Home অনুবাদ আলম খোরশেদ অনূদিত > কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [ শেষ পর্ব]

আলম খোরশেদ অনূদিত > কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [ শেষ পর্ব]

প্রকাশঃ December 19, 2017

আলম খোরশেদ অনূদিত > কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [ শেষ পর্ব]
0
0

আলম খোরশেদ অনূদিত > কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [ শেষ পর্ব]

 

[সম্পাদকীয় নোট : এই অনুবাদটি বিশ্বসাহিত্যের দুই স্বনামখ্যাত লেখকের কথোপকথন। এদের একজন লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ভুবনবিখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস, অন্যজন রবীন্দ্রনাথের সূত্রে আমাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। অনুবাদটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথম পর্বে অনুবাদক আলম খোরশেদ ওকাম্পো আর বোর্হেসের সাহিত্যিক-ব্যক্তিক পরিচয়কে তুলে ধরে প্রবেশ করেছিলেন দু’জনের আলাপচারিতায়। সেই আলাপের প্রথম অংশ তীরন্দাজে প্রকাশিত হয়েছিল। এবার সাক্ষাৎকারটির তৃতীয় ও শেষ অংশ প্রকাশিত হলো।]

 

ওকাম্পো : আপনি কি ‘এল মুয়ের্তো’ গল্পের ঘটনাবলি স্থাপন করেছেন উরুগুয়াইয়ের সেই নদীর তীরে, যেখানে আমরা আপনাকে ছবিতে দেখেছি?

বোর্হেস : হ্যাঁ। আমি কাহিনীটা সেখানেই কল্পনা করেছি। তবে গল্পটা কেবল সেই আরাপে নদীর ধারের কথাই বলে না, তা অন্য এক দেশ-কালে উত্তীর্ণ হয়ে যায়।

ওকাম্পো : আপনার এই গল্পটিকে, যা একজন উত্তর আমেরিকান প্রযোজককে আকৃষ্ট করেছে, চলচ্চিত্র হিসাবে কীভাবে কল্পনা করেন? আপনি কি এখন মনে করেন ‘এল মুয়ের্তো’ গল্পটিকে চলচ্চিত্রে রূপদান সম্ভব?

বোর্হেস : অতিরিক্ত অহংকার ছাড়াই বলতে পারি, এই গল্পটি একটি ভালো ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র হবার যোগ্য। যখন আমি ওয়েস্টার্ন শব্দটা ব্যবহার করি, তখন তা আমি খারাপ অর্থে করি না। আমি মনে করি একসময় লেখকেরা তাদের একটি অঙ্গীকার ও আঙ্গিককে ভুলে বসেছিল। সেটা মহাকাব্য। যাকে এই ‘ওয়েস্টার্ন’  পুনরায় উদ্ধার করে এনে দিয়েছিল এই পৃথিবীকে। বলতে গেলে ‘ওয়েস্টার্ন’ ছবি সমস্ত পৃথিবীজুড়ে মহাকাব্যের প্রয়োজন মিটিয়েছে, যা মানবাত্মার একটি অন্যতম  মহৎ বৈশিষ্ট্য।

ওকাম্পো : কিন্তানা আভেন্যুর বাড়ির এক ছবিতে যে-বিশেষ টেবিলটি আমরা দেখি, এটা কার ছিল জানেন?

বোর্হেস : হ্যাঁ, সাপের আকৃতির, তেপায়া এই টেবিলটি আমার প্রপিতামহ সুয়ারেস তাঁর পেরু অভিযানে সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি একটা রূপার বেসিনও ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে এসেছিলেন।

ওকাম্পো : আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি রিকার্দো ও আদেলিনা গিরাল্দেস আমাকে যে কিন্তানা আভেন্যুর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল তার কথা, সে যুগে অবশ্য আমার মনে হয় তাকে আভেন্যু বলা হত না। সেটা ছিল প্রোআর যুগ। সেই পত্রিকায় আপনার ভূমিকার বিষয়ে এবং আর যা কিছু মনে আছে, বলুন না আমাকে।

বোর্হেস : অপরিহার্যভাবে আমাকে তা হলে একটা গল্পের পুনরাবৃত্তি করতে হবে। সেটা ১৯২৪ সাল। ব্রান্দান কারাফা আমাকে ফোনে ডাকলেন। তিনি আমাকে জানালেন রিকার্দো গিরাল্দেস ও পাবলো রোহাস পাসের সঙ্গে মিলে একটা পত্রিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছেন, যা হবে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের প্রতিনিধি এবং যা আমাকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। সংগত কারণে আমি খুব গর্ববোধ করি। সে রাত্রে আমি সান মার্তিন ও কর্দোবাস্থ হোটেল ফিনিক্স-এ যাই। যেখানে তখন গিরাল্দেস থাকতেন। তিনি আমাকে এই বলে অভ্যর্থনা করলেন, ‘ব্রান্দান আমাকে বলেছেন যে, গত রাতে তাঁরা একত্র হয়েছিলেন তরুণদের সাহিত্য নিয়ে একটা পত্রিকা প্রকাশের লক্ষ্যে। সবাই বলেছেন এই পত্রিকা আপনাকে ছাড়া চলতে পারে না’। এমন সময় ঢুকলেন পাবলো রোহাস পাস। আমাদেরকে অভিবাদন জানিয়ে তিনি আবেগ সহকারে বললেন, ‘আমি খুব গর্বিত’। তারপর একটু থেমে বললেন, গত রাতে আমরা তিনজন একত্র হয়ে এই সিদ্ধান্তে আসি যে তরুণদের সাহিত্য নিয়ে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় আপনি অপরিহার্য।

এইভাবে এক নির্মল ষড়যন্ত্রের ফসলরূপে আত্মপ্রকাশ করে প্রোআ। প্রথম সংখ্যার জন্য (কাগজে-কলমে যা ছাপা হয়েছিল ছিল পাঁচশত কপি, পৃষ্ঠা সংখ্যা একশত বিশ) প্রত্যেকে, সম্মানসূচকভাবে আমাকে বাদ দিয়ে, পঞ্চাশ পেসো করে চাঁদা দিয়েছিলেন।

ওকাম্পো : নোরা, যাকে এই ছবিতে ওফেলিয়া বলে মনে হচ্ছে, আপনার সঙ্গেই বড় হয়ে উঠেছিল। আপনার কি মনে হয় নোরার আঁকা ছবিতে এই অ্যালবামে দেখা আপনার পূর্বপুরুষদের অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে? নাকি এই যোদ্ধারা নোরার তুলিতে দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছেন? হতে পারে নোরা যোদ্ধাদেরকেই এঁকেছিল আর আপনি তাঁদের বর্ণনা করেছেন দেবতারূপে?

বোর্হেস : না, না। আমি বিশ্বাস করি নোরার আঁকা যোদ্ধারা দয়ালু ও মানবিক ছিলেন। আর আমার কথা বললে বলব, দেবতাদের বর্ণনার ব্যাপারে আমি নিজেকে অক্ষম বলে মনে করি। তবে পূর্বপুরুষদের প্রসঙ্গে আমার বিশ্বাস, নোরার মধ্যে আমার পরিবারের ইংরেজ অংশের প্রোটেস্টান্ট পাদ্রিদের অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে, প্রাচ্যের ও আর্হেন্তিনার যোদ্ধাদের চেয়ে।

ওকাম্পো : এখানে আপনাকে দেখতে পাচ্ছি আমার ভগ্নিপতি বিঅয় কাসারেস-এর সঙ্গে। সে আমাকে একটা গল্প বলেছিল, সেটা সম্ভবত আপনি জানেন না। আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি আমি ভুল করি নি। সেই সময়ে আমার বোন সিলবিনা ছবি আঁকত। সে ও নোরা আদোলফো ও গিয়েরমোর সঙ্গে তাদের বিয়ের অনেক আগে থেকেই বন্ধু ছিল। ঠিক কখন থেকে বিঅয়-এর সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বের সূত্রপাত?

বোর্হেস : কঠিন প্রশ্ন করেছেন, কেননা দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই। এটুকু বলতে পারি, কোনো এক অপরাহ্নে আমরা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠি। তখন সে আমাকে এই সান ইসিদ্রোর বাড়ি থেকে, যেখানে বসে আমরা কথা বলছি, তাঁর বাড়িতে নিয়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি আমরা পরস্পরের ওপর প্রভাব ফেলেছি। সবসময় এটা ভাবা হয়ে থাকে যে, বড়জনই বেশি প্রভাব ফেলে ছোটদের ওপর। তবে আমি বিশ্বাস করি আমি যদি আদোলফিতোকে কিছু শিখিয়েও থাকি, সে আমাকে শিখিয়েছে আরো অনেক বেশি। সরাসরি নয়, যে-জিনিস সোজাসুজি শেখানো হয় সেগুলো সাধারণত অর্থহীন হয়, পরোক্ষভাবে। আদোলফিতো আমাকে দিয়েছিল দারুণ এক সারল্য আর জটিল বারোকরীতির প্রতি ভর্ৎসনা। সব মিলিয়ে তরুণ আদোলফো বিঅয় কাসারেস ছিল এক ওস্তাদ, আমরা যাকে বলি ধ্রুপদী। এই বৃদ্ধ বোর্হেসের চেয়েও অনেক বেশি।

ওকাম্পো : বুস্তোস দোমেক-এর ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছিল?

বোর্হেস : আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাই নি; আমার মনে হয়েছিল তাঁর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা অসম্ভব। এক সকালে তিনি আমাকে বললেন, আমরা একটা পরীক্ষা করি। আমি তাঁর বাড়িতে খেতে গেলাম। আমাদের হাতে দুই ঘণ্টা সময় ছিল। এরই মধ্যে আমাদের মধ্যে তর্ক জমে ওঠে। আমরা লিখতে শুরু করি আর অল্প পরেই, সেই একই সকালে, সেই আশ্চর্য ঘটনাটি ঘটে। আমরা এমন এক ভঙ্গিতে লিখতে শুরু করি, যা না বিঅয়-এর মতো না বোর্হেসের মতো। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে অন্য কোনো উপায়ে হয়তো আমাদের দুজনের মধ্যে এক তৃতীয় ব্যক্তি ঢুকে পড়েছিল। বুস্তোস দোমেক, দোমেক তাঁর প্রপিতামহের নাম আর বুস্তোস আমার এক প্রপিতামহের নাম, আর তারপর যা ঘটল তা এই যেÍবুস্তোস দোমেক-এর কাজের সঙ্গে বিঅয় কিংবা আমার গল্প লেখার কোনো মিল পাওয়া গেল না। সেই ব্যক্তি এখনও  অস্তিত্ববান, অন্য কোনো আঙ্গিকে। তবে তাকে দেখা যেত কেবল আমরা দুজন যখন কথা বলতাম তখন।

ওকাম্পো : নোরার এই ট্যাপেস্ট্রি ‘লা পাসিয়ন’-এর সাথে আপনার এক লেখা ‘দ্বিখণ্ডিত পথের বাগান’-এর এক ধরনের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় কি?

বোর্হেস : না। এর সঙ্গে এমন এক সময়ের মিল খুঁজে পাওয়া যায় যখন নোরা শান্তিময়, দেবতুল্য ছবির বিষয় খুঁজে পাচ্ছিল না। এমন এক সময় যখন সে জার্মান অভিব্যক্তিবাদীদের প্রভাবে ছিল খুব জীবন্ত, গতিশীল ও ট্রাজিক এক আঁকিয়ে ও শিল্পী, এমনটি মনে হওয়ার পক্ষে যা অযৌক্তিক।

ওকাম্পো : আপনার চমৎকার একটি কবিতা ‘লস দোনেস’-এ আপনি গ্রুসাক-এর নাম করেছেন। আপনার কাছে তাঁর তাৎপর্য কী? গ্রুসাক এমন এক চেতনার অধিকারী যা আপনার চেয়ে অনেক সুদূরের, আর আপনি এই কবিতায় বলেন, ‘দুজনের মধ্যে কে লেখেন এই কবিতা?’ ঠিক কীভাবে আপনি এমন একজনের সঙ্গে একাত্মতা খুঁজে পান যে কোনোভাবেই আপনার মতো নয়?

বোর্হেস : আমি নিজেকে গ্রুসাকের মতো বলে মনে করি না। তবে আমি চেয়েছিলাম আমার গদ্যকে তাঁর মতো করতে। গ্রুসাকের গদ্য এবং আমাদের বন্ধু আলফোনসো রেইয়েসের গদ্য আমাদের ভাষায় সম্মানিত, যা খুবই গতিশীল। কেবেদো ও সাবেদ্রা ফাহার্দোর গদ্য আড়ষ্টতাদোষে দুষ্ট। আর লুগোনেসের গদ্য অত্যন্ত আত্মসচেতন।

ওকাম্পো : এই যে ছবিগুলো, এতে আপনাকে আমরা দেখছি সুর পত্রিকা পর্বে। আমার বিশ্বাস এর মধ্যে একটা সুর প্রকাশিত হওয়ার আগে তোলা। সেটা তোলা হয়েছিল আমার রুফিনো দেল এলিসান্দের বাড়িতে। আমরা সিঁড়ির ওপরে। সেখানে মিলিত হয়েছিল পেদ্রো এনরিকেস উরেনিয়া, মায়েয়া, নোরা, মারিয়া, রোসা অলিবার, আনসেরমেত, রামোন গোমেস, দে লা সেরেনা, অলিবেরিও হিরোন্দো, এদুয়ার্দো বুলরিচ, গিয়েরমো দে তোরে। এই ছবিটা যেদিন তোলা হয়, সেদিনটার কথা মনে আছে আপনার? সেটাই সম্ভবত সুর-এর সহযোগী পরিষদের প্রথম সমাবেশ ছিল।

বোর্হেস : মনে পড়ে আমি সেদিন অনুভব করেছিলাম, আপনারা একটা ভুল, বড় ধরনের ভুল করেছিলেন আমাকে আপনাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে। আমার এটাও মনে পড়ে, যদিও সঠিক বিষয় মনে নেই, সেদিন নিয়তিবাদী, মহৎপ্রাণ পেদ্রো এনরিকেস উরেনিয়ার সাথে আমার একটা দীর্ঘ আড্ডা হয়েছিল।

ওকাম্পো : এর পর আরো একটা ছবি আছে, সম্ভবত শেষ ছবি। সেটা তোলা হয়েছিল তুকমান সরণিতে, সান মার্তিন ও বিয়ামোন্তের কোণায় অবস্থিত নতুন বাড়িতে। এটা পত্রিকার কী জানি কোন বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে তোলা। সূচি দেখে এখন মনে হয়, সেটা ছিল এর পয়ঁত্রিশতম বার্ষিকী। এই পত্রিকা অনেকদিন টিকে ছিল, বলা যায় একটু বেশিই। তা সেটা বিশেষ কোনো অবদান রাখতে পেরেছিল বলে মনে করেন?

বোর্হেস : সুর ছিল আর্হেন্তিনার সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম প্রধান একটা ঘটনা। এর প্রভাব ছিল কেবলই ইতিবাচক। আর্হেন্তিনামানসের বড় এক বৈশিষ্ট্য, শুধু তার মাটিতে নয়, এই গ্রহে যেখানে যা ঘটেছে সব ব্যাপারে এক উদার ঔৎসুক্য। আমাদের ঐতিহ্যের এই নম্রতাবোধ আমাদেরকে ইউরোপের চেয়ে কম প্রাদেশিক হতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে আমরা এও বলতে পারি যে, অভিজ্ঞতালব্ধ সবই আমাদের ঐতিহ্য যা আমাদের নিজস্ব ভাষা কিংবা জাতিসত্তাকে ছাড়িয়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি সব আর্হেন্তিনাবাসীই, তা তারা জানান দিয়ে বলুক আর না বলুক, সুর-এর প্রতি এক অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতাবোধ অনুভব করে।

ওকাম্পো : কাগজগুলোর ভিড়ে আরেকটা ছবি দেখতে পাচ্ছি, আপনি এটার কথা জানেন না। এটা আমি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করব। এখানে এই ওকাম্পো ভিলার হলঘরে তোলা, যখন ইউনেস্কোর মহাপরিচালক জুলিয়ান হাক্সলি বুয়েনস আইরেসে এসেছিলেন তখন। একনায়কের যুগ ছিল সেটা। আমি হাক্সলির লেখা একটা চিঠি পাই যাতে তিনি আমার লেখক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেখানেই ছবিটা তোলা। সবার মধ্যে অধ্যাপক হোসেও ছিলেন। এই সমাবেশের আগের দিন আমাদের বাড়িতে আগুন লেগেছিল। নিচতলার দুটো ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে একটা ছিল লাইব্রেরি, যেখানে আমার বাবার সব বইপত্র রাখা ছিল। হলঘরেই আমরা একত্র হয়েছিলাম, যেখানে আপনাকে বন্ধুপরিবেষ্টিত দেখা যাচ্ছে। যাদের মধ্যে রাফায়েল আলবের্তিও আছেন। পটভূমিতে প্রিলিদিয়ানো পুয়েরেদন-এর আঁকা আমার প্রপিতামহ মানুয়েল ওকাম্পোর, যিনি ছিলেন খোদ সেরমিয়েন্তোর বন্ধু, একটি তৈলচিত্র দেখা যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, সে-রাতে যে-আলোচনা হয়েছিল তার গুরুত্ব আমরা কেউ অস্বীকার করব না। আমি জানি না আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন কিনা যে, আমার বাড়িতে জুলিয়ান হাক্সলির সেই উপস্থিতির মাশুল তাকে দিতে হয়েছিল একনায়ক দ্বারা আমন্ত্রিত না হয়ে। আমার আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের, যাদের মধ্যে ছিলেন আপনি, হোসে, মায়েয়া, এনরিকেস উরেনিয়া, রোমেরো প্রমুখের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ছিল শাস্তিযোগ্য এক চরম অপরাধ।

বোর্হেস : হয়তো এটা বলাই আরো ভালো হতো যে, তাঁর এই সিদ্ধান্ত তাকে একনায়কের সঙ্গে সাক্ষাতের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

ওকাম্পো : ওকাম্পো ভিলায় তোলা আরো একটি ছবি দেখতে পাচ্ছি। আপনি ও মায়েয়া বিখ্যাত উত্তর আমেরিকান অভিনেত্রী হেলেন হায়েসের সঙ্গে প্রাতরাশ করছেন। নাট্যসাহিত্যের কোন বিষয়টি আপনাকে সব চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে?

বোর্হেস : আমি নাটক দেখার চাইতে পড়তেই বেশি পছন্দ করি। এক ও’নীল ছাড়া। ও’নীল-কে পড়ার সময় কেমন যেন ভঙ্গুর মনে হয়। কিন্তু তার মঞ্চরূপ আমাকে কাঁপিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট, গভীরভাবে নাড়া দেয় আমাকে। নাটকের কথা বলতে গেলে দুটো নামই তাৎক্ষণিকভাবে আমার মনে আসে। ইপসেন, যাকে আমি আরো একবার মূলে পড়তে চাই, আর বার্নার্ড শ। দি রেস্ট ইজ সাইলেন্স।

ওকাম্পো : থিয়েটারের কথার সূত্রেই বলুন, চলচ্চিত্রের কী তাৎপর্য আছে আপনার কাছে, যা আপনি সত্যি পছন্দ করেন ও দেখতে ভালোবাসেন।

বোর্হেস : হ্যাঁ। একসময় খুব সিনেমা দেখতাম। এখন অবশ্য শুনতেই বেশি পছন্দ করি। আমি যোসেফ ফন স্টার্নবার্গ-এর গ্যাংস্টার মুভিগুলো বারবার দেখতাম। বিশেষ করে যেগুলোতে ব্যাংক্রফ্ট্ ও ফ্রেড কোহলার পরস্পর লড়ে যেতেন অন্তহীন। আমি খুব দেখতাম টু বি অর নট টু বি, ওয়ান নাইট ইন অপেরা, ভার্টিগো, সাইকোসিস, খার্তুম, দ্য ঘোস্ট অভ রোম, দ্য গ্রেট গেম, নিনোশ্কা, লাভ উইদাউট ব্যারিয়ার, দ্য কালেকশনিস্ট। এই তালিকা থেকে আমি জানি আরো অনেক ছবিই বাদ পড়ে গেছে। সাধারণভাবে আমি ইংলিশ ও মার্কিন ছবি দেখতে পছন্দ করতাম।

ওকাম্পো : যদি আপনার জীবন আরেকবার যাপন করার স্বপ্ন দেখেন- আপনি অবশ্য জীবনকে কেবল যাপনই করেন না, তা আপনার স্বপ্নও বটে- কোন পর্বে আপনি নিজেকে ধরে রাখতে চাইবেন, শৈশবে, কৈশোরে নাকি প্রাপ্তবয়সে?

বোর্হেস : আমি ১৯৬৭ সালের এই দিনটাতেই নিজেকে ধরে রাখতে চাইব।

[শেষ]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close