়া বুড়ি কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল : ‘তোর ভাইদের দেখছি না কেন? কোথায়, তারা কোথায়? তারা কি আমার ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে?’ বুড়ির বাজখাই গলার কথা শুনে আশাবির, যার চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছিল, আঙুল তুলে আমাদেরকে দেখাল, আর বললো : ওই যে দেখ, বুড়ি মা, ওই, গতরাতে আমার ভাই দুটি কাদামাটির মূর্তি হয়ে গেছে। অরণ্যের ডাইনি তার ভীতি-জাগানিয়া চোখে আমাদেরকে দেখল, দেখেই মায়াহীন নির্দয় কণ্ঠে বলল : ‘আহা-হা-এইতো, বেশ, বেশ হয়েছে; আমি ভাগ্যবতী এই কারণে যে আজ আমার দুটি মূর্তি বেড়ে গেল। বেশ বেশ। আমি তো জানতামই যে তারা কথা রাখতে পারবে না।’ হা হা অট্টহাসি আর আনন্দের সঙ্গে কথাগুলি বলল বনের এই প্রাচীন রমণীটি। আর আশাবি ভাবল যে এবার হয়তো বুড়ি তার ভাইদের আগের রূপ ফিরিয়ে দেবে। বুড়ি তাকে (আশাবিকে) ঘরের মধ্যে রেখেই আমাদের কাছে চলে আসে তার ঝুঁকেপড়া শরীর নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে, আর চাবুকের বোঝাটাকেও সে আমাদের কাছে নিয়ে আসে।

বোঝা থেকে একটি চাবুক তুলে নিয়ে বুড়ি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর বলল : হ্যাঁ, আমি জানতাম, আমি খুব ভাল করেই জানতাম একদিন না একদিন এমন সময় আসবে তোমরা যেদিন আমার ফাঁদে পা দেবে। আর দেখো, আজ সত্যিই তা ঘটে গেছে। আজ তোমরা আমার ফাঁদে সত্যিই আটকা পড়েছ। কথা শেষ হতে না হতেই নিদয়া ডাইনি আমাদেরকে চাবুক দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করা শুরু করল। একটি চাবুক ছিঁড়ে ফালাফালা হবার সঙ্গে সঙ্গে সে আরেকটি চাবুক তুলে নিল, আর অবিরাম চলতে থাকল চাবুকপেটা। এভাবে চলতে চলতে একসময় বোঝার সবগুলি চাবুক ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।

বুড়ির এমনধারা চাবুকপেটার দৃশ্য দেখবার পর আশাবি তার কাছে দৌড়ে চলে আসে, এসেই তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে অশ্রুসজল চোখে কাতর মিনতি জানায় যেন বুড়ি আমাদের আবার আগের রূপটা ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু নিদয়া ডাইনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল : ‘কখনওই না। আমার অরণ্যে কোনও ক্ষমা নেই। আমি আমার জীবনে কোনও আইন অমান্যকারীকে ক্ষমা করিনি। ক্ষমা এমন একটা জিনিস আমি যাকে ঘেন্না করি। আর তুই, এদের পক্ষে ওকালতি করছিস! তুইও শুনে রাখ, তুই খুব শিগগির উটপাখিতে পরিণত হবি, আমি তখন তোর পিঠে চড়বো, কেননা (সে আঙুল তুলে উটপাখিটিকে দেখায়) সে বুড়া হয়ে গেছে আর তাই খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

আশাবিকে সবকিছু ঠিকমতো বুঝিয়ে বলবার পর বুড়ি ফিরে চলল তার উটপাখিতে চড়ে। যেতে যেতে আজ সে গলা ছেড়ে গান গাইতে লাগল, আর সেই সরু পথটি ধরে- যে-পথ ধীরে ধীরে গভীর অরণ্যের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছে- যেতে যেতে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার পাখিরাও তাকে অনুসরণ করল। আমাদেরকে যখন সে চাবুকপেটা করছিল, তীব্র যন্ত্রণায় আমরা কাঁদছিলাম, দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইছিলাম কিন্তু একটুও নড়তে পারছিলাম না। সেই সরু পথে বুড়ি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলে আশাবি ফিরে এলো। গভীর দুঃখে গভীর নিরাশায় সে ভেঙে পড়েছে, আর একটু পরপর আমাদেরকে দেখছে, হয়তো এক্ষুনি আমরা আমাদের আগের রূপ ফিরে পাব। কিন্তু তার সকল আশা নিষ্ফল হলো।

আমাদের মূর্তিতে পরিণত হয়ে যাওয়া আর পালকওলা ডাইনির দ্বারা প্রতিদিন সকালে আমাদের চাবুকপেটা করার দৃশ্য দেখতে দেখতে গভীর দুঃখে আর উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় আশাবি এতটাই কাহিল হয়ে পড়ল যে তার শরীরের সবগুলি হাড় বের হয়ে পড়ল। গভীর বনে সে ছিল একা। ঘরের এক কোণে ঝিম মেরে পড়ে থাকা ছাড়া তার করার আর কিছুই ছিল না। তবে ডাইনি বুড়ি তাকে যেমন বলেছিল- অচিরেই সে একটি উটপাখিতে পরিণত হবে, আবার যেদিন বুড়ি আমাদেরকে চাবুকপেটা করতে আসবে। আর সেই ভয়ে আশাবি একদিন আমাদেরকে ফেলে গ্রামে পালিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু কোনো এক অমোঘ কারণে হয়ত-বা পালিয়ে যাওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এল। ঘরের এক কোণে বসে তখন সে খালি কাঁদে আর আমাদেরকে দেখতে থাকে। আমাদেরকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারল না।

একদিন রাতে হলো কী, রাত ন’টার মতো বেজেছে, এক থুত্থুরে বৃদ্ধ ঘরটিতে প্রবেশ করল, ভয়ে আশাবি কোণায় জড়সড় হয়ে পড়ে থাকল। বয়সের কারণে বৃদ্ধের শরীর একেবারে বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। বেশ লম্বা আর বড়সড় একটা লাঠিতে ভর দিয়ে কোনো মতে হাঁটছিল লোকটি। তার হাতের লাঠিটি এত পালিশ করা ছিল যে আঁধারেও সেটা চকচক করছিল। ঘরে ঢুকে সে হামাগুড়ি দিয়ে একটা টুলে বসে পড়ল। টুলটি ঘরের চুলার পাশে রাখা ছিল। বুড়ো তার হাঁটাচলার লাঠিটিকে মেঝেয় শুইয়ে রাখল, তাতে লম্বা লাঠিটির অগ্রভাগ একেবারে চুলার কাছে পৌঁছে গেল। ভয়ে জড়সড় হয়ে কান্না থামিয়ে আশাবি দেখতে লাগল কীভাবে বুড়ো লোকটি হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে চুলার কাছে চলে যাচ্ছে, আর চুলার পাশের টুলটিতে ভাল করে বসবার পর সে চুলায় ফেলতে লাগল শুকনো ডালগুলি, ফেলল কাঠের টুকরো। তারপর সে তার মাথার আদিবাসী টুপিটি খুলে তার ভেতর থেকে বের করে আনলো দুটি মাঝারি আকারের পাথর, তারপর আবার টুপিটি মাথায় পরে নিল। দুই হাতে দুটি পাথর নিয়ে লোকটি ঠকাঠক ঠুকতে শুরু করল যতক্ষণ না পাথর থেকে বের হওয়া স্ফুলিঙ্গ চুলার ডালগুলোয় আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে। ঠকাঠক ঘর্ষণে পাথরের স্ফুলিঙ্গ থেকে একসময় দাউদাউ আগুন জ্বলল। বুড়োর কারসাজিতে কয়েক মিনিটের মধ্যে শুকনো ডালে আর টুকরোতে আগুনের শিখা লকলক করে উঠল আর তাতে ঘরের প্রতিটি কোণ ঝলমল করতে লাগল।

সেই আগুনে বুড়ো তার শরীর গরম করতে শুরু করল। আমি সবকিছুই দেখছিলাম। এ পর্যন্ত বুড়ো যা যা করল, সব। যদিও আমি এখন কাদামাটির মূর্তি!

আগুনের উজ্জ্বলতায় আমরা বুড়োকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তার একটা মাত্র পা, আর বুঝতে পারলাম যে সে তার পা-টিকে বেশ কয়েক বছর আগেই হারিয়েছে। আগুনের পাশে বসে নাক দিয়ে সে এমন কান্নার মতো শব্দ করছিল যে আমাদের বুঝতে বাকি রইল না- উষ্ণতার আরামে সে নাক ডাকছে, ক্রমাগত। বুড়ো এসব করছিল কাঠের যে খুঁটিটিতে হেলান দিয়ে বসে, হঠাৎ সেই খুঁটিটি ভেঙে পড়ল। তাল সামলাতে না পেরে সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল চুলার ওপর। বুড়ো যেভাবে নিজেকে চুলার আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছিল, সেই দৃশ্যটি ছিল বেশ মজার। তারপর হলো কী, বুড়োর মাথার ওপর হঠাৎ খড়ের চালের ঝুলকালিসহ একটা টুকরো খসে পড়ল আর অপ্রত্যাশিতভাবে চুলার আগুনও দ্বিগুণ শক্তিতে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বুড়োও উঠে দাঁড়াল, সে ভুলেই গেল যে তার একটা মাত্র পা, আর তার মাথায় জ্বলছে আগুন। সেই আগুনের তাপের যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে লাঠিটির কথাও ভুলে গেল। বাঁচবার জন্য শুরু করল চিৎকার, আর একসময় ছটফট করতে করতে আশাবি যেখানে জড়সড় হয়ে বসেছিল সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ভয়ে দিশেহারা হয়ে আশাবি তখন ঘরের অন্য কোণায় চলে গেল, সঙ্গে সঙ্গে বুড়োও সেখানে গিয়ে ধপাস করে পরে গেল। আশাবি তার ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

বৃদ্ধ লোকটি যখন এসব কাণ্ড করছিল, তখন আমরা বুঝতেও পারছিলাম না যে ঠিক কখন আমরা হা-হা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছি। কিন্তু আমাদের সেই হাসি কেউ শুনতে পেল না। তবে এই কাণ্ডকীর্তিতে আমরা যেন আমাদের সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে গেলাম, আর আশাবি, যে বুড়োর কাছ থেকে এতক্ষণ নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেও বুঝতে পারল না ঠিক কখন সেও খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছে, ঠিক আমাদের মতো; যেন সেও আমাদের মতো তার জীবনের চরম দুর্দশাকে বেমালুম বিস্মৃত হয়েছে। আর এই মধ্যরাতে আমরা এমন এক বিনোদনের দর্শক হলাম, যা দিলেন দুঃখের পিতা। আশাবি যে নিদারুণ একাকীত্বের যন্ত্রণায় হাড়ে-চামড়ায় পরিণত হয়েছিল, আজ সেও যেন তার হারানো শক্তি ফিরে পেল, হেসে উঠল চরম হাস্যকর ব্যাপারগুলি দেখে, যা এতক্ষণ ধরে বৃদ্ধ লোকটি এখানে করল; আর আমরাও, কাদামাটির মূর্তিরা ভুলে গেলাম ডাইনি বুড়ির সকালের নির্যাতনের কথা।

আশাবি নিজেকে কোনামতে বৃদ্ধের শরীরের তল থেকে টেনে বের হয়ে এসে তাকে দাঁড়াতে সাহায্য করল। তাকে আবার নিয়ে গেল চুলার কাছে। বসবার জন্য আরেকটি টুল দিয়ে চুলার আগুনটাকে একটু উসকে দিল। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় লোকটা এতটাই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছিল যে ফের আগুনের উষ্ণতা ছাড়া সে যেন আর স্থির থাকতে পারছিল না। স্থির হওয়াটাও যে তার জন্যে জরুরি এখন। কারণ আশাবিকে তার ধন্যবাদ জানাতেই হবে। আশাবি যে তাকে অনেক সাহায্য করেছে।

কিন্তু আশাবির একটানা উথলে ওঠা কান্না ভয়ে-বিস্ময়ে এতটাই হতবাক করে দিল যে তার পক্ষে ধন্যবাদ দেওয়াটাও অসম্ভব হয়ে পড়লো। ব্যাপারটি আসলে কী বুঝতে না পেরে বৃদ্ধ লোকটি তার গলা একেবারে খাদে নামিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল : ‘তুমি কিসের জন্য এমন করে কাঁদছ, মা?’ উত্তরে আশাবি বলল : ‘আমি কাদছি দুই ভাইয়ের জন্য (সে আঙুল তুলে আমাদেরকে দেখায়), আমি তাদেরকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে সব রকমের চেষ্টাই করেছি কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়েছে।কিন্তু তাদেরকে ছাড়া আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে পারব না।

ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলবার পর বৃদ্ধ লোকটি আশাবির প্রতি তার স্নেহের প্রকাশ হিসেবে মাথা ঝাঁকাল, ঝাঁকিয়ে তাকে বোঝাল যে- কাদামাটির মূর্তিতে পরিণত হওয়ার আগেই তুমি তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছ বলে তোমার ভাইয়েরা ভাগ্যবান। তুমি না এলে তারা আজীবন এরকম মূর্তি হয়েই থেকে যেত। তবে, হ্যাঁ, তুমি তোমার ভাইদের রক্ষা করতে পারবে, যদি খুব ধৈর্য ধরে সমস্ত যন্ত্রণাকে সহ্য করতে পারো। তোমাকে আগামী দুটি বছর একটানা কথা না বলে বোবার অভিনয় করে যেতে হবে। কিন্তু দেখো, ভুলেও যদি একটিমাত্র শব্দ বলে ফেলো, কিংবা মুখ দিয়ে ‘আঃ’ শব্দটিও বের হয়ে যায় এই দুই বছরের মধ্যে কিংবা সময় শেষ হবার আগে, তাহলে মনে রেখো, দুই ভাই তোমার আজীবনের জন্য মূর্তি হয়ে থাকবে, মনুষ্য রূপে ফিরতে পারবে না। দুই বছরের জন্য বোবার অভিনয় করাটাই তোমার ভাইদের পূর্বরূপ ফিরে পাওয়ার একমাত্র উপায়। ভেবে দেখো, যদি অন্য মূর্তিদের তোমার মতো বোন থাকতো, কিংবা তোমার ভাইদের মতো কেউ থাকতো, যারা দুটি বছর একদম বোবার অভিনয় করতে পারবে, তাহলে তারাও আজীবন এরকম নিশ্চল মূর্তি হয়ে থাকতো না। আর একটি ব্যাপার বলে রাখি- আমি যতদূর দেখতে পাচ্ছি, ভোর হওয়ার আগেই এখানে একজন সুদর্শন লোক আসবে। সে এসেই তোমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করবে। দয়া করে তুমি তার কোনো কথারই উত্তর দিও না, শুধু বোবার অভিনয়টা করে যেও। তোমার ওপর পরে যাওয়ার পর আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি চলে যাচ্ছি- বলেই বৃদ্ধ লোকটি তার চকচকে লাঠিটিতে ভর করে উঠে দাঁড়াল আর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল বাইরের অন্ধকারে। কিন্তু তখনও আশাবি লোকটির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল।

যদিও আমরা কাদামাটির মূর্তিতে পরিণত হয়েছি, তবু, বৃদ্ধ লোকটি আমাদেরকে প্রকৃত রূপে ফিরিয়ে আনতে আশাবিকে কী কী করতে বলল, সেই কথাগুলি আমরা শুনতে পেলাম। কিন্তু আমরা যাতে এক্ষুনি আগের রূপে ফিরতে পারি কিংবা দীর্ঘ সময় যাতে অপেক্ষা করতে না হয়, এরকম একটা কথা লোকটিকে  বলতে চাইলাম, কিন্তু সে আমাদের কথা শুনতেই পেল না।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close