Home অনুবাদ আমোস তুতুওলা > অরণ্যের পালকঅলা রমণীর উপকথা >> ধারাবাহিক উপন্যাস >>> অনুবাদ : এমদাদ রহমান

আমোস তুতুওলা > অরণ্যের পালকঅলা রমণীর উপকথা >> ধারাবাহিক উপন্যাস >>> অনুবাদ : এমদাদ রহমান

প্রকাশঃ August 25, 2017

আমোস তুতুওলা > অরণ্যের পালকঅলা রমণীর উপকথা >> ধারাবাহিক উপন্যাস >>> অনুবাদ : এমদাদ রহমান
0
0

আমোস তুতুওলা > অরণ্যের পালকঅলা রমণীর উপকথা

[পর্ব ১]

ভূমিকা

Tutuola’s voice is like the beginning of man on earth- সমালোচকরা কেন তুতুওলা সম্পর্কে এই কথাটি বিশ্বাস করেন? কী আছে তার লেখায়? আর এই কৌতূহল থেকেই আমি যখন বাংলা অনুবাদে তার সাড়া জাগানো উপন্যাস তাড়িখোর (জি এইচ হাবীব অনূদিত) পড়লাম, ঠিক তখনই আমি এই কথাটির মর্মার্থ উপলব্ধি করেছি। সমস্ত নাইজেরিয়া যেন তার জলমাটি, হাওয়া আর আগুন নিয়ে উপন্যাসে উঠে এসেছে আর নতুন এক পৃথিবীর জন্ম হচ্ছে। ‘অরণ্যের পালকওলা নারীর উপকথা’ উপন্যাসটিও তাই। নাইজেরিয়ার ঐতিহ্যবাহি গল্প-বলার ভঙ্গির সঙ্গে মিথের মিশ্রণে এক আধুনিক জীবনের উপলব্ধি ও তার অনুসন্ধান যেন উপন্যাসের আদলে তুতুওলা নির্মাণ করলেন।

আমোস তুতুওলার জন্ম, চিনুয়া আচেবের জন্মের ১০ বছর আগে, ১৯২০ সালে, নাইজেরিয়ায়। তার পিতা ছিলেন একজন কোকো উৎপাদনকারী কৃষক। কামার হিসেবে কাজ করার আগে তিনি বিভিন্ন শিক্ষালয়ে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। তারপর চলে যান সরকারের শ্রম দপ্তরের কাজে। তাড়িখোর (‘দ্য পাম-ওয়াইন ড্রিংকার্ড’) প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে, বাঙালির ভাষা আন্দোলনের বছরে, আচেবের থিংস ফল অ্যাপার্ট প্রকাশের ৬ বছর আগে। তাড়িখোর তাকে ব্যাপক আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়। বিশ্বের বহু ভাষায় এই নাইজেরীয় উপকথাটি অনূদিত হয়। চিনুয়া আচেবের মৃত্যুর ১৬ বছর আগে, ১৯৯৭ সালে, জীবনাবসান হয় আমোস তুতুওলার।

তাড়িখোর উপন্যাসটি তো আধুনিক আফ্রিকীও সাহিত্যের এক ক্লাসিকে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব কিছু পড়েছে চিনুয়া আচেবে এবং ওলে সোয়িঙ্কার সাহিত্যের ওপর। উপন্যাসটিতে তুতুওলা এমন অনেক কাহিনি বর্ণনা করেছেন কিংবা তুতুওলা কর্তৃক পুনঃকথিত হয়েছে যে কাহিনিগুলি তিনি প্রথম শোনেন ইয়োরোবা-ভাষী পশ্চিম নাইজেরিয়ার আবিওকুতায়, যেখানে তিনি জন্ম নিয়েছেন, আর তিনি এমন এক লেখক বিশ্বজুড়ে যিনি পরিচিতি লাভ করেছেন ইয়োরোবা লোককাহিনিগুলির ওপর ভিত্তি করে রচিত সাহিত্যের জন্য।

‘অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা’ উপন্যাসে ইয়োরোবা-ভাষী গ্রামের লোকেরা পরপর দশ রাত তাদের প্রধানের জীবনের আশ্চর্য অভিযাত্রার গল্প ও প্রজ্ঞার কথা শুনতে জড়ো হয়। উপন্যাসটিতে গ্রামের লোকেরা গ্রামপ্রধানের অতীত জীবন, অরণ্যের ডাইনি, ডাইনির বিকট উটপাখির আক্রমণ, জল-মানবের শহরে গমন, হীরার দেবী কর্তৃক কারাদণ্ডের কাহিনী শোনে। তারা প্রতি রাতেই গ্রাম প্রধানের বাড়িতে জড়ো হতো আর প্রধানের গল্পের একটি সুন্দর সমাপ্তির জন্য অধীর আগ্রহে গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করত।

সমালোচকরা বলেন- তুতুওলা, হেমিংওয়ে কিংবা ইভান তুর্গিনিভের মত লেখেন না। আপনি যদি গল্প পছন্দ করেন, রঙ এবং কল্পনাকে ভালোবাসেন, তাহলে আপনি হয়তো তার গল্পগুলোকেও ভালবাসবেন; যে-গল্পগুলো ভরে আছে ডাইনি, জাদুবিদ্যা, শয়তান, প্রেতাত্মা, মৃত্যুর দেশ আর আজব আজব শহর দিয়ে।

তুতুওলা’র গল্পগুলি নিশ্চিতভাবেই নাইজেরিয়ার স্থানীয় মিথ এবং গল্পকথন ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত যা শত শত বছর ধরে প্রবহমান।

তীরন্দাজে ধারাবাহিকভাবে এই উপন্যাসের নির্বাচিত কিছু অংশ প্রকাশিত হবে।

অরণ্যের পালকওলা রমণীর উপকথা

আমার জনপদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

সেই আঠারো শতকে, আবিওকুতায় (নাইজেরিয়া) প্রথমে এক শিকারি আসে, তারপর আবাস গাড়ে কয়েকটি দেশান্তরী পরিবার, তারপর তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্নও হয়ে পড়ে, তারপর আবার তারা থিতু হয় যে-জায়গাটিতে, লোকে তাকেও আবিওকুতা বলে ডাকে; শুধু নিজেদেরকে বন্য পশু আর অন্যান্য কিছুর বিপদ থেকে রক্ষা করতেই থিতু হয়েছিল তারা। দেশান্তরী এই লোকগুলির গোত্রের আজকের পরিচয় আদিবাসী ইগবা। আর এদের গোত্রপ্রধান এবং নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিটিকে বলা হয় ওদুদুয়ো। এই ওদুদুয়ো হলেন ইয়োরোবাদের বীর এবং প্রতিপালক পিতা। এই ব্যাপারটিও জেনে রাখা ভাল যে ইগবা লোকেরা কখনওই একত্রে মিলেমিশে বাস করত না যেমনটা তারা আজকের দিনে করছে, আর তারা সংখ্যায়ও ছিল হাতেগোনা কয়েকজন।

নির্মিত ঘরবাড়িগুলির ধরন : ঘরবাড়িগুলি মৃত্তিকা নির্মিত, সেগুলির চাল ছাওয়া হয় ঘাস আর বড় বড় পাতা দিয়ে, আর এই ধাঁচে নির্মিত ঘরগুলি ইয়োরোবা গ্রামগুলিতে এখনও টিকে আছে। ঘরগুলির বেশিরভাগই এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে পরিবেষ্টিত থাকে যে তাতে চতুর্ভুজ আকৃতির জায়গা খালি থাকে আর সেই খালি জায়গায় তৈরি হয় বহু দেবতার স্মৃতিচিহ্নসংবলিত সমাধিমন্দির, যেখানে এই পরিবারগুলি নিজেদের উৎসর্গ করে।

দৈনন্দিন কাজকর্মের বিবরণ : সেই সকাল থেকেই, দিন শুরু হয় যখন, তাদের কঠোর কাজেরও শুরুও তখনই। চরকা চালকরা সুতা কাটার যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ শুরু করে, তাঁতিরা তাঁতের মাকু হাঁটে তুলে নেয়। কৃষকরা হাতে তুলে নেয় মাটি থেকে আগাছা খুঁড়ে তোলার নিড়ানি আর কাটারিগুলিকে। যোদ্ধারা হাতে তুলে নেয় তাদের অস্ত্রগুলি, ঢোলবাদকরা ঢোল, শিকারিরা তুলে নেয় তীক্ষ্ণফলাবিশিষ্ট তীর আর ধনুকগুলি।

গোত্র-প্রতীক : গোত্র-প্রতীকগুলি বিভিন্ন ধরনের হয়, আর এগুলি পরিবারগুলির পছন্দের ভিত্তিতেই গ্রহণ করা হয়।

নারীদের পোশাক : নারীদের পোশাকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অ্যাপ্রোন, চুলের ফিতা, তরুণী এবং সদ্য বিবাহিতা মেয়েদের জন্য অবগুণ্ঠন, বৃদ্ধা ও বয়স্কা বিবাহিত নারীদের জন্য মাথা ঢাকবার আচ্ছাদন। তাদের মূল্যবান মালাগুলি সব সময়ই হাতের কব্জি, গলা আর কোমরে রক্ষিত থাকে। লাল চন্দনের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয় শরীরে ঘষার জন্য আর চোখের পাতায় লাগাবার জন্য রূপালি রঙের ধাতুর প্রলেপ।

খেলাধুলা ও অবসর বিনোদন : আমাদের খেলা আর অবসর বিনোদন হচ্ছে নীতিকথা, লোক-কাহিনি, প্রবাদ প্রবচন, ধাঁধা, ইত্যাদি। অবসর যাপন শুরু হয় সমস্ত দিনের কাজের শেষে।

প্রতিবেশী কিংবা দূরের বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতি : বহু, বহু বছর আগে, ইয়োরোবারা তাদের স্বপ্নে সাদা চামড়ার মানুষ দেখারও বহু আগে আর তাদের কোনও রকমের গ্রন্থগত বিদ্যা না থাকবার কারণে ইগবোদের কাছে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বেশ কিছু প্রতীকের অধিকারী ছিল যেখানে আমরা বেশ কিছু অক্ষর আর এরকম কিছু জিনিসও ব্যবহার করতাম- যদি দুইটি কড়ি পরস্পরের দিকে মুখ করে আছে বলে দেখা যেত, আমরা বুঝতাম এর মানে হল- ‘আমি তোমাকে দেখতে চাই।’ কিন্তু যাকে দুটি কড়ি দেখানো হল উত্তরে সে যদি লম্বা একটা পালক প্রদর্শন করত, আমরা বুঝতাম যে এর মানে- ‘আমাকেই আকাঙ্ক্ষা করা হচ্ছে।’ দুইটি কড়ি যদি পরস্পরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করত, বুঝতে হতো বলা হচ্ছে- ‘আমি তোমাকে বহুদূরে পাঠিয়ে দেব।’ কিন্তু যদি দুটির বদলে তিনটি কড়ি দেখানো হতো, তাহলে বুঝতে হবে বলা হচ্ছে- ‘তাহলে আমি তোমাকে পেছন থেকে আঘাত করব।’ কিন্তু যদি উত্তরে কাঠকয়লা দেখানো হতো, মানে দাঁড়াত- আমাকে বহুদূরে পাঠিয়ে দেবার কারণগুলি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি।’ ইত্যাদি, ইত্যাদি।

বিশ্বাস সমূহ : বহু প্রাচীন বন্য ঝোপঝাড় রক্ষা করা হচ্ছিল বা কেউ যাতে এগুলিকে ধ্বংস না করে সে ব্যবস্থা ছিল যাতে ঝোপগুলোয় বসবাস করতে থাকা আত্মারা দূরে অন্য কোথাও চলে না যায়। জনপদের প্রকাণ্ড বৃক্ষগুলিকে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল যাতে বৃক্ষগুলোয় আত্মা আর ডাইনিরা নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে।

এ পর্যন্ত আমার জনপদ সম্পর্কে যা কিছু কথা বলা হলো তার সবকিছুর অস্তিত্ব এখনও টিকে আছে কিন্তু ধীরে ধীরে সেসব বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

একরাতের তাড়ি ও গল্পকথার আসর

আমার ছিয়াত্তর বয়সে গ্রামপ্রধান মারা গেলেন। সে-সময় গ্রামে আমিই ছিলাম একমাত্র পুরোনো আমলের মানুষ আর একারণেই নতুন গ্রামপ্রধান হিসেবে আমাকেই বেছে নেয়া হয়।

ছয় মাস পর, আমি তখন পুরদস্তুর গ্রামপ্রধান; আর, আমার লোকেরাও যেন আমার অতীত জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলি- যা বিত্তশালি হওয়ার আগে ঘটেছিল- শুনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। যা-ই হোক, এক রাতে, গ্রামের লোকদের আমি আমার বাসগৃহে নিমন্ত্রণ করলাম। তারা সবাই বাড়ির সামনে গোল হয়ে বসে পড়ল, বাম পাশে বসল মহিলারা আর ডান পাশে সমস্ত পুরুষ। নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমি আমার নিত্যসঙ্গী আসনে বসলাম- কিছুটা দূরত্ব রেখে, সকলের সামনে। তারপর আমার পক্ষ থেকে সমবেত সকলের মাঝে ছোট ছোট পিপায় করে তাড়ি পরিবেশন করা হল। তাড়ির সবচে বড় পিপাটি থাকল আমার সামনে।

রাতের আবহাওয়া ছিল শুষ্ক, আকাশে পূর্ণ চাঁদ, ফলে- শুষ্ক সময়ের চাঁদনিতে লোকেরা খুব ভাল করেই আমাকে দেখতে পাচ্ছিল আর আমিও দেখতে পাচ্ছিলাম তাদের মুখগুলিকে। মুখগুলি গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে করতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে আর তাড়ির পিপায় চুমুক দেবার কথাও বেমালুম ভুলে গেছে। তাদের সমস্ত আগ্রহ আমার গল্পে। তাদের আর দেরি সহ্য হচ্ছিল না। অবশেষে তাদের একজন দাঁড়িয়েই গেল, দাঁড়িয়েই চড়া গলায় বলল- আমরা তোমার অভিযাত্রার কাহিনি শুনবার জন্য আকুল হয়ে আছি। তারা হয়ত ভেবেছিল- আমার অভিযাত্রার গল্পগুলি এমন যা কেবল একরাতেই বলে ফেলা যাবে, কিন্তু গ্রামের লোকেদের কাছে ব্যাপারটা এক বিস্ময় হিসেবে ধরা দিল- যখন তারা দেখল যে আমার গল্পগুলি সম্পূর্ণ বলে শেষ করতে রাতের পর রাত কেটে যাচ্ছে।

আর এভাবে, এক রাতের আসর থেকেই শুরু হল আমার অতীত জীবনের অভিযাত্রার গল্প বলা। রাতের পর রাত।

 

অরণ্যের ডাইনি : গল্পকথার প্রথম রাত : প্রথম যাত্রা

আমার লোকেরা শোনো, আমি সত্যিই খুব খুশি হয়েছি যে তোমরা আমার অতীত জীবনের রোমাঞ্চকর অভিযানগুলির গল্প শুনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলে। আর আমিও আজ রাত থেকেই তোমাদেরকে সেই গল্পগুলি বলা শুরু করব। তবে, তোমাদের কাছে আমার একটা ব্যাপার চাওয়ার আছে, চাওয়াটা হলো গল্পগুলি পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে যাতে তোমরা বিস্মৃত হয়ে না যাও; আর, তোমরা শোনো, আমি বিশ্বাস করি এই গল্পগুলিতে এমন কিছু প্রজ্ঞাময় ব্যাপার আছে যা তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য উপকারি হবে।

মাত্র পনেরো বছর বয়সেই আমি খুব চালাক আর ক্ষিপ্রগতির বালক ছিলাম, তখন কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ সেটা বুঝতে পারতাম, তেমনি কী করলে ভাল হয় আর কি করলে মন্দ হয় সেটাও বুঝে ফেলেছিলাম। সেই তখন থেকেই আমি জীবনের কঠোরতা, জটিলতা, দুর্ভোগ, কর্মফল, দণ্ডভোগ প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের কাজে নেমে পড়ি। কিন্তু নেমে পড়লে কী হবে, কোনোভাবেই যেন সেই বয়সে জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত, কষ্ট, যন্ত্রণা, দুর্ভোগ, ঝুঁকি, অপরাধের দণ্ড ইত্যাদি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছিলাম না…অভিজাত্রায় নিরুদ্দেশ হয়েও আমি ব্যর্থ হচ্ছিলাম বারবার।

তখন একদিন ভাল করে লক্ষ্য করলাম- আমার বাবা দরিদ্র এক বৃদ্ধে পরিণত হয়েছেন। তিনি এত চরম পর্যায়ের দারিদ্র্যের মধ্যে ছিলেন যে গ্রামের লোকেদের ধারণাই জন্মে গেল- পূর্ব থেকেই তার নিয়তিকে চরম দুর্ভোগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। পেশায় বাবা ছিলেন এক কৃষক, আর তিনি কঠোর পরিশ্রমী। গ্রামের অন্য কৃষকদের চেয়ে অনেক বেশি জমি চাষ করতেন তিনি; কিন্তু করলে কী হবে! সর্বদাই তিনি নিদারুণ যন্ত্রণা আর গভীর দুঃখে পতিত থাকতেন, কারণ যতোই তিনি কঠোর পরিশ্রম করতেন তার দারিদ্র্য যেন পাল্লা দিয়ে ঠিক ততোটাই বেড়ে যেত, আর বাড়তে বাড়তে সমস্ত সীমা অতিক্রম করত।

তার ছিল দুই পুত্র, আমার ছোট ভাই, যার নাম রাখা হয়েছিল আলাবি, আর আমি হলাম সবার বড়; তার একটি কন্যাও ছিল, আশাবি; সবার শেষে সে-ই জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু তার মতো কঠোর পরিশ্রমী মানুষের পুত্র হলেও গ্রামের লোকেদের কাছে দিনে দিনে আলসে, পাজি, বদমাশ, হতচ্ছাড়া হিসেবে পরিচিতি লাভ করলাম। আমি আর আলাবি এতটাই অলস হয়ে পড়লাম যে খেতখামারের কাজে বাবাকে একটু সাহায্য করতেও ইচ্ছা করত না। অবশ্য এটাও ঠিক যে জন্মের পর থেকেই এসব খেতখামারের কাজের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। অবশেষে বাবা যখন একেবারেই বৃদ্ধ আর ক্লান্ত হয়ে পড়ল, খামারে আর কাজ করার সামর্থ্য তার ছিল না, তখন আমাদের জন্য খাদ্য, পোশাক আর অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলি ঋণ করে করে কিনতে লাগল। একদিন হলো কী, বাবা তার ঋণের অল্প কিছুও যখন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলো, ঋণদাতা তার সঙ্গে খুবই লজ্জাজনক আচরণ করল। ব্যাপারটা চোখের সামনে দেখে ভিতরে ভিতরে চরম বিরক্ত হয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার ছোট ভাইটিকে ঘরের কোণায় আসার জন্য ডাক দিলাম। ডাক শুনে সে চলে আসার পর তাকে এই কথাগুলি বললাম- ভাই শোন, দূরের কোনও জায়গায় গিয়ে কাজ খুঁজে বের করার পক্ষে আমরা যথেষ্ট বড় হয়েছি। সেখানে কয়েকবছর কঠোর পরিশ্রম করে মোটামুটি কিছু পয়সা জমিয়ে ফেলতে পারলেই আমরা আবার ফিরে আসব। বৃদ্ধ বাবা-মাকে পয়সাগুলি দিব, তখন তারা ঋণের দায় থেকে মুক্তি পাবেন আর আমাদের কোনও অভাবও থাকবে না।

কোনও তর্কে না গিয়ে বলা যায় এক কথাতেই ভাইটি আমার এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। পরদিন সকালে বাড়ির বসার ঘরে বাবা-মা আর ছোটবোন আশাবিকে ডাকলাম। তাদেরকে জানালাম যে আজ এই সকালেই আমি ও আলাবি তাদেরকে ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছি কাজের সন্ধানে। আমার বাবা আর মা বললেন যে তারা আমাদের এই কথা শুনে খুশি হয়েছেন। বাবার কাছে জানতে চাইলাম : সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য তিনি আমাদেরকে কী দিচ্ছেন? বিষাদভরা কণ্ঠস্বরে বাবা বললেন যে আমরা খুব ভাল করেই জানি যে তার কাছে এখন জমি খোঁড়ার কাটারি, নিড়ানি, খামারের কাজের হাতাওলা জাম্পার আর বালিধুলি থেকে শরীর বাঁচাবার কয়েকটি অ্যাপ্রোন ছাড়া আর কিছুই নেই আমাদের সঙ্গে দেওয়ার মতো। তার কথা শেষ হলে কোনো কিছু না ভেবেই আমি একটা অ্যাপ্রোন আর হাতাওলা জাম্পার পরে নিলাম, ছোট ভাইটিও তাই করল; তারপর আমি দুটো নিড়ানি আর দুটি কাটারি একটি টুকরিতে ভরলাম। আমার ভাই টুকরিটাকে তার কাঁধে তুলে নিল। তারপর তাদেরকে আমরা শুভ আর মঙ্গল কামনার ভঙ্গিতে বিদায় জানালাম, উত্তরে তারা আমাদের জন্য সৌভাগ্য প্রার্থনা করলেন যাতে আমরা নিরাপদে তাদের কাছে ফিরে আসি। তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের গ্রাম ছেড়ে এই সকালেই চলে যাচ্ছি কোনও এক অচিন জায়গায়।

মাইলের পর মাইল পথ হাঁটার পর আমরা যেন পথের একেবারে শেষ প্রান্তে চলে আসলাম, যে-পথটি ধরে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করেছিলাম, আর সময় তখন সন্ধ্যা ছয়টার মত হয়েছে বলে মনে হল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা বিরতি নিলাম যখন সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার এক রাত নেমে এল। রাত অন্ধকার হলেও আকাশে চাঁদ ছিল, যদিও তখন তার উজ্জ্বল আলোটি ফোটেনি। এদিকে আমাদের সঙ্গে খাবার বলতে কিছুই ছিল না আর আমরাও প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলাম, আর সেই সকাল থেকে বিরতি না নিয়ে একটানা হাঁটার কারণে দিবানিদ্রাও হয়নি। যাই হোক, রাতটা কোনওমতে কেটে গেল। পরের দিন খুব ভোরে জেগে উঠলাম আর একেবারে খালি পেটে অন্তহীন এক অরণ্যের ভিতর দিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম। সেই অরণ্যপথে যেতে যেতে প্রায় দুই মাইলের মতো পথ পেছনে পড়ে গেল, কিন্তু আর কাউকেই চোখে পড়ল না। আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম বলেই হঠাৎ আমাদের চোখে পড়ল প্রকাণ্ড এক গাছের তলায় অজস্র পাকা আম, পাও-পাও, আরও নানা ধরনের ফল, ছড়িয়ে পড়ে আছে। আমাদের বিশ্বাস জন্মে গেল যে দূরবর্তী কোনও বাগান থেকে বানর ও অন্যান্য গাছের ডালপাতায় ওঠানামা করা প্রাণিগুলিই ফলগুলিকে এখানে নিয়ে এসেছে। যাই হোক, এখন ফলগুলিকে দেখে আমরা থামলাম আর লোভাতুর হয়ে পড়লাম। তাড়াতাড়ি খেয়েও ফেললাম যতগুলি পারা যায়। সঙ্গের টুকরিতেও ভাল দেখে দেখে কিছু ফল নিয়েও নিলাম যাতে পথ চলতে চলতে আবার ক্ষুধার্ত হলে খাওয়া যায়।

তারপর, ঘণ্টা দুই বিশ্রামের পর আবারও আমাদের যাত্রা শুরু হল। যেতে যেতে যেতে যেতে সন্ধ্যা নামার আগে আমরা আবার থামলাম। টুকরিতে বয়ে আনা ফলগুলি খেলাম। তারপর গভীর এই অরণ্যের ভিতর হেলে-পড়া হাওয়া গাছের ওপর আমরা শুয়ে পড়লাম, ঘুমোলাম পরদিন সকাল পর্যন্ত।

কিন্তু প্রায় নয় দিন সীমাহীন এই অরণ্যের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে আমরা ভাবলাম আমরা যেন  মাঝামাঝি পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পেরেছি। হাঁটতে হাঁটতে দুজনেই আমরা ক্লান্ত। ক্লান্তিতে যেন নুয়ে পড়ছি। আর যেতে পারছিলাম না। শেষে, অতিকায় দানবাকৃতির এক গাছের শীতল ছায়ায় আমরা বসে পড়লাম।

গাছের শীতল ছায়ায় বসে তো বিশ্রাম করছিলাম আর কী খাওয়া যায় তাই নিয়ে দুই ভাই কথা বলছিলাম। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম এক বৃদ্ধা মহিলাকে ঘিরে প্রায় দুই-তিনশ ছোটবড় পাখি যেন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁদছে আর তাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। বৃদ্ধা মহিলাটির সামনে এক উটপাখি। উটপাখিটি আকারে এত বড় আর এত লম্বা যে তার আড়ালের কারণে মহিলাকে আমরা ঠিকমত দেখতে পারছিলাম না। উটপাখিটি মহিলার আগে আগে এমনভাবে চলছিল যে মনে হচ্ছিল সে যেন তাকে যাবতীয় বিপদ থেকে রক্ষা করে চলেছে। মহিলাটি যদি তার বামে কিংবা ডানে হাঁটে, উটপাখিটিও তাই করে, মহিলার জন্য সে তার বিশাল ডানাদুটিকে প্রসারিত করে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে পাখিগুলির কান্না যেন বহুগুণে বেড়ে যায়, তারপর মহিলাটি যেদিকে যায় তারাও সেদিকে তীরবেগে ছুটে গিয়ে চক্কর খেতে শুরু করে।

চোখের সামনে এগুলি দেখে আমরা ভাবলাম প্রাণ নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাব, কিন্তু আমরা তা করতে পারলাম না কারণ আমাদের জানা ছিল না যে এই দিকচিহ্নহীন অসীম অরণ্যের ঠিক কোথায় পালালে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাব। আর এই কারণেও পালিয়ে যেতে পারলাম না, ঠিক আমরা যেমন করে বৃদ্ধাকে দেখছিলাম বৃদ্ধাও তার শরীর কাঁপিয়ে, বাঁকিয়ে, ডানে-বাঁয়ে হেলে ঠিক একইভাবে আমাদেরকেও দেখছিল। অরণ্যের বৃদ্ধা মহিলাটি যখন আমাদের কাছাকাছি চলে এল, তখন তাকে ভাল করে দেখতে পেলাম।

বৃদ্ধা মহিলাটির শরীর কোমল পালকে আবৃত হলেও নিজেকে সে গোড়ালি থেকে কোমর পর্যন্ত বাঘছাল দিয়ে ঢেকে রেখেছে, শরীরের বাকিটুকুতে পালক আর পালক। পুরো শরীরই তার পালকে আবৃত- যেন সে এক অতিকায় পাখি, শুধু মাথা ছাড়া; মাথায় হালকা একগোছা পাকা চুল। তার চোখগুলি আগুনের মত লাল, আর বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে কোটরে বসা চোখগুলি যেন শূন্যগর্ভ। তার স্তনগুলি কোনোভাবেই দেখা যাচ্ছিল না, কারণ কোমল পালকে সেগুলি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সবগুলি দাঁতই তার পড়ে গিয়েছিল বলে তার মুখ অনবরত এমনভাবে নড়ছিল যেন সে সব সময়ই কিছু না কিছু খাচ্ছে।

বৃদ্ধা মহিলাটি যখন আমাদের কাছাকাছি চলে এল, হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল আর চোখের সামনেই আমাদেরকে দেখতে পেল, দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমাদের মনের ভিতর আবারও প্রচণ্ড ভয় জাগিয়ে দেবার জন্য উটপাখিটি যেন উদগ্রীব হয়ে আমাদেরকে লক্ষ্য করছিল যেন আমরা প্রচণ্ড ভয়ে তাদের দিকে তাকাই। উটপাখিটি হঠাৎ করেই যেন আরও ক্ষিপ্ত, উন্মত্ত হয়ে উঠল, তারপর আমাদের দিকে প্রচণ্ড আক্রোশে তীর বেগে ছুটে এলো, যেন এখনই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু আমরা তাকে সেই সুযোগ না দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াই আর খুব দ্রুতই হেলে-পড়া সেই প্রকাণ্ড গাছটির কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আর তখন দেখতে পাই বৃদ্ধা মহিলাটির চারপাশে গোল হয়ে ঘুরতে থাকা কয়েকশ ছোটবড় পাখি মহিলাটিকে ছেড়ে আবার আমাদের দিকে উড়ে আসতে শুরু করেছে। তারা হঠাৎ ভয়ংকর কান্না শুরু করে দেয় আর তাদের তীক্ষ্ণ নখরে আমাদেরকে আঁচড়াতে শুরু করে. যতক্ষণ না বৃদ্ধ মহিলাটি একেবারে অস্থির হয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মুহূর্তেই সে দাঁড়ায়, পাখিরা দু’দিকে দুই ভাগে স্থির হয়ে যায় যাতে বৃদ্ধা আমাদেরকে ভাল করে দেখতে পায়, উটপাখিটি তখন মহিলার বাম দিকে চলে এসেছে।

ভয় ও বিস্ময়ে আমাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত তখনও যেমন কাঁপছিল, ঠিক তেমনি এক রক্ত হিম করে দেওয়া বিকট কিন্তু ভেঙে পড়ে যাওয়া কণ্ঠে বৃদ্ধা আমাদেরকে হয়তো জিজ্ঞেস করে : তোমরা কীভাবে আমার রাজত্বে ঢুকে পড়লে? তোমরা কি জানতে না এটা আমার অরণ্য?

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close