Home অনুবাদ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > শুভ্র হাতির মতো পাহাড়সারি >> ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : রনক জামান

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > শুভ্র হাতির মতো পাহাড়সারি >> ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : রনক জামান

প্রকাশঃ July 21, 2018

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > শুভ্র হাতির মতো পাহাড়সারি  >> ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : রনক জামান
0
0

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে > শুভ্র হাতির মতো পাহাড়সারি >> ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : রনক জামান

 

 

এব্রোর উপত্যকার পাশে সাদা সাদা পাহাড়গুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এইপাশে কোনো ছায়া নেই, গাছ নেই, দীর্ঘ রেললাইন, মাঝখানে স্টেশন। সেখানে এসে পড়ছে দালান আর পর্দাগুলোর উষ্ণ ছায়া। বাঁশের বাতা দিয়ে বানানো, বারের দরজা খোলা, পর্দা টাঙানো হয়েছে যাতে ভেতরে মাছি ঢুকতে না পারে। আমেরিকান লোকটি তার সাথের মহিলাকে নিয়ে ছায়ার নিচে একটা টেবিলে বসে আছে দালানগুলোর বাইরে। প্রচণ্ড গরম পড়েছে, বার্সেলোনা থেকে ট্রেন আসতে আরো চল্লিশ মিনিট সময় লাগবে। ট্রেন এসে মিনিট দুয়েক থামে এই জংশনটিতে, তারপর আবার মাদ্রিদের উদ্দেশে যাত্রা করে।
“কী খাওয়া যায়?” মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে। মাথার হ্যাট খুলে টেবিলে রাখে সে।
“বেশ গরম পড়েছে,” লোকটি বলে।
“চলো বিয়ার খাওয়া যাক।”
“ডস শ্যার্ভেস,” লোকটি পর্দার অন্যপাশে ডাকে।
“বড়টা?” দরজার কাছ থেকে এক মহিলা জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যাঁ, বড় দেখে দুটো দেবেন।”
দুই গ্লাস বিয়ার ও দুটো ফেল্ট প্যাড নিয়ে এলো মহিলাটি। প্যাড দুটো টেবিলে রেখে তার উপর বিয়ারের গ্লাস রাখে। লোকটিকে আর সঙ্গের মেয়েটিকে দেখে নেয় এক নজর। মেয়েটি তখন দূরের পাহাড়সারির দিকে তাকিয়ে আছে। সূর্যের আলোতে সাদা দেখাচ্ছে পাহাড়গুলোকে আর এলাকাটিকে লাগছে ধূসর বাদামী, রুক্ষ।
“ওগুলো দেখতে সাদা হাতির মতো,” মেয়েটি বলল।
“আমি সাদা হাতি দেখিনি কখনো,” লোকটি বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল।
“না, তা দেখোনি।”
“দেখতেও তো পারি,” লোকটি বলল। “তুমি বললেই তো হলো না।”
মেয়েটি পর্দার দিকে তাকায়। “ওরা এর উপর আঁকাআঁকি করেছে কিছু,” সে বলে। “এর অর্থ কী?”
“আনিস দেল টরো, এক ধরণের পানীয়।”
“আমরা চেখে দেখতে পারি, কী বলো?”
লোকটি পর্দার এ পাশ থেকেই “শুনুন” বলে ইশারা করে। বার থেকে সেই মহিলা বের হয়ে আসে। “আজ্ঞে?”
“দুটো আনিস দেল টরো দেবেন।”
“পানি মিশিয়ে?”
“তুমি কি পানিসহ চাও?”
“আমি জানি না,” মেয়েটি বলল। “পানিসহ কি ভালো হবে?”
“মন্দ না।”
“আপনি কি পানিসহ চান?” মহিলাটি জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যাঁ, পানিসহ।”
“এটা খেতে যষ্টিমধুর মত,” বিয়ারের গ্লাসটি নামিয়ে মেয়েটি বলল।
“এমনই সবকিছু।”
“হ্যাঁ,” মেয়েটি বলে। “সবকিছুতেই যষ্টিমধুর স্বাদ আছে। বিশেষ করে তুমি যেসব জিনিস খেতে কত অপেক্ষা করেছিলে, ঐ যেমন, সোমরস তার মধ্যে একটা।”
“উফ, বাদ দাও।”
“তুমিই শুরু করেছো,” মেয়েটি বলল। “আমার তো ভালোই লাগছিল। ভালো সময় কাটাচ্ছিলাম।”
“বেশ, আবার ভালো সময় কাটানোর চেষ্টা করা যাক।”
“ঠিক আছে। আমি সে চেষ্টাই করছি। আমি বলছিলাম কী, ওই পাহাড়গুলো দেখতে সাদা হাতির মতো। অনেক উজ্জ্বল না?”
“হ্যাঁ, উজ্জ্বল।”
“আমি এই নতুন পানীয়টা চেখে দেখতে চেয়েছিলাম। আমরা যা করি আরকি, না? ঘুরেফিরে দেখি আর নতুন নতুন পানীয় চেখে দেখি?”
“মনে হয়।”
“মেয়েটি পাহাড়সারির দিকে তাকালো।
“বেশ আদুরে ওই পাহাড়গুলো,” সে বলে। “ওগুলো আসলে সাদা হাতির মতো দেখতে না। আমি আসলে গাছপালার ফাঁক গলে ওই পাহাড়গুলোর গায়ের রঙ দেখে তুলনা করেছিলাম।”
“আরেক গ্লাস নেব?”
“আচ্ছা।”
উষ্ণ হাওয়া এসে পর্দা উড়িয়ে নিতে চায়, টেবিলের দিকে পর্দাটি সরে সরে আসে।
“বিয়ারটা ভালো ছিল,” লোকটি জানায়।
“দারুণ ছিল,” মেয়েটি বলে।
“এটা আসলে খুব সহজ অস্ত্রোপচার, জিগ,” লোকটি বলে। “মানে, অস্ত্রোপচারের মতো তেমন কিছুই না।”
মেয়েটি পায়ের নিচে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, টেবিলের পায়াগুলো ছুঁয়ে আছে যেখানটায়, সেখানে তার দৃষ্টি।
“আমি জানি, তুমি কিছু মনে করবে না জিগ। এটা তেমন কিছুই না। তাজা হাওয়া ঢোকার মতই স্বস্তিদায়ক ব্যাপার।”
মেয়েটি কিছু বলল না।
“আমি তোমার সাথে যাবো, সারাক্ষণ থাকব তোমার পাশে। ওরা কেবল বাতাসটা ঢুকতে দেবে, তারপরই সব একদম স্বাভাবিক।”
“তারপর আমরা কী করব?”
“তারপর আমরা ভালো থাকব। আগে যেমন ছিলাম।”
“কেন এরকম মনে হলো তোমার?”
“এই একমাত্র ব্যাপারটিই আমাদের বিরক্ত করছে। এই একটা জিনিস আমাদের অসুখী করে রেখেছে, জিগ।”
মেয়েটি পর্দার ভেতর দিয়ে অন্যপাশে তাকায়, হাত বাড়িয়ে পর্দার দুটো সুতো ধরে।
“তুমি ভাবছো এরপর আমরা স্বাভাবিক থাকব, সুখে থাকব।”
“আমি জানি, থাকব। তোমার ভয়ের কিছু নেই। আমি অনেক লোককে চিনি যারা আগে এটা করেছে।”
“তাই আমাকেও করতে হচ্ছে,” মেয়েটি বলল। “আর তারা সবাই কি সুখী হয়েছিল তারপর?”
“বেশ,” লোকটি বলল। “তুমি যদি না চাও, তাহলে বাদ দাও। তুমি না চাইলে আমিও চাই না। কিন্তু আমি জানি, এটা খুবই সহজ।”
“আর তুমি তা চাইছো?”
“আমার মনে হয়, এটা করাই সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি। কিন্তু আমি তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করতে চাই না।”
“আর আমি যদি এটি করি তাহলে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে? তুমি আমাকে ভালোবাসবে?”
“আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। তুমি জানো, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
“জানি। কিন্তু আমি যদি এটা করি আর সব স্বাভাবিক হয়ে যাবার পর যদি বলি, কিছু দেখতে সাদা হাতির মতো, তুমি তা পছন্দ করবে?”
“ভীষণ পছন্দ করব। আমি এখনো পছন্দ করছি, কিন্তু এ ব্যাপারে ভাবছি না শুধু। তুমি জানো দুশ্চিন্তার সময় আমি কেমন হয়ে যাই।”
“আমি যদি এটা করলে তুমি আর কখনো দুশ্চিন্তা করবে না?”
“আমি এই বিষয়ে অন্তত দুশ্চিন্তা করব না, কারণ এটা খুব সহজ একটা কাজ।”
“আচ্ছা, আমি করব। কারণ, আমি আমার কোনো পরোয়া করি না।”
“বেশ, কিন্তু আমি তোমার পরোয়া করি।”
“ও হ্যাঁ। কিন্তু আমি আমার পরোয়া করি না। এবং আমি এটা করব, তারপর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।”
“ওভাবে যদি ভাবো, তবে আমি চাই না তুমি তা করো।”
মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়। স্টেশনের অন্যপ্রান্তের দিকে হেঁটে যায়। সেখান থেকে দূরে অন্যপাশে, এব্রোর তীর, একটা সবুজ মাঠ, বৃক্ষ। তারচেয়েও দূরে নদী পেরিয়ে ওইতো দাঁড়িয়ে আছে পর্বতগুলো। মেঘের ছায়া সবুজ মাঠের উপর দিয়ে ছায়া ফেলে চলে যায়, আর মেয়েটি গাছপালার ফাঁক গলে নদীটিকে দেখতে থাকে।
“এই সবকিছুই আমাদের হতে পারতো,” সে বলে। “সমস্তকিছু আমাদের হতে পারতো। আমরা দিনের পর দিন সেটাকে আরো অসম্ভবের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।”
“কী বললে?”
“বললাম, এই সবকিছু আমাদের হতে পারতো।”
“এখনো আমাদের হতে পারে সব।”
“না, পারে না।”
“পুরো পৃথিবীটাই আমাদের হতে পারে।”
“না, পারে না।”
“আমরা যে কোনো জায়গাতেই যেতে পারি চাইলে।”
“না, আমরা পারি না। এখন আর এ পৃথিবী আমাদের নেই।”
“এটা আমাদের।”
“না, আমাদের না। আর একবার যদি মানুষ এটা নিয়ে নেয় তো আর ফেরত পাবে না।”
“কিন্তু তারা এখনো এটা নেয়নি।”
“বেশ, অপেক্ষা করে দেখা যাক নেয় কিনা।”
“এসো, ছায়ায় চলে এসো,” লোকটি বলল। “তুমি ওভাবে একদমই ভাববে না।”
“আমি কোনভাবেই ভাবছি না,” মেয়েটি বলল। “আমি শুধু ব্যাপারগুলো জানি।”
“আমি চাই না তুমি এমন কিছু করো যা তুমি নিজে থেকে করতে চাচ্ছো না-”
“আমার জন্য খারাপ কিছু তো নয়,” সে বলল। “আমি জানি। আচ্ছা, আরেক গ্লাস বিয়ার খাওয়া যাক?”
“আচ্ছা। কিন্তু তোমাকে নিজে থেকে উপলব্ধি করতে হবে-”
“আমি বুঝেছি,” মেয়েটি বলল। “আমরা কি কিছুক্ষণের জন্য চুপ থাকতে পারি না?”
তারা আবার টেবিলটাতে এসে বসে। মেয়েটি আবার ঐ দূরের পাহাড়সারির দিকে তাকায়, যে পাশটায় উপত্যকা শুকনো। লোকটি একবার তার দিকে তাকায়, তারপর টেবিলের দিকে।
“তোমাকে ভালো করে উপলব্ধি করতে হবে,” সে বলল। “যে আমি এটা চাই না, যদি তুমি না চাও। আর তোমার কাছে যদি অন্যরকম কিছু না মনে হয় তবে আমি এ ব্যাপারটিই মেনে নিতে চাই।”
“তোমার কাছে কি অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছে না? আমরা একসাথে মানিয়ে চলতে পারতাম।”
“অবশ্যই পারতাম। কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাই না আপাতত। আর কেউই না। এবং আমি জানি তা কতটা সহজ।”
“হ্যাঁ, তুমি জানো এটা খুব সহজ।”
“তোমার জন্য বলাটা ঠিক আছে, কিন্তু আমি আসলেই জানি।”
“তুমি আমার জন্য একটা কাজ করে দেবে?”
“তোমার জন্য সব করতে পারি আমি।”
“তুমি কি প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ চুপ করবে কিছুক্ষণ?”
লোকটি কিছু বলল না। স্টেশনের দেয়ালের পাশে রাখা নিজেদের ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে সবগুলো স্টিকার লাগানো আছে, যেসব হোটেলে রাত থাকতে হয়েছে সেগুলোর।
“কিন্তু আমি চাই না, তুমি-” লোকটি বলল। “আমি এ ব্যাপারে একদম পরোয়া করি না।”
“আমি চিৎকার করে কাঁদব,” মেয়েটি বলল।
দুই গ্লাস বিয়ার নিয়ে এলো বারের মহিলাটি, টেবিলের উপর রাখা স্যাঁতস্যাঁতে ফেল্ট প্যাডের উপর রাখে। “ট্রেন পাঁচ মিনিটের ভেতর চলে আসবে,” বলল মহিলাটি।
“কী বললেন উনি?” মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে।
“বলল, ট্রেন আর পাঁচ মিনিটের মাঝেই চলে আসবে।”
মেয়েটি বারের মহিলার দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল একটা হাসি দিল ধন্যবাদস্বরূপ।
“আমি বরং ব্যাগগুলো স্টেশনের অন্যপাশে রেখে আসি, সুবিধা হবে,” লোকটি বলে। মেয়েটি তার দিকেও তাকিয়ে স্মিত হাসে।
“ঠিক আছে, রেখে এসো। তারপর একসাথে বিয়ারটা শেষ করা যাবে।”
লোকটি ভারি দুটো ব্যাগ সাথে করে স্টেশনের অন্যপাশে চলে যায় রেললাইন পেরিয়ে। লাইন বরাবর একবার দূরে তাকায়, কিন্তু কোনো ট্রেনের দেখা মিলল না। ফিরে এসে বার বরাবর হেঁটে এলো যেখানে লোকজন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ড্রিঙ্ক করছিল তখন। সে একটা আনিস অর্ডার করে সেখানেই খেয়ে নিলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই, তারপর লোকজনের দিকে একবার দৃষ্টি বুলালো। সকলেই কোনো না কোনো কারণে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে, ভাবলো সে। এরপর পর্দার ওপাশে নিজেদের টেবিলের কাছে চলে এলো। মেয়েটি বসেই ছিল, লোকটি ফিরতেই তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“এখন কেমন লাগছে?” লোকটি জিজ্ঞাসা করে।
“ভালো,” মেয়েটি জবাব দেয়। “আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। ভালো লাগছে।”

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close