Home অনুবাদ আলম খোরশেদ অনূদিত >> কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [পর্ব ২]

আলম খোরশেদ অনূদিত >> কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [পর্ব ২]

প্রকাশঃ November 29, 2017

আলম খোরশেদ অনূদিত >> কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [পর্ব ২]
0
0

আলম খোরশেদ অনূদিত >> কথোপকথন : ওকাম্পো ও বোর্হেস [পর্ব ২]

 

[সম্পাদকীয় নোট : এই অনুবাদটি বিশ্বসাহিত্যের দুই স্বনামখ্যাত লেখকের কথোপকথন। এদের একজন লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ভুবনবিখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস, অন্যজন রবীন্দ্রনাথের সূত্রে আমাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। অনুবাদটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথম পর্বে অনুবাদক আলম খোরশেদ ওকাম্পো আর বোর্হেসের সাহিত্যিক-ব্যক্তিক পরিচয়কে তুলে ধরে প্রবেশ করেছিলেন দু’জনের আলাপচারিতায়। সেই আলাপের প্রথম অংশ তীরন্দাজে প্রকাশিত হয়েছিল। এবার সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় অংশ প্রকাশিত হলো। পড়ুন তীরন্দাজে তিন পর্বে প্রকাশিত এই কিংবদন্তিতুল্য দুই লেখকের কথোপকথন।]

ওকাম্পো: আমরা দেখেছি, আপনার বংশে অনেক যোদ্ধা ছিলেন। আপনার কি মনে হয় সেটা আপনার জীবনে ও সাহিত্যে অন্য রূপে ধরা দিয়েছে?

বোর্হেস : আমার জীবনে, আমি জানি না। আমার সাহিত্যে, হ্যাঁ। আমি কখনোই এই মহাকাব্যিক জীবনপরিণতির ব্যাপারে কোনো প্রকার নস্টালজিয়াকে প্রশ্রয় দিই নি। ঈশ্বর জেনেশুনেই নিঃসন্দেহে আমাকে তা দিতে অস্বীকার করেছেন।

ওকাম্পো : একজন যোদ্ধার মধ্যে প্রশংসনীয় কী দেখতে পান আপনি, অথবা কোন শ্রেণির নায়কদের আপনার সবচেয়ে বেশি পছন্দ, বলুন। সন্ত মার্তিনের মতো মানুষদের কোন জিনিসটাকে আপনি সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করেন; শারীরিক শৌর্য না নিরাসক্তি, কৌশলক্ষমতা না উদারতা?

বোর্হেস : সন্ত মার্তিনের মূর্তিসমূহ, মূর্তির চিত্রাবলি, তাঁর জন্ম, মৃত্যুবার্ষিকী, সে সময়ে নিবেদিত পুষ্পরাজি এবং এটাও বা বলব না কেন; সেই সব স্মৃতিজ্ঞাপনের যাবতীয় কলাকৌশল, আমাকে এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। সেরমিয়োন্তোর মধ্যে একজন ইউরোপীয় যোদ্ধাকেই দেখতে পাই। যিনি মহাদেশব্যাপী এক যুদ্ধে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। যাকে তিনি নিঃসন্দেহে ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন নি কোনোদিন। একজন সৈন্যের মধ্যে আমি সেই মানুষের অস্তিত্বকে পছন্দ করি, যে তাঁর ব্যক্তিগত লিপ্সাকে অতিক্রম করে যায় কিংবা যেতে চেষ্টা করে।

ওকাম্পো : আপনার পদবীসমূহের সঙ্গে একাত্ম হয়ে, আপনিও কি মনে করেন, যেমনটি বলেছেন মার্কেস সান্তিয়ানা, কলম কখনও বর্শার ফলাকে ভোঁতা করে দিতে পারে না?

বোর্হেস : কবিতাটি একটি মহাকাব্যের জন্য রচিত, যার মূল সুরই হল যুদ্ধ।

ওকাম্পো : ইসিদোরো ও ওয়েনসেসলাও আসেভেদো লাপ্রিদার এই রোমান্টিক ছবিটিকে দেখুন। মনে হচ্ছে যেন ছবির এই দু’জন মানুষ দ্বন্দ্বযুদ্ধে লড়ছেন। সেটা আপনি নিজেই আমাকে বলেছেন। কোনো ত্রাতা কিংবা শয়তান, যাদের আমরা বহু বছর পরে অনেক বোর্হেসীয় গল্পে পুনরাবির্ভূত হতে দেখেছি, কারো সঙ্গেই এদের কোনো সাদৃশ্য নেই। এই ধরনের চরিত্রের মধ্যেকার কোন বিষয়টি আপনাকে এত আকর্ষণ করে?

বোর্হেস : আমাকে আকর্ষণ করে, এবারিস্তো কারিয়েগো যাকে বলেছেন ‘ক্রোধকৃষ্টি’, সেটা। আমি মনে করি এই সাধারণ গোবেচারা  মানুষেরা, অন্যভাবে সাফাই গেয়ে বলা, তৈরি করেছেন এমন একটি বিষয় যাকে আমি অন্যত্র বলেছি ‘ছুরি ও ক্রোধের সংস্কৃতি’। যে-ক্রোধ, আমি বিশ্বাস করি, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে।

ওকাম্পো : ইসিদোরো ও ওয়েনসেসলাও-এর মধ্যে আমরা এও দেখি না যে, তাঁরা কখনও কারো মন জয় করার জন্য তাঙ্গো নাচ নেচেছেন। তাঙ্গোর মধ্যে কোন জিনিসটা আপনাকে মুগ্ধ করে বেশি?  কথা, সুর, নৃত্যভঙ্গি; না এগুলোর সমন্বয়?

বোর্হেস : আমার বেশি ভালো লাগে সুর। তাঙ্গোর চাইতে অবশ্য মিলাঙ্গা ভালো লাগে বেশি। আবার তাঙ্গো কানসিয়নের, যাকে খুব ক্ষণস্থায়ী মনে হয়, চেয়ে তাঙ্গো মিলাঙ্গা বেশি ভালো লাগে।

ওকাম্পো : এই পারিবারিক অ্যালবামে আমরা একটি শিশুর ছবি দেখছি এবং অন্য আর একটি ছবিতে অপর এক শিশুকে দেখা যায় চেয়ারে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। মনে হয় তাঁরা আপনার মা ও বাবা। এরপর আরো কিছু বড়সড় ছবিতে তাদেরকে দেখতে পাই। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো আপনার মায়ের ছবিতে মাথাভর্তি ফিতা, অনেকটা এই সময়ের স্টাইলমাফিক। একটি ছবিতে আপনার বাবা সমুদ্রে নৌকায় দাঁড় বেয়ে চলেছেন। আপনি কি তাদেরকে শিশুরূপে কল্পনা করতে পারেন?

বোর্হেস : না। এই রেলিং আর সমুদ্রে তাদেরকে আমার চিনে নিতে কষ্ট হয়, সেগুলো যে-বিশেষ মুহূর্তে তোলা হয়েছিল তার সঙ্গেই কেবল মেলে।

ওকাম্পো : কালো কাপড় ও সাদা দস্তানা পরা এই অভিজাত নারীটিকে দেখুন। আপনার মা। এই ছবি আপনার জন্মের আগে না পরে তোলা হয়েছিল? যৌবনের এই ঝলমল রূপে আপনার মাকে কি মনে পড়ে?

বোর্হেস : হ্যাঁ। আমার বিশ্বাস, সেটা মনে আছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা আমাকে বলত, ‘বেচারি লিয়োনর, তার সৌন্দর্য তাকে কিছুই দেয় নি।’ আমার মনে হয় তাঁরা মিথ্যে বলেছেন।

ওকাম্পো : এখানে দেখছি আপনার বাবা ও মাকে। এই সুন্দর সুখী দম্পতির কাছ থেকে কোন প্রতিভা উত্তরাধিকার সূত্রে আপনি পেয়েছেন বলে মনে করেন?

বোর্হেস : আশা করি কিছু না কিছু পেয়েছি।

ওকাম্পো : কখনো অসুখে কষ্ট পেয়েছেন বলে আপনার মনে পড়ে?

বোর্হেস : আর সব বাচ্চার মতো আমারও খুব অসুখ হত। মনে হয় তাতে খুব বেশি ভান ছিল না। জীবনে অনেক ক’টা বছর আমি যে অসুখে ভুগেছি তা ছিল খুবই কষ্টকর এবং দুর্ভাগ্যজনক।

ওকাম্পো : আপনাকে বই হাতে দেখা যাচ্ছে যে-ছবিটিতে, সেই বয়সে আপনি কি খেলাধূলা করতেন? সেই বইটাই বা কী ছিল?

বোর্হেস : যে-বইটার কথা আপনি বলেছেন, সেটা আমি দেখানোর জন্য হাতে ধরে রেখেছিলাম। আমার খেলার কথাই বলি, আমার বোন নোরা ছিল দলপতি। আমাকে আমাদের পালেরমো বাগানের মাথা ঘোরানো বাতাসকলটার চূড়াতে উঠতে আর উঁচু ও সরু দেয়ালের ওপর দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করা হত। আমি সে-আদেশ মান্য করতাম। কেননা, আমি যে ভয় পাচ্ছি সেটুকু বলার মত সাহস পর্যন্ত আমার ছিল না।

ওকাম্পো : তাহলে নোরা ছিল আপনার খেলার ও দুষ্টুমির সাথী এবং, আপনি যেমন বললেন, দলপতি?

বোর্হেস : হ্যাঁ, এখন সে প্রায় আলাদা এক মানুষ। তার শৌর্য অবশ্য এখনো একই রকম আছে; যা, ভিক্তোরিয়া, আপনারই মতো প্রকাশিত হয়েছিল সে যখন জেলে ছিল তখন। এখন যারা তাকে চিনেন, তারা তাকে একই মানুষ বলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। সে কী ভালোই না বাসত, ইংরেজরা যাকে বলে নির্মম রসিকতা, তা করতে। সে তার দুষ্টুমি আর রসিকতা সব ছেড়ে দিয়েছিল দেবতার নির্মল দলে যোগ দেবে বলে।

ওকাম্পো : আর আপনার কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল? লেখক কিংবা কবি হবার বাসনা কি আপনার শৈশবেই পুরোপুরি জেগে উঠেছিল?

বোর্হেস : হ্যাঁ। বলা যায় আমি সব সময়ই জানতাম যে আমি লেখক হব। আর আমার উচ্চাভিলাষের কথাই বলি। জানি না অন্যত্র আপনাকে এই কথা বলেছি কিনা। যখন ছোট ছিলাম তখন খুব ব্যর্থতার কথা বলা হত। তাও ফরাসিতে, কদ্যপি ¯প্যানিশে। আমি এইসব ব্যর্থতার কথা শুনতাম আর উদ্বিগ্ন হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতাম- আচ্ছা এমন কোনো দিন কি আসবে যে, আমিও ‘ব্যর্থ’ হব? এটাই ছিল আমার সর্বোচ্চ উচ্চাভিলাষ।

ওকাম্পো : তাহলে আপনি ফরাসিতুল্য ‘ব্যর্থ’ হতে ব্যর্থ হয়েছেন। কৈশোরে কী ছিল আপনার বড় আকাক্সক্ষা- বিখ্যাত হওয়া, না ভালোবাসা পাওয়া?

বোর্হেস : বিখ্যাত হবার কথা কখনো ভাবি নি। আর জানি না ভালোবাসা পাবার কথা কোনোদিন ভেবেছি কিনা। আমি বিশ্বাস করতাম প্রিয়ভাজন হওয়াটা এক ধরনের অবিচার। কোনো বিশেষ ভালোবাসার যোগ্য ছিলাম বলে বিশ্বাস ছিল না আমার। আরো মনে পড়ে আমার বিব্রতকর জন্মদিনগুলোর কথা। যখন সবাই আমাকে উপহারে ভরে দিত আর আমি নিজেকে এক বিশেষ প্রজাতির ঠগ বলে ভাবতাম, যে, এসবের  যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য কিছুই করে নি।

ওকাম্পো : লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন কেন? সেই বয়সে সাহিত্যের কোন দিকটা আপনাকে বিশেষভাবে আর্কষণ করেছিল?

বোর্হেস : প্রথম প্রশ্নটা খুব কঠিন আর সেটার উত্তর দেয়াও অসম্ভব। তবে দ্বিতীয়টার ব্যাপারে বলতে পারি, আমাকে আকর্ষণ করেছিল গ্রিক পুরাণ, স্ক্যান্ডেনিভীয় পুরাণ, খোরাসানের ভেলাদো নবি, মাসকারা দে য়িয়েরার এল ওমব্রে, এদুয়ার্দো পুতিয়েরেসের উপন্যাসিকাসমূহ, ফাসুন্দো, ওয়েলস্-এর প্রশংসনীয় দুঃস্বপ্নেরা ও লস মিল ই উনা নচেস-এর এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেইনকৃত সংস্করণ ইত্যাদি। আমার এইসব ভালোবাসার পরম্পরা মনে নেই। তবে আমার সেই বয়সের দুই প্রেম হাক্লবেরি ফিন ও দন কিহোতে আজ অব্দি আমার সঙ্গ ছাড়ে নি।

ওকাম্পো : স্যঁত এক্সপুরির ভাষ্যমাফিক আপনিও কি শৈশব থেকেই ‘শৈশবের নাগরিক’ বলে মনে করেন নিজেকে? নিজেকে কি আলাদা বলে মনে করতেন, যা কম-বেশি আমরা করে থাকি? কিন্তু কারো কারো অনুভূতি বেশি তীব্র বলেই কি তারা সত্যি তা হয়ে উঠতে পারে?

বোর্হেস : আমি সেই তখন থেকেই একই রকম অর্ন্তমুখী, এ ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট আমি অনুভব করেছি বলে মনে হয় না।

ওকাম্পো : আপনি যেটাকে বলেছেন আপনার শৈশবের মৌল বাসভূমি, সেখানে এখন আমরা প্রবেশ করছি। কেমন ছিল সেটা?

বোর্হেস : ধারাবাহিকভাবে বলতে গেলে, প্রথমটা ছিল সুইপাচা ও এসমেরাল্দার মাঝখানে তুকুমান সড়কের ওপর অবস্থিত একটি পুরানো, নিচু ধরনের বাড়ি। আর সব বাড়ির মতো এরও ছিল লোহার গরাদ দেওয়া দুটো জানালা, বিশাল করিডোর, তোরণের ন্যায় দরজা ও দুটো চত্বর। প্রথম চত্বরটি ছিল সাদাকালো মার্বেল পাথরের তৈরি। একটি চৌবাচ্চা ছিল। সেটার তলায় থাকত একটি কচ্ছপ, যার কাজ ছিল পানিকে পরিশুদ্ধ করা। মন্তেবিদেয়োতে লোকে বলে, কচ্ছপের ভূমিকা পালন করে একটি ব্যাঙ। তাদের ধারণা কচ্ছপ শুধু পানি পরিষ্কার করে না, নোংরাও করে। পালেরমোর সেরানোর সড়কের বাড়িটার কথাও আমি পরিষ্কার মনে করতে পারি। সেটা ছিল উঁচু রাস্তার ওপরের অল্প ক’টা বাড়ির মধ্যে একটা। বাকি বাড়িগুলো, যদি সেগুলোকে আদৌ বাড়ি বলা যায়, সব ছিল নিচের অনাবাদি জমি জুড়ে।

ওকাম্পো : পারানিয়ার বাড়িতেই তো আপনার বাবার জন্ম। আপনি কি সেই বাড়িতে গেছেন, স্বপ্নে কিংবা বাস্তবে?

বোর্হেস : স্বপ্নে এবং বাস্তবেও। তবে ছবির মাধ্যমে গেছি বহুবার। আমার বিশ্বাস আমার কল্পনায় তাদের যে-চিত্র, তা সেই ছবি থেকেই পাওয়া; এন্ত্রেরিয়োসে গিয়ে দেখা বাড়ি থেকে নয়। আমার আরো অনেক বন্ধুর মতো গিরাল্দেস-এর ক্ষেত্রেও তার যে-স্মৃতি আমার মনে আছে, তা কি সত্যিই তাকে দেখার স্মৃতি, নাকি আমি তাকে প্রতিস্থাপন করেছি তার ছবির সঙ্গে, সেটা ভাবতে আমার কষ্ট লাগে। ছবি স্মৃতিতে সহজেই শেকড় গাড়ে, কেননা সে স্থির। আর অন্যদিকে যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে দেখে, সেই মানুষটা ক্রমশ পাল্টে যেতে থাকে।

ওকাম্পো : এই ছবিতে আমরা ১৬২৬ আনচোরেনা সড়কের যে বাগানটা দেখছি তার কোনো রং, শব্দ কিংবা স্বর আপনার মনে পড়ে? আপনার বোন নোরা তো রং আর রেখায় ভাবত। সে যখন তরুণী তখন একবার আমাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘তোমার কোনটা ভালো লাগে বেশি, গোলাপ না লেবু?’ আপনিও কি এরকম ভাবেন?

বোর্হেস : না, একেবারেই না। থিওফিল গতিয়ের-এর মতো আমি বলতে পারব না যে, ‘আমি এমন এক মানুষ যার জন্য পৃথিবী দৃশ্যমানরূপে বিরাজমান।’ বিমূর্ত ও আবেগময়ভাবে ভাবতে পছন্দ করি আমি। তবে আমার বোনের মতো রং আর রেখার বিন্যাসে নয়। যেসব নারীদের সঙ্গে আমি মিশেছি, আমার ভালো মনে নেই, তাদের চুল সোনালি না বাদামি ছিল; আর এও সত্য যে, আমি এই বিমূর্ত পৃথিবীর মোকাবেলা করেছি আমার ক্রমবর্ধমান অন্ধত্ব নিয়েই।

ওকাম্পো : আনচোরেনা সড়কের এই বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে কারা কারা উঠেছেন? কিছু মনে পড়ে আপনার?

বোর্হেস : হ্যাঁ, মনে পড়ে আমাদের উইলিয়াম ব্লেক্কে, (জুলসোলার) মাসেদোনিও ফেরনান্দেস কে- যিনি এমন এক মানুষ যার প্রভাব আমার জীবনে আমি প্রবলভাবে অনুভব করেছি। যতটা না তাঁর লেখার মাধ্যমে, যেগুলোকে আজ আমার খানিকটা জটিল ও দুর্বোধ্য বলে মনে হয়, তার চেয়ে বেশি তাঁর মুখের কথার দ্বারা। আমার জীবনে দেখা বাগ্মীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাসেদোনিও ফের্নান্দেস। সেই সঙ্গে ছিলেন, যা বেশ অসঙ্গতিপূর্ণ বলেই মনে হয়, মিতবাকও। যে কেউ তাঁর সঙ্গে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় কাটাতে পারত। মাসেদোনিও তাঁর নিচু গলায়, বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্নবোধক স্বরে তিনটা কি চারটা পর্যবেক্ষণের কথা উচ্চারণ করতেন। তাঁর সেই তিন কি চারখানা নিরীহ প্রশ্ন ঝলমল করত আমাদের স্মৃতিতে, অনেক পরেও। সবসময় তা আমাদের স্মৃতি জুড়ে থেকে যেত। আমার কাকা আলবারো মেলিয়ান লাফিনুর এবং অবশ্য আমার পিতৃকুলের কথা আমার খুব মনে আছে। এর বাইরে সে-যুগের কোনো ঘনিষ্ঠ স্মৃতি আমার নেই বলেই মনে হয়।

ওকাম্পো : বুয়েনস আইরেসের কথা কি এখনো প্রীতিভরে স্মরণে আসে আপনার? সেখানে গিনবেরা কলেজের ছাত্র ছিলেন আপনি, নোরা যাকে লাল রঙা ছাদের আদলে দেখিয়েছে তার ছবিতে?

বোর্হেস : হ্যাঁ, বুয়েনস আইরেসের কথা আমি সবসময় ভাবতাম। আমাদের বাড়িতে কিছু আর্হেন্তিনীয় সাহিত্যের বই ছিল; যেমন এল ফাসুন্দো, আসাসুবি’র তিন খণ্ড, ছিল মার্তিন ফিয়েরো হুয়ান মোরেইরা, এদুয়ার্দো গুতিয়েরেস-এর সিলুয়েতাস মিলেতারেস। এই উপন্যাসে আমার পিতামহের কথা আছে বলে আমি খুব গর্ববোধ করতাম। যদিও আমি পছন্দ করতাম বোর্হেস নয় মোরেইরার পৌত্র বলেই নিজের পরিচয় দিতে। এবারেস্তো কারিয়েগোর মিসাস হোরহেসও আমার বাবাকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। অরোর লাস মনতালাস ও লুগোনেস-এর লুনারিও সেন্তিমেন্তাল-এর কথাও আমি ভুলতে চাই না। আমি এই বইগুলো বারবার করে পড়েছি। আমার ধারণা এগুলো আমাকে আমার পিতৃভূমির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে দিয়েছে। একে আপনারা আমার নস্টালজিয়া বলে মনে করবেন না, যা আমি কখনো বোধ করি নি। গিনবেরা শহরের জন্য আমার গভীর প্রণয় ছাড়া আর কিছুই নেই।

ওকাম্পো : এই ছবিতে আমরা আপনাকে ও আপনার বাবা-মাকে দেখতে পাচ্ছি কিন্তানা আভেন্যুর বাড়িতে, এতে তাঁরা আপনার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, আমার ধারণা আপনার ভেতরটাকে দেখছেন, আর আপনিও চেয়ে রয়েছেন তাদের দিকে। সে সময় কারা আপনাদের পারিবারিক বন্ধু ছিল?

বোর্হেস : ভিক্তোরিয়া, আপনি প্রথম পদধূলি দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন আমাদের এই বাড়িটিকেই, আজ যা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মন্তেবিদেয়ো কিন্তানা থেকে। এই বাড়িতেই শেষবারের মত আদেলিনার সঙ্গে বাড়ি চলে যাবার সময় রিকার্দো গিরাল্দেস তাঁর গিটারখানা আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন।

ওকাম্পো : আমার ধারণা সান ইসিদ্রো আমার কাছে যা, আদ্রোগেও অনেকটা তাই আপনার কাছে। তাই নয় কি? এই জায়গাটার সামান্য বর্ণনা দেবেন, যেখানে আপনি অনেক ক’টা গ্রীষ্ম কাটিয়েছেন?

বোর্হেস : আদ্রোগের কথা যখন ভাবি তখন আমি বাস্তব আদ্রোগের কথা মনে করি না, যা প্রগতির আঘাতে, মটরযান আর রেডিও, টেলিফোনের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে। আমি ভাবি সেই হারিয়ে যাওয়া আদ্রোগের কথা, তাঁর শান্ত বাড়িঘর, চত্বর আর অলিগলির গোলকধাঁধাঁ আর লোহার গরাদ দেওয়া অবকাশগৃহসমূহ আর শস্যদানায় ভরা বিশালকায় জালাগুলোর কথা। পৃথিবীর যে জায়গাতেই আমি যাই না কেন সেই ইউকেলিপটাস গাছের গন্ধের জন্যই আমি এই হারানো আদ্রোগেতে ফিরে আসব। যা এখন কেবল আমার স্মৃতি, সমস্ত স্মৃতিজুড়েই বিরাজমান।

ওকাম্পো : আপনার বাবার কথা বলুন। কী ধরনের সাহিত্য তিনি পছন্দ করতেন, মানুষ হিসাবে কেমন ছিলেন তিনি, যাকে আপনি দেখেছেন ও জেনেছেন- এসব- জানালে খুশি হব।

বোর্হেস : তিনি ছিলেন খুব বুদ্ধিমান এবং সব বুদ্ধিমান মানুষের মতোই খুব দয়ালু। তিনি স্পেন্সার-এর শিষ্য ছিলেন। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন আমার উচিত এই সৈন্যদল, উর্দি, ছাউনি, পতাকা, গির্জা, পাদ্রি ও কসাইখানা, সবকিছু ভালো করে দেখে রাখ। কেননা এই সব বিলুপ্তির পথে। যাতে করে আমি আমার সন্তানদের বলে যেতে পারি যে, একদিন আমি এসবের সাক্ষী ছিলাম। তার ভবিষ্যদ্বাণী আজও সত্য হয় নি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী একজন মানুষ যিনি নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন। অ্যাংলো স্যাক্সন রক্তের তাঁর পিঠাপিঠি বোনের জন্য দারুণ গর্বিত ছিলেন, তাকে নিয়ে রসিকতাও করতেন। বিমূঢ়ভাবে তিনি আমাদের বলতেন, ‘জানি না কেন এই ইংরেজদের নিয়ে এত মাতামাতি, শেষ পর্যন্ত তারা কারা, একদল জার্মান চাষা মাত্র!’ তাঁর দেবতারা ছিলেন শেলি, কিটস্, ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর সুইনবার্ন। কবিতার বাস্তব যা শব্দের সৃষ্টি, তা যে কেবল প্রতীকের খেলা নয়, একধরনের সঙ্গীত ও ইন্দ্রজালবিশেষ, এ-কথা তিনিই আমার কাছে উদ্ঘাটন করেছিলেন। এখন, যখনই কোনো কবিতা আবৃত্তি করি আমি, তখন আমার অনিচ্ছাতেও, বাবার কণ্ঠেই আমি তা করে থাকি। তিনি বলতেন, এই দেশে আর্হেন্তিনার ইতিহাসে স্থান নিয়েছে আধ্যাত্মিকতা। তিনি ভাষাকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন অনেক শব্দই তাদের মধ্যে একধরনের মরমিয়াপনা লুকিয়ে রাখে। জরাগ্রস্তরা বিশ্বাস করে, তিনি আমাদের বলতেন যে, তারা সেরে উঠবে যেহেতু তাদের আরোগ্যআশ্রমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নসত্রোস পত্রিকায় এনরিকে বাঙ্কস-এর ঘরানায় লেখা তাঁর কিছু প্রশংসনীয় সনেটের সন্ধান পেতে পারেন আপনারা। এল কদিয়ো নামে একখানা ঐতিহাসিক উপন্যাসও রেখে গেছেন তিনি। অনেকগুলো বই লিখে নষ্ট করে ফেলেছিলেন। এসমেরান্দো সড়কের ‘লেঙ্গুয়াস বিবাস’ বিভাগের অধীনে মনস্তত্ত্বের এক প্রফেসরকে দিয়ে ইংরেজিতে শ্রুতিলিখন করিয়েছিলেন কিছু।

ওকাম্পো : আপনার কোনো কবিতা বা গল্পে এই বাড়িকে নিয়ে কোনো স্মৃতি ধ্বনিত হয়েছে?

বোর্হেস : ঠিক জানি না। কিন্তানা আভেন্যুস্থ আমাদের প্রথম বাড়ির ব্যালকনিটি হয়ত এসেছে কোনো কবিতায়। কেননা, যদিও গল্প পড়তে ভালোই লাগত আমার, আমি ভাবতাম গল্প লেখার মত অত্যন্ত জটিল একটি কাজের যোগ্য নই আমি। তবে আমাদের আনচোরেনার বাড়ির ব্যালকনির বর্ণনা আমার ‘বৃত্তাকার ধ্বংস¯তূপ’ গল্পে এসেছে। গল্পটা লিখতে আমার এক সপ্তাহ সময় লেগেছিল। সেই এক সপ্তাহে আমি আলসাগ্রোর এই লাইব্রেরিতে কাজ করেছি। একবার সিনেমাও দেখতে গেছি, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু সবই যেন স্বপ্নের মত ঘটেছিল। তার সবটুকুই যাপন করেছি আমি। এমন করে আর কোনো সাহিত্যকর্মের সঙ্গে জীবনযাপন করি নি আমি, ‘বৃত্তাকার ধ্বংসস্তূপে’র আগে কিংবা পরে।

ওকাম্পো : আপনি কি বিশ্বাস করেন যারা এই বাড়িতে বাস করেছিলেন তাদের কেউ কেউ এ-বাড়িতে কখনো রয়ে গেছেন। অদৃশ্যভাবে উড়ে বেড়াচ্ছেন সেখানে এবং সব পুরোনো বাড়িই কম-বেশি, ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘হন্টেন্ড’? আর কেনই বা এই ‘হন্টেন্ড’ শব্দটার কোনো প্রতিশব্দ নেই স্প্যানিশ ভাষায়? স্পেনীয় কিংবা লাতিন আমেরিকান কেউ কি এর প্রতিশব্দ উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি?

বোর্হেস : আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমিও বিশ্বাস করি, আপনি যেমনটা বললেন যে ‘হন্টেন্ড’, ‘আনক্যানি’, ‘ইরি’ জাতীয় ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় নেই। কেননা আমরা যারা সে-ভাষা ব্যবহার করি তারা তা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি নি। অন্যদিকে ইংরেজিতে ও স্কচ ভাষায় ‘আনক্যানি’ কিংবা জার্মানে তার প্রতিশব্দ ‘আনহাইমলিশ’ জাতীয় শব্দ রয়েছে, কেননা সেসব ভাষাভাষী লোকজন শব্দগুলোকে দরকারি মনে করেছেন। তারা একই সঙ্গে আধিদৈবিক ও অতিপ্রাকৃতের উপস্থিতি অনুভব করেছেন। আমি মনে করি এই বাগর্থসমূহ যারা তা ব্যবহার করেন তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি কোনো শব্দের প্রতিশব্দ না থেকে থাকে আমাদের ভাষায়, তার মানে তার কোনো চেতনা কিংবা আরো ভালো করে বলা যায়, অনুভূতি নেই আমাদের মধ্যে।

ওকাম্পো : আরো একটা শব্দ আছে যা অনুবাদ করা যায় না। ‘উইস্টফুল’ শব্দটি। অন্তত আমি এর কোনো অনুবাদ দেখি নি। আপনি কি দেখেছেন?

বোর্হেস : না, আমার চোখেও পড়ে নি। ‘নস্তালহিকো’, ‘আনহেলান্তে’ জাতীয় শব্দগুলো তার কাছাকাছি অর্থ বহন করে। কিন্তু কোনোটাই ঠিক ‘উইস্টফুল’ শব্দের যথার্থ প্রতিশব্দ নয়। সত্যি বলতে কী, এই শব্দের ধ্বনিতে, উচ্চারণে এমনকি ভাবানুষঙ্গে এমন কিছু রয়েছে যা ঠিক তার অর্থের প্রতিরূপ।

ওকাম্পো : আপনি কি আদ্রোগের কথা ভাবতে গিয়ে উইস্টফুল মনে করেন নিজেকে? আপনি কি তাঁর স্মৃতিচারণ করেন ‘উইস্টফুলি’?

বোর্হেস : হ্যাঁ। একই ব্যাপার ঘটে অন্য ক্ষেত্রেও।

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close