Home অগ্রন্থিত আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [দ্বিতীয় পর্ব] >> প্রবন্ধ

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [দ্বিতীয় পর্ব] >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ March 13, 2018

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [দ্বিতীয় পর্ব] >> প্রবন্ধ
0
0

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [দ্বিতীয় পর্ব] >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : গত ১২ মার্চ ছিল কবি রফিক আজাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এই উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতায় নিযুক্ত আলী রীয়াজের এই প্রবন্ধটির দ্বিতীয় পর্ব। প্রবন্ধটি ১৯৭৬ সালে লেখা।]

 

দ্বিতীয় পর্ব

 

রফিক আজাদের কাব্যযাত্রার অগ্রসরণের ক্ষেত্রে সব সময়ই এইসব বৈশিষ্ট্যের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হয়েছে; এমনকি তৃতীয় গ্রন্থেও তা দুর্নিরীক্ষ্য নয়। তদুপরি তাঁর এই দীঘল যাত্রায় তাঁর অগ্রসরণ সম্পর্কে তিনি যে জ্ঞাত, তা ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র দ্বিতীয় কবিতাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যখন তিনি স্পষ্টত উচ্চারণ করেন-

মাটির উত্তাপ বুঝে

ঘাসের মসৃণ স্পর্শ পেয়ে

সবুজ শস্যের মাঠ পার হ’য়ে

পাখিদের স্বচ্ছন্দ জীবনে চোখ রেখে

লাঙলের দীর্ঘ ইতিহাস পড়াশোনা ক’রে

বনাঞ্চল আর বিন্যস্ত বাগান দেখে-দেখে

সমভূমি থেকে দূরে এই উষ্ণ প্রস্রবণের ধারে

এসে গেছি

[‘পদব্রজে’ না ‘পায়ে হেঁটে’, পৃ. ১০]

তাঁর এই পদব্রজ-যাত্রা তাঁর ঐতিহ্যানুসরণেরই স্বাক্ষর বহন করে। ইতিহাসের ধারাক্রমে বিশ্বাসী একজন কবির দীঘল যাত্রা যে ইতিহাস ভুগোলের শোভাভূমিতে ব্যাপপৃত ও বিস্তৃত তা তাঁর এই কবিতা থেকে অনায়াসে উদ্ধার করা যায়। রফিকের অন্বিষ্ট সেই ধারাক্রম অনুসরণ, অগ্রসরণ ও উত্তরণ। এই উত্তরণাকাঙ্ক্ষাই রফিককে তাঁর ব্যক্তিকতার বিশাল ভূমিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে; তিনি চান বা না চান তাঁর ‘কেবলি মানব-সভ্যতা আর তার শৈশবের কথা খুব ক’রে মনে পড়ে’ [মধ্যরাতের শোকগাথা, পৃ. ২১]। রফিকের ধারাবাহিকতা অনুসৃতির বোধ যে কতো গভীর ও তার ব্যাপ্তি যে কতো বিস্তৃত তার প্রমাণ মেলে ‘শিকড়েরা’ কবিতায়-

শিকড়েরা চ’লে গেছে স্তর-পরম্পরাক্রমে

মৃত্তিকার গভীর গহ্বরে,

ডানা মেলে পাখিদের মতো উড়ে-উড়ে ঢুকে গেছে

পাললিক স্তর ভেদ ক’রে- বহু দূরে- স্বাদু জলে,

জলের গভীরে;

জলের সংস্পর্শে এসে শিকড়েরা আর্দ্র হ’তে থাকে,

ক্রমাগত মৃত্তিকায় প্রবিষ্ট হতেই যেন

বৃক্ষেদের প্রধান আহলাদ।

[শিকড়েরা, পৃ. ৩৮]

রফিকেরও যেন একটি প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা এইভাবে মৃত্তিকার গভীর গহ্বরে ঢুকে যেতে-যেতে ধারাবাহিকতার সূক্ষ্ণ সুতো হাতে ধরে রাখা। তাই তিনি স্পষ্টতই সেখানে বলে দিয়েছেন ‘জানি আমি একটানা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কী-রকম কষ্টকর’ [পৃ. ৩৯]। কিন্তু রফিকের শেষ এখানে নয় বরং তিনি নিজেকে আরো সহজ, স্পষ্ট, সরল ও তীক্ষ্ণ ক’রে প্রকাশ করতে উৎসুক, যার উজ্জ্বল প্রমাণ ‘নর্তকী’ কবিতাটি। যাকে আমি বলতে চাই রফিকের এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ কবিতা এবং বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এক অনন্য সংযোজন। যেখানে তিনি বিনীতভাবে স্বীকার করেছেন-

আদিম গুহার মধ্যে শুরু

হয়েছিলো যেই নৃত্য- তাকেই সযত্নে

সম্মুখের দিকে নিয়ে যাওয়া- আমার যেটুকু সাধ্য

করি সেইটুকু-

কিংবা-

কৃষকের হাতের লাঙল উত্তরাধিকারসূত্রে

পায় তার প্রিয় সন্তানেরা,

এইভাবে ক্রমাগত ধারাবাহিকতা;

আমাকেও চ’লে যেতে হবে নূপুর ও ঘাগরা ফেলে,

শিল্পিত চঞ্চল ক্ষিপ্র অন্য কারু পায়ে তুলে দিয়ে-

[নর্তকী, পৃ. ৪৫]।

একজন কবিকে যে মানবিকতার ঝাণ্ডা তুলে ধরতে হয়, একজন শিল্পীকে যে শেষাবধি এক অকল্পনীয় মানবিকতার স্তরেই উঠে আসতে হয় রফিক আজাদ তা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন এবং তা পেরেছেন ব’লে মানুষের প্রতিনিধি হয়ে এই হীন-বিরুদ্ধ প্রতি হয়ে এ হীন-বিরুদ্ধ প্রতিবেশে মানবিকতার লালফুল ফোটানোর সাধনায় নিবেদিত। তার ধারাক্রমানুসরণ- স্পৃহা ও বোধই তাকে মানবিকতার পথানুসারী করেছে। রফিক শুধু নিজেকে নয় এমনকি তাঁর শব্দাবলিকেও ভাবতে চান মানুষের প্রতিনিধি- “তোমার চিঠির মধ্য থেকে উঠে আসে আবেগের/ অনন্ত সুন্দর শস্য : পরিচ্ছন্ন দীপ্র শব্দাবলি/ যেন ওরা আমার পদ্যের মধ্যে ব্যবহৃত হতে/ মানুষের প্রতিনিধিরূপে জন্মেছে নতুন করে।” [তোমার চিঠির মধ্য থেকে উঠে আসা শব্দাবলি, পৃ. ২৬]। তাঁর এই বোধ যে অন্তঃসারশূন্য অর্থহীন প্রগলভতা নয় তা বুঝতে আমাদের কষ্ট হয় না। কেননা তাঁর এই মানবিকতা তাৎক্ষণিক আবেগ তাড়নার ফল নয়; রফিকের অপরাপর কবিতা ও বক্তব্য যেমন আপাত-মধুর বাক্যজাল বিস্তার করে তাৎক্ষণিক অনুভূতির বাহির-ভুবনে সীমিত না থেকে মেধা ও মনীষা, মনন ও বুদ্ধির ভেতর-মহলে প্রবিষ্ট শাশ্বত মানবানুভূতিকে স্পর্শ করতে উৎসুক তেমনি মননের যুক্তিসিদ্ধ কষ্টিপাথরে কেলাসিত হয়েই বেরিয়ে এসেছে এই মানবিক কণ্ঠস্বর। কবি অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠেই বলে দিয়েছেন- “চালাকি আমার নয়/ মানবিক পৃথিবীকে খুব ভালোবেসে/ আমার বোকামি আমি ধ’রে রাখি সমস্ত জীবন” [ভালোবেসে বোকা থাকতে চাই, পৃ. ১২] তাঁর এই বোধ অত্যন্ত অকৃত্রিম এবং সে কারণেই তার পক্ষে ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র মতো উচ্চকণ্ঠ মানবিক কবিতা রচনা সম্ভব হয়েছে, যার শেকড় চেতনার এক গূঢ় গভীরে সম্প্রসারিত। এই কবিতায় তাঁর আরেকটি বৈশিষ্ট্য দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে তা হলো তাঁর সমাজ-সংলগ্নতা, শুধু ‘সংলগ্নতা’ নয়, সত্যিকার অর্থে আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা। সমকালের রক্তাক্ত ও হিম-বিরুদ্ধ প্রতিবেশ এবং ‘মনুষ্য-পশুর হিংস্রতা’ [পৃ. ৭১] তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে, ক্ষোভদীর্ণ করেছে; তিনি প্রত্যাশা করেছেন ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিবেকের জাগরণ’ [ভালোবাসি, পৃ. ৪০]।

রফিকের এই সমাজ-ঘনিষ্ঠতা কতদূর বিস্তৃত তা নির্ণয় খুব একটা কষ্টকর কাজ নয়। কারণ তাঁর প্রধান প্রবণতাই হচ্ছে নিজেকে স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ করে উপস্থাপিত করা। ‘পারদের মতো ভারি কিন্তু খুবই অস্থির এক সময়ের জলে’র ওপরে একটি ‘সংকীর্ণ সাঁকো’তে [ঘড়ির কাঁটার মতো, পৃ. ৩০] দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি; যখন দুঃসময় গ্রাস ক’রে আছে বহুদূর লোকালয় [অশ্রুজলে-ধোয়া পথে, পৃ. ৩৫], যখন ‘সৈনিকের ভারী বুট, ট্যাঙ্কের ঘর্ঘর’ [এই রাতে, পৃ. ৪৩] রাত্রির নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে, ‘রূঢ় বাণিজ্যিক সভ্যতায় মার খেয়ে’ ‘যুগের কিছু প্রকৃত প্রতিভা…সঙ্গত কারণে ‘মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে, [ এক্ষেত্রে প্রসঙ্গত স্মরণ হয়ে যায় গিনসবার্গের একটি লাইন : I saw the best minds of my generation destroyed by madness- পাশাপাশি রফিকের পংক্তি-নিচয়-

…আমার মুখের কিছু

প্রকৃত প্রতিভা আজ সঙ্গত কারণে চ’লে গ্যাছে

সুতোর ওপারে : এই রূঢ় বাণিজ্যিক সভ্যতার

মার খেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে [পৃ. ৫৮] [রফিকের এই বোধ আজ যে কেলাসিত রূপ ধারণ করেছে তার পূর্বরূপটি উল্লেখ বোধ করি অসঙ্গত হবে না : We have no other alternative except self destruction…Live is meaningless, we are living meaninglessly…we are every momet, swimming in the ocean of mental and physical agitation for which happiness is forgotten to us….Then, what de we want? Nothing, Nothing, we want nothing from our bloody society. We are exhausted, annoyed, tired and `Sad’. [Sad Generation থেকে উদ্ধৃত।] যে সময় ‘প্রতিটি সংসার ব্যায়ামের আখড়া খুলেছে’ [চ’লে যাবো সুতোর ওপারে, পৃ. ৫৮]- সে সময় রফিক ‘সভ্যতার সূতীবস্ত্রগুলি ফেলে পথে নেমে…সম্পূর্ণ শৃঙ্খলমুক্ত, যথারীতি সবাক, স্বাধীন’ হতে চেয়েছেন। একটি কালের অনন্য রূপচ্ছবি হিশেবে এই কবিতা অনেকানেক দিন ধ’রে আমাদেরকে আলোড়িত করবে একথা অনস্বীকার্য়। রফিকের এই সমাজ-ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নে আরেকটি কথা বলা অত্যন্ত জরুরি; তাহলে তিনি তার সময়ের এই সব ক্ষুদ্রতা ও দীনতা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং ভেতরে-ভেতরে গুমরে মরেছেন। কিন্তু প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠেননি। একটি অবিচল ও নিষ্ক্রম্প্র পথানুসরণ ক’রে লক্ষ্যে পৌঁছুবার সাধনায় ব্যাপৃত হন নি। তাঁর সমাজ ও সময়-সচেতনতা শেষাবধি একটি ব্যক্তি-অন্তরের কান্না, দীর্ঘশ্বাস, অভিমানের ভেতরে অস্থির ও চঞ্চল হয়ে ছুটোছুটি করেছে; বেরুবার পথ পায়নি। গাঢ় অভিমান নিয়ে রফিক সুতোর ওপারে চ’লে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু এপারের অন্যান্য মানুষের অনির্ধারিত অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিত হন নি। তাঁর মানবিকতার ভেতরে এই দ্বৈততা আমাদেরকে বিস্মিত করে, কিছুটা আশ্চর্য়ান্বিতও বটে। যে কবি ‘শব্দ সমবায়ের সঙ্গে জীবন মরণ বাজী’, রাখতে পারেন [শব্দবন্দী, পৃ. ৪৪] তাঁকে কেন ‘বিপরীত জীবন-যাপন, পৃ. ৩২]- আমি অন্তত তা ঠিক বুঝতে পারি না।

কিন্তু তাই ব’লে রফিকের ওপর আস্থা হারানোও যুক্তিসঙ্গত নয়। কেননা সমাজতত্ত্ববিদসুলভ বিশ্লেষণী চোখ নিয়ে তিনি শিল্পের, জীবনের, সমাজের ভেতরমহলে তীব্র, তীক্ষ্ণ, অন্তর্দৃষ্টির আলো ফেলে এগুচ্ছেন। তাঁর দৃষ্টির এই তীক্ষ্ণতা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে-

মুখ ও মুখোশ এক বস্তু নয়

‘মানুষ’ নামের ফাঁপা ফানুস

নির্বিবাদে

মুখের কথা বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফ্যালে,

চোখও কোনো ভাবা বলে না।

[মানুষ, পৃ. ৬১]।

‘বহিরাবরণের জাল ছিন্ন করে ভেতর-সন্ধানী আলো’ এমন অনেক কিছুই তাকে জানিয়ে দিয়ে গেছে যা তাঁর জানার কথা নয় [মধ্যরাতের শোকগাথা, পৃ. ২০]; আর তাই ‘শিল্পিত নাচের ঊর্ধ্বে র’য়ে যায় যে বিশদ ঘাম’ তার খবরাখবর নিতেও তিনি কুণ্ঠিত নন [নর্তকীর প্রতি বাদক, পৃ. ২৩]।

রফিকের এই ‘ভেতর-সন্ধানী আলো’ আবার ঘুরতে ঘুরতে এসে নিজের ভেতরই স্থান নিয়েছে; বাহির-ভুবনে পথ পরিক্রমাকারী এই চঞ্চল, অস্থির, ক্ষুদ্র পথিককে নস্টালজিয়ার কোমল মিষ্টি আলোতে স্থান নিতে তাই কোনো কষ্টই হয়নি। বরং তা এক অভাবিত মেদুরতায় আমাদেরকে টেনে নিয়ে গেছে ‘স্মৃতিভারাতুর আলোয়-আঁধারে-মোড়া’ এক জগতে। ‘কলাগাছের ছায়ায় ওড়া অপেক্ষাতুর/ একটি সবুজ শাড়ি/ বিদায়’ বলা একটি মুখের কান্নাচাপা হাসি’ [পেছনে ফেলে আসি, পৃ. ১৫] আমাদের বুকে শীত-সন্ধ্যার হিমেল হাওয়া বইয়ে দেয়, আমরা আমাদের নিজের কাছে ফিরে আসি। এই হিমেল ঠাণ্ডা হাওয়া ‘আমার কৈশোর’ এবং ‘তুমি : বিশবছর আগে ও পরে’ কবিতায় সমভাবে প্রবাহিত আমাদের ভেতরে এক স্পর্শময় কাব্য-ভুবনের বোধ সঞ্চার করে দেয়, আমাদের ভেতর লেখা হয়ে যায় ‘নিখুঁত প্রণয়-সংহিতা’। [রফিক তাঁর ‘স্পর্শের পুরাণ’ কবিতায় লিখেছেন :

স্পর্শের ভাষায়

লেখা হতে পারে শুধু

সম্পূর্ণ নিখুঁত এক প্রণয়-সংহিতা।

[পৃ. ১৮]

উপর্য়ুক্ত ক্ষেত্রসমূহে তিনি ভাষার এক মোহময় স্পর্শে ‘ইন্দ্রজাল-ঘেরা কিছু শব্দের সম্মোহে’ [পৃ. ২৪] আমাদের ভেতর এক পরিপূর্ণ প্রণয়-সংহিতা রচনা করে যেন তারই স্বাক্ষর রাখবেন।]

[আগামীকাল সমাপ্ত হবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close