Home সাক্ষাৎকার আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাক্ষাৎকার > ‘যতটুকু পড়বেন, পড়ার আনন্দে পড়ুন…’ >> প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাক্ষাৎকার > ‘যতটুকু পড়বেন, পড়ার আনন্দে পড়ুন…’ >> প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ September 12, 2017

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাক্ষাৎকার > ‘যতটুকু পড়বেন, পড়ার আনন্দে পড়ুন…’ >> প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম
0
0

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাক্ষাৎকার > ‘যতটুকু পড়বেন, পড়ার আনন্দে পড়ুন…’ >> প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম 

“আপনি লেখালেখিতে যতোটা মগ্ন হবেন, ততোটাই আপনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বেন। আপনার পুরোনো ভালো বন্ধুদের অনেকেই মারা যাবে, অনেকেই অন্যত্র চলে যাবে, আপনি খুব অল্প সময়ই তাদের কাছে পাবেন। কিন্তু আপনি যখন গভীরভাবে মগ্ন হয়ে লিখবেন, আপনার মনে হবে তাদের সাথে আগের মতোই পুরোনো দিনের কোনো ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।” 

ভূমিকা

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মার্কিন নন্দিত কথাসাহিত্যিক। তিনি ১৮৯৯ সালে আমেরিকার ইলিনয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে  কথাসাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৫৪ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তাঁর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে যা পরবর্তীতে তাঁর অসংখ্য লেখায় উঠে আসে। অ্যা ফেয়ারওয়েল টু দ্য আর্মস, দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, দ্য সান অলসো রাইজেস, ফর হুম দ্য বেল টোলস তাঁর বিখ্যাত এবং বিশ্বজুড়ে বহুল পঠিত উপন্যাস। ছোটগল্প বিনির্মাণেও তিনি অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। এই কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক ১৯৬১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। প্যারি রিভিউর এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তাঁর লেখালেখির গল্প, কথাসাহিত্য নিয়ে তাঁর অভিমত এবং জানা-অজানা অনেক তথ্য। দ্য আর্ট অব ফিকশন শিরোনামে সাড়া জাগানো এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন জর্জ প্লিম্পটন। প্রকাশিত হয়েছিল প্যারি রিভিউয়ের ১৮তম সংখ্যায় ১৯৫৮ সালে।

সাক্ষাৎকার

প্রশ্ন > লেখালেখির মূল সময়টা কি আপনার কাছে আনন্দদায়ক?

উত্তর > খুব বেশি আনন্দদায়ক।

আপনার লেখালেখির সময় সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? সাধারনত আপনি কখন লেখালেখি করেন?  লেখালেখির ক্ষেত্রে কি সময়সূচী কঠোরভাবে অনুসরণ করেন?

যখন কোনো উপন্যাস বা গল্প নিয়ে কাজ করি, আমি প্রতিটি সূর্যোদয়ের পর যত দ্রুত সম্ভব লিখতে বসি। এই সময়ে ব্যাঘাত ঘটানোর মত কেউ থাকে না। তাছাড়া এই সময়টা শান্ত বা শীতল থাকে। তাছাড়া একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করলে যে কেউই অস্থির হয়ে উঠবেন। আমি যা লিখি তা বারবার পড়ি। যখন আমি অনুধাবন করি এরপর কি হতে যাচ্ছে, আমি লেখা থামাই এবং সেখান থেকে চলে যাই। আমি এমন একটি স্থানে  না পৌছানো পর্যন্ত লিখি যে আমার কাছে তখনও কিছু নির্যাস থেকে যায়। আমাকে অবশ্যই অবগত থাকতে হয় এরপর কি ঘটতে যাচ্ছে। আমি কিছু নির্যাস নিজের মধ্যে রেখেই থামি এবং পরবর্তী দিন শুরু করার আগে পর্যন্ত প্রাণবন্ত থাকতে চেষ্টা করি। আমি সকাল ছ’টায়  শুরু করি এবং দুপুর পর্যন্ত বা তার পূর্বে যে কোন সময় পর্যন্ত লিখি। আমি যখন থামি তখন আমি শূন্য, কিন্তু অনুভূতিটা এমন থাকে যে, আমি শূন্য নই। যেমনটা কেউ যখন কাউকে ভালোবাসেন, অনেক ভালোবাসার পরও তাকে চাইলেই ভালোবাসতে পারেন, মানে তার জন্যে কিছু ভালোবাসা সবসময় থেকেই যায়। কোনো কিছুই আমাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে না, কোনো কিছুই আমাকে থামাতে পারে না যেই পর্যন্ত না আমি পরবর্তী দিনের কাজ শুরু করি। পরবর্তী দিনে পৌছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কঠিন।

আগের দিনের রেখে যাওয়া লেখা পড়ে কি সংশোধন করেন? নাকি লেখা সম্পন্ন হলে সংশোধন করেন?

আমি প্রতিদিন যেখানে থামি, পরের দিনে সে পর্যন্ত পড়ে তা প্রয়োজনীয় অংশে সংশোধন করি। যখন সম্পূর্ণ লেখাটা শেষ হয়ে যায় তখনও স্বাভাবিকভাবেই আমাকে সেটা পড়তে হয়। যখন অন্য কেউ মুদ্রাক্ষর  করবে আর আপনি তা স্পষ্ট মুদ্রাক্ষরে দেখতে পাবেন তখন আরেকবার সংশোধনের সুযোগ পাবেন। আর শেষ সুযোগ হচ্ছে প্রুফের সময়। এই ভিন্ন ভিন্ন সুযোগগুলোর জন্য আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ।

আপনি নিজের লেখাকে কতোটা সংশোধন করে থাকেন?

এটা লেখার উপর নির্ভরশীল। ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ এর শেষ পৃষ্ঠাটি নিয়ে তৃপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ঊনচল্লিশ বার সংশোধন করতে হয়েছে।

কোনো প্রায়োগিক সমস্যা ছিলো? কোন্ সমস্যাটি বারবার আপনাকে থামিয়ে দিয়েছিলো?

যথার্থ শব্দ খুঁজে পাওয়া।

লেখা পূনঃপাঠ কি লেখার নির্যাস ফুটিয়ে তোলে বলে মনে করেন?

পূনঃপাঠ আপনার লেখাকে যথার্থ স্থানে নিয়ে যাবে। আপনি নিজেই একটা সময় অনুধাবন করবেন, যতটুকু পর্যন্ত পৌছেছেন আপনার সেরাটা দিতে পেরেছেন। নির্যাসটা সবসময়ই কোথাও না কোথাও থেকে যায়।

কিন্তু কখনো কি এমনটা বোধ করেছেন যে, আপনি আদৌ লেখার উৎসাহ পাচ্ছেন না?

স্বভাবতই। কিন্তু যখন আপনি এমন একটি স্থানে থামলেন যে, আপনি জানেন এরপর কি ঘটতে যাচ্ছে; তাহলে আপনি তা চালিয়ে যেতে পারবেন। আপনি যতোটা সময় নিয়ে শুরু করবেন, ততোটাই ভালো। লেখার মূল নির্যাসটা বেরিয়ে আসবে।

কোন কোন স্থানে লেখার ক্ষেত্রে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন? অবশ্যই  অ্যাম্বোস মাঁদোস হোটেল তার মধ্যে একটি হতে পারে কারণ আপনি সর্বাধিক সংখ্যক বই সেখানে বসে লিখেছেন?

হাভানার অ্যাম্বোস মাঁদোস হোটেলটি লেখালেখির জন্য আসলেই একটি চমৎকার জায়গা। কিন্তু আমি সব জায়গাতেই ভালো কাজ করতে পেরেছি। আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে, আমি যে কোনো  পরিস্থিতিতে যে কোন স্থানে কাজ করতে সক্ষম। তবে টেলিফোন ও দর্শনার্থীরা কাজের সর্বনাশ করে।

আবেগের উপস্থিতি কি লেখালেখির ক্ষেত্রে অপরিহার্য? আপনি আমাকে একবার বলেছিলেন, আপনি প্রেমে পড়ার সময়ে সবচেয়ে ভালো লিখতে পারেন। এ বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

কি এক অদ্ভূত প্রশ্ন! অবশ্য আবেগীয় বিষয়ে জানতে চেষ্টা করার জন্যে আপনাকে পূর্ণ নাম্বার দেয়া যেতে পারে। আসল ব্যাপার হচ্ছে, যখন লোকজন আপনাকে একাকী থাকতে দেবে অথবা বিঘ্ন ঘটাবে না তখন আপনি সার্বক্ষণিকভাবে লিখতে পারবেন। এমনকি যখন আপনি খুব নির্দয়, খুব নির্মোহ হয়ে ওঠেন, তখনও। কিন্তু যখন আপনি প্রেমে পড়বেন, অবশ্যই তখন আপনার সেরা লেখাটি বেরিয়ে আসবে। এ ব্যাপারটি আপনার ক্ষেত্রেও একই রকম হলে বরং আমি তা ব্যাখ্যা করতে চাই না।

লেখকের জন্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কতটা জরুরি? ভালো লেখালেখির ক্ষেত্রে কি এটা প্রতিবন্ধক হতে পারে?

লেখালেখির সত্তাটি যদি জীবনের খুব শুরুতেই আপনার মধ্যে চলে আসে আর আপনি যদি জীবন ও লেখালেখিকে সমানভাবে ভালোবাসতে পারেন তবে প্রলোভনকে সংযত করার মত অনেক বৈশিষ্ট্যই আপনার মধ্যে চলে আসবে। একবার যদি লেখালেখি আপনার বৃহৎ প্রবৃত্তি ও সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎস হয়ে উঠে তবে তা শুধুমাত্র মৃত্যুই থামাতে পারে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তখন আপনার জন্যে বড় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে যেহেতু এটা আপনাকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখবে। দুশ্চিন্তা লেখকের লেখালেখির ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়।

আপনি কি এমন একটি সুনির্দিষ্ট মুহূর্তের কথা মনে করতে পারেন যখন আপনি একজন লেখক হতে চেয়েছিলেন?

না, আমি সবসময়ই লেখক হতে চাইতাম।

উঠতি লেখকদের জন্যে কোন বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

একজন তরুণ লেখকের উচিৎ ভ্রমণে বের হওয়া এবং নিজেকে সময় দেয়া। কেননা ভালো লেখালেখি করাটা তার কাছে অসম্ভব রকমের কঠিন মনে হতে পারে। নিদেনপক্ষে, ভ্রমণের প্রলম্বিত সময়ের গল্পটা তার থাকবে যা দিয়ে সে শুরু করতে পারবে।

অনেক লেখক বিভিন্ন পেশাবৃত্তিতে প্রবেশ করছেন। তাদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? যে বিশাল সংখ্যক লেখকগোষ্ঠী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন তারা তাদের সাহিত্য জগতের সাথে আপোস করছেন বা ছাড় দিয়েছেন বলে মনে করেন কি?

আপনি আপোস বা ছাড় বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন এটা তার উপর নির্ভরশীল। এটি কি কোনো নারীর বিষয়ে আপোস? কোনো প্রশাসকের সাথে আপোস? অথবা কোনো মুদি দোকানী বা দর্জির সাথে আপোস করা যে, আপনি কিছুটা কম দিলেন কিংবা বাকিতে পরিশোধ করবেন? যে লেখক লিখতেও পারেন শিক্ষকতাও করতে পারেন তার দুটোই করা উচিৎ। অনেক যোগ্য লেখকই এটা করে দেখিয়েছেন। আমি এটা করতে পারিনি। যারা পেরেছেন আমি তাদের প্রসংশা করি। আমার মনে হতো, পেশাগত জগৎ যদিও বাইরের জগত সম্পর্কে ধারণা দেয়, এটা  বৈশ্বিক জ্ঞান বৃদ্ধির ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। যাই হোক, জ্ঞান লেখকের দায়বদ্ধতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং লেখালেখির কাজকে কঠিন করে তোলে। স্থায়ী মূল্য পাওয়ার মত কিছু লিখতে হলে লেখালেখিকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে নিতে হবে। এমনকি যদি সারাদিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টাও মূল লেখালেখির সময়কাল হয়ে থাকে। একজন লেখককে একটি কূপের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কূপ আছে যেমনটা রয়েছে বিভিন্ন ধরনের লেখক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কূপের জল কতোটা স্বচ্ছ। আর সর্বোত্তম হচ্ছে কূপটিকে একবারে সেচের মাধ্যমে না শুকিয়ে আপনি প্রতিদিন সেখান থেকে নির্দিষ্ট পরিমান জল তুলে নেবেন এবং পূনরায় কূপটি পরিপূর্ণ হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করবেন। মনে হচ্ছে, আমি প্রশ্ন থেকে দূরে সরে গেছি। এই প্রশ্নটা আসলে তেমন একটা স্বস্তিদায়ক ছিলো না।

পত্রপত্রিকায় লেখালেখির ব্যাপারে তরুণ লেখকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী? ‘কানসাস সিটি স্টার’ পত্রিকায় লেখালেখি করাটা আপনার জন্য কতোটা সহায়ক হয়েছিলো?

স্টার সাধারণ একটি বাক্য লেখাও আপনাকে শিখতে বাধ্য করবে। এটা যে কারো জন্যে উপকারী। সংবাদপত্রে লেখাটা তরুণ লেখকদের জন্য ক্ষতিকর নয়। এটা তাদের বরং উপকারই করবে যদি প্রয়োজনের সময় সে বেরিয়ে আসতে পারে। সবগুলো প্রশ্নের মধ্যে এটি নিম্নমানের প্রশ্ন এবং এটা বলার জন্যে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু আপনি যখন পুরোনো ক্লান্তিকর প্রশ্ন করবেন তখন আপনাকে পুরোনো ক্লান্তিকর উত্তর শোনার জন্যই প্রস্তুত থাকতে হবে।

একজন লেখকের সাথে অন্য লেখকদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও উদ্দীপনামূলক সঙ্গ কি কোনো গুরুত্ব বহন করে বলে আপনি মনে করেন?

অবশ্যই।

প্যারিতে লেখক ও চিত্রকরদের মধ্যে কি কোনো গোষ্ঠীগত সম্পর্ক অনুভব করেছিলেন?

না, দলগত বা গোষ্ঠিগত কোনো অনুভূতি নেই। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছিল আমাদের। আমি অনেক চিত্রকরকে শ্রদ্ধা করতাম। এদের কেউ কেউ আমার সমবয়সী ছিলেন, অন্যরা বড় ছিলেন যেমন গ্রীচ, পিকাসো, মোনে। এই তালিকায় কিছু লেখকও আছেন, যেমন জয়েস, এজরা, স্টেইন…

আপনি অন্যদের যেসব লেখা পড়েছেন তার দ্বারা পঠনকালীন সময়ের লেখা-লেখনীতে কি প্রভাবিত হতেন বলে মনে হয়?

জয়েস কর্তৃক ইউলিসিস লেখার আগ পর্যন্ত এমনটা হয়নি। কিন্তু ঐ দিনগুলোতে আমাদের জানা অনেক শব্দই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠেছিলো। এমনকি কখনো কখনো একটি একক শব্দের জন্যেও আমাদের সংগ্রাম করতে হতো। জয়েসের কাজের প্রভাবে বদলে গিয়েছিলো আমাদের সেসব পরিস্থিতি। আমাদের পক্ষে সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে সামনে আসা সম্ভব হয়ে উঠেছিলো।

শেষের দিকের বছরগুলোতে মনে হচ্ছে আপনি অন্যান্য লেখকদের এড়িয়ে চলছেন। এর কোনো কারণ রয়েছে কি?

এটা আসলে খুবই জটিল একটি বিষয়। আপনি লেখালেখিতে যতোটা মগ্ন হবেন, ততোটাই আপনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বেন। আপনার পুরোনো ভালো বন্ধুদের অনেকেই মারা যাবে, অনেকেই অন্যত্র চলে যাবে, আপনি খুব অল্প সময়ই তাদের কাছে পাবেন। কিন্তু আপনি যখন গভীরভাবে মগ্ন হয়ে লিখবেন, আপনার মনে হবে তাদের সাথে আগের মতোই পুরোনো দিনের কোনো ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।

লেখালেখিতে যেসব অগ্রজদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি শিখেছেন তাদের নাম বলতে গেলে কোন নামগুলো প্রথমে বলবেন?

মার্ক টোয়েন, ফ্লবেয়ার, স্তাঁদাল, বাক, তুর্গেনিভ, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, চেখভ, অ্যান্ড্রু মার্ভেল, জন ডান, মোঁপাসা, কিপলিং, থরো, শেক্সপিয়র, দান্তে, ভার্জিল, হেরোনিমাস, ব্রুঘেল, গয়া, ভ্যান ঘগ, সান জুয়ান দে লা ক্রুজ, গঙ্গোরা- সবার কথা বলতে গেলে আমার একদিন লেগে যাবে।

আপনার দেয়া এই তালিকার লেখকদের লেখা কি পুনঃপাঠ করেছেন, যেমন ধরুন মার্ক টোয়েন?

টোয়েনকে বুঝতে হলে তাঁর কাজের সাথে আপনাকে দু’তিন বছর থাকতে হবে। প্রতিবছরই আমি শেক্সপিয়রের কিছু লেখা পাঠ করি, লিয়ার তো সব সময়ই। এটা পড়লে আমি সবসময় উজ্জীবিত থাকি।

পড়াটা তখন একসাথে পেশা ও আনন্দের উৎস হয়ে উঠে?

আমি সব সময়ই পড়ি। পড়ার জন্যে আমি আমার কিছু সময় বরাদ্দ রাখি যাতে সেগুলো সবসময় আমাকে প্রণোদনা দেয়।

আপনি কখনো অন্য কারো পাণ্ডুলিপি পড়েছেন?

এই কাজটা করলে আপনি বিপদে পড়বেন যদি উক্ত লেখকের সাথে আপনার পরিচয় না থাকে। কয়েক বছর আগে আমি একজন লোক কর্তৃক প্লেজিয়ারিজমের (নকল) অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলাম। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, আমি ‘ফর হুম দ্যা বেল টোলস’-এ নাকি তার অগ্রন্থিত লেখা হতে দৃশ্য নিয়েছি। সে এই দৃশ্যটি কোনো এক হলিউড পার্টিতে পড়েছিলো। আমিও নাকি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। পরবর্তীতে আমরা আদালতে গেলাম। অবশ্য মামলায় আমরা জিতেছিলাম। লোকটা কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

আপনার উপন্যাসে রূপকের ব্যবহার সম্পর্কে বলবেন?

আমার ধারণা আমার লেখায় রূপকের ব্যবহার আছে, যেহেতু সমালোচকরা সেগুলো খুঁজে পাচ্ছেন। আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমি এসব নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না। এটা অনুসন্ধিৎসুদেরকে বঞ্চিত করে। যদি পাঁচ, ছয় বা তারও অধিক ভালো মানের ব্যাখ্যাকারী এই কাজটা করতে পারে তবে আমি কেন তাদের বিঘ্ন ঘটাবো!  আমি যা কিছু লিখি তার যতটুকু পড়বেন, পড়ার আনন্দ নিয়ে পড়ুন। এই আনন্দের অধিক যতটুক লেখায় খুঁজে পাবেন তা দিয়েই আপনার পঠনপাঠন মূল্যায়িত হবে।

লেখালেখি শুরুর পূর্বেই কি আপনি পুরো বিষয়টি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করে সেই ছক অনুযায়ী অগ্রসর হন?

‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ লিখতে গিয়ে আমি একটি সমস্যা বোধ করেছিলাম। এই সমস্যাটি তখন প্রায় প্রতিদিনই বোধ করতাম এবং দিনগুলোকে কোনোভাবে চালিয়ে নিতাম। ঐ সময়টাতে আমি আমার মূল কাজটা উপলব্ধি করতাম, আমি জানতাম আমি কি করতে চাচ্ছি। কিন্তু প্রতিদিন লেখালেখিতে যা ঘটতো তা আমাকে খুঁজে বের করে লিখতে হতো।

একটি বিশেষ ধরনের সাহিত্যকর্ম হতে আরেক ধরনের সাহিত্যকর্মে যাওয়া কি আপনার জন্য সহজসাধ্য ছিলো,  নাকি যে কোনো লেখা শুরু করলে শেষ করা পর্যন্ত চালিয়ে যেতেন?

ব্যাপারটা এমন যে, ধরুন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থামিয়ে রেখে আপনি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছেন, এতে আপনার মূর্খতা প্রমাণিত হবে এবং এজন্য আপনার বড় রকমের জরিমানা হওয়া উচিৎ।

আপনি কি অন্য লেখকদেরকে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন?

কখনোই না। তবে আমি মৃত লেখকদের চেয়ে ভালো লিখতে চাইতাম। এখন আমি আমার সেরাটা লিখতে চেষ্টা করি। মাঝে-মধ্যে আমার ভাগ্য  এতোটা সুপ্রসন্ন হয় যে আমি আমার সামর্থের চেয়েও বেশি ভালো লিখে ফেলি।

একজন লেখকের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার লেখনীর ক্ষমতা হ্রাস পায় বলে কি মনে করেন?

এমনটা আমার জানা নেই। যারা জানে তারা কী করতে যাচ্ছে, তারা তাদের সম্পূর্ণ আয়ুষ্কালে টিকে থাকে।

আমরা চরিত্র নিয়ে আলোচনা করিনি। আপনি কি আপনার লেখার চরিত্রগুলো বাস্তব জীবন হতেই তুলে আনেন?

অবশ্যই নয়। কিছুসংখ্যক চরিত্র বাস্তব জীবন হতে উঠে আসে। অধিকাংশই উঠে আসে আমার জ্ঞান, বোঝাপড়া আর অভিজ্ঞতা থেকে।

বাস্তব জীবন হতে নেয়া চরিত্র কিভাবে কথাশিল্পের চরিত্র হয়ে ওঠে এ সম্পর্কে বলবেন কি?

আমি প্রায়শ যেমনটা বলে থাকি, ঠিক সেভাবেই যদি এ প্রশ্নের উত্তর দিই তবে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে একজন নিন্দুক আইনজীবীও একটি চমৎকার হ্যান্ডবুক বানাতে পারবেন।

আপনার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনটির প্রতি বিশেষ ভালোবাসা অনুভব করেন?

সে এক দীর্ঘ তালিকা…

লেখায় কোনো সংশোধন চান না- এমন অনুভূতি নিয়ে কি আনন্দের সাথে নিজের লেখা পড়তে পারেন?

নিজেকে উৎফুল্ল রাখার প্রয়োজনে মাঝে-মধ্যে সেগুলো পড়ি। বিশেষ করে যখন লেখালেখিটা কঠিন বোধ হয়। এবং আমি স্বীকার করার চেষ্টা করি, লেখালেখিটা সবসময়ই কঠিন এবং মাঝে-মধ্যে সেটা অনেকটা অসম্ভবের কাছাকাছি হয়ে ওঠে।

আপনি কিভাবে চরিত্রের নামকরণ করে থাকেন?

আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকে ভালো নামকরণের জন্যে।

গল্প লেখার ক্ষেত্রে কি আপনি আগেই গল্পের শিরোনাম নির্ধারণ করেন?

না, আমি লেখা শেষ করার পর নামের একটি তালিকা তৈরি করি। মাঝেমধ্যে এই সংখ্যাটি একশোও হয়ে উঠেছে। তারপর সেগুলো বাছাই শুরু করি এবং কখনো কখনো বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ দিতে দিতে সবগুলো নামই বাদ দিয়ে দিই।

যখন আপনি লেখেন না, আপনি একজন পর্যবেক্ষক হয়ে ওঠেন, কিছু একটা খোঁজ করেন যা পরবর্তীতে ব্যবহার করা যেতে পারে?

নিশ্চয়ই। একজন লেখক পর্যবেক্ষণ বন্ধ করে দিলে ফুরিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি শুধু এর ব্যবহার কিভাবে করা যাবে তা ভেবেই পর্যবেক্ষণ করবেন না। একজন লেখক যদি কোনো কিছু সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা না রেখে লেখেন তবে তাতে গলদ থেকে যাবে।

আমি যদি প্রতিটি চরিত্র ও তাদের পরিপার্শ্বকে তুলে ধরতাম তবে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি হতে পারতো। অন্য লেখকদের অনেকেই এটি প্রায়শ খুব চমৎকারভাবে করে থাকেন। আমি ব্যতিক্রম কিছু করতে চেয়েছি। প্রথমে আমি অপ্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ বাদ দিয়েছি যাতে পাঠক যা পড়বেন তার মাধ্যমে তিনি অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। এটা করা খুব কঠিন এবং এজন্যে আমাকে প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে।

আপনি কি কখনো এমন কোনো অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন যা সম্পর্কে আপনার কোনো ব্যক্তিগত ধারণা ছিলো না?

এটি একটি অদ্ভুত প্রশ্ন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলতে যদি আপনি জাগতিক অভিজ্ঞতাকে বোঝান তবে তার জবাব অবশ্যই ইতিবাচক।

আপনার লেখায় কি কোনো উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্য নিহিত থাকে?

‘উপদেশমূলক’ শব্দটি অতি ব্যবহারের ফলে নষ্ট হয়ে গেছে। ‘ডেথ ইন দ্যা আফটারনুন’ও কিন্তু একটি নির্দেশনামূলক গ্রন্থ।

বলা হয়ে থাকে, লেখক তাঁর প্রতিটি কাজে একটি বড়জোর দুটি ধারণা সম্পৃক্ত করে থাকেন। আপনার লেখার ক্ষেত্রে এমনটা হয় কি?

কে বলেছে এটা? যে এটা বলেছে সম্ভবত তার একটি বা দুটি ধারণাই আছে।

সবশেষে একটি মৌলিক প্রশ্ন, একজন সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে আপনার সৃষ্ট শিল্পের কার্যকারিতা কতটুকু বলে মনে করেন?

এসব নিয়ে বিহ্বল হও কেন? যা কিছু ঘটেছে, যা কিছু বিরাজমান এবং যা কিছু তোমার জানা ও অজানা; সবকিছু মিলিয়ে তোমার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সত্যের চেয়ে অধিকতর সত্য ও প্রাণবন্ত নতুন কিছু করতে পারো। এবং তুমি যদি তা করতে পারো তবে তুমি সেটিকে অমরত্ব দান করলে। আর তুমি শুধু এজন্যেই লিখবে, অন্য কোনো কারণ তোমাকে জানতে হবে না। কিন্তু অবশিষ্ট কারণগুলো কি সবারই জানা নয়?

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close