Home অনুবাদ আলবেয়ার কামু > নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) >> ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

আলবেয়ার কামু > নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) >> ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

প্রকাশঃ August 19, 2018

আলবেয়ার কামু > নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) >> ভাষান্তর : এমদাদ রহমান
0
0

আলবেয়ার কামু > নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে >> ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

 

[আলবেয়ার কামু জন্ম নিয়েছেন ১৯১৩ সালে, আলজেরিয়ায়। দি আউটসাইডার, দ্য প্লেগ, দ্য ফল তাঁর উপন্যাস। লিখেছেন সিসিফাসের মিথ। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। জীবন আসলেই কী, এ ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। নিরর্থকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকৃতির অনন্য দলিল ‘নোটবুকস’। কামু’র নোটবুকের ১ম খণ্ডে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২, ২য় খণ্ডে ১৯৪২ থেকে ১৯৫১ এবং ৩য় খণ্ডে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন চিন্তা ও উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেছেন। এই সময়কালের মধ্যেই তিনি লেখন দি আউটসাইডার, দ্য প্লেগ, দ্য ফল-এই উপন্যাসগুলি; ভাবনাবিস্তারি প্রবন্ধ ‘দ্য রিবেল’, ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’; ‘ক্যালিগুলা’, ‘ক্রস পারপাস’, ‘দ্য পজেজসড’ এই তিনখানি নাটক। ১৯৫৭ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ১৯৬০-এ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। ]

 

 

প্লেগ : কিছুতেই যেন লিখতে পারছিলাম না। আটকে যাচ্ছিলাম। এটা লেখবার সময় নানাভাবে উলটে-পালটে ভেবেছি। অনুমিত ধারণার সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে সংযুক্ত করেছি। ‘দ্য আউটসাইডার’ বর্ণনা করেছে মানুষের নগ্নতা যখন নিরর্থকতা বা অযৌক্তিকতার সঙ্গে পরস্পর মুখোমুখি হয়। ‘দ্য প্লেগ’ হল সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সমান মূল্যবোধের উদ্ভাসন, যেখানে একই ব্যাপার অর্থাৎ মানুষের নগ্নতার সঙ্গে নিরর্থকতা বা অযৌক্তিকতার মোকাবেলা। তবে এখানে আমি আরেকটু বলতে চাই, ‘দ্য প্লেগ’ এখানে আমাদের দেখাচ্ছে যে অযৌক্তিকতা কিংবা নিরর্থকতা আসলে কিছুই শেখায় না।

 

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ১

 

 

‘সবকিছু, যেসব আমাকে হত্যা করে না, তা-ই আমাকে শক্তিমান করে তোলে।’ হ্যাঁ, কিন্তু… কতই না কঠিন সুখী হওয়ার চিন্তা। এইসব হল বিবমিষা জাগানো ব্যাপার। সবচেয়ে উত্তম হল নীরব হয়ে থাকা, সবসময়, এবং আর কী ঘটবার বাকি আছে, তার জন্য অপেক্ষা করা।
এখানেই সেই অবস্থা তৈরি হয় যখন দুটি সমান অগ্রহণযোগ্য বিকল্পের একটিকে বেছে নিতে হয়, জিদ বলছেন, নৈতিক হওয়া আর আন্তরিক হওয়ার মধ্যেকার জটিলতা। তিনি এও বলছেন, একমাত্র সুন্দর বিষয় হল সেইসব উন্মাদনা, কাউকে দিয়ে লেখানোর জন্য শব্দ করে বলা এবং কারণগুলোকে লিপিবদ্ধ করে ফেলা।
নিজেকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এখানে যদি মরুভূমি নাও থাকে, তবে আছে প্লেগ, অথবা তলস্তয়ের সেই ছোট্ট স্টেশন।
গ্যেতে–আমি নিজেকে খুব বেশি অনুভব করি তখনই, যখন আমি মানুষের কন্যাদের দিকে অগ্রসর হই।
এফ. অ্যালেকজান্ডার এবং এইচ. স্ত্যাব। দ্য ক্রিমিনাল। কয়েক শতাব্দী আগে স্নায়ুবিকারগ্রস্তদের জেলখানায় রাখা হতো। সেই সময়ও এগিয়ে আসছে, যখন অপরাধীদের হাসপাতালে পাঠাতে হবে।
‘জীবন আর মৃত্যু একটি আয়নার সামনে’, বোদলেয়ার বলেছেন। ‘মৃত্যু’কে কতই না গুরুত্বহীনভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রত্যেকেই যেন মৃতের মত বেঁচে থাকে। কিন্তু নিজের মৃত্যুর নিয়ন্ত্রক হতে পারা কতটা কঠিন?
কেউ একজন, যিনি পৌঁছে গেছেন নিরর্থকতায়, এবং ক্রমাগত বেঁচে থাকবার চেষ্টা করছেন, তার দৃষ্টিভঙ্গিটুকুকে আঁকড়ে ধরে রাখবার জন্য, আর এইসব, তাকে সবসময় জানান দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজটি হল- প্রতিটি পদক্ষেপে আত্মসচেতন থাকা। পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব সময় তার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকবে। মানুষটা পৃথিবীতে খুব সহজভাবে বাস করতে চাইবে, যেখানে আলোকবিকিরণই হল নিয়ম। আর তখনই মানুষটি অনুধাবন করবে প্রকৃত সমস্যাটি, এমনকি ঈশ্বরকে ছাড়াই, তা হল মনস্তাত্ত্বিক একতার সঙ্কট আর নিজের ভিতরকার প্রশান্তি। মানুষটি আরও উপলব্ধি করবে যে নিজের ভিতরের এই প্রশান্তি, শৃঙ্খলা ছাড়া সম্ভব নয়, যা একই সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও কঠিন। পৃথিবীতে, কর্তৃত্ব দ্বারা শাসিত হয়ে মানুষের অর্জনটা কী?
প্রতিবন্ধকতা ঘুমিয়ে আছে জীবনের খণ্ড খণ্ড অংশে, যা ইতোমধ্যে যাপিত হয়ে গেছে (পেশা, বিবাহ, পূর্ববর্তী মতামতসমূহ); ইতোপূর্বে ঘটে গেছে। সমস্যার উপাদানগুলো খুব কৌশলে থেকে যায়, জীবন থেকে পালিয়ে যেতে পারে না।
লেখক, যিনি পর্যালোচনা করেন এবং দারুণভাবে লেখার কাজটাও শেষ করেন, যা আগে তার অভিজ্ঞতায় ছিল না, তা, সম্পূর্ণই বর্জনীয়; ঘৃণ্য। তবে সাবধান, একজন খুনি কখনোই যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি নন, যিনি অপরাধ বিষয়ে কথা বলবেন। (তবে তার নিজের কৃত অপরাধ সম্পর্কে বর্ণনা দেবার পক্ষেও কি তিনি যথেষ্ট যোগ্যতা রাখেন না? এমনকি যা নির্দিষ্টও নয়।) আমরা অবশ্যই সৃষ্টি আর কর্ম- এই দুটি ব্যাপারের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবধান কল্পনা করে নেব। একজন প্রকৃত শিল্পী কী তিনি ভাবলেন আর কী করলেন- এই দুইয়ের মাঝামাঝিতেই অবস্থান করেন।
আমার অভিজ্ঞতালোকের বিশ্ব : মানুষের অমরত্ব ব্যতিরেকে ঈশ্বরের কল্পনা।
প্রথম দর্শনেই, মানুষের জীবনই তার কাজের চেয়েও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। জীবন খুব দৃঢ়ভাবে সক্রিয় থেকেছে আর সমগ্রটাকে খুব একগুঁয়েভাবে শাসন করেছে। শাসন করেছে তার নিজের মানসিক আচরণের ভঙ্গি। একটিমাত্র নিঃশ্বাস বয়ে গেছে তার অনেকগুলো বছরের ওপর দিয়ে। তার উপন্যাস আসলে সে নিজেই। আবার তার দিকে তাকাবেন, অবশ্যই।
অস্তিত্বজনিত ভয়, প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের কাছে পৌঁছানোর ভয়। চিত্রকলার ভাষায় কথা বলবার চেষ্টা করা দরকার, যে-কথা আসলে হয়ে উঠবে সাহিত্যবিষয়ক। আমরা অবশ্যই বোদলেয়ারের কাছে ফিরে যাব। ‘মানব’—এই ধারণায় পরিভ্রমণ, তবে বিষয়মুখ হবে বস্তুনিষ্ঠ।

সমালোচনা প্রসঙ্গে :
তিন বছর লাগল একটি বই লিখে শেষ করতে, মাত্র পাঁচটি বাক্যে তাকে হাস্যকর করে ফেলা হল; এবং ভুল উদ্ধৃতিতে।
আমার দিন আর রাতের সঙ্গে চলমান জলপ্রবাহের শব্দ। আমার চারপাশে, আমাকে ঘিরেই তা প্রবহমান। সূর্যকরোজ্জ্বল চারণভূমির ভিতর দিয়ে এই প্রবাহ আমার আত্মার নিকটবর্তী হয় আর শীঘ্রই আমি আমার ভিতরেই সেই শব্দকে শুনতে পাই। জলপ্রবাহ আমার হৃদয়ের ভিতরে ঢুকে পড়ে, বয়ে চলে, আর জলধারার বিশৃঙ্খল-চলন আমার সবকিছুর সহগামী হবে। এটাই হল বিস্মরণপ্রবণতা।
এম প্রসঙ্গে : আমি অস্তিত্বের অভিঘাতের দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করি না, কিন্তু আমি এমন কোনও যাত্রাপথও আকাঙ্ক্ষা করি না যা মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে। আমরা কি আমাদের তীব্রতম অনুভূতিগুলোর শেষে ঈশ্বরকে খুঁজে পাব?
প্লেগ : কিছুতেই যেন লিখতে পারছিলাম না। আটকে যাচ্ছিলাম। এটা লেখবার সময় নানাভাবে উলটে-পালটে ভেবেছি। অনুমিত ধারণার সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে সংযুক্ত করেছি। ‘দ্য আউটসাইডার’ বর্ণনা করেছে মানুষের নগ্নতা যখন নিরর্থকতা বা অযৌক্তিকতার সঙ্গে পরস্পর মুখোমুখি হয়। ‘দ্য প্লেগ’ হল সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সমান মূল্যবোধের উদ্ভাসন, যেখানে একই ব্যাপার অর্থাৎ মানুষের নগ্নতার সঙ্গে নিরর্থকতা বা অযৌক্তিকতার মোকাবেলা। তবে এখানে আমি আরেকটু বলতে চাই, ‘দ্য প্লেগ’ এখানে আমাদের দেখাচ্ছে যে অযৌক্তিকতা কিংবা নিরর্থকতা আসলে কিছুই শেখায় না। এটা এক ধরণের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি।
দীর্ঘ দিন ধরে ফ্রান্সকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখছিলাম, কিন্তু এখনও কোনভাবেই লিখে শেষ করতে পারছি না বর্তমান সময়ের বিশস্ত কিছু তথ্যসূত্র ছাড়া। এটা লিখবার প্রাথমিক ধারণা আমার কাছে এসেছিল একটি ছোট্ট লোকাল ট্রেনে, যেন আমি দেখছিলাম ট্রেনটি আমাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, ছোট স্টেশনগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে আর ট্রেনযাত্রী ফরাসি মানুষগুলোর শরীর আর মুখগুলোকে আমি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না : বৃদ্ধ চাষি পরিবার। মহিলার মুখখানা যেন দলা পাকানো, ঠিক যেন মানুষের মুখের উপযোগী করে বানানো পশুর চামড়া। পুরুষটির মুখ, কোমল আর আলোকিত করে আছে দুটি চোখ আর শাদা গোঁফ— তাদের শরীর এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে দলা পাকিয়ে আছে যে মনে হচ্ছে যেন দুই দুইটি শীতকালের অভাব আর বঞ্চনা, শরীরে জড়িয়ে আছে উজ্জ্বল আর কারুকার্যখচিত পোশাক, তবুও বোঝা যায়, যেখানে দরিদ্রতা থাকে, সেখানে মানুষের কাছ থেকে অভিজাত কেতা বিদায় নেয়। ট্রেনে যাত্রীদের সুটকেসগুলোকে দেখাচ্ছে অতি ব্যবহারে জীর্ণ। ক্ষয়ে যাওয়া। রশি দিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা বাঁধা আর কার্ডবোর্ড দিয়ে তালি মারা। ফরাসিদেরকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা সবাই দেশত্যাগকারী।
কোনও এক শহরের শিল্প-এলাকায়, এক বয়স্ক শ্রমিক যাকে আমি তার ঘরের জানালায় দেখতে পাচ্ছিলাম— সূর্যাস্তের শেষ আলোয়, কোনও কিছু পড়বার জন্য চোখে দিচ্ছে তার চশমাজোড়া আর খুব প্রাজ্ঞের মত দুটি প্রসারিত হাতে খুলে রেখেছে একখানা বই।
স্টেশনে স্টেশনে ব্যস্ত মানুষগুলো বিনা প্রতিবাদে, অনেকটা হার মেনে নিয়েছে এমন ভঙ্গিতে, খেয়ে নিচ্ছে জঘন্য সব খাবার আর তারপর একে একে পৌঁছে যাচ্ছে অন্ধকারে-ডুবে-থাকা শহরগুলোয়, যার সঙ্গে দেখা করবে তার সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ না করায় একা একা মালিশ করছে নিজেদের কাঁধ, তারপর ফিরে যাচ্ছে হোটেলে, ফিরে যাচ্ছে নিজেদের ঘরে, ইত্যাদি। নৈরাশ্য আর নীরবতার একজীবন যেন যাপন করছে সবাই, পুরো ফ্রান্স জুড়ে। কী ঘটতে যাচ্ছে—এমন কিছু একটার জন্য তারা এখন একযোগে অপেক্ষা করছে।
নস্টালজিয়া, অন্য মানুষের জীবনকে ঘিরে। তার কারণ, বাইরে থেকে দেখা হচ্ছে বলেই, সব কিছুকেই বাইরে থেকে দেখা হচ্ছে, তারপর তারা এই দেখা থেকেই এক উপসংহারে, সমগ্রে পৌঁছাচ্ছে। যখন আমাদের জীবন, ভিতর থেকে দেখলে, দেখে নিলে তার প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ, প্রতিটি অন্ধকার কোণ, আরও একবার, ভিতর থেকে দেখতে লাগলে, একাত্মতার এক বিভ্রমের পেছনে আমরা দৌড়াতে শুরু করব।
বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে কী তার কাজ এবং এটা কী নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেন ফুলের এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি আর শুধুমাত্র একটাই নয় কেন?
উপন্যাস। ‘দ্য প্লেগ’ নাম রাখা যাবে না। তবে অনেকটাই ‘দ্য প্রিজনার্স’-এর মত।
প্রুস্তের মতে, এটা কখনোই প্রকৃতি নয় যা থেকে শিল্পকে অনুকৃতি করা হয়। তিনিই প্রকৃত শিল্পী যিনি আমাদের এই শিক্ষা দেন যে প্রকৃতির ভিতর দিয়ে তাকিয়েই তার কাজগুলোকে দেখতে হবে, কীভাবে প্রকৃতির অকৃত্রিম আচরণের ভিতর বসে থেকে সম্ভব করেছে তার অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা। সব নারী রেনোয়াঁর শিল্পকর্ম হয়ে গেছে।
দ্য আউটসাইডার এবং সমালোচকগণ : তারা বলছেন অসম্ভব পরিস্থিতি, অসম্ভব। ভুল শব্দ। তার চেয়ে বরং ‘মুক্তি’ শব্দটাকেই যথার্থরূপে প্রয়োগ করা যেত।

 
আলবেয়ার কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ২ 

 

 

ঈশ্বর আর এই ব্রহ্মাণ্ড কখনোই বদলাবে না আর এর কারণগুলোও তাদের ঐকতানের ভিতর পতিত হয়েছে। এখানে সবকিছুকেই একবারের জন্য দেয়া হয়েছে আর সবার জন্যই একই নিয়ম। এটা হল আমাদের কাজ, যদি আমরা খুবই আনন্দিত হই, তাহলে আমরা খুঁজে বের করব সেই কারণগুলোকে আর খুঁজে বের করব তার পরিণতিকে (জ্যামিতিক অস্তিত্ত্বের কারণে), কিন্তু ইতোমধ্যেই তা সম্পূর্ণতা পেয়ে গেছে এবং তা অনাদিকাল থেকেই বিরাজমান। এখানে, এই ব্রহ্মাণ্ডের অগ্রযাত্রার আর কিছুই বাকি নেই। তবে, এর কোনও ট্র্যাজেডি নেই, কারণ তার কোনও ইতিহাস নেই। সব কিছুই এখানে নির্মম, নির্দয়। যে-কেউ ইচ্ছা করলেই ঘটিয়ে ফেলতে পারে। এটা হল সাহসীদের দুনিয়া।
এখানে, সব কিছুকেই একবারের জন্য দেয়া হয়েছে, সবার ক্ষেত্রেই এক নিয়ম। সুতরাং, পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে যাওয়া জরুরি প্রয়োজন। প্রয়োজন এখানে অসীম। মৌলিকতা আর সুযোগ সব সময় কাজ করে না। সব কিছুই এখানে একঘেয়ে।
মানুষকে ‘যৌনজীবন’ দেয়া হয়েছে সম্ভবত তাকে তার উপযুক্ত পথ থেকে বিচ্যুত করতেই। যৌনসঙ্গমের ব্যাপারটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যৌনতাই মানুষের কাছে সবচেয়ে আদিম। সবকিছুর ভিতর, তার সমস্ত ঘুমের ভিতর। এর থেকে চোখ ফিরিয়ে বাইরে তাকালে, আবার সবকিছু জীবনে ফিরে আসে। ঠিক একই সঙ্গে আমাদের প্রজাতির কাছে কৌমার্যের বা কুমারীত্বের অবসান হয়।
একজন লেখক কখনোই তার সৃষ্টির বিষয়ে তার সংশয় নিয়ে কিছুই প্রকাশ করবেন না। তাতে, খুব সহজেই লেখককে বলা হবে : ‘কে আপনাকে সৃষ্টি করতে বাধ্য করেছে? যদি এই সংশয়ের ভার নিদারুণ হয়, অবিরাম চলতে থাকে, তবে কেন লেখক তাকে বহন করে চলবেন?’ হ্যাঁ, আমাদের সংশয়গুলো আমাদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, যা লেখক বলেই আমাদের মাঝে বিদ্যমান। কক্ষনোই তার সংশয় নিয়ে কথা বলা যাবে না–তা যা-ই হোক না কেন?
‘উইদারিং হাইটস’ হল অন্যতম একটি মহৎ প্রেমের উপন্যাস, কারণ এর সমাপ্তি হয়েছে ব্যর্থতা আর বিদ্রোহে–আমি আসলে আশাহীন মৃত্যুকেই বোঝাচ্ছি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হচ্ছে এক অশুভ আত্মা। এমনও প্রেম আছে যা প্রবহমান থাকে কেবলই ব্যর্থতায়, আর এই ব্যর্থতা হল মৃত্যু। একমাত্র নরকেই তা নিরবিচ্ছিন্ন থাকে।
উঁচু উঁচু বৃক্ষের জঙ্গলকে অবিরাম বৃষ্টিতে লাল দেখাচ্ছে, চারণভূমি হলদে পাতার চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। শুকন মাশরুমের গন্ধ, কাঠের আগুন (জ্বলতে থাকা দেবদারু গাছের কয়লা এমন নিভু নিভু, যেন তারা নরকের হীরা।), মত্ত বাতাস ঘরের চারপাশে, বেদনা ও অনুতাপে যেন চাপা আর্তনাদ করছে। এখন, এখানে কেউ কি চিরচেনা সেই শরৎকাল খুঁজে পাবে? চাষিরা এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে, যেমন করে তারা সব সময় হাঁটে—ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির বাধা অতিক্রম করে!
‘দ্য প্লেগ’-এর আছে এক সামাজিক এবং অধিবিদ্যামূলক অর্থ। সত্তার প্রকৃতি ও জ্ঞান সংক্রান্ত দর্শনের এক বিশেষ অর্থ কিংবা উদ্দেশ্য। একেবারে যথার্থরূপে এই কথাই বলা যায়। আউটসাইডারে, এই অর্থ বা অভিপ্রায়ের অস্পষ্টতা কিংবা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান।
কাফকা’র সমস্ত শিল্প তাঁকে পুনর্বার পড়বার জন্য আমাদের প্রস্তুত হবার ভিতর ঘুমিয়ে থাকে।
পাইন গাছগুলি- হলদে পরাগরেণু আর তাদের সবুজ পাতার উল্লাস!
একজন বুদ্ধিজীবী? হ্যাঁ, এবং তাকে কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। বুদ্ধিজীবী হলেন এমন একজন ব্যক্তি যার মন নিজেই নিজেকে দেখতে থাকে। আমি এই ব্যাপারটা পছন্দ করি, কারণ আমি নিজেই দুটি সত্ত্বা-কে ধারণ করছি- আমিই দর্শক আবার সেই আমিই নিজেকে দেখাচ্ছি। ‘তারা কি দুইয়ে মিলে এক হতে পারে না?’ এটা একটা প্রায়োগিক প্রশ্ন। আমাদেরকে অবশ্যই এর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিকে আমি এই দৃষ্টিতেই বোঝে থাকি : ‘আমি কোনওভাবেই আমার সংশয়গুলোকে বহন করতে পারছি না।’ আমি আমার চোখগুলোকে সব সময় খোলা রাখতে পছন্দ করি।
সারাটা জীবন ধরে আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বকে একটা নির্দিষ্ট আকার দিতে আবিরাম চেষ্টা করি। যদি আমরা নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে জেনে যাই, আমরা মারা যাব।
ম্যাডনেস– একটি দিনের যাত্রা শুরুর পক্ষে এক মহৎ বিন্যাস– দিবাকর। আকাশ আর অস্থি। ম্যাজিক। জানলায় একটি আঙুল, উদ্দেশ্যহীন।
বিপ্লব, গৌরব, মৃত্যু, এবং প্রেম। আমার ভেতরকার সেইসব আলো-অন্ধকার, যাতে ছাপ পড়ে আছে গভীর এক বোধ, এক তীব্র সত্য; সেই দিক থেকে- কী বিশেষ তাৎপর্য আছে তাদের আমার কাছে? ‘আর সেই ব্যাপারটা?’‘কান্নার সেই প্রবল ধারাস্রোত?’ সে বলল, ‘মৃত্যুতেই আমি যার সমস্ত স্বাদকে খুঁজে পেয়েছিলাম।’
প্যারিস- তার সমস্ত আবেগ আর কোমলতা। সেই বিড়াল, শিশু আর লোকজনের সরল ও সাবলীল মনোভাব; আর- রঙের সেই অদ্ভুত ধূসরতা, সেই আকাশ, জল-পাথরের সেই প্রশান্ত প্রদর্শনী।

 
আলবেয়ার কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ৩ 

 

কাফকার সমস্ত সৃষ্টি, সমস্ত শিল্পকর্ম ঘুমিয়ে থাকে তাকে পুনর্বার পড়বার জন্য আমাদের নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়ার ভিতর। যেভাবে তার বই শেষ হয়,- কিংবা তারা আসলেই যেভাবে শেষ হতে চায় না, দাবি করে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যার, যা কখনোই যথাযথভাবে বলা যাবে না কোনভাবেই এবং যা আমাদেরকে বাধ্য করে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পটিকে পুনরায় পাঠ করতে, যাতে গল্পের ভিত্তিটি আমরা খুঁজে বের করতে সফল হই।

 

নভেম্বর ১১, যেন একটি ইঁদুর আটকা পড়েছে ফাঁদে।
এই মাসের সকালগুলোয় দেখা যায়, চারপাশের সবকিছু ঢেকে গেছে সাদা তুষারে, আকাশ উজ্জ্বল হয়ে সেখানে, যেখানে এক অনিন্দ্য-ঐতিহ্যময় গ্রাম্য মেলার চত্বরকে ফুলপাতা আর লম্বা করে কাটা কাগজের সরু টুকরো দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, তার ঠিক পিছনে, দীপ্তিময় আলোয় উদ্ভাসিত হয়। দশটার সময়, সূর্য যখন তাপ ছড়াতে শুরু করে, তখন, ঠিক তখনই প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্যাবলী যেন একটু একটু করে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে শুরু করে এক আচ্ছন্ন করে দেয়া স্ফটিক-স্বচ্ছ কোমল সঙ্গীতের মূর্ছনায়, কেননা তখন বইতে শুরু করে হাওয়া আর তাতেই যেন গলতে শুরু করে তুষার : অতি সন্তর্পণে তুষারের স্তূপ ভাঙতে শুরু করে যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে গাছগুলি, জমাট হিম এমনভাবে ওপর থেকে গড়াতে গড়াতে নামতে শুরু করে নিচে, যেন তাদের এই অবিরাম নেমে আসবার তালের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে শুভ্র কীটপতঙ্গদের একের ওপর অন্যের টপাটপ পড়তে থাকার প্রায় শুনতে না পাওয়া শব্দ, এখনও ঝরে পড়েনি এমন পাতারা অন্তহীন অবিরাম ঝরছে জমে থাকা বরফের ভর সামলাতে না পেরে; এবং, মরা মাকড়শার পলকা শরীরের মত মাটিতে পড়ছে তারা এমনভাবে যেন কোনোমতে কেবল স্পর্শটুকুই করতে পারছে! চারপাশের পাহাড় আর উপত্যকাগুলি ধোঁয়াশায় ঢেকে গিয়ে দৃষ্টিসীমা থেকে ক্রমশ আবছা হয়ে গেছে। আপনি যদি এই আবছা হয়ে যাওয়া দৃশ্যের দিকে নির্দিষ্ট কিছু সময় ধরে তাকিয়ে থাকেন, উপলব্ধি করতে পারবেন- তাদের নিজস্ব রঙ যেন হারিয়ে গেছে। পুরো ভূভাগ যেন হঠাৎ করেই বয়োবৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই ভূমি পৃথিবীর বুকের বহু পুরনো একটি দেশ যা মাঝে মাঝে একটিমাত্র ভোরের প্রথম আলোর ভিতর দিয়ে আমাদের কাছে ফিরে ফিরে আসছে কয়েকহাজার বছর ধরে… পাহাড়ময় এই ভূমিখণ্ডের সর্বত্র বৃক্ষরাজি আর ফার্ন, শুধুমাত্র দুইটি নদীর সংযোগের মাঝখানে; যেন তারা একটি জাহাজের সূচাল অগ্রভাগ। যখনই, সূর্যের প্রথম রশ্মিগুলি এই অঞ্চলটাকে তুষারহিমের কবল থেকে মুক্ত করে দিতে থাকে, তখন মনে হয় এই পাহাড়জঙ্গল যেন পৃথিবীর মাঝখানের একমাত্র জীবিত কিছু, শুভ্রতা বিস্তার করছে, আর এমনটা করতেই থাকবে অনাদিকাল ধরে। এখানে, অন্তত দুটি জলপ্রবাহের সম্মিলিত তরঙ্গস্বর অন্তহীন নীরবতার সঙ্গে যেন যুদ্ধ করছে। নীরবতা তাদের ঘিরে রেখেছে চারপাশ থেকে। কিন্তু একটু একটু করে জলের এই তীব্র স্রোত, এই তরঙ্গরোল নিজেকে এই পুরো অঞ্চলটাতেই মিশিয়ে দিয়েছে। অসীম নীরবতার মাঝখানে নিজেকে ধীরে ধীরে বিস্তার করা ছাড়া যেন তার আর কোনও উপায় ছিল না। তাই তার প্রয়োজন তিনটি ছাইরঙা কাক, জীবনের চিহ্ন হয়ে যারা আচমকা আকাশের বুকে উড়তে থাকবে।
কাফকার সমস্ত সৃষ্টি, সমস্ত শিল্পকর্ম ঘুমিয়ে থাকে তাকে পুনর্বার পড়বার জন্য আমাদের নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়ার ভিতর। যেভাবে তার বই শেষ হয়,- কিংবা তারা আসলেই যেভাবে শেষ হতে চায় না, দাবি করে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যার, যা কখনোই যথাযথভাবে বলা যাবে না কোনভাবেই এবং যা আমাদেরকে বাধ্য করে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পটিকে পুনরায় পাঠ করতে, যাতে গল্পের ভিত্তিটি আমরা খুঁজে বের করতে সফল হই। মাঝে মাঝে তার বইকে দুই বা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাখ্যা করা যেতেও পারে; এবং এই ব্যাখ্যা দেবার জন্য বইগুলোকে দুই থেকে তিনবার পড়তেও হতে পারে। কিন্তু মারাত্মকরকমের ভুল হয়ে যেতে পারে কাফকার লেখাগুলোকে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে। একটি প্রতীক সব সময়ই থাকে এক সাধারণ স্তরে বা পর্যায়ে; এবং, একজন শিল্পী প্রতীকটিকে মোটামুটি উপযোগী কিংবা হতে পারে অদ্ভুতভাবেই রূপান্তরিত করে ফেলতে পারেন। শব্দকে অনুবাদের জন্য শব্দ কখনোই অস্তিমান বা বিদ্যমান থাকে না। কেবলমাত্র শব্দের সাধারণ চলন থেকেই এর অর্থকে খুঁজে বের করা যায়। যতটা কাছাকাছি যাওয়া যায়, শব্দ সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা নিয়ে আরেক শব্দের কাছে, আমরা তখন শব্দ থেকে শব্দকে খুঁজে বের করে নেবার সুযোগটা পেতে থাকব, আর এই ব্যাপারটাই সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এক মহৎ সম্মান।
কারুর প্রবল উৎসাহ, ঘৃণা কিংবা ক্রোধের তীব্র অনুভূতির সঙ্গে বেঁচে থাকবার মানেই হল সেই একজন আসলে বাস করছে প্রচণ্ড দুর্দশার মধ্যে, যা বোঝায় এই দুই বিপরীতধর্মী অবস্থানের ভারসাম্য, একটি সংশোধনক্ষম অবস্থা, একীভূত করা আর তার মধ্যেই জীবনটাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করা। যখনই একজন ব্যক্তি কিছু শিখে ফেলে—বই পড়ে নয়—তার দুর্ভোগের সঙ্গে তার নিজের অস্তিত্বের অন্তরঙ্গতাটুকু অবশিষ্ট থাকে, যেখানে সে হয়ে পড়ে চরম নিঃসঙ্গ; তার আকাঙ্ক্ষাগুলোকে অতিক্রম করবার জন্য সে দৌড়ে পালিয়ে যায় আর তখন তৈরি হয় এক বিভ্রম, যেখানে অন্যান্য ব্যক্তি নিজেদেরকে ব্যক্ত করে অন্যের কাছে আর তার ক্ষেত্রে আরও কিছু শিখে নেবার বিষয় বাকি থেকে যায়।
এই উদ্ভট নিরর্থক কিম্ভূতকিমাকার বিশ্বকে কেবল নান্দনিকভাবেই সমর্থন করা যায়।
প্লেগ। দ্বিতীয় বার লেখবার পর।
মূলত, প্রথম তিনটি পর্বই লিখিত হয়েছিল ডাইরিতে—নোটবুকে—নোট আকারে, লেখবার ভাবনা এসেছিল ধর্মোপদেশ থেকে, বিভিন্ন আলোচনা গ্রন্থ থেকে, এবং বইটি লিখবার লক্ষ্যসমূহ, যা নিজের ভিতর থেকে কেউ যেন ঠিক করে দিচ্ছিল, দাবি করছিল গভীর মনোযোগ, এবং; বইটিকে বোঝবার জন্য যেন উন্মুখ হয়ে ছিল। শেষের পর্বটি বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লিখিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে একটি সাধারণ উদ্দেশ্য প্রকাশ হয়ে পড়েছিল এবং খুব নিঃসঙ্গভাবেই তারা প্রকাশিত হচ্ছিল। প্রত্যেকটি পর্ব চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিবিড় হবার যোগসূত্র তৈরি করছিল আর পাঠককে তৈরি করছিল এমনভাবে, যেখানে ক্রমশ ঘটনাবলী সংগঠিত হচ্ছে এমন এক একীভবন বা সংমিশ্রণ দিয়ে, যাতে অনেকগুলো ডাইরিকে একটি ডাইরি করে যৌক্তিক শৃঙ্খল তৈরি করা যায়; আর, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় চতুর্থ পর্বের দৃশ্যাবলীর মাধ্যমে।
শত্রুতা আর উষ্ণতা বা আন্তরিকতার অবস্থান একই সঙ্গে, একই সময়ে। সিনেমায় সবকিছুই যেন মিটমাট হয়ে যায়, একাত্মবোধ তৈরি হয় অদ্ভুতভাবে, মানুষ যেখানে নিজেকে অন্য আরেকজনের সঙ্গে নিজেদের সহজেই মিশে যায়, পরস্পরকে যা জেনেই।
প্লেগের মাধ্যমে আমি বলতে চেয়েছি সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিটাকে, আমরা সবাই যার শিকার, যেখানে আমরা সবাই শাস্তি ভোগ করছি আর এখানে বিরাজ করছে ভয়- প্রদর্শন, হুমকি, গুম, হত্যা… আর এসব থেকেই তৈরি হচ্ছে চরম এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি; আর, আমরা যেখানে বাস করতে চাইছি, সেখানে আমাদের জন্য যেন অনিবার্য হয়ে আছে, নির্বাসন। একই সঙ্গে একই সময়ে আমি আমাদের অস্তিত্বের সাধারণ ধারণাটিকে বোঝাবার জন্য ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করছি।
কারণ, আকাশ নীল, নদীকূলের বৃক্ষগুলি তুষার-চাদরে ঢাকা; বৃক্ষেরা তাদের শুভ্র ডালপাতা নিয়ে ঝুঁকে পড়েছে হিমে জমে যাওয়া জলের ওপর, যেন জলকে স্পর্শ করলেই তার জীবন। তাদের দেখে মনে হচ্ছে ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া বাদামের গাছ। এই দেশ আমাকে এমন এক চক্ষু উপহার দিয়েছে, যাতে বসন্ত আর শীতের ব্যবধান বোঝবার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক অপরিবর্তনীয় বিভ্রান্তি!

 

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক(১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ৪ 

 

 

মে, ১৯৩৫
আমি যা বোঝাতে চাই, তা হল– রোমান্টিসিজম বাদ দিয়ে হারানো দরিদ্রতার জন্য কেউ একজন অনুভব করবেন, নস্টালজিয়া। অতীতস্মৃতিবিধুরতা।
কপর্দকহীন হয়ে জীবনের নির্দিষ্ট কিছু বছর বেঁচে থাকাটাকে, আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় এই কারণে যে, একটি পূর্ণাঙ্গ চেতনাবিশ্ব বা প্রকৃত সংবেদনশীলতা অর্জনের জন্য এই সময়টুকু দরকার। এই ধরণের বিশেষ পরিস্থিতিতে বা অবস্থায় আমাদের অদ্ভুত অনুভূতি হল এটাই যে, জন্মদাত্রীর সমস্ত সংবেদনকে ধারণ করছে তার পুত্র। মা সন্তানের ভিতরে অবিকল তার সংবেদনকে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। তার ছেলেবেলা থেকে বহন করা সেইসব সুপ্ত বস্তুগত স্মৃতিগুলি (আত্মার সঙ্গে তা যেন আঠা দিয়ে লাগানো থাকে) তার কাছে ব্যাখ্যা তৈরি করে কেন অনুভূতির বা অনুভবের পদ্ধতি নিজেকে গড়ে তোলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন ভিন্ন রূপে।
যে-কেউ তার নিজের উদ্দেশ্যে এই কথা বলতে পারে, তার নিজের ভিতর এই তাড়না জাগতে পারে, যাতে সে অনুভব করে কৃতজ্ঞতা, এবং পরবর্তীতে এক অপরাধী বা দোষী নীতিচেতনা। যদি সে তার শ্রেণিগত অবস্থান থেকে অন্য শ্রেণিতে স্থান বদল করে, তাহলে দুইটি শ্রেণির মধ্যেকার তুলনাও তাকে দেবে এই অনুভূতি– ইতোমধ্যেই সে তার মহৎ সম্পদ খুইয়ে বসেছে।
আর ধনী লোকেরা সব সময় ভেবে থাকে, আকাশ আসলে তেমন বিশেষ কিছুই নয়, এ না থাকলেও চলে, এ আসলে প্রকৃতির দান। অন্যদিকে, বিত্তহীনরা আকাশ দেখে, যেভাবে তারা সত্যিকার অর্থেই কোনও কিছু দেখে থাকে, তারা মনে করে– আকাশ ঈশ্বরের এক অসীম অনুগ্রহ।
যখন আমার মায়ের চোখগুলি আমার উপর স্থির না হয়, আমার দিকে কোনভাবেই তার দিকে তাকানো সম্ভব হয় না, যতক্ষণ না আমার চোখ থেকে কান্নার জলফোঁটাগুলি শুকিয়ে যায়।
একটি দোষী বা অপরাধী নীতিচেতনার দরকার হয় স্বীকারোক্তির। একটি শিল্পকর্মই হল একটি স্বীকারোক্তি; আর অবশ্যই আমাকে সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিল করতে হবে।
যখন আমি পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে, এই জগতের সকল বস্তুকে দেখব, আমার তখন মাত্র একটি কথাই বলবার থাকবে। এই ব্যাপারটা নিহিত ছিল দারিদ্র্যময় জীবনে, সেইসব অনর্থক, অসার, অপদার্থ, নিষ্ফল কিংবা বিনয়ী মানুষেরাও, অনুভব করতে পেরেছে; আমি নিশ্চিতভাবেই স্পর্শ করব তাকে, যা হল জীবনের খাঁটি অর্থকেই অনুভব করা। শিল্পের কাজগুলি হয়ত কখনোই আমাদেরকে তা দেখিয়ে দেবে না, এবং শিল্প আমার কাছে অবশ্যই সব কিছু নয়। তবে শিল্পকে জীবনসন্ধানী হওয়ার একটি উপায় হতে দেওয়া উচিত।
যেখানে কাপুরুষতার ছোট্ট অভিনয়কেও গণনা করা হচ্ছে, সময় স্বয়ং যেন লজ্জিত। যে পদ্ধতিতে একজন আরেকজনের জগত নিয়ে ভাবনা করছি, সেই জগতটা হল টাকার জগৎ। পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা ছাড়াই আমরা ভাবছি।
আমি চিন্তা করি যে, দারিদ্র্যের জগৎ আসলে একটিই যা নিজেকে নিজেই সম্পূর্ণরূপে বদলে ফেলতে পারবে, সমাজের মধ্যে একটি বিশেষ দ্বীপ হিসেবে যা একটি আকার নিতে পারে। যাদের যথেষ্ট টাকা নেই, তারা খেলা করতে পারবে রবিনসন ক্রুসোয়, সেখানে হয়ত আরও কয়েকজন এমন থাকবে, যারা লাফ দিয়ে নিচে আসবার কালে, প্রতিবেশি ডাক্তারকে নিয়ে কথা বলবে।
সবকিছু যথার্থরূপে বিশ্লেষিত হবে, মা আর পুত্রের উপর চালিত এক বিশেষ পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়ে।
এইমাত্র আমি যা যা লিখলাম, তার সবটুকুই সাধারণ কিছু ক্ষেত্রে বা বিষয়ে প্রযোজ্য কিনা, তা ভেবে দেখলাম।
যখনই কেউ কোনও বিশেষ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চায়, তখনই সবকিছু হয়ে পড়ে আরও বেশি জটিল এবং দুর্বোধ্য–
০১- পারিপার্শ্বিকতা। নিকটবর্তী এলাকা এবং তার অধিবাসীরা।
০২- সেই মা, এবং তিনি যা কিছু করেছেন।
০৩- মা আর পুত্রের মধ্যেকার সম্পর্ক।
এসবের সমাধান কী? কে মিলিয়ে দিবে? সেই মা?
একটি অধ্যায়ের শেষ হচ্ছে এই বর্ণনার মধ্যে দিয়ে- কীভাবে মায়ের প্রতীকীমূল্য অস্তিত্ববান হয়ে উঠছে তার পুত্রের নস্টালজিয়ার ভিতর দিয়ে।
আত্মগর্ব বা অন্তঃসারশূন্যতাকে আমরা যে শব্দে প্রকাশ করতে পারি, তা হল- অভিজ্ঞতা। আপনি কখনোই অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন না, কোনোরকম ঘটনা কিংবা পরীক্ষার ভিতর দিয়ে না গিয়ে। আপনার পক্ষে অভিজ্ঞতাকে সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়। আমাদেরকে অবশ্যই এর ভিতর দিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য, যথার্থ রূপে বললে, ধৈর্যই অভিজ্ঞতা। ধৈর্য না বলে একে সহনশীলতাও বলা যায়। আমরা খুব ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করব, অথবা, ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করব।
আমাদের অভিজ্ঞতাগুলি যখন আমরা অভিজ্ঞতা থেকে ঘটনা কিংবা চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রকাশিত হই, আসলে আমরা তখন কোনোভাবেই বিচক্ষণ বা প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠি না, হয়ে উঠি দক্ষ। কিন্তু, কেন?

 

 

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ৫

 

 
পাইন গাছগুলি- হলদে পরাগরেণু আর তাদের সবুজ পাতার উল্লাস!
একজন বুদ্ধিজীবী? হ্যাঁ, এবং তাকে কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। বুদ্ধিজীবী হলেন এমন একজন ব্যক্তি যার মন নিজেই নিজেকে দেখতে থাকে। আমি এই ব্যাপারটা পছন্দ করি, কারণ আমি নিজেই দুটি সত্তাকে ধারণ করছি- আমিই দর্শক আবার সেই আমিই নিজেকে দেখাচ্ছি। ‘তারা কি দুইয়ে মিলে এক হতে পারে না?’ এটা একটা প্রায়োগিক প্রশ্ন। আমাদেরকে অবশ্যই এর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিকে আমি এই দৃষ্টিতেই বোঝে থাকি : ‘আমি কোনোভাবেই আমার সংশয়গুলোকে বহন করতে পারছি না।’ আমি আমার চোখগুলোকে সবসময় খোলা রাখতে পছন্দ করি।
সারাটা জীবন ধরে আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বকে একটা নির্দিষ্ট আকার দিতে আবিরাম চেষ্টা করি। যদি আমরা নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে জেনে যাই, আমরা মারা যাব।
ম্যাডনেস– একটি দিনের যাত্রা শুরুর পক্ষে এক মহৎ বিন্যাস– দিবাকর। আকাশ আর অস্থি। ম্যাজিক। জানলায় একটি আঙুল, উদ্দেশ্যহীন।
বিপ্লব, গৌরব, মৃত্যু, এবং প্রেম। আমার ভেতরকার সেইসব আলো-অন্ধকার, যাতে ছাপ পড়ে আছে গভীর এক বোধ, এক তীব্র সত্য; সেই দিক থেকে- কী বিশেষ তাৎপর্য আছে তাদের আমার কাছে? ‘আর সেই ব্যাপারটা?’ ‘কান্নার সেই প্রবল ধারাস্রোত?’ সে বলল, ‘মৃত্যুতেই আমি যার সমস্ত স্বাদকে খুঁজে পেয়েছিলাম।’
প্যারিস- তার সমস্ত আবেগ আর কোমলতা। সেই বিড়াল, শিশু আর লোকজনের সরল ও সাবলীল মনোভাব; আর- রঙের সেই অদ্ভুত ধূসরতা, সেই আকাশ, জল-পাথরের সেই প্রশান্ত প্রদর্শনী।
নভেম্বর, ’৪২।
এবারের হেমন্তে, বর্ণিল পাতায় পাতায় চারপাশ ছেয়ে গেছে—চেরি গাছগুলি হয়েছে লাল, ম্যাপল হয়েছে হলদে আর বিচ গাছগুলি যেন ব্রোঞ্জের পোশাকে সজ্জিত। সমস্ত মালভূমি, দ্বিতীয় বসন্তের সহস্র সৌন্দর্যশিখায় ছেয়ে গেছে পুরোপুরি।
যৌবন চলে যাচ্ছে। এ তবে আমি নই, যে কিনা মানুষ আর অন্য সবকিছু থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে (আমি কখনই তা করতে পারব না), কিন্তু মানুষ আর অন্য সবকিছুই আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। আমার যৌবন আমার কাছ থেকে উড়ে চলে যাচ্ছে আর এটাই হল নিজেকে অসুস্থ ভাববার মোক্ষম উপায়।
একজন লেখকের জন্য একেবারে প্রাথমিক শর্ত হল স্বর পরিবর্তন কিংবা বিভিন্নমাত্রিক ভাবনার স্থানবিন্যাস করার শিল্পকৌশলকে আয়ত্ত করে ফেলা। অন্যরা ঠিক কী অনুভব করতে চাইছে সে সম্পর্কে তার নিজের অনুভূতিটাকে বুঝতে শেখা। তবে, হঠাৎ প্রথমবারেই লেখক হয়ত সফল হবেন। কিন্তু পরবর্তীতে, অবশ্যই প্রজ্ঞার প্রশ্নটি চলে আসবে এবং ভাবনার সমস্ত স্থান দখল করে নেবে। আর এইভাবে আমাদের প্রজ্ঞা বা প্রতিভা একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হয়ে বিরাজ করতে থাকবে।
সেন্ট স্তেফান চার্চ।
আমি জানি খেটে খাওয়া একজন দরিদ্র মানুষের কাছে রবিবার ব্যাপারটা কী। আবার, রবিবার সন্ধ্যার মানে কী তার অর্থও আমি জানি। আর আমি যদি এখন কী কী জানি তার সব অর্থ বলে দিই আর তাদের অর্থের এক একটি মূর্তি গড়ে তুলি, তাহলে আমি এক দরিদ্র ব্যক্তির রবিবারকে মানবজাতির জন্য কাজ করবার দিন হিসেবেই গড়ে তুলব।
হয়ত লিখিতই আছে, তবু আমার জন্য ব্যাপারটা ভয়ানকরকম বিস্ময়কর : দুনিয়াটা যদি একেবারে সহজ, সরল হত, তাহলে আমাদের কাছে শিল্প বলে কিছুই আর থাকত না, — তবে, আমি যদি খুঁজে বের করি যে এই বিশ্বের কোনো একটি তাৎপর্যময় অর্থ আছে, তাহলে আমার পক্ষে আর কিছুই লেখা সম্ভব নয়।
এখানে এমনকিছু বিশেষ পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে বিনয় কিংবা নিরভিমান দাবি করে যে সে থাকবে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে। এই ধারণাটিকে একটি বিশেষ সূত্রের সঙ্গে যুক্ত করলে, খুব সতর্কতার সঙ্গে আমার মনে কিছু ভাবনার জন্ম হবে আর শেষ পর্যন্ত এটা দাঁড়াবে যে আমি কোনোভাবেই জটিলতাটাকে লিখে উঠতে পারব না।
লাগামহীম যৌনতা পৃথিবীর এক অনর্থক দর্শনকে প্রধানরূপে তুলে ধরে। তার বিপরীতে, কৌমার্য পৃথিবীকে অর্থময়তার দিকে নিয়ে যায়।
কিয়ের্কেগার্দ। বিবাহের এক সৌন্দর্যতাত্ত্বিক মূল্যবোধ। চূড়ান্ত বা সুচিন্তিত ধারণাগুলো কিন্তু অতিমাত্রায় শব্দের বাহুল্য।
কখন, ঠিক কখন আমাদের এই জীবন নিয়তির দ্বারা পরিবর্তিত হয়? যখন আমরা মারা যাই? কিন্তু এটা হল অন্য মানুষের নিয়তি- ইতিহাসের কিংবা একটি পরিবারের। কিন্তু আমাদের সচেতনতা কোথায়? এ হল আমাদের মনের একটি অবস্থা যা নিয়তি হিসেবে আমাদের জীবনের এক ছবি তৈরি করে ফেলে আর এই ছবি তৈরি করে একধরণের সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা, যেখানে আর কারও অস্তিত্ব থাকে না। দুইক্ষেত্রেই আমরা কুহক কিংবা অলীকতা নিয়েই জীবনের মুখোমুখিতে দাঁড়াই। উপসংহার? এখানে কি নিয়তি বলে কিছু আছে?
এই দেশে, শীত অন্যান্য সব রঙ এমনভাবে মুছে দিয়েছে যে মনেই হবে না সাদা ছাড়া আর কিছু আছে, ক্ষীণ শব্দগুলি যেন শুরু থেকেই প্রবল তুষারপাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়েছিল, সব সুগন্ধ যেন আদিকাল থেকেই প্রচণ্ড হিমে জমে গিয়েছিল। বসন্তের প্রথম উন্মাদ হাওয়ায় ঘাসফুলগুলিকে মনে হচ্ছে যেন আনন্দের হল্লা, যেন সংবেদনের ট্রাম্পেট উল্লাসে ফেটে পড়ছে।
আলজেরিয়ায় রাতের বেলা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ইউরোপের তুলনায় দশগুণ বেশি শোনা যায়। আর এই তীব্র ডাক আমাদের স্মৃতিকাতর করে তোলে। আমাদের আবদ্ধ, স্থবির দেশে আমরা একটি ঘরের জন্য হাহাকার করতে থাকি। এই ব্যাপারটা আমার ভিতর ভাষার আকার নিচ্ছে, আজ আমি আমার স্মৃতির ভিতর একা-একা শব্দগুলিকে শুনছি।
একটা প্রশ্ন করি : আপনি কি এই ধারণাগুলিকে ভালবাসেন আপনার তীব্র অনুভূতি দিয়ে, রক্ত দিয়ে? এইসব চিন্তা বা ধারণাগুলি কি আপনাকে জাগাতেও পারে? আপনি এই অনুভবটুকু কখনও করতে পেরেছেন যে চিন্তাগুলি দিয়ে আপনি আপনার জীবনটাকে একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে পেরেছেন? কতজন গভীর চিন্তাশীল মানুষ একসময় পিছিয়ে পড়েছেন!
আমার নাটকগুলির প্রকাশনার জন্য : ক্যালিগুলা- ট্র্যাজেডি, নির্বাসন (অথবা, বুদযোভিখ)- কমেডি।
সেই মুহূর্তে, যখন তুষারে ঢাকা পড়েছে সবকিছু, আমি তখন দেখছিলাম দরজা জানালাগুলি নীল হয়ে গেছে!
দরিদ্রতায় বিপন্ন এক ছেলেবেলা। রেইনকোট শরীরের মাপের চেয়েও বড়— সিয়েস্তা। ভিঙ্গা বিয়ারের বোতল— ফুফুর ঘরে, রবিবার। অজস্র বই—দ্য টাউন লাইব্রেরি। ক্রিসমাসের রাতে নিজের ঘরে ফিরছিলাম। রেস্টুরেন্টের সামনে মৃতদেহ। পড়ে আছে। সেলারে, খেলা চলছে— জিনে, জোসেফ আর ম্যাক্স।

 

 

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ৬

 
জানালার বাইরে একটা বাগান, কিন্তু আমি শুধু তার দেয়ালগুলোকেই দেখছি। আর কয়েকটি ডাল যেন আলোকপ্রবাহে উচ্ছ্বল হয়ে পড়েছে। আর একটু ওপরে, দেখলাম আরও কিছু ডাল নিজেদের সীমানাকে বিস্তৃত করেছে, আর তাদের মাথার অনেক ওপরে জ্বলে আছে সূর্যটা। বাতাসের বিজয়ী উল্লাস চারপাশটাকে কেমন সজীব করে তুলেছে, মনে হচ্ছে পুরো বিশ্বে যেন এই আলোক-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি শাদা পর্দায় বিম্বিত ডালগুলোর আলোছায়ার খেলা…
দুটি চরিত্র, তাদের একজনের আত্মহত্যা।
যেন ফুলগুলি সূর্যকে তাদের আত্মা দিয়ে ধরে রেখেছে।
ফিয়েসোলে, ইতালি : আমরা অবিরাম লড়াই করছি আর যাতনা সহ্য করছি, আমাদের নিঃসঙ্গতাকে পুনর্বার জয় করবার জন্য। কিন্তু আমরা জানি এমন একদিন আসবে মা-ধরিত্রী তার সেই সরল আর সেই আদিম হাসিটি হেসে উঠবে।
ফিয়েসোলের প্রতিটি স্ট্রিট-কর্নারে তাকে পাবে যাকে তুমি বুকে টেনে নেবে নিঃশ্বাসে- লরেলের ঘ্রাণ।
রোববার
উত্থাল পার্বত্য হাওয়া আমাদেরকে পেছন থেকে যেন জাপটে ধরে, এমনি উন্মাতাল; আর- যেন ঠাট্টা করছিল আমাদের সঙ্গে, চিৎকার করছিল আমাদের কানের কাছে। পুরোটা ফরেস্ট যেন উন্মাদ হাওয়ায় টুইস্ট করছে। উপত্যকার ওপরে লাল রঙের ফার্নগুলি এক পর্বত থেকে অন্য পর্বতে উড়ে চলেছে। আর, এই সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে একটি কমলারঙের অপরূপ পাখি।
পুরুষ নার্সদের একজন সাংবাদিকদের বলল : ‘আপনাদের কাগজে এসম্পর্কে কিছুই লিখবেন না। সে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট যন্ত্রণা ভোগ করে ফেলেছে।’
মৃত্যু আর একজন লেখকের কাজ। মৃত্যুর মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে তার শেষ লেখাটিও পঠিত হয়ে গেছে। তিনি এবারও বলতে পারেননি যা তার বলার ছিল। লেখাটিকে পুড়িয়ে ফেলতে বললেন তিনি, এবং মারা গেলেন যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে, সহানুভূতিহীন; এবং হৃদয়ে এমন এক ভাঙচুর নিয়ে ঠিক যেন এক ভেঙে যাওয়া সুরের ঐকতান।
নৈঃশব্দ্যের আরাধনার এক প্রগাঢ় মুহূর্ত। মানুষ নৈঃশব্দ্যে পতিত। কিন্তু মাটিপৃথিবীর বুক থেকে উঠে আসছে যে গান এবং এই আমি- যেন এক কারাবন্দি হয়ে আছি পর্বতগুহায়, শিকলপরা, কিন্তু যেন আনন্দে পূর্ণ, কেননা পূর্বে আমারও আকাঙ্ক্ষার সময়-অসময় ছিল। মনে হচ্ছে এখানেই সেই অনন্তকাল সেই চিরন্তনতা আর আমিও যেন তাকে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম। এখন আমি আমার কথাগুলি বলতে পারব। আমি এখনও কিন্তু জানি না কীভাবে আমি স্বয়ং-এর সঙ্গে স্বয়ং-এর ধারাবাহিক উপস্থিতিটুকুর জন্য নিজেকে সময়ের কাছে আমার ইচ্ছাকে প্রকাশ করব। যাকে আমি ঠিক এখনই চাইছি তা সুখ নয় কিন্তু- সচেতনা। একজন ভাবছে সে নিজেই নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে কিন্তু তার জন্য এই দৃশ্যটি দেখাই তো মহাজীবনকে দেখা- একটি জলপাই গাছ সোনালি ধুলোয় দাঁড়িয়ে আছে- আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে, সোজা; কিংবা সকালবেলার সূর্য ঝলসে যেতে শুরু করেছে বেলাভূমিতে আর আমি দেখছি তাদের একসঙ্গে মিশে যাওয়াটা, যেন তা আমার ভেতর ঘটছে। যার জন্য আমি নীতিগতভাবে দায়ী তার সম্ভাবনার জন্য আমি সদা সতর্ক হয়ে আছি। জীবনের প্রতিটি মিনিটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে তার অতিলৌকিক মূল্য, তার এক চিরতরুণ মুখ।
আমাদের সাহিত্য আর সঙ্গীত নগরবাসীর জন্য তৈরি করা হয়। এইভাবে আমরা দর্শনের ইতিহাসকেও তৈরি করি প্রতিটি চিন্তার সিরিয়াস থিম হিসেবে।
এপ্রিল
দুটি গদ্য পাঠালাম। ক্যালিগুলা। লেখায় তাৎপর্য তেমন বিশেষ কিছু নেই। যথেষ্ট প্রাজ্ঞতাও নেই। আলজিয়ার্সে ছাপা হবে। তারপর… ফিরে যাই দর্শন ও সংস্কৃতিতে। অন্য সবকিছুকে ত্যাগ করে : থিসিস।
এই নোটবুকে, প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখে চলেছি। দুই বছরের মতো সময়ে, আরও একটি লেখা লিখে ফেলতে হবে।

 

 

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক (১৯৩৫-১৯৪২) থেকে ৭ 

 

 

প্যারিস। বেপরোয়া বৃষ্টি ও বাতাস হেমন্তের পাতাগুলিকে ছড়িয়ে দিয়েছে এভিনিউ জুড়ে যেন তুমি হেঁটে যাচ্ছ এক স্যাঁতসেঁতে তামাটে লোমশ চামড়ার ওপর দিয়ে।
ট্যাক্সি-চালক লোকটা, নিগ্রো, ১৯৫০-এর প্যারিসে এক স্বভাববিরুদ্ধ সৌজন্যতায়, আমাকে নিয়ে যেতে যেতে বলতে থাকে, থিয়েত্রে ফ্রান্সকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গাড়ি, এই সন্ধ্যায় লোকে পূর্ণ যাত্রাঘরে প্রদর্শিত হচ্ছিল : লা মেইজন দে মলিয়ের।
ফকনার। তরুণ প্রজন্মের লেখকদের সম্পর্কে আপনি কী ভাবেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন : তারা করে চলেছেন এক অন্তহীন অনর্থক কাজ। এর বেশি এই প্রসঙ্গে আর কী-ই-বা বলার আছে। কেউ যদি লিখতেই চায়, লিখতে হলে, আপনাকে অতি অবশ্যই নিজের ভেতরে জেগেওঠা সেই প্রাথমিক সত্যগুলোকে গ্রহণ করতে হবে যা মিশে থাকে আমাদের অন্তর্জগতে, আমাদের শিকড়ে; আপনার কাজকে সেই সত্যগুলোর একটির দিকে চালিত করতে হবে, কিংবা একটি নয়, হৃদয়ের সমস্ত সত্যের দিকে এগিয়ে দিতে হবে- একই সময়ে। সেইসব লেখক, যারা জানেই না কীভাবে আত্মার ঐশ্বর্যের কথা বলতে হয়, যন্ত্রণার কথা বলতে হয়, আলোর কথা বলতে হয়,- তারাই আসলে অন্তঃসারশূন্য লেখক, তাদের কাজের মৃত্যু হয় ঠিক তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কিংবা তাদের মৃত্যুর আগে। গ্যোতে আর শেক্সপীয়র সমস্ত কিছুর ভেতর থেকেও দাঁড়িয়ে যান, দাঁড়িয়ে যেতে পারেন, কারণ- মানুষের হৃদয়ের প্রতি তাদের বিশ্বাস, বালজাক আর ফ্লবেয়ারও ঠিক তেমনি, চিরকালের লেখক তারা।
: এই নাস্তিবাদ বা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের কারণটি কী যা সাহিত্যকে আকীর্ণ করে রেখেছে?
: ভয়। মানুষের যেদিন থেকে ভয় পাওয়া বন্ধ হবে, সেদিনই আবার সে মাস্টারপিস লিখতে পারবে, যা হবে এমন এক কাজ, যাকে বলে চিরকালীন।
আমার সমস্ত কাজই বিদ্রূপাত্মক।
জিদ (আন্দ্রে জিদ)-এর সঙ্গে ডিনার। তাঁর হাতে তরুণ লেখকদের চিঠি, তাতে তাদের জিজ্ঞাসা- তারা কী লেখালেখি চালিয়ে যাবে। জিদের উত্তর- বলো কী? নিজেকে যেখানে লেখালেখি থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে, আর সেখানে কিনা ইতস্তত করছ?
উপন্যাসের শেষ : ‘মানুষ হচ্ছে এক ধর্মানুগামী প্রাণী’, সে বলল, আর সঙ্গে সঙ্গে ক্রুর পৃথিবীতে বৃষ্টি নামল- অপ্রতিরোধ্য।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close