Home অনুবাদ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > মৃতদের প্রাকৃতিক ইতিহাস >> ছোটগল্প >>> শহীদুল জহির অনূদিত

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > মৃতদের প্রাকৃতিক ইতিহাস >> ছোটগল্প >>> শহীদুল জহির অনূদিত

প্রকাশঃ September 22, 2017

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > মৃতদের প্রাকৃতিক ইতিহাস >> ছোটগল্প >>> শহীদুল জহির অনূদিত
0
0

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > মৃতদের প্রাকৃতিক ইতিহাস >> ছোটগল্প >>> শহীদুল জহির অনূদিত

আমার সব সময় মনে হয়েছে যে, প্রকৃতি-বিশারদদের পর্যবেক্ষণের এলাকা হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পাটাগোনিয়ার ফুল এবং প্রাণী সম্পর্কে মৃত ডব্লিউ এইচ হাডসনের দেয়া আকর্ষণীয় এবং সুস্থ বিবরণ আমরা পেয়েছি। রেভারেন্ড গিলবার্ট হোয়াইট খুব হৃদয়গ্রাহী করে হুপু পাখিদের সোলবোর্নে আগমন সম্পর্কে লিখেছেন, যে আগমন বা সফর মোটেই নিয়মিত নয়, বরং তা কখনো-সখনো ঘটে। বিশপ স্ট্যানলি আমাদের দিয়েছেন মূল্যবান, জনপ্রিয় একটি গ্রন্থ, পাখিদের পরিচিত ইতিহাস। আমরা কি মৃতদের সম্পর্কে কিছু নিয়ম এবং মজার তথ্য পাঠকদের অবহিত করার আশা করতে পারি না? আমার মনে হয় পারি। যখন মুংগো পার্ক নামক সেই অধ্যবসায়ী ভ্ৰমণকারী, তার ভ্রমণের এক পর্যায়ে আফ্রিকার বিজন ও বিস্তৃত মরুভূমিতে মূর্ছিত হয়ে পড়েছিলেন, একা এবং নগ্ন এবং ভেবেছিলেন যে তার দিন শেষ হয়ে গেছে এবং যখন শুয়ে পড়ে মরে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছুই করার ছিল না বলে তার মনে হয়েছিল, তখন একটি অসাধারণ কান্তিময় ঘাসফুল তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। “যদিও পুরো গাছটি”, তিনি বলেন, “আমার হাতের একটি আঙুলের চেয়ে বড় ছিল না, আমি এর শিকড়, পাতা এবং বীজকোষের অতিসূক্ষ্ম আকৃতি ও গড়ন অবলোকন করে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। সেই কোষের অতি সূক্ষ্ণ আকৃতি ও গড়ন অবলোকন করে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। সেই অস্তিত্ব, যে পৃথিবীর এই অজানা প্রান্তে এমন একটি জিনিস লাগিয়েছে, পানি সিঞ্চন করেছে এবং তাতে আকৃতিগত পূর্ণাঙ্গতা এনেছে, যে জিনিসটি বাহ্যত খুব কম গুরুত্বের মনে হয়; সেই অস্তিত্বের পক্ষে কি তার নিজের আদলে গড়া জীবের যন্ত্রণাময় পরিস্থিতির প্রতি নিরুদ্বিগ্নভাবে তাকানো সম্ভব? নিশ্চয়ই না। এ ধরনের ভাবনা আমাকে হতাশ করে, আমি উঠে দাড়াই এবং ক্ষুধা ও ক্লান্তিকে অস্বীকার করে সম্মুখে অগ্রসর হই, এ বিষয়ে আশ্বস্ত হয়ে যে সামনেই রয়েছে সাহায্য এবং আমাকে নিরাশ হতে হয়নি। বিশপ স্ট্যালিন যেভাবে বলেন, সেরকম বিস্মিত হওয়া এবং প্রশংসা করার ক্ষমতা নিয়ে, সেই বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং আশার বিস্তার না ঘটিয়ে প্রাকৃতিক ইতিহাসের কোনো শাখা অধ্যয়ন করা যায় কি; যে বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং আশা জীবনের বিজনতার ভেতর দিয়ে পরিক্রমণের জন্য আমাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন? কাজেই মৃতদের কাছ থেকে আমরা কী ধরনের প্রেরণা পেতে পারি, সেটা দেখা যেতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বেলায় মৃতরা সাধারণত যে পুরুষ; যদিও এটা পশুদের বেলায় সত্য নয়, আমি অনেকবার মৃত ঘোড়াদের ভেতর মাদি ঘোড়া দেখেছি। যুদ্ধক্ষেত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, একমাত্র সেখানেই প্রকৃতবিদরা মৃত খচ্চর পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। বেসামরিক জীবনে, আমার কুড়ি বছরের পর্যবেক্ষণে কখনো কোনো মৃত খচ্চর দেখিনি এবং আমি এই সন্দেহ করতে শুরু করি যে, এই প্রাণীগুলো আদৌ মরণশীল কি না। কখনো কোনো বিরল সময়ে মৃত বলে মনে হয়েছে এমন খচ্চর আমি দেখেছি, কিন্তু কাছ থেকে দেখে বোঝা গেছে যে ওগুলো জীবিত; দেহকে পরিপূর্ণরূপে শিথিল করে দেয়ার এদের ক্ষমতার ফলে মনে হয়েছিল যে, এগুলো মৃত। কিন্তু যুদ্ধে এই জীবনগুলো অধিকতর সাধারণ এবং কম কষ্টসহিষ্ণু ঘোড়াদের মতো একইভাবে মারা পড়ত। বেশির ভাগ খচ্চর, যেগুলোকে আমি মৃত দেখতে পাই, ছিল খাড়া উতরাইয়ের পাদদেশে; রাস্তার চলাচলের বিঘ্ন দূর করার জন্য এগুলোকে ঠেলে ফেলে দেয়া হয়েছিল। পাহাড়ি এলাকায় এই মৃত খচ্চরের দেহ মানানসই দৃশ্য বলে মনে হতো, কারণ এখানে এদের উপস্থিতির বিষয়ে সবাই অভ্যস্ত ছিল; এবং এখানে এদেরকে অনেক কম বিসদৃশ লাগত, যেমন পরবর্তী সময়ে স্মির্নায় লেগেছিল। স্মির্নায় গ্রিকরা তাদের মালবাহী পশুদের ডুবিয়ে মারার জন্য হাঁটু ভেঙে জেটির উপর থেকে অল্প পানিতে ঠেলে ফেলে দেয়। সেখানে যে সংখ্যায় হাঁটু-ভাঙা ঘোড়া এবং খচ্চর অল্প পানিতে ডুবে মরছিল, সেই দৃশ্য তুলে ধরার জন্য গয়ার প্রয়োজন ছিল। যদিও আভিধানিক অর্থে বলতে গেলে, এই বিষয়টি ফুটিয়ে তোলার জন্য গয়ার প্রয়োজন ছিল এ কথা বলা যায় না, কারণ গয়া মাত্র একজনই ছিলেন, যিনি দীর্ঘকাল পূর্বে মারা গেছেন এবং এটা বলাও শক্ত, এই প্রাণীগুলোর ডাকার শক্তি থাকলে তারা তাদের এই দুর্দশার চিত্ররূপ দেয়ার জন্য গয়াকে ডাকত কি না। বরং খুব সম্ভবত, কথা বলতে পারলে তারা এমন কাউকে ডাকত যে তাদের এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ করতে পারত। মৃতদের লিঙ্গ সম্পর্কে সত্য হচ্ছে এই যে, সব মৃতই পুরুষ, এ দৃশ্যে লোকে এমন অভ্যস্ত হয়ে ওঠে যে, কোনো মৃত মহিলা দেখা বেদনাকর মনে হয়। ইতালীয় মিলানের গ্রাম এলাকায় অবস্থিত একটি গোলাবারুদের কারখানায় বিস্ফোরণের পর আমি মৃতদের সাধারণ লিঙ্গ পরিচয়ের পরিবর্তন হতে দেখি। আমরা পপলার গাছের ছায়াঘেরা রাস্তা দিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে যাই। এই রাস্তার দুই পাশে ছিল খানাখন্দ, যার ভেতর ছিল অনেক ক্ষুদ্ৰাকৃতির প্রাণী-জীবন, ট্রাকের সৃষ্ট ধুলোর কারণে যেগুলো আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। গোলাবারুদের কারখানাটি যেখানে ছিল, সেখানে পৌছার পর আমাদের কিছু অংশকে গোলাবারুদের বিশাল মজুদ পাহারা দেয়ার কাজে লাগানো হয়, সেগুলো কোনো কারণে বিস্ফোরিত হয়নি। অন্যদের নিয়োজিত করা হয় সংলগ্ন মাঠের ঘাসে লেগে যাওয়া আগুন নেভানোর কাজে। এই কাজ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর আমাদের নিকটের এবং আশপাশের মাঠগুলোতে মৃতদের সন্ধান করার হুকুম দেয়া হয়। আমরা অনেকগুলো মৃতদেহ খুঁজে বের করে সেগুলো একটি ভাঙাচোরা মর্গের ভেতরে রাখি। এই মৃতেরা পুরুষ নয়, নারী— এটা দেখে আমাদের যে মানসিক অভিঘাত হয়েছিল, সেটা আমার অকপটে স্বীকার করা দরকার। ইউরোপ-আমেরিকায় পরে বহু বছর ধরে মেয়েরা যেমন চুল ছোট করে রাখতে শুরু করে, তখনো তারা তেমন করতে শুরু করেনি এবং সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার ছিল লম্বা চুলের উপস্থিতি, কারণ যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা ছিল রীতিবহির্ভূত এবং তার চেয়েও বেদনাদায়ক ছিল কিছু কিছু ক্ষেত্রে লম্বা চুলের অনুপস্থিতি। আমার মনে আছে, আস্ত মৃতদেহের জন্য ভালোভাবে সন্ধান করার পর, আমরা সব টুকরো সংগ্রহ করে আনি, এরপর অনেকগুলো কারখানার জায়গাটা ঘিরে রাখা ভারী কাঁটাতারের বেড়ার উপর থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়। কারখানার যে অংশটি তখনো টিকে ছিল, সেখান থেকে আমরা যে অনেকগুলো টুকরো সংগ্ৰহ করি, সেগুলো দেখে উচ্চ বিস্ফোরকের শক্তি সম্পর্কে সহজেই ধারণা করা যায়। অনেকগুলো খণ্ডাংশ মাঠের ভেতর অনেক দূরে পাওয়া যায়, সেগুলো নিজেদের ওজনের কারণে অনেক দূরে ছুটে গিয়েছিল। মিলানে ফিরে আসার পর আমরা দু-একজন ঘটনাটি সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। আমরা এ বিষয়ে একমত হয়েছিলাম যে, ঘটনার আবহের বিশাল অবাস্তবতা এবং কোনো আহত লোক পাওয়া না যাওয়ার ফলে ঘটনাটিকে যতটা ভয়াবহ লাগা স্বাভাবিক ছিল ততটা ভয়াবহ লাগেনি। তা ছাড়া এর আকস্মিকতা এবং মৃতদের বহন এবং নাড়াচাড়া করায় কম ঝামেলা, ঘটনাটিকে যুদ্ধে মাঠের সাধারণ অভিজ্ঞতার চেয়ে ব্যতিক্রমী করে তুলেছিল। লোম্বার্ডের সুন্দর, যদিও ধূলি-ধূসরিত, গ্রামাঞ্চলের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ফেরার আনন্দ আমাদের এই অপ্রীতিকর কাজের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করেছিল। আমরা যখন অভিমত বিনিময় করছিলাম, তখন আমরা সবাই একমত হই যে, আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার পূর্বে যে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল, তা বিপুল অবিস্ফোরিত গোলাবারুদে লেগে যাওয়ার আগেই দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। আমরা এ বিষয়েও একমত হই যে, দেহের খণ্ডাংশ কুড়িয়ে আনা একটি অসাধারণ ঘটনা ছিল। এটা খুবই বিহ্বলকর ব্যাপার ছিল যে, মানুষের দেহ বিস্ফোরণে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং সেই খণ্ডায়ন ঘটবে দেহগত রেখা ধরে নয় এবং উচ্চ বিস্ফোরক গোলার খোলের বিস্ফোরণের মতো উল্টোপাল্টাভাবে। একজন প্রকৃতিবিদ তার পর্যবেক্ষণে যথার্থতা আনার জন্য, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতর তার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রিত করতে পারে এবং আমি ১৯১৮ সালের জুন মাসে ইতালিতে অস্ট্রিয়ান আক্রমণের পরের সময়টিকে প্রথমে বেছে নেব, কারণ এ সময় মৃতের উপস্থিতির সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। এ সময় একটি পশ্চাদপসরণের পর হৃতভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য একটি পুনরাক্রমণ ঘটে, যাতে করে যুদ্ধের শেষে মৃতদের উপস্থিতির বিষয়টি ছাড়া অবস্থানগত পরিস্থিতি আগের মতো রাখা যায়। মৃতদের কবর না দেয়া পর্যন্ত, তাদের চেহারা প্রতিদিন কিছুটা করে পাল্টায়। ককেশীয় প্রজাতির মৃতদের গায়ের রং বদলে সাদা থেকে হলুদ হয়, হলুদ থেকে সবুজ এবং তারপর কালো হয়। উত্তাপের ভেতর যথেষ্ট দীর্ঘ সময় ফেলে রাখলে মাংস, বিশেষ করে যেসব জায়গা কেটে অথবা ছড়ে গেছে, দেখতে কালো কয়লার মতো হয়ে ওঠে এবং এতে দৃশ্যত আলকাতরার মতো বর্ণের ঝিলিক দেখা দেয়। মৃতরা প্রতিদিন বড় হতে থাকে যতক্ষণ না তারা ফুলে তাদের ইউনিফর্মের সমান হয়ে ওঠে এবং মনে হয় যে, তারা ফেটে পড়ছে। দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আয়তনে অবিশ্বাস্য রকমে স্ফীত হয়ে উঠতে পারে এবং মুখমণ্ডল হয়ে উঠতে পারে একটি বেলুনের মতো টানটান এবং গোলাকার। ক্রমবর্ধমানভাবে স্ফীত হয়ে ওঠা মৃতদের চারপাশে যে পরিমাণ কাগজ ছড়িয়ে থাকে, সে এক আশ্চর্যের বিষয়। কবর দেয়ার প্রশ্ন দেখা দেয়ার আগে এরা যে চূড়ান্ত ভঙ্গিতে পড়ে থাকে সেটা নির্ভর করে তাদের ইউনিফর্মের পকেটের অবস্থান কোথায় তার ওপর। অস্ট্রীয় বাহিনীর এই পকেট ছিল তাদের আঁটো জামার পেছন দিকে। এর ফলে একটু সময় পর সব মৃতদের দেখা গেল উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, তাদের হিপ-পকেট দুটো টেনে বার করা এবং চারধারে ঘাসের উপর তাদের পকেটে যা কিছু ছিল, সেসব কাগজপত্র ছড়িয়ে রয়েছে। উত্তাপ, মাছি, ঘাসের উপর দেহের পড়ে থাকার ভঙ্গি এবং ছড়িয়ে থাকা কাগজের রাশি, এ সবই একজনের স্মৃতিতে থেকে যাওয়ার মতো। কিন্তু গরম আবহাওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রের ঘাণ কেমন হয়, তা মনে করা যায় না। আপনি হয়তো স্মরণ করতে পারবেন যে, সেখানে এরকম এরকম ঘাণ ছিল। কিন্তু এটাকে মনে করতে পারার

মতো কোনো কিছুই আর ঘটবে না। এটা কোনো সেনা রেজিমেন্টের ঘ্রাণের মতো নয়, যে ঘ্রাণ রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে আপনার কাছে ভেসে আসতে পারে, এবং আপনি তাকিয়ে সেই লোকটিকে দেখতে পারেন যে সেটা আপনার কাছে বহন করে এনেছে। কিন্তু অন্য জিনিসগুলো সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে গেছে, যেমন আপনি যখন ভালোবাসায় মগ্ন ছিলেন সেই সময় হারিয়ে গেছে; যা কিছু ঘটেছে তা আপনি মনে করতে পারেন, কিন্তু ইন্দ্ৰিয়ের যে অনুভূতি স্মরণে আনা যায় না। আমরা অবাক হয়ে ভাবতে পারি, সেই অধ্যবসায়ী ভ্ৰমণকারী মুংগো পার্ক গরম আবহাওয়ায় যুদ্ধের মাঠে, তার আত্মবিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কোন জিনিসের দিকে তাকিয়ে দেখতেন। জুনের শেষে এবং জুলাই মাসের গমের খেতে পপি ফুল ফুটত এবং তুতগাছ পরিপূর্ণরূপে ছেয়ে যেত পত্রপল্লবে, পাতার আচ্ছাদনের ফাঁক দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে কামানোর নলের যে জায়গায় পেত, সেখান থেকে তরঙ্গের মতো উষ্ণতা বিকিরিত হতে দেখা যেত। যেখানে মাস্টার্ডে গ্যাসের শেল পড়েছিল, সেখানে গর্তের কিনারগুলো দেখতে উজ্জ্বল হলদে বর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং সাধারণ বাড়িঘর যেগুলো ভেঙে গিয়েছিল, সেগুলো তার পরও বোমার আঘাত লাগা দালানকোঠার চেয়ে দেখতে সুন্দর ছিল। কিন্তু গ্রীষ্মের প্রথম দিককার সেই বাতাসে খুব কমসংখ্যক ভ্ৰমণকারীই ভালোমতো লম্বা করে শ্বাস নিতে পারবে এবং মুংগো পার্কের মতো, তার নিজের আদলে প্রস্তুত যারা, তাদের কথা ভাববে। মৃতদের সম্পর্কে আপনি যে জিনিসটি দেখবেন তা হচ্ছে এই যে, আঘাত পাওয়ার ফলে তারা পশুর মতো মরেছে। কেউ কেউ দ্রুত এমন আঘাতের ফলে মারা গেছে যে, আপনার মনে হবে, এতে একটি খরগোশও মরত না। তারা খুব সামান্য আঘাতে মারা গেছে, যেমন কখনো কখনো ছররা গুলির তিন-চারটি ছোট ছোট দানার আঘাতে, যখন মনে হয় যেন চামড়াও ফাটেনি, খরগোশ মারা যায়। অন্যরা মরে যেন বিড়ালের মতো; খুলির হাড় ভেঙে মগজের ভেতর লোহার টুকরো ঢুকে গেছে, এরা দুই দিন পর্যন্ত জীবিত পড়ে তাকে, সেইসব বিড়ালের মতো যারা মাথায় গুলি খেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কয়লার স্তূপের ভেতর গিয়ে ঢোকে এবং মুণ্ড কেটে বিচ্ছিন্ন না করে ফেলা পর্যন্ত মরতে চায় না। হয়তো বা বিড়াল তখনো মরে না, কারণ, বলা হয় যে, বিড়ালের নয়টি জান। আমি জানি না, তবে মনে হয়, অধিকাংশ মানুষ পশুর মতো মরে, মানুষের মতো নয়। আমি কখনোই তথাকথিত স্বাভাবিক মৃত্যু দেখিনি, কাজেই এজন্য আমি যুদ্ধকে দায়ী করেছি এবং অধ্যবসায়ী ভ্ৰমণকারী মুংগো পার্কের মতো বিশ্বাস করেছি যে, এখানে কিছু একটা আছে, সর্বদা অনুপস্থিত কিছু একটা এবং অতঃপর আমি এরকম কিছু একটা দেখতে পাই। রক্তক্ষরণে মৃত্যু ছাড়া যেটাকে খুব খারাপ বলা যায় না, আমি কেবল একটি স্বাভাবিক মৃত্যু দেখেছিলাম, সেটা ছিল স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। এই রোগ হলে শ্লেষ্মায় ডুবে আপনার দম আটকে আসবে এবং রোগীর যে মৃত্যু হয়েছে সেটা আপনি কীভাবে বুঝবেন; আর পুরুষালি শক্তি সত্ত্বেও, শেষাবস্থায় সে পুনরায় ছোট্ট শিশুর মতো হয়ে উঠবে, একটি বিরাট চূড়ান্ত হলদে জলপ্রপাতের ধারায় সে তোয়ালে এবং চাদর পূর্ণ করে ফেলবে এবং তার চলে যাওয়ার পরও বইতে এবং ঝরে পড়তে থাকবে। কাজেই আমি এখন কোনো একজন স্বঘোষিত মানববাদীর মৃত্যু অবলোকন করতে চাই কারণ, মুংগো পার্ক অথবা আমার মতো একজন অধ্যবসায়ী ভ্ৰমণকারী বেঁচে থাকবে, অথবা হয়তো বেঁচে থাকবে এই সাহিত্য-সম্প্রদায়ের একজনের সত্যিকার মৃত্যু এবং তারা যে মহান প্রস্থান সাধন করেন, তা দেখার জন্য। প্রকৃতিবিদ হিসেবে আমার চিন্তাভাবনার সময় এটা আমার মনে হয়েছে যে, যদিও শোভনতা একটি চমৎকার জিনিস, প্রজাতির টিকে থাকার বিষয়টি অব্যাহত রাখতে হলে কিছু লোককে নিশ্চয়ই অশোভন হতে হবে যেহেতু প্রজননের নির্ধারিত পদ্ধতিটি অশোভন এবং আমার মনে হয়েছে যে, এই লোকগুলো হচ্ছে এ-ই। অথবা ছিল এ-ই শিষ্ট সহাবস্থানের সন্তান। তবে তাদের যেভাবেই শুরু হয়ে থাক না কেন, আমি আশা করেছিলাম। এদের কয়েক জনের শেষ দেখার এবং কল্পনা করার; পোকা কীভাবে তাদের দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত নিবীৰ্যতার ভেতর ঢুকবে;– যখন তাদের খেয়ালি পুস্তিকাসমূহ ফেটে পড়েছে এবং তাদের সব লালসা পাদটীকায় পরিণত হয়েছে। মৃতদের প্রাকৃতিক ইতিহাসে এই স্বঘোষিত নাগরিকদের প্রসঙ্গ লেখাটা বৈধ হলেও, এটা অন্যান্য মৃতদের প্রতি অবিচার হবে, যারা তাদের যৌবনে মৃত্যুবরণ করেছিল, কোনো ইচ্ছের কারণে নয়; যারা কোনো সাময়িকীর মালিক ছিল না এবং যাদের অনেকে নিঃসন্দেহে কখনো এমনকি কোনো রিভিউ পাঠ করেনি— যারা উষ্ণ আবহাওয়ার ভেতর পড়েছিল, তাদের মুখ যেখানে ছিল সেখানে আধ-পোয়া কিলবিলে পোকাসহ। মৃতরা যে সর্বদা উষ্ণ আবহাওয়ায় থাকত তা নয়; বেশির ভাগ সময় বৃষ্টি পড়ত। যখন তারা বৃষ্টির ভেতর মাটিতে পড়ে থাকত, বৃষ্টি তাদের মুখ ধুয়ে পরিষ্কার করত এবং কবর দেয়ার পর বৃষ্টি তাদের কবরের মাটি নরম করে তুলত এবং কখনো কখনো ক্রমাগত বৃষ্টির ধারায় মাটি গলে কাদা হয়ে যেত এবং লাশ বের হয়ে ভেসে উঠত, তখন সেই লাশ আবার দাফন করতে হতো। অথবা শীতকালে পাহাড়ি এলাকায় তুষারের ভেতর লাশ রেখে দিতে হতো, তারপর বসন্তে তুষার গলে তখন সেই লাশ অন্য কাউকে দাফন করতে হতো। পাহাড়গুলোতে অনেক সুন্দর সুন্দর কবরস্থান ছিল; যুদ্ধের সময়, পাহাড়ি এলাকায় যুদ্ধ সবচেয়ে সুন্দর এবং এইসব কবরস্থানের একটিতে পোকোল নামক স্থানে আরো একজন জেনারেলকে সমাহিত করেছিল, যার মাথায় গোপন বন্দুকধারীর বন্দুকের গুলি লাগে। এখানেই কিছু লেখক ভুল করেন, যখন তারা বই লেখেন এবং তার নাম দেন, ‘জেনারেলরা বিছানায় মৃত্যুবরণ করে’, কারণ এই সেনাপতিটি উঁচু পর্বতের উপর তুষারের ভেতর খোড়া পরিখায় মারা গিয়েছিল, তখন তার মাথায় ছিল ঈগলের পালক বসানো একটি আলাইনীয় হ্যাট এবং তার মাথার সামনে ছিল একটি ছিদ্র, যার ভেতর হাতের কড়ে আঙুলও প্রবেশ করানো সম্ভবপর ছিল না, আর মাথার পেছনে একটি হা করা গর্ত, যার ভেতর হাতের মুঠো প্রবেশ করিয়ে দেয়া যেত; এবং তুষারের উপর ছিল প্রচুর রক্ত। সে ছিল দারুণ ভালো একজন সেনাপতি একই রকম ভালো ছিল জেনারেল ভন ব্যের, যে কাপোরেট্টোর যুদ্ধে ব্যাভেরীয় আলপোকৰ্প বাহিনীর অধিনায়ক ছিল; নিজ সেনাদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের আগেই গাড়ি চালিয়ে ইউনাইনে গিয়ে পৌঁছালে, ইতালি বাহিনীর পশ্চাতের সেনাদের হাতে সে তার স্টাফ কারের ভেতর নিহত হয়। কাজেই বিষয়টি সম্পর্কে একধরনের সঠিকতা আনতে হলে এইসব পুস্তকের নাম হওয়া উচিত, ‘সেনাপতিরা সাধারণত বিছানায় মৃত্যুবরণ করে’।

পাহাড়ের উপর গোলাবর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আড়ালে নিহিত চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে মৃতদের ওপর কখনো কখনো তুষার পড়ে। মাটি জমে শক্ত হয়ে যাওয়ার আগেই পাহাড়ের গা কেটে বানানো গুহার ভেতর এই মৃতদের নিয়ে গিয়ে রাখা হয়। এই গুহার ভেতর একজন লোক ছিল, একটি ফুলের টব যেমন চূৰ্ণ হয় তেমনভাবে তার মাথা চূৰ্ণ হয়ে গিয়েছিল। যদিও মাথার চামড়া এবং দক্ষতার সঙ্গে বাঁধা এবং এখন শুকিয়ে যাওয়া ব্যান্ডেজের কারণে তার বিচূর্ণ খুলি একত্রই ছিল। মগজের ভেতর প্রবিষ্ট একখণ্ড ইস্পাতের কারণে তার গুলিয়ে যাওয়া মস্তিষ্ক-কাঠামো নিয়ে সে একটি দিন, একটি রাত এবং একটি দিন পড়ে থাকে। স্ট্রেচার বাহকরা চিকিৎসককে ভেতরে গিয়ে তাকে দেখে আসতে বলে। তারা প্রতিবার যখন গুহার ভেতর যায়, তাকে দেখতে পায় এবং এমনকি তার দিকে না তাকিয়েও তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে। কাঁদানে গ্যাসের কারণে ডাক্তারের চোখ ছিল লাল, ফোলা এবং প্রায় বুঁজে আসা। সে লোকটি দুবার দেখে, একবার দিনের বেলায়, অন্য আর একবার টর্চলাইটের আলোয়; এটাও গয়ার একটি ভালো ইচিং হতে পারত, এখানে টর্চলাইটের আলোয় এই পরিদর্শনকে বোঝাচ্ছি। স্ট্রেচার বাহকরা যখন বলে যে লোকটি বেঁচে আছে, তাকে দ্বিতীয়বার দেখে ডাক্তারের তা বিশ্বাস হয়। তোমরা আমাকে এ সম্পর্কে কী করতে বলো? সে জিজ্ঞেস করে। কোনো কিছু করা হোক তা তারা চায়নি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তারা তাকে বের করে এনে গুরুতরভাবে আহতদের সঙ্গে রাখার অনুমতি চায়। ‘না, না, না!’ বলে ডাক্তার, যে খুব ব্যস্ত ছিল। ব্যাপারটা কী? তোমরা কি ওকে ভয় পাচ্ছ? মৃতদের ভেতর ওর শব্দ শুনতে আমাদের ভালো লাগছে না। ওর দিকে কান দিয়ো না। ওকে যদি বের করে আনো, তাহলে ওকে তোমাদের আগের জায়গায় ফেরত বয়ে নিয়ে যেতে হবে।” “আমরা তাতে কিছু মনে করব না, ক্যাপ্টেন ডাক্তার।” “না”, ডাক্তার বলে, “না, তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ না যে, আমি মানা করছি।” “আপনি কেন ওকে মরফিনের একটি বেশি মাত্রার ডোজ দেন না?” গোলন্দাজ বাহিনীর একজন অফিসার বলে, যে তার বাহুর আঘাতে ব্যান্ডেজ বাধার জন্য অপেক্ষা করছিল। “আপনার কি মনে হয়, আমার মরফিনের এ ছাড়া অন্য কোনো কাজ নাই? আমাকে মরফিন ছাড়া অস্ত্ৰোপচার করতে হোক, আপনি কি এটা চান। আপনার কাছে তো পিস্তল আছে, আপনি নিজে বরং ওকে গুলি করুন।” “ওকে ইতিমধ্যেই গুলি করা হয়েছে”, অফিসারটি বলে, “আপনাদের কোনো ডাক্তারকে গুলি করা হলে, আপনি অন্য রকম ব্যবহার করতেন।” “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ”, ডাক্তার একটি ফোরসেপ বাতাসে নেড়ে বলে, “হাজারো ধন্যবাদ।” কিন্তু এই চোখগুলোর বেলায়? ডাক্তার তার নিজের চোখের দিকে ফোরসেপ দিয়ে ইঙ্গিত করে বলে, “এগুলোকে আপনার কেমন লাগছে?” “কাদানে গ্যাস। এটা কাঁদানে গ্যাস, আমরা এটাকে বলি, সৌভাগ্য।” “কারণ, তাহলে আপনারা যুদ্ধের সম্মুখক্ষেত্র ত্যাগ করতে পারেন, ডাক্তার বলে, “কারণ, আপনারা এখানে কাঁদানে গ্যাস নিয়ে দৌড়ে আসতে পারেন উপশমের জন্য; আপনারা আপনাদের চোখে পেয়াজ ঘষেন৷” “আপনি আপনার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আমি খেয়াল করিনি যে, আপনি অপমান করার চেষ্টা করছেন; আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” তখন স্ট্রেচার বাহকরা এসে প্রবেশ করে। “ক্যাপ্টেন ডাক্তার”, তাদের একজন বলে, “বের হয়ে যাও এখান থেকে”, ডাক্তার বলে। তারা বের হয়ে যায়। “হতভাগ্য লোকটিকে আমি গুলি করব,” গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসারটি বলে, “আমি নিষ্ঠুর মানুষ নই, আমি ওকে কষ্ট পেতে দেব না।” “তাহলে ওকে গুলি করুন”, ডাক্তার বলে, “ওকে গুলি করুন, দায়িত্ব নিন। আমি রিপোর্ট করব; আহত হয়েছিল, আরোগ্য-পরিচর্যা কেন্দ্ৰে গোলন্দাজ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট গুলি করে। গুলি করুন, যান গুলি করুন ওকে৷” “আপনি মানুষ না।” “আমার কাজ হচ্ছে আহতদের শুশ্রুষা করা, তাদেরকে হত্যা করা নয়; সেটা গোলন্দাজ বাহিনীর জেন্টলম্যানদের কাজ।” “এর জন্য তাহলে আপনি অনুভব করছেন না কেন?” “আমি তা করেছি; যা করা সম্ভব আমি তার সবকিছু করেছি।” “ওকে আপনি কেবল্ রেলে করে নিচে পাঠিয়ে দিচ্ছেন না কেন?” “আমাকে প্রশ্ন করার আপনি কে?” “আপনি কি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আপনি কি এই পরিচর্যা কক্ষের নিয়ন্ত্ৰক হিসেবে আছেন? দয়া করে উত্তর দিন।” গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসারটি কিছু বলে না। কক্ষে উপস্থিত অন্য সবাই ছিল সৈনিক, সেখানে আর কোনো অফিসার ছিল না। “উত্তর দিন”, ডাক্তার ফোরসেপ দিয়ে একটি সুঁচ ধরে বলে, “উত্তর দিন আমার কথার।” “চুতমারানির…” গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসারটি বলে। “তাহলে”, ডাক্তার বলে, “তাহলে আপনি এ কথা বললেন। ঠিক আছে, ঠিক আছে। দেখা যাবে।”

গোলন্দাজ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট উঠে দাঁড়ায় এবং তার দিকে এগিয়ে যায়।

‘শালা-”, সে বলে, “তোর মাকে…তোর বোনকে…।” ডাক্তার তস্তরিভর্তি আয়োডিন তার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে। লেফটেন্যান্ট তার দিকে এগোনোর সময় অন্ধ হয়ে গিয়ে তার পিস্তলের জন্য হাতড়ায়। ডাক্তার দ্রুত লাফিয়ে উঠে তার পেছনে চলে যায় এবং তাকে ধাক্কা দেয়, সে মেঝেতে পড়ে গেলে কয়েকবার লাথি মারে এবং দস্তানা-পরা হাত দিয়ে তার পিস্তল কুড়িয়ে নেয়। লেফটেন্যান্ট তার ভালো হাত দিয়ে চোখ ধরে বসে থাকে।

“আমি তোমাকে খুন করব,” সে বলে, “আমি চোখে দেখতে পাওয়ামাত্র তোমাকে খুন করব।”

“এখানে আমিই কর্তা”, ডাক্তার বলে, “এখন যেহেতু তুমি জেনেছ যে আমিই কর্তা; সব মাফ করে দেয়া গেল। তুমি আমাকে খুন করতে পারবে না, কারণ, তোমার পিস্তল আমার কাছে। সার্জেন্ট। অ্যাডজুটেন্ট। অ্যাডজুটেন্ট!”

“অ্যাডজুটেন্ট কেবল্-রেলগাড়ির ওখানে”, সার্জেন্ট বলে।

“এই অফিসারের চোখে অ্যালকোহল এবং পানি দিয়ে মুছে দাও, সে তার চোখে আয়োডিন ঢুকিয়েছে। হাত ধোয়ার জন্য আমাকে বেসিনটা এনে দাও। এরপর অফিসারাটিকে আমি দেখব।”

“তুমি আমাকে ছোবে না।”

“একে শক্ত করে ধরো, ও একটু প্ৰলাপ বকছে।”

স্ট্রেচার বাহকদের একজন ভেতরে আসে।

“ক্যাপ্টেন ডাক্তার।”

“কী চাও তুমি?”

“মুর্দাদের ঘরের ওই লোকটা—।”

“বের হয়ে যাও এখন থেকে৷”

“সে মারা গেছে ক্যাপ্টেন ডাক্তার। আমি মনে করেছিলাম যে, আপনি এটা জেনে খুশি হবেন।” “দেখবেন, হতভাগা লেফটেন্যান্ট? আমরা অর্থহীনভাবে ঝগড়া করছি, এই যুদ্ধের সময় অর্থহীনভাবে ঝগড়া করছি।” “চুতমারানির—”, গোলন্দাজ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট বলে। সে তখনো চোখে দেখতে পাচ্ছিল না, “তুমি আমাকে অন্ধ করে দিয়েছো।” “এটা কিছু না”, ডাক্তার বলে, “আপনার চোখ ঠিক হয়ে যাবে। এটা কিছু না, অর্থহীন ঝগড়া।” “আঁই আঁই আঁই”, লেফটেন্যান্ট হঠাৎ আর্তচিৎকার করে ওঠে, “তুমি আমাকে অন্ধ করে দিয়েছ, তুমি আমাকে অন্ধ করে দিয়েছ।” “ওকে শক্ত করে ধরো”, ডাক্তার বলে, “ওর খুব ব্যথা হচ্ছে ওকে শক্ত করে ধরে।”

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close