Home কথোপকথন আলম খোরশেদ অনূদিত >> ওকাম্পো ও বোর্হেস-এর কথোপকথন

আলম খোরশেদ অনূদিত >> ওকাম্পো ও বোর্হেস-এর কথোপকথন

প্রকাশঃ November 10, 2017

আলম খোরশেদ অনূদিত >> ওকাম্পো ও বোর্হেস-এর কথোপকথন
0
0

আলম খোরশেদ অনূদিত >> ওকাম্পো ও বোর্হেস-এর কথোপকথন

 

[সম্পাদকীয় নোট : এই অনুবাদটি বিশ্বসাহিত্যের দুই স্বনামখ্যাত লেখকের কথোপকথন। এদের একজন লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ভুবনবিখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস, অন্যজন রবীন্দ্রনাথের সূত্রে আমাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। অনুবাদটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথমে অনুবাদক আলম খোরশেদ ওকাম্পো আর বোর্হেসের সাহিত্যিক-ব্যক্তিক পরিচয়কে তুলে ধরেছেন তারপর প্রবেশ করেছেন দু’জনের আলাপচারিতায়। পরিশেষে ওকাম্পোর প্রাসঙ্গিক দুটি লেখার অনুবাদ সন্নিবেশিত করেছে। পড়ুন তীরন্দাজে কয়েক পর্বে প্রকাশিত এই কিংবদন্তিতুল্য দুই লেখকের কথোপকথন।]

 

উপক্রমণিকা  

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো (১৮৯০-১৯৭৯) আর্হেন্তিনার এক কৃতী নারী, যিনি একাধারে ছিলেন উচ্চাঙ্গের সাহিত্যবোদ্ধা ও নারী অধিকার আদায় আন্দোলনের লড়াকু নেত্রী। তাঁর আরেক পরিচয় আমাদের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের একজন অত্যন্ত কাছের মানুষ হিসাবে। হোর্হে লুইস বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬) সেই আর্হেন্তিনা তথা গোটা লাতিন আমেরিকান কথাসাহিত্যের একজন পথিকৃত, যিনি বিশেষ করে ছোটগল্পকে প্রায় দর্শনের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং যার হাতে স্প্যানিশ গদ্য পেয়েছিল সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠা। এ ছাড়া ওকাম্পো লাতিন আমেরিকার আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাধিক প্রভাবসঞ্চারী সাহিত্যপত্রিকা সুর-এর সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে। বোর্হেস ছিলেন সেই পত্রিকার একজন সম্মানিত সদস্য।

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো ও হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর একটি কথোপকথন সুর পত্রিকায় ছাপা হয় সম্ভবত ১৯৬৭ সালে, যা ‘সুর’ প্রকাশনী থেকেই ১৯৬৯ সালে Diálogo con Borges নামে পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। স্প্যানিশ ভাষার ঐ সাক্ষাৎকারটির কোনো ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। মূল স্প্যানিশ থেকেই এটির বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে।

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো-র জন্ম ১৮৯০ সালের ৭ এপ্রিল, বুয়েনস আইরেস শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ছয় বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ইউরোপের নানা জায়গায় ভ্রমণ এবং নানা ভাষার সঙ্গে পরিচিতির সূত্রে ছোটবেলা থেকেই বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পান। তখনকার দিনের বনেদি পরিবারের প্রথা অনুযায়ী তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়। ডরিস মেয়ার-এর লেখা ওকাম্পোর জীবনীতে উল্লেখ আছে ফ্রান্সের ‘সরবর্ন’ এবং ‘কলেজ দ্য ফ্রাঁস’-এ ১৯০৬-০৭ সালে তিনি কিছু লেকচার শোনেন। পরবর্তী কালে ওকাম্পো নিজেও ‘কলেজ দ্য ফ্রাঁস’-এ অঁরি বের্গসঁ-র লেকচার তাঁর বিশেষভাবে ভালো লাগার কথা উল্লেখ করেছেন।

১৯১২ সালে বের্নান্দো দে এস্ত্রাদা-র সঙ্গে ওকাম্পোর বিয়ে হয়। মূলত ওকাম্পোর স্বাধীনচেতা মনোভাব ও লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুর্দম সংকল্পের কারণে ১৯২০ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ওকাম্পো তাঁর স্বামীর এক চাচাতো ভাই হুলিয়ান মার্তিনেস-এর সঙ্গে ১৩ বছর প্রণয়াবদ্ধ ছিলেন।

তাঁর প্রথম গ্রন্থ দ্য ফ্রাঞ্চেস্কা আ বিয়াত্রিচে (১৯২৩?) ছিল দান্তের ডিভাইন কমেডির মূল্যায়ন। সাড়া-জাগানো প্রবন্ধ-সংকলন ‘তেস্তিমনিয়স’ ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত মোট দশটি খণ্ডে বেরোয়। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে আছে দমিঙ্গোস্ এন হাইড পার্ক; এল হেমলেট দে লরেন্স অলিভিয়ের; এমিলি ব্রন্টি (তেরা ইনকগ্নিতা); ভার্জিনিয়া উল্ফ, অর্লান্দো ঈ সিয়া; তাগোরে এন লাস বারাংকাস দে সান ইসিদ্রো; টি ই লরেন্স-এর জীবনী এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত একটি আত্মজীবনী। নারীদের নাগরিক অধিকারের বিষয়াদি ওকাম্পোর প্রথম দিককার লেখাগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়। নারী-অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘আর্জেন্টাইন ইউনিয়ন অভ উইমেন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।

ওকাম্পো তাঁর নিজের লেখাপত্রের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় হয়ে আছেন তৎকালীন লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্রিকা ‘সুর’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক (১৯৩১) ও প্রকাশক হিসাবে। ‘সুর’-এর লেখক-তালিকায় ছিলেন হোর্হে লুইস বোর্হেস, এর্নেস্তো সাবাতো, আদলফো বিঅয় কাসারেস, হুলিয়ো কর্তাসার, হোসে অর্তেগা ই গাসেৎ, মানুয়েল পেইরু, আলবের কাম্যু, এনরিকে এন্দেরসন ইমবের্ত, হোসে বিয়ানকো, সান্তিয়াগো দাবোবে, এসেকিয়েল মার্তিনেস এস্ত্রাদা, পিয়ের দ্র্যু লা রোশেল, ওয়াল্দো ফ্রাঙ্ক, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, এদুয়ার্দো মায়েয়া, সিলবিনা ওকাম্পো (ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর ছোটবোন), আলফোন্সো রেইয়েস এবং এনরিকে পেস্সোনি প্রমুখ।

তৎকালীন শাসক হুয়ান দমিঙ্গো পেরনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে ১৯৫৩ সালে ওকাম্পো কারাবন্দি হন। তবে, বুদ্ধিজীবী বন্ধুদের সহায়তায় অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তি পান। ১৯৭৬ সালে তিনি ‘আর্জেন্টাইন একাডেমি অভ লের্টাস’-এর প্রথম নারী সভ্য নির্বাচিত হন। জেনারেল হোর্হে রাফায়েল বিদেলা-র নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের সঙ্গে ইউনেস্কো-আয়োজিত ‘সাংস্কৃতিক সংলাপ’ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে, ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর বাড়িতে। বাড়িটি পরে তিনি ইউনেস্কোকে দান করে দেন। ইগর স্ত্রাভিনিস্কি, আঁদ্রে মালরো এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সে-বাড়ির আতিথ্য পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কারণে বাঙালি বিদ্বৎসমাজেও তিনি পরিচিত। এ-বিষয়ে শঙ্খ ঘোষের ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ এবং কেতকী কুশারী ডাইসনের রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে নামের দুটো বহুল পঠিত গ্রন্থ রয়েছে।

১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসের ২৭ তারিখে ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো মারা যান। বুয়েনস আইরেস শহরের ‘লা রেকোলেতা’ কবরখানায় তাকে সমাহিত করা হয়। আমৃত্যু তিনি একজন প্রগতিশীল চিন্তক ও লেখক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন।

হোর্হে লুই বোর্হেস

হোর্হে ফ্রান্সিস্কো ইসিদ্রো লুইস বোর্হেস-এর জন্ম ২৪ আগস্ট ১৮৯৯ তারিখে, আর্হেন্তিনার বুয়েনস আইরেস-এ। ইংরেজি ও স্প্যানিশ দ্বিভাষিক পারিবারিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন তিনি। ১৯১৪ সালে তাদের পরিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে চলে যায় এবং সেখানেই বোর্হেস ও তাঁর বোন নোরার পড়াশোনা চলে। সেখাতে তিনি ফরাসি ও জার্মান ভাষা আয়ত্ত করেন। ১৯১৮ সালে তিনি ‘কলেজ দ্য জেনেভ’ থেকে স্নাতক হন। ১৯২১ সালে বুয়েনস আইরেস-এ ফিরে আসার পরে উলত্রাইসমো ধারার নানা পত্রিকায় রূপক ও মুক্তছন্দের কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার মধ্য দিয়ে লেখক-জীবনের সূচনা করেন।

বোর্হেসের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ফেরভর দে বুয়েনস আইরেস প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। তিনি আভাঁগার্দ-পত্রিকা ‘মার্তিন ফিয়েরো’র লেখক এবং ‘প্রিসমা’ ও ‘প্রোআ’ পত্রিকার যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। অবশ্য প্রথম জীবনের এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত ইনকিসিসিওনেস প্রবন্ধের বইটির ব্যাপারে পরবর্তীকালে তিনি অনুতপ্ত হন এবং সব কপি কিনে নিয়ে নষ্ট করে ফেলার চেষ্টা করেন।

তিনের দশকের মাঝামাঝি থেকে বোর্হেসের লেখায় অস্তিত্ববাদী জিজ্ঞাসা এবং আনা মারিয়া বারেনেচিয়া যাকে বলেছেন ‘অবাস্তবতা’ তা আসতে থাকে। তিনি একাই সেটা করেননি, লাতিন আমেরিকার অন্যান্য লেখকগণ, যেমন হুয়ান রুলফো, হুয়ান হোসে আরেওলা এবং আলেহো কার্পেন্তিয়ের প্রমুখও এ-জাতীয় বিষয়বস্তু নিয়ে নিরীক্ষা চালান। এঁরা হুসার্ল ও হাইডেগার-এর প্রপঞ্চবাদ কিংবা জাঁ পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো সম্পাদিত ‘সুর’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই বোর্হেস এর নিয়মিত লেখক ছিলেন। বোর্হেসকে আর্হেন্তিনীয় সাহিত্যের আরেক দিকপাল বিঅয় কাসারেস-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো নিজে। বোর্হেস ও কাসারেস-এর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব হয় এবং তাঁরা যুগ্মভাবে অনেকগুলো সাহিত্যকর্ম রচনা করেন।

১৯৩৩ সালে বোর্হেস ক্রিতিকা পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে ইস্তোরিয়া উনিভার্সাল দে লা ইনফামিয়া (আ ইউনিভার্সাল হিস্ট্রি অভ ইনফেমি) শিরোনামে সংকলনভুক্ত লেখাগুলো এ-পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে তিনি প্রকাশনা সংস্থা ‘এমেসে এদিতরেস’-এর উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ‘এল হোগার’ পত্রিকায় সাপ্তাহিক স্তম্ভ লেখেন।

১৯৩৭ সাল নাগাদ বন্ধুরা জানতে পারেন তিনি বুয়েনস আইরেস মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরির ‘মিগেল কানে’ শাখায় কর্তব্যরত। ওখানে বেশিরভাগ সময় তিনি গল্প ও প্রবন্ধ লিখেই কাটাতেন।

১৯৩৮ সালে বোর্হেসের বাবা মারা যান। বোর্হেসের জীবনে এটা এক বিরাট ট্রাজেডি। সে-বছর খ্রিস্টমাসে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং চিকিৎসারত অবস্থায় সেপ্টিসেমিয়ায় তাঁর মরণাপন্ন অবস্থা হয়েছিল। আরোগ্যলাভের পর্যায়ে বোর্হেস নতুন একটি শৈলিতে লেখার কথা ভাবেন, পরবর্তীকালে যেটার জন্য তিনি প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই দুর্ঘটনার পর তিনি প্রথম যে-গল্পটি লিখেন সেটার নাম ‘পিয়েরে ম্যানার্দ, অথর অভ দ্য কিহোতে’ (১৯৩৯)। এই গল্পে তিনি পিতা-পুত্র সম্পর্ক এবং লেখকসত্তার প্রকৃতি নিয়ে নিরীক্ষা চালান।

তাঁর প্রথম গল্প-সংকলন এল হার্দিন দে সেন্দেরস কে সে বিফুরকান (দ্য গার্ডেন অভ ফর্কিং পাথ্স) বেরোয় ১৯৪১ সালে, যার অধিকাংশ গল্প পূর্বে ‘সুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সংকলনটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করলেও কোনো সাহিত্য পুরস্কার লাভে ব্যর্থ হয়।

১৯৪৬ সালে স্বৈরশাসক হুয়ান পেরন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হলে পেরন-প্রশাসন বোর্হেসকে নানাভাবে নিগৃহীত করে এবং বোর্হেস চাকরি থেকে পদত্যাগ করে স্বৈরাচারবিরোধী দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। একদিকে চাকুরিহীন, অন্যদিকে বংশগত অন্ধত্বরোগে ক্রমে আক্রান্ত হতে থাকলে লেখকের জীবনযাপন বোর্হেসের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠতে থাকে। এই অবস্থায় জনবক্তা হিসাবে তিনি নিজের নতুন পেশাজীবন শুরু করেন। রাজনৈতিক হয়রানি-নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি ধীরে ধীরে জনব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। ‘আর্জেন্টাইন সোসাইটি অভ রাইটার্স’-এর সভাপতি এবং ‘আর্জেন্টাইন এসোসিয়েশন অভ ইংলিশ কালচার’-এর ইংলিশ ও আমেরিকান সাহিত্যের অধ্যাপক পদও অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে আর্হেন্তিনীয় পরিচালক লিউপোল্দো তোরে নিলসন বোর্হেসের ‘এমা সুন্স’ গল্পটিকে দিয়াস দে ওদিও (ইংরেজি শিরোনাম : ডেইজ অভ হেইট) শিরোনামে চলচ্চিত্রে রূপ দেন। এই সময় বোর্হেস কিছু চিত্রনাট্যও লিখতে শুরু করেন।

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর দে উদ্যোগ ও সহযোগিতায় পেরন-বিরোধী সামরিক সরকার ১৯৫৫ সালে বোর্হেসকে জাতীয় গণ গ্রন্থাগার (বিবলিওতেকা নাসিওনাল)-এর পরিচালক পদে বৃত করেন। ততদিনে তিনি পুরোপুরি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন। পরের বছর ইউনিভার্সিটি অভ কুয়ো তাঁকে জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অভ বুয়েনস আইরেস-এ সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এই সময় তিনি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন নিয়োগ পান।

১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যুগ্মভাবে আন্তর্জাতিক প্রকাশকগণ কর্তৃক প্রদত্ত ‘প্রি ফরমেন্তর’ পুরস্কারে ভূষিত হলে তিনি বিশ্বদরবারের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। ১৯৬২ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রধান দুটি রচনা-সংকলন ফিক্সিওনেসল্যাবিরিন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৮০ সালে তিনি ‘প্রি মনদিয়াল সিনো দেল দুকা’ পুরস্কারে ভূষিত হন। বোর্হেসের অর্জিত আরো অনেক সম্মাননার মধ্যে রয়েছে ‘লিজিয়ন অভ অনার’ (১৯৮৩), ‘সের্ভান্তেস পুরস্কার’, আমেরিকার রহস্যলেখকবৃন্দ কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ ‘অ্যাডগার অ্যালান পো অ্যাওয়ার্ড’ প্রভৃতি।

নোবেল পুরস্কারের যোগ্য হিসাবে তাঁর নাম বারবার বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও বোর্হেসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় নি। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানই এর কারণ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।

১৯৭৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর বোর্হেস পৃথিবীর নানা স্থান ঘুরে বেড়িয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ১৯৮৬ সালের ১৪ জুন যকৃতের কর্কটরোগে তিনি মারা যান। জেনেভার ‘সিমেতিয়ের দে রোয়া’ কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

কথোপকথন ওকাম্পো ও বোর্হেস

পর্ব-১

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো : আপনার পূর্বপুরুষের এই ছবিটি নিয়ে কিছু বলার আগে, বোর্হেস বলুনতো আপনার শৈশবের প্রথম স্মৃতি কোনটি?

হোর্হে লুইস বোর্হেস : ঠিক নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করতে পারব না প্রথম স্মৃতি কোনটি। জানি না তখন আমি নদীর এপারে ছিলাম, না অন্য পারে। বুয়েনস আইরেসের পালেরমো পল্লীতে ছিলাম, না মন্তেবিদেয়োর মলিনো অঞ্চলের কোনো গ্রামে! কেবল মনে পড়ছে একটি বাড়ি আর আইরিস ফুলের লতানো কুঞ্জের কথা।

ওকাম্পো : আপনার পরিবারের বিষয়ে কথা বলা যাক। আপনার কবিতায় সে-প্রসঙ্গ এসেছে। আপনি আমাকে যে-অ্যালবামটি দেখতে দিয়েছেন তার প্রথম দিকটায় মেয়েদের তিনটি ছবি আছে। নাচের পোশাক পরা ঝিনুকের চিরুনি আঁটা হানা র্আনেত দে হাসলাম নামের এই মেয়েটি কে হন আপনার?

বোর্হেস : এই বালিকা আমার প্রপিতামহীদের একজন। জন্মেছিলেন স্ট্যাফোর্ডশায়ারে। আমি তার চেহারায় আমার বোন নোরার আদল দেখতে পাই। তাদের পরিবারটি ছিল কোয়েকারপন্থি।

ওকাম্পো : আয়নারা আপনাকে ভয় দেখাত বলে আপনি আপনার কবিতায় উল্লেখ করেছেন। তেমনি এক আয়নায় প্রতিফলিত এই কারোলিনা হাসলাম দে সুয়ারেসটিই বা কে?

বোর্হেস : আমার বাবার চাচিদের একজন। সহায় সম্পত্তি খুইয়ে তিনি ইংরেজি শিক্ষায় আত্মনিবেদিত হন। তিনি খুবই সুন্দরী ছিলেন। তাঁর এক শিষ্যা মারিয়েতা আয়েরসা সব সময় তাঁর স্মৃতিচারণ করতেন। আমি জানি না কেন তিনি এমন গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন আমাকে।

ওকাম্পো : এই কথা বলা অবান্তর যে, আপনার আপন পিতামহী ফ্যানি হাসলাম দে বোর্হেস ইংরেজ ছিলেন। কিন্তু ঠিক কতখানি ইংরেজ ছিলেন তিনি আদতে?

বোর্হেস : এটা আনুগত্যের ব্যাপার। স্যার ওয়াল্টার স্কটের রচনা পাঠের প্রভাবে ইঁচড়েপাকা আমি তাঁকে একদা জিজ্ঞাসা করি তাঁর শরীরে স্কটিশ রক্ত রয়েছে কি না। উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমার শরীরে একফোঁটাও স্কটিশ, কি আইরিশ, কি গ্যালিক রক্ত নেই।’ মৃত্যুশয্যায় তাঁকে ঘিরে দাঁড়ানো আমাদের সবাইকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমি এক বৃদ্ধা, যে খুব ধীরে মারা যাচ্ছে। আমার এই মৃত্যু করুণ কিংবা আকর্ষণীয় নয়।’ বিলম্বে মৃত্যুর জন্য তিনি আমাদের কাছে ক্ষমা চাইছিলেন। তিনি বারবার করে ডিকেন্স পড়েছেন কিন্তু সেই সঙ্গে ওয়েলস ও আর্নল্ড বেনেটও। নোরার সৌজন্যে তার পুস্তকসংগ্রহে বেঁচে থাকবেন ফ্রান্সেস হাসলাম।

ওকাম্পো : পাশেই আমরা দেখতে পাচ্ছি তার স্বামী কর্নেল ফ্রান্সিসকো বোর্হেস লাফিনুরকে। এই সৈনিক সর্ম্পকে আপনি কী জানেন? হুয়ান ক্রিসসতোমো লাফিনুরের সঙ্গে তাঁর কী সর্ম্পক ছিল?

বোর্হেস : তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের সম্ভবত প্রধান রোমান্টিক কবি হুয়ান ক্রিসসতোমো লাফিনুরের বোন কারমেন লাফিনুরের পুত্র। প্রাচ্যদেশীয়রা যাকে বলে ‘মহাযুদ্ধ’, সেই সময় তার জন্ম হয় মন্তেবিদেয়োর এক অবরুদ্ধ প্রাসাদে। পনের বছর বয়সে তিনি এই প্রাসাদেই অস্ত্রচালনা শুরু করেন। প্রথমে চাঁদমারি তাক করে, তারপর কাসেরসে উরকিসার তত্ত্বাবধানে, এরপর পারাগুয়াইয়ে, তারপর দক্ষিণ ও পশ্চিমের রণাঙ্গনে। মিত্রে তখন বিপ্লবের ফন্দি আঁটছিল। তখনকার রাষ্ট্রপতি সেরমিয়েন্তো আমার পিতামহের কাছে জানতে চান হুনিন প্রদেশে তার নেতৃত্বে যে সৈন্যরা রয়েছে তিনি তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন কি না। বোর্হেস তাকে জবাব দেন, ‘আপনি যতক্ষণ ক্ষমতায় রয়েছেন ততক্ষণ তাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন।’ বিপ্লব ঘনিয়ে আসে। বোর্হেস, যিনি নিজে ছিলেন মিত্রেপন্থী, তার সেনাদলের নেতৃত্ব পরিবর্তন করে তুয়ু শহরে বিপ্লবীদের তাঁবুতে একা গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর এই আনুগত্যের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা খুঁজে পাওয়ার মতো লোকেরও অভাব হয় নি। শুরু হয় লা বের্দের যুদ্ধ, তাঁর বয়স তখন ৭৪। মিত্রেপন্থীরা পরাজিত হলেন। বোর্হেস ইতোমধ্যে রণক্লান্ত, সাদা পোশাকে, তাঁর ঘোড়ায় চেপে, পেছনে দশ কি পনের জন সৈন্যসহ, ধীরে ধীরে শত্র“পক্ষের পরিখার দিকে এগিয়ে যান, তাঁর হাতজোড়া আড়াআড়িভাবে বুকে রাখা, নিজেকে হত্যা করেন তিনি সেখানে। এদেশে এটাই ছিল রেমিংটন পিস্তল ব্যবহারের প্রথম ঘটনা।

আঁরিয়াস নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সরকারি সেনাদলের। পারাগুয়াইতে এবং রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন বোর্হেসের বাহিনীর সদস্য। এই যুদ্ধের আগে, নিরপেক্ষ এলাকায় দুই বন্ধু মিলিত হয়েছিলেন তাদের সৈন্যসহ। ঘোড়ায় বসেই দু’জন শেষবারের মত আলিঙ্গন করেন; আঁরিয়াস যান বিজয়ের দিকে আর বোর্হেস মৃত্যু অভিমুখে।

ওকাম্পো : লিওনর সুয়ারেস আইদো আর ইসিদোরো আসেভেদো লাপ্রিদা কে ছিলেন, বোর্হেস?

বোর্হেস : ভিক্তোরিয়া, আপনি আমার মাতামহ-মাতামহীর নাম বললেন। লিওনর সুয়ারেস ছিলেন কর্নেল ইসিদোরো সুয়ারেস-এর কন্যা, যিনি মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে কলম্বিয়া ও পেরুর অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে হুনিনের বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি ছিলেন রোসাদের বংশধর। কিন্তু বিশ্বাসে ছিলেন সম্মানিত ইউনিটারিয়ান, তাই মন্তেবিদেয়োর নির্বাসনেই বেছে নিয়েছিলেন মৃত্যুকে। আমার মাতামহ আসেবেদো ছিলেন সন্ত নিকোলাসের বংশধর। তিনি বলতেন, ‘আমি জন্মেছি মেদিয়ার আরোয়োদের উত্তমাংশে। তিনি যুদ্ধ করেছেন পাভনে, সেপেদায় এবং পুয়েন্তে আলসিলায়; বেসামরিক নাগরিকদের তখন সত্যিকার যোদ্ধাদের মতই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল।

নয় কি দশ বছর বয়সে একবার তিনি প্লাতার বাজারের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন ছিল রোসাদের সময়। দুটো কাপড়ঢাকা ঝুড়ি, সাদা আর হলদে পিচফলের কথা জানান দিল যেন তাকে। ঢাকনা সরিয়ে সেখানে তিনি ইউনিটারিয়ানদের কিছু কর্তিত মস্তক দেখতে পেয়েছিলেন। তাদের মুখ রক্তে রঞ্জিত। আর চোখগুলো খোলা। তিনি প্রান্তরের শেষ আঙুর বাগান পেরিয়ে বাড়ি পালিয়ে আসেন এবং কেবল রাত্রিবেলায় বলতে পারেন সকালে কী দৃশ্য দেখেছিলেন। এরপর গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে অনেক কিছুই দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর, কিন্তু কোনো কিছুই তাঁর মনে এমন গভীর রেখাপাত করে নি।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close