Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [তৃতীয় ও শেষপর্ব] >> প্রবন্ধ

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [তৃতীয় ও শেষপর্ব] >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ March 16, 2018

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [তৃতীয় ও শেষপর্ব] >> প্রবন্ধ
0
0

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ [তৃতীয় ও শেষপর্ব] >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : গত ১২ মার্চ ছিল কবি রফিক আজাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এই উপলক্ষে প্রকাশিত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতায় নিযুক্ত আলী রীয়াজের এই প্রবন্ধটির তৃতীয় ও শেষপর্ব। প্রবন্ধটি ১৯৭৬ সালে লেখা।]

 

শেষ পর্ব

রফিক আজাদের কবিতালোচনার একস্থানে সিকদার আমিনুল হক লিখেছেন : “রফিকের কবিতায় প্রেম ও নারীর প্রসঙ্গ বার বার আসে, প্রতিশ্রুত মুক্তির অপরিমিত আলো নিয়ে। তাই তিনি স্বভাবতই নারীকে বলতে পারে, ‘তোমার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মুহূর্তেই শেখা হয়/ কবিতার ব্যবহার্য সমস্ত ছন্দের মূলসূত্র’। প্রকৃতির কাছে এরকমভাবে শিক্ষা নেন বলেই তা উল্লেখযোগ্য। অন্তর্হিতা প্রণয়িনীর জন্যে তাঁর হাহাকার তীব্রভাবে বর্ধন করে ‘নিঃস্ব, রিক্ত পাখির পালকে’র মতো একা পড়ে থাকার নির্লিপ্ত ঘোষণাটুকু করেই পাঠকদের কল্পনার উপর বাকিটুকু ছেড়ে দেন। কেননা, সে কথা বিস্তৃত পরিসরে, অনেক প্রত্যক্ষ আর্তিতে গানের মতো বার বার উচ্চারণ করে একটি কবিতায় তিনি বলতে চেয়েছেন অন্যত্র (যদি ভালোবাসা পাই)। তিনি প্রেমকে প্রচলিত আধুনিক নিয়মে ব্যঙ্গ করেননি- বঞ্চিত অবস্থায়ও বিষণ্ন ও আন্তরিক সশ্রদ্ধ থেকেছেন। প্রেমের সফলতা বা পূর্ণতার দিকে সোচ্চার হতে পারেননি- এক মেদুর হতাশা নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখেছেন মাত্র।” [প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৬]। সিকদার আমিনুল হকের এই বক্তব্য এক অর্থে সত্যি বটে, কিন্তু তারই সাথে যুক্ত করা দরকার একটি প্রসঙ্গ- শরীরী প্রেমের প্রতি রফিকের অভাবিত দৌর্বল্য। তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রন্থে আমরা তার সাথে পরিচিতি হয়েছি; তৃতীয় গ্রন্থেও তার অন্যথা ঘটেনি। উপরন্ত তিনি খোলাখুলিভাবে বলতে চেয়েছেন- “এমন নারীর কাছে যাবো না কখনো/ শুধুমাত্র মন দেবে, দেবে না বিগ্রহ।” [যা চাই পুরোপুরি চাই, পৃ. ৩৪]। বস্ত্রের বাহুল্যহীন শরীরে শরীর ন্যস্ত করে/ আমরা দুজন হই তোলপাড় রাহিত-দম্পতি” [চুম্বনের জালে, পৃ. ৩৫]। একদিকে শরীরী প্রেমের প্রতি তাঁর এই পক্ষপাত এবং অন্যদিকে তাঁর ভেতরের এক মেদুর হতাশা তার দ্বৈততারই স্বাক্ষরবহ। রফিক আবার উভয়ের সমন্বয়ের চেষ্টা থেকে বিরত থাকেননি; ‘দেহের অতীত কোনো এক ঐশ্বর্যর লোভে’ ‘শরীর-মনের ঐক্যে’র উপরেও গুরুত্ব আরোপ করে তা প্রমাণের প্রয়াস পেয়েছেন [নর্তকীর প্রতি বাদক, পৃ. ২৪]। এই দোলাচল দোদুল্যমানতা বিস্ময়কর হলেও অভাবিত নয়।

রফিকের কবিতার আরেকটি মৌলসূত্র সম্পর্কে এবার আলোচনা করা যেতে পারে, তাহলো রফিকের সত্য, সুন্দর ও আনন্দের সাধনা। এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় গ্রন্থের একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করা জরুরি মনে করি-

“…ট্রিগারে আঙুল রেখে, পুনর্বার, বুঝে নিতে চাই
অধিনায়কের কণ্ঠে উচ্চারিত গাঢ় শব্দাবলি,
শপথ-প্যারেডে : ‘তোমার মনে রাখা প্রয়োজন
এই যুদ্ধ ন্যায়-যুদ্ধ;- বিশ্বাসঘাতক নয়, আজ
সৌন্দর্য়ের প্রকৃত প্রেমিক চাই;- তোমাদের কাজ
নয় মোটে সাহজিক। আনন্দের রক্ষণাবেক্ষণ
অত্যন্ত দুরূহ কর্ম- অনেকের ঘটে অন্তর্জলি।
সত্যের বিরুদ্ধে নয়, আজীবন সপক্ষে লড়াই।
(সৌন্দর্য-সৈনিকের শপথ প্যারেড : সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে, পৃ. ১৬)।

তাঁর এই ভাবনা-বেদনারই পুলকিত ও স্পষ্টতর প্রকাশ দেখতে পাই তৃতীয় গ্রন্থের প্রথম কবিতায় (সুন্দরের দিকে চোখ রেখে, পৃ. ৯)। সেখানে তাঁর সরাসরি ঘোষণা- ‘সত্যে ও সুন্দরে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ বাধে না।’ রফিকের সত্য, সুন্দর ও আনন্দের এই সাধনা কি তাঁর রোমান্টিক চৈতন্যেরই প্রকাশ; নিঃসন্দেহে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় এবং তার একটি বিশদ প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা দরকার। ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে মূলত সত্যকে খোঁজা’-র এই রফিকীয় প্রয়াসকে যদি প্রবাদতুল্য উক্তি Beauty is truth, truth is beauty-র পাশে স্থাপন করে দিই তবে বোধকরি তার ভেতরে সামান্যই প্রভেদ থাকবে। কিন্তু বিতর্ক এত সহজে ও অবলীলায় শেষ হয়ে যায় না, কেননা রোমান্টিক কাব্যাদর্শের এই গূঢ়তত্ত্ব আপাত দৃষ্টে যত সহজ বলে প্রতীয়মান হয় তত সহজ নয়; তার জন্যে বোধকরি ‘শিকড় চারিয়ে দিয়ে অন্বেষণ’ করা দরকার।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সাহিত্য’ গ্রন্থের ‘সৌন্দর্য়বোধ’ প্রবন্ধের একজায়গায় লিখেছেন- “আধুনিক কবি বলিয়াছেন : Truth is beauty, beauty is truth আমাদের শুভ্রবসনা কমলাশয়া দেবী সরস্বতী একাধারে Truth এবং Beauty মূর্তিমতী। উপনিষদেও বলিতেছেন : আনন্দরূপমমৃতং বদ্‌বিভাতি। যাতা কিছু প্রকাশ পাইতেছে তাহাই তাঁহার অমৃতরূপ। আমাদের পদতলের ধূলি হইতে আকাশের নক্ষত্র পর্যন্ত সমস্ত Truth এবং Beauty, সমস্তই আনন্দরূপমমৃতম।সত্যের এই আনন্দরূপ অমৃতরূপ দেখিয়া আনন্দকে ব্যক্ত করাই কাব্য-সাহিত্যের লক্ষ্য।” রবীন্দ্রনাথের এই ধারণা একার্থে সত্যি বটে, কেননা সত্য সুন্দর ও আনন্দের ধারণা স্থির নিশ্চিত কোন বস্তু নয় বরং তার পার্থক্য লেখকে-লেখকে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে। এই পরিবর্তমান পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে হয়তো সাহিত্যের লক্ষ্য বঙ্কিমচন্দ্র কথিত ‘দেশের ও মনুষ্যজাতির মঙ্গলসাধন’ বা ‘সৌন্দর্য় সৃষ্টি’ (বঙ্কিমচন্দ্র একবার লিখেছেন : ‘যদি সবে এমন বুজিতে পারেন যে লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য় সৃষ্টি করেন, তবে অবশ্য লিখিবেন।”) ভিন্ন আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু আমাদের সাথে সাথেই মনে পড়ে যায় : Beauty is not monadic. It requires two unities, one visible and the other secret. It we ever managed even after relentless effort to penetrate into the essence of a work by a single glance, the object would be reduced to its inert visibility. Beauty would be effaced, and only its ornamentation would remain. (Essays in Aesthetics: Jean-Paul Sartre)। এই অবস্থায় সত্য, সুন্দর ও আনন্দের কোনো অবকাশ থাকে কি? অন্ততপক্ষে রফিক আজাদের মতো ‘সুন্দরের দিকে প্রধান প্রবণতা’ (নারী: কবির অভিধান, পৃ. ৬৬) সত্ত্বেও সত্য ও সুন্দরকে একসূত্রে গ্রথিত করার প্রয়াস বোধকরি তখন আর তাৎপর্যবহ থাকে না। এই অনিশ্চিতির বোধ আমাদের আরো গভীর হয় যখন প্লাটোর দর্শনের মূলসূত্রের দিকে চোখ রেখে আবিষ্কার করি : The lover of beauty ought not to rest iontent with the vision of beauty in a single mortal, but out to rise to a higher step on the stairway of love and love all physical beauty. He will them be able to rise yet another vision of the beauty of the soul then to the beauty of institutions, then to the beauty of sciences (i.e. intellectual beauty),and finally be ought to rise to an intellectual vision of the eternal unchanging idea of beauty, of which beautiful mortals (Physical Beauty) partake only cudely and temporality.” এই অবস্থায় রফিকের সত্য ও সুন্দরের রোমান্টিক ব্যাখ্যা রোমান্টিক আদর্শের প্রতি অন্ধ-অনুসরণেরই সমগোত্রীয়। তিনি সত্য, সুন্দর ও আনন্দকে ভিন্নতর ব্যঞ্জনা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছেন বললে বোধকরি কোনো ভুল হবে না।

তাঁর এই রোমান্টিক মানসতা তাঁর মানবিকতার প্রশ্নে কেউ-কেউ খুব সহজেই উত্থাপন করতে পারবেন। কেননা, তাঁদের হাতে তো ওয়ার্ডস্বার্থ, কোলরিজ, শেলী, কীটস, বায়রন আর আমাদের সাহিত্যের বিহারীলাল ও রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ, রয়েছেই, যাঁদেরকে মানবতাবাদী করে তুলেছিল এই রোমান্টিকতাই। কিন্তু আমি সেখানে আপত্তি জানাতে বাধ্য হবো। যেহেতু রফিকের এই মানবতাবাদের প্রতি সমর্থন ও মানবিক অভিজ্ঞান সম্পন্ন কবি হয়ে ওঠার পেছনে প্রত্যক্ষ কারণ হিশেবে দ্বিধাহীনভাবে শনাক্ত করা যায় : তাঁর সময় ও সমাজ সচেতনতা। হয়তো পরোক্ষে এবং একটি অপ্রধান কারণ হিশেবে তাঁর এই রোমান্টিক মানসতা কাজ করছে; কিন্তু রফিকের প্রথম পর্বের কবিতার পরিদৃষ্ট অমঙ্গলবোধে যেভাবে তাঁর রোমান্টিক মানসতার উৎসারণ ঘটেছিল তা এখানে ঘটেনি। রফিকের প্রথম পর্বের কবিতায় যে রক্তাক্ত আত্মমগ্নতা প্রত্যক্ষ করা যায় তা খুব সঙ্গত কারণেই আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় রোমান্টিক যুগের কবিদের সেইসব নিষ্ঠুর চেহারার কথা। যেখানে কোলরিজকে আবিষ্কার করি ‘ভয়ঙ্করের প্রতি প্রেমে’ আচ্ছন্ন, শেলীকে সমকামিতার কিম্বা ‘মেডুসা’ বন্দনার; মিলটনের ‘মহৎ-শয়তান’ বা বায়রনের ‘রোমান্টিক তৃষ্ণা’র নামে নারকীয় হত্যাকারী ডাকাতদের সৃজনে মার্কুইস দ্য সাদের যৌন অনাচারাচ্ছন্নতা, এডগার এলান পো’র মৃত্যুমগ্নতা, কীটসের নারী-নির্দয়তার ছবি অঙ্কন তো তাঁদের রোমান্টিক মানসতারই ফসল। রফিক কি তাঁর প্রথম পর্বে সেই ধারারই অনুসারী হয়ে এতটা রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিলেন না? তিনি শেষাবধি অমঙ্গলবোধের পরিপূর্ণ দখল থেকে বেরিয়ে জীবনের বৃহত্তর আলোকোজ্জ্বল অংশে এসে দাঁড়িয়েছেন শুভ ও সুন্দরের স্বপ্ন চোখে নিয়ে।

মোটামুটিভাবে রফিক আজাদের সাম্প্রতিক কবিতার ধারায় হচ্ছে তাই। একজন ব্যক্তিকতাচ্ছন্ন কবি ব্যক্তিমোহব্যুহ ভেঙে ইতিহাস ও সভ্যতার ধারাক্রমে বিশ্বাসী একজন মানবিক কবি হয়ে উঠেছেন- একথা নিঃসন্দেহে আনন্দজনক। কেননা একথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনি ‘অসম্ভবের পায়ে’ থেকে ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’-র দীঘল পথ হেঁটে এসেছেন। তদুপরি তিনি তাঁর লোকালয়কে দুঃসময়ের গ্রাসে আবদ্ধ হতে দেখেছেন (পৃ. ৩৫), দেখেছেন তাঁর যুগের প্রতিভাদের অপমৃত্যু- আবিষ্কার করেছেন তার কারণ (পৃ. ৫৭); জানিয়ে দিয়েছেন অবিন্যস্তির প্রতি তার কোনো সমর্থন নেই- বরং সচেতন শিল্পকর্মই অন্বিষ্ট তাঁর-

অনাবাদী অভিধানে শব্দেরা নীরব,
বন্দী কখনো-বা, শৃঙ্খলিত বোবা-কালা;
শুধু সচেতন শিল্পকর্মে বাঁচে তারা-
নড়ে-চড়ে বসে, হাঁটে : লীলাময় নৃত্যে
কখনো বা জেগে ওঠে শব্দ ব্যালেরিনা;

শব্দকে বিন্যস্ত করে তবেই সংস্কৃতি
তা-না হলে শব্দ সে তো মৃত অভিধান।
(প্রকৃতি ও সংস্কৃতি, পৃ. ৭০)

চারপাশের ‘মানুষ’ নামের ফাঁপা-ফানুসের মধ্যে তিনি দর্পণে এক ‘আস্ত মানুষ’ আবিষ্কার করে ঘোষণা করে দিয়েছেন- ‘যা চাই তা পুরোপুরি চাই’ (পৃ. ৩৪)। রফিকের এই দুর্বিনীত ঘোষণা এবং ঠিক তারই পাশে পাশে তাঁর প্রতিশ্রুতি- “যদি ভালোবাসা পাই শিল্পদীর্ঘ পথে বয়ে যাবো কাঁথাগুলি” (পৃ. ৫৬) আমাদেরকে আশাবাদী ও সাহসী করে তোলে। পরিবর্তে চেয়েছেন এমন কাউকে যার হাত ধরে শিল্পে সাহস পাবেন তিনি (পৃ. ২৯)। আমাদের কাছে রফিকের এই চাওয়া বড় কিছু নয়, আর তাই আমরা ভালোবেসে আমাদের এই হাত বাড়িয়ে দিলাম- রফিক আজাদের দিকে, তিনি বস্তুত শিল্পের এক শ্রদ্ধাভাজন ‘অভিভূত চাষা’-

পথের জমি-জমার দিকে ফিরে
নজর দিই না যে,
একটি মাত্র ক্ষেত্রটিকে ঘিরে
ব্যস্ত থাকি : কাজে।
চাষের যোগ্য জমিটিরে সদা
ফসল-উপযোগী
রাখাই নিয়ম। গা-গতরে খাটি
সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা সর্বদা।
সন্ন্যাসী নই, গরীব কৃষক : ভোগী;
গুচ্ছ গুচ্ছ ধানের বাঁধি আঁটি।
(অভিভূত চাষা, পৃ. ৬৭)।

 

[সমাপ্ত]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close