Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আমার প্রথম বই আলপথ থেকে ধানক্ষেতে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতি > আমার প্রথম বই >> ওবায়েদ আকাশ

আলপথ থেকে ধানক্ষেতে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতি > আমার প্রথম বই >> ওবায়েদ আকাশ

প্রকাশঃ June 26, 2017

আলপথ থেকে ধানক্ষেতে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতি > আমার প্রথম বই >> ওবায়েদ আকাশ
0
0

আলপথ থেকে ধানক্ষেতে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতি

গত শতকের নব্বইয়ের দশকের দিনগুলি ছিল আমার ক্রমাগত পতন আর বিষাদের। সঠিক পথে গাছে উঠতে গিয়ে অকস্মাৎ পড়ে যাবার স্মৃতি, সবার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে শেষমেশ বৈতালিকে একা হয়ে পড়ার স্মৃতি; কিংবা ছোপ ছোপ জলে কাঁচাসবুজ ধানক্ষেতের আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে…স্বপ্ন পেরুনোর কালে…হঠাৎ আলপথ থেকে পড়ে আজও অব্দি ধানক্ষেতের ঐশ্বর্যে মাতাল হয়ে…ধানের সবুজ ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার গভীর থেকে গভীরে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতি।

আমার সেই দিনগুলিকে শুধু বিহ্বল করেছিল আমার শৈশব-কৈশোরের অসামান্য সুখস্মৃতি। সেই দিনগুলির নিরন্তর সুখবাস আর প্রকৃতিকাতরতা আমাকে সুস্থ করে তুলেছিল যেন অনন্ত সময়ের কোনো পথের ছবি এঁকে। সেই পথ ছিল কবিতার, সেই পথ ছিল পাঠাভ্যাসের। কৈশোর পেরিয়ে আমার যাবতীয় অনিয়ম, অনৈতিকতা, সমস্ত রকমের অশোভন মানুষিতা, সমস্ত রকমের অসামাজিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল কবিতা। এককথায় বলি, আমার স্বপ্ন ছিল কবিতা, আমার কবিতা ছিল স্বপ্ন। আর এতে মগ্ন হতে গিয়ে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত একটি পরিবেশে পরিবার-স্বজনের কাছ থেকে যতটুকু পাওয়া যায়, আমার বেলায় তার খুব একটা ব্যত্যয় ঘটেনি। আর এটাকেই স্বাভাবিক ভাবা ছাড়া আর কোনো বিকল্পও ছিল না।

সেই দিনগুলি, কবিতার চাষবাস হচ্ছে রাত্রিদিন, কখনো বর্ষায়-জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত ক্ষেতের শস্য, কখনো নিড়ানি দিয়ে আগাছা তুলে, তাতে কীটনাশক ছিটিয়ে সুস্থ-স্বাস্থ্যবান করে তোলার কাজে আমার সকল মুখরতা। একদিন পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। আমার প্রথম বই প্রকাশের তোড়জোর চলছে। চলছে সন্ধেবেলায় প্রদীপ জ্বালানোর আগে সকালবেলা সলতে পাকানোর কাজ। প্রথম বই প্রকাশের উন্মাদনায় সকাল-সন্ধে একাকার, পাণ্ডুলিপিতে ঠাঁই করে নিল আরেকটি নতুন কবিতা। বলা যায়, পাণ্ডুলিপির কবিতাগুলিকে কনুই মেরে ধাক্কা দিয়ে তাদের কাতারে নিজের জায়গা করে নেয় আমার প্রথম বই প্রকাশ ও আমার তখনকার অবস্থা সম্পর্কে লিখিত একটি কবিতা। কবিতার শিরোনাম ‘জনপ্রিয় হতে থাকি’। কবিতাটি যেন সমগ্র পাণ্ডুলিপিটাকে বলছে : ‘আমাকে ছাড়া তোমার পূর্ণতা হবে না।’ টানা গদ্যে লেখা সেই কবিতাটি এখানে তুলে না দিলে প্রথম বই নিয়ে আমার এই রচনাটি সত্যি সম্পূর্ণ হবে না। কবিতাটি ছিল এরকম :

কদাচিৎ ভাল থেকে দেখি, ভালদের জন্য একটি-দুটি বাড়ি… সাধ্যাতীত নারী… আর প্রথম প্রথম কাব্যগ্রন্থ মুদ্রণে পাঠিয়েছি।… চাঁদ উঠছে।… এবার ঠিক জোছনাদের জন্য জন্ম কিংবা বিবাহ উৎসবে ভালদের নেমন্তন্ন নিয়ে যাবো।… এই শহরের জোছনাদের জন্য কিছু একটা রফাদফা এখনো হলো না। পতিতালয় হলো; নীল ছবি, পর্নো পত্রিকা থেকে নগ্নতার চিত্রমূল্যও খুব সস্তা এক সাবানের মূল্য!

এটা তো ভিক্ষুকের শহর!… আজকাল ভিক্ষুকবেশে ঘুরিফিরি বলে বাড়িওয়ালার মেয়ে দুটো নিয়মিত ঘুমের পিল খেয়ে বাঁচে।… আমি এত যে বলি, ‘তুই আমার কন্যা হও না মেয়ে?’ উরুর কাপড় তুলে যে মেয়েটি উনিশে এবার ছবি আর বইয়ের স্তূপে ওয়াক ওয়াক বমি করে দেয়।… আমি তবু বলি, ‘আমার চিকিৎসক বাবা মাঝেমধ্যে বেড়াতে এসে প্রেমিক পুত্রের দেহে ফি সালের জ্ঞান ঢেলে যান।… ধর্ম ও ঈশ্বরীকে রেখে যান কাছে।’ হো হো হো… ব্যাপক মেঘের রাজ্যে কন্যাদ্বয় চশমা ও সুচাগ্র স্তন কাঁপিয়ে বলে, ‘আপনার ঈশ্বরী, সে তো বিবাহিত মেয়ে! আর এই কন্যারা?’…

আজকাল বিকেলের রিক্সায় আমি নিশ্চিন্তে ভিক্ষুকবেশে ভালদের বিরুদ্ধে বসবাস করি। রাত্রি হলে বাঁকাতেড়া পঙক্তি রচিত হয়। ক্রমাগত জনপ্রিয় হতে থাকি… [জনপ্রিয় হতে থাকি (কিছুটা সংশোধিত), পৃষ্ঠা : ১৪]

তখন ২০০১ সাল। সত্যি সত্যি এমন এক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে ‘বর্তমান সময়’ নামের প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছিল আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ’। সকল দোদুল্যমানতা কাটাতে কাটাতে সময় গড়িয়ে গেল, তবু থেকেই গেল অতৃপ্তি, থেকেই গেল অমীমাংসা। সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল নাকি ভুল, সে সম্পর্কে আজও সমাধানে আসতে পারিনি। আরো এক-দু’বছর আগেই প্রকাশ করা উচিত ছিল নাকি এক দুই বা পাঁচ বছর পরে প্রকাশিত হলে ভাল হতো, সে প্রশ্নের উত্তর আজো ঝুলন্ত। এ প্রশ্নের উত্তর যদি আমার কবিতার যৎসামান্য যে দু’চার জন পাঠক আছেন তাদের ওপর ছেড়ে দিই, তবে তাদের কাছে আমার প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতাটি পৌঁছে দিয়ে বলব, অনুগ্রহ করে আমার এই কবিতাটি অন্তত পড়ে নিন। কতটা কাঁচামি কিংবা পাকনামি করেছি কিংবা সঠিক করেছি, এ কবিতাটি হয়তো তার অনেকটা ইঙ্গিত দেবে। তুলে দিচ্ছি প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতাটি :

চূড়ান্ত শুশ্রূষা হলো। জন্মান্ধ শরীর থেকে

হাউই আরোগ্য ওড়ে। আঙুলে মাতাল তৃষ্ণা

শিয়রে ভরসা রেখে এইবার পালানোই শ্রেয়

আজ সারাবেলা বাগানের বহ্নিদিন। পিপীলিকা

সার বেঁধে নামছে ঝর্ণায়। আলোরা আসছে…

আলোদের আগমনে এ বাগান বহ্নিময় হলো

এ-রকম আয়োজনে মূলত উৎসব থাকে না

আজ তুমি আরোগ্যের নাকি উৎসবের

 বলছ না কিছু

বিপন্ন জোনাকি ভয়ে ঢেকে আছি পাতার কৌশলে

দেখছ না তুমি

তোমার মুখের শেষে আর কোনো অভ্রকুচি নেই

প্রগাঢ় লাবণ্য থেকে প্রিয় পথ

                 নেমে গেছে অরণ্য নগরে

আর তুমি বিস্মৃত পৌরুষ দেখে

                  মুখের ঝালর

                       খুলছ এবার

[পাতার কৌশলে থাকি পলায়নপর, পৃষ্ঠা : ৭]

এভাবে ধরে ধরে প্রতিটি কবিতা তুলে দেয়া গেলে হয়তো ব্যক্তিগত একধরনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হতো। সে বাস্তবতা এখানে না থাকায় কিছু কিছু অনিবার্য বিষয়ের অবতারণাবশত কিছু কিছু কবিতাংশ উদ্ধৃত করবো।

আমার অস্থি-মজ্জা-নিঃশ্বাসে মিশে আছে গ্রামের মানুষ-প্রকৃতি- ধূলিকণা, ফসলের মাঠ, এলোমেলো হাওয়া, কুঁড়েঘর, গবাদিপশু, কৃষক, রাখাল, মজুর, দোকানি, মাছধরা, সাঁতার কাটা, প্রত্ন-পৌরাণিক বাড়ি, শানবাধা পুকুর, রূপকথা, পাতালপুরির গল্প, কিচ্ছাকাহিনি, রাজরাজড়াদের দুরাচার, জমিদার মহাজন উচ্চবিত্তদের নারীদের প্রতি অসদাচরণ, তাদের যাচ্ছেতাই ব্যবহার, ছোট মানুষদের প্রতি বড়দের আগ্রাসী দৃষ্টির মতো আরো কত কিছু। আর এমনিতর দেখাগুলো আজও যেমন, আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও আমার কবিতায় ভর করেছিল অবিকল চেহারায়, যা জায়গা পেয়েছে আমার প্রথম বই ‘পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ’-এ। গ্রামনির্ভরতাকে ঘিরে কিছু কবিতার উদ্ধৃতি অবশ্য-প্রাসঙ্গিক :

১.

কিছু কথা গ্রামেগঞ্জে ফলে। পাথর নিয়ে অতিরিক্ত কথাগুলো থেকে গেল আঞ্চলিক ভাষায়। ভেবে দেখি পাথর শানানো গাঁয়ে তা ধিন তা কৈশোরিক বিচরণশীলা পা মুছে গেল কিনা।… এবার মেঘবৃষ্টির ঋতুগুলো বরাদ্দ হলে গাঁয়ের হাটে ইলিশের মৌসুম ধরে তোমাদের বেড়াবার প্রসঙ্গে যথার্থ ভেবেছি। তখন তো মুখরিত স্রোতে ভোরের বর্ণনা এলে ব্রিজের তলায় নেমে পাথরের জটিলতাগুলো নিরীক্ষণ করি। প্রচণ্ড খরতাময় স্রোতে মাছেদের ঠোঁটে-মুখে পাথরসংক্রান্ত কথাগুলো জরুরি হয়ে ওঠে।…

                  [পাথর সংক্রান্ত আঞ্চলিক কথাগুলো, পৃষ্ঠা : ৮]

২.

বাড়ি মানে এক বা একাধিক ঘর, জীবজন্তু, স্নেহারণ্য

বাড়ি মানে উঠোনে অরক্ষিত দুঃখবতী মায়ের কবর [বাড়ি, পৃষ্ঠা : ১০]

৩.

…ছুটিছাটায় গ্রামে ফিরে যেতে রাত হয় খুব। সেই সব শিহরণ-দৃশ্য যদি বলি, মেস-জুড়ে মাছের মায়েরা পুত্রশোক করে। যেমন- নদী পেরুলেই বাঁশঝাড়ে ময়না মামুর ঝুলন্ত মৃতদেহ… ঝিম… ঝিম… শেষরাতের মরা জোছনায় মৃতদের গোঙানির ভেতর পরস্পর ছায়াগুলো প্রেতের শরীর হয়ে ঘিরে ধরে। আরো দূরে- জেলেদের নাও থেকে নিবু নিবু বাতিগুলো দুলে উঠে নিভে যাবে বলে ফজরের কাছাকাছি পরীদের সুখ নেমে আসে। আমি গ্রামে অতি গ্রামে বাড়ি যেতে থাকি। প্রতিটি প্রহরে শুধু মনে পড়ে মাকে। মা আমার পুকুরের পারে আজও শুয়ে আছে শাশ্বত ঘুমে। আর এই কবরের প্রহরী যারা– ও জবা ও পাতাবাহারের ঝাড়- তোমাদের জন্য তাই বয়ে নিয়ে আসা নবান্ন ও শীতের উপহার।…

 [গ্রামে গ্রামে বাড়ি যেতে যেতে…, পৃষ্ঠা :২৫]

আমার চার বছর বয়সে মাকে হারানোর বেদনামথিত মানসিকতা যতটা কবিতায় স্থান পেয়েছে, তার বেশকিছু কবিতা আমার প্রথম বইতে স্থান পেয়েছে। ঠাঁই পেয়েছে আমার যৌবনদীপ্ত দিনে মনের অজান্তে উঁকি দেয়া নারীপ্রেম, বাঁধভাঙা স্রোতের মতো তা এলোমেলো ছড়িয়ে পড়েছে প্রথম গ্রন্থে, অসংখ্য পঙক্তিতে, কবিতায়। গ্রামের কিশোরী প্রেমিকা যেন নানা প্রতিকূলতার স্রোত ডিঙিয়ে খুব সাবলীলভাবেই আশ্রয় নিয়েছে এই মহানাগরিক ইট-সিমেন্টের অলিন্দ্যঝুলানো উচ্চতায়। আমিও গ্রাম ছেড়ে নগরে এসে যেন তাকে খুঁজে পেয়েছিলাম এক নাগরিক কিশোরী হিসেবে।

 

‘ভোর হলো দোর খোল’ প্রতি প্রত্যুষে

তোমাকে জাগাতে আসে বহুতল টাওয়ারের ছায়া

তুমি আনমনে উঠোনে বাগানের রোদে ক্লোরোফিল খোঁজো

হেলেদুলে ভোরের কুমারী ফুলে

ব্যাপক ঘ্রাণের সখ্য শরীরে ভাসাও

বিদ্যুৎবিকেলে তুমি নগরীর ঈশ্বরী হলে- বারান্দার অবকাশে

শহরের সফল বর্ষণ অকুণ্ঠ দেখে নিতে পারো-

               [পুকুরপারে, ক্রমশ উজ্জ্বল বাড়ি, পৃষ্ঠা : ১২]

এভাবে একের পর এক বিষয় নিয়ে দিনের পর দিন ভরিয়ে তুলেছি কবিতার খাতা। মনে পড়ে ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলাম এই শহরাভিমুখে। প্রথমত জীবন সংগ্রাম, সংগ্রামী জীবনে ৪/৫ বছরের মতো কবিতা লেখার ফুসরত মেলেনি। তাহলে হয়তো আমার প্রথম বইটি ২০০১ সালে প্রকাশিত না হয়ে ’৯৬ কিংবা ’৯৭ সালেই আলোর মুখ দেখতো। আবার দূর থেকে দেখলে মনে হয়, হয়তো যথাসময়েই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। কেননা এখনো মনে হয় বেশকিছু কাঁচা কবিতা প্রাথমিক আবেগে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। আবার কখনো মনে হয় ’৯৬/’৯৭ সালে বইটি প্রকাশিত হলে কবিতা যাচাই-বাছাই অথবা কবিতা নির্বাচনের ক্ষমতাটা আরো আগেই তৈরি হতে পারতো। ধারণা করি, প্রথম বই প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অত বেশি বাছবিচার কাম্য নয়। যেমন এক্ষেত্রে বাংলা কবিতার দুই মহাপ্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের স্মরণ নিতে পারি। রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর ‘মানসী’র আগের চারটি গ্রন্থকে স্বীকারই করেননি। ‘মানসী’কেই তাঁর প্রথম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। এক্ষেত্রে ভাববার বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে তাঁর অপূর্ণ ওই চারটি গ্রন্থ যদি প্রকাশিত না হয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে ‘মানসী’ই তাঁর প্রথম গ্রন্থ হতো, তবে ‘মানসী’ কি অতটা পরিণত হতে পারতো? তা নিশ্চয় হতে পারতো না। ওই চারটি বই প্রকাশের ভেতর দিয়েই মানসী প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আবার জীবনানন্দের প্রথম গ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ যখন নজরুল প্রভাবিত হয়ে প্রকাশিত হলো, তখনই তাঁর নিজস্ব স্বরের কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি হলো।

এসব বিবেচনায় প্রথম বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় খুঁতখুঁত কিংবা দ্বিধাম্মন্যতা আমার কাঙ্ক্ষিত নয়। প্রথম দু চারটি বই কাঁচা হলেও পরবর্তীতে তা তেমন প্রভাব ফেলে বলে মনে হয় না। যেমন রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দের ক্ষেত্রে তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ আমরা হাতের কাছেই পাই। এছাড়া সবার প্রথম বই যে অপূর্ণ বা অপরিণত হবে, এমন ভাববারও কোনো কারণ নেই। অনেকের প্রথম বই শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

আমি অবশ্য ২০০১ সালে ততটা গভীরে না ভেবেই পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলি। নিজেকে গ্রন্থের কবি বলে ধারণা করতে মনস্থির করি। খুঁজতে থাকি প্রকাশক।

একপর্যায়ে প্রকাশক মিলল বটে, কিন্তু বই প্রকাশিত হলো বইমেলার মাঝামাঝি সময়ে, কিন্তু প্রকাশকের সঙ্গে কথা ছিল, তিনি মেলার প্রথম দিন থেকেই বইমেলায় নিয়ে আসবেন। প্রকাশকের সঙ্গে আমার চুক্তি ছিল যে, তাকে শুধু বইয়ের কাগজ কিনে দিতে হবে। বিনিময়ে তিনি আমাকে ২০০ কপি বই দেবেন। মনে পড়ে সেই ২০০ বই উদ্ধার করতে আমাকে কী পরিমাণ ঘাম ঝরাতে হয়েছিল এবং কতদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেই থেকে সেই প্রকাশক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে গেল।

এখন আমার সর্বমোট প্রকাশিত গ্রন্থ ৩০টি। মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ১৫টির ওপরে। তো প্রথম বইটি প্রকাশের সেই অনুভূতিটা অবশ্য পরবর্তীতে অন্য কোনো বই প্রকাশের অনুভূতির সঙ্গে মেলানো যায় না। সে-এক অন্যরকম উত্তেজনা। মনে পড়ে প্রচুর বই কিনিয়েছিলাম বন্ধুবান্ধবকে দিয়ে প্রকাশকের স্টল থেকে। আর নিজের দুই শ’ বই অকাতরে বিলিয়েছিলাম বন্ধু-স্বজনদের ভেতর।

যে কোনো লেখকের প্রথম বইটি একদিন ভিন্নমাত্রায় মূল্যায়িত হয়। এটা স্বাভাবিকও। এ বিবেচনায় অনেকে আছেন, প্রথম বইটি ভালো করবার প্রত্যাশায়, অপেক্ষা করতে করতে দশ পনেরো বছরও অপেক্ষা করেন। তারপর এমন একটা সময় এসে দাঁড়ায় সম্মুখে যখন আর বই প্রকাশের আগ্রহ থাকে না। অথবা যে ত্রুটি সারাবার জন্য তিনি অপেক্ষা করেন যুগ কিংবা দশক, তারপর প্রথম বইটি প্রকাশিত হলে দেখা যায় সে ত্রুটিটা তার থেকেই গেছে। সুতরাং প্রথম বইটি আগেভাগে হলে বরং অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। আমি নিজেও অবশ্য সে ত্রুটি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি। তবে আরো আগে প্রথম বইটি প্রকাশিত হলে আমার কবিতা আরো বেশি বাঁক দেখতে পেত, সন্দেহ নেই।

প্রথম বই ‘পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ’ থেকে এ বছর প্রকাশিত ‘মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি’ পর্যন্ত আমার যে ধারাবাহিকতা, সেই ধারাবাহিকতা থেকে আমি প্রতিটি বইতেই আমূল পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করেছি। এবং আমার সর্বশেষ মৌলিক কবিতার বই ‘পাতাগুলি আলো’ থেকে প্রথম বইয়ের দূরত্ব ঢের বেশি। হয়তো ভবিষ্যতে সে দূরত্ব অরো বাড়বে। এত কিছু বিবেচনায়, বলি, আমার প্রথম বই প্রকাশের ক্ষণ, মাস কিংবা বছরটিকে আমি বৃষ্টিবর্ষণের ক্ষণ বলেই মনে করি। এ বইয়েরই একটি কবিতা সেই প্রকাশের ক্ষণটিকে নিবেদন করে যাই :

ওখানে ভাঙছে, সুবর্ণ পরিখা- তাকে যে বেষ্টন করে

ফলের উপমা হয়ে- উড়ে এসে বসেছ শস্যের শোভা

মেঘের ফলনে যদি বহুদূরে বৃষ্টি নামে এই-

এমন নিপুণ জলে কাকে দেখো- ভেসে চলে যায়…

এভাবে ভেসেছে, দলিত মেঘেরা- ভেবেছে প্রখর চাঁদে

দুটি কথা বলা যদি হয়, অগোচরে ফিরে দেখা

চতুর পালক- তোমার জন্মের মাসে

                        এই ঝড়ে ঝরে গেল যদি

দুটি কথা কিছু নয় তাকে আমি বৃষ্টি বলি”

               [তাকে আমি বৃষ্টি বলি, পৃষ্ঠা : ১৮]

 

একইসঙ্গে অনাগত দিনের প্রথম বইয়ের কবিদের জন্য বলতে চাই, সকল প্রকার বৈপরীত্যের মধ্যেই আসলে কবিতার বসবাস। বৈপরীত্য ছাড়া সৃষ্টি হয় না। তাকে ভাবতে হবে বিপরীত দিক থেকে। আমার প্রথম গ্রন্থের ৫৪ নম্বর পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ‘বৈপরীত্য’ কবিতাটি প্রকাশিতব্য প্রথম বইয়ের কবিদের নিবেদন করে প্রথম বই থেকে আপাত আড়াল নিচ্ছি :

বিপক্ষ আমার রক্তে, বক্তব্যে ব্যাকুলতা- ওগো সরলতা

আমার বিধিভুক্ত ঘুম জেগে জেগে মাছ খুন করে, জলে-

ঘোলা নদী- কর্ষিত হও, লাল

এই রক্তজল! দয়া করো নদী, পারের প্রাণী

হাঙর ফলাও নদী তাতার জলে। ফসলের মাঠ

প্রাণান্ত হোক প্রাণীতে-

এই ঊর্বরতা বিপন্ন হলে- কৃষিজীবী যারা শিল্প ফলাবে?

এই পলিমাটি চর্চিত হোক ঋণে-

আকালের কবি শিল্পিত হোক, ধাতস্থ হোক বিষে

০৯ / ০৬/ ২০১৭ পুরানা পল্টন, ঢাকা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close