Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ >> প্রবন্ধ

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ March 12, 2018

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ >> প্রবন্ধ
0
0

আলী রীয়াজ > ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ রফিক আজাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এই উপলক্ষে প্রকাশিত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতায় নিযুক্ত আলী রীয়াজের প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি ১৯৭৬ সালে লেখা।]

 

প্রথম পর্ব

একজন কবি তাঁর সমগ্র কাব্যজীবনে একটি দীঘল পথ অতিক্রমণের সাধনা করেন; একটি অনন্ত পথেরই পথিক তিনি। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রাপথের পাশে-পাশে সদা-দৃশ্যমান হয়ে ওঠে উজ্জ্বল, আলোঝলমল দেবালয়। আর তিনি এই সদা-দৃশ্যমান শিল্পের দেবালয়কে জানিয়ে দিয়ে যান তাঁর অমেয় বার্তা, তার ভেতর-মহলে জ্বালিয়ে দিয়ে যান আরেকগুচ্ছ ঝাড়বাতি। একটু আগেই যা ছিল তাঁর আরাধ্য পরমুহূর্তেই তাই হয়ে ওঠে অতীত, উচ্ছিষ্ট। যাকে স্পর্শ করতে পূর্বমুহূর্ত অব্দি তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেন তাই তাঁর কাছে তখন মনে হয় পরিধেয় বস্ত্রের মতো ব্যবহৃত, জীর্ণ- অতএব পরিত্যাজ্য। এইভাবে এগুতে এগুতে কবি কখনো বা আবিষ্কার করে চলেন নতুন বিশ্ব, কর্ষণ করে যেতে থাকেন অকর্ষিত ভূমি, তুলে নিতে থাকেন কষ্টার্জিত ফসল। তাঁর এইসব ফসলকে ধরে রাখে তাঁর একটি গ্রন্থ, একটি পদ্য, একটি পঙক্তি- এমনকি একটি শব্দ। আর তাই একজন কবির একটি ব্যবহৃত শব্দের পেছনে থাকে আপাত অবান্তর, অপ্রয়োজনীয়, জীর্ণ, উচ্ছিষ্ট শব্দরাজি; পেছনে ফেলে আসা সেইসব দেবালয়গুলোই আগামী দেবালয়ের চালচিত্র নির্মাণ করে, পেছনে ফেলে আসা কর্ষিত ভূমি তাকে চিনিয়ে দেয় আগামী অকর্ষিত ভূমিকে। এইভাবে অনন্ত জীবন ধরে একজন কবিকে সামনের দিকে, তাঁর অজানা গন্তব্যের দিকে, অচেনা অন্ধকারের দিকে আলোর অনন্ত উৎস হাতে নিয়ে এগুতে হয়। যেন তিনি আগামী অজানা দেবালয়ের ভেতর-মহলে বইয়ে দিতে পারেন ঝাড়বাতির আলোর ফোয়ারা, অচেনা অন্ধকারের ভেতরেও ঠিকই পথ চিনে নিতে পারেন। ফলত, একজন কবির এক পর্বের কর্ষিত ভূমি আর শস্যকে দেখতে হলে দেখতে হয় তাঁর অতিক্রান্ত দীঘল পথকে। আলাদা বিচ্ছিন্নভাবে এক পর্বের শস্যকে, আবিষ্কৃত দেবালয়কে দেখতে গেলে নিঃসন্দেহে একটি অসম্পূর্ণ, খণ্ডিত রূপই চোখে পড়বে।বিশেষত, একজন কবি- যিনি এখনও সশ্রমভাবে আবিষ্কার করছেন ও সৃষ্টি করছেন নতুন-নতুন বিশ্ব, যাঁর হাতের লাঙল এখনও ভরে দিয়ে যাচ্ছে জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার- তার জন্যে, মানতেই হবে এক পর্বের শস্যই যথেষ্ট নয়। তাঁকে খণ্ডিত করে দেখবার কোনো অবকাশ নেই; বরং তাঁকে দেখতে হবে তার অতীতের বিশদ প্রেক্ষাপট থেকে, দেখতে হবে কতদূর এগুলেন তিনি; সব মিলে কতখানি জমি আবাদ হলো।

রফিক আজাদের সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ হাতে নিয়ে একজন কবির কাব্য-বিচারের এই মৌল প্রেক্ষাপটের কথা আমার পুনরায় স্মরণ হয়েছে। রফিকের এই তৃতীয় গ্রন্থের আলোচনার ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত প্রেক্ষাপটটি পূর্বশর্ত বলে পরিগণিত হওয়া উচিত বলে আমার ধারণা। কেননা, রফিক আজাদ সেইসব কবিদের একজন, যাঁরা নিরন্তর সাধনা করেন অকর্ষিত নতুন ভূমি কর্ষণের। কম লিখলেও তাঁদের রচনাস্রোত তাঁদের কালের প্রতিনিধিত্বের দাবি করে অবলীলায়। আপাতদৃষ্টিতে ছোট জমি বলে মনে হলেও তাঁদের কর্ষিত ঐ ভূমিই জন্ম দেয় ধান্যগুচ্ছের মতো প্রাণদায়িনী শস্যের।

একজন সত্যিকার কবির কাব্য-বিচারের জন্যে শুধু উপর্য়ুক্ত প্রেক্ষাপটই যথেষ্ট নয়; যেহেতু তিনি কালের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন সেহেতু তাঁকে যেমন তাঁর কালের প্রধান ঘটনাস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়, তেমনি অবাস্তব তাঁর কালের কাব্য-প্রবাহের প্রধান প্রবণতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস। একজন কবির এক-পর্বের শস্যকে ধারণ করে যে গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার বিশ্লেষণ করা দরকার সমসাময়িক কাব্যস্রোতের প্রধান প্রবাহের পাশে রেখেই। অন্যথায় একজন কবির একটি গ্রন্থকে আপাতভাবে একটি বিরল বিষয় বলে অনুভূত হলেও কালস্রোতের সামনে তা ছোট এবং নেহাৎই গতানুগতিকতার চর্চা বলে প্রমাণিত হবে। রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ গ্রন্থের আলোচনায় আমি এই কয়েকটি প্রেক্ষাপট স্মরণ রাখতে সদা-সচেষ্ট থেকেছি এবং সে কারণেই রফিকের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র ভিত্তি বলে আমার মনে হয়েছে ‘অসম্ভবের পায়ে’ গ্রন্থটি এবং তাঁর এই উত্তরিত স্থানের পথ বলে স্বীকৃত হয়েছে ‘সীমাবব্ধ জলে সীমিত সবুজে’ গ্রন্থটি। রফিক আজ যে-ভাষায় ও যে-সুরে কথা বলছেন তার ভেতরে যে উত্তরণের চিহ্ন তাকে ‘উত্তরণ’ বলে মনে হয়েছে তাঁর পূর্বোক্ত দুটি গ্রন্থ থেকে তাঁর অগ্রসরণের কারণে। সে ক্ষেত্রে আপনা থেকেই ঐ দুটি কাব্যগ্রন্থের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকৃত হয়েছে। ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’য় যে মানবিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কবি-ব্যক্তির সাক্ষাৎ মেলে যার মানবিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হয়েছে- ‘সভ্যতার উত্থান পতনে’, ‘সাফল্যে ও ব্যর্থতায়, ক্রমে-ক্রমান্বয়ে,/ মৃত্তিকার স্তরে স্তরে, পাথুরে গুহার খাঁজে খাঁজে (মানবিক অভিজ্ঞতা এইভাবে সম্পন্ন হয়েছে চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, পৃষ্ঠা ৬৮); তার পেছনে যে রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা উপস্থিত তাকে কোনোভাবেই এড়ানো যায় না এবং তা রফিকের অপরাপর দুটি গ্রন্থের ব্যক্তিকতাচ্ছন্নতা ও ব্যক্তি-মোহব্যূহ ভাঙার আপোষহীন প্রয়াসেই লিপিবদ্ধ।

রফিকের প্রথম গ্রন্থ ‘অসম্ভবের পায়ে’ বাহাত্তরে স্বাধীনতা-উত্তর আশাদীপ্ত এলোমেলো পরিবেশে প্রকাশিত হলেও ঐ গ্রন্থভুক্ত কবিতানিচয় রচিত হয়েছে তাঁর কাব্য-জীবনের প্রথম পর্বে- ষাটের দশকের রক্তাক্ত সময়ে। ষাটের যে সময়ের প্রতিচ্ছবি এই গ্রন্থ, তাকে বলা যেতে পারে ‘স্ববিরোধিতার কাল’। একদিকে উপস্থিত নৈরাশ্য ও নৈরাজ্য, ক্লেদ ও কালিমা, হতাশা ও অবক্ষয়; অন্যদিকে একটি জাতি তার আগামী জাগরণের রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠছে ভেতরে-ভেতরে। রফিক তাঁর ব্যক্তি-জীবনের ভেতরে এমনভাবে টেনে নিয়েছিলেন যে, তাঁর পক্ষে বেদনাগাঢ় রক্তক্ষরণের শিকার হওয়া ভিন্ন গত্যন্তর ছিল না। আত্ম-আবিষ্কারের পথ ধরে শত খণ্ডে খণ্ডিত একজন ব্যক্তির যন্ত্রণা ও সুদূর দীর্ঘশ্বাসকে রফিক তুলে এনেছিলেন একটি নতুন বিষয়ের ভেতর দিয়ে। তাই ‘অসম্ভবের পায়ে’র প্রথম নামকরণ ‘অন্তরঙ্গ দীর্ঘশ্বাস’ই বোধকরি যথার্থ ছিল। তাঁর প্রথম গ্রন্থের আলোচনা প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ মন্তব্য করেছিলেন : “ষাটের দশক বলতে যে ক্লেদ এবং কদর্য়তার ছবি আমাদের চোখে ভাসে, ষাটের রফিক প্রায় তারই প্রতীক। যে পচন এবং বিকার, রোগ এবং বৈকল্য ষাটের দশককে নিঃশেষিত করেছিল, যে কালো অবক্ষয় আমাদের সামাজিক অঙ্গনের বুকে কঠিন ও নিথর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, রফিক যেন তারই প্রতিভূ কবি।” (কণ্ঠস্বর, দশম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, মার্চ ১৯৭৫)। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এই মন্তব্যের যাথার্থ্য সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার অবকাশ নেই্ কিন্তু তার সাথেই বোধকরি স্মরণ রাখা দরকার যে, রফিকের এই একটি ব্যক্তি-মোহাবিষ্টতা থেকে। তাঁর রক্তাক্ত অনুভব সমস্ত কৃত্রিম পেলবতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আগামী দিনের প্রত্যাশিত জাগরণের রক্তে রঞ্জিত সময়ের স্বকীয়তাকে তা পরিস্ফুট করেনি। আত্মমগ্ন একজন কবির গুমোট বেদনা, গাঢ় নৈরাশ্য, তার অভাবনীয় যৌনতাস্পৃষ্টতার প্রতিচ্ছবি রচনা ও হার্দ্য উচ্চারণ ‘অসম্ভবের পায়ে’কে ঋদ্ধ করেছে। কিন্তু একই সাথে এই নৈরাশ্য ‍ও প্রতিকুলতার উৎস যে সামাজিক হিম-বিরুদ্ধ পরিবেশ, দুরারোগ্য ব্যাধি-আক্রান্ত যে আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা সে প্রসঙ্গের অনুপস্থিতি এই পর্বের কবিতাকে অনেকাংশেই দুর্বল করেছে। রফিকের এই পর্বের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে কবিতার চারুময় গীতশ্রীকে ভেঙে টুকরো-টুকরো করে সেখানে তিনি এনে বসিয়ে দিয়েছেন ঋজু, সাহসী, অনমনীয়, বিষয়-নির্ভর কবি-ব্যক্তিকে।

তারপর রফিক প্রবেশ করেন তাঁর কাব্য-জীবনের দ্বিতীয় পর্বে; চার বছরের স্বেচ্ছানির্বাসনের শেষে সমাজ অঙ্গনের আরেক পালাবদলের মুহূর্তে রফিক প্রত্যাবর্তন করেন কাব্যাঙ্গনে। তাঁর এই পর্বের কাব্যচরিত্রের প্রধান লক্ষণ নির্ণয় করতে গিয়ে শিহাব সরকারের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য : “ঘন মেঘের মতো কবিতার চারপাশে একেক সময় জমা হয়ে থাকে বাইরের চলমান বিশ্ব, তার ব্যক্তিগত, আপাত-দুর্বোধ্য অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায় মহাবিশ্বের অনাদি প্রাণ-স্পন্দন।” (রফিক আজাদের কবিতা, দৈনিক ইত্তেফাক। রফিক আজাদের এই পর্য়ায়ের কবিতাবলি নিয়েই ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’ গ্রন্থের প্রকাশ। একজন কবি-ব্যক্তি এবং তাঁর প্রতিবেশ পৃথিবীর দোদুল্যমানতা এই গ্রন্থের উপজীব্য বিষয়। সেখানে কবি তাঁর সমাজ ও সমকালের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে সচেষ্ট, আত্মমগ্ন কবিতার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে ক্রিয়াশীল। তিনি ব্যক্তি সীমা থেকে সমাজের ও স্বকালের রক্তময়তার দিকে। তাঁর এই প্রয়াস এক অর্থে ‘প্রয়াসেই’ সীমিত ছিল এই গ্রন্থে। সার্থকতা তেমন উজ্জ্বলভাবে দেখা দেয়নি। উপরন্তু তাঁর পূর্ববর্তী কাব্যচরিত্র- আত্মমগ্নতা- একেবারে ঝেড়েমুছে ফেলতে পারেননি তিনি; সম্ভবও ছিল না। আর সে কারণেই প্রসঙ্গে-অপ্রসঙ্গে তাঁর ভেতর-টান আমাদের চোখে ধরা পড়তে কষ্ট হয় না। রফিক আজাদের এই কাব্যগ্রন্থটি তুলনামূলকভাবে এতো কম আলোচিত হয়েছে যে-কারণে তা হলো এই গ্রন্থ একটি ঋজু চরিত্রের অধিকারী নয়। একজন কবি তার পেছনের একটি উজ্জ্বল চরিত্রের খোলস ফেলে রেখে অন্য আরেকটি আবরণে আবৃত হতে যাচ্ছেন, মাঝখানটার একটি চেহারা দেখা গেলো এক ঝলকের জন্যে। এই এক ঝলক দেখা চেহারার বর্ণনা করা নিঃসন্দেহে কষ্টকর বৈকি। যত সহজে তার প্রথম পর্বের কবিতাকে ‘আত্মমগ্ন রক্তাক্ত কবিতা’ বলে ঘোষণা করে দেয়া যায়, তত সহজে কি দ্বিতীয় পর্বের কবিতাগুচ্ছকে ‘প্রতিবেশ পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি’ বলে দাবি করা সম্ভব? অথচ রফিকের অন্বিষ্ট যে তা-ই তার প্রমাণ মেলে তাঁর কাব্যজীবনের তৃতীয় পর্বের স্বাক্ষর-চিহ্নিত কাব্যগ্রন্থ ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’য়। রফিক আজাদের কবিতা সম্পর্কে আলোচনায় সিকদার আমিনুল হক লিখেছিলেন : “‘অসম্ভবের পায়ে’র কবিতাগুলো কবির ভিতর-ভুবনের কবিতা- যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম, দুঃখ, হতাশা, ক্লান্তি আর আর্তির চিহ্ন। আত্মমনোরঞ্জনই কবিতাগুলোর লক্ষ্য; বিমুগ্ধ তারুণ্য নিয়ে জীবনকে দেখার স্বপ্নময় প্রচেষ্টা। অথচ ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’র বহু কবিতাই বাহির-ভুবনে প্রসারিত। এখন সেই বিমুগ্ধ তারুণ্যের পর্দা অনেকটা উঠে গেছে দৃশ্য থেকে, নিজেকে আবিষ্কারের মুহূর্তেও তার মনে পড়ে যায় ‘এটম বোমার থেকে দু’ বছর বড় এই আমি’।” (দুই ভুবনের দুই কবি, কণ্ঠস্বর, একাদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, মার্চ ১৯৭৬)। বস্তুতপক্ষে রফিক আজাদ তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থেই সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়েছেন। আমি আগেই বলেছি অনেকটা খোলস পাল্টানোর ফাঁকে এক ঝলকের দেখা। সে কারণে সিকদার আমিনুল হককেও স্বীকার করতে হয়েছে দ্বিতীয় গ্রন্থটি কোনো অসামান্য উত্তরণ নয়।

রফিকের এই দুটি গ্রন্থ প্রসঙ্গে বারবার তাঁর আত্মমগ্নতা ও আত্মমনোরঞ্জনতার প্রশ্ন এসেছে, সে প্রশ্নেও রফিকের আরেকটি উল্লেখের দাবিদার। ব্যক্তি-হৃদয়ের উদ্ভাসন তথা আত্মতা লিরিক কাব্যেই বোধকরি সবচেয়ে ফলবানভাবে উৎসারিত হয়; অন্তত আমাদের কাব্যেতিহাস তারই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু রফিক লিরিক কাব্যের সেই মধ্যবিত্তসুলভ শান্তিপ্রিয়তাকে ধ্বসিয়ে দিয়ে আত্ম-আবিষ্কারের এক আলাদা জগৎ সন্ধান করেছেন। বাংলা কাব্যের লিরিকাশ্রয়ী মেদুর-আবহাওয়ায় বেড়ে-ওঠা সত্ত্বেও তিনি তার অনুসারী হলেন না; বিশেষত তাঁর কাব্য-জীবনের প্রাথমিক-লগ্ন যে ক্ষেত্রে ‘সবুজ তিরিশের সার্থক নির্ভরতা’য় সমর্পিত সেখানে এই প্রয়াসের ব্যতিক্রমিতা বিরল কৃতিত্ব বলে অনস্বীকার্য়।

[চলবে]

কভারের আলোকচিত্র : নাসির আলী মামুন

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close